কাজী সহিদের প্রথম একক : ত্রিমাত্রিক অনুভব

শ্রমসাধ্য সৃজনকাজের জন্য সুপরিচিত শিল্পী কাজী সহিদ। অনেকদিন ধরেই তাঁর কাজ দেখে আসছি। বেশ ডিটেইলস করে আঁকার চেষ্টা তাঁর, দর্শকের সামনে তিনি মেলে ধরেন নিজের সৃজন! দেড় বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে যে-কাজগুলো করেছেন – এবার সেই ৪৬টি চিত্র নিয়ে তাঁর প্রদর্শনী হলো লালমাটিয়ার ভূমি আর্ট গ্যালারিতে। উল্লেখ্য যে, এটি তাঁর প্রথম চিত্রকলা প্রদর্শনী।

সহিদের জন্ম ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জে ১৯৮০ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ২০০৬ সালে। ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের ‘রাজকীয় বৈদেশিক দৃশ্যকলাশিল্পে’র বৃত্তি পেয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন। শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। তিনি এখন সহযোগী অধ্যাপক।

সহিদ বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলার এক মেধাবী ও পরিশ্রমী শিল্পী। ইংরেজি ভাষায় যাকে ওয়ার্কহলিক – কাজী তদ্রƒপ। তুমুল কাজের মধ্য দিয়ে নিজের শিল্পীসত্তাকে বোদ্ধা দর্শকের জন্য অন্তর দিয়ে নিবেদন করেন বলে তাঁর চিত্রকলা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

কাজের প্রতি তাঁর ঐকান্তিক নিষ্ঠা আমরা দেখতে পাচ্ছি অনেকদিন থেকেই। প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রত্যয়, তাকে জেনে-বুঝে দর্শকদের কাছে উপস্থাপনার জন্য দৃশ্যশিল্পরচনায় পরিশ্রম ও বিশ্বাস তাঁকে শিল্পী হিসেবে অন্য অনেকের থেকে আলাদা করেছে। সহিদ প্রকৃতিপ্রেমী। তিনি প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতা প্রত্যক্ষ করে এর প্রাণছন্দকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

তাঁর কাজগুলোকে আমরা বলতে পারি ইম্প্রেশনিজম বা প্রতিচ্ছায়াবাদী বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়েই আধুনিকতার একটা স্বতন্ত্র উজ্জীবনের পথ ধরেছে। আলোছায়ার মায়ায় প্রকৃতির যে রূপবদল ঘটে সে এমন এক রহস্যময়তা তৈরি করে যা আমাদের দৃষ্টিতে প্রকৃতির বিচিত্র বৈভবকে তুলে ধরে। ভিনসেন্ট ভ্যান গঁঘ বলতেন – রহস্যের রহস্য হলো প্রকৃতির আলোছায়া।

কাজী সহিদের চিত্রপ্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘ইমপাস্তো’, এটি হলো চিত্রকলা রচনার একটি শৈলী। যেখানে রংকে স্পেচুলার সাহায্যে ঘন ও পুরুস্তরে প্রয়োগ করা হয়, যাতে করে টেক্সচার ও এর ত্রিমাত্রিকতাকে স্পর্শযোগ্যভাবে অনুভব করা যায়। এতে চিত্রে তৈরি হয় গভীরতা, আলোছায়ার নাটকীয়তা। এই ধারাটি ইম্প্রেশনিস্ট ও
পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের একটি প্রিয় প্রকাশভঙ্গি।

আবার সহিদের কাজ তেলরঙেরও। তেলরং তাঁর প্রিয় মাধ্যম। চিত্রকলার মাধ্যম হিসেবে তেলরং চিত্রশিল্পীদের কাছে ধ্রুপদী সংগীতের মতো নন্দিত ও আদরণীয় মাধ্যম। তেলরঙের কাজে সময় নিয়ে লেয়ারের পর লেয়ার বসানো যায়। শাস্ত্রীয়সংগীতে যেমন স্বরের ভেতর নতুন স্বরের আলাপ করার প্রক্রিয়া আছে, তেমন।

সহিদ তেলরং মাধ্যমে এসব চিত্রকর্ম সম্পন্ন করেছেন এই প্রদর্শনীর জন্য। তেলরং আমাদের দেশের আবহাওয়া উপযোগী নয়, আজকাল খুব কম শিল্পীই তেলরঙে আঁকেন। এই মাধ্যমকে কীভাবে প্রয়োগ করলে এটি আমাদের আবহাওয়ায় টেকসই হবে, সে নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। তারই কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই প্রদর্শনীতে তিনি উপস্থাপন করেছেন। ক্যানভাসে তেলরঙে কাজ করলেও এই ক্যানভাসের তল প্লাইউড মোড়ানো। দর্শক ও শিল্পবোদ্ধাদের কাছে সফল এই প্রদর্শনীর বেশিরভাগ চিত্রকর্ম অনেকের সংগ্রহে চলে গেছে।

তাঁর আঁকা ফুল কিংবা পাতার সামনে দাঁড়ালে যেন অনুভব করা যায় তার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার সময়স্তর। নানারকম ফুল ও পাতার নানা বয়সের ছবি। আছে মাটিতে পতিত কচি সূর্যমুখী ফুল, গাছের শীর্ষে থাকা সূর্যমুখী, লাল ও গোলাপি রঙের গোলাপ, সাদা গোলাপের নানা রূপের ছবি। এসব আমরা দেখলেও এর গভীরতাকে তেমন অনুভব করি না। কাজীর চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে এর স্পর্শযোগ্যতায় মনে হয়েছে বস্তুর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও সবশেষে এর মৃত্যু বা বিদায়ের সময়কে যেন অনুভব করা যায়।

মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলের খোলামেলা দৃশ্যপট আছে যেমন সহিদের ক্যানভাসে, তেমনি পুরনো ঢাকার সরু গলির আলোছায়াময় দৃশ্যও তুলে এনেছেন তিনি। নানা ইমেজকে মিলিয়ে শিল্পী সাজিয়েছেন পুরো দৃশ্যকে। এটি তাঁর পরিবেশনার শ্রমসাধ্য একটা ধরন, কিন্তু সৌন্দর্যের রসাস্বাদন এতে বাধাগ্রস্ত তো হয়ই না, বরং তা আরো নান্দনিকভাবে ফুটে ওঠে। এভাবে দেখা ও দেখানোর কৌশল অন্যের থেকে আলাদা করছে তাঁকে – সব মিলে এখানেই কাজী সহিদের সার্থকতা।

তাঁর ছবিতে মায়াময় আলোর বিস্তার শিল্পপ্রেমিক দর্শকদের মনেও অনুরণন তুলেছে। আমি নিজে গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তাঁর কাজের রসাস্বাদনে অন্যরকম মুগ্ধতা দেখেছি। শিল্পের নতুন প্রজন্মের অনেককেই উদ্বুদ্ধ করেছে। ভূমি গ্যালারিতে কাজী সহিদের এই ইমপাস্তো প্রদর্শনী চলেছে গত ৫ই থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত।