কবিতার বিচারে আহসান হাবীব

হুমায়ূন মালিক

এজরা পাউন্ড কবি এবং মহান এক সংগঠক। তিনি তাঁর সমকালীনদের জন্যে ছিলেন গুরুপ্রতিম। সাংগঠনিক যোগ্যতার দিকটি বাদ দিয়ে কেবল তাঁর কবিতার বিষয়টি আলোচনা করে পাউন্ডের যথার্থ এবং পরিপূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। এজরা পাউন্ড কবি এবং কবি হিসেবে তিনি তাঁর সমকালীনদের প্রভাবিত করেছেন। সমান্তরালভাবে সংগঠক হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে অন্য লেখকদের পথিকৃৎ ছিলেন। এ দুটো পরিপূরক স্রোতের মিলিত প্রবাহের মাঝেই তাঁর পরিচয় এবং এভাবেই তিনি বিশ্বসাহিত্যের অন্তর্গত। কবি আহসান হাবীব বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে কবিতা নির্মাণের পাশাপাশি সাংগঠনিক অবদানও রেখেছেন এবং এই দুদিক মিলিয়ে তিনি আমাদের সাহিত্যে বিশেষভাবে উলেস্নখের দাবিদার।

কবি আহসান হাবীবের জন্ম পিরোজপুরের (সাবেক বরিশাল জেলার) সংকরপাশা গ্রামে। ১৯১৭ সালে। ২ জানুয়ারি। কবির বাড়িতে যে-পাঠশালাটি ছিল সেখান থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। কৈশোরেই কবি মধ্যযুগীয় পুঁথি, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের কবিতা থেকে শুরু করে মীর মশাররফ হোসেনের বহু গ্রন্থ পড়ে ফেলেন। অতঃপর তাঁকে সাবেক মহকুমা শহর পিরোজপুরের মাইনর স্কুলে ভর্তি করানো হয় ক্লাস থ্রিতে। বলা যায়, আর্থিক অপচয়ের কারণেই তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। মুরবিবদের উপদেশে বাবা তাঁকে গ্রামের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। পরে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী আবার তাঁকে স্কুলে ভর্তি করা হয় পিরোজপুরে। এ-সময় থেকেই তাঁর কবিতা কলকাতার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘মায়ের কবর পাড়ে কিশোর’ তাঁর প্রথম মুদ্রিত রচনা। বাইরের পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘প্রদীপ’ বের হয় শরিয়তে ইসলাম পত্রিকায়। এরপর তাঁর কবিতা কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকা যেমন – দেশ, মাসিক মুয়াজ্জিন, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, সাপ্তাহিক হানাফীতে প্রকাশিত হয়।

ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি বরিশাল বিএম কলেজে ভর্তি হন। দেড় বছর এই কলেজে পড়ার পর চলে যান কলকাতায়। তাঁর প্রকৃত জীবনসংগ্রামের শুরু এখান থেকেই।

কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাসহ (তকবীর, দৈনিক আজাদ, দৈনিক কৃষক, মাসিক সওগাত, দৈনিক ইত্তেহাদ) আকাশবাণী বেতারে চাকরি করেন।

এ সময়েই (১৩৩৭ থেকে ৪৭ বঙ্গাব্দ) তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাত্রি শেষ-এর কবিতাগুলো রচিত হয়। কবিতাগুলোর বিষয়ে হুমায়ুন আজাদের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, তিনি বলেন, ‘রাত্রিশেষ বেরোয় ১৯৪৭-এ; এবং এ-কাব্যেই সর্বপ্রথম একজন মুসলমান কবি ব্যাপক বিংশ শতকী চেতনাসহ আত্মপ্রকাশ করেন। তিরিশি কবিরা যেসব চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন স্বকালের বন্ধ্যত্ব, শূন্যতা, ঊষরতা, অস্থিরতা জ্ঞাপনের জন্য, সেসব পুনরাবৃত্ত হলো তার কবিতায়।’ পরবর্তীকালে রাত্রিশেষ গ্রন্থটি তাঁর জন্য বিশেষ খ্যাতি বয়ে আনে। গ্রন্থটি সে-সময় (’৩৭ থেকে ’৪৭ সাল এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্র, যখন বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে একটি বিশেষ তাৎপর্যের বাহক) রচিত তাঁর কবিতায় পরাধীনতার প্রতিক্রিয়া, স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবের পাশাপাশি শ্রেণিচেতনা হয়ে ওঠে প্রধান উপজীব্য। কিন্তু এই রাত্রিশেষ কাব্যগ্রন্থটির পাঠকপ্রিয়তার কেন্দ্রীয় আকর্ষণ ‘এই মন – এ-মৃত্তিকা’ কবিতাটি। এই কবিতায় কবি একটি চিরায়ত মানবিক আবেগকে ধারণ করেছেন।

চেনা পৃথিবীকে ভালোবাসিতাম জানাজানি ছিলো বাকী

জানতাম না তো সে পরিচয়েতে ছিল অফুরান ফাঁকি

(‘এই মন – এ-মৃত্তিকা’, রাত্রিশেষ)

রাত্রিশেষ কাব্যগ্রন্থের যেসব কবিতায় কবি এরকম আদি বা দ্রোপদ রহস্যের (Classical romanticism) ধারক এবং প্রকৃত অর্থে তিরিশ-উত্তর আধুনিক বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল নন, সেক্ষেত্রে কবির আদি-রহস্যবাদী সত্তার বিকাশ লক্ষণীয়, যে-বিকাশ পরিপূর্ণ এবং সম্পন্ন। অন্তত যতটা দুর্বলতা খুব সহজে উপেক্ষণীয়, তার বেশি নেই এসব কবিতায়। এক্ষেত্রে কবি চিরায়ত বোধ প্রস্ফুটনে স্বাভাবিকভাবে শেলি, কিটস, বায়রনের আদি-রহস্যবাদী বৈশিষ্ট্যে প্রভাবিত। যেমন –

মনে থাকে যার দহনের তৃষ্ণা তারি সেই মন জয়

সম্ভব নয়, তবু ভুল ক’রে ভালবাসতেই হয়।

(‘এই মন – এ-মৃত্তিকা’, রাত্রিশেষ)

রাত্রিশেষ তিরিশের পরিপূর্ণ উত্তরাধিকার নয় কোনো অর্থেই। যদিও এক্ষেত্রে প্রাপ্ত উত্তরাধিকারকে অস্বীকারও করা যায় না। কিন্তু এর যে উত্তরাধিকারিত্ব অতিক্রমণের প্রয়াস তা খুব সহজে চোখে পড়ে। এবং রাত্রিশেষ এমন বিশিষ্টতার ধারক, যা আহসান হাবীবের বলিষ্ঠ সূচনাপর্বকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা থেকে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে :

রাতের পাহাড় থেকে খসে যাওয়া

পাথরের মতো অন্ধকার ধসে ধসে পড়ছে

দু’হাতে সরিয়ে তাকে

নির্বিকার নিরুত্তাপ মন এগোলো।

(‘রেড রোডে রাত্রিশেষ’, রাত্রিশেষ)

সমকাল চেতনা, আধুনিক জীবন-যন্ত্রণার জটিলতা ইত্যাদি বিষয় এবং কবিতার আঙ্গিকগত বিবর্তনিক সচেতনতা তাঁকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে এমন এক অধিষ্ঠানে, যেখানে কবির কবিতাসত্য ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ধারণে প্রয়াসী। বলা বাহুল্য, ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতা বলতে বোঝানো হয়েছে তথাকথিত আধুনিক কবিতার পরবর্তী কালকে।  এই ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতা জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এঁদের পরবর্তী কবিদের পরিশ্রমী ফসল, যা যথার্থ অর্থে কবি আহসান হাবীবের সমকালীন।

আহসান হাবীবের সাহিত্যিক অবদান যে-বইগুলোতে বিধৃত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে – কবিতা : রাত্রিশেষ (’৪৭), ছায়াহরিণ (’৬২), সারাদুপুর (’৬৪), আশায় বসতি (’৭৪), মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (’৭৬), দু’হাতে দুই আদিম পাথর (’৮০), প্রেমের কবিতা (’৮১), বিদীর্ণ দর্পণে মুখ (’৮৫)।

উপন্যাস : অরণ্য নীলিমা (’৬১), জাফরানী রঙ পায়রা (অগ্রন্থিত), রাণী খালের সাঁকো (কিশোর উপন্যাস)।

শিশু-কিশোর গ্রন্থ : ছুটির দিনে দুপুরে (’৭৮, ছড়া-কবিতা), বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর (ছড়া), জ্যোৎস্না রাতের গল্প

সম্পাদিত গ্রন্থ : বিদেশের সেরা গল্প (’৫১)।

বাংলা কবিতায় চলিস্নশের দশক নতুন মাত্রায় সমাজ-সম্পৃক্ত এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কাল। এ-সময়ের কবিদের ভেতর সমাজ-সচেতনতা এসেছে তিনভাবে :

(১) ধর্মীয় ঐতিহ্যে আস্থা : এ-ধারায় কবিরা সমাজে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে ধর্মীয় জাগরণে বিশ্বাসী। এক্ষেত্রে ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেনের নাম বিশেষভাবে উলেস্ন­খযোগ্য।

(২) বাম রাজনৈতিক ধারা : এই ধারার কবিদের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত বিভিন্ন পার্থক্য থাকলেও মূলত সবাই সমাজতান্ত্রিক বিপস্ন­বের মাধ্যমে শোষিত, শাসিত, ঘুণেধরা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী। এ-ধারার কবিদের মধ্যে সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় উলেস্ন­খযোগ্য। সিকান্দার আবু জাফর ছাড়া তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে বামধারার তেমন কোনো উলেস্নখযোগ্য কবি নেই।

(৩) কোনো একটি বিশেষ ধারায় বিশ্বাসী নন : এঁরা কোনো একটি বিশেষ ধারায় বিশ্বাসী নন। প্রয়োজনানুসারে তাঁরা পরিমিতভাবে উভয় ধারার জারকরসে সম্পৃক্ত হয়ে মূলত আধুনিক চিন্তাচেতনা বা প্রাগ্রসর কাব্য-ভাবনায় ঋদ্ধ। আবুল হোসেন, আহসান হাবীব ও সৈয়দ আলী আহসান এ-ধারার কবি।

আহসান হাবীবের বিশ্বাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেবও, যেমন তিনি পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রবিরোধীদের সঙ্গে যুক্ত হন, কিন্তু তিন থেকে আটের দশক পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় তাঁর কবি-ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয়েছে মূলত উলিস্নখিত এই তৃতীয় ধারার বৈশিষ্ট্যের আলোকেই। তাঁর বিষয়ে শিহাব শাহারিয়ারের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আহসান হাবীব কখনই প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক স্রোতে গা ভাসাননি, কিন্তু এদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার-সচেতন ছিলেন। সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা, জীবনের নিগূঢ় সত্যকে স্বীকার করে নিয়েছেন কবির বোধ দিয়ে। তাঁর নিজের ভাষায় : ‘শ্রেণী-বৈষম্যের অভিশাপ, মধ্যবিত্ত জীবনের কৃত্রিমতা ও উদ্ভ্রান্ত, উদ্বাস্ত্ত যৌবনের যন্ত্রণা’, হ্যাঁ, এসব বিষয় নিয়ে কবিতা রচনায় নিবিষ্ট থাকেন তিনি।’

সামান্য কটি গ্রন্থ প্রকাশের পর একটা পর্যায়ে এসে আহসান হাবীব মৃদুভাষী কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন। এই মৃদুভাষিতার বৈশিষ্ট্য কী এবং কেনইবা আহসান হাবীব বিশেষভাবে মৃদুভাষী কবি হিসেবে চিহ্নিত হলেন তা মূল্যায়নের প্রয়াস নেওয়া যাক। ধরা যাক, একজন নতুন মানুষ এলো একটি নতুন সার্কেলে, সেখানে সবার কাছে সে অপরিচিত। তার চলাফেরা, চাওয়ার ভঙ্গি, কথা বলার মুদ্রা সবই অপরিচিত। কিন্তু প্রতিদিনের পরিচয়ের মাধ্যমে মানুষটির বিশেষ ভঙ্গি, মুদ্রাগুলো এই সার্কেলের মানুষের উপলব্ধিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তখন এই মুদ্রাগুলো তাদের কাছে একান্তই সে-মানুষটির। কবি আহসান হাবীবও এভাবে তাঁর পাঠকদের উপলব্ধিতে প্রতিষ্ঠিত হলেন মৃদুভাষী বলে। তাঁর এই মৃদুভাষিতার বিশেষ ভঙ্গি বিষয় ও আঙ্গিকের সম্পৃক্তিতে কবিতানুরাগীদের উপলব্ধিতে একটি বিশেষ ইম্প্রেশন সৃষ্টি করে। একটি কবিতা থেকে এ-বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

পুতুল যদিও

তবু

হেমমেত্মর বিকেলের রোদে

মুখ মুছে

নিজ হাতে তুলে নেয়

সোনা মাখা ধানের মঞ্জরী দু’চারিটি;

যদিও পুতুল।

পুতুল।

…  …  …

এখন তার সম্রাজ্ঞীর মতন মহিমা!

শৈশব কৈশোর আর যৌবনের সারা পথ হেঁটে

অবশেষে

সে এখন একযুগ সভ্যতার উজ্জ্বল আকাশ!

