খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী ও নিষেধাজ্ঞার মামলা

লেখক:

ভূমিকা ও অনুবাদ

আন্দালিব রাশদী

 

আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী Truth, Love & a Little Malice-এর প্রকাশনা ছয় বছর আটকে ছিল। এ-গ্রন্থের একটি ছোট অধ্যায় ‘Gandhis  and Anands’ ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

ইন্দিরা গান্ধি শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, প্রধানমন্ত্রী অবস্থায় রাজিব ও সঞ্জয়ের মা এবং সোনিয়া ও মানেকার শাশুড়িও ছিলেন। সে-সময় এই পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন খুশবন্ত সিং। ট্রেন টু পাকিসত্মানের ঔপন্যাসিক হিসেবে, দ্য ইলাসট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়ার ডাক ফাটানো সম্পাদক হিসেবে এবং ভারতের সবচেয়ে পঠিত কলামনিস্ট হিসেবে এবং দিলিস্নর ১নং সফদরজং রোডে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পারিবারিক সংকটে উদ্ধারকারী হিসেবে খুশবন্ত সিংয়ের তখন তুঙ্গে অবস্থান। পঁচাত্তরে ইন্দিরা গান্ধি যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, গোটা দেশ এর বিরোধিতা করলেও খুশবন্ত সিং জোর গলায় একে সমর্থন করলেন এবং আমৃত্যু এ-সমর্থনকে তিনি যৌক্তিক মনে করে গেছেন। এ-ভূমিকা তাঁকে পরিণত করল ‘ইন্দিরাজির চামচা, সঞ্জয়জির চামচা’তে।

সম্পর্কটি ভাঙতেও সময় লাগল না। হঠকারী কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সঞ্জয় বিতর্কিত হলেন, বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হলেন সঞ্জয় – ‘ভারতের আগামীদিনের প্রধানমন্ত্রী’।

শাশুড়ি-বউমার সনাতন বিবাদ দেখা দিল প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে। খুশবন্ত দুপক্ষেরই সাক্ষী, কাছে থেকেই দেখেছেন। এই কাহিনিই লিখেছেন গান্ধিস অ্যান্ড আনন্দসে। যাঁর যতটুকু ভূমিকা হয়তো তা-ই লিখেছেন খুশবন্ত সিং। কিন্তু মানেকা চলে গেলেন আদালতে। আত্মজীবনীর প্রকাশনা থেকে লেখক ও প্রকাশককে বিরত রাখার আদেশও পেয়ে গেলেন।

পাঁচ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের আদেশ খারিজ করে দেন। সাহিত্যকর্ম হিসেবে গ্রন্থটি আলোর মুখ দেখে।

আত্মজীবনীর বিতর্কিত অংশ অনূদিত হলো, সেইসঙ্গে মানেকা গান্ধির মামলার রায়ের সারসংক্ষেপও উপস্থাপন করা হলো।

 

ভালোবাসায় ও বিদ্বেষে

মনে রাখা দরকার নিজের বিয়েতে ইন্দিরা গান্ধি সাফল্য লাভ করতে পারেননি। তাঁর স্বামী ফিরোজ গান্ধি এলাহাবাদের এক পার্সি মদ বিক্রেতার ছেলে।

তাঁর ঔরসে রাজিব আর সঞ্জয় নামে দুটো ছেলের জন্ম দিয়ে ইন্দিরা তাঁকে ছেড়ে দেন। ছেড়ে দিয়ে বাবার সঙ্গে বসবাস করতে, তাঁর হাউসকিপার ও হোস্টেস হতে চলে আসেন। প–ত নেহরুর বহু বছরের ব্যক্তিগত সচিব এমএ মাথাই বলেছেন, বাবা কিংবা মেয়ে কারোই যৌনতা নিয়ে কোনো সংকোচ ছিল না। মাথাই তাঁর বইয়ে পদ্মজা নাইডু এবং এডউইনা মাউন্টব্যাটনের সঙ্গে নেহরুর সম্পর্কের কথা লিখেছেন।

মাথাই-ই প্রথম বলেছেন, তান্ত্রিক সাধ্বী শ্রদ্ধামাতার সঙ্গে প–তজির একটি স্বল্পজীবী সম্পর্ক ছিল, তাঁর গর্ভে নেহরুর একটি অবৈধ সমত্মান জন্মগ্রহণ করে, শ্রদ্ধামাতা বাচ্চাটিকে দক্ষেণের একটি ক্যাথলিক হাসপাতালে পরিত্যাগ করেন।

মাথাইর বইয়ে ‘শি’ নামে একটি অধ্যায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ভিকাস উঠিয়ে নিয়েছে, তবে সে-অংশটি অনেকের কাছে আছে, আমার কাছেও। তাতে মাথাই ইন্দিরাকে প্রণয়িনী নারী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ১২ বছর তাঁর ভালোবাসা পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন, তারপর তিনি ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীর কাছে হেরে যান।

এসবের উল্লেখ গুরুত্বপূর্ণ কারণ মিসেস গান্ধি পরে মনে করতেন মানেকা তাঁর পরিবারের সঙ্গে খাপ খাওয়ার মতো নন, তাঁর পরিবার নেহরু-গান্ধিদের শ্রেণিভুক্ত নয়। মানেকার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি মানেকার সঙ্গে যে-আচরণ করেছেন, তা ভারতীয় রমণীসুলভ নয়।

মানেকার সঙ্গে সঞ্জয়ের প্রথম দেখা ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩, ছেলে ভিনু কাপুরের আসন্ন বিয়ে উদ্যাপন উপলক্ষে মেজর জেনারেল কাপুরের দেওয়া একটি ককটেল পার্টিতে (মেজর জেনারেল কাপুর মানেকার ফুপা, তাঁর ফুপু সে-সময়কার ডাক ফাটানো সুন্দরী)।

ভিনুর স্কুলজীবনের বন্ধু হিসেবে সঞ্জয় পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন। আর সে-তারিখটা সঞ্জয়ের জন্মদিন। সঞ্জয়ের মনোবল তখন দারুণ চাঙ্গা – হাই স্পিরিটেড (সঞ্জয় কখনো অ্যালকোহলিক নন, তিনি পানীয় স্পর্শ করতেন না)। পার্টি গার্লসের ওপর তাঁর বরাবরই চোখ ছিল; কিন্তু যাকে তাঁর মনে হতো, ভারতের ফার্স্ট ফ্যামিলির সদস্য হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর প্রেমে পড়তে এগিয়ে আসছে, তিনি তার সঙ্গে নিজেকে না জড়িয়ে সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। মানেকার বয়স তখন সতেরো, হালকা-পাতলা, সমতল বুক, মুখে মেচেতার দাগ, কলেজের সুন্দরী প্রতিযোগিতা জেতার মতো যথেষ্ট আকর্ষণীয়; এক তোয়ালে প্রস্ত্ততকারকের জন্য সে মডেলও হয়েছে। মানেকা তখন, এখনো দারুণ ফটোজেনিক।

