ইফ্ফাত আরার চিত্রিত গীতিময়তা

লেখক: ইব্রাহিম ফাত্তাহ্

একজন সৃজনশিল্পীর দুটি ধ্যান, দুদিকেই তাঁর যশ। এমন প্রতিভার দেখা পাই ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের মধ্যে। তিনি একাধারে এদেশের স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী; রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদের গান করেন। বৈতালিক গানে স্বতন্ত্র একটা গায়কি তৈরি করেছেন। পুরনো বাংলা গানের পুনরুজ্জীবনে তাঁর বিশেষ অবদান আছে।
এই সংগীতশিল্পী যেমন গান করেন, তেমনি আঁকিয়েও। এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের অনুগামী। রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শুরু করেন ৬৩ বছর বয়সে। কবির পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইফ্ফাত আরার ছবি আঁকার শুরু।

সংগীতশিল্পী হিসেবে খ্যাতির মধ্যগগনে এসে চিত্রকর হিসেবে তাঁর আবির্ভাব। ১৯৯২ সালে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে তাঁর প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে এর সূচনা। তারপর পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেছে। দেশে-বিদেশে সাকুল্যে তাঁর ষোলোটি একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

২০০০ সালে সিঙ্গাপুরে গ্যালারি বেলভেদেরে তাঁর তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী হয়। বিদেশে এটি শিল্পীর প্রথম প্রদর্শনী। এরপর ২০০৪, ২০১০ ও ২০১৪ সালে শিল্পের রাজধানীখ্যাত প্যারিসে মুসি আতেলিয়ার আদজাকে ইফ্ফাত আরার তিনটি একক প্রদর্শনী হয়েছে। ২০১৮ ও ২০১৫ সালে কলকাতায় তাঁর দুটি একক প্রদর্শনী হয়।

ঢাকার লালমাটিয়ায় সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনে ‘চাঁদের এতো আলো’ শিরোনামে তাঁর ষোড়শ একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে গত জানুয়ারিতে। দুই সপ্তাহব্যাপী এ-প্রদর্শনী চলেছে ১৫ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। এ-প্রদর্শনীতে শিল্পীর আঁকা সাম্প্রতিককালের কাজের সংখ্যাই বেশি। তবে এগুলোর সঙ্গে নববইয়ের দশকে আঁকা তাঁর কয়েকটি চিত্রকর্মও স্থান পেয়েছে।

শিল্পীর প্রথম প্রদর্শনী থেকেই আমি ইফ্ফাত আরার আঁকা চিত্রকর্ম দেখে আসছি। তিনি নিজের দেখা প্রকৃতি, ঘরের তৈজস ও আসবাবপত্র আর চারপাশের নানা বিষয়কে সহজ ও সরলভাবে চিত্রপটে তুলে ধরেন। তাঁর আঁকার ধরন প্রায় বাস্তবানুগ, তবে হুবহু নয়। পরাবাস্তবের অনুরণন আছে, তবে তাকে পরাবাস্তবও বলা যাবে না।

নিজের অঙ্কনজ্ঞানকে সম্বল করে তাঁর শিল্পবোধ, ঘর সাজানোর শিল্পরুচি নিয়ে তিনি ছবি আঁকছেন। ফুলসহ ফুলদানি আঁকা তাঁর প্রিয় বিষয়। এ-বিষয়টি ধরেই তিনি আঁকতে শুরু করেছিলেন। এ-প্রদর্শনীর জন্যও এঁকেছেন। পরে ঘরের বাইরের কতক বিষয় পর্যায়ক্রমে উঠে এসেছে তাঁর চিত্রপটে। সময় বদলেছে, তাঁর বিষয়ও খানিকটা বিসত্মৃত হয়েছে, তবে আঁকার ধরন বদলায়নি। সারল্যের অন্যরকম একটা শক্তির দিক আছে। সেটি আমরা অবলোকন করি ইফ্ফাত আরার চিত্রকর্মে। সংগীত যেমন তাঁর আজন্ম সাথি, চিত্রকলাও হয়তো তাঁর সঙ্গে আছে বহুকাল ধরে। নইলে অমন ভালোবাসা দিয়ে কী করে ভরান চিত্রপটের জমিন, রেখা ও রঙের রসায়নে!

তাঁর সংগীতগুরু ওয়াহিদুল হক বলেছিলেন – ‘ইফ্ফাত আরার ছবির রেখা খুব নিশ্চিত, সুন্দর এবং গীতিময়।’ সে-কথার প্রতিফলন লক্ষ করি সুলেখক ও বিশিষ্ট কলা-সমালোচক মফিদুল হকের বয়ানে। ইফ্ফাত আরার চিত্রকলা নিয়ে লিখেছেন – তাঁর ছবিতে রয়েছে সংগীতময়তা। ছবি ও গান এক নয়, তবু তাঁর ছবিতে মেলে গানের রেশ, যে-গান দুঃখের, বিষণ্ণতার। তেমনি
জীবনতৃষ্ণার তীব্রতাও এখানে রূপায়িত হয়েছে। শূন্যঘর, শতরঞ্জিতে পড়ে আছে সেতার, গান বুঝি সাঙ্গ হয়েছে। এখন
নিভৃতির অবকাশ। তারপরও আছে জানালা এবং জানালার বাইরের প্রকৃতি। এমনি টুকরো টুকরো ছবির মধ্য দিয়ে ইফ্ফাত মেলে ধরেন জীবনের ছবি, যা পৃথক, স্বতন্ত্র এবং গভীর অর্থে অনন্যও বটে।

ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের ছবিতে গল্প আছে, ছবির শিরোনামেও গল্প বলার ভাবনা আছে। কতক চেনা জিনিস, চেনা বিষয়, শিল্পীর চারপাশের জগৎ নিয়ে সেই গল্প। আবার এই গল্পে কল্পনায় দর্শককে ডানা মেলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন শিল্পী। যেমন – ‘ফুলের সুরভী আছে’ শিরোনামে আঁকা তাঁর চিত্রকর্মে আমরা দেখতে পাই সংস্কৃতিবান মধ্যবিত্তের একটি ঘর। সেখানে জানালা দিয়ে দেখা যায় বাইরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, গোল সূর্য। আর ঘরের ভেতরে বাতাসে জানালার দুলে ওঠা পর্দা, মেঝের ওপর বড় টি-টেবিলে ফুলসহ একটি ফুলদানি, নিচেই মেঝেতে একটি তানপুরা রাখা। জানালা ভেদ করা সূর্যের আলোয় যেন ভরে গেছে ঘর। পরিবেশ দেখে মনে হয়, এই তো এখানে কেউ ছিলেন! এই ভাবনাই তো গল্প তৈরি করার, শিল্পী সে-আবহটি তৈরি করে দেন।

ওই চিত্রটির অনুরূপ ‘উতলা মাধবী রাতে’ শিরোনামে আরেকটি চিত্রেও সেই গল্পকথার আবহ। শিল্পী এক্ষেত্রে রাতের পরিবেশ আনতে চিত্রপটে ভারী রং ব্যবহার করেছেন। জানালায় গভীর নীল বর্ণের আকাশে জ্যোৎস্নাপস্নাবিত গোলচাঁদ, পর্দা উড়ছে, দেয়ালে নদী-নৌকার ছবি। ঘরের ভেতর লাল দেয়াল ও মেঝে; মেঝের ওপর নানা আসবাব ও তৈজসের সঙ্গে এখানেও সেই তানপুরা। কোনো জনপ্রাণি নেই। ফলে বাস্তবানুগ ছবি হয়েও এটি পরাবাস্তব অনুভূতি আনে দর্শকের মনে।

ঘরের বাইরে সবুজ প্রকৃতি নিয়ে ‘আমাদের এই বসুন্ধরা’ ও ‘প্রিয় বসুন্ধরা’ নামে সেই সরল ও সাবলীল ছবি এঁকেছেন। প্রথম চিত্রটিতে বর্গাকার-আয়তাকার জমির বিভাজন চিত্রপটের কেন্দ্রে জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছেন। নিচে নীলাভ জলাধারে সাঁতার কাটছে দুটি হাঁস।

নারী-পুরুষের অবয়ব শিল্পী আঁকেন। তবে তাতে অবয়বের অভিব্যক্তির চেয়ে তার অঙ্কন রেখা ও নকশাটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার রং-রাগের আবহে পাশ থেকে দেখা খোঁপা করা এক নারী-অবয়ব এঁকে শিল্পী এটির নাম দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গান ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’। খোঁপা, কাঠামোসহ এই নারী-অবয়ব হলুদাভ রঙে এঁকেছেন শিল্পী। আবার ‘স্নিগ্ধা’ শিরোনামে আঁকা নারীচিত্রে কাঠামো ও আবহ প্রায় একই ধরনের, খোঁপাসহ মাথার চুলের রং লালচে প্রয়োগ করে শিল্পী চিত্রপটের আবহ রং থেকে অবয়বকে আলাদা করেছেন। সামনাসামনি কয়েকটি নারী অবয়ব এঁকেছেন শিল্পী। এর দুটির নামকরণ করেছেন দুজন নারীর নামে – সংগীতা ও নীরা নামে। মনে হতেই পারে এ-প্রশ্ন – এটি কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের কাব্যলক্ষমীর নীরা কিনা!

রং ও রেখাকেন্দ্রিক কিছু পরিমাণে ছবি এঁকেছেন ইফ্ফাত আরা। যেমন – ‘তুমি রবে নীরবে’, ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো’, ‘ফুলসহ ফুলদানি’ প্রভৃতি। এত সাদামাটা কাজ, তবু মন টানে বিন্যাস ও গঠনের দৃঢ়তায়। এসব মিলিয়ে এক স্বকীয় ও স্বতন্ত্র ইফ্ফাত আরাকে আবার নতুন করে আমরা পেয়ে যাই তাঁর প্রদর্শনী ও প্রদর্শিত চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: