পিয়াস মজিদের কাব্যগ্রন্থ অফ টপিক ৫৫টি কবিতায় সাজানো। গ্রন্থটি নিয়ে আমার এই আলোচনাকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা করেছি। প্রথম পর্যায়ে গ্রন্থটির এমন কিছু প্রবণতাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি, যা এটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রন্থের কবিতাগুলির কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরেছি, যা কবিতার পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে সমালোচনার উপযুক্ত। শেষভাগে, আমার বিশেষভাবে ভালো লাগা কবিতাগুলির একটি ফর্দ তুলে দিয়েছি।

অফ টপিকের মূল বৈশিষ্ট্য গতিময়তা। ৫৫টি কবিতার বর্ণনাকারী ভিন্ন কেউ নন, একটিই কণ্ঠস্বর, অর্থাৎ, কবি স্বয়ং। কখনো তিনি বর্ণনা করেন, আমরা শুনি; কখনো কবিতার ভেতর অন্য একটি কণ্ঠস্বর তাঁর সঙ্গে কথা বলে, তিনি শোনেন, তাঁর সঙ্গে পুনরায় আমরাও হই শ্রোতা।

বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে ছড়িয়ে আছে কবির ছুটে চলার ইতিহাস, ভ্রমণের ইতিবৃত্ত। এই ছুটতে ছুটতেই যা কিছু তিনি দেখেন, যা কিছু তাঁর হৃদতন্ত্রে অনুরণন তোলে, তাদের গল্প তিনি লিপিবদ্ধ করতে থাকেন কবিতার আঙ্গিকে। তিনি ছুটে চলেন ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে, ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে সারা বাংলাদেশ, কখনোবা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানচিত্রেও।

কবির ঢাকার নিবাস মোহাম্মদপুরে। কাজেই কবিতায় হরদম উপস্থিত শিয়া মসজিদ, নূরজাহান রোডের কোরেশী কাবাব, মোহাম্মদপুর টু কাঁটাবন, অথবা নীলক্ষেতের বাসরুট, জিগাতলা থেকে মোহাম্মদপুর যাওয়ার পথে ‘থিন ক্রাস্ট’ পিজ্জার জন্যে বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট বেল্লা ইটালিয়া। তাঁর কবিতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে মিরপুর সাড়ে এগারো, বেঙ্গল ক্ল্যাসিক মিউজিক ফেস্টিভালের সূত্র ধরে মিরপুর আর্মি স্টেডিয়াম। পুরনো ঢাকার লালবাগের কেল্লা, ইংলিশ রোড, সদরঘাট থেকে জুরাইন কিংবা পোস্তগোলা।

হঠাৎ হঠাৎ কবিতার বিষয়বস্তু ছুটে চলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার, অথবা ঢাকা থেকে মাওয়া – গরম টাটকা মাছ খাওয়ার জন্যে। অথবা পছন্দের কারো খোঁজে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর, জামালপুর থেকে নিয়ে মেলান্দহ, মেলান্দহ থেকে শেরপুর হয়ে ফের ঢাকা। কখনো কবিকে আবিষ্কার করি কুমিল্লা ওয়ার সেমেটারিতে, কখনো বা গোমতী বা আড়িয়াল খাঁ নদের তীরে। রাজশাহীতে, কিংবা একেবারেই অচেনা – ‘পাড়ার মোড়ের/ সিয়োন টালিথা কুমী চার্চের কোণার টঙ’-এ।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কবি ছুটে যান লিও তলস্তয়ের তাসখন্দের নিবাসে, টোকিও কিংবা তেহরানে, কলাম্বিয়া কিংবা রোমের রাজপথেও।

ক্রমশ ছুটে চলা – সশরীরে, কিংবা মানসভ্রমণে; এবং চলার পথেই কাব্যের রসদ সংগ্রহ কাব্যগ্রন্থ অফ টপিকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

অফ টপিক কাব্যগ্রন্থের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সংজ্ঞায়ন প্রবণতা। কবি সচেতনভাবে বা ক্ষেত্রবিশেষে কাব্যিকতার অনিবার্য অমোঘ পরিণতি হিসেবেই উচ্চারণ করতে থাকেন আত্মার বা অন্যান্য বিষয়বস্তুর (সাবজেক্ট ম্যাটার) পরিচিতি বা সংজ্ঞা। উদাহরণ দেখা যাক –

‘মৃত্যু আজকাল/ জীবনের জাস্ট/ বিপরীতার্থক কিছু না’ (‘জীবনের জাদুঘর’)

‘প্রেম তো কিছু/ অলীক অক্ষর’ (‘নিরক্ষর’)

‘জীবন এক দানবের ডায়রি’ (‘চেরি ফোটার দিন’)

‘মহাবিশ্ব আসলে ভিখিরির ভূগোল’ (‘খরা কিংবা প্লাবন’)

‘তাদের (জলপুত্রদের) জীবন মূলত/ মৎস্যকন্যার কবর’ (‘দারুণ না!’)

‘জীবন এক/ গ্রীষ্মপ্রাসাদ’ (‘হিমা’)

‘মানুষ বড়জোর/ শীতকালীন একটা তোপকাপি প্রাসাদ।’ (‘ধরি, মানুষ মানে’)

‘অনুভবের জাল পেতে, দৃশ্যের গায়ে/ লুকানো শব্দ শিকারের অপরাধকে/ নাম দেয়া হল ‘কবিতা’। (‘চক্ষুঘটিত নয়’)

এভাবে কাব্যগ্রন্থটি জুড়ে জীবন-মৃত্যু-প্রেম-মানুষ-কবিতা-আমজনতার সংজ্ঞায়ন কবি করে চলেন তাঁর অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার সংগ্রহশালা থেকে।

পূর্বভাগে অনুপ্রাসের ব্যবহারে বাক্যের মধ্যে বিশেষ দ্যোতনা সৃষ্টি, অক্সিমোরোনের চমক এবং ক্ষেত্রবিশেষে নতুন শব্দগুচ্ছের সৃষ্টি – কবিতার অলংকারশাস্ত্রে কবি পিয়াস মজিদের বিশেষ শক্তির দিক। অফ টপিকেও আমরা তার বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করি – 

‘জলের আয়াত’, ‘অগ্নিআগামী’, ‘পবিত্র লিবিডো খামার’ (কবিতা ‘তন্দুর খাওয়ার প্রহর’), ‘তোমার দাউ দাউ উপকূল’ (‘জীবনের জাদুঘর’), ‘বিপরীত গমনাগমনের/ তীব্রগন্ধা ফুল’ (‘নভেম্বর রেইন’), ‘ভাইরাল হওয়ার বিষাদ’, ‘নির্জনতাকামী কুহু’ (‘হয়’), ‘মৃত্যুর তামসিক শিশির’ (‘ও চাঁদ’) , ‘পাথর-গালিচা’ (‘সূত্রসার’), ‘অক্ষরের অশ্রু’ (‘কবিতার ক্লাস’), ‘ময়লাবাহার জীবন’ (‘কুয়াশা ফ্যাক্ট’), ‘জীবনব্যাপী মরণযাপন’ (‘সান্তাকে বলে দেবো, শান্তা’), ‘ক্ষুধার ফুল’ (‘যে যেখানে আছি’)।

রেফারেন্স ব্যবহারে এক বিস্তৃত পরিধি লক্ষ করা যায় অফ টপিকে। একই সঙ্গে বোঝা যায়, হালের পপ কালচারের পাশাপাশি মার্গীয় বিষয়বস্তুর আলোচনায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্য পিয়াস মজিদের।

