বালিশচাপা দিয়ে খুন করলে কেমন হয়?

সিদ্ধান্তটা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দেন সামিনা মাহতাব, নাহ্ – খুব সহজে মরে যাবে লোকটা। যদি খুনই করি, একটু যদি কষ্ট না পায়, রক্ত বের না হয়, সেটা সত্যিকারের খুন হতে পারে না। সুতরাং মাহবুব মাহতাবকে খুন করতে হলে অন্য পথে এগোতে হবে, কিন্তু কী সেই পথ?

ছয়-সাত মাস ধরে মিসেস সামিনা মাহতাবের মাথার মধ্যে একটা খুনের তীব্র অভিলাষ ঘুণপোকার লাটিম হয়ে ঘুরছে। খুন! খুন একটা করতেই হবে। আগে সাবিনা মাহতাব টিভি দেখতেন না, পত্রিকাও পড়তেন না। সারাদিন ঘুম, প্রসাধন আর মার্কেটিং নিয়ে পড়ে থাকতেন, দিনরাত্রির চব্বিশ ঘণ্টা সময় কখন যে চলে যেত টেরই পেতেন না। আরো একটা ঘটনা ছিল, কয়েকজন বন্ধু মিলে হঠাৎ কোথাও চলে যাওয়া। এটা খুব পছন্দের একটা ব্যাপার ছিল সামিনা মাহতাবের, খুব মজাও পেতেন। গাড়িতে চড়ে হইহুল্লোড়-গল্প করতে করতে হাসতে হাসতে যেতেন। গাড়িতে যেতে যেতে হঠাৎ কোনো নদীর ধারে কিংবা গ্রামের কোনো বাজারে গাড়ি থামিয়ে নেমে যেতেন হুল্লোড়ে। সেখানেই আড্ডা-গল্প করে চলে আসতেন। এলাকার মানুষজনের সঙ্গে গল্প করে অনেক নতুন নতুন প্রসঙ্গ জানার চেষ্টা করতেন। একবার তো এক গ্রামের স্কুলমাস্টার বাড়িতেই নিয়ে গিয়েছিলেন। দুপুরের সময়ে মুরগি জবাই করে রান্না করে খাইয়েছিলেন। গ্রামীণ নারীর হাতের সেই রান্নার স্বাদটা ছিল মনে রাখার মতো। কিন্তু সেসবও বন্ধ। যাদের নিয়ে চলাফেরা ছিল, সেই মনীষা রব্বানী হঠাৎ মারা গেলেন, মাত্র একদিনের জ¦রে। মনীষার হ্যাজবেন্ড রব্বানী খান আর এক মেয়েকে নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। শামীম কোরেশী অ্যাক্সিডেন্ট করে ডান পা হারিয়ে স্তব্ধ, বাসায়ই থাকেন দিনরাত, বাইরে বের হন না মোটেই। ইউনিভার্সিটির ক্লাসমেট হামিদ আহসান হঠাৎ সবকিছু থেকে আগ্রহ হারিয়ে বৈরাগী হয়ে ঘুরছে নানা জায়গায়, প্রায় একবস্ত্রে। তাঁর ছেলেমেয়েরা চিকিৎসা করিয়েছে অনেক, কিন্তু সুযোগ পেলেই বাসা থেকে এক কাপড়ে বের হয়ে যান, ফিরে আসেন যখন তখন প্রায় হাড় জিরজিরে, আর প্রায় উদোম। মানুষ না, মনে হয় আদিম গুহামানুষ।

একদিন তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন সামিনা। একটা রুমের মধ্যে প্রায় ন্যাংটো হয়ে বসে বসে ঝিমুচ্ছিলেন হামিদ চোখ বুজে। সামিনাকে দেখে হাসলেন চোখ না খুলে। তাকিয়ে থাকলেন রক্তজবাচোখে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আমি কে?

বিব্রত সামিনা মাহতাব।

বলতে পারলি না? একটু সময় নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছোড়েন, তুই কে? আমরা কেন জন্মেছি? জন্মের চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো, মধুর, মিষ্টি …। চল মরে যাই আমরা, অথবা মারি – এমন স্বাভাবিক ঢংয়ে ও স্বরে তিনি বলেন যে মনে হচ্ছে প্রেমের সংলাপ বলছেন হামিদ।

হামিদের চল মরে যাই অথবা মারি – মগজের মধ্যে গেঁেথ যায় জাহাজের গেরাফির মতো, চল মরে যাই অথবা মারি …। চল মরে যাই অথবা মারি … নামতার ছন্দে পড়তে পড়তে পড়তে একসময়ে কেবল মনে পড়ে অথবা মারি … অথবা মারি … মারি … মেরে ফেলি…

চারপাশের প্রিয়জনদের মধ্যে জীবনবোধের এই আশ্চর্য নীল পরিবর্তন দেখে নিজের ভেতরে আর একটা জগৎ বানিয়ে ফেলেন সামিনা মাহতাব, আমি কে? মাহবুব মাহতাব আমার কে? ও কেন প্রতিরাতে আমার সঙ্গে এক খাটে এক বিছানায় শোয়? মানুষ মরবে কেন? যদি মরবেই জন্মালো কেন? অথবা মারি গানটা কানের মধ্যে এত বাজে কেন? মৃত্যু কি মহান কোনো সূত্র? মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়? কেন যায়? কতদূরে যায়? মানুষ মানুষ থাকে, নাকি পশু হয়ে যায়?

দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা বাসার মধ্যে আটকে ফেলেন নিজেকে। বসে বসে ডিম পাড়ো, ডিম না পাড়তে পারো, বসে বসে তা দেওয়ার ভান করো। অথচ তিনি দেখতে পাচ্ছেন মাহতাব কত নির্বিকার!

মেইলে মেইলে রাজ্যের কত ব্যবসা করে যাচ্ছে … টাকা-ডলার গুনছে।

কিভাবে হত্যা করা যায় মাহতাবকে? মনের মধ্যে প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন সামিনা মাহতাব। মাথায় যখন খুন করার পরিকল্পনা আসছে, বাস্তবায়িত না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। খুন বিষয়ে তিনি নেট ঘাঁটতে শুরু করেন। টিভি নিউজে প্রতিদিন অবাক অবাক খুনের ঘটনা দেখেন। দেখেন আর ভাবেন, বাহ্! এমনভাবে খুন করা যায়? মানুষ মানুষকে কত বিচিত্র পদ্ধতিতে খুন করে!

অনেক বছর আগে টিভি নাটকে নায়ককে বলতে দেখেছিলেন, খুন একটি শিল্প! মহান শিল্প! তোমরা বুঝতে পারছো না, খুন করার মধ্যে কী অসাধারণ গৌরব আছে? আছে অনাবিল আনন্দ!! সেই শিল্পীর অভিনীত আনন্দ কী প্রবেশ করেছে সাবিনা মাহতাবের মস্তিষ্কের গৃহে?

গত দিন তিনি টিভিতে দেখেছেন ময়মনসিংয়ের গফরগাঁওয়ের এক গ্রামে ছোট ভাই একসঙ্গে বড় ভাই, ভাবি, দুটি নাবালক ভাতিজাকে খুন করে বাড়ির পেছনে বিরাট গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছে। মাটিচাপা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি – মাটির ওপর কয়েক ধরনের ফুল-ফলের গাছের চারাও লাগিয়েছে। ফলে, বোঝার কোনো উপায় ছিল না, একটা ঘরের চার-চারটে মানুষ হত্যা করে সেই মানুষটিরই মাটিতে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। ধরা পড়ার কোনো সুযোগই ছিল না। বড় ভাই ও বড় ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ছোট ভাই বশীরউল্লাহ এলাকার লোকজনকে বলেছে, ভাই জমিজমা বিক্রি করে ঢাকায় চলে গেছে। গ্রামে আর থাকবো না।

জমি কার কাছে বিক্রি করেছে?

আমার কাছে বিক্রি করেছে। আমি বড় ভাইয়ের ছোট ভাই – আমার কাছে বিক্রি করবে না তো কার কাছে করবে?

