ইফতেখারুল ইসলাম একাধিকবার চাকরিসূত্রে ইউরোপ, বিশেষ করে ফ্রান্স ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র পর্বত-দর্শনে। এই আকাক্সক্ষা তাঁর মনে গেঁথে দিয়েছিল দেশ পত্রিকায় পড়া কতগুলি অবিস্মরণীয় ভ্রমণকাহিনি এবং বই। সবচেয়ে নাড়া দিয়েছিল উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখা শেরপাদের দেশে। সেই সাধ কর্মজীবনে মেটেনি। কারণটা তাঁর ভাষাতেই বলি, ‘আমাদের সমাজে, বিশেষত নগরজীবনে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সাধারণত তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর স্বেচ্ছাবন্দিত্বে কাটায়।’ আসে অবসর জীবন। তখন, তাঁর ভাষায়, ‘অন্যদের মত আমিও দীর্ঘদিন পরিপূর্ণ গৃহীর জীবন কাটিয়ে একসময় একটু ক্লান্ত বোধ করি। … যা যা ইচ্ছে করে তার মধ্যে একটা হচ্ছে অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণ।’ হিমালয় তাঁকে নিয়ত হাতছানি দিতে শুরু করে। সরাসরি হিমালয়যাত্রা নয়, নেপালের পোখরাতে সস্ত্রীক অবকাশযাপন করতে যান; কিন্তু মনে হিমালয়ের কথা তুষচাপা আগুনের মতো জ¦লতে থাকে। তাঁর লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিই :

পোখরাতে লেকের কাছে কোন হোটেলে না থেকে শরণকোট অঞ্চলে থাকব বলে সিদ্ধান্ত নিই। প্রথম দিন বিকেলেই সেখান থেকে দেখি আকাশের অনেকখানি উঁচুতে অন্নপূর্ণার শিখরগুলো, একসঙ্গে পুরো অনুপূর্ণার রেঞ্জ দেখে বিস্ময়ে ও অভিভূতিতে আমি নিশ্চুপ হয়ে যাই। পরের দিন সূর্যোদয়ের অনেক আগে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। যখন আকাশে আলোর আভা ফুটতে শুরু করে, মনে হয় আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল মচ্ছপুছারের শৃঙ্গ আর পুরো অন্নপূর্ণা রেঞ্জ। একটু একটু করে আলো বাড়ে। আর ছোট ছোট সোনালি বিন্দু ছড়িয়ে পড়ে অন্নপূর্ণার শিখরগুলোর উপর।

আমাকে আরও উন্মাতাল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে দিনটা হয়ে ওঠে মেঘহীন, কুয়াশাহীন ও রৌদ্রোজ্জ্বল। বেলা আরও একটু বাড়লে হোটেলের বারান্দা থেকেই দূর পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট সচল মানুষ দেখা যায়। অক্টোবরের উজ্জ্বল রোদে পর্বতারোহীরা এগিয়ে চলেছে। আমার মন ঘুরে বেড়ায় ওই অভিযাত্রীদের সঙ্গে তুষার ঢাকা পাহাড়ি রাস্তায়। পাহাড়ের আরও কাছে যেতে ইচ্ছে করে।

তাহলে বাধা কোথায়? লেখক একাধারে ভেতো বাঙালি এবং বয়স তেষট্টি। জিমে যাওয়ার অভ্যেস থাকলেও ট্রেকিং করতে লাগে বাড়তি শক্তি, সহনশক্তি, কম অক্সিজেনে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা। ঘটনাক্রমে ফেরার পথে নেপালে থিতু এক ইউরোপীয় ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। লেখকের মনে সংশয়, ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার (১৭ হাজার ৬০০ ফুট) উচ্চতায় পাহাড়ের বেস ক্যাম্পে পৌঁছানো তাঁর এই তেষট্টি বছর বয়সে সম্ভব হবে কি? ডাক্তারকে আনুপূর্বিক তাঁর বাসনার কথা বলে প্রশ্ন করেন, ‘আমি কি পারব? আমার বয়স হয়েছে তেষট্টি বছর।’ তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় পারবে, কিন্তু তার জন্য কিছু প্রস্তুতি চাই …।’

লেখক মনস্থির করে ফেললেন, তিনি ট্রেকিংয়ে যাবেনই। এরপর চলল তাঁর প্রস্তুতি। এনাম আল হকের কাছ থেকে এ-বিষয়ে পেলেন কিছু টিপস। শুরু হয়ে গেল সাজ-সরঞ্জাম জোগাড়ের পাশাপাশি জিমে উপযুক্ত শরীরচর্চা। বইয়ের এই অংশটুকু পাঠ করলে ভবিষ্যতে ট্রেকিংয়ে যেতে ইচ্ছুক যুবারা খুবই উপকৃত হবেন। কারণ তাঁর প্রস্তুতিপর্বের বর্ণনা অতি অনুপুঙ্খ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত।

বইটির পাঠ্যাংশকে মোটামুটি তিনটি অংশে ভাগ করা যায় – ১. ট্রেকিংয়ে যাওয়ার জন্য নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য প্রস্তুতি, ঢাকা ও নেপাল থেকে ট্রেকিংয়ের প্রয়োজনীয় পোশাক ও সরঞ্জাম এবং নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে বেজ ক্যাম্পে যাওয়ার পথে চৌদ্দ আসনের সীতা এয়ারে করে বেজের নিকটবর্তী একচিলতে বিমানবন্দর লুকলা (উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৮৪০ মিটার) পৌঁছানো। ২. সেখান থেকে ইবিসিতে (এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প) পৌঁছানো এবং পুনরায় লুকলায় প্রত্যাবর্তন। ৩. কোভিড-১৯ ও লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে লুকলা থেকে কাঠমান্ডু ফিরে এসে ঢাকা-কাঠমান্ডু-ঢাকা বিমান চলাচল স্থগিতকালীন টানটান উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে লেখকের ঢাকায় প্রত্যাগমন।

লেখকের বর্ণনা বাগড়ম্বরহীন এবং অতিরিক্ত বাক্যবর্জিত। যেমন তিনি তাঁর কর্মসূচি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন লুকলাতে পৌঁছে।

লুকলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮৪০ মিটার উঁচুতে। কাঠমান্ডু থেকে এ পর্যন্ত আমরা উড়ে এসেছি। কাঠমান্ডু ছিল ১৩৫০ মিটার উচ্চতায়। এখান থেকে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প পর্যন্ত বাকি পথ আমরা আটদিনে ট্রেকিং করে যাব। ইবিসির উচ্চতা হলো ৫৩৬৪ মিটার। অর্থাৎ লুকলা থেকে ইবিসি পর্যন্ত আমাদের আরও ২৫২৪ মিটার উঁচুতে উঠতে হবে। এর জন্য হাঁটতে হবে ৬২ কিলোমিটার, এটা আনুমানিক একলক্ষ পনেরো হাজার স্টেপস। শেষ লক্ষ্যে পৌঁছতে আমাদের লাগবে আটদিন, কারণ দুটো দিন আমাদের একলাইমেটাইজেশনের জন্য লাগবে। আর ফেরার সময় পাঁচ দিনে আমরা এই ৬২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসব, …

… এই ট্রেকিংয়ের পথের অন্তত ৩০ শতাংশ হচ্ছে খাড়া ধরনের চড়াই। স্টিপ ক্লাইম্বিং। আর ৩৫ শতাংশ হচ্ছে ধারাবাহিক চড়াই। গ্রাজুয়েন ক্লাইম্বিং। এছাড়া আছে ১৫ শতাংশ উতরাই আর ২০ শতাংশ উঁচুনিচু ধরনের সমতল, যাকে ওরা কৌতুকের সঙ্গে বলে নেপালি ফ্ল্যাট। অর্থাৎ প্রায় সমতল ঠিকই, তবে পুরোটাই উঁচু-নিচু-মাটি-পাথর মিলিয়ে বেশ কঠিন পথ।