পুতুল বলি না তাকে

যদিও সে আদিম পুতুল।

রানী বলি

কেননা সে প্রাণের পুতুল।

(‘পুতুল’, সারা দুপুর)

তাঁর এই মৃদুভাষিতা মানে নির্লিপ্ততা কিংবা নিরপেক্ষতা নয়। বলা বাহুল্য, মৃদুকণ্ঠের বাক্-দুর্বলতাও নয়। এ এক বিশেষ চিন্তা-চেতনার ফসল এবং তা বিশেষ ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত, যা আপনাতে আপনি পরিপূর্ণতা পাওয়ার প্রয়াসী। এই কবি হয়তো অতিনাটকীয়তায় বিশ্বাস করতেন না এবং ক্ষ্যাপার মতো অনর্থক হইচই করে বিপ্লবীও সাজতে চাননি। যেখানে যা জরুরি, যে-ভঙ্গিতে বলা দরকার সেভাবেই বলতে চেয়েছেন। বিষয়কে পরিমিতির পরিশ্রাবণে পরিশ্রম্নত করে তার সমান্তরাল এক সামঞ্জস্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বলতে চেয়েছেন। এভাবেই আহসান হাবীবের ক্ষেত্রে Evelyn Waugh -এর উক্তি ‘The style is the man’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে তাঁর শ্রেণিচেতনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কিংবা বিপ্লবীসত্তা কোনো এক বিশেষদিকে মাথাচাড়া না দিয়ে তাঁর কবিতাসত্য স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তাঁর কবি-ব্যক্তিত্বের বিশেষ দিক মৃদুভাষিতা সমৃদ্ধির আলোয় হয়ে উঠেছে উদ্ভাসিত।

সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও

সে অস্ত্র উত্তোলিত হলে

পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত

সে অস্ত্র উত্তোলিত হলে

অরণ্য হবে আরো সবুজ

(‘সেই অস্ত্র’, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ)

এই যে বিপস্ন­বের উপলব্ধি কিংবা কোনো বিক্ষোভ প্রকাশে কবির পরিমিতি বোধ তা কি কেবল বাহুল্য বর্জনের প্রচেষ্টা? এর উৎস কোথায়? হয়তো এটি মানুষের প্রতি সুস্থ এবং সুস্থির ভালোবাসা বোধের উৎসারণ। প্রকৃত বিনয়, মানবিক কোমলতার মহৎ তাৎপর্যকে মর্যাদা দেওয়া।

বলেছিলাম ভালোবাসবো।

ভালোবাসার জোরে এই

নদীকে আমি জনস্রোতের

কাছাকাছি নিয়ে যাবো

(‘ভালোবাসা আবিষ্ট’, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ)

বলা বাহুল্য, এই মৃদুভাষিতার মধ্যে আহসান হাবীবের কবিতার সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিহিত নয়। এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য যা আরো অনেক অনুষঙ্গী ধারার সম্পৃক্তিতে তাঁর সত্তার পূর্ণতা এনেছে।

কবি আহসান হাবীবের কবিতায় সমাজ ও সমাজ-সচেতনতা এসেছে বিচিত্রভাবে। এই সচেতনতা এসেছে গ্রামকেন্দ্রিক জীবনবোধ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিশ্বাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ, শ্রেণিচেতনা ইত্যাদি বিসত্মৃত প্রেক্ষাপটে। নিচের আলোচনা তাঁর এসব বৈশিষ্ট্য বিশেস্ন­ষণে প্রয়াসী।

গ্রামীণ প্রকৃতি ও জীবন : পল্ল­xকবি জসীম উদ্দীনের সৃজন পর্বের সিংহভাগ যদিও শহরে কেটেছে; কিন্তু তাঁর কবিতার উপজীব্য ছিল সর্বদাই গ্রামীণ প্রকৃতি ও মানুষ। আহসান হাবীবের কবিতা বিশেস্নষণে আমরা পাই সে প্রকৃতি ও মানুষ, মানুষের সামাজিক ঐতিহ্য। অথচ এই দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বিস্তর। একজনকে আধুনিক লোককবি এবং অন্যজনকে পরিপূর্ণ অর্থে আধুনিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে কেবল তাদের এই জীবন দর্শনের পার্থক্যের কারণে। যদিও কবি আহসান হাবীবের জীবনের অধিকাংশ সময় শহরে কেটেছে, তবু তাঁর রক্ত তাঁর উপলব্ধির গভীরে ছিল তাঁর শৈশব-কৈশোরের ধানক্ষেত, ঘুঘুর দুপুর, সুপারির বন, কবিরাজবাড়ি, রানী খালের সাঁকো, নেহাল উদ্দিন, বাঁশবাগান, সিমলার খাল, সোঁদাল গন্ধ ইত্যাদি এবং এসব তাঁর কবিতায় সমসাময়িক