এলাকার মানুষজনও যুক্তি মেনে নেয়। কিন্তু ঘটনার দরজা খুলে যায়, এক ভীষণ বৃষ্টির দিনে বশীরউল্লাহ্র ছোট মেয়ে এলাচি যখন বাড়ির পেছনে আম কুড়াতে যায়। আম কুড়াতে কুড়াতে নতুন মাটির ওপর পা রাখলে দেখতে পায়, বৃষ্টির স্রোতে নতুন মাটি সরে ভেতর থেকে ছোট একটা হাত বের হয়ে আসছে। এলাচি দৌড়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় দেখা হয় পাশের বাড়ির জমিরউদ্দিনের সঙ্গে। জমিরউদ্দিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুধেল গাই খুঁজতে আসছেন।

কিরে, বৃষ্টির মধ্যে দৌড়াচ্ছিস ক্যান? পড়ে যাবি তো –

কাকা, একটা হাত বের হয়ে আছে।

কোথায়? কিয়ের হাত?

ভয়ে কম্পমান এলাচি হাত দিয়ে দেখায়, ওই তো।

কই দেখি।

সামনে কয়েক পা এগিয়েই দেখেন, নতুন লাগানো আম-জাম-কাঁঠালের বাগান ও ফুলের গাছের মধ্যে থেকে, নতুন মাটির ওপর একখানা ছোট হাত পৃথিবীর দিকে অসহায় প্রার্থনায় বের হয়ে আছে। ছোট হাতের তালুটা সাদা আর আঙুলগুলো ফুলে গেছে পাকা আঙুরের মতো। জমিরউদ্দিন কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে, চারপাশটা দেখে বুঝতে পারেন, ঘটনার পরম্পরা। আলুথালু ভয় তাঁকেও ঘিরে ধরে, ও আল্লাগো … চিৎকারে দৌড়ে রাস্তায় চলে আসেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে লোক জমে যায়, কেউ ছোটে থানায়। পুলিশ আসার পর মাটি খুঁড়ে বের করে আনা হয় চার-চারটে লাশ।

খুনের গোটা ঘটনা টিভির নিউজে দেখতে দেখতে সামিনা মাহতাব রোমাঞ্চিত, এভাবেও খুন করা যায়? আর কী আশ্চর্য, মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার লোক জমা হয়ে যায় বাড়ির চারপাশে। প্রত্যেকের চোখেমুখে হত্যার বিষয়ে অদম্য কৌতূহল, ভীষণ ভালো লাগে এই খুনের ঘটনা সাবিনা মাহতাবের। তিনি সন্ধে সাতটার খবর দেখে বিরাট আয়নার সামনে বসেন প্রসাধন সারতে, আর ঘণ্টাখানেক পর মাহতাব চলে আসবে তার বিশাল অফিসের রাজ্যপাট থেকে। একটাই বায়না লোকটার, যখন বাসায় আসবো, আমি তোমাকে পরিপাটি সাজে দেখতে চাই।

এত সুখ দিয়েছে বেচারা, এইটুকু আবদার পূরণ করবেন না? নিশ্চয়ই …। আয়নার মধ্যে প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে লাবণ্যখচিত শরীরের বাঁকে আলতো হাত বুলিয়ে সামিনা মাহতাব ভাবেন, গ্রামের লোকজনের মতো খুন করে আমি মাহতাবকে কোথায় রাখবো? মাটি কোথায়? গোটা চারতলা বাড়ির কোথাও এক ইঞ্চি মাটি নেই। মাটি খুঁড়ে মাটির ওপর ইট সিমেন্টের বাড়ি করেছে মাহতাব মাহবুব। কোথাও একমুঠো মাটি নেই, আচ্ছা! নিজের মনে প্রশ্ন আসে সামিনা মাহতাবের, ওকে খুন করার পর মাটি দেবো কোথায়? আজিমপুরে? নাহ্ – আজিমপুর খুব সাধারণমানের কবরস্থান। ঢাকা শহরের সব গরিব-গুবরো লোকের কবর হয় আজিমপুরে। ওখানে নিশ্চয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী-ব্যাংকার মাহতাব মাহবুবকে মানাবে না। তাহলে? বনানী কবরস্থান? হ্যাঁ, বনানী কবরস্থানই যায় মাহতাবের লাশের সঙ্গে। আয়নায় নিজেকে প্রসাধনচর্চিত করতে করতে সামিনা মাহতাব আবার সিদ্ধান্তের সীমানায় এসে দাঁড়ালেন, বনানী গোরস্তানের চেয়ে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তানের মর্যাদা আরও বেশি না? বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মাহতাব শুয়ে থাকবে, আমি ওর প্রতিটি জন্মদিনে আর মৃত্যুর দিনে ফুল দিয়ে আসবো, হাতে সময় থাকলে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করবো বেহেশত নসিবের জন্য! সব শেষে কবরের একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে একটা ফুল কালারের ছবি তুলবো। গাড়িতে বাসায় আসতে আসতে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে লিখবো, তোমাকে হারিয়ে আমি দিশেহারা … এটা তো গানের লাইন হয়ে গেল। সমস্যা নেই – আমি না লিখে একটু গেয়েই দেবো না হয়, আমার ফেসবুকবন্ধুরা নতুন একটা ধারণা পাবে আমার সম্পর্কে!

কিন্তু সরকার কী দেবে একজন ব্যবসায়ী কাম ব্যাংকারকে শহিদ বুদ্ধিজীবী করবস্থানে কবর দিতে? ভাবনার মধ্যে রিং আসে মোবাইলে। তিনি প্রসাধন ছেড়ে মোবাইলটা হাতে নেন। বাটন টিপে মোবাইল কানে লাগিয়ে প্রশ্ন করেন, এতদিনে মাকে মনে পড়লো?

যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন থেকে ছেলে সোহানের উত্তর, মা অনেক ব্যস্ত থাকি তো। ইচ্ছে করলেও অনেক সময় ফোন করতে পারি না। মা, ভিডিওতে আসো।

আসছি, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজর মাইল দূরত্ব ঘুচিয়ে মার্ক জুকারবার্গের যন্ত্রনেট কল্যাণে মা ও ছেলে মোবাইল স্ক্রিনে মুখোমুখি।

মা, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে!

তৃপ্তির হাসি হাসেন সামিনা মাহতাব, তাই নাকি?

হ্যাঁ। বাবা তোমাকে দারুণ সুখে রেখেছে।

সোহান, মুহূর্তে কাঁটা কম্পাস ঘুরিয়ে দিলেন সামিনা মাহতাব, তোরা যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকিস, রাস্তাঘাটে চলিস, তোদের ভয় করে না?

বিস্ময়ের হাসি হাসে সোহান, কী বলছো মা? যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সুপার পাওয়ার। এখানে রাস্তায় বা বাসায় ভয় করবে কেন?

ওই যে প্রত্যেক দিন দেখি কোনো না কোনো জায়গায় খুনোখুনি হচ্ছে – বাড়ি থেকে অত্যাধুনিক বন্দুক বা রাইফেল এনে মার্কেটে, পানশালায়, রাস্তায়, স্কুলে, কলেজে গুলি চালিয়ে নির্বিচারে নারী-পুরুষ-শিশু হত্যা করছে।

ওসব কিছু না, মাকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করে সোহান, যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ, কোনো শহরে এসব হলে অন্য শহরে প্রভাব পড়ে না। কিন্তু মা, তুমি তো রাজনীতির মানুষ না, হঠাৎ এই দেশের খুন-খারাবি নিয়ে পড়লে কেন?

আচ্ছা শোন, খুন কিন্তু একটা শিল্প যদি নিজের পরিকল্পনামতো করে করা যায়।

মা! কী হয়েছে তোমার? কী বলছো এসব? বাবার সঙ্গে তোমার কোনো ঝামেলা?

গাধা! তোর বাবা, আমার সঙ্গে ঝামেলা করার সাহস আছে?

না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। সোহান, যুক্তরাষ্ট্রে যারা খুন করে তারা রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়, না?

তা যায়, কিন্তু মা তুমি এসব প্রশ্ন করছো কেন?

হাসেন সামিনা মাহতাব, খুন করার আগে নিশ্চয়ই অনেক পরিকল্পনা করে খুনি, না?

তা  তো করেই কিন্তু মা …

সোহান, তোর বাবা আসছে। তোর সঙ্গে পরে যুক্ত হবো। এখন রাখি। জানিস তো, বাসায় ঢুকে আমাকে দেখতে না পেলে তোর বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

ভিডিও ফোন কেটে দিলে সোহান সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ম্যাপল বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে, মা খুন নিয়ে এতো গবেষণা করছে কেন?

 সোহান পিতা মাহতাব মাহবুবকে ফোন করে, বাবা?

হ্যাঁ, বল। তোর পরীক্ষা কেমন হলো? গাড়ির পেছনে তিনি হেলান দিয়ে ছেলের ফোন রিসিভ করছেন।

পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে! কিন্তু বাবা কিছুক্ষণ আগে মায়ের সঙ্গে কথা বললাম, অবাক কাণ্ড! মা খুন-টুন কিসব নিয়ে প্রশ্ন করলো! মাকে কী ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে?

হাসিতে ভেঙে পড়েন মাহতাব, তোর মা মুরগি জবাইয়ের রক্ত দেখলে পালিয়ে বেড়ায়, যদিও মুরগির মাংস ওর প্রিয়। ও খুন করবে কাকে? তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুই পড়াশোনায় মন দে – একটা ভালো রেজাল্ট নিয়ে দেশে আয়। অনেক দায়িত্ব তোকে সামলাতে হবে। বাই – কিন্তু সোহান পিতার ওপর আস্থা রাখতে পারে না। ফোন করে ঢাকায় বড় বোন ফারিয়ার কাছে। ফারিয়া সব শুনে পিতার মতোই হেসে উড়িয়ে দেয়, তোর সমস্যা কী রে সোহান? আমার সঙ্গে মায়ের প্রতিদিন কথা হয় ফোনে। আমার ছেলে প্লাবনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে চ্যাট করে। গত পরশু আমি বাসায় গিয়েছিলাম। মা নিজের হাতে আমার প্রিয় পাবদা মাছ রান্না আর বেগুন ভর্তা করে খাইয়েছে। তোর দুলাভাইয়ের জন্য জোর করে এক বাটি দিয়েছে আমার হাতে। সেই বেগুন ভর্তা কী মজা করে তোর দুলাভাই খেয়েছে, যদি দেখতি … আমি তো ভাবছি প্রতিদিন দুপুরে মায়ের কাছ গিয়ে বেগুন ভর্তা বানানো শিখে…।

আপা! আটলান্টিকের ওপার থেকে মোবাইলে চিৎকার করে সোহান, আপা তুমি বুঝতে পারছো না, মা ভয়ানক একটা কিছু করে ফেলবে।

কচু করবে মা! আসলে তোর ডাক্তার দেখানো দরকার, হোয়াটসঅ্যাপে প্রাক্তন প্রেমিক সানোয়ার আকন্দ ফোন করলে, ছোট ভাই সোহানের ফোন কেটে দিয়ে আকন্দকে হ্যালো বলে, হ্যালো আকন্দ! কেমন আছো?

খুন করার পরিকল্পনা মাথায় আসে জাপানের সম্মিলিত হারিকারির একটা ভিডিও দেখে। ফেসবুকে প্রতিদিন কত ভিডিও ক্লিপ আসে। সাবিনা মাহতাব শুয়ে-বসে দেখেন আর হাসেন। হাসতে হাসতে যখন জাপানের কয়েকজন তরুণ-তরুণী মিলে একটা পাহাড়ের পাদদেশে খরস্রোতা নদীর তীরে হাঁটু মুড়ে বসে হাতে ধরা চকচকে তরবারি নিজেদের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে হাসছিল, পেট চিরে রক্তের লাল নহর বইছে, ছেলেমেয়েরা – জাপানি ভাষায় মুক্তি মুক্তি উচ্চারণে চিৎকার করছিল।

একটা অপরূপ মেয়ে গোটা হারিকিরির অনুষ্ঠানটা মোবাইলে ভিডিও করছিল। ওরা দলে ছিল সাতজন, ভিডিও করা মেয়েটিকে ধরে আটজন। ভিডিওতে সব কজন নিজের নিজের রক্তের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার পর মেয়েটি মোবাইলটি একটা উঁচু মাটির ঢিবির ওপর পজিশনে রেখে একটা মেয়ের পেটের তলা থেকে রক্তাক্ত চাকু বের করে নিজের পেটে আমূল বসিয়ে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে লাল রক্তের ধারা বের হয়ে আসে। মেয়েটি ধীরে ধীরে বাকি মৃতদের সঙ্গে বসে পড়ে। মেয়েটি হাসছে আর জাপানি ভাষায় বলছে, অনেক বেঁচে তো থাকলাম, এবার মরণের স্বাদ নিলাম, খুব ভালো লাগছে দুনিয়া থেকে নিজের ইচ্ছেয় নিজের মতো করে চলে যেতে পারায়। আমি মানুষ, আমিই হত্যা করলাম আমাকে Ñ এই হত্যা গৌরবের, আনন্দের …। মেয়েটি পড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে ভিডিওটি শেষ।

জাপানি দলগত হারিকিরির ভিডিওটি দেখার পর সাবিনা মাহতাব ভাবছেন, নিজে হত্যার উপকরণ না হয়ে অন্যকে উপকরণ করলে কেমন হয়? যেহেতু হাতে অঢেল সময়, কোনো কাজ নেই প্রসাধন আর খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া, সেহেতু খুনের একটা কারখানা খুললে কেমন হয়? খুনের কারখানা বললেই  তো হলো না, খুনের জন্য প্রথম দরকার কাকে দিয়ে, কীভাবে খুন শুরু করা যায়? কাজ তো একটা দরকার, না কি! বাড়ির কাজের মহিলা জয়গুনের মাকে প্রথম শিকারের জন্য টার্গেট করেন সাবিনা মাহতাব। কাজ করার সময়ে বেশ কয়েকবার রান্নাঘরে এসে জয়গুনের মাকে রেকি করেন তিনি। কিন্তু শরীরের বয়সজনিত চামড়ার ভাঁজ আর মাথার বেযত্নের চুল দেখে শরীর ঘিন ঘিন করে সাবিনা মাহতাবের : না! এই মহিলাকে দিয়ে হবে না। প্রথম খুনটা করার জন্য হৃষ্টপুষ্ট মানুষ দরকার। জবাই করতে সুখ পাওয়া যাবে … হাড্ডির ওপর ছুরি বা দা তেমন জমবে না। এমন কি কোপ দিলে শক্ত হাড়ের ওপর লেগে দা ফিরে আসতে পারে নিজের দিকে!

তিনি ডেকে পাঠান গাড়ির ড্রাইভার আবুল কালামকে। আবুল কালাম তাগড়া জোয়ান। ওকে দিয়ে খুনটা শুরু করলে একটা কাজের কাজ পাওয়া যাবে। কিন্তু খুন করে ওকে রাখবো কোথায়? নিজের মনে পরিকল্পনা সাজাতে সাজাতে ভাবেন সাবিনা মাহতাব, আবুল কালামকে খুন করে ওয়ারড্রোবের মধ্যে রেখে দেবেন। গন্ধ আসবে, কিন্তু গন্ধটা সহ্য করে নিতে হবে। খুনের গন্ধটা কেমন Ñ জানতে হবে না? অভিজ্ঞতা না থাকলে খুনের কাজগুলি কেমনে করবো?

প্রথম খুনের পরিকল্পনা পাকাপাকি করার পর সামিনা মাহতাব রিলাক্সড মুডে সোফায় শরীর দিয়ে অপেক্ষা করছেন আবুল কালামের জন্য। আবুল কালাম একটু বেশি সময় নিয়েই ঢোকে ড্রয়িংরুমে, কিন্তু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ!

কী, কী হয়েছে তোমার?