সে-পার্টির পর সঞ্জয় ও মানেকা প্রতিদিনই দেখা করতে শুরু করলেন। সঞ্জয় রেসেত্মারাঁ কিংবা সিনেমায় যাওয়া যুবকদের মতো নন, তাঁকে চিনে ফেলতে পারে এমন জনসমক্ষে পড়তে চাইতেন না। তার চেয়ে তিনি যেতেন মানেকাদের বাড়ি অথবা মানেকাকে নিয়ে আসতেন নিজেদের বাড়িতে।

১৯৭৪-এর গোড়ার দিকে মানেকাকে খাবারের আমন্ত্রণ জানালেন। প্রধানমন্ত্রীকে সামনে পেয়ে মানেকা সংগত কারণেই নার্ভাস হয়ে পড়েছিল, কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। মিসেস গান্ধি নিজেই বরফ গলালেন, ‘সঞ্জয় যেহেতু আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়নি তুমিই বরং বলো তোমার নাম কি, তুমি কী করো?’

ছেলের বউয়ের উপযুক্ত কিনা এই মেয়েকে নিয়ে মিসেস গান্ধির তা মাপামাপি করার কোনো কারণ নেই। বিভিন্ন সময় সঞ্জয় বিভিন্ন মেয়েকে নিয়ে এসেছে। উপযুক্ত ছেলের বউ হতে পারে এমন কোনো মেয়ের সঙ্গে তিনি কখনো সঞ্জয়কে পরিচয় করিয়ে দেননি। বড় ছেলের বেলায় কিন্তু পছন্দের ক্ষমতা ছেলেকেই দিতে তৈরি তিনি, যাকে সে উপযুক্ত মনে করে বিয়ে করুক।

মানেকার মা আমতেশ্বর আনন্দ দাবি করেন, তাঁর মেয়ের জন্য সঞ্জয়কে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করা তো দূরের কথা, যে-পরিবারের সঙ্গে মৈত্রী হবে না বলে তিনি অনুভব করছেন মেয়েকে সেদিকে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তারপর তিনি মানেকাকে কিছুদিনের জন্য ভুপাল পাঠিয়ে দিলেন, দিদিমা ল্যাডি দাতার সিংয়ের সঙ্গে সময়টা কাটাক। ১৯৭৪-এর জুলাইয়ে মানেকা ভুপাল থেকে ফিরে এল।

সে-মাসেরই ২৯ তারিখ প্রধানমন্ত্রীর ১নং সফদরজং রোডের বাসায় দুজনের লৌকিক এনগেজমেন্ট উৎসব হয়ে গেল। তারপর লাঞ্চ। দুপরিবারের সদস্যরা এতে উপস্থিত ছিলেন। মিসেস গান্ধি বউমাকে সোনা ও ফিরোজা পাথরের একটি সেট এবং একটি তানচই শাড়ি উপহার দিলেন। এক মাস পর মানেকার জন্মদিনে (২৬ আগস্ট ১৯৭৪) তিনি তাঁকে ইতালীয় সিল্কের শাড়ি দিলেন। এর পরপরই সঞ্জয়ের হার্নিয়া অপারেশন করাতে হয়। সকাল-বিকেল কলেজ সেরে মানেকা বিকেল ও সন্ধেটা অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের একটি প্রাইভেট ওয়ার্ডে তার প্রেমিকের সঙ্গে কাটাত।

রোগমুক্ত হয়ে সঞ্জয় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে মোহাম্মদ ইউনুসের বাড়িতে সঞ্জয় ও মানেকার সিভিল ম্যারেজ অনুষ্ঠিত হলো। মিসেস গান্ধি বউমাকে বিয়ের উপহার দেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত উদারতা দেখিয়েছেন – একুশটি দামি শাড়ি, দুই সেট সোনার অলংকার, একটি লেহেঙ্গা এবং এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটি ছিল একটি খাদির শাড়ি, জেলখানায় থাকার সময় তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরুর নিজের হাতে চরকায় তৈরি সুতোতে বানানো।

বউকে যেভাবে বরণ করে সনাতন ঐতিহ্যবাহী শাশুড়ি, তিনিও তেমনি বধূবরণ করে নিলেন। তাঁদের ঘর সাজিয়ে দিলেন, ড্রেসিং টেবিলে শোপিস রাখলেন, বিয়ের পরদিন মানেকা কোন চুড়ি পরবে তাও ঠিক করে দিলেন।

১৯৮০-র জুনে সঞ্জয়ের মৃত্যুর এক মাস পর মিসেস গান্ধি নিজ থেকেই মানেকাকে তাঁর সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার প্রসত্মাব দিলেন। কয়েকদিন পর ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী মানেকার কক্ষে এসে তাকে জানালেন, মিসেস গান্ধি একটা বিষয় তাঁকে জানাতে খুব বিব্রতবোধ করছেন – মানেকাকে দেওয়া তাঁর প্রসত্মাবে সোনিয়া পা গলিয়ে দিয়েছে, হুমকি দিয়েছে মিসেস গান্ধি যদি এ-প্রসত্মাব প্রত্যাহার না করে তাহলে সোনিয়া স্বামী-সমত্মান নিয়ে ইতালি ফিরে যাবে।

মানেকার কথা যদি বিশ্বাস করা যায় তাহলে শাশুড়ির বিরুদ্ধে সোনিয়ারই অনেক অভিযোগ ছিল। প্রথম গর্ভাবস্থায় সোনিয়াকে বিশালদেহী দেখা যাওয়ায় মিসেস গান্ধী চাপ দিয়ে কিছু ব্যায়াম করতে বাধ্য করেন। আর এই ব্যায়ামের কারণে তাঁর পাঁচ মাসের ছেলে-ভ্রূণটি গর্ভপাতে নষ্ট হয়ে যায়।

আমার এ-কাহিনি অবিশ্বাস করার কারণ রয়েছে, কারণ সঞ্জয়ের জীবদ্দশায় মানেকা আমাকে বলেছে, তার বদলে তিনি কেমন করে সোনিয়ার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে যাচ্ছেন, একটি ঘড়ি ও কলমসহ প–ত নেহরুজির জিনিসপত্র দেশি বউ হিসেবে তাকে না দিয়ে বিদেশি বউ সোনিয়াকে দিয়ে দিয়েছেন। আমারও কিঞ্চিৎ সন্দেহ ছিল সঞ্জয় যেমন মিসেস গান্ধির অধিক পছন্দের পুত্র, তেমনি সোনিয়াও অধিক পছন্দের বউমা। যেহেতু সঞ্জয় আর নেই, একমাত্র জীবিত সমত্মানের দিকে ঝুঁকেপড়া ছাড়া মিসেস গান্ধির আর উপায় নেই। মানেকার জন্য তাঁর বিশেষ কোনো স্নেহ বা ভালোবাসা নেই, সঞ্জয়ের শাশুড়ি আমতেশ্বরের খবরদারিও তিনি অপছন্দ করছেন। এই অনুভূতি শিগগির প্রকাশ্য শত্রম্নতায় পরিণত হলো।

মানেকার উপস্থিতিতে তিনি ক্রমাগত উত্ত্যক্ত হতে এবং মানেকা যা করছে তাতেই দোষ ধরতে থাকলেন। তিনি আমাকে বললেন, যখন লোকজন সঞ্জয়ের জন্য সমবেদনা জানাতে আসে মানেকা তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিসেস মার্গারেট থ্যাচারের সম্মানে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বাঙ্কোয়েটে প্রধান টেবিলে রাজিব ও সোনিয়াকে প্রধান অতিথির সঙ্গে বসানো হয় আর মানেকার মর্যাদা নামিয়ে তাকে বসানো হয় মিসেস গান্ধির ব্যক্তিগত সচিব আর.কে. ধাওয়ানসহ

অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে।

তাকে বলা হয়, সে একজন মনোযোগ বিনষ্টকারী মহিলা এবং সে টেবিল সৌজন্য জানে না। একদিন মিসেস গান্ধি আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমি যেন মানেকাকে ভালো ব্যবহার করতে বলে দিই। আমি যখন মানেকার সঙ্গে কথা বলি, সে জানায়, মিসেস গান্ধি তার সঙ্গে আবর্জনার মতো আচরণ করছেন আর সেও মিসেস গান্ধিকে ‘নোংরা ও অসংবৃত মহিলা’ বলে উল্লেখ করে।

এই দুজন নারীর মধ্যে সম্পর্কের দ্রম্নত অবনতি ঘটতে লাগল। মানেকা তার বন্ধুদের বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করছে যে, মিসেস গান্ধিকে প্ররোচিত করতে সে কিছুই করেনি, দোষ সবটাই তার শাশুড়ির। যতবারই সে মিসেস গান্ধির সঙ্গে দেখা করেছে, তিনি বলেছেন, ‘সবাই তোমাকে ঘেন্না করে, তুমি তোমার বাবাকে খুন করেছ (তেজিন্দার সিং আনন্দ ১৯৭৮ সালে আত্মহত্যা করেন), তোমার মা হচ্ছে একটা কুকুরী।’

রাজস্থান থেকে মার্বেল পরিবহনের একটি কন্ট্রাক্ট প্রদানের ব্যাপারে জনৈক খোশনার কাছ থেকে মানেকা দেড় লাখ রুপি ঘুষ নিয়েছে বলে মিসেস গান্ধি নিজেই অভিযোগ করেছেন।

অল্পদিন পরই মিসেস গান্ধি যখন জয়সালমার (রাজস্থানের একটি শহর, দ্য গোল্ডেন সিটি নামে পরিচিত) গেলেন তাঁর সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে মানেকাকে বাদ দিলেন। কারণ বাহ্যত রাজস্থানের পর্যটনমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং ভাট্টি সূর্যতে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সাত লাইনের একটি নিবন্ধের জন্য মানেকাকে কোর্টে দাঁড় করিয়েছিলেন

(সূর্য, মানেকা গান্ধি-সম্পাদিত ম্যাগাজিন)।

ভাট্টি সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে তাতে অবশ্যই তার আত্মসম্মানহানির কারণ ঘটেছে। তবে মিসেস গান্ধি এবং রাজিবের অনুমোদন ছাড়া ভাট্টি মানেকার বিরুদ্ধে মামলা করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন – এটা বিশ্বাস করা কঠিন। মানেকা ও তার মা যখন ভাট্টির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

এই দুই মহিলার কারো মধ্যেই এতটুকু অপরাধবোধ ছিল না যে, তারা মিথ্যেভাবে ভাট্টির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছেন, বরং মিসেস গান্ধী কেন তাঁকে বরখাস্ত করলেন না, এ নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ হলো।

সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল, এক নম্বর সফদরজং রোডে মানেকার দিন হাতেগোনা। তখন কেবল অনুমান চলছে কখন ও কীভাবে সে সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে। মিসেস গান্ধী কখনো ভাবেননি তিনি ছাড়া অন্য কেউ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে – তাঁর জন্য তখন অপেক্ষা করছিল এক নোংরা বিস্ময় – ন্যাস্টি সারপ্রাইজ।

শাশুড়ির কাছ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন নিলই, মানেকা এবার ঠিক করল, বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় ও-শর্ত সে-ই নির্ধারণ করবে।

কোন তারিখে তাকে এই বাড়ি থেকে ‘বের করে’ দেওয়া হবে কয়েক সপ্তাহ আগেই সে-ই আমাকে জানিয়ে দিলো।

খুব সতর্কভাবে মানেকা সেই তারিখ বেছে নিল। ইন্ডিয়া ফেস্টিভালে যোগ দিতে মিসেস গান্ধি তখন লন্ডনে। রাজিব তখন নিজেকে তৈরি করায় ব্যস্ত। খাবারের সময় মানেকার সঙ্গে দেখা হওয়া এড়াতে বাড়িতেই থাকছেন না। মানেকা ও তার মা এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে এ-বাড়ি থেকে দলিল-দসত্মাবেজ যা কিছু নেওয়ার সরিয়ে ফেললেন।

তার ভাই এবং বোন যথারীতি তার ভ্যানটি চালিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকত এবং কোনো ধরনের তল্লাশি ছাড়াই বেরিয়ে যেত। মানেকা ও আকবর আহমেদ (ডাম্মি)-কে সঙ্গে নিয়ে সঞ্জয় বিচার-মঞ্চের ঘোষণা দিলেন। (আকবর ভারতের দ্বাদশ লোকসভায় উত্তর প্রদেশের আজমগর থেকে নির্বাচিত সদস্য)। তার নিজের ছেলের আদর্শ প্রচারের জন্য গঠিত এই সংস্থা যে মিসেস গান্ধি অনুমোদন করেন না তা কেমন করে প্রকাশ করবেন ভেবে পেলেন না।

সঞ্জয় মঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মানেকার দেওয়া ভাষণ (মানেকার দাবি, এই ভাষণ মিসেস গান্ধি অনুমোদন করেছেন) রাজিব টেলিগ্রাফে লন্ডনে অবস্থানরত মিসেস গান্ধির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। দুর্বিনীত পুত্রবধূকে সরিয়ে দেওয়ার যে-সুযোগের অপেক্ষায় তিনি ছিলেন, মিসেস গান্ধি সিদ্ধান্ত নিলেন, সে-সুযোগ তিনি পেয়ে গেছেন।

১৮ মার্চ ১৯৮২ সকালবেলা মিসেস গান্ধি লন্ডন থেকে ফিরে এলেন, কেষ্টবিষ্টুদের ডাকলেন। যখন মানেকা তাঁকে অভিবাদন জানাতে এলো তিনি কাঠখোট্টা স্বরে তাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে পরে কথা হবে।’ তার কাছে কথাটা পৌঁছে গেল যে, পারিবারিক মধ্যাহ্নভোজে সে আর প্রত্যাশিত নয়, খাবার তার রুমেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে। দুপুর একটার দিকে আরো একটি সংবাদ তার কাছে পৌঁছল যে, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।

মানেকা মিসেস গান্ধির কাছে ধোলাই খাওয়ার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিল। মিসেস গান্ধি যখন খালি পায়ে ঢুকলেন মানেকা তখন বসার ঘরে। তিনি মানেকাকে কী বলেন তার সাক্ষী রাখার জন্য ধাওয়ান ও ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীকে সঙ্গে ডেকে নিলেন।

মানেকার কথা অনুযায়ী তিনি রাগে ফুঁসছিলেন, তাঁর কথাও বোঝা যাচ্ছিল না, ‘তুমি নোংরা খুদে মিথ্যুক। তুমি প্রতারক, তুমি…,’ মানেকার দিকে আঙুল তুলে তিনি চিৎকার করতে থাকলেন। ‘তুমি এক্ষুনি এ-বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।’

মানেকা যেন নিষ্পাপ এমন একটা ভান করে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন? আমি কী করেছি?’

তিনি আবারো চেঁচিয়ে বললেন, ‘তোমার ভাষণের প্রতিটি শব্দ আমি শুনেছি।’

‘কিন্তু এ-ভাষণ তো আপনিই অনুমোদন করেছিলেন।’

এরপর মিসেস গান্ধি আরো একদফা বিস্ফোরণ ঘটালেন।

তিনি যখন লন্ডনে ছিলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে মানেকা এ-বাড়িতে শত্রম্নদের এনেছে বলে তিনি উল্লেখ করলেন, সংগত কারণে আরো যোগ করলেন : ‘তোমার (ভাষণের) প্রতিটি শব্দে বিষ ছড়ানো ছিল। এ-মুহূর্তে এ-বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। বেরোও।’

তিনি আরো যোগ করলেন : ‘গাড়িকে বলা হয়েছে তোমাকে তোমার মায়ের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে।’

মানেকা তার পায়ের তলার মাটি খুঁজে পেতে চেষ্টা করছে। তার মায়ের বাড়িতে যেতে চাইছে না, গোছগাছ করার জন্য সময় চাইছে।

‘তোমাকে যেখানে যেতে বলা হচ্ছে সেখানেই যাবে। তোমার জিনিসপত্র পরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ মিসেস গান্ধি বললেন এবং মানেকার মা আমতেশ্বর সম্পর্কে কড়া-কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন। মানেকা ফোঁপাতে শুরু করল। তার রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় চেঁচিয়ে মিসেস গান্ধিকে শোনাল, তার মাকে অপমান করা সে সহ্য করবে না।

মিসেস গান্ধি খালি পায়ে তাকে পাথুরে রাসত্মা পর্যন্ত অনুসরণ করে চেঁচিয়ে বললেন, ‘গেট আউট’, ‘গেট আউট’। বাড়ির কর্মচারী ও পাহারাদারদের তা শোনার বাকি রইল না।

ততক্ষণে ফিরোজ বরুণকে মিসেস গান্ধির রুমে নিয়ে আসা হলো। মানেকা তার রুমে ফিরে প্রথম যে-কাজটি করল তা হচ্ছে সঞ্জয়ের পুরনো বন্ধু ও কো-পাইলট কে.ভি. সিংকে ফোন করে কী ঘটেছে তা বলা এবং সকলকে তা জানাতে অনুরোধ করা – তার আশঙ্কা ছিল, পরে সে হয়তো কাউকে জানাতে সমর্থ হবে না।

ফোনের রিসিভার রাখতে না রাখতেই তার টেলিফোন ডেড হয়ে গেল এবং প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি থেকে বের হওয়ার সব গেট বন্ধ হলো।

মানেকার বন্ধুরা গণমাধ্যমে এ-সংবাদটি ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে যাওয়ার আগে মানেকার বোন আম্বিকা আমাকে ফোন করে কী-কী ঘটেছে জানাল এবং দ্রম্নত খবরটি ছড়িয়ে দিতে অনুরোধ করল। রাত ৯টার মধ্যে বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিসহ ফটোগ্রাফার ও রিপোর্টাররা গেটের বাইরে জমায়েত হতে শুরু করল।

বিদেশি গণমাধ্যম সম্পর্কে মিসেস গান্ধির মনে বেশ আতঙ্ক ও ঘৃণা  ছিল। বাড়িতে ঢোকার বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন ছিল কিন্তু কাকে আটকাবে আর কাকে ঢুকতে দেবে, এ-নিয়ে তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া ছিল না। দশ মিনিটের মধ্যে আম্বিকা ও তার ভাই এসে পৌঁছানোর পর আট বছরে এই প্রথম তাদের গেটে আটকানো হলো। তাদের আগমনের খবর মিসেস গান্ধিকে দেওয়া হলো এবং বলা হলো আম্বিকা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছে।

তাদের গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো এবং দুজন মানেকার রুমে ঢুকল। তারা মানেকাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় পেল, কাঁদতে-কাঁদতে সে যতটা পারে ট্রাঙ্কে তার জিনিসপত্র ঢোকাচ্ছে।

হঠাৎ মিসেস গান্ধি তার রুমে ঢুকলেন এবং কোনো কিছু না নিয়ে তাকে বাড়ি ছাড়তে নির্দেশ দিলেন। আম্বিকা প্রতিবাদ করল, ‘সে যাবে না, এটা মানেকার বাড়ি।’ মিসেস গান্ধি আম্বিকাকে অপছন্দ করতেন, সে-সঙ্গে মেয়েটির ধারালো জিহবা তাঁর কাছে ভীতিকর হয়ে উঠল।

মিসেস গান্ধি চেঁচিয়ে বললেন, ‘এটা তার বাড়ি নয়, এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। অনুমতি ছাড়া সে কাউকে এ-বাড়িতে ঢোকাতে পারে না। যা-ই হোক, আম্বিকা আনন্দ আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি না।’

কিন্তু আম্বিকা ভীত হওয়ার মতো মেয়ে নয়। ‘মিসেস গান্ধি, এভাবে আমার বোনের সঙ্গে কথা বলার কোনো অধিকার আপনার নেই। এটা সঞ্জয়ের বাড়ি এবং সে সঞ্জয়ের স্ত্রী, সুতরাং এটা তার বাড়ি। কেউ তাকে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আদেশ দিতে পারে না।’

মিসেস গান্ধি উপযুক্ত শব্দ খুঁজে চিৎকার করার জন্য হাতড়ে বেড়ালেন, ‘আমি তাকে বেরিয়ে যেতে বলিনি। আমি জীবনে কখনো মিথ্যা কথা বলিনি।’

পরস্পরের উপস্থিতিতে দুবোনই সাহসী হয়ে উঠে প্রতিশোধের কণ্ঠে বলল, ‘আপনি জীবনে কখনো সত্যি কথা বলেননি।’

দুই বোন রয়ে গেল। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা, কৌশল ও সময় ঠিক করল। তারা লাঞ্চের অর্ডার দিলো, ভিডিও ক্যাসেটে সাত্তে পে সাত্তা – অমিতাভ বচ্চনের ছবিটি সজোরে চালিয়ে দিলো যাতে পাশের রুম থেকে মিসেস গান্ধির মনে হয় এ দুজন তাঁকে পাত্তাই দেয়নি।

প্রতিবারই ধাওয়ান তাদের কাছে এসে বাড়ি ছাড়ার কথা বলছে, তারা নতুন-নতুন দাবি পেশ করতে শুরু করল। কুকুরগুলোকে খাওয়াতে হবে, কুকুর খাওয়ানো হলো। ধাওয়ান যখন তাদের কোনো কিছু সঙ্গে নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত করতে পারলেন না, মিসেস গান্ধি ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন এবং তাদের প্যাক করা সবকিছু তল্লাশি করার নির্দেশ দিলেন।

মানেকা জোর দিয়ে বলল, তার নিজের জিনিসপত্রের কোনো কিছু যদি তল্লাশি করতে হয়, তবে তা করতে হবে খোলা রাসত্মায় গণমাধ্যমের সামনে। রুমে বাইরের ট্রাঙ্কগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা হলো যাতে সাংবাদিকরা গেটের বাইরের টেলিস্কোপিক লেন্স লাগানো ক্যামেরায় ছবিগুলো ধরতে পারে।

আরো এক দফা গালি ও পালটা গালি চলল। মিসেস গান্ধি আরো একবার ঝাঁঝালো কণ্ঠে তাকে তখনই বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। বোনের পক্ষ থেকে আম্বিকাই তার শাশুড়িকে প্রতিরোধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ‘আপনার কত বড় দুঃসাহস, আমার বোনের সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন! তার যা খুশি সে তাই করবে।’

মিসেস গান্ধি আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘চুপ কর। তোকে কথা বলতে কে বলেছে?’

আম্বিকাও ক্ষেপ্ত হয়ে বলল, ‘তুই চুপ কর। তুই নিজেকে কী মনে করিস, কুত্তি কোথাকার।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে কেউ কোনোদিন কথা শোনায়নি। লড়াইটা তাঁর আয়ত্তের বাইরে চলে গেল। তিনি ভেঙে পড়লেন, কান্না-ভেজা চোখে রুম থেকে কার্যত পালিয়ে গেলেন।

পরিস্থিতি আর মিসেস গান্ধির নিয়ন্ত্রণে রইল না।

অরুণ নেহরুকে সঙ্গে নিয়ে রাজিব এসে নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিল। তারা নিরাপত্তা কর্মকর্তা এন কে সিংকে ডাকলেন এবং দুই বোনকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। বুদ্ধিমান মানুষ এনকে সিং কাগজে-কলমে আদেশ চাইলেন।

রাজিব কিংবা অরুণ নেহরু কেউই কাগজে সই করতে রাজি নন। এনকে সিংয়ের মৌখিক অনুরোধ এই দুই তরুণী প্রত্যাখ্যান করল। তারা তাদের বাক্সপেঁটরা, কুকুর সঙ্গে নিয়ে যাবে; সঙ্গে যোগ হলো ফিরোজ বরুণ, তার তখন জ্বর, তাঁকে আগে রেখে আসতে হবে।

এনকে সিং বিষয়টি রাজিব ও অরুণ নেহরুকে জানালে তারা আবার তাকে নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছে প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে বললেন। সিং জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা যদি থানায় আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে তাহলে কী হবে?’

অরুণ নেহরু ক্ষেপ্ত হয়ে বললেন, এখানকার থানাকে বলে দেওয়া হয়েছে, যেন মানেকার কিংবা তার পক্ষে কারো অভিযোগ রেকর্ড করা না হয়। সিং তখন তাদের সতর্ক করে দিলেন, ‘তিনি এটা আপনাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারেন। বিদেশিসহ সাংবাদিকদের তার সঙ্গে ডেকে এনে গোটা পৃথিবীকে দেখিয়ে দেবে ভারতের পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে।’

রাজিব ও অরুণ স্পষ্টতই ব্যাপারটা নিয়ে এভাবে চিমত্মা করেনি। আলোচনা করার জন্য তারা মিসেস গান্ধীর কাছে ছুটল। মিসেস গান্ধি জেনে গেছেন তিনি মার খেয়েছেন এবং পরাজিত হয়েছেন।

এই মেয়েদুটো এবং তাদের ভাই সময় নিয়ে দুপুরের সুস্বাদু আহার সারল। লাগেজ এবং কুকুর একটি ট্যাক্সিতে আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাত এগারোটায় প্রায়-ঘুমন্ত ফিরোজ বরুণকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো। ট্যাক্সির বদলে প্রধানমন্ত্রীর কার তাদের জন্য মোতায়েন করা হলো। মানেকা ও তার ছেলে যেখানে যেতে চায় নিয়ে যাবে।

অভ্যাস অনুযায়ী মিসেস গান্ধি শেষ যে-কাজটি করলেন তা হচ্ছে মানেকাকে লেখা একটি চিঠির ডিকটেশন দেওয়া : তাতে বলা হয়েছে কোন-কোন অপকর্মের কারণে তাকে বহিষ্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।

মানেকাও জবাব লিখতে বসে গেল এবং সে-জবাব পাঠিয়ে দিলো সাংবাদিকদের কাছে।

এগারোটা বাজার কয়েক মিনিট পর অশ্রম্নসিক্ত মানেকা ঝাপসা চোখের বিস্মিত ফিরোজ বরুণকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। গেটের বাইরে আসতেই প্রেস-ক্যামেরার ফ্লাশ বাল্বগুলোর বিস্ফোরণ ঘটল। মানেকা এই রাউন্ডে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিকে নক-আউটে হারিয়ে দিয়েছেন।

কয়েক মাস পর মানেকা ও তার মা আমতেশ্বরের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেল। সে-সময় মানেকার সঙ্গে সঞ্জয়ের বন্ধু আকবর আহমেদের (ডাম্পি) ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উড়ো খবর রটে চলেছে। ডাম্পি তখন উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস নেতা।

এ-বিষয়টি নিয়ে দুটি জার্নাল আমার সাক্ষাৎকার নিল। মানেকার পক্ষে সোৎসাহে বলতে গিয়ে তাকে সেক্সবিহীন, চ্যাপ্টা বুকের নারী হিসেবে বর্ণনা দিলাম এবং তাকে তার মায়ের প্রতিকূলে তুলনা করলাম যে আসলে সেরকম নয়।

তার মা ও শাশুড়িকে আড়ালে রেখে আমি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যেবাদী হিসেবে বর্ণিত করলাম। কয়েকদিন পর মানেকা ঝড়োবেগে আমার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকল, ম্যাগাজিনের একটি

কপি আমার মুখের ওপর ছুড়ে ফেলে একইভাবে বেরিয়ে গেল।

এক ঘণ্টা পর আমি প্রাপ্তি স্বীকারোক্তিপত্রসহ রেজিস্টার্ড একটি চিঠি পেলাম। আমতেশ্বর পরিবার সম্পর্কে মিথ্যে কথা বলার জন্য আমাকে অভিযুক্ত করেছেন। গান্ধি ও আনন্দ পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতি ঘটল। আমি মুক্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার জীবনের আর একটি অধ্যায় শেষ হলো।

 

টীকা

সাত্তা পে সাত্তা : ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি অ্যাকশন কমেডি ফিল্ম। রাজ সিপ্পি-পরিচালিত এ-ছবিতে অভিনয় করেছেন অমিতাভ বচ্চন, হেমা মালিনী, আমজাদ খান, রঞ্জিতা কাউর, শক্তি কাপুর, প্রেমা নারায়ণ ও কল্পনা আয়ার। ছবিতে গান গেয়েছেন কিশোর কুমার, আশা ভোঁশলে ও রাহুল দেব বর্মন।

ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী : (জন্ম ১২ ফেব্রম্নয়ারি ১৯২৪-মৃত্যু ৯ জুন ১৯৯৪) ইন্দিরা গান্ধির যোগ সাধনার শিক্ষক হিসেবেই বেশি পরিচিত। তাঁর সঙ্গে মিসেস গান্ধিকে জড়িয়ে কিছু ‘গসিপ’ রটেছিল।

পদ্মজা নাইডু : (জন্ম ১৯০০-মৃত্যু ২ মে ১৯৭৫) সরোজিনী নাইডুর কন্যা। ১৯৪২-এ ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের একজন নেত্রী, পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর ও ভারতীয় রেডক্রসের চেয়ারম্যান ছিলেন।

আর. কে. ধাওয়ান : ইন্দিরা গান্ধির বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত সচিব। ইন্দিরার সময় জারি করা জরুরি অবস্থা চলাকালে তিনি অত্যন্ত ক্ষমতাধর মানুষে পরিণত হন।

ও.এম. মাথাই : (১৯০৯-৮১) প–ত নেহরুর ব্যক্তিগত সচিব। তাঁর দুটি বিতর্কিত গ্রন্থ : রেমিনেসেন্স অব নেহরু এজ (১৯৭৮) এবং মাই ডেজ উইথ নেহরু (১৯৭৯)।

ফিরোজ বরুণ গান্ধি : (জন্ম ১৩ মার্চ ১৯৮০) সঞ্জয় ও মানেকা গান্ধির একমাত্র সমত্মান, লোকসভার সদস্য।

সঞ্জয় বিচারমঞ্চ : সঞ্জয় গান্ধির দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পর মানেকা ও সঞ্জয় সমর্থকদের গঠিত মঞ্চ যা পরে রাজনৈতিক ফোরামে পরিণত হয়।

অরুণ নেহরু : (১৯৪৪-২০১৩) রাজিব-সঞ্জয়ের কাজিন। রাজিব গান্ধির বন্ধু ও পরবর্তীকালে মন্ত্রী।

খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী : Truth love and a little Malice : An Autobiography, Penguin, India

 

মানেকার মামলায় খুশবন্ত ও তাঁর আত্মজীবনী

বন্ধুত্ব খুব দীর্ঘমেয়াদি হয় না। আনন্দ পরিবার এবং গান্ধি (মহাত্মা নন, ইন্দিরা) পরিবারের সঙ্গে খুশবন্ত সিংয়ের খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। তেজিন্দার সিং আনন্দ ইন্দিরা গান্ধির ছোট বউমা মানেকার বাবা। মানেকার মায়ের সঙ্গে খুশবন্ত সিংয়ের বহুদিনের বন্ধুত্ব। আর ইন্দিরা গান্ধি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কটা এমনই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে যে, তিনি সঞ্জয়ের কিছু হঠকারিতায় সায় দেন, ইন্দিরার জরুরি অবস্থা ঘোষণাও অপরিহার্য ছিল বলে সমর্থন করে যান। তিনি হয়ে ওঠেন ‘ইন্দিরাজির চামচা’।

কিন্তু তিনি যখন আত্মজীবনী লিখতে বসলেন, এতটুকুও ছাড় দিলেন না। ভারতবর্ষের সর্বাধিক পঠিত আত্মজীবনী Truth love and a little Malice যখন প্রকাশিত হওয়ার কথা তার আগে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় এ-গ্রন্থটির একাংশ ‘Gandhis and Anands’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এতে মানহানিকর অনেক বিষয় ছিল বলে মানেকার বিশ্বাস। মানহানির মামলা করে তিনি দিলিস্নর আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এলেন : খুশবমেত্মর আত্মজীবনীর প্রকাশনা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত।

ভারতীয় শাশুড়ি-বউমার লড়াইয়ে ইন্দিরা গান্ধি কেমন করে প্রয়াত প্রিয় পুত্রের বিধবা স্ত্রী মানেকাকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১নং সফদরজং রোড থেকে বের করে দিলেন তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা এই অংশে রয়েছে।

মানহানির মামলা এবং আত্মজীবনী প্রকাশে দিলিস্নর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কথা শুনে খুশবন্ত সিং বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি অবশ্যই বিস্মিত হয়েছি। অনেক বছর ধরে মানেকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। মামলা বিচারাধীন বলে এ-সম্পর্কে কিছু কথা বলা সাব-জুডিস হবে বলে তিনি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেন।

তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন আদালতেই মোকাবিলা করবেন।

খুশবমেত্মর আত্মজীবনীর প্রকাশক রবি দয়াল বললেন, ‘এটা তো সাহিত্যকর্ম। ৪২৫ পৃষ্ঠার এ-বইয়ের ছোট্ট একটি অংশে মানেকার উল্লেখ রয়েছে। এর বড় অংশ জুড়ে আছে ভারত ভাগের স্মৃতি, দিলিস্নর গড়ে ওঠা, তাঁর পাকিসত্মানি দিনগুলো, পার্লামেন্টের দিনগুলো, আর সম্পাদকের অভিজ্ঞতার কথা তো রয়েছেই।

খুশবন্ত সিংয়ের আপিল মামলায় তাঁর সঙ্গী রবি দয়াল। ভারতের একটি বিখ্যাত মামলায় সকল জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ‘গোপনীয়তার অধিকার’ স্বীকৃত হয়েছে। সংবাদপত্র কি এ-ধরনের ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিজীবন নিয়ে তদন্ত করে তার গোপনীয়তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারে? আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘না, পারে না।’

খুশবন্ত সিং কি গোপনীয়তার অধিকারে হানা দিয়েছেন?

দেখা যাক আপিল-আদালত কী রায় দিয়েছেন। সেই রায়ের মূল অংশ থেকে উদ্ধৃত :

 

দিলিস্ন হাইকোর্ট

খুশবন্ত সিং ও অপর একজন বনাম মানেকা গান্ধী।

বেঞ্চ : বিচারপতি ডি গুপ্ত এবং সঞ্জয় কিশান কাউল

রায় ঘোষক : বিচারপতি সঞ্জয় কিশান কাউল

১. প্রথম আপিলকারী খুশবন্ত সিং একজন সুপরিচিত লেখক। তিনি তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশ করতে আগ্রহী হলে তা Truth love and a little Malice নামে প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। দ্বিতীয় আপিলকারী বরি দয়াল বইটি প্রকাশ ও বিতরণ করবেন। এই বইয়ের ‘Gandhis and Anands’ শিরোনামের একটি অধ্যায় ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনের ৩১ অক্টোবর ১৯৯৫ সংখ্যা আত্মজীবনীর স্বীকৃত একটি অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এতে লেখক গান্ধি পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং সে-সূত্রে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের বিবরণ দিয়েছেন, তাতে আপিল মামলার বিবাদী ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

২. আপিল মামলার বিবাদী (মূল মামলায় তিনিই বাদ) উল্লেখ করেছেন, তিনি ভারতের সাবেক ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধির পুত্রবধূ এবং প্রয়াত সঞ্জয় গান্ধির বিধবা স্ত্রী। তিনি গ্রন্থকার এবং প্রকাশক ও বিতরণকারীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং ক্ষতিপূরণের মামলা করেছেন, যাতে তাঁর নাম ও পরিবারের প্রতি সম্মান রক্ষেত হয়। তিনিও উল্লেখ করেছেন, ১ নম্বর বাদী নামকরা লেখক ও সাংবাদিক, তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, তিনি অনেক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন, তাদের জন্য অবমাননাকর আত্মজীবনীর তিনিই লেখক। প্রকাশিতব্য আত্মজীবনীতে তিনি যা লিখেছেন তাতে তিনি ক্ষুব্ধ এবং প্রতিকারপ্রার্থী।

৩. এই লেখক ভ্রান্ত, অসত্য, অমর্যাদাকর, মানহানিকর তথ্য ও শব্দ ব্যবহার করা ছাড়াও তিনি উল্লেখ করেছেন :

ক. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শেষদিকে মিসেস গান্ধি মনে করতেন মানেকা তাঁর পরিবারের মর্যাদার সঙ্গে খাপ খাওয়ার মতো নন, নেহরু-গান্ধির মতো একই শ্রেণির নয় এবং ভারতীয় নারীর যে আচরণ হওয়া উচিত, তা তিনি রপ্ত করতে পারেননি।

খ. তিনি (মিসেস গান্ধি) আমাকে (খুশবন্ত সিং) বলেছেন যারা সমবেদনা জানাতে আসেন (সঞ্জয় গান্ধির দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে) তিনি তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন।

গ. তাকে বলা হয়েছে তিনি মনোনিবেশ নষ্ট করিয়ে থাকেন এবং তিনি খাবার টেবিলের আচরণ জানেন না।

ঘ. ‘… সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, তুমি তোমার বাবাকে খুন করেছো (জেনারেল আনন্দ আত্মহত্যা করেছিলেন) আর তোমার মা একটা কুকুরী।’

ঙ. রাজস্থান থেকে মার্বেল পরিবহনের একটি কন্ট্রাক্ট প্রদানের ব্যাপারে জনৈক খোশলার কাছ থেকে মানেকা দেড় লাখ রুপি ঘুষ নিয়েছেন বলে মিসেস গান্ধি অভিযোগ করেছেন।

চ. এবার মানেকা ঠিক করলেন বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময়ও শর্ত তিনিই নির্ধারণ করবেন। কোন তারিখে তাকে সেই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হবে তিনি কয়েক সপ্তাহ আগেই আমাকে জানিয়েছেন।

ছ. মানেকা ও তার মা এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে (মিসেস গান্ধির লন্ডনে অবস্থানকাল) এ-বাড়ি থেকে দলিল-দসত্মাবেজ যা কিছু নেওয়ার সরিয়ে ফেললেন।

জ. মানেকার দিকে আঙুল তুলে তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘তুমি নোংরা খুদে মিথ্যুক, তুমি প্রতারক।’

ঝ. মানেকা ও সঞ্জয়ের বন্ধু আকবর আহমেদের (ডাম্মি) মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন রটে গিয়েছিল।

৪. বিবাদীর আরজিতে আরো বলা হয়, গ্রন্থকারের লেখা তাঁর প্রতি ঘৃণা ও ঠাট্টা-মশকরায় পরিপূর্ণ। তাঁর লেখায় মর্যাদার হানি ঘটেছে, এ লেখা তাঁর সম্মান ও আত্মবিশ্বাসের ওপর আঘাত করেছে, তাঁকে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা দিয়েছে। লেখক তাঁর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করেছে যার গ্যারান্টি ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ প্রদান করেছে। এতে বলা হয়েছে, সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা যাবে না, যে সম্মতি মানেকা কিংবা তার মা কখনো গ্রন্থকারকে দেননি।

৫. গ্রন্থকার প–ত জওহরলাল নেহরুর ব্যক্তিগত সচিব এম.ও. মাথাইর গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তার জন্য অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন, মাথাইর গ্রন্থ কোনো দলিল-দসত্মাবেজের ওপর ভিত্তি করে রচিত নয়।

৬. মূল মামলার বাদী এই মামলার প্রতিবাদী মানেকা গান্ধি খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী প্রকাশ, প্রচার ও বিক্রয় রোধ করতে, তার বা তার পরিবার-সংক্রান্ত এই গ্রন্থের কোনো অংশ যে কোনোভাবে উৎকলিত করে কোনোভাবে প্রকাশ করাবে না। (যেমন করা হয়েছে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায়) প্রকাশ থেকে বিরত রাখার আদেশ চেয়ে এবং পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করলে তখন জজ কেবল বাদীর শুনানি গ্রহণ করে তার প্রার্থনা অনুযায়ী আত্মজীবনী প্রকাশনার ওপর ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯৫ স্থগিতাদেশ প্রদান করেন।