তাঁর কবিতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘অ্যালেন পো’র অসহায় ‘মার্জারের মাথা’ থেকে প্রবাহিত ‘রক্তের পিচকিরি’, গেম অফ থ্রোনসে স্টার্ক ফ্যামিলির আরিয়া স্টার্কের তরবারির শিক্ষকের সেই বিখ্যাত উক্তি – ‘ÔThere is only one God, and His name is Death. And there is only one thing we say to Death : ‘not today’, – এর সঙ্গে মিলিয়ে ‘মৃত্যুর মিস্তিরি কাল আসুক বরং …’ (‘তন্দুর খাওয়ার প্রহর’)। কবি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন ‘মান্দেলস্তাম, বুকোস্কি’র কবিতার সঙ্গে, কেননা, তাঁদের ‘কবিতার লাইন ফেসবুকে পোস্ট করে হালফিল থাকা’ ছাড়া আমাদের কোনো গতি নাই (‘জন্ম থেকে জ্বলছি টু বি কন্টিনিউড’)। কবির আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন তলস্তয় (‘তাসখন্দে, তলস্তয়ের বন্ধ বাড়ির সামনে’), গার্সিয়া মার্কেজ (‘এই বাংলায়’), তরুণ কবি কাপুসকে পাঠানো রিলকের চিঠি (‘ঝিলমিল’) থেকে আমাদের খুব আপন শহিদুল জহির এবং তাঁর ডুমুরখেকো মানুষ (‘খেতে খেতে’)। আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন শায়েস্তা খান (‘মিডলক্লাস’)। গানস অ্যান্ড রোজেস ব্যান্ডের ভুবনবিখ্যাত গান ‘নভেম্বর রেইন’, কখনো কবিতার শিরোনাম, কখনো কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে অন্তত দুবার হাজির হয় পুরো কাব্যগ্রন্থে। হালের পপ কালচারে ঝড় তোলা ‘কে – পপ’ ব্যান্ড বিটিএস (‘কবিতার ক্লাস’) থেকে নিয়ে মার্গ সংগীতের কিন্নরী কৌশিকী চক্রবর্তী (‘জাস্ট মিউজিক্যাল’), যাঁর ধ্রুপদী ঝংকারে রাত গলে গলে পড়তে থাকে মিরপুর আর্মি স্টেডিয়ামের ক্ল্যাসিক মিউজিক ফেস্টিভালে।

অফ টপিক কাব্যগ্রন্থজুড়ে দেখা যায় কবি উপস্থিত তাঁর জটিল-সহজের বুননে নির্মিত জীবনদর্শনের কাব্যিকতায়। তা থেকে আমার পছন্দের কিছু লাইন উল্লেখ করছি –

ভাষার সুর নিলে

নিতে হবে ভাষার বজ্জাতিও (‘তন্দুরি খাওয়ার প্রহর’)

একমাত্র মরতে গিয়েই বুঝতে পারা যায়

বেঁচে থাকতে পড়া তলস্তয়ের মৌল মর্ম। (‘তাসখন্দে, তলস্তয়ের বন্ধ বাড়ির সামনে’)

হাঁটার প্রতিভা নিয়ে/ দৌড় প্রতিযোগিতায়/ জয়ী হওয়া যায় না (‘পদাতিক ২০২১’)

প্রতিটি অভ্যর্থনায় আছে গুডবাই – গন্ধ! (‘সূত্রসার’)

ফুলেদের ক্রমিক ধাক্কায়/ ময়লা হয়ে পড়ে থাকি/ নগরীর রাস্তায় (‘অফ টপিক’)

বেঁচে থাকার অশ্লীল অমরতায় জারি রাখছি/ আমার ছোট ছোট শ্বাসের শয়তানি। (‘বিউটি অফ ডেথ’)

কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে মোটামুটি তিনটি সমালোচনা আছে আমার। সংক্ষেপে বলি।

প্রথমত, কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম থেকে শুরু করে অনেকগুলি কবিতায় ইংরেজি শব্দের বহুল ব্যবহার চোখে পড়ে। এসব ইংরেজি শব্দের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক, আবার ক্ষেত্রবিশেষে হয়তো তারা প্রাসঙ্গিকতা-অপ্রাসঙ্গিকতার বিলীয়মান সীমায় দণ্ডায়মান।

দ্বিতীয়ত, পাঠ করার পর মনে হয়, কবিতাগুলির অধিকাংশই ক্ষণিকের অনুভূতিজাত। অর্থাৎ, কবিকে তাড়িত করেছে তার দৃশ্যমান জগতের কোনো এক বিষয়বস্তু এবং তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে পরিণত করেছেন কবিতায়। দীর্ঘদিন ধরে তাড়িত কোনো জীবনদর্শনের সন্তান তারা হয়তো নয়। 

তৃতীয়ত, অনেক কবিতাই মূলত একটি বাক্য, যাকে দুটি বা তিনটি শব্দে ভেঙে দুটো, বা তিনটে আলাদা লাইনে পরিণত করা হয়েছে। 

স্মৃতিকাতরতা, অস্তিমানতার যাতনা, প্রেম ও প্রেমহীনতা, বন্ধুত্বের উদযাপন, যাপিত জীবনের নিনাদে ঘেরা কাব্যগ্রন্থ অফ টপিক, কবি পিয়াস মজিদের কবিতায় আগ্রহীদের সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।

Leave a Reply