কলাকেন্দ্রে ঢালী আল মামুনের একক প্রদর্শনী ইতিহাস অথবা রূপান্তর

লেখক: মোবাশ্বির আলম মজুমদার

আমরা তোমাদের পেছনে ফেলে অনেক দূরে চলে এসেছি! দূর থেকে তাকাও, দেখো তো চিনতে পারো কিনা আমাদের নতুন নতুন শিল্প, নতুন মানুষ?

 

– পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী

আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা, পৃষ্ঠা ২৬

 

ঢালী আল মামুন সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবেন। সামাজিক অনাচার আর অসামঞ্জস্যকে সামনে তুলে আনেন। ছবিতে তাই আশ্রয় নেয় প্রতীকধর্মিতা। দৃশ্যভাষায় দৃষ্টিনন্দন নির্মাণের পরিবর্তে দৃষ্টিগ্রাহ্যতাকে তিনি মনোযোগ দিয়ে শিল্প গড়েন। আঘাত করা তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য। ভ-, মুখোশধারী প্রতারক, চলতি সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা চাটুকারকে তিনি কটাক্ষ করেন। এসব প্রতিবাদের ভাষায় শুরুর দিকে ফ্রান্সিস বেকনের শিল্পকরণ পদ্ধতিতে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন। পরবর্তীকালে তিনি লোকজ ধারার গল্প অবলম্বনে শিল্পকর্ম নির্মাণ করেন। অতিসম্প্রতি যে-মাধ্যম নিয়ে কাজ করেছেন তাতে ঐতিহাসিক সূত্রের সন্ধান মেলে। ঢালী আল মামুন মূর্ত আর বিমূর্ত – এ-দুইয়ের মাঝামাঝি দৃশ্যভাষা তৈরি করেন। মামুনের এবারের প্রদর্শনীর শিরোনাম – ড্রয়িং অ্যান্ড থিংকিং, থিংকিং অ্যান্ড ড্রয়িং-১ অর্থাৎ রেখাচিত্র এবং চিন্তা, চিন্তা এবং রেখাচিত্র-১। চিত্রকলার মৌলিক যে উপাদান সেগুলো হলো – রং, রেখা, বিন্যাস। সাধারণত সেগুলো আমাদের মাঝে দৃশ্যমান হয় বিমূর্তরূপে। মামুন যখন সময়ের কথা বলেন তাঁর কাজে তখন সেটি সুনির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিকতা হাজির করেন। মূর্ত আর বিমূর্তের মাঝে শিল্পী যে-লড়াই করেন তাতে শেষ অবধি উপলব্ধিরই জয় হয়। মামুনের ক্ষেত্রে এটি সত্য।

ঢালী আল মামুনের প্রথম প্রদর্শনী ১৯৮৮ থেকে দেখা যায় অ্যাকাডেমির অনুশীলনের বাইরে তাঁর কাজের উপাদানে পরিবর্তন। সে-সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিপক্ষে একটি ছবি এঁকেছিলেন ‘ল্যান্ড অব ফ্যান্টাসি’ (তেলরং-১৯৮৭)। সেই থেকে তাঁর কাজে ঘুরেফিরে আসে ক্ষমতা, দখল, নিয়ন্ত্রণ, আপসকামিতা, আক্রমণ ইত্যাকার নানা বিষয়। সেই থেকে ভাবনা আর উপাদানে বিশেষত্ব দেখা যায়। ঢালী মনে করেন, ‘শিল্প শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। অতিপ্রাচীন সময় থেকেই শিল্প জ্ঞানব্যবস্থার অংশ। এর মধ্যে কোনো-না-কোনোভাবেই জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব আছে। শিল্পের ইতিহাস শুধু ইতিহাসের নির্দিষ্ট অংশ নয়। সাধারণ ইতিহাসের অংশও শিল্প।’ ইতিহাস, অভিঘাত ও প্রতীকবাদিতার সূত্র নির্ণয়ের অব্যাহত প্রচেষ্টাকেই আমরা শিল্পভাষা বলতে পারি।

ঢালী আল মামুন শুধু অনুশীলনের জন্য রেখার ব্যবহার না করে, স্বতন্ত্র বা নিজস্ব এক চিত্রভাষা তৈরি করেছেন। চলতি প্রদর্শনী নিয়ে শিল্পীর ভাবনা এমন – ‘ড্রয়িংকে নিরেট অনুশীলনের জন্য বা দৃশ্যভাষার সহযোগী হিসেবে বিবেচনায় নিইনি, বরং ভেবেছি স্বতন্ত্র স্বয়ম্ভূ প্রকাশমাধ্যম, যা ভাবনা, উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতার এক ধরনের মানচিত্রীকরণ।’

ঢালী শিল্পকর্মে অনুভূতি প্রকাশ করেন না। ছবির বিষয়ে তুলে আনেন চলমান সমাজ, সাংস্কৃতিক সূত্র, ঐতিহাসিক পটভূমি, বাংলা, বাঙালির উৎসে কী রীতি বা প্রথার প্রচলন ছিল – এসব। এবারের প্রদর্শনী তিনটি নতুন ধরন দর্শকদের অভিজ্ঞতায় যুক্ত হয়ে থাকবে। প্রথমত, প্রদর্শিত কাজের শিরোনাম ইতিপূর্বে প্রদর্শিত কোনো কোনো কাজের শিরোনামের সঙ্গে মিলে যায়। তাতে বিষয়কে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়নি। শুধু সূত্রটুকু বলা হয়েছিল।

ঢালী আল মামুন কখনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা অর্থ দর্শকদের ওপর আরোপ করতে চান না। তিনি প্রসঙ্গটি স্পষ্ট করেই বলেন – ‘একজন দর্শক নিজের মতো করে শিল্পকর্মের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। কবিতায় শব্দ দিয়ে যেমন শিল্প তৈরি হয়, দৃশ্যশিল্পীরাও তেমনি কতগুলো ফর্ম দিয়ে সুনির্দিষ্ট ভাষা তৈরি করেন। দর্শক শিল্পকর্মকে নিজের মতো উপলব্ধি করে একটি সূত্র বা বিষয় নির্ণয় করে শিল্পকর্মকে গ্রহণ করে থাকেন। সেটা শিল্পীকে এক ধরনের ভাবনার সুযোগ দেয়।’ দর্শকদের পর্যবেক্ষণ থেকেও অনেক কিছু গ্রহণ করা যায়। এক্ষেত্রে শিল্পী পুরনো একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন – ‘জলের মধ্যে একটি বরফখ- ভাসে, বরফের অনেকটা অংশই তখন জলে নিমগ্ন থাকে। যে-জ্ঞান দিয়েই আমি কাজ করি না কেন, যদি সে-জ্ঞান প্রত্যক্ষে চলে আসে তখনই একটি সংকট তৈরি হয়। তখন কিন্তু আমি যা তৈরি করলাম, তা নতুন কোনো জ্ঞান সৃষ্টির কথা বলতে পারব না। আমি জ্ঞান ব্যবহার করছি শুধু একটি নতুন জায়গায় যাওয়ার জন্য, নতুন একটি উপত্যকা রচনা করার জন্য।’

প্রদর্শনীর কাজগুলো নিয়ে দ্বিতীয়ত বলা যায় মাধ্যম হিসেবে চা-পাতার সরাসরি ব্যবহার বা পাতা থেকে আহরিত রঙের ব্যবহার করে রেখাপ্রধান কাজ করা। চায়ের পাতার সঙ্গে যোগ হয়েছে – লবঙ্গ, নীল। এ-তিনটি মাধ্যম শুধু শিল্পসৃষ্টির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তা নয়, মাধ্যমগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। শিল্পীর মতটি এখানে এমন – ‘চা, নীল, লবঙ্গ কেবল বিষয়-ভাবনার দৃশ্যরূপ বা অবয়ব বিবৃত করার মাধ্যম ছিল না, তারা একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক সূত্র, ইতিহাসের বয়ান এবং অর্থকারক হিসেবেও বিবেচিত।’

ঢালী শিল্পভাষায় ইতিহাসের সূত্র খোঁজেন। শিল্পকর্মের বিষয়ে দর্শকদের নিশ্চিত তথ্য দিয়ে যান। ২০১৪ সালে বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের আয়োজনে একক প্রদর্শনীতে আমরা সে-ইতিহাস, অতীত, বর্তমান ও আত্মোপলব্ধির প্রকাশ দেখতে পেয়েছিলাম।

তৃতীয় প্রসঙ্গটি পাঠককে বলে দেওয়া যায় এভাবে – ঢালী আল মামুন শিল্পকর্মে রোমান্টিকতাপূর্ণ শিল্প সৃষ্টি করেন না, তিনি সময়ের উত্তাল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেন। নির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিকতা কাজে উঠে আসে। যেমনটি কবিতায়, গল্পে হয়ে থাকে। শিল্পীর দায় থেকে এমন হচ্ছে তাও এখানে সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় না। বলা যায়, যখন ছবির বিষয়ে একটি পাখির মুখের সামনে শাপলা ফুলের আকৃতি তীক্ষè হয়ে পাখির মুখোমুখি হয়ে থাকে তখন বোঝা যায় এর প্রাসঙ্গিকতা আছে। সময়ের এই টানাপড়েন, মানুষে, প্রাণীতে, প্রতিবেশে এ-সংকটকে পার হয়ে যাওয়ার তাগিদ থেকেই মামুনের শিল্পভাষা নতুন মোড় নেয়।

এ-প্রদর্শনীর ছোট-বড় মোট ফ্রেমবন্দি কাজের সংখ্যা সাতাশটি। তার সঙ্গে কিছু স্কেচবুক ও অবজেক্ট রাখা হয়েছে, যেগুলো দেয়ালে থাকা কাজগুলোর পূর্বপ্রস্তুতিকে মনে করিয়ে দেয়। দর্শকদের মধ্যে ঢালীর কাজের চিন্তার সূত্র অনুসন্ধান, মাধ্যমে নতুনত্ব, রেখা ও ছবির জমিন নির্মাণের রীতি একেবারে নতুন মনে হতে পারে। এখানেই ঢালী আল মামুনের শিল্পভাষা যোগাযোগ তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে হয়।

রাজধানীর কলাকেন্দ্রে ঢালী আল মামুনের এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ৩১ মার্চ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply