মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। একটু এপাশ-ওপাশ করি, তারপর আবার ঘুমিয়ে যাই। চৌকিতে বাবার সঙ্গে ঘুমাই। মেঝেতে মা আর অন্য চার ভাই-বোন। আমি বড় ছেলে। বাবা খুব ভালোবাসেন আমাকে। আমিও বাবা ছাড়া কিচ্ছু বুঝি না। ক্লাস সেভেনে পড়া ছেলেটি এখনো পারলে বাবার কোলে চড়ে। বাবাও পারলে তাকে কোলে নেন। সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় বাবা একবার আমার মাথায় হাত রাখবেনই। রাতে বাবার ফিরতে দেরি হলে আমি গিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মা এজন্য প্রায়ই রাগ করেন। বাবার জন্য এতো আহ্লাদ ভালো না! বাবাকেও বলেন এই ধরনের কথা। বাবা-আমি কেউ গা করি না।

আজ রাতে ঘুম ভেঙে অদ্ভুত একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। বাবা বিছানায় বসে আছেন। জানালা দিয়ে চাঁদের এক টুকরো আলো এসে পড়েছে ঠিক তাঁর মুখে। সেই আলোয় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি বাবা নিঃশব্দে কাঁদছেন। চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে। দেখে আমার বুকটা হু-হু করে উঠল।

বাবা এভাবে কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে?

মা আর অন্য ভাই-বোনরা গভীর ঘুমে। খানিক বাবার কান্না দেখে উঠে বসতে চাইলাম। বাবা টের পেয়ে গেলেন। এক হাতে চোখ মুছতে মুছতে অন্য হাত রাখলেন আমার ঠোঁটে। বুঝলাম, বাবা চাইছেন আমি যেন শব্দ না করি।

বাবা তারপর শুয়ে পড়লেন। আমার মাথায়-পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিস করে বললেন, ঘুমাও বাবা। কাল তোমার সঙ্গে কথা বলবো।

আমি ঘুমাবার চেষ্টা করলাম। ঘুম হলো না। টের পেলাম বাবাও ঘুমাচ্ছেন না। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। বোধহয় নিঃশব্দে কাঁদছেনও।

পরদিন অফিসে যাওয়ার সময় বাবা আমাকে চুপিচুপি বললেন, সন্ধ্যা ছ’টার দিকে বটতলার ওখানে থাকিস। কাউকে কিছু বলিস না।

আমি মাথা নাড়লাম।

বাবার মুখটা শুকনো। চোখে দিশেহারা, চিন্তিত দৃষ্টি। পনেরো ভাড়াটের বস্তির চেয়ে সামান্য উন্নত বাড়ির গেটের দিকে এমন অসহায় ভঙ্গিতে হেঁটে গেলেন, দেখে আমার বুক তোলপাড় করতে লাগল। স্কুলে গেলাম ঠিকই কিন্তু মন কোথাও বসল না। না ক্লাস ভালো লাগল, না বন্ধুদের সঙ্গ। শুধু মনে হয় কখন ছ’টা বাজবে। কখন আমি গিয়ে দাঁড়াব বটতলার সামনে। কখন বাবা আসবেন! কী হয়েছে বাবার? রাতে ওভাবে কাঁদছিলেন কেন?

যতবার বাবার কান্নার দৃশ্যটা দেখি ততবারই কান্না পায়। এমন অসহায়, নিঃশব্দ করুণ কান্না কেন কাঁদলেন আমার বাবা? অন্য কাউকে কেন বুঝতেও দিতে চাইলেন না? কী হয়েছে?

স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরতে চারটা বাজে। ভাত খেয়ে চলে যাই মাঠের দিকে। পাড়ার ছেলেরা, স্কুলের বন্ধুরা ফুটবল খেলে মাঠে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়। শীত চলে গেছে। গরম এখনো তেমন পড়েনি। আবহাওয়া ভালো।

আমি খেলাধুলা তেমন পারি না। তবু ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করি বন্ধুদের সঙ্গে। আজ তাও করি না। মাঠের ধারে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। কেউ কেউ খেলতে ডাকল। গেলাম না। কাল রাতের দৃশ্যটা ভুলতেই পারছি না। বাবা কেন অমন করে কাঁদছিলেন? যতবার কথাটা ভাবি ততবারই বাবার করুণ মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বুক তোলপাড় করে।

কাঠেরপুলের পুব পাশটায় বিশাল বটগাছ। বটতলায় একটা পান বিড়ি সিগ্রেটের দোকান। সঙ্গে চা-শিঙাড়াও বিক্রি হয়। সেই দোকানটার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সন্ধ্যা হয়ে আসে। বাবা আসেন না। আমি দাঁড়িয়েই থাকি। ধীরে ধীরে দোকানপাটে জ্বলে ওঠে আলো। রাস্তায় জ্বলে ওঠে। বাবা আসেন না। আমি অপেক্ষায় থাকি। বুকের ভেতরটা কেমন করে! এমন কী কথা আমাকে বলবেন বাবা, যে-কথা বাসায় বলা যাবে না! অন্য কারো সামনে বলা যাবে না!

বাবা এলেন অনেকটা দেরি করে। কাঠেরপুল পেরিয়ে এলেন ক্লান্ত বিপর্যস্ত মানুষের ভঙ্গিতে। হাঁটাচলায় গভীর অসহায়ত্ব। পরনে ময়লা জীর্ণ পায়জামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি। কনুই পর্যন্ত হাতা গোটানো। কাছাকাছি আসার পর দেখি মুখটা শুকিয়ে এই এতটুকু হয়ে গেছে। বোধহয় সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। আমাকে দেখে ম্লান হাসলেন। এসেছো বাবা?

অনেকক্ষণ আগেই এসেছি। তুমি এতো দেরি করলে কেন? মুখটা এতো শুকনো কেন? দুপুরের ভাত খাওনি?

প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন বাবা। তোমরা কী দিয়ে খেলে? সকালবেলা তো আজ বাজার করিনি!

জানি। আমরা খিচুড়ি খেয়েছি।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, কী হয়েছে বাবা?

সে-কথা বলার জন্যই তোমাকে এখানে আসতে বলেছি। সারাদিন অনেক হাঁটাহাঁটি করেছি। পা দুটো ভেঙে আসছে। চলো ওদিকটায় বসি। বসে কথা বলি।

বটগাছটার পিছনে মাঠ। তারপর তিনটা সরকারি গুদাম। বিশাল লম্বা লম্বা ঘর। এখন একদম নীরব। কেউ নেই। বাবা আমাকে নিয়ে সেখানটায় এলেন। খোলা মাঠে হাত-পা ছড়িয়ে বসলেন। বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল তাঁর। সেই দীর্ঘশ্বাস আমার একেবারে বুকে এসে লাগল।

কী হয়েছে, বাবা?

বাবা কথা বললেন না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

বাবার কান্না দেখে প্রথমে আমি একটু থতমত খেলাম। তারপর নিজেও কাঁদতে লাগলাম। বাবাকে আমি কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। কাল রাতে প্রথম দেখলাম। নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। আজ দেখছি প্রকাশ্যে। বাবার কান্না সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কাল রাতের কান্না দেখে একটা মিনিটও ঘুমাতে পারিনি। সারাটা দিন তাঁর নিঃশব্দ করুণ কান্নার কথা ভেবে বারবারই চোখে পানি এসেছে। আর এখন আমার সামনে বসে শিশুর মতো এভাবে কাঁদছেন, এই কান্না কেমন করে সহ্য করব? কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। কী হয়েছে বলো আমাকে। এভাবে কাঁদছো কেন?

এক হাতে চোখ মুছতে মুছতে অন্য হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন বাবা। জড়ানো গলায় কোনো রকমে বললেন, দু-মাস ধরে বেতন বন্ধ। আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।

শুনে আঁতকে উঠলাম। ‘সাসপেন্ড’ ব্যাপারটা আমি বুঝি। বাবার মুখেই শুনেছি। অস্থির গলায় বললাম, কী বলছো, বাবা? সাসপেন্ড করেছে তোমাকে?

বাবা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ। অফিসের কিছু টাকা থাকতো আমার কাছে। সেই টাকা থেকে সাতশো টাকা সংসারের জন্য খরচ করেছিলাম গত কয়েক মাসে। সময় মতো টাকাটা জমা দিতে পারিনি। অফিস এইসব ব্যাপার অনেক বড় করে দেখে। জানাজানি হওয়ার পর সাসপেন্ড করে দিয়েছে।

বাবা আবার কাঁদতে লাগলেন। সাড়ে তিনশো টাকা বেতন পেতাম। পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে, বাসা ভাড়া দিয়ে কিছুতেই চলতে পারি না। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ধার-উধার করে, এদিক-ওদিক করে কত কষ্ট করে যে চলি! তারপরও চাকরিটা ছিল, কোনো রকমে চলতে পারছিলাম। দু-মাস হলো চাকরিই নেই। ধার-কর্জ করতে করতে ডুবে গেছি। বাসা ভাড়া বাকি পড়েছে। যখন-তখন বাড়িঅলা বাসা ছাড়তে বলবে। এখন আর একটা টাকাও ধার পাই না। আজ সারাটা দিন কত জায়গায় যে গেলাম! কতজনের কাছে যে হাত পাতলাম! আট আনা পয়সাও কেউ দিলো না।

বাবা আবার কাঁদতে লাগলেন। কাল-পরশু থেকে না-খেয়ে থাকতে হবে। রেশন তোলার টাকা নেই, বাজার করার টাকা নেই। আমার ছেলেমেয়েরা না খেয়ে থাকবে! বুঝতে পারছি না এই অবস্থায় কী করব? কার কাছে যাবো? কোথায় দুটো টাকা পাবো?

আমি ততোক্ষণে এতোটাই দিশেহারা হয়েছি, কখন কান্না থেমে গেছে বুঝতেই পারিনি। কী হবে এখন আমাদের? কীভাবে সংসার চলবে? রেশন বাজার বাসাভাড়া! আমাদের স্কুলের বেতন! বাসা ছেড়ে দিতে হলে কোথায় যাবো? খাবো কী?

পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে সবার। মাথায় যেন সত্যিকার অর্থেই আকাশ ভেঙে পড়ল। এমন কোনো আত্মীয়স্বজন নেই আমাদের যাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো যাবে। মা-বাবা দুজনই পৈতৃকসূত্রে জমিজমা ভিটেমাটি যেটুকু পেয়েছিলেন বহু আগে সেইসব বিক্রি হয়ে গিয়েছে। এখন নেই কিছুই। বাবার দুজন সৎভাই আছে, তাদের অবস্থাও খারাপ। একটা বোন আছে, হতদরিদ্র স্বামীর ঘর করছে। মায়ের কোনো ভাই নেই। এক বোন আছে, তাঁর অবস্থাও ভালো নয়। অর্থাৎ চারপাশে একজনও এমন মানুষ নেই যে আমাদের পাশে দুটো টাকা নিয়ে দাঁড়াতে পারে।

এখন কী হবে? কেমন করে বাঁচবো আমরা?

বাবা তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তোর মাকে কিছুই জানতে দিইনি। আমার চিন্তিত মুখ দেখে নানাভাবে জানতে চেয়েছে, কী হয়েছে? আবোলতাবোল বুঝ দিয়েছি। সে জানলে একদমই ভেঙে পড়বে। ছোট ছেলেমেয়েগুলো ঘাবড়ে যাবে। এজন্য তাকে কিছুই বুঝতে দিইনি। তোর কাছেও লুকিয়ে গেছি। কাল রাতে আমার কান্না না দেখলে আজো হয়তো বলতাম না। তবে না বলেও পারছিলাম না। হয় তোর মাকে আর নয়তো তোকে বলতেই হতো। তুই আমার বড় সন্তান। ক্লাস সেভেনে পড়ছিস। এই অবস্থায় কী করবো রে, বাবা? আমি তো কোনো পথ দেখছি না। হয়তো চাকরিটা আর ফিরেই পাবো না। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা প্রায় পুরোটাই লোন হিসেবে নিয়ে রেখেছি। অল্প কিছু পাওনা আছে। সেই টাকা আটকে রাখা হয়েছে। চাকরি পুরোপুরি চলে গেলে গ্র্যাচুইটির টাকা পাবো কিছু। সেসব বহুদূরের ব্যাপার। তার আগেই সবাইকে নিয়ে না-খেয়ে মরতে হবে।

আমার বয়স তেরো বছর। এই বয়সী ছেলে সংসারের এরকম পরিস্থিতিতে কী বলতে পারে? কোন পরামর্শ দিতে পারে বাবাকে? তবে এটুকু আমি বুঝলাম, মাকে না বলে ভালোই করেছেন বাবা। মা ভেঙে পড়লে সব ভেঙে পড়বে। কোনোরকমে বললাম, কাউকে ধরে সমস্যাটা মিটাতে পারলে না?

গত দু-মাস ধরে সেই চেষ্টা রোজই করছি। ব্যাপারটা যাঁর হাতে তাঁর নাম মোহাম্মদ আলী। ঢাকাইয়া লোক। শিক্ষিত আর ক্ষমতাবান। তবে খুবই কঠিন ধরনের। বহু চেষ্টা করেছি। তাঁর রুমেই আমাকে ঢুকতে দেন না। বাড়িতে গিয়েছি কয়েকবার। সেখানেও ঢুকতে দেননি। হাত-পা ধরে যে মাফ চাইব সেই সুযোগ দিচ্ছেন না। অন্য জায়গায় চাকরির চেষ্টা করছি। রোজই এই অফিস ওই অফিসে যাচ্ছি। পরিচিতজনদের ধরাধরি করছি। চাকরির বাজার খুবই খারাপ। আমি ম্যাট্রিক পাশ মানুষ। কেরানির চাকরি করতাম। এই চাকরির বাজারে হাজার হাজার লোক লাইন দিয়ে আছে। মুরব্বি না থাকলে চাকরি হয় না। আমার হয়েছিল ভাগ্যক্রমে। সত্তর টাকা বেতনে ঢুকেছিলাম। দিনে দিনে সাড়ে তিনশো হয়েছিল। উনিশ বছর ধরে চাকরিটা করছিলাম। তোর মায়ের সঙ্গে বিয়ের পাঁচ বছর আগে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন দূরসম্পর্কের এক চাচা। সেই চাকরি সাতশো টাকার জন্য গেল! আর যে কারণে সাসপেন্ড করা হয়েছে, ওসব শুনলে কোথাও আমার চাকরি হবে না।

আমি মাথায় হাত দিয়ে অসহায় বাবার পাশে বসে আছি। একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। কী হবে এখন? সাতজন মানুষ আমরা বাঁচবো কেমন করে?

বাবা বললেন, ডিআইটি প্লটের ওদিককার এক মুদিদোকানদার আমার খুবই পরিচিত। গত দু-মাসে তার কাছ থেকে চারশো তিরিশ টাকার বাজারসদাই এনেছি। চাল-আটা সবই এনেছি। ওই রাস্তা দিয়ে এখন হাঁটতে পারি না। যখন-তখন ধরবে। কবে বাসায় এসে ওঠে টাকার জন্য সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকি। কোনো পথ দেখছি না বাবা। কী করব? রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

দুই

পরদিন থেকে সত্যি সত্যি বাবা আর আমি ভিক্ষা করতে শুরু করলাম। ভিক্ষাটা একটু অন্যরকম। বাবা করেন দিনের বেলা, আমি তাঁর সঙ্গে যুক্ত হই স্কুল শেষ করে। বিকেল থেকে অনেকটা রাত পর্যন্ত। মা-ভাইবোনদের ম্যানেজ করলাম বাপ-ছেলে বুদ্ধি খাটিয়ে।

বাবা সকালবেলা অফিসে যাওয়ার মতো করে বাসা থেকে বেরোন। তারপর সদরঘাট পটুয়াটুলি শাঁখারিবাজার ইসলামপুর বাদামতলি আরমানিটোলা চকবাজার ওইসব দিকে চলে যান। পরনে জীর্ণ পায়জামা-পাঞ্জাবি। মুখটা করুণ অসহায়। পায়ের স্যান্ডেল ছেঁড়ার পথে। বাবার কথার ধরন সব সময়ই নম্র-ভদ্র-বিনয়ী। ভাষা সুন্দর। কথা বললে লোকে বুঝতে পারে, মানুষটা লেখাপড়া জানা। ভদ্র চেহারার পথচারীদের কাছে বাবা হাত পাতেন। সত্য কথাই বলেন। সংসারের কথা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কথা। চাকরির কথা। কখনো কখনো ইংরেজিও বলেন। আই য়্যাম নট এ বেগার। দিস অ্যান্ড দিস।

প্লিজ হেল্প মি।

বেশির ভাগ লোকই এসব কথায় গলে না। কেউ নিঃশব্দে চলে যায়। কেউ ধমক দেয়, দুর্ব্যবহার করে। আবার দয়ালু কেউ কেউ দু-পয়সা এক আনা দেয়। দু-আনা চার-আনাও দেয়।

একেকদিন একেক এলাকায় যান বাবা। বংশাল পাকিস্তান মাঠ ফুলবাড়িয়া স্টেশন গুলিস্তান। ডিআইটি বিল্ডিংয়ের ওদিক দিয়ে মতিঝিল ঘুরে এসে রামকৃষ্ণ মিশন রোড, গোপীবাগ ওয়ারী। দুপুরবেলা ছ-আনা খরচা করে দুটো পরোটা আর ভাজি খেয়ে আবার পথে নামেন। আমার সঙ্গে বাবার দেখা হয় সাড়ে পাঁচটা-ছ’টার দিকে। তখন শুরু হয় ভিক্ষার দ্বিতীয় পর্ব।

স্কুল থেকে বাসায় ফিরে কোনো রকমে খেয়েই বইখাতা নিয়ে আমি বেরিয়ে যাই। প্রথম দিন মা জিজ্ঞেস করলেন, এই সময় না তুই মাঠে খেলতে যাস! আজ বইখাতা নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?

এই প্রশ্নের জবাব আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। অর্থাৎ বাবা আর আমি পরামর্শ করেই ঠিক করেছি। ফজলু স্যারের বাসায় যাচ্ছি মা। স্যার বলেছেন ছুটির পর এখন থেকে তিনি আমাকে প্রাইভেট পড়াবেন।

বলিস কী? প্রাইভেট পড়ার টাকা দিবি কোত্থেকে?

টাকা দিতে হবে না। স্যার আমাকে খুবই ভালোবাসেন। মাগনা পড়াবেন।

তাহলে তো ভালোই।

মা আর কিছু সন্দেহ করলেন না। ছোট ভাইবোনদের তো সন্দেহের কোনো কারণ নেই।

বাবার জন্য একেকদিন একেক জায়গায় অপেক্ষা করি। আগের দিনই দুজনে পরামর্শ করে রাখি কাল কোথায় অপেক্ষা করবো। পাড়ার একটা মুদিদোকানদার আছে পরিচিত। স্কুলের বইখাতা সেই দোকানে রেখে জায়গামতো চলে যাই। বাবা তাঁর ভাঙাচোরা, অসহায় মুখ নিয়ে ফিরে আসেন। আমরা চলে যাই ফরিদাবাদ পোস্তগোলা যাত্রাবাড়ী ওইসব এলাকায়। সারাদিন একা একা ভিক্ষা করেছেন বাবা। তখন বলেছেন একরকম কথা। আমি যুক্ত হওয়ার পর আমাকে দেখিয়ে ভদ্রগোছের পথচারীদের ধরেন। ছেলেটার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারি না। চাকরি নেই। আমাদের সাহায্য করুন। যা পারেন দিন ভাই।

আমি অসহায় করুণ মুখ করে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। কী যে খারাপ লাগে! গভীর কষ্টে বুকটা ফেটে যেতে চায়। কান্না পায় খুব যখন কেউ ধমক দেয় বা গালাগাল করে। টাউটারির জায়গা পান না মিয়া। যান ভাগেন। খুবই অপমান বোধ করি। বাবা আমার হিরো। বাবার সবকিছুই আমার পছন্দ। বড় হয়ে আমি বাবার মতো হবো – সব সময় এমন ভেবে এসেছি। আমার সেই হিরো আজ ভিখিরি। সত্যি সত্যি ভিক্ষা করছে। সঙ্গে আমিও আছি।

প্রথম কয়েকদিন খুবই খারাপ লেগেছে। তারপর দেখি মানুষের অবহেলা গালাগাল ধমকাধমকি খারাপ লাগছে না। ধীরে ধীরে যেন স্বাভাবিক হয়ে আসছে সব। তবে রাস্তাঘাটের সব মানুষ খারাপ না। ভালো মানুষও অনেক। সেইসব ভালো মানুষ বাবার কথা দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে শোনেন। দু-চার আনা পয়সা দেন। ফরাশগঞ্জের ওদিকে এক ভদ্রলোক একদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা পুরো টাকা দিয়ে দিলেন। বাবার হাতে দিলেন না। দিলেন আমার হাতে।

রোজগার খারাপ হয় না।

প্রথম দিন আমরা পেয়েছিলাম এগারো টাকা। সবই

খুচরা-খাচরা। বাবার পাঞ্জাবির পকেট ভারি হয়ে গেছে। হাঁটতে গেলে ঝনঝন শব্দ হয়। শব্দ বাঁচাবার জন্য আমার হাফপ্যান্টের পকেটেও রাখি কিছু। তার অবশ্য অন্য একটা কারণও আছে। পকেটে পয়সা ঝনঝন করতে দেখলে লোকে আর ভিক্ষা দেবে না। ভাববে আমরা বাপ-ছেলে ভাওতাবাজি করছি। মারধর খাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিতে পারে।

দিনে দিনে পনেরো-বিশ টাকা পর্যন্ত রোজগার হতে লাগল আমাদের। এতো খুচরা নিয়ে তো বাসায় আসা যায় না! মা কী না কী সন্দেহ করেন। এজন্য সেই মুদিদোকানির সাহায্য নিতে হলো। মুদিদোকানে খুচরা পয়সা লাগে অনেক। খুচরা পেলে তারা খুশি হয়। দোকানিকে খুচরা দিয়ে আমরা নোট নিয়ে আসি। বাসায় বাবার একটা ছেঁড়া চামড়ার ব্যাগ আছে। ব্যাগভর্তি দরকারি-অদরকারি অনেক কাগজ। সেই ব্যাগে আমরা কেউ কখনো হাত দিই না। মাও দেন না। বাবার নিষেধ আছে। রাতের বেলা বাসায় এসে এক ফাঁকে নোটগুলো বাবা সেই ব্যাগে লুকিয়ে রাখেন। ওখান থেকে সকালবেলা এক-দু টাকা বের করে বাজার করে আনেন। সপ্তাহের রেশন তুলতে পাঠান আমাকে। এই করে করে মাসখানেক কাটল। মাসের শুরুতে এক মাসের বাসা ভাড়াও বাবা দিয়ে ফেললেন। আমাকে একদিন বললেন, বেতনের চেয়ে বেশিই হয়েছে। বলে একটু হাসলেন। কী যে বেদনার হাসি!

রোজ রাতেই খুচরা এতো এতো পয়সা মুদিদোকান থেকে নোট বানিয়ে আনছি আমরা। দোকানি একদিন সন্দেহ করল। আব্বাকে জিজ্ঞেস করল, ও মিয়া, ডেলি এতো রেজগি আনেন কই থিকা? এতো পদের রেজগি তো ফকির-ফাকরাগো কাছে থাকে! ভিক্কা করেননি?

কথাটা আমরা গায়ে মাখলাম না। যেন শুনতে পাইনি।

বাবা একদিন বললেন, এবার ডিআইটি প্লটের মুদিদোকানদারের টাকাটা আস্তে আস্তে শোধ করে দেব। কবে রাস্তাঘাটে ধরবে, আর নয়তো বাসায় এসে উঠবে!

যেদিন বাবা এই নিয়ে কথা বললেন, তার ঠিক তিনদিন পর রাত নয়টার দিকে সেই মুদিদোকানদারের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। সঙ্গে আমি আছি। মুদিদোকানদার নিজে ধরল না, ধরল শাজাহান গুণ্ডা। সে বসে আড্ডা দিচ্ছিল দোকানির সঙ্গে। শাজাহানদের বাড়ি ওই পাড়াতেই। স্থানীয় প্রভাবশালী ঘরের ছেলে। আমাদের স্কুলে ওল্ড টেনে পড়ে। এবার এসএসসি দেবে। টেনের ছেলেদের তুলনায় বয়স বেশি। ফুকফুক করে সিগ্রেট টানে। এলাকার গুণ্ডা হিসেবে নামডাক হয়েছে। লোকে খুবই খাতির-তোয়াজ করে তাকে। দোকানি নিশ্চয় আগেই শাজাহানকে বাবার কাছে পাওনা টাকার কথা বলেছিল। শাজাহানকে নিয়ে বাসায় এসে হানা দেওয়ার প্ল্যান হয়তো করেছিল। তার আগেই খাপে খাপে মিলে গেল। শাজাহানদের এলাকাতেই, মুদিদোকানটার গলির ভিতরই বাবাকে শাজাহান ধরে ফেলল। সে তো আর বাবাকে চেনে না! বাবা সেদিন বেশ আনমনা। জুরাইন কবরস্থানের ওদিক দিয়ে এসে ডিআইটি প্লটের গলিটা ধরেছিলেন আমাকে নিয়ে। এখানেই যে ওই দোকান, কেন যে বাবা ভুলে গিয়েছিলেন!

দূর থেকেই বাবাকে দেখতে পেয়েছিল দোকানি। দেখেই লাফ দিয়ে দোকান থেকে বেরোল। চিৎকার করে শাজাহানকে বলল, ওই যে, ওই যে শালায়। ধরেন শাজাহান ভাই, ধরেন।

বুঝতে পেরে বাবা দৌড় দিতে চাইলেন। পারলেন না। তার আগেই শাজাহান এসে তাঁর কলার চেপে ধরল। আমি গেছি হতভম্ব হয়ে। তবে মুহূর্তের জন্য। তারপরই বাবা আর শাজাহানের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। তাকে আমি চিনি। স্কুলের বড়ভাই। অন্যদিকে নামকরা গুণ্ডা। কাতর গলায় বললাম, শাজাহান ভাই, শাজাহান ভাই। আমার বাবা, আমার বাবা।

শাজাহান থতমত খেল। বাবার কলার ছেড়ে অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকাল। আবে তরে তো চিনা চিনা লাগে! আমগো ইস্কুলে পড়ছ? নাম কী তর?

আমার নাম রঞ্জু। ক্লাস সেভেনে পড়ি। আপনি আমাকে দেখেছেন। আমার বাবার চাকরি নেই। আমরা খুব কষ্টে আছি। বাবা চেষ্টা করছেন। টাকা পেলেই দোকানের টাকাটা শোধ করে দেবেন।

মুদিদোকানদার লাফ দিয়ে সামনে এলো। অশ্লীল একটা গাল দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল বাবার ওপর। শাজাহান ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তো থামলোই, একেবারে যেন কেঁচো হয়ে গেল।

শাজাহান শান্ত কঠিন গলায় বলল, আমি কথা কইবার লাগছি, তুমি সামনে আইলা ক্যালা?

দোকানি কাঁচুমাঁচু গলায় বলল, ভুল হইয়া গেছে ভাই। মাপ কইরা দেন।

যাও দোকানে গিয়া বহ। আমি দেখতাছি।

শাজাহান একেবারেই অন্য মানুষ তখন। যেন কোনো মন্ত্র মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে তাকে। আমার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে তাকাল বাবার দিকে। লজ্জায়-অপমানে বাবা মুখ নিচু করে ফেলেছেন। ছেলের সামনে কেউ তাঁর কলার চেপে ধরেছে, আরেকজন তেড়ে এসেছে মারতে, অশ্লীল গালাগাল করেছে! কত বড় অপমান! একদিকে ছেলেকে নিয়ে ভিক্ষা করে প্রতি মুহূর্তে অপমানিত হচ্ছেন, অন্যদিকে এই অবস্থা।

কিন্তু শাজাহান এভাবে বদলে গেল কেন কে জানে! হয়তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লেগেছে। আমার মুখটা নাকি মায়াবী। এই মুখের দিকে তাকালে নাকি মানুষের খুব মায়া হয়। কথাটা বলেছিলেন নজরুল স্যার। ক্লাসে সবাই মিলে খুবই দুষ্টুমি করছিলাম একদিন। স্যার বেত নিয়ে এলেন মারতে। কাউকে কাউকে দু-চারটা বাড়িও দিলেন। আমার সামনে এসে মারতে ভুলে গেলেন। শাজাহানের মতোই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বাড়ি মারতে পারলেন না। মুহূর্তে বদলে গেলেন। স্নিগ্ধ গলায় বললেন, তোর মুখটা খুবই মায়াবী রে। দেখে মায়া লাগছে। এজন্য মারলাম না। তবে দুষ্টুমি করিস না বাবা।

শাজাহানের গলাও নজরুল স্যারের মতো হয়ে গেল। আমাকে না, বাবাকে খুবই আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করল, চাচা, আপনে চাকরি করতেন কই?

মিউনিসিপ্যালিটিতে।

মিন্সিপালটিতে? আরে ওহেনে তো আমার চাচায় বি কাম করে। মোহাম্মদ আলী ছাব। চিনেন নি? কলতাবাজার থাকে।

চমকে শাজাহানের মুখের দিকে তাকালেন বাবা। মোহাম্মদ আলী সাহেবের আন্ডারেই চাকরি করতাম। তাঁর হাতেই আমার চাকরি। তিনিই আমাকে সাসপেন্ড করেছেন।

কন কী?

হ্যাঁ বাবা।

ক্যালা, সাসপেন করল ক্যালা?

সংক্ষেপে ঘটনা বললেন বাবা। শুনে শাজাহান তাজ্জব হয়ে গেল। এইডা কোনো কথানি? ছাতছো টেকার লেইগা সাসপেন কইরা দিব! আমার চাচার রাগ বেছি। আপনা চাচা না। আব্বার জ্যাঠাতো ভাই। তয় বহুত আদর করে আমারে। আপনে একটা কাম করেন। রবিবার দোফর তরি বাইতেই থাকে চাচায়। বিয়ানবেলা আমার লগে চাচার কাছে লন। চাচারে ধইরা দেহি চাকরিডা আপনের ঠিক কইরা দিবার পারিনি।

শাজাহানের কথায় বাবার চোখে পানি এসে গেল। দু-হাতে শাজাহানের একটা হাত ধরলেন তিনি। কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, অনেক উপকার হবে বাবা। চাকরি ফেরত পেলে ছেলেমেয়ে নিয়ে বাঁচতে পারি। তুমি আমাকে বাঁচাও।

মোহাম্মদ আলী চাচায় বহুত ছিক্ষিত মানুষ। আমগো চৌদ্দ গুষ্টির মাইদ্যে চাচার লাহান ছিক্ষিত নাই। তয় বহুত রাগী। লন যাই। দেহি চেষ্টা কইরা।

শাজাহান আমার দিকে তাকাল। তুইও লইচ রঞ্জু। রবিবার ছকাল নয়টার দিকে আমি তগো বাছায় আমুনে। চাচারে লইয়া তিনজনে যামুনে কলতাবাজার।

জি আচ্ছা। আপনি আমাদের বাসা চেনেন?

বাসার ঠিকানা বলতে গেলাম। শাজাহান বলল, আবে চিনি। লিয়াকত মুদি চিনাই দিছে। দুয়েক দিনের মাইদ্যেই আমি অর টেকার লেইগা তগো বাছায় যাইতাম। ঠিক আছে যাগা তরা। রবিবার বিয়ানে আমি আইতাছি।

বাবাকে বলল, আপনে চিনতা কইরেন না চাচা। লিয়াকতরে আমি কইয়া দিমুনে। অর টেকা যহন পারেন দিয়েন।

তিন

জীবনের বাঁকে বাঁকে কত যে বিস্ময়কর ঘটনা। শাজাহান গুণ্ডা তেমন এক ঘটনা ঘটাল। রোববার সকাল নয়টায় সে আমাদের বাসায় আসবে এটাই আমরা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লেগেছিল দেখে দোকানির হাত থেকে বাবাকে বাঁচিয়েছে আর ওসব কথা বলেছে। আমরা চোখের আড়াল হয়েছি সেও সব ভুলে গিয়েছে।

না, ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। রোববার সকাল নটায় শাজাহান এসে হাজির। খানিক আগে আমরা মোটা মোটা আটার রুটি আর লাবড়া দিয়ে নাশতা করেছি। বাবা পায়জামা পাঞ্জাবি পরছেন ভিক্ষায় বেরোবার জন্য। আমি হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বইখাতা নাড়ছি। গেটের কাছ থেকে পাশের ঘরের মহিলা চিৎকার করে ডাকল। ওই রঞ্জু, তরে ডাকে।

দৌড়ে গেছি। গিয়ে দেখি শাজাহান ভাই দাঁড়িয়ে সিগ্রেট টানছে। আমাকে দেখে বলল, কিবে, রেডি অছ নাই? চাচায় কো?

ব্যস্ত গলায় বললাম, বাবা রেডি হয়ে আছে। আমি শুধু শার্টটা পরব।

তাড়াতাড়ি ছাট পিন্দা আয়। চাচায় আহনের আগে সিকরেটে শেষ টানডা দিয়া ফালাই।

তার মানে বাবার সামনে সে সিগ্রেট খাবে না। শাজাহান দেখি অদ্ভুত মানুষ। গুণ্ডারা এমনও হয়!

শাজাহান সত্যি এসেছে শুনে বাবা যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে এলেন। বাবাকে সালাম দিলো সে। সøামালায়কুম চাচা।

ওয়ালাইকুমসালাম, বাবা। ভালো আছো?

হ আছি। লন যাই।

একটা খালি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। সেই রিকশা দেখিয়ে শাজাহান বলল, ওঠেন চাচা। ওঠেন। রঞ্জু তুই বি উট। আমার কুলে বহিছ।

শাজাহান গুণ্ডার কোলে বসে কলতাবাজারে মোহাম্মদ আলী সাহেবের বাড়িতে এলাম। বাবা রিকশা ভাড়া দিতে গেলেন। শাজাহান হাসল। না চাচা, ও আপনের থিকা ভাড়া লিব না। আমার রিশকা, হারাদিন অরে লইয়া ঘুরি।

গেট ঠেলে মোহাম্মদ আলী সাহেবের বাড়িতে ঢুকল শাজাহান। আমরা ঢুকলাম তার পিছু পিছু। বাবা বললেন, গত দুই মাসে পাঁচবার এই বাড়িতে আমি এসেছি বাবা। স্যার আমার সঙ্গে দেখাই করেননি।

আইজ করবো। চিন্তা কইরেন না।

বারান্দায় উঠতেই একজন কাজের লোক এলো। শাজাহানকে দেখে ব্যস্ত হলো। আহেন ভাইয়া, আহেন।

চাচায় কো?

ড্রয়িংরুমে আছে।

আমাদের নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকল শাজাহান। মোহাম্মদ আলী সাহেব সোফায় বসে ফাইলপত্র দেখছেন। পরনে সাদা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। মাঝারি ধরনের ভুঁড়ি আছে। গায়ের রং বেশ কালো। তবে চেহারা খারাপ না। সেন্টার টেবিলে চায়ের কাপ, ক্যাপস্টান সিগ্রেটের প্যাকেট আর কাচের অ্যাশট্রে। অ্যাশট্রেতে ছাই আর তিন-চারটা সিগ্রেটের শেষ অংশ পড়ে আছে। শাজাহানকে দেখে মুখটা হাসি হাসি হয়েছিল কিন্তু বাবাকে দেখেই ভুরু কুঁচকে গেল। আমার দিকে তাকালেনই না। বাবাকে বললেন, ও তয় আমার ভাতিজারে গিয়া ধরছেন!

বাবা কথা বলবার আগেই শাজাহান বলল, না না, চাচায় আমারে ধরে নাইক্কা। আমিই তারে ধরছি।

কচ কী বে?

হ চাচা। রঞ্জুর বাপ, আমি চাচা ডাকি। হেয় জানতই না আপনে আমার চাচা লাগেন।

বাবার দিকে তাকাল শাজাহান। বহেন চাচা, বহেন। ওই সোফাটায় বহেন। রঞ্জু, তুই বি ব।

বাবা আর আমি একটু সংকোচ করছিলাম। কারণ মোহাম্মদ আলী সাহেব বিরক্ত হয়ে আছেন। তাঁর ভুরু কোঁচকানো। শাজাহান ওসব পাত্তাই দিলো না। নিজে একটা সোফায় বসে আমাদের আবার বসতে বলল। খাড়াইয়া রইলেন ক্যালা? বহেন চাচা। আবে ওই রঞ্জু, বহচ না ক্যালা? মোহাম্মদ আলী চাচায় এই রহমই। মানুছ ভালা, তয় ইট্টু রাগী আর কী! আমার লাহান। হা হা হা।

মোহাম্মদ আলী সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে সিগ্রেট ধরালেন। কথা বললেন না।

শাজাহান বলল, চাচার চাকরিটা খাইছেন ক্যালা? ছাতছো টেকা কোনো টেকা অইলোনি? দিয়া দিব নে। সাসপেন ঠিক কইরা দেন।

সিগ্রেটের ধোঁয়া ছেড়ে মোহাম্মদ আলী সাহেব বললেন, কামডা তো নিজাম ছাবে বহুত খারাপ করছে বে। অফিছের টেকা মারন যায়নি?

মারে নাইক্কা। খরচা কইরা হালাইছে? এরম অইতেই পারে। কিচ্ছু বুজি না, চাকরি ঠিক কইরা দেন।

আবে তুই আমারে বহুত দিগ্দারি করবার লাগছ্ছ আইজ।

করুম না ক্যালা? আপনে আমার চাচা, হেয়বি আমার চাচা। চা-বিস্কুট খিলান। খাইয়া যাইগা।

কাজের লোক ডেকে চা-বিস্কুট দিতে বললেন মোহাম্মদ আলী সাহেব। বাবা এক ফাঁকে শুধু বললেন, আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার। এমন আর কোনোদিন হবে না।

মোহাম্মদ আলী সাহেবকে কথা বলবার সুযোগই দিলো না শাজাহান। বাবাকে বলল, ভুল অইছে, অইছে। অহন আর কী করন যাইব। চাচায় ঠিক কইরা দিব নে। কাইল আপনে অফিছে গিয়া চাচার লগে দেহা কইরেন।

মোহাম্মদ আলী সাহেব এবার হাসলেন। ভাতিজা, তুই-ই তো বেবাক কতা কইয়া দিলি! আমি আর কী কমু! হ নিজাম ছাব, কাইলকা আইয়েন অফিসে, দেহুম নে।

দেহাদেহির কিছু নাইক্কা। চাকরি ঠিক কইরা দিয়েন। আমার ইজ্জতের সাওয়াল।

আবে অইছে তো! চা-বিস্কুট খাইছস, যা এলা।

চাচা-ভাতিজার এরকম কথাবার্তা আর ভাবভঙ্গি আমি তো দূরের কথা বাবাও তাঁর জীবনে দেখেননি। অদ্ভুত একটা মানসিক অবস্থা নিয়ে আমরা ফিরে এলাম। শাজাহান চলে যাওয়ার পর বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, মোহাম্মদ আলী সাহেব কি অফিসেও এই ভাষায় কথা বলেন?

আরে না। শুদ্ধ ভাষায় বলেন। ইংরেজি বলেন গড়গড় করে। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হয়তো ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলেন।

আর কোনো কথা হলো না আমাদের।

পরদিন বিকেলবেলা হাসিমুখে বাড়ি ফিরে এলেন বাবা। সাসপেনশন উইথড্র হয়ে গেছে। রীতিমতো অফিস করে বাড়ি ফিরলেন। এক ফাঁকে শুধু আমাকে ঘটনা বললেন। আর কাউকেই কিছু বুঝতে দিলেন না। সাত মাসের মাথায় বাবা প্রমোশন পেয়ে হেডক্লার্ক হয়ে গেলেন। হেডক্লার্কদের কিছু উপরি রোজগার আছে। কন্ট্রাক্টরদের ফাইল বড় সাহেবদের দিয়ে সই করিয়ে আনলেই টাকা। বাবা ভালোই রোজগার করতে লাগলেন। আমাদের সংসারের চেহারা ঘুরতে লাগল।

চার

তারপর পঞ্চান্ন বছর কেটে গেছে। বাবা সাসপেন্ড হয়েছিলেন বা আমরা ভিক্ষা করেছি, বাবার কলার চেপে ধরার পর, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শাজাহান বদলে গেল, গুন্ডা থেকে গেল ফেরেশতা হয়ে, এসব ঘটনা বাবা আর আমি ছাড়া জীবনে কেউ জানলোই না।

বাবা মারা গেছেন সাতাশ বছর হলো। তাঁর তিন বছর আগে মারা গেছেন মা। ততোদিনে আমরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ওপর বাবা খুব জোর দিয়েছিলেন। এই একটা ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ছাড় দেননি। নিজে প্রায় মুখে রক্ত তুলে পরিশ্রম করেছেন। ছেলেমেয়েদেরও পরিশ্রমী হিসেবে তৈরি করেছেন। পাঁচজনের মধ্যে প্রথম চারজনই আমরা ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করলাম। সবার ছোট ভাই। খুবই ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। ইন্টারমিডিয়েট করে আমেরিকার কয়েকটা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করল। ফুল স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেল ইউনিভার্সিটি অফ অস্টিনে। পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকাতেই সেটেল করেছে। বাঙালি মেয়েই বিয়ে করেছে। বউটাও খুব মেধাবী। দুজনেই ভালো জব করে। দুই মেয়ে নিয়ে ডালাসে থাকে। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি করেছে। সুন্দর ছিমছাম জীবন। তিন-চার বছর পরপর বউবাচ্চা নিয়ে দেশে এসে বেরিয়ে যায়। তিন বোনেরই ভালো বিয়ে হয়েছে। মেজো বোনটা থাকে লন্ডনে। হাজব্যান্ড রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। বেশ কয়েকটা রেস্টুরেন্ট আছে সেন্ট্রাল লন্ডনে। অবস্থা খুবই ভালো। বোনও বিজনেসের অনেকটা দেখে। অন্য দু-বোন দেশে।

বোনদের মধ্যে বড়টা ব্যাংকার ছিল। বেশ উচ্চপদ থেকে রিটায়ার করেছে। শ্বশুরের বড় প্রপার্টি ছিল ধানমণ্ডিতে। ভাগ-বাটোয়ারার পর দশ কাঠা জমি পেয়েছে। হাজব্যান্ড এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ার ছিল। সেও রিটায়ার করেছে। দশ কাঠা জমি ডেভেলপারকে দিয়ে অনেকগুলো ফ্ল্যাট আর ক্যাশ টাকা পেয়েছে। ফ্ল্যাট ভাড়াই পায় পাঁচ-সাত লাখ টাকা।

ছোট বোনটা টিচিং প্রফেশনে ঢুকেছিল। এখন ফুল প্রফেসর। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আছে। ওর হাজব্যান্ড গাড়ির ব্যবসায়ী। বনানীতে নিজেদের বাড়ির নিচতলাতেই শোরুম।

আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি দুজন মাত্র দেশে। বাকি সবাই বাইরে। কেউ আমেরিকায়, কেউ কানাডায়। এক ভাগ্নি অস্ট্রেলিয়ায়। ছোট বোনের ছেলেটা ছাড়া বাকি সবাই বিয়েশাদি করে সংসারজীবনে ঢুকে গেছে। তার মানে কোথা থেকে কোথায় এসেছে আমাদের জীবন!

আমি থাকি গুলশানে। গুলশান এক আর দুইয়ের মাঝামাঝি লেকের ধারে এক বিঘার ওপর তিনতলা ছবির মতো বাড়ি আমার। চারপাশটা খোলামেলা। গাছপালা, বাগান। মাঝখানে তিনতলা বিল্ডিং। স্ত্রী নীলা আর একটাই ছেলে, বাবন। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ করেছে। এমবিএ করেছে ইউনিভার্সিটি অফ ফিনিক্স থেকে। তারপর দেশে ফিরে ব্যবসার হাল ধরেছে।

আমার গার্মেন্টের ব্যবসা। বাংলাদেশে গার্মেন্ট ব্যবসা যখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল অর্থাৎ একেবারে শুরুর দিককার ব্যবসায়ী আমি। খুবই পরিশ্রম করেছি অনেক বছর। ছেলে ফিরে আসার পর তাকে বিয়ে করালাম। ওর পছন্দের বিয়ে। বউর নাম ঐশী। বড়ঘরের মেয়ে। নর্থ সাউথ থেকে এমবিএ করেছে। দেখতেও খুব সুন্দর। দুজনে মিলেই ব্যবসাটা দেখছে। গাজীপুরে বিশাল দুটো ফ্যাক্টরি। আমি এখন আর যাই-ই না। কাজ করতে ভালো লাগে না। ওরাই সব সামলায়। দুটো নাতি-নাতনি আছে। আমি আর নীলা সেই দুটিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই থাকি। বই পড়ি, গান শুনি, সিনেমা দেখি আর ফেলে আসা জীবনের কথা ভাবি।

বয়স হয়ে গেলে দূর অতীতের অনেক কথা মনে আসে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু না কিছু দুঃখ-বেদনা থাকে। হাহাকার থাকে। হাসি আনন্দ সচ্ছলতার ভেতর লুকিয়ে থাকে গভীর কষ্টের কান্না। বাবার সঙ্গে সেই কয়েকটা দিন ভিক্ষা করার কথাটা মনে পড়ে প্রায়ই। কত অপমান অপদস্থ হওয়া। শাজাহান গুণ্ডার কথা মনে পড়ে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে কেমন বদলে গিয়েছিল সে। এই জীবনে সেইসব কথা কাউকে বলা হলো না। চাপা পড়ে থাকল ‘পরানের গহিন ভিতর’।

আজ বিকেলে বারান্দায় বসে আছি। হেমন্তকাল। শীতের আমেজ লেগেছে চারদিকে। বাড়িটা লেকের ধারে বলে বিকেলবেলা এখানটায় বসতে খুব ভালো লাগে। লেকের ধারের গাছগুলো সুন্দর। বড় গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে নানা রকম ফুলের ঝাড়। তলায় সবুজ ঘাস। সবমিলিয়ে পরিবেশটা মনোরম।

খানিক আগে কাজের মেয়ে এক মগ চা দিয়ে গেছে। কোলের ওপর রাখা গোর্কির আমার ছেলেবেলা। দু-তিনবার পড়া বই। তবু এখনো পড়তে ভালো লাগে। নতুন করে পড়তে শুরু করেছিলাম। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে মন কেমন উদাস হয়ে গেল। বই রেখে লেকের দিকে তাকিয়ে আছি। চায়ে চুমুক দিতেও ভুলে গেছি।

বাড়িতে এখন আমি আর বাবন। শুনলাম বাবন ঘুমাচ্ছে। একটু বোধহয় ক্লান্ত। এজন্যই আজ আর অফিসে যায়নি। নীলা আর ঐশী বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে গেছে। রাতে বাইরে কোথাও খেয়ে ফিরবে।

এসময় বাবন বারান্দায় এলো। ওর হাতেও চায়ের মগ। কী করো, বাবা?

চায়ে চুমুক দিয়ে ছেলের দিকে তাকালাম। কিছু না। বসে আছি।

বাবন চেয়ার টেনে বসল। তোমাকে কেমন আনমনা দেখাচ্ছে। কী ভাবছো, বাবা?

পুরনো দিনের কথা মনে আসে। কত দুঃখ-কষ্টের কথা। বেদনার কথা।

তোমরা খুবই স্ট্রাগল করে বড় হয়েছো সেসব শুনেছি। শুনলে মন খারাপ হয়।

সব শুনিসনি, বাবা। কিছু ঘটনা আছে যা কখনো কাউকে বলা হয়নি। শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হবে।

বাবন শিশুর মতো আবদার করল। আমাকে বলো না, বাবা। তোমার সেই জীবনের সব কথা জেনে রাখি।

লাভ কী?

তোমার মন হালকা হলো। আমিও জেনে রাখলাম আমার বাবার জীবনের না-বলা কথা। ছেলে হিসেবে সেইসব ঘটনা আমার জীবনে নিশ্চয় কাজে লাগবে।

তা লাগবে না। গল্প-কাহিনির মতো মনে হবে।

গল্প-কাহিনি তো মানুষের জীবন নিয়েই তৈরি হয়, বাবা। এই যে তুমি গোর্কির ছেলেবেলা পড়ছো, কী কঠিন জীবন ছিল এই লেখকের, ভাবো তো! সেই জীবন থেকে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একজন লেখক।

বাবনের কথা শুনে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঠিকই তো বলেছে আমার ছেলে। নিয়তি মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাবে মানুষ তা জানতে পারে না। নিয়তি খণ্ডাবার ক্ষমতাও মানুষের থাকে না। আমি তারপর বাবনকে সেই দিনগুলোর কথা বললাম। এখন থেকে পঞ্চান্ন বছর আগের সেই অসহায় বাবা আর ছেলের কথা বললাম। শাজাহান গুণ্ডার কথা বললাম। বলতে বলতে গলা ধরে এলো, চোখ ভেসে গেল কান্নায়। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আমি কাঁদতে লাগলাম।

আমার কথা শুনতে শুনতে বাবন খুবই দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। চায়ের মগ পাশের টিপয়ে রেখে শিশুর মতো দু-হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। টের পাই বাবনের চোখের জল টপটপ করে পড়ছে আমার কাঁধে। বাবার সেই অসহায়ত্বের কথা সহ্য করতে না পেরে ছেলে কাঁদছে।

আমি একসময় বাবনের পিঠ আলতো করে চাপড়ে দিলাম। নিজেকে সামলালাম। টিপয়ে রাখা টিস্যুবক্স থেকে টিস্যু পেপার নিয়ে চোখ মুছলাম। বাবনও তাই করল। বাপ-ছেলে পাশাপাশি বসে রইলাম কিছুক্ষণ। কেউ কোনো কথা বলতে পারছি না। কান্নার পর বড় করে দীর্ঘশ্বাস পড়ে অনেক সময়। ওরকম দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার।

বাবন বলল, তুমি জানো বাবা, আমি একটু শক্ত ধরনের ছেলে। সহজে আমার চোখে পানি আসে না। আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমার জায়গায় আমি দেখতে পেলাম ক্লাস সেভেনে পড়া তোমাকে আর তোমার জায়গায় দেখতে পেলাম তোমার বাবাকে, আমার দাদাকে। আমি তোমাদের রক্ত বহন করছি। বাপ-ছেলের ওরকম অসহায়ত্ব আর অপমান, গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে আছে ভেবে বাবা নিঃশব্দে কাঁদছেন, নির্জন মাঠে বসে ওইটুকু ছেলেকে অসহায়ত্বের কথা বলছেন আর কাঁদছেন, এ আমি সহ্য করতে পারছিলাম না বাবা।

আর আমি এতোগুলো বছর সেইসব স্মৃতি বুকে নিয়ে বসে আছি। যখন দিনগুলোর কথা মনে আসে, আমার অবস্থা কী হয় ভাব তো!

বাবনের চোখে আবার পানি এলো। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি সামলাল সে আর অন্তরঙ্গ বন্ধুর ভঙ্গিতে একটা হাত রাখল আমার কাঁধে। কথা ঘোরাল অন্যদিকে। শাজাহানকে গুন্ডা বলতে ইচ্ছে করছে না বাবা। তাঁকে অনেক বড় মানুষের চেয়ে বড় মনে হচ্ছে।

আসলেই তাই।

সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পর তুমি কিংবা দাদা তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করোনি?

করেছি তো বটেই। সেখানেও আরেক ঘটনা। চাকরি ফিরে পেয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরলেন বাবা। এক ফাঁকে আমাকে বললেন শাজাহানকে একটু বলে আসতে। পরদিন স্কুল শেষ করে গেলাম শাজাহান ভাইকে খুঁজতে। বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া হলো না। তাদের পাড়ার কে একজন বলল সেদিনই সকাল থেকে শাজাহান পলাতক। যাত্রাবাড়ীর ওদিকে একটা মার্ডার হয়েছিল কয়েকদিন আগে। সেই কেসের শাজাহান একজন আসামি। আজই নাকি ঘটনা সে জেনেছে। জেনেই উধাও হয়ে গেছে।

আশ্চর্য ব্যাপার!

সত্যি আশ্চর্য ব্যাপার। উধাও তো উধাওই। অনেকদিন তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া গেল না। কোথায় গেল তার এসএসসি পরীক্ষা, কোথায় কী! পালিয়ে থেকেও বাঁচতে পারল না। ধরা পড়ে গেল। যাবজ্জীবন হলো। তারপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হলো। বাবা আমাদের নিয়ে ব্যস্ত। আমরা নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলাম। সেই সময় কে কার কথা ভাবে! দিন যেতে লাগল। আমার হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়তো শাজাহানের কথা। ওই মনে পড়া পর্যন্তই। খোঁজখবর আর করা হতো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ছিলাম মুন্সীগঞ্জের পুরা গ্রামে, বাবার এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়র বাড়িতে। বাবা ওই অবস্থাতেও চাকরি চালিয়ে গেছেন। হাতের তালুতে জীবন নিয়ে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতেন। বেতন না পেলে আমরা খাবো কী?

বুঝলাম। কিন্তু কখনোই কি তুমি একটু সময় বের করতে পারোনি সেই মানুষটির খোঁজখবর করার। কেমন আছেন তিনি, কী অবস্থা! বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন!

উচিত ছিল বাবা, উচিত ছিল। জীবন গুছাতে গুছাতে স্মৃতিটা বুকে নিয়ে দিন পার করেছি। আসলে বড় ভুল হয়ে গেছে। ইচ্ছে করলে পারতাম। কেন যে হয়নি!

এখন একদিন যাও। দরকার হলে আমিও যাই তোমার সঙ্গে। ওই এলাকায় গেলে জানা তো যাবে তাঁর সম্পর্কে, নাকি?

তা নিশ্চয় যাবে।

তাহলে চলো কালই যাই।

তোর যেতে হবে না। আমি ফ্রি আছি, আমি যাই। তবে বাবা, এসব কথা কাউকে বলিস না। গভীর কষ্টের কোনো কোনো কথা নিজের ভেতর রেখে দেওয়া ভালো।

না বাবা, আমি কখনোই কাউকে বলব না। তুমি যেভাবে কথাগুলো নিজের ভেতর রেখেছো, দাদা যেভাবে রেখেছিলেন, আমিও ঠিক সেভাবেই রাখব। আমি তো তোমাদের রক্তই বহন করছি। তোমাদের গোপন দুঃখ-বেদনাটাও বহন করি।

পাঁচ

পরদিন দুপুরের পর ছোট একটা গাড়ি নিয়ে আমি পুরান ঢাকার দিকে রওনা দিলাম। নীলা অবাক হয়ে বলল, এই গাড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?

সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে-মিশিয়ে বললাম নীলাকে। পুরান ঢাকার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাব। স্কুলজীবনের বন্ধু। হঠাৎ মনে পড়ল। আমার ছেলেবেলার এলাকা। ঘিঞ্জি এলাকা। বড় গাড়ি নিয়ে না যাওয়াই ভালো।

নীলা হাসল। যাও তাহলে। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে এসো।

ইত্তেফাকের ওদিকটা দিয়ে দয়াগঞ্জের কাছে এসে আমি অবাক। একদম বদলে গেছে পুরো এলাকা। ধোলাই খালটাই নেই। রাস্তা হয়ে গেছে। দুটো রেললাইনের একটা উঠে গেছে। খাল না থাকলে রেলব্রিজ থাকবে কেন? ধোলাইখালে নেমে, অর্থাৎ ওই রাস্তায় নেমে কাঠেরপুলের দিকটায় গিয়ে দেখি ভারি জমজমাট এলাকা। কত রকমের দোকানপাট, কমিউনিটি সেন্টার। খালের পশ্চিম পারের বানিয়ানগর, কলুটোলা একদমই অচেনা। আরেকটু এগিয়ে সেই সরকারি গুদামের জায়গাটায় কী সব অফিস। লোহারপুল উধাও। সেদিকটায় এসে বাঁদিককার রাস্তা ধরে ফরিদাবাদ পোস্ট অফিসের গলিটায় ঢুকলাম। পোস্ট অফিস নেই। এলাকাটা আরো ঘিঞ্জি হয়েছে, দোকানপাট গাড়ি রিকশা সিএনজিতে ঠাসা। আমার ড্রাইভার নিয়ামত খুবই অবাক। বুঝতে পারি সে ভাবছে, স্যার কোথায় এলেন?

ওই গলি দিয়ে সোজা পুবদিকে এসে, গেণ্ডারিয়া হাইস্কুল ছাড়িয়ে, ফায়ার সার্ভিসের এলাকা ছাড়িয়ে সেই মুদিদোকানের গলিটায় ঢুকলাম। বড় বড় দালানকোঠা হয়েছে এদিকটায়! আর এতো লোকজন! বিকেলবেলায় মনে হচ্ছে মানুষের হাট। দোকানপাটে কেনাকাটা, রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া, রিকশাঅলাদের হইচই গালাগাল। হাওয়ায় মানুষের ঘেমোগন্ধের সঙ্গে মিশে আছে নর্দমার গন্ধ। তবু পরিবেশটা আমার খারাপ লাগে না। কত কতদিন এদিকটায় চলাফেরা করেছি। বাবার সঙ্গে সেই অসহায় দিনগুলোতে, সন্ধ্যার পর থেকে অনেকটা রাত পর্যন্ত …। এই গলিতেই তো শাজাহান গুণ্ডা বাবার …

ডালপুড়ি ভাজা হচ্ছে রেস্টুরেন্টে। ভারি মনোহর চায়ের গন্ধ ভেসে আসছে। দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেওয়া দুধ মিশিয়ে চা তৈরি করলে এমন গন্ধ হয়। এই গন্ধও আমাকে সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে বয়স্ক কালোপনা একজন বসে আছে। বেশ নাদুস-নুদুস। মুখে দাড়ি। মাথায় গোলটুপি। মুখে পান। হাসি আনন্দ ভরা মুখখানি।

গাড়ি গলির মুখে রেখে ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সালাম দিয়ে শাজাহানের কথা জানতে চাইলাম। এই এলাকারই লোক। একসময় বেশ নামডাক ছিল তার ইত্যাদি, ইত্যাদি।

ভদ্রলোক প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শাজাহানকে চিনলেন। মার্ডার কেসে চৌদ্দ বছরের জেল হয়েছিল। স্বাধীনতার পর জেল থেকে বেরিয়েছিল। এই তো কাছেই বাড়ি! এখনো বেঁচে আছে। তবে শয্যাশায়ী। আমার চেহারা দেখে, শাজাহানের মতো লোককে আমি খুঁজছি দেখে, সে একটু অবাকই হয়েছে। একজন বেয়ারাকে বলল, সাহেবরে শাজাহান ভাইর বাড়ি দেখাইয়া দে।

ছেলেটা আমাকে নিয়ে বস্তির চেয়ে সামান্য উন্নত একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। টিনের চাল আর চারদিকে দেওয়াল দেওয়া একটার গায়ে আরেকটা ঘর বাড়িটায়। সেই অসহায় দিনে যে-বাড়িটায় আমরা থাকতাম অনেকটাই ওরকম বাড়ি। ভাঙাচোরা টিনের গেটও আছে। গেটের কাছে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে ঘেয়ো কুকুর। নর্দমা থেকে দুর্গন্ধ আসছে। একটা রোগা কৃষ্ণচূড়া গাছ কোনোরকমে টিকে আছে গেটের একপাশে। ভেতরে বাচ্চাকাচ্চাদের হইচই। শিশুর ওঁয়া ওঁয়া কান্না।

বেয়ারা ছেলেটা গেট ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে ডাকল, আকবর, ওই আকবর। শাজাহান চাচার কাছে লোক আইছে।

দু-তিনবার ডাকাডাকির পর সাতাশ-আঠাশ বছর বয়সের একটা ছেলে বেরিয়ে এলো। রোগা পটকা কালো। পরনে ডোরাকাটা লুঙ্গি আর ছেঁড়া সাদা টি-শার্ট। কে আইছে আব্বার কাছে?

তারপর আমাকে দেখে থতমত খেল। কই থিকা আইছেন?

কোথা থেকে এসেছি বললাম না। বললাম, তুমি আমাকে চিনবে না, বাবা। তোমার আব্বা চিনবেন। তাঁর সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।

আব্বায় তো বিচনা থিকা উঠবার পারে না। কথাও কইবার পারে না ঠিক মতন। মানুষ চিনবার পারে না। চাইর বচ্ছর আগে ইস্টোক করছিল। পঙ্গু অইয়া গেছে।

ও আচ্ছা। তবু আমি তাঁর সঙ্গে একটু দেখা করব। তাঁর ঘরে যাওয়া যাবে না?

ছেলেটা সামান্য একটু সময় নিয়ে বলল, হ যাইব। আহেন।

আমি তার পিছু পিছু স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা ঘরে এসে ঢুকলাম। ঘরভর্তি ভ্যাপসা গন্ধ আর মশার ভ্যানভ্যানি। আকবর সুইচ টিপে আলো জ্বালল। সেই আলোয় দেখি পুরনো চৌকিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে একজন। বিছানার সঙ্গে শরীর একেবারে মিশে গেছে। তাকে মানুষ না বলে মানুষের কঙ্কাল বলা ভালো। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা পঙ্গু ভিখিরির মতো অবস্থা। নোংরা কাঁথায় পা থেকে গলা পর্যন্ত ঢাকা। মাথায় দু-চারটা চুল পাটের আঁশের মতো লেগে আছে। মুখ সাদা দাড়িগোঁফে একাকার। কাঁথার তলা থেকে হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে বুক আর পেট। চোখে ঘোলা দৃষ্টি। হা করা মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসছে।

আকবর বলল, আপনের নামডা কন। আব্বার কানের কাছে মুখ নিয়া জিগাই, চিনে নি।

নাম বললাম। আকবর শাজাহান ভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে চিৎকার করে বলল, রঞ্জু আংকেল আপনেরে দেখবার আইছে আব্বা। দেহেন তো চিনবার পারেন নি?

শাজাহান ভাইয়ের কোনো ভাবান্তর হলো না।

আকবর আবার চিৎকার করতে গেল, আমি তাকে থামালাম। থাক, দরকার নেই। শাজাহান ভাইয়ের চিকিৎসা খাওয়াদাওয়া কীভাবে চলছে? তোমার মা, ভাইবোন?

মায় মইরা গেছে এগারো বচ্ছর আগে। আমরা দুই ভাই তিন বইন। বইনগ বিয়াছাদি অইয়া গেছে। বড়ভাই থাকে কলতাবাজারে। আমার এক দাদার বাড়িতে দাওরানি করে। দাদায় মইরা গেছে বহুত আগে। তাঁর বড় পোলায় থাকে ওই বাড়িতে।

তোমার সেই দাদার নাম মোহাম্মদ আলী সাহেব? মিউনিসিপ্যালিটিতে বড় চাকরি করতেন?

হ হ। আপনে দেহি চিনেন!

হ্যাঁ চিনি। তুমি কী করো? মানে চলছো কী করে? বাড়িভাড়ায়?

ভাড়া আমি কিছু পাই। তয় বাড়ি তো আমার একলা না। আব্বার বাড়ি। পাঁচ ভাইবইনেই মালিক। ভাড়ার টেকা যে যারটা ভাগ কইরা লইয়া যায়। আমি থাকি আব্বার লগে, এর লেইগা আমারে কিছু বেশি দেয়। আমি অহনতরি বিয়াশাদি করবার পারি নাই। আব্বার লেইগা বহুত মায়া লাগে। কত দাপটের মানুষ আছিল আমার আব্বায়। কী মানুষ কী অইয়া গেছে! আমিই আব্বারে রাইন্দা-বাইরা খাওয়াই। অষইদ খাওয়াই। হাসপাতালে বি লইয়া গেছি কহেকবার। ভাইবইনরা কেঐ আব্বারে দেহে না। আমি দেহি। টেকার লেইগা ঠিক লাহান চিকিৎসা করাইবার পারি না। ছাভারের সিআরপিতে কিছুদিন রাখবার পারলে আব্বায় ভালা অইয়া যাইতো। আহা রে, আমার আব্বায় যে আমারে কী আদর করতো।

আকবরের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। ডান হাতটা মায়াবী ভঙ্গিতে শাজাহান ভাইয়ের মাথায় বুলাতে লাগল সে। আর তার কথায় আমার মনে পড়ে আমার বাবার কথা। আমার বাবাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমি পাগলের মতো ভালোবাসতাম আমার বাবাকে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, শাজাহান ভাইকে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে, তাঁর ওষুধ, খাওয়াদাওয়া সব মিলিয়ে কত টাকা লাগতে পারে মাসে?

কত! পোনরো ষোলো­ হাজার টেকা।

আর তাঁকে নিয়ে তুমি যদি ভালো একটা বাসায় ভাড়া থাকো। বিয়েশাদি করলে। বউ শাজাহান ভাইকে দেখলো, তুমি ছোটখাটো বিজনেস করলে …

আকবর আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। বিজনেস তো আমি করবারই পারি। টেকা পামু কই? আপনে যেমনে কইলেন ওইছব করতে বহুত টেকা লাগে। আইজকাল মুদিদোকানের ব্যবসা বহুত ভালা। আমগ বাড়ির গেটের লগে একখান দোকান দিয়া বইলেই অয়। ভালা বিজনিস।

তাহলে একটা কাজ করো। গেটের সামনে তিন রুমের একটা বিল্ডিং করো। একটা তোমার দোকান, অন্য দুটোর একটায় তুমি বউ নিয়ে থাকবে অন্যটায় থাকবেন শাজাহানভাই।

আকবর আবার হাসল। কী যে কইবার লাগছেন আংকেল? টেকা পামু কই?

আকবরের কথাবার্তায় শুরু থেকেই আমি খেয়াল করছিলাম, পুরোপুরি ঢাকাইয়া ভাষায় কথা সে বলে না। দুয়েকটা শব্দ ঢাকাইয়া বাকিটা মিক্সড। দিনে দিনে ঢাকাইয়া ভাষাটা বোধহয় হারিয়ে যাচ্ছে।

শাজাহানভাইয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে আকবরকে বললাম, টাকা-পয়সা নিয়ে তুমি ভেবো না। যেভাবে বললাম তা কি সম্ভব?

হ ছম্ভব। আব্বায় অহনও বাঁইচা আছে। বাড়িডা তাঁর। আমি তাঁর লগে আছি। এই বাড়ির যেহেনে ইচ্ছা ওহেনেই আমি দালান দিবার পারি। ভাইবইনরা কিছু করবার পারব না। আমার চাচা ফুপুরা আমার পাশে খাড়াইব।

ঠিক আছে তাহলে। কাল সকাল দশটার দিকে ফরহাদ সাহেব নামে এক ভদ্রলোক আসবেন তোমার কাছে। সে আমার ম্যানেজার। ফরহাদ সব ব্যবস্থা করবে। তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলে ফরহাদকে বলে দেবে আর না থাকলে কাছাকাছি কোনো একটা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করে নেবে। তবে একটাই শর্ত, শাজাহান ভাইকে যতদিন সম্ভব বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর যেন কোনো অযত্ন না হয়। পরশুর মধ্যে শাজাহান ভাইকে আমি সিআরপিতে পাঠাবার ব্যবস্থা করবো। ওখানে রুম বুক করে দেব। যতদিন দরকার ওখানে তিনি থাকবেন। ওখানকার ডাক্তার, নার্স আর ফিজিওথেরাপিস্টরা তাঁকে দেখবেন। দরকার হলে তুমিও গিয়ে তাঁর সঙ্গে থাকবে। এদিকে আমার লোকজন তোমার বিল্ডিং করে দেবে। দেখবে ততদিনে তোমার বাবা হেঁটে বাড়ি ফিরছেন। আমার ফোন নাম্বারটা রাখো। যখন দরকার হবে তখনই ফোন করবে। এখন এই পঞ্চাশ হাজার টাকা রাখো।

প্যান্টের পকেট থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল বের করে আকবরের হাতে দিলাম। তোমার ফোন নাম্বারটা দাও। বিস্ময়ে আবেগে আকবর আর কথা বলতে পারল না। ফোন নাম্বার দিলো।

ফিরে আসার সময় বারবারই মনে পড়ছিল বাবার সঙ্গে আমার সেই দিনগুলোর কথা। আমি একভাবে আমার বাবার পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিলাম, তাঁর কষ্টটা ভাগ করে নিয়েছিলাম, আকবর অন্যভাবে তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বাবার পাশে থেকে যে জীবন আমি একলা কাটিয়েছি, শাজাহান ভাইকে নিয়ে আকবর একটু অন্যভাবে কাটাচ্ছে সেই জীবন। আমি তার জীবনটা বদলে দেব। তার বাবাকে সে যেন যত্নে আর মমতায় যতদিন সম্ভব বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

Leave a Reply