চিন্তা- চেতনায় নতুন তাৎপর্য, নতুন সঞ্জীবনী পেয়েছে।

দুপাশে ধানের ক্ষেত

সরুপথ

সামনে ধুধু নদীর কিনার

আমার অসিত্মত্বে গাঁথা

আমি এই উধাও নদীর মুগ্ধ

এক অবোধ বালক

(‘দুই হাতে দুই আদিম পাথর’)

 

তবে শহরে বাস করে যেমন গ্রামজীবনের রূপকার, তেমনি শহুরে মানুষের ভিড়ে কীভাবে গ্রামীণ উপকরণ মিশে থাকে আবার গ্রামের মানুষের জীবনে কীভাবে শহুরে উপকরণ ঢুকে পড়ে তাও তিনি তাঁর কবিতায় এনেছেন। এ-বিষয়ে মাসুদুল হক বলেন, ‘তিনি কখনো নির্দিষ্ট বলয়ে অবস্থান করেননি। বিভিন্ন দিকে তিনি তাঁর নান্দনিক অভিরুচিকে পরিভ্রমণ করিয়েছেন। তিনি শুষ্ক খরতার রাজপথে নদী, জলস্রোত, পাল-ঘাট ইত্যাদি বিষয় এনেছেন, তেমনি আবার গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের মধ্যে নাগরিক মানুষের অসিত্মত্বচেতনার সংস্থাপন করেছেন।’

রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিশ্বাস : কবি আহসান হাবীব দুটি প্রশ্ন দিয়ে বাঁধা তিনটি পর্বে বিভক্ত রাজনৈতিক সময়ের অংশীদার। তাঁর কবিতায় এ-সময়ের সম্পৃক্তি খুব স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট। কবি দেখেছেন স্বাধীনতার জন্য এক সর্বভারতীয় (ব্রিটিশের অধীন) জাগরণ, যা ভিন্ন বিশ্বাসবোধকে অবলম্বন করে দুটো সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিলো। জন্ম দিলো মানুষের মনে নতুন আশা ও বিশ্বাসের। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে এদেশের মানুষ আবিষ্কার করল যে, তারা আজো পরাধীন। তারা আজো শাসিত ও শোষিত এবং পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকল তাৎপর্যময় বেশ কিছু ঘটনা। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের বিজয়। ছয় দফা। এগারো দফা। সর্বোপরি ষাটের দশকের গণঅভ্যুত্থান। এসব ঘটনা কবিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু কবি এমন কবিতা রচনায় ব্রতী হতে চাননি, যা কেবল সেই বিশেষ ঘটনার এবং সে- সময়ের প্রয়োজনকে মিটিয়ে সময়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমে সমর্থ নয়। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই কবির ক্ষেত্রে উপরোক্ত বক্তব্য সত্য।

শব্দের মালায় আমি তোমাকে গাঁথতে চাই স্বাধীনতা

তুমি ঘরে বাইরে এমন উলুল ঝুলুল নৃত্যে মেতে আছো,

কি আশ্চর্য, আমার কলম

কিছুতেই তোমাকে যে ছুঁতেও পারে না

(‘স্বাধীনতা’, মেঘ বলে চৈত্রে যাবো)

সমাজ সচেতনতা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ : যেহেতু এ-সমাজ ধর্মকে অবলম্বন করেই। সেজন্য বলা যায়, সমাজ-সচেতনতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় চালচিত্র আসাই স্বাভাবিক। তবে এ-কবি রক্ষণশীল কোনো ধর্মবাদী নন এবং ধর্মীয় বিশেস্নষণের মাধ্যমে সামাজিক উত্তরণের দিকনির্দেশনাও তিনি দিতে চাননি। এক্ষেত্রে এ-সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ধর্মীয় চালচিত্র সমাজ-সচেতনতায় শ্রেণিচেতনার উৎকৃষ্ট বাহক। ছায়াহরিণ কাব্যগ্রন্থে এই শ্রেণিকবিতা মেলে সবচেয়ে বেশি। মহম্মদ তালেবালি, হুজ্জত সরদারের কণ্ঠে (উত্তম পুরুষে) কবির বক্তব্য এক্ষেত্রে তীব্র এবং তীক্ষ্ণভাবে এসেছে।

যেমন :

জী হুজুর, আমি সেই হুজ্জত সরদার

তবে কিনা অর্ধাহারে অনাহারে আজ

হয়েছে এমন হাল। হাড়-মাংসহীন

(‘ছহি জঙ্গনামা’, ছায়াহরিণ)

