ছোট পত্রিকা, নতুন লেখা, অচেনা পাঠক অচেনা পাঠক

লেখক: দেবেশ রায়

এক
যে -সাহিত্য নিজের সংজ্ঞা বদলাতে পারে না, সে-সাহিত্য ভিতরে-ভিতরে মরতে থাকে। আমরা, যারা সেই সাহিত্যের সঙ্গে পুরুষানুক্রমিক জীবনযাপন করি, তারা বুঝতে পারি না, আমাদের সেই মৃত সাহিত্যের সঙ্গে বসবাস।
যেন কোনো বহু পুরনো বাড়ি। কয়েক পুরুষ ধরে সেখানে কত কী জমে উঠেছে, যার কোনোটারই কোনো ব্যবহার নেই, কোনটা কী কাজে ব্যবহার হল তা পর্যন্ত জানা নেই। বাচ্চার বেতের দোলনা থেকে কয়েক বুড়োর হাঁটার লাঠি, পুকুর থেকে মাছ তোলার নানা ধরনের জাল – সেই ধরনগুলোর সঙ্গে লুপ্ত হয়ে আছে এই জ্ঞান – কোন পুকুরে বা দিঘিতে বা কোন বিলে বা জোলায় কী মাছ পাওয়া যায় ও সেই মাছের জন্য কোন জাল চাই। কথাটা এই নয় যে, এ-ঘরের বাসিন্দেরা আর নানা ধরনের মাছ খায় না। মাছও আছে, বিভিন্ন স্বাদের জিভও আছে নানা রকম, মাছ খাওয়াও হয় দু-বেলা – কিন্তু কোনো একটা কারণে এই ঘরের এই জালগুলির সঙ্গে মাছের সম্বন্ধ নেই। সেটা এমন অনিবার্য কারণেও হতে পারে যে জাল ছিঁড়ে গেছে বা ডান্ডা ভেঙে গেছে। সারিয়ে নিলেই হতো – প্রথমত জাল খুব একটা ভালো সারানোও যায় না। ফেলে দিলেই হয় – স-র্ব-না-শ, ফেলে দেয়া মানে তো যেন সেই নানা জলে, নানা জালের মাছ খাওয়ার জীবনটাই ফেলে দেয়া। যা দিয়ে জীবন তৈরি করেছ তা ফেলা যায়? তাহলে বাড়ির মানুষ বুড়ো হলে তাকে ফেলে দিলেই হয়।
তুমি যাকে অতীত ভাবছ, বর্জনীয় ভাবছ, সেটা তো একটা জীবন, জীবনপ্রবাহ। সেই প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার প্রক্রিয়া আবিষ্কারের নামই তো শিল্প বা সাহিত্য।
এই বাংলাভূখ–র এমন কোনো মাঝারি নদীও আছে কি যার খাত বদলায় নি? সেই পুরনো খাল যে শুকিয়ে যায় তা না – কোনো বিল বা জোলা বা নিচু জমি হয়ে টিকে থাকে, বসবাসও হয়, চাষবাসও হয়। কিন্তু সে-খাতটি আর নদী থাকে না। নদীর একটা নিশ্চিত উৎস চাই, চিহ্নিত নিশ্চিত উৎস ও নদীর একটা নিশ্চিত উদ্দেশ চাই – সেটা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রই হয়, এ-নদী ও-নদী করতে-করতে।
সাহিত্যের সংজ্ঞাবদলের সঙ্গে নদীর খাতবদলের তুলনাটা আর বাড়াতে গেলে বিপদ আছে। তাই এই উপমা আর বাড়াব না। হয়তো এর পরেও দু-একবার এই উপমা বা তুলনা ব্যবহার করব কথা বলার সুবিধের জন্য। কিন্তু তার বেশি নয়।
বাংলা সাহিত্যের বিকাশে এই এক সমস্যায় বা জটিলতায় আমাদের পড়ে আসতেই হচ্ছে মোটামুটি সেই ১৮০০ সাল থেকেই, যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা হল, যেন এর আগে বাংলা সাহিত্য বলে কিছু ছিলই না – সাহেবরা ছাপার যন্ত্র এনে বাংলা ভাষার সাহিত্য তৈরিতে লাগলেন আর সংস্কৃতজ্ঞ কিছু বাঙালি লেখককেও লাগালেন।
এই প্রশ্নটা তখন কেউ করে নি – সাহেবরা যে-ভাষাকে বাংলা বলে চিনে, খানিকটা শিখে, কিছুটা বুঝে ও অনেকটাই না বুঝে বই লেখাল, সংকলন বের করল, সেই ভাষাটাকে তো অন্তত তখন কমপক্ষে ছ-সাতশ বছর টিকে আসতে হয়েছে, এই ছ-সাতশ বছর ধরে তো কত আখ্যান গাওয়া হয়েছে, যা এখন আমরা মঙ্গলকাব্য বলে চিনি, পাঁচালির কত গান তৈরি হয়েছে, বৈষ্ণবদের কত পালা গাওয়া হয়েছে, কত পুথি খাগের কলমে লেখা হয়েছে, মুসলমানি কত কেচ্ছা কাহিনির আকার নিয়েছে, ও, ইংরেজরা আসার মুখোমুখি ভারতচন্দ্রের বিশাল কাব্যে শব্দের, ছন্দের, গল্পের নতুন আকার তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে চৈতন্য ও মহান্তদের নিয়ে সব বাংলা পুরাণ লেখা হয়েছে, আবার, বিদ্যাসুন্দরের ঘোর শারীরিক কাব্য লিখে সুর দিয়ে হাটেমাঠেঘাটে গাওয়া হয়েছে গরিবচাষি থেকে তার জমিদারের শিল্পতৃপ্তির জন্য একই আসরে – সেটা কি বাংলা ভাষা ছিল না?
এই প্রশ্নটা তখন কেউ করে নি কিন্তু এর একটা ও একটাই মাত্র উত্তর অন্তত ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত সবাই মেনে নিয়েছিল। এই ‘সবাই’ হচ্ছে নব্য শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত, কলকাতা ও তার আশপাশ তখন তৈরি হয়ে উঠছে। আর, ‘উত্তর’টা হচ্ছে সে-বাংলা ছিল অনাধুনিক গ্রাম্য ভাষা, অশস্নীলতায় আকীর্ণ, সভ্যবিষয়ের বিনিময়ের অযোগ্য।
আমরা আমাদের ভাষাকে চিনতেই পারি নি। যেহেতু সে-ভাষা ইংরেজির অবিকল নয়। এখানে আমি শুধু একটা ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছি। সতীদাহপ্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে বাংলার নতুন সাংবাদিকতা তর্কবিতর্কে যে বাঁকা কথা, চোরা কথা, প্রবাদ, প্রতিপক্ষকে খিসিত্ম করা, খেউড় করার ধারালো চলৎশক্তি দেখিয়েছিল ও ঈশ্বর গুপ্ত সংবাদ প্রভাকর-এ পদ্য-সাংবাদিকতায় পদ্যের পরিচিত ভঙ্গির সঙ্গে নতুন অপরিচিত বিষয়ের বিস্ময়কর সংযোজন ঘটিয়েছিলেন, তার উৎস কিন্তু কবিগানের খেউড়-খিসিত্ম। আজ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একচোখো ব্যাখ্যার ফলে খিসিত্ম-খেউড় এই সব শব্দের একটিমাত্র অর্থই আমরা জানি। এগুলি যখন সামাজিক ব্যবহারের শব্দ ছিল তখন বাক্যের গড়ন, উপমা ব্যবহার, প্রতিপক্ষকে আক্রমণও বোঝাত। আর শব্দের সেই লক্ষবেধে এটা গ্রাহ্যই হত না – কোনটা শস্নীল আর কোনটা অশস্নীল।
ইচ্ছা করে ধন্না পাড়ি রান্নাঘরে ঢুকে
কুক হয়ে মুখখানি লুক করি সুখে। …
তেড় হয়ে তুড়ি মারে টপ্পা গীত গেয়ে
গোচে গাচে বাবু হয় পচা শাল চেয়ে
কোনো রূপে পিত্তি রক্ষা এঁটো কাঁটা খেয়ে
শুদ্ধ হোন ধেনো গাঙে বেনো জলে নেয়ে
এ বি পড়া ডবি ছেলে প্রতি ঘরে-ঘরে –
সাজায়েছে গাঁদা-গাদা ডেকসের উপরে।

ইংরেজরা এসে আমাদের বাংলা ভাষা শেখাতে শুরুর আগে আমাদের বাংলার বাড়িঘর, জলজঙ্গল, নদীখাল আমাদের কাছে পোড়ো ঘর, বা নদীর কোনো খাত পুরনো ছিল না। ইংরেজরা এদেশে এসে বাংলা বানাল আর বাঙালিরা বাংলা ভুলল।
কিন্তু জন্মের ভাষা ভোলা যায় না। বিদ্যাসাগর মশায়ের ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রসত্মাব দ্বিতীয় পুস্তক’ বাংলা লোকগদ্যের এক মহানিদর্শন। লোকগদ্য বলতে বোঝাচ্ছি ‘পাবলিক প্রোজ’। গদ্য হিসেবে মিলটনের ‘অ্যারিওপ্যাগিটিকা’র সমতুল্য। বাংলায় লোকগদ্যের কোনো ঐতিহ্যই ছিল না ও বিদ্যাসাগর ‘হিন্দু কলেজ’-এর ছাত্র ছিলেন না। অথচ তিনি কাশ্যপ প্রমুখ শাস্ত্রকারের যুক্তি খ-ন করছেন ও এই ‘দ্বিতীয় পুস্তক’ যতই উপসংহারের দিকে এগোচ্ছে ততই যে শানিত হয়ে উঠেছে, তা সম্ভব হয়েছে – ভারতচন্দ্র থেকে কবিগান পর্যন্ত ব্যবহৃত বাংলা ভাষার উদাহরণে ও অভিজ্ঞতায়। এই নির্ভেজাল বাংলা