বইটি পাঠককে শেষাবধি চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় লেখকের প্রাঞ্জল ও প্রাণবন্ত গদ্যের কারণে। আজকাল কেবল টিভির কল্যাণে পৃথিবীর সকল দর্শনীয় স্থান বা পৃথিবীর এমন কোনো কোনা নেই যা মানুষের চাক্ষুষ দেখার বাইরে আছে। সত্যিকার সাহিত্য ও গদ্যই পাঠককে কেবল ভ্রমণকাহিনিতে আকৃষ্ট করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি নমুনা তুলে ধরি :

বেশ খানিকটা নেমে যাবার পর ছেপলুং নামের একটা জায়গায় পৌঁছে দুধকোশি উপত্যকা ধরে হাঁটি। এটা লুকলার চেয়েও নিচুতে। হাঁটার সময় কোথাও দুধকোশি নদীটা দেখতে পাই। দুধকোশি, দুধের মতো তার রং – সাদা ধবধবে। উদ্দাম বেগে বয়ে চলে দুগ্ধ নদীর ধারা। … চারপাশে পাহাড়ের নিস্তব্ধতার পটভূমিতে দুধকোশি নদীর অস্থিরতা আমাদের কানে তরঙ্গিত হতে থাকে। … নদীর কাছাকাছি থাকলে স্রোতের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। পানি অল্প ও অগভীর; কিন্তু শব্দ অনেক বেশি। আমার হাঁপিয়ে ওঠা নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায় না। ওই সাদা সফেন তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে আমার ক্লান্তি মুছে যায়।

বইটির সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ও মূল্যবান দিক হলো লেখকের ওই ট্রেকিংকালে দৃষ্টিগোচর পাহাড়-পর্বত, তাদের চূড়া, নাম, উচ্চতা, সেসবের সৌন্দর্য ইত্যাদির নিখুঁত পরিবেশনা, অথচ এই যে বিশাল তথ্যের সন্নিবেশ তাতে তাঁর বর্ণনা কোথাও আটকে যায় না।

আখ্যান পর্বে রানি চরিত্রটির প্রথম উল্লেখ পরিচিতিহীন হওয়ায় পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় যে, তিনি লেখকের অর্ধাঙ্গিনী। আর লকডাউন ও ঢাকা-কাঠমান্ডু-ঢাকা বিমান চলাচল স্থগিতকালে লেখককে ঢাকা প্রত্যাবর্তনে সহায়তাকারী বিশিষ্ট চরিত্র কামালের পূর্ণ পরিচিতি না থাকায় এই নামটিকে ঘিরে পাঠকের কৌতূহল থেকেই যাবে। আরো একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে, যেটি হলো, ‘অভিভূতি’ শব্দের যথাপ্রয়োগ। লেখক যা ব্যক্ত করতে চেয়েছেন তার জন্য ওই শব্দটি বিকল্পহীন; কিন্তু এর প্রয়োগ অত্যন্ত বিরল।

আমি ইতিপূর্বে বইটির পাঠ্যাংশকে তিন ভাগে ভাগ করেছি; কিন্তু এ পর্যন্ত শেষ ভাগটি সম্পর্কে কেবল সামান্য ইঙ্গিত দিয়েছি। এই অংশটি লেখকের ঘামঝরানো ট্রেকিংয়ের আবশ্যিক অংশ না হলেও এ-বিষয়ে কিছু না বললে আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। লেখক বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগেই কোভিড পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছেন। লুকলায় ফেরার পর কাঠমান্ডু ফিরতে ব্যাপক বিপত্তি সৃষ্টি হয় বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ার কারণে। তিনি সেখানে আটকে পড়েন। সেখান থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছানো, অনিশ্চয়তার মধ্যে, এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সহায়তায় আশ্চর্যজনকভাবে সম্ভব হয়। তেমনই নানান দৌড়-ঝাঁপ, প্রভাবশালী বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় তিনি ঢাকা-নেপাল-ঢাকা বিমান চলাচল স্থগিত থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পান এবং ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই কাহিনি বেশ দীর্ঘ, উত্তেজনাপূর্ণ এবং বর্ণিত হয়েছে সুচারুভাবে।

আমার মতে, যেখানে এভারেস্ট বইটি গতানুগতিকতার বাইরে বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

Leave a Reply