সমাজ-চেতনায় সাময়িক ঘটনা : বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্গতি আর শোষণের শিকার। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগ এবং পরিবর্তনের হাওয়া বইতে দেখা গেলেও আবহমানকালের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, প্রাকৃতিক স্বভাব প্রায় একই থেকেছে। তাই এই কবির কবিতায় কোনো বিশেষ সময়ের দুর্ভিক্ষ, ভাঙন কিংবা সমুদ্রের আক্রোশ চিরদিনের; তা বিশেষ একটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিশেষ একটি সময়ের ঘটনার প্রতিক্রিয়া সেই বিশেষ মুহূর্তের হয়েও চিরন্তন। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত কবির কাব্য-কৌশলের জন্য। এসব ক্ষেত্রে কবি প্রতীক, রূপক কিংবা বাক্প্রতিমার আশ্রয় নিয়েছেন আবেদনকে ব্যাপক ও বহুমাত্রিক করে তোলার জন্য। এই আবেদন তাই সর্বকালের দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মূর্ত করে।

হাতে সানকি একটু ফেন

একটু পচা ভাতের আশায়

কাঁপবে আর তার দু’চোখে হঠাৎ

ক্লান্তির আঁধার নামলে :

(‘ধান শুধু ধান’, দুই হাতে দুই আদিম পাথর)

তাঁর কবিতায় সমাজ ও শ্রেণিচেতনা : আহসান হাবীবের কবিতার একটি তাৎপর্যময় দিক শ্রেণিচেতনা। রাত্রিশেষ থেকেই এই শ্রেণিচেতনার সূচনা। তার এই শ্রেণিচেতনার উৎস দুমড়ানো- মুচড়ানো গ্রামকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত এবং বিত্তহীন জীবন। আধা-সামন্ত আর পেটি-বুর্জোয়াদের শোষণনীতি, গ্রাম ও শহরের মাঝে সৃষ্ট কৃত্রিম ব্যবধান ইত্যাদি। এই শ্রেণিচেতনার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এই চেতনা তাঁকে বিদ্রোহী করেছে ঠিকই, কিন্তু পরিমিতিবোধ অতিক্রমণে গোঁড়া মার্কসবাদী বিপ্লবী করেনি।

আহসান হাবীবের কবিতায় শব্দচয়ন ও আঙ্গিকগত বিবর্তন :  যেহেতু শব্দই কবিতা, সেহেতু শব্দের বিবর্তনিক উন্নয়নই কবিতাকে প্রকৃত সমৃদ্ধি দিতে পারে – এ-বিশ্বাস আহসান হাবীবের মধ্যে ছিল। ছিল বলেই উন্নয়ন প্রয়াস প্রথম থেকেই তাঁর কাব্য-কৌশলে দৃশ্যমান। প্রথম কাব্যগ্রন্থে তিরিশের কবিদের শব্দচয়ন এবং
চয়ন- কৌশল আহসান হাবীবকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আহসান হাবীব তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাত্রিশেষের ‘এই মন – এ-মৃত্তিকা’ কবিতার শুরুতেই লিখেছেন ‘ঝরা পালকের ভস্মসত্মূপে তবু বাঁধিলাম নীড়।’ এদিকে জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক এবং কবির প্রথম কবিতার প্রথম পঙ্ক্তিতে এই ঝরা পালক ব্যবহার করেছেন। আবেদন সৃষ্টিতেও এই শব্দ ব্যবহারের তাৎপর্য খুব কাছাকাছি। জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘আমি কবি সেই কবি আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি’ এবং আহসান হাবীব লিখেছেন, ‘ঝরা পালকের ভস্মসত্মূপে তবু বাঁধিলাম নীড়।’ কবিতাদুটি পাশাপাশি সম্পূর্ণ না পড়লে এর প্রভাব ও তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। আহসান হাবীবের এ-গ্রন্থের আরো একটি বিখ্যাত কবিতা ‘রেড রোডে রাত্রিশেষে’র (গ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা) রূপক নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ-অনূদিত ইয়েটসের কবিতা ‘পাহাড়পুরে দুর্ভাবনার রাত্রি’র খুব কাছাকাছি। তিরিশ-উত্তর ও তিরিশ-পূর্ব কবিদের ব্যাপক প্রভাবের ভেতর থেকে তাঁর স্বকীয় রূপটি চিনতেও পাঠকের অসুবিধা হয় না। এই স্বকীয় শক্তির বলেই তিনি পরবর্তী গ্রন্থ ছায়াহরিণে এসব প্রভাব থেকে মূলত মুক্ত। ছায়াহরিণে এই মুক্তি তাঁকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা দিলেও ব্যাপক শক্তি দেয়নি, তবে ‘মৃদুভাষী’র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত হওয়ার মর্যাদা দিয়েছে।

ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছেন, ভাষার সবচেয়ে মূল্যবান ঐশ্বর্য দেশের লোকসাহিত্য এবং সাধারণ মানুষের প্রতিদিন ব্যবহৃত সংলাপের মধ্যে। এ-বিশ্বাস তাঁর সমসাময়িক অন্য কবিদের মতো আহসান হাবীবকেও আলোড়িত করে। এই ঐতিহ্য মূল্যায়ন ও রূপায়ণে তাঁর ব্যাপক প্রয়াস দেখা যায়। তাঁর দুই হাতে দুই আদিম পাথর গ্রন্থে এই প্রয়াস সবচেয়ে বেশি। যেমন :

আসমানে তারা সাক্ষী

সাক্ষী এই জমিনে দুল, এই

নিশি রাইতে বাঁশ বাগান

বিস্তর জোনাকী সাক্ষী

সাক্ষী এই জারুল

জামরুল সাক্ষী

(‘উৎসর্গ’, দুই হাতে দুই আদিম পাথর)

এই ঐতিহ্য মূল্যায়ন-প্রয়াস তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থেও দেখা যায়। T.S Eliot তাঁর ‘Tradition and Individual Talent’ প্রবন্ধে যে-ঐতিহ্য মূল্যায়নের কথা বলেছিলেন, আধুনিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার প্রভাব ব্যাপক। বাংলাদেশের কবিতায়ও এই ঐতিহ্য মূল্যায়ন আহসান হাবীবসহ তাঁর সমসাময়িক অন্য অনেক কবির মধ্যে দেখা যায়। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এর প্রথম ব্যাপক প্রয়াস দেখা যায় পঞ্চাশের দশকের কবিদের ক্ষেত্রে। শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মাহমুদসহ অন্যান্য কবির কবিতায় তা খুব উজ্জ্বলভাবে আসে। এঁদের অগ্রজ এবং সমসাময়িক কবি আহসান হাবীবের কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং তা আহসান হাবীবের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই ঐতিহ্য মূল্যায়ন প্রয়াস তিনি তাঁর শেষ দিককার কবিতাগুলোতেও বহমান রেখেছেন। শেষ কাব্যগ্রন্থ থেকে উদাহরণ দেওয়া যাক :

বানাইলাম রূপার বাটি

আঁকিলাম পুষ্প পাতা

গলায় গলায় দুধের ক্ষীর টলে

কালো কেশ কালো হইলো

কালো চক্ষু টলোমলো

তোমার নারীর রূপে জগৎ জ্বলে

(‘তোমার আমার’, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ)

আহসান হাবীবের প্রেমের কবিতা : আহসান হাবীব প্রেমের কবিতার আদি-রহস্যবাদে আধুনিক কলাকৌশল সংস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ এ শুধু কবিতার আঙ্গিক নির্মাণে কিন্তু বিষয়ে নয়। যেমন প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে আহসান হাবীব প্রকৃত আধুনিক নন। তাঁর কবিতায় আধুনিক জীবননির্ভর প্রেমের দর্শন অনুপস্থিত। সমকালীন প্রেমের জটিলতা, দ্বিচারী, বহুচারী প্রেমের টানাপড়েন, আধুনিক প্রেমের বিকৃতিবোধ তাঁর কবিতায় আসেনি বললেই চলে। তিনি বিশুদ্ধ এবং তথাকথিত চিরায়ত প্রেমের উপাসক বলেই এসব বোধ থেকে অনুপস্থিত।

কবিতার লাবণ্যে শরীর তার সম্পন্ন

যদিও তার কোনো তৃষ্ণা নেই

অথচ তৃষ্ণার সমুদ্রও তার

দেহে অনায়াসে লীন হতে পারে

ট্রয়ের আত্মাকে আর হৃদয়কে

জ্বালিয়েছে যে আগুন।

(‘তারা দুজন’, সারা দুপুর)