ম্যাডাম বাসায় ফেরার সময়ে মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটা বড় বাস আমাদের গাড়িটাকে প্রায় আইল্যান্ডের সঙ্গে চেপে ধরেছিল। আর একটু হলেই মরে যেতাম!

প্রথম খুনের প্রথম শিকার নিজেই দুর্ঘটনার শিকার! শরীরে আঘাতের চিহ্ন! মানে নিখুঁত নয় আবুল কালাম! বিরক্তিতে সাবিনা মাহতাবের মনটা নিষিদ্ধ কর্পূরের মতো উড়ে যায় আসমানে। খুন Ñ প্রথম খুনটা করবো নিখুঁত একটা মানুষকে! কিন্তু কোথায় পাবো তারে … ঠিক আছে তুমি যাও। বিশ্রাম নাও গে – আবুল কালাম সামনে থেকে সরে যায়।

খুনের নেশায় জাগরিত হননের স্রোতে ছুটে চলা সাবিনা মাহতাব উঠে দাঁড়ান সোফা থেকে, কে হবে খুনের প্রথম শিকার? নিখুঁত পরিপাটি আর সুন্দরতম হবে আমার … হোয়াটসঅ্যাপে ফোন আসে মাহবুব মাহতাবের, দামি মোবাইলের স্ক্রিন জুড়ে সৌম্যদর্শন মাহবুব মাহতাব হাসেন, কী করছো তুমি?

খুনের পরিকল্পনা করছি।

অফিসের ঘূর্ণায়মান চেয়ারে দোল খেতে খেতে মাহতাব প্রশ্ন করেন ভ্রু কুঁচকে, কিসের পরিকল্পনা করছো?

খুনের?

খুনের?

মাথা ঝাঁকান সাবিনা মাহতাব, হাতে কোনো কাজ নেই। সময় কাটে না আমার। তাই পরিকল্পনা করছি খুনের। খুন তো একটা শিল্প, তাই না মাহতাব?

নিশ্চয়ই, যদি শিল্পময়তার সঙ্গে করতে পারো। কিন্তু কাকে খুন করবে?

ক্লায়েন্ট খুঁজছি!

হাসেন মাহতাব, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সোহানের সতর্কবার্তা। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে চেনেন আটাশ বছর ধরে, ওর পক্ষে একটা তেলাপোকাও মারা সম্ভব নয়। কারণ, তেলাপোকা দেখলে চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়িঘর ওলটপালট করে দৌড়ে পালায়। আচ্ছা, স্ত্রীকে কে বেশি চেনে? স্বামী, না সন্তান? দুজনেই স্ত্রী ও মায়ের শরীরের মনের আদি-অন্তের সঙ্গে যুক্ত; কিন্তু স্বামী জানেন, স্ত্রীর শরীর নির্মাণ কলার কৌশল ও মনের স্রোত, যা সন্তান জানে না।

সাতদিন পরে বাসায় আসে ফারিয়া, কিন্তু বাসায় ঢুকেই বিশ্রী তিক্ত গন্ধে মা-বাবার বেডরুমে ঢুকতে পারে না। বমি আসছে।

মা কিসের গন্ধ?

হাসেন সাবিনা মাহতাব বিশাল প্রসাধন আয়নার সামনে বসে, গন্ধ? কিসের গন্ধ? তিনি নাক টানেন, মিষ্টি হাসেন – আমি তো কোনো গন্ধ পাই না।

ফারিয়া দ্রুত নেমে আসে নিচতলায়, ফোন করে পুলিশকে। পুলিশ এসে সাবিনা মাহতাব ও মাহবুব মাহতাবের বেডরুমের ওয়ারড্রোবের মধ্যে থেকে টুুকরো টুকরো মাংসসহ মাববুব মাহতাবের লাশ বের করে আনে নাকে রুমাল বেঁধে। হ্যান্ডকাফ পরানো সাবিনা মাহতাব যখন হাজার হাজার উৎসুক দর্শকের মধ্যে হেঁটে হেঁেট পুলিশের গাড়িতে ওঠেন, মুখে প্রশান্তির হাসি।

 তাহলে আমিও অনেক লোক জড়ো করাতে পারি!

Leave a Reply