আপিলকারী জানান, তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে কোনোরকম মানহানিমূলক অধ্যায় রচনা করেননি। মানেকা গান্ধি সম্পর্কে যা লিখেছেন তার সবই সত্য। তিনি তাকে তার পরিবারেরই একজন কনিষ্ঠ সদস্য মনে করে বিভিন্ন সময় উপদেশ দিয়েছেন, সমর্থন করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ ও অন্যায় আক্রমণের সময় প্রতিবাদ করেছেন। মানেকা যখন তার ম্যাগাজিন সূর্য সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনিই তাকে সহায়তা করেছেন। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পক্ষে আপিলকারী বলেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো জনগুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদের গ্যারান্টি অনুসারে ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যান্ড এক্সপ্রেশন’ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশে নেতানেত্রী এবং যে-কোনো ‘পাবলিক ফিগার’ সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে গোপনীয়তার যে-অধিকার দেওয়া হয়েছে জনস্বার্থ তাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। যেসব বিষয় নিয়ে মানেকা গান্ধি মামলা করে খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী প্রকাশ স্থগিত করিয়েছেন, সেসব তথ্য বহুদিন ধরেই ‘পাবলিক ডোমেইনে’ রয়েছে। এসব বিষয় পুপুল জয়কারের ইন্দিরা গান্ধি এবং ভেদ মেহতার রাজিব গান্ধি গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। আত্মজীবনীর অধ্যায় যখন ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত হয় মানেকা গান্ধি কোনো প্রতিবাদ করেননি। তার নীরবতার অর্থ তিনি লিখিত ও প্রকাশিত বিষয় মেনে নিয়েছেন। তিনি এ-বিষয়ে লেখককেও কিছু বলেননি। এম.ও. মাথাইয়ের সূত্রে মানেকা গান্ধি যে-অভিযোগ করেছেন, খুশবন্ত সিং নিজেও মাথাইর নিন্দা করে হিন্দুসত্মান টাইমসে নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তারই একটি অংশ :

‘মাথাইর শরীর থেকে যখন নেহরু পালক সরিয়ে নেওয়া হলো (তিনি নেহরুর ব্যক্তিগত সচিবের পদ থেকে চাকরিচ্যুত হলেন) তিনি হীনমনের পরিচয় প্রকাশ করলেন এবং তার ওপর নেহরু পরিবারের অর্পিত আস্থার অসম্মান করলেন। নেহরু অত্যন্ত উদার মানুষ হিসেবে তাকে ক্ষমা করে ফিরিয়ে নিতে প্রস্ত্তত ছিলেন। যখন এ-প্রসত্মাব মাথাইকে দেওয়া হলে মাথাই ক্ষুব্ধ স্বরে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘কেবল কুকুরই তার বমি গিলতে ফিরে যায়।’ চাকরি হারানোর আঠারো বছর পর নেহরু যখন মৃত, ইন্দিরা গান্ধি যখন ক্ষমতাচ্যুত, মাথাই এমন নিরাপদ সময় বেছে নিয়ে যে-পরিবারের তিনি নুন খেয়েছেন সে-পরিবারের বিরুদ্ধে বিষ উগড়ালেন।’

(মাথাই তাঁর বইয়ে নেহরুর বিবিধ যৌন সম্পর্ক, কথিত অবৈধ পিতৃত্ব, ইন্দিরার সঙ্গে তার সম্পর্ক, ইত্যাদি বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় উত্থাপন করেন।)

৭. আত্মজীবনীর প্রকাশক দুনম্বর আপিলকারী এমনই ধরনের বক্তব্য দেন এবং সাক্ষ্য হিসেবে পুপুল জয়কার এবং ভেদ মেহতার বই আদালতে উপস্থাপন করেন।

আপিলকারী খুশবন্ত সিং ও তাঁর প্রকাশকের পক্ষে মামলায় ওকালতি করেন সিনিয়র আইনজীবী শিখ সুন্দরম আর মানেকা গান্ধির পক্ষে আইনজীবী রাজ পানজোয়ানি। সুন্দরম বলেন, বই তো এখনো প্রকাশিত হয়নি, প্রকাশের আগে নিষেধাজ্ঞা হওয়ার সুযোগ নেই। অধিকন্তু মানেকা গান্ধি বা তাঁর পরিবারের জন্য মানহানিকর কিছু লিখেননি। সুন্দরম বহু মামলা ও রায়ের সূত্র টেনে বলেছেন, প্রকাশিত  হওয়ার আগেই প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা কোনো আইনই রাষ্ট্রকে দেয়নি। একাধিক মামলার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন Those who kill public positions must not be too thin-skired in reference to comments made up on them – রাষ্ট্রীয় অবস্থানে যারা যান তাদের নিয়ে করা মন্তব্যের ব্যাপারে তাদের এত পাতলা চামড়ার হলে চলে না। অস্কার ওয়াইল্ড থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারকরা উল্লেখ করেছেন : ‘নৈতিক বই বা অনৈতিক বই বলে কিছু নেই। বই হয় সুলিখিত, না হয় বাজেভাবে লিখিত।’ আর পাঠক ছাড়া আর কেই-বা তা নির্ধারণ করবে।

 

রায়ের শেষ অংশে উল্লেখ করা হয় :

প্রসত্মাবিত আত্মজীবনীর সত্যায়িত অংশ ৩১ অক্টোবর ১৯৯৫ ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কেবল একপক্ষকে শুনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং পরে তা দূরীকরণ করা হয়। প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেছে বইটি ইন্ডিয়া টুডের ১৯৯৫-এর অক্টোবর সংস্করণের পরপরই প্রকাশিত হতে পারত। আপিলকারীকে তার চিমত্মাভাবনা, মতামত, তার ব্যক্তিগত মিথস্ক্রিয়া, জীবন নিয়ে আত্মজীবনীতে তার ভাবনা থেকে প্রায় ছয় বছর বারিত করা হয়েছে। আমাদের সুচিমিত্মত মতামত হচ্ছে, এ-অবস্থা চলতে দেওয়া ঠিক হবে না। বিবেচনায় ভারসাম্য নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন না করার পক্ষে। ছয় বছরে পর্যাপ্ত ক্ষতি হয়ে গেছে। অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা উচিত।

৮. আপিল গৃহীত হলো, ১৯ এপ্রিল ১৯৯৭ একক জাজের দেওয়া আদেশ বাতিল করা হলো। আপিলকারী Truth love and a little Malice স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবেন। ক্ষতিপূরণের বিষয় বিচারে নিষ্পত্তি হবে। উভয়পক্ষই নিজ-নিজ ক্ষতি হলফনামাসহ দাখিল করতে পারবে।

আপিলকারী মামলার খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা পাবেন।

শিগগিরই খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী প্রকাশিত হলো। দীর্ঘদিন এ-বইটি ভারতের বেস্ট সেলার্স লিস্টে ছিল। প্রথম কমাসের রয়্যালটি হিসেবে খুশবন্ত সিং পেলেন পঁচিশ লাখ রুপিরও বেশি। এটিও উপমহাদেশের জন্য রেকর্ড।