কাচ ভাঙা আয়না

লেখক:

মুর্শিদা জামান

রাজ্যের কাজ ঘাড়ে চেপে বসেছে। নিজের দিকে পর্যন্ত তাকানোর সময় নেই। দিনদুয়েক হলো লাগাতার বুকে ব্যথা করে চলছে। বাড়ির কাউকে জানায়নি আহসান কবির। ভাবছে আজ অফিস থেকে বেরিয়েই সোজা ডক্টরের কাছে যাবে। যেতেই হবে ওকে। টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল সে। মাকে জানিয়ে রাখতে হয় সবটা সময়। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মায়ের শরীর খারাপ করে। মা আর ছোট্ট ভাই ছাড়া এ-সংসারে কবিরের আপন বলতে তেমন কেউ নেইও। বিগত বছরগুলো সংসারের উন্নতি-ভাবনায় রক্তমাংস এক করে ফেলেছে শরীরের। বুকের ব্যথা নিয়ে তেমন একটা ভাবছে না ও। ভাবছে সামনে ওর

অনেক কাজ। সেগুলো সফলভাবে করতে হলে শরীরটাকেও ঠিকঠাক রাখা প্রয়োজন বইকি।

সব কাজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল কবির। মগবাজারের রাস্তায় এখন অফিসফেরত মানুষের ঢল নেমেছে। রিকশা একটা পেল ঠিকই; কিন্তু ভাড়া প্রায় দুদিনের রিকশাভাড়ার সমান। কিছু অবশ্য করার নেই। দিন দিন বাজারের চালচিত্র বদলে যাচ্ছে। হু হু করে সব জিনিসের মূল্য নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আহসান কবির যখন রাজধানীর বুকে খুঁটি গেড়েছিল, তখন রিকশাওয়ালাদের হাতে সেলফোন ছিল না। এত ট্রাফিকও ছিল না। গভীর করে শ্বাস নেয় কবির। শস্যহীন এ-শহরে না দেখতে পারে সূর্যোদয়, না অস্ত। এক দেয়ালঘর থেকে অন্য দেয়ালঘরে দিনান্ত কেবল ছোটা। তবু শান্তি এইখানে যে, এখানে ওদের কেউ চেনে না।

তারেক ঘরে ফিরে দেখে বড় ভাইয়া এখনো আসেনি। মা মন দিয়ে ঈদসংখ্যা পড়ছে। কাঁধের ব্যাগটা ফেলেই তারেক ওয়াশরুমে ঢুকল। নিজের কাছে বিশ্বাস হচ্ছে না ওর, ঠিক ওদের বিল্ডিংয়ের নিচে যাকে দেখেছে সে বাবা কিনা। অন্ধকারে অতটা দেখতে পায়নি ও; কিন্তু ওর মনের ভেতরটা মজবুত স্বরে বলছে, হ্যাঁ, ওটা বাবাই ছিল। কিন্তু বাবাই যদি হন, তবে কেন? কেন এসেছেন এখানে? অনেকগুলো প্রশ্নের বুদ্বুদ মাথার ভেতর তারেকের। নিজের কাছেই যা তীব্র সন্দেহের চিহ্ন হয়ে ফিরে আসছে বারবার। বেসিনের আয়নায় মুখটা ভালো করে দেখল। না বাবার মতো সুন্দর হয়নি ও। একটু তামিল তামিল ছোঁয়া আছে চোখমুখে, যেটা বড় ভাইয়ার নেই। তারেক নিজের সঙ্গে আলোচনা করল একটু। নাহ, মাকে বলবে না বাবাকে দেখার কথা। কিংবা এমনও হতে পারে, ওটা বাবা ছিল না। কলিংবেলটা বাজল। ভাইয়া এলো বোধহয়।

তারেকের ব্যাগ দেখেই কবির বুঝল ছোট ভাই ফিরেছে। একটা স্বস্তি বোধ করল ভেতরে ভেতরে। মা এগিয়ে এলেন।

: যা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়।

: তুমি খেয়ে নিলেই পারতে মা। ওষুধের সময় তো ঘণ্টাখানেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

: এত ভাবিস না আমাকে নিয়ে।

তারেক মন দিয়ে কথাগুলো শুনল। মায়ের কণ্ঠস্বরে আজ কেমন যেন বিষাদ লেগে আছে। তাঁর শরীর থেকে ক্লান্তির একটা ছায়া সারা ঘরে এঁকেবেঁকে রয়েছে। ভাইয়ার কাছে বাবাকে দেখার কথাটা শেয়ার করবে কিনা ভাবছে এখনো তারেক।

: কী রে, তোর স্টাডি ট্যুর কবে? সব গুছিয়ে ফেলেছিস তো?

: না ভাইয়া, ক্যাম্পাসে গন্ডগোল চলছে। পিছিয়ে গেছে স্টাডি ট্যুর।

কবির মোজা খুলতে খুলতে ভাইয়ের সমগ্র মুখ-চোখ পরখ করে নিল একবার। সময়ের অভাবে ভাইয়ের সঙ্গেও কথা হয় না তেমন। পুরুষের সবটুকু রুক্ষতা নিয়ে ভাইটি তার বড় হয়ে উঠছে। আগামী বছরই গ্র্যাজুয়েট কমপ্লিট করবে তারেক।

রাতের খাবারের পরে তারেক কিছুটা স্বস্তিবোধ করে। ভাইয়াকে আজ খুব কাহিল মনে হলো ওর। সংসারে ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মেলাতে পারলে ভালো হতো বুঝি, কিন্তু ওর পথ তো সম্পূর্ণ আলাদা। অস্থির সময়ের দাবি মেটাতে গিয়ে তারেক গভীরভাবে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। দলের কমিটিতে ওর নাম তালিকার ঠিক ছয় নম্বরে। গত বছর সোহাগের বডিটা ধামরাই বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ পাওয়ার পর থেকেই পার্টির নেতারা ওর দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। সে-কথা মনে হলে এখনো শেয়ালের মতো ধূর্ত হয়ে ওঠে তারেকের চোখ। সোহাগটা সত্যি রামগাধাই ছিল। কিছু করারও ছিল না অবশ্য। ওপর থেকে চাপ আসছিল। সিঁড়ির সবচেয়ে ওপরে নিজেকে দেখতে হলে বোকাচন্দদের লাথি মেরেই এগিয়ে যেতে হয়। এটাই এই খেলার প্রধান ও প্রথম সূত্র। আর তারেক সূত্রটা ভালোমতোই আয়ত্ত করে নিয়েছে। রাজনীতির ময়দানে ফাঁকা চোখে সবাই হরিণ-শাবক। আর যাদের চোখের ভেতর ভরা থাকে আগুন, তারাই দেখতে পায় কোথায় শ্বাস ফেলছে বাঘের স্নায়ু। কাক কাকের মাংস ভক্ষণ করে না – এখানে এ-কথাটি খাঁটি অসত্য। তারেক সত্যকে আগলে রাখতে চায় না। ডেসপারেডো সিনেমায় নায়ক অ্যান্টোনিও ব্যান্ডারাসের গিটারে যেমন অস্ত্র মজুত থাকে, তেমনি তারেকের জুতার বাক্সে ঘাপটি মেরে থাকে ল্যুগার বা কোল্ট। রোজ রাতে ঘর বন্ধ করে এগুলোর ত্বক মসৃণ করতে করতে তারেকের শরীরে অ্যাড্রেনালিনের প্রবাহ অনুভবে মর্মর থাকে। চকচকে পিস্তলটায় ঘনিষ্ঠ চুম্বন এঁকে দিলো সে। নিজের সাম্রাজ্য গোছানোর এই ফাঁকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির চেয়ারে নিজেকে দেখে নিল একবার কল্পচোখে। আরাম, বড্ড আরাম এই দেখায়। শালা কেউ তখন বলতে পারবে না… কুত্তার বাচ্চা বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।

নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হলে এ-বছর ড্রপ দিতেই হবে ওকে। ভাইয়াকে সে-কথা বলবে কী করে তারেক? নেক্সট স্টেপ ফেলার আগে তারেককে সতর্ক থাকতে হবে। ঘুমানোর আগে খুব যত্ন করে পিস্তলটা জুতার বাক্সে ভরে রাখল ও। তারেকের চাই ভীষণ কোয়ালিটি লাইফ। পেতেই হবে ওকে সেটা।

বেলা তাতিয়ে উঠেছে প্রায়। সব লোক চলে গেছে যে যার কাজে। সাবিনা হোসেনের দুটি ছেলেও বাইরে গেছে। বড় কঠিন তাঁর দৃষ্টি। সে-দৃষ্টি জানালা গলে ঘুরে এলো পাশের বাড়ির বারান্দায়। সেখানে রোজ এ-সময় লুঙ্গি মেলতে আসে একটি তরুণী-বউ। আন্ডার গার্মেন্টসহ তোয়ালেটা পর্যন্ত মেয়েটা এত যত্ন করে মেলে যে, বড় ভালো লাগে দেখতে। সাবিনা হোসেনের চোখ খালি লুঙ্গি থেকে চুঁইয়ে নামা ফোঁটা ফোঁটা জল পড়া দেখে একমনে। কবিরের বাবাও ঠিক এরকম একটি লুঙ্গি পরত। কলেজ থেকে ফিরেই লুঙ্গি-গামছা চাইত তার কাছে। সাবিনা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত সেই মানুষটিকে। লুঙ্গিটা পর্যন্ত সে আয়রন করে ভাঁজ করে রাখত তাঁর জন্য। আজ সেই ভালোবাসা কঠিন মাটির মতো শুষ্ক হয়ে গেছে। কিছু তো নেই অবশিষ্ট। তবু কি অমোঘ আকর্ষণ বোধ করে সে ওই ভেজা লুঙ্গিটি দেখে। অদ্ভুত তরল মনে সাবিনা হোসেন প্রার্থনা করে ওঠে। ভালো হোক, তাঁর ভালো হোক।

এই একা একা বোধ থেকে মুক্ত হওয়া দরকার তাঁর  কিন্তু কবির তো বিয়েই করতে রাজি হচ্ছে না।  ছেলেটারইবা দোষ কী। ধাক্কা তো কম খায়নি। এদিকে দিন দিন তারেকটাও অচেনা হয়ে উঠছে তাঁর কাছে। চোখদুটি ঠিক সাপের মতো ঠান্ডা দেখায় আজকাল। জীবনের এতসব অস্পষ্ট দিক সাবিনা হোসেন আর নিতে পারেন না। অনেকখানি খোলা  জায়গা চাই তাঁর। একটু পুঁইলতা, বেলির ঝোপ, পেঁপের ডালে বুলবুলির হুটোপুটি – এসব খুব প্রয়োজন সাবিনা হোসেনের।

অফিসের সব কলিগই কবিরকে নিয়ে মশকরা করে। বড় বেশি মাথাব্যথা সবার কবিরের বিয়ে দেওয়া নিয়ে। মওকা পেলেই হুল ফোটাবে যে যেমন করে পারে। কবিরের গা-সওয়া হয়ে গেছে এসবে। মন দিয়ে টালিটা দেখে নেওয়ার ফাঁকে ও ফোনটার দিকে তাকাল। নাহ্, আজো হ্যাং হয়ে আছে যন্ত্রটা। একটু যে লাঞ্চ আওয়ারে বের হবে সে-কায়দা নেই। আজ আবার গ্রুপ মিটিং আছে। তবু আর না গেলেই চলছে না বসুন্ধরায়। সত্যি সেলফোন জীবনে অনেকখানি জায়গা দখল করে আছে। গতকাল নিজেকে যেতে হয়েছিল ডাক্তারের কাছে। আর আজ ফোনটাকে নিয়ে একই দুশ্চিন্তা হচ্ছে কবিরের। কবিরের টালি অসম্পূর্ণই রয়ে গেল হঠাৎ একটি বিষয় মনে হতে। ফোন খারাপ হলে এত উতলা হয়ে ওঠে মানুষ। কেবল তো ওই সংযোগ হারাবার ভয়েই। কিন্তু কাছের মানুষের সঙ্গে যখন কোনো মাধ্যমেই আর যোগাযোগ করা যায় না, তখন কি এতটুকু মন খারাপ হয় না? বাবা, বাবার কি একবারও আমাদের কথা মনে পড়ে না! কবিরের বুকটা কিঞ্চিৎ ব্যথা করে উঠল।

কিশোরীর গালের মতো আরক্ত আভা নিয়ে বিকেলটা উপচে আছে। হেমন্তের ঘ্রাণ নেই, তবে লাবণ্য আছে মেট্রোপলিটন সিটিটায়। রিকশায় করে বসুন্ধরা আসতে আসতে কবির মনে করার চেষ্টা করল শেষ কবে ধানের ক্ষেত দেখেছে ও। বাগেরহাট থাকতে বাবা এইসব দিনে ইলিশ নিয়ে ঘরে ফিরত। কলাপাতায় মুড়িয়ে মা কত মজার সব রান্না করত। বাবার কলেজের বড় নারিকেল গাছটায় উঠে ইয়া বড় বড় সব ডাব পাড়ত কবির। তারেকের তখন সবে গলাটা ভেঙেছে।

