কলুষ্কাল

লেখক:

মুর্শিদা জামান

 

শেষবার চোখ বুজে আসার আগে আয়েত্রির মুখটা ভেসে উঠল জাফরের মানসপটে – এরপর নিটোল অন্ধকার। গাঢ় কালো রঙের ভেতর ডুবতে-ডুবতে তীব্র বেগুনির ঝলকানিতেই যেন-বা মস্তিষ্ক সজাগ হলো ওর। ফের বাস্তবে ফিরে আসার প্রবল আলোড়ন অস্তিত্ব জুড়ে। কানের লতি বেয়ে টপ-টপ করে রক্ত মাটিতে পড়ছে, সেই শব্দটুকুও শুনতে পেল সহসা। এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য যেন আর কিছুই নেই এই মুহূর্তে। কার্যত জাফরের মাথাটা ঝুলছে জমিন থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে। সারসার আমবাগানের ভেতর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ক্রমাগত লাঠির প্রহারে যখন ওর শরীর ফেটে ছিঁড়ে যাচ্ছে তখনো ক্ষীণ আশার স্রোত বয়ে যাচ্ছিল বুকের ভেতর। এই বুঝি থেমে যাবে লাঠির আঘাত। এই বুঝি আববার আগমন ঘটবে রক্তাক্ত দৃশ্যপটে। কিন্তু তখনো আঘাতের পর আঘাত শরীর ভেদ করে হাড়ে প্রবেশ করছে।

বড় ভাইজানের লাঠির বাড়িটা আলাদা করতে পেরেছিল জাফর। একটু যেন কম লেগেছিল ব্যথা। কিন্তু মেজভাইজানের লাঠির সঙ্গে-সঙ্গে মুখেও চলছিল গালাগাল। নিমিষেই পাঁজরের হাড় গুঁড়া-গুঁড়া হয়ে যাচ্ছিল। নাকি হৃদয়ের ভেতর তীব্র হলাহলে নীলাভ হয়ে যাচ্ছিল জাফর, আঁধারে বোঝা গেল না। এক পর্যায়ে বড়ভাইজানের বিক্ষুব্ধ স্বরে চিৎকার থাক, ঝুলুক এখানে ইবলিশটা সারা রাত! প্রায় শব্দহীন তিন জোড়া পা আমবাগান ছেড়ে গৃহের দিকে নিশ্চিন্তে চলে যায়। চৈত্রমাসের সংক্ষেপ্ত জ্যোৎস্নারাত। রাতের শেষ অর্ধাংশই কেবল জাফরের অতীত-বর্তমান। আয়েত্রি যেন গাইছে –

তুমি না রাখিলে, গৃহ আর পাইবো কোথা,

বড়ো আশা ক’রে এসেছি গো,   কাছে ডেকে লও,

ফিরায়ো না জননী …

স্মৃতির অভ্যন্তরে সুরের মূর্ছনা যতই জাগুক আম্মার মুখটাও তেতো হয়ে উঠেছিল যখন আয়েত্রির কথা জানায় ও। বাড়িসুদ্ধ লোক মুখ ফেরাবে জানত তাই বলে আম্মাও! কত অদৃশ্য শত্রুর চিন্তায় আম্মার সুরা পড়া ফুঁ ওর শরীর জুড়ে। সেই শরীর তো এখন ভাইদের হিংস্র আক্রমণে রক্ত ঝড়াচ্ছে। জাফরের কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। আম্মা, আম্মা গো একটু পানি খাব বলে প্রাণটা ডেকে ওঠে। প্রায় নিস্তেজ হয়ে আসা গলা দিয়ে আওয়াজ বেশিদূর পৌঁছায় না।

ভীষণ রোমান্টিক স্বভাবের ছিল ও ছেলেবেলা থেকেই। কলেজ ছাড়ার পরই ভর্তি হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। কিন্তু ওর মন পড়ে থাকত সর্বদা সংগীতে আর চিত্রকলায়। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আয়েত্রির গান প্রথম যেদিন শোনে –

আমি   বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।

পরমুহূর্তেই জাফরের শরীরে আকুল ধারায় তীব্র আনন্দ প্রবাহিত হয়ে বলেছিল, এই তোমার অর্ধাংশ। এবার তুমি পূর্ণাঙ্গ হলে। জগতের এই অচেনা মাধুরী জীবনের গতিপথে আনল এক অদ্ভুত স্থিরতা। শান্ত আর মায়াময় আয়েত্রিকে মনের কথা জানানোর এত তাড়া ছিল না জাফরের। কিন্তু বন্ধুদের সমন্বিত কলরোলে গোপন কথা চাপা থাকল না। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য “শাপমোচনের ”- আয়েত্রির হাতে তুলে দিয়ে কেবল চুপ করে তাকিয়ে ছিল জাফর। সেই মুহূর্তেই আয়েত্রিও প্রবেশ করেছিল জাফরের হালকা বাদামি রঙের চোখের ভেতর।

 

দুই

পরিবহন সমিতির ধর্মঘটে উড়িপুরের যোগাযোগব্যবস্থা স্থবির। খুব ভুল হয়ে গেছে ময়ান সরদারের এভাবে না জেনে বাড়ি থেকে সদরে আসা। নির্বাচনের যত পোস্টার, ব্যানার সবকিছু সদর থেকে আনা-নেওয়ার কাজ বড় ছেলের হাতে। এ-বছর হাওয়া বেশ মন্দা। প্রতিপক্ষ চতুর শেয়ালের মতো চারপাশে ওঁৎ পেতে আছে। লোকবল যেমন মজবুত, তেমন অর্থও অঢেল ময়ান সরদারের। তবে এবার ইউনিয়ন নির্বাচরের ডামাডোলে ইতোমধ্যে দুজন কর্মী রক্তাক্ত হয়ে সদর হাসপাতালে। মানুষজন দিন-দিন অসহিষ্ণু আর উন্মত্ততার দিকে ছুটছে। সবদিক ভেবেচিন্তে ময়ান সরদার পল্লি বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের আড়ালে হাসপাতালেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। গত পরশু পাশের গ্রামের এক নির্বাচন-প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে দিনদুপুরে। শোরগোল যা হয়েছে সব মুহূর্তে নীরব। যেন কিছুই ঘটেনি।

পরিস্থিতি তো তারও বেশ খারাপ। দুপুরে যদিও শাসিয়ে এসেছে ছোট ছেলে জাফরকে। কিন্তু বড় ছেলের ওপর ভরসা করা কি ঠিক হলো? না না, ওরা পারবে, বেশ ভালোই বোঝাতে পারবে ছোট ভাইকে। ভুলটা তো সে তখনই করেছিল যখন বাড়ির গিন্নির কথা শুনে ছেলেকে ঢাকায় পড়তে দিয়েছিল। চেয়ারম্যানের ছেলেদের বলশালী হলেই হয়। ডিগ্রি পাশই কি যথেষ্ট ছিল না! এখন এই মুসিবত সামাল দেবে নাকি ভোটের তদারকি করবে বাড়িবাড়ি। উথালপাথাল চিন্তা ময়ান সরদারের শক্তি ক্ষয় করে দিচ্ছে ক্রমশ। গ্রামের মানুষের কানে কথাটা প্রবেশ করা মাত্র বেঁধে যাবে লংকাকাণ্ড। তার ওপর এ-বছর নির্বাচনে জিতলে হজ করার মনস্থ তার। সমস্তই এখন রসাতলে যাওয়ার উপক্রম। হাসপাতালের কোনো রোগী মারা গেল মনে হয়। সমন্বিত কান্নার ধ্বনি ময়ান সরদারের হাড়ের ভেতর অচেনা কাঁপন তুলল যেন-বা। এত ভীতু কি সে! এখনো বাড়ির সবচেয়ে শক্তিমত্ত ষাঁড়ের শিং বাগিয়ে গলায় রশি পরাতে সেই পারে। তবু কি এক শীতল ফাটল শরীরের অভ্যন্তরে দাগ টেনে গেল। মৃত্যু তাকে ভয় দেখাতে পারে না, কোনোভাবেই না। হাসপাতাল মানেই তো জন্ম-মৃত্যু। এখানে এটাই ঘটে। মনকে প্রবোধ দিতে লাগল সে। বুকের পশম ভিজে ওঠে তবু। মৃত রোগীর স্বজনদের আহাজারি ভয় ছড়াতে থাকে রাতের পলে-পলে। আর ময়ান সরদার শক্তি সঞ্চয় করে উচ্চারণ করতে থাকে নাউজুবিল্লাহ! যেন ছোট ছেলের গর্হিত অপরাধে এখনই আজরাইল ছুটে আসবে তাঁর দিকে।

তিন

প্রশস্ত অন্ধকার ক্রমে ক্ষয়ে আসছে। বাদুরের ডানার তরঙ্গ আমবাগানের সীমা ছাড়িয়ে গেল। টিউবওয়েলের পাম্প করার শব্দই প্রথম আঘাত করল জাফরের মস্তিষ্কে। প্রচণ্ড গতিতে কেউ যেন ওকেই পাম্প করছে প্রথমটায় তাই বোধ হলো। কিন্তু না, পরমুহূর্তেই টের পেল নিজের ঝুলন্ত শরীরের অসিত্মত্ব। যে-আমবাগানে ভাইদের সঙ্গে খেলে বড় হয়েছে ও, সেখানেই এমন প্রহার কেবল আয়েত্রিকে বিয়ে করেছে বলে! নাকি অন্যকিছু আছে এর ভেতর। ওর ভালো পড়াশোনা, ঢাকায় থাকা, আবার ইলেকশন থেকে ওর দূরে থাকা এসবই কি ভাইদের মনে ধীরে-ধীরে রোপণ করে দিয়েছে ঈর্ষার বীজ! আববা না হয় একটু শাসিয়েছে দুপুরে খেতে বসে। একটু না হয় রাগ দেখিয়ে বলেছে মাকে রাতে খাবার না দিতে! সে জানলে এভাবে গাছে ঝুলিয়ে পেটাতে দিত কি? গলা শুকিয়ে কাঠ, একটু যে চিৎকার দিয়ে আম্মাকে ডাকবে তাও পারছে না ও। পানি একটু পানি হলে প্রাণটা বাঁচে এ-যাত্রা। তীব্র আশা নিয়ে বাড়ির দিকে কান পাতল; কিন্তু না, কেউ জাগেনি এখনো। ভোরের প্রথম আজানেই তো আববা উঠে মসজিদে যান; কিন্তু সেই প্রথম আজানের এত দেরি কেন! এত প্রতীক্ষেত হয়ে কোনোদিনই আজান কামনা করেনি জাফর। আয়েত্রির নিষেধ সত্ত্বেও বাড়ি এসেছিল। জাফরের বিশ্বাস ছিল, মা অন্তত মেনে নেবে এই বিয়ে। কিন্তু আয়েত্রি জানত এখন কত বিপন্ন সময়। তাই বারবার ওর হাত মুঠোর ভেতর শক্ত করে ধরে ছিল। গত কয়েক মাসে অনেকগুলো হত্যার ঘটনায় আয়েত্রির মন ভেঙে আসছিল। দেশের বাইরে চলে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে এরই ভেতর। আয়েত্রির বিবিসির জবটা পাকা হয়ে গেলেও কোথাও যেন কাঁটা বিঁধে ছিল ওর মনে। কিছুতেই আর এই দেশে থাকতে চাইছিল না। জাফরের স্বপ্ন ছিল দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে গ্রামে একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করার। বসার ঘরের দেয়ালভর্তি বইগুলো তাই সঙ্গে করে এনেছিল। প্রথমে মা ভেবেছিল ছেলে বুঝি ঘরে ফিরল। কিন্তু আয়েত্রির কথা পাড়তেই গোটা আবহাওয়া মুহূর্তে থমথম।

কী ভুল? আয়েত্রি খ্রিষ্টান সেটাই, নাকি না জানিয়ে বিয়ে? কোনটা? বড়ভাইজানের বুদ্ধিমতো বাকি দুই ভাইও পালা করে মারল কেবল খ্রিষ্টান মেয়েকে বিয়ে করেছে বলে। জাহান্নামের আগুনে পোড়ার ভয়ে নাকি বেহেশতের হুরপরি দেখার লিপ্সা, কোন অভিপ্রায়ে ভাইয়েরা ওকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিলো আজ। বাষ্পময় চোখে ও দেখতে পেল আয়েত্রি যেন প্রজাপতি হয়ে উঠল। উড়ছে, সে-প্রজাপতি উড়ছে। উড়তে-উড়তে এত উঁচুতে উঠে গেল যে, জাফর নাগাল পেল না। অমোঘ সময়-উত্তীর্ণ। আজানের মোলায়েম ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল আচমকা নিস্তব্ধ ভূচরে। হাজার-হাজার প্রজাপতি যেন ঘিরে ধরল জাফরকে সহসা। গোলাপের গন্ধে মোড়া বাতাস যেন-বা ওর সমস্ত চেতনাকে ছুঁয়ে গেল। যাবতীয় আচ্ছন্নতার ভেতর থেকে তবু ওর কণ্ঠ পানি-পানি বলে মরিয়া হয়ে উঠল – কিন্তু আকুল সে-ধ্বনি চুষে নিল আজানের শেষ পঙ্ক্তি –

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার

লা-ইলাহা, ইল্লাল্লাহ…

 

চার

এরপর সময় গড়িয়ে নয় বরং ধাই-ধাই করে উড়তে থাকে। টানা তিন মাস সরদারবাড়ি হয়ে উঠল লঙ্গরখানা। পেঁয়াজ-রসুনের আর মাংসভর্তি খিচুড়ির গন্ধ মৃত্যুর গন্ধকে অনেক দূরে সরিয়ে দিলো। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ময়ান সরদারের স্তুতিকথা। নির্বাচনের ফাঁড়াটা এবারের মতো কাটিয়ে ওঠা গেছে বটে। কিন্তু গুচ্ছের টাকাও ঢালতে হয়েছে জলের মতো। বংশ, মান, মর্যাদা ঠেকিয়ে রাখতে তিন ছেলে রাগের বশে একটা ভুল করেছে বটে, কিন্তু তাই বলে তাঁদের জেলের অন্ন তো বাবা হয়ে খাওয়াতে পারেন না

তিনি। আইনের সবকটা ছিদ্রেই টাকা গুঁজে দিয়েছেন ময়ান সরদার। গ্রামে আরো একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন। আর কি! পুত্রশোক কাটিয়ে ওঠার জন্য মনস্থ করেছেন ছেলেদের মাকে নেবেন হজযাত্রায়। স্থানীয় সংবাদকর্মীকে হঠাৎ সাইকেল ছেড়ে মোটরবাইকে চড়ে ঘুরতে দেখে গ্রামের লোক খানিকটা অবাক হয়েছে আর ভেবেছে তাঁদের ছেলেকেও সাংবাদিক বানাবেন।

এদিকে মর্জিনা খাতুনের সন্দেহ কেবল পোক্ত হতে থাকে দিনদিন স্বামীর প্রতি। ছোট ছেলের ইয়া মোটা-মোটা বইগুলোর ধুলো মুছতে-মুছতে কেবল ভাবেন, আর ভাবেন। পাপ! বড় পাপ! কিন্তু তার ভাবনা বেশিদূর এগোতে পারে না। সংসারের কাজ আর নাতি-পুতিদের কান্না তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। আষাঢ় মাসের মধ্যবর্তী সময়, তবু একফোঁটা বৃষ্টি নেই। প্রকৃতির এরূপ নির্মমতায় বয়োবৃদ্ধরা হাহাকার করে উঠে বলতে থাকেন – কলিকাল! এ হলো ঘোরতর কলিকাল! তারা চাপাস্বরে এ-ও বলাবলি করেন নিমজ্জিত সন্ধ্যায় – আহা বড়ই বিদ্বান ছেলে ছিল জাফর! কিন্তু আলোচনার বিষয়বস্ত্ত অধিক গভীরে প্রবেশ করে না। তপ্ত হাওয়ার দাপট তাঁদের হাতের চালিত তালপাখাকে বরং আরো দ্রুত ঘূর্ণায়মান করে। অদৃশ্য এক ভয় গোটা উড়িপুর ইউনিয়নের মানুষকে এই ভাবতেই সাহায্য করে যে – বেঁচে থাকাই মোদ্দাকথা। ন্যায়-অন্যায় নিয়ে লাঠালাঠির দিন উবে গেছে। পরিবারের কুণ্ডলির ভেতর ক্রমান্বয়ে মানুষের আশা-আকাঙক্ষার ডানা মেলার অভ্যাস বিসর্জন দিতে থাকে।