গদ্য ইংরেজি-প্রভাবহীন সচছলতায় ‘রত্নপরীক্ষা কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য প্রর্ণীত’ রচনাটিতে প্রখর প্রকট আক্রমী ও জঙ্গি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু বাঙালির সেই প্রখর, প্রকট, আক্রমী ও জঙ্গি নি জ স্ব গদ্য বা বাক্যরূপের নির্ভেজাল বাংলা বলে চিনতে হলে সাহিত্যের ইতিহাস রচনার পদ্ধতি বদলাতে হবে। আমরা বাংলা সাহিত্যের যে-ইতিহাসচর্চায় অভ্যস্ত সে সবই আমাদের প্রভু দেশের সাহিত্যের ইতিহাসের পদ্ধতির অনুযায়ী।
এতটাই অন্ধ অনুযায়ী যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বিদ্যাসাগর, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সেই ইতিহাসচর্চায় ইংরেজি-প্রভাবিত বাংলা গদ্যের উদ্ভবের ইতিহাসের অন্তর্গত করা হয়েছে। অথচ, এই তিনজন গদ্যলেখক অন্তত ইংরেজি সন্দর্ভ রচনার মতো ইংরেজি জ্ঞান আয়ত্ত করেছিলেন – এমন কথা তাঁদের জীবনী থেকে জানা যায় না।

দুই
এই বিভ্রাটের ফল কী হল? বাঙালি বাংলা জানে কিন্তু চেনে না। ইংরেজি চেনে কিন্তু জানে না।
১৮৫৪ সালে রাধানাথ শিকদার ও প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলায় একটা কাগজ বের করলেন, নাম মাসিক পত্রিকা। পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতা নেই, বাংলায় প্রথম ‘লিট্ল ম্যাগাজিন’। ‘এই পত্রিকা সাধারণের বিশেষত স্ত্রীলোকের জন্য ছাপা হইতেছে, যে-ভাষায় আমাদিগের সচরাচর কথাবার্তা হয়, তাহাতেই প্রসত্মাব সকল রচনা হইবেক। বিজ্ঞ প–তেরা পড়িতে চান পড়িবেন কিন্তু তাঁহাদিগের নিমিত্তে এই পত্রিকা লিখিত হয় নাই।’
সাহিত্য-ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে লিট্ল ম্যাগাজিনের যে চরিত্রলক্ষণ বিংশ শতকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে সেই লক্ষণগুলিকে চিহ্নিত করেছিলেন দুই সম্পাদক। ১. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্পষ্ট, ২. পত্রিকার বিশিষ্ট একটি ভাষাভঙ্গি আছে, ৩. পত্রিকার স্পষ্ট প্রতিপক্ষ আছে।
আজও আমাদের এই বাংলাভূমিতে প্রতিদিন যে অজস্র লিট্ল ম্যাগাজিনের জন্মমৃত্যু ঘটছে, ঘটে থাকে ও যে-লিট্ল ম্যাগাজিন ছাড়া বাংলা সাহিত্যের কোনো বিকাশ সম্ভবই নয়, তার প্রত্যেকটিরই এই একই নীতি বা প্রয়োজনবোধ। আজ থেকে ১৬৫ বছর আগে বাংলার প্রথম লিট্ল ম্যাগাজিন মাসিক পত্রিকায় সেটা নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল – ১. ভাষার প্রচলিত ঘের থেকে বেরিয়ে আসা, ২. স্পষ্ট পাঠক লক্ষ, ৩. স্পষ্ট প্রতিপক্ষ।
