ইয়াসমীন জাহান নূপুরের একক : নীরবতা সরব যেখানে

বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পে ইয়াসমীন জাহান নূপুর পরিচিত নাম। নূপুর ভূখণ্ড আর্টিস্ট স্পেসের
সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের সদস্য। আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করে নয়াদিল্লির এক্সিবিট-৩২০ গ্যালারি। সাম্প্রতিক প্রদর্শনীর মধ্যে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ময়না মুখার্জির নির্দেশনায় ‘দেশ-পরদেশ’(২০২৫)।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বের শিল্প আঙিনায়ও তাঁর খানিক পরিচিতি আছে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত ৫৫তম ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে নূপুর ছিলেন আমাদের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী অন্যতম শিল্পী। ২০২২ সালে ঢাকায় আয়োজিত এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে তিনি গ্র্যান্ড পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কাজ টেট মডার্ন, লন্ডন ও হুইটওয়ার্থ আর্ট গ্যালারি, ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টারের সংগ্রহে আছে।

ইয়াসমীন জাহান নূপুরের শিল্পকর্মের একটি বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্প্রতি ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনশালায় তানজিম ওয়াহাবের কিউরেটিংয়ে।

কিউরেটর লিখেছেন, ‘নূপুর আমাদের প্রবেশ করান তাঁর শিল্পালোকে, যেখানে বোনা হয় তাঁর আর আমাদের গল্প। শৈশবে মায়ের হাতে যত্নে, ধৈর্যে, নিখুঁত ভঙ্গিতে সেলাই করা কাপড় দেখেছেন তিনি। সেই দেয়াল-মাদুরের ভাঁজে ভাঁজে ছিল মঙ্গলকামনা আর ভালোবাসা।

এ প্রদর্শনীতে নানা উপকরণে ও প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত হয়েছে অঙ্কন ও ভাস্কর্য। ২০০৮ সাল থেকে তাঁতিদের সঙ্গে কাজের সুবাদে নূপুর অনুধাবন করেন সামষ্টিক কাজ এবং অন্তর্নিহিত সৃষ্টিশীলতার শক্তি। … এখানে হাত আঁকে নিখুঁত জ্যামিতি আর মন ভেসে যায় নদী, বাড়ি, অন্তরঙ্গ পরিবেশের স্মৃতিতে।’

জলরং, তেলরঙের প্রথাসিদ্ধ মাধ্যম ছাপিয়ে ভাস্কর্য, বয়ন ও পারফরম্যান্স তাঁর অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম, আর এসবই তাঁকে আলাদা করেছে অন্য অনেকের থেকে। আলোচ্য প্রদর্শনীটি মূলত বয়নশিল্পনির্ভর।

নূপুরের বাসস্থান দেশের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পনির্ভর নারায়ণগঞ্জ জেলায়।

আর পাঁচটি বাঙালি মেয়ের মতো তাঁরও পারিবারিক পরিমণ্ডলে পূর্বসূরি মা-খালা আর নানি-দাদির কাছ থেকে বয়নসংক্রান্ত শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ ঘটা বিচিত্র নয়।

এসব যোগসূত্রের সঙ্গে বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের বিকাশ শিল্পীর সৃজন-প্রক্রিয়াকে সম্ভব করেছে। প্রসঙ্গক্রমে আমার মনে পড়ছে, ভেনিসে দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীতে আমাদের বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে নূপুর সুতার রোল দিয়ে যে পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছিলেন সেটিও সমাজে প্রচলিত পোশাকি ভেদাভেদ ও নারীকে অবরুদ্ধ করে রাখার বিরুদ্ধে শিল্পিত প্রতিবাদ ছিল।

শিল্পী তাঁর বয়ানে উল্লেখ করেছেন, ‘বুননের সূক্ষ্মতা, স্বচ্ছতা ও ঐতিহাসিক ভার আমাকে টানে। তার প্রতিটি সুতা ঔপনিবেশিক অতীতের ক্ষত, নদী, দুর্ভিক্ষ ও মায়ের স্মৃতি। পরম্পরাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে স্থানীয় গড়নশৈলীর স্মৃতি ও দেশীয় মেলার পণ্যের আকৃতি-আশ্রিত কোমল ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে একটা সংলাপ রচনা করতে। যেমন, হাটে আদিবাসীদের তৈরি কাগজের খেলনা থেকে কিছু ফর্মের ধারণা পেয়েছি। সেই ফর্ম কাপড়ে প্রতিস্থাপনের ফলে এর নাটকীয়তা, ভঙ্গুরতা এবং স্থিতি নতুন মাত্রা লাভ করেছে।’

বেঙ্গল শিল্পালয়ের প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত কাজগুলোকে শিল্পী বলছেন – সফট স্কাল্পচার বা কোমল ভাস্কর্য। দূর থেকে প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজকেই ভাস্কর্য বলে প্রতীয়মান হয়, কাছে গিয়ে দেখা গেল শিল্পের প্রথাসিদ্ধ উপকরণগুলোর পরিবর্তে শিল্প এখানে বস্ত্র ও আনুষঙ্গিক দ্রব্য দ্বারা নির্মিত, আর তাতে লক্ষণীয় বয়ন ও বুননের শিল্পিত ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ। এসব বৈশিষ্ট্যই এ সময়ের দৃশ্যশিল্পকে এমন অভিনব ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে, যা বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের জন্য এক প্রকার নতুন সংযোজন।

নূপুরের প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘নীরবতার সরবতা’ ইংরেজিতে ‘আনরিভেলিং অফ সাইলেন্স’। বুনটকৃত বস্ত্রের ভেতরে ব্যবহারকারীর হাসি-কান্না, দুঃখ-আনন্দের যে-ভাষা, তার নীরবপাঠ শিল্পীর কাজের ভেতরে। শিল্পী মনে করেন, শিল্পকর্ম হিসেবে এসব বস্ত্রখণ্ডের ভাঁজে ভাঁজে বুননের স্তরে স্তরে বহু শতাব্দীর নীরব ও জমাটবাঁধা অনেক গল্প রয়েছে। শিল্পী এটাকেই যেন ভাষা দিতে চেয়েছেন সমকালের আঙ্গিক ও অবয়বে।

শিল্পী তাঁর নিজের ভাষায় বলছেন, ‘আমার কাজ জুড়ে আমি চেষ্টা করি যা দৃশ্যমান নয় তাকে তুলে ধরতে। কোনো চমকপ্রদ ইঙ্গিত নয়, বরং বিশ্রান্ত নীরব উপস্থিতিতে। আমার কাজের প্রক্রিয়া ক্রমসঞ্চিত, সাংকেতিক, সুকুমার ও স্তরীভূত। আমি বস্ত্র ও বয়নের ভেতর দিয়ে উপনিবেশ, অভিবাসন, ক্ষয় ও নারীত্বের ইতিহাস অনুসন্ধান করি। প্রতিটি সুতাই কিছু স্মৃতি ও শ্রমের ছাপ বহন করে এবং তা অদৃশ্য হতে অস্বীকৃতি জানায়।’

শিল্পী ইয়াসমীন জাহান নূপুরের অনেক কাজের শিরোনামেই আগুন শব্দটির উল্লেখ দেখা গেছে। যেমন ‘যে ডানায় আগুন ঝরে’, ‘বাতাসে আগুনের শিখা’ ইত্যাদি। এমন সরাসরি বক্তব্যধর্মী কাজের এই আগুনের উত্তাপে ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পোশাকি অবয়ব এবং ভেতরকার ক্ষত ও ক্ষয়ের বিরুদ্ধে শিল্পী প্রতিরোধের চিন্তার পাশাপাশি নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্য, বঞ্চনা ও বিরূপ মনোভাবেরও যৌক্তিক সমালোচনা করেছেন।

‘যে ডানায় আগুন ঝরে’ শিরোনামের কাজটিতে আমরা দেখি বোরকায় আবৃত এক অবয়ব, যার ভেতরে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। এরূপ বঞ্চনা থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায় বেগে, ডানার আগুন ঝরিয়ে সে পুড়িয়ে দিতে চায় পরাধীনতার ইতিহাস, উপড়ে ফেলতে চায় শোষণের রক্তবীজ।

আবার একেবারেই বিমূর্ত বিন্যাসের আলংকারিক ও শোভাবর্ধকরূপে প্রতিফলিত শিল্পরূপ তাঁর যেসব কাজে সেগুলো তাঁর অংকন-কুশলতা ও নান্দনিক চৈতন্যের পরিচায়ক। যেমন তাঁর ‘স্পর্শনীয় খাঁজের বিন্যাস’ শিরোনামের কাজে তিন রূপের বিমূর্ত আলংকারিক শোভা বিদ্যমান।

জামদানিশিল্পকে রক্ষার আকুতি বিধৃত হয়েছে তাঁর ‘প্রভুর কাছে প্রার্থনা, জামদানি, বিবিধ ২০১৫-১৬’ শীর্ষক কাজে। এটি সমতল একটি সারফেসে ভাঁজে ভাঁজে রাখা শাড়ি, যার ওপর ইংরেজিতে লেখা আছে প্রার্থনার বাণী।

গ্রাফ কাগজে আঁকা নূপুরের রেখাগুলো আমাদের স্মরণ

করিয়ে দেয় জামদানির নকশা, আগের আমলের মেঝের কারুকাজ, টালির ছাঁচ অথবা শাড়ির পাড়। এসব নকশা দেখে মনের ভেতর অনুভব করি নদীর স্রোত, ঢেউয়ের কল্লোল, জালের বুনট, মেলার কাগজের ফুল।

প্রদর্শনী কক্ষের এদিকে-ওদিকে সুতার বয়নে তৈরি ঝুলন্ত জাল বংশপরম্পরায় জেলে সম্প্রদায়ের জলাশয়, নদী ও মাছধরা পেশার সঙ্গে সম্পর্ক যেমন নির্দেশ করে, তেমনই মহাজনি পুঁজির সঙ্গে শোষণ প্রক্রিয়ার দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত একটা বিশাল ক্যানভাসের গল্পকে অনুভব করা যায়।

শিল্পী ইয়াসমীন জাহান নূপুরের এই প্রদর্শনী তাঁর দীর্ঘদিনের ধ্যান, গবেষণা ও শ্রমের ফসল – যেটি শিল্পবোদ্ধা ও দর্শকদের অনেক ভাবনার খোরাক দিয়েছে। গত ১০ই অক্টোবর ২০২৫ তারিখ আরম্ভ হয়ে প্রদর্শনীটি শেষ হয় ২২শে নভেম্বর ২০২৫-এ।