 

পাঁচ

একরাশ জলজ মেঘ বুকে নিয়ে আয়েত্রি রোজারিও বিদেশবিভুঁইয়ে যেদিন চলে গেল সেই দিনটি ছিল ওদের বিবাহবার্ষিকী। স্বপ্নেরা মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ায় আয়েত্রি ভুলেই গিয়েছিল দিনটির কথা। বন্ধুরা সি-অফ করতে এসে কদমের তোড়া এগিয়ে দিতেই স্মৃতিরা নীপগন্ধময় হয়ে উঠেছিল আয়েত্রির বেদনাহত মনে। বেলি আর কদমে ওদের ইস্কাটনের ছোট্ট বাসা বছরদুয়েক আগে ঠিক এদিনে স্বর্গ হয়ে উঠেছিল যেন। পরস্পর বাহুবন্ধ হয়ে ওরা দুজনে গেয়েছিল –

মোরে আরও আরও দাও প্রাণ

সুধা হারিয়ে…

 

ছয়

মর্জিনা খাতুনের চোখ আরো তির্যক হতে থাকে। সে পাপের সমুদ্রে, নাকি পুণ্যের সমুদ্রে কিছুতেই বোধ করে উঠতে পারে না। ছেলেরা তখন তাকে বেহেশতের স্বর্ণমহল দেখায় এবং তিনি তো বুঝি একদিন পরিষ্কার দেখতেও পান। শুধু মাঝরাতে ঘুম না পেলে ছোট ছেলের বইগুলো উইপোকা খাবে এই চিন্তায় বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে থাকেন সুবহে সাদিক অবধি। বেশিদিন তাকে এই চিন্তা করতে হলো না। প্রকৃতি এক আশ্চর্য উপায়ে ঝড়সমেত বৃষ্টির তা-বে ময়ান সরদারের বাড়ির ঠিক সেই আমগাছটি মাটি হতে বিচ্যুত করে দিলো, যেখানে জাফরের রক্তাক্ত শরীর পানি-পানি করে ত্যাগ করেছিল প্রাণবায়ু। ঝড়ের আক্রোশে উড়িপুর গ্রামের শস্যক্ষেত, গাছপালা সবই কিঞ্চিৎ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু মানুষ খুশি তবু। খুশি বুঝি সরদারবাড়ির তিন ছেলেও। বাড়ির বাচ্চারা বাগানে যেতে এতদিন ভয় পেত। এখন সেই অবসরটুকুও থাকল না।

এদিকে ময়ান সরদারও তার বিদ্বান ছেলের বই রাখার পাকা বন্দোবস্ত পেয়ে গেল হাতে। লোক ডেকে গাছ কেটে তক্তা বানিয়ে রোদে দেওয়া থেকে শুরু করে সিন্দুক বানানো ও বইয়ের বান্ডিল ঢোকানো সবই করলেন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে এবং চমৎকার একটি কাপড় দিয়ে সিন্দুকটি ঢেকে দিলেন। ওপরে রাখলেন বেশকিছু ধর্মীয় কেতাব। এখন থেকে এই ঘরেই তিনি রাজনৈতিক বৈঠক করবেন ভাবলেন।

আসন্ন হজযাত্রার বেশ কিছুদিন আগে থেকে আত্মীয়-পরিজন এলেন দেখা করতে এবং তারা সিন্দুকভর্তি কেতাবের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। এতসব আয়োজন ভেদ করেও ময়ান সরদার মনশ্চক্ষুতে কনিষ্ঠপুত্রের মুখাবয়ব দেখতে পান। বুকের কঠিন মাংসপিণ্ড ভেদ করে সবার অগোচরে প্রলম্বিত একটি দীর্ঘশ্বাসের পতন ঘটে সহসা। আত্মীয়-পরিজনদের সমন্বিত কলরোলে বিয়োগব্যথার সে-দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে যায় একেবারে।