মাসিক পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই টেকচাঁদ ঠাকুরের (প্যারীচাঁদ মিত্র-এর ছদ্মনাম) আলালের ঘরের দুলাল বেরতে শুরু করে। লেখক-পাঠক সবাই এই রচনার অদ্ভুত পূর্ষতা বুঝতে পারছিলেন কিন্তু তাঁরা কেউই তাঁদের চেনা কোনো আকারের সঙ্গে এর কোনো মিল পাচ্ছিলেন না। উপন্যাস-এর ধারণাই তখন তৈরি হয়নি। ‘বিজ্ঞ প–তেরা’ অর্থাৎ যাঁরা ইংরেজি জানেন, তাঁরা এমন কোনো ইংরেজি বই মনে করতে পারলেন না যে ইংরেজি বই থেকে এটা অস্বচ্ছন্দ বাংলা গদ্যে অনুবাদগোছের কিছু করা হয়েছে। কেন পারলেন না? যেহেতু এই বইটির সমতুল্য কোনো ইংরেজি বই সত্যিই ছিল না ও এই বইটির নির্ভেজাল অনারোপিত স্বাধীন স্বাদেশিকতা। আমি অন্য একটি নিবন্ধে আধুনিক উপন্যাসতত্ত্বের ভিত্তিতে আলোচনা করেছি – কেন আলালের ঘরের দুলাল একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ও বাংলার প্রথম উপন্যাস। তাই এখানে সেই আলোচনার ভিতর ঢুকছি না। সাধারণত যে যে দোষকে আলালের ঘরের দুলাল-এর দুর্বলতা বলে দেখানো হয়, সেই সবই এই উপন্যাসের গুণ। একটি লিট্ল ম্যাগাজিন ছাড়া এই উপন্যাস বেরতেই পারত না। সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্বের কার্যকারণে পাঠক এ-রচনাকে উপন্যাস বলে চিনতেই পারল না।
এবার আমি একটু উল্টো দিক থেকে বুঝতে চাই, কখন একজন লেখকের লেখা প্রকাশের জন্য একটা লিট্ল ম্যাগাজিনেরই প্রয়োজন হয়।
দুর্গেশনন্দিনী, কপালকু-লা, মৃণালিনী (১৮৬৫-৬৯) বঙ্কিমচন্দ্রকে একজন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের মর্যাদায় যে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তার নিরিখটা ছিল ইংরেজি উপন্যাস। কপালকু-লা এই নিরিখটাকে অবান্তর করে দিয়ে বিশ্বনিরিখে আধুনিক হয়ে গেল। ঐতিহাসিক বিন্যাস, রোম্যান্স এসব পরিভাষা উপন্যাসকে ভুল পড়ায়। ঔপন্যাসিকের দুটি মাত্র অবলম্বন, সে-দুটিও সাপেক্ষ নয় : ঔপন্যাসিক কল্পনা ও ঔপন্যাসিক ব্যূহরচনা। যেমন শশিচন্দ্র দত্ত-এর বাঙালিয়ানা উপন্যাসটি ইংরেজিতে লেখা বাংলা উপন্যাস।
ঔপন্যাসিক কল্পনাই একটি উপন্যাসের অবলম্বন হতে পারে। আবার ঔপন্যাসিক কল্পনার বিভা বা দীপ্তি বা খনন বা উড্ডয়ন ছাড়াই, শুধু ঔপন্যাসিক কুশলতা (স্ট্র্যাটেজি)-তেই একটি উপন্যাস, উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে। ঘটনা, সংলাপ, নিসর্গ, নাটকীয় বিপরীত, পরম্পরা মনোদর্শিতা ভঙ্গি বিবরণ, বিশদতা বা বাস্তবতা – এ সবই উপন্যাসের রচনাপদ্ধতির অংশ। বাংলায় বনফুল-এর অধিকাংশ উপন্যাসই ব্যূহনির্মাণ।
কল্পনা ও ব্যূহরচনার মধ্যে বিনিময়ের অসমতা ঘটা খুব স্বাভাবিক। খুব বড় ঔপন্যাসিক সেই অসমতা ঘটতে দেন না। যেমন রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ ও যোগাযোগ। ঔপন্যাসিককে অদৃশ্য তুলাদ– এই সমতা নিরূপণ করতে হয়। কপালকু-লায় বঙ্কিমচন্দ্রের ঔপন্যাসিক কল্পনার বিষয় মৃত