: স্যার আর যাবার দিব না।

সুখ চিত্রটা দুম করে মুছে গেলে মস্তিষ্ক থেকে কবিরের রিকশাওয়ালার সংলাপে।

বেশ একটু হাঁটতে হলো ওকে। কত রকমের মানুষে ভরা জগৎ। কবির দেখে আর ভাবে। মেয়েরা এখানে পরীর মতো সেজে আসে শপিং করতে। ছেলেরা আসে তাদের সঙ্গে। কবির হয়তো কোনোদিন নরম কোনো হাত ধরে উঠবে না এই বৈদ্যুতিক সিঁড়ি বেয়ে। কবিরের এক হাত সামনেই একটি নারীর প্রায় উন্মুক্ত পিঠ উঠে যাচ্ছে থার্ড ফ্লোরে। সে-পিঠে কী দীপ্তি! এর আগে কখনো এত কাছ থেকে কোনো রমণীর পেলব ত্বক দেখেনি। ওপর থেকে একটি বছরতিনেকের  বাচ্চা আম্মু, আম্মু করে লাফ দিচ্ছে। নারীটি গিয়ে কোলে তুলে নিল তাকে। মামুলি সংলাপ ভেসে এলো কবিরের কানে।

কবিরের খুব ইচ্ছে হলো ওই পেলব ত্বকের নারীটির মুখ ভালো করে দেখতে। কিন্তু বাচ্চাটি ভারি চঞ্চল। পাপা, পাপা করেই যাচ্ছে। তাতে করে রমণীর মুখটিও ঘুরছে এপাশ-ওপাশ। তাই ভালো করে দেখা হলো না মুখটি। কবির একটু লজ্জাই পেল মনে মনে। সত্যি নারী রহস্যময়। এত মানুষ আসে এখানে বাবা! লিফটেও লাইন। কবিরের বেশ ক্লান্ত লাগছে। লিফটেই যাবে মনস্ত করল। খুব কাছেই একটি চেনা গলার আওয়াজে ঘুরে তাকাল কবির। লোকটি ওর দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটি অল্প বয়সী ছেলে লোকটির পা ছুঁয়ে সালাম করছে। এমন দৃশ্য আজকাল চোখেই পড়ে না। এখনো তবে মানুষ ভুলে যায়নি গুরুজনদের শ্রদ্ধা করতে।

কবিরের মন খুশি হয়ে উঠল। আচমকা সেই খুশির রেশ কেটে গেল লোকটি যখন এদিকে ফিরল। আরো অবাক হলো খানিক আগে দেখা সেই চঞ্চল বাচ্চাটি যখন দৌড়ে লোকটির কোলে উঠল পাপা বলে। বাচ্চার মা এগিয়ে এসে বলছে, আর পারি না, যেখানে যাবে সেখানেই তোমার ছাত্ররা হাজির। তুমি তো কথা বলছিলে, দোতলায় নীলার সঙ্গে দেখা হলে। দেখো, তনয় ওই পান্ডা-পুতুলটি চাইছে। চলো না দোতলায় যাই। কবির দেখল লিফটের দরজা দুভাগ হয়ে গেছে। লাইনটা সামনে দুলে উঠল তৎক্ষণাৎ। কবিরের পা কে যেন গেঁথে দিয়েছে মেঝের সঙ্গে। পেছনের লোকটি ভ্রূ কুঁচকে ওর দিকে একপলক তাকিয়ে লিফটে শরীর ঢুকিয়ে দিলো। কবির সরে এসে অন্যদের জায়গা করে দিলো। বৈদ্যুতিক সিঁড়ি উঠছে আর নামছে। কবিরের চোখ আটকে আছে সেখানে। বাবার নিচে নেমে যাওয়া দেখছে অপলক। ওর ভেতর থেকে অস্পষ্ট আওয়াজে একটি শব্দ জনস্রোতে মিশে গেল, ‘বাবা’!

একদিন ওই রকম কবিরও বাবার কোলে চেপে হাটে যেত। তবে তা পান্ডা-পুতুল কিনতে নয়, জ্যান্ত রাজহাঁস কিনতে যেত। আজ বাবা এত কাছে; কিন্তু একবার দৌড় গিয়ে হাতটা ধরতে পারছে না ও। বাবার হাত যে রাজহাঁসের মতো সাদা একটি রমণীর হাতে আটকে আছে। বাবা যে এখন অন্য আরেকজনের পাপা হয়ে গেছে। ওদের মাঝের যোগাযোগ হ্যাং হয়ে গেছে আজ। যতদূর দেখা গেল বাবাকে, ততদূর চেয়ে রইল কবির। আপন আপন গন্ধে ভরে উঠল গোটা বসুন্ধরার ঠান্ডা পরিসর। একটুও ঘৃণা নেই, ক্রোধ নেই মনে। বাবা কত সুন্দর এখনো। কবির কাঁদছে। জীবনে ছন্দপতন বলে কিছু নেই। রহস্যময় এক ছন্দ এই জীবন।