তাঁর প্রেমের কবিতায় আধুনিকতম দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন না করে যদি বলা হয় ‘The object in literature is delight, its soul is imagination, its body is style’ (‘A History of English criticism’, George Seintsbury) তবেই তাঁর কবিতার যথার্থ মূল্যায়ন হয়। তবে তাঁর প্রেমের কবিতার বিষয়ে শিহাব শাহারিয়ার ভিন্নমত পোষণ করেন। আহসান হাবীবের প্রেমের কবিতা মূল্যায়নের স্বার্থে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আহসান হাবীবের প্রেম-চেতনা তাঁর কাব্যসত্তার অনিবার্য অংশ। প্রেমের কবিতায় তাঁকে পাওয়া যায় এক সার্থক কবি হিসেবে। কখনো সহজ-সরল ভাষায়, কখনো উপমায়, কখনো প্রকৃতি-নিসর্গ বর্ণনায় নিজের প্রেম-চেতনাকে নান্দনিক রূপ দান করেছেন। যদিও আহসান হাবীব মাটি, নদী ও মানুষের কবি, তবু প্রেমের কবিতার কবি হিসেবে বাংলা কবিতার আসরেও প্রতিষ্ঠিত তিনি।’

এই প্রেমের কবিতার বৈশিষ্ট্যের মতোই তাঁর সমগ্র কবিতায় আধুনিক জীবনাক্রান্ত দেহজ উত্তাপের বিকৃত বোধ, নৈরাশ্য, জীবনের অর্থহীনতার বোধ, মৃত্যু-চেতনা, নাসিত্মকতা, আন্তর্জাতিক দ্বিমেরুকরণের কুপ্রভাব – এসব আসেনি। আসেনি বলেই তিনি তাঁর ধারায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন এক ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে। এবং এ-কারণেই তার সমসাময়িক কবিদের কাছ থেকে নিজেকে তিনি আলাদা করতে পেরেছেন। সমসাময়িক কবি ফররুখ আহমদের মতো একক এবং এতটা শক্তিমান কোনো বিশিষ্ট ধারায় চিহ্নিত না হলেও তিনি একটি কাব্যিক পরিম-ল সৃষ্টি করেছিলেন, যা তাঁর নিজস্ব।

কবি আহসান হাবীব বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (সারা দুপুর কাব্যগ্রন্থের জন্য), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ পুরস্কার, পদাবলি পুরস্কার, কবি আবুল হাসান স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন।

তুলনামূলক সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে কবি আহসান হাবীব চলিস্ন­শের অন্যান্য কবি যেমন ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে বিবেচিত হবেন নিঃসন্দেহে। সে-বিবেচনায় তাঁর কবিতার বিষয়ে শহীদ ইকবালের বক্তব্য উলেস্নখযোগ্য, তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কবিতাধারায় তিনি পরিশুদ্ধ ও জীবনবাদী রূপে বিস্তর আলোর অনুগামী, যা উদ্ধত চীৎকারের বিপরীত কিন্তু প্রবলভাবে পূর্ববাংলার নিসর্গে ঐতিহ্যিক। …তেমন পাশ্চাত্য-প্রভাবী না হয়ে, নিজস্ব ঐতিহ্য ও বিবেচনার সময়ের অন্যদের থেকে নিজ গুণেই তিনি আলাদা। আধুনিক ও বৈশি^ক ভূগোলটিও তাঁর মৌল ও শুদ্ধচেতনা পরিশ্রম্নত।’ কবি একটু ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে হলেও পঞ্চাশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীনের পাশাপাশি এমনকি ষাটের কবি রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আল মুজাহিদী, মোহাম্মদ রফিক, আফজাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, অরুণাভ সরকার, আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির, সিকদার আমিনুল হক, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ কবির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আঙ্গিক এবং বিষয়গত বিবর্তনের মিল ও বিশিষ্টতার আলোকেও মূল্যায়িত হওয়ার যোগ্য। কারণ কবি আহসান হাবীব একটি দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন এঁদের পাশাপাশি থেকে। এই দশকগুলোর কোনো সময়ে প্রধান কবি না হলেও তিনি ছিলেন একটি বিশেষ শক্তি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের ধারক।

 

১.      শামসুর রাহমান : নিঃসঙ্গ শেরপা, হুমায়ুন আজাদ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৯৬, পৃ ১৫৭।

২.      ‘তুমি ভালো না বাসলেই বুঝতে পারি ভালোবাসা আছে’, নরম রোদের আলোয়, শিহাব শাহারিয়ার, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৫, পৃ ১২।

৩.     বাংলাদেশের কবিতায় নন্দনতত্তব, মাসুদুল হক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৮, পৃ ৬৭।

৪.      ‘তুমি ভালো না বাসলেই বুঝতে পারি ভালোবাসা আছে’, নরম রোদের আলোয়, শিহাব শাহারিয়ার, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৫, পৃ ১৮।

৫.    বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস : ১৯৪৭-২০০০, শহীদ ইকবাল, রোদেলা, ঢাকা, ২০১৩, পৃ ৩৭। r

Leave a Reply

%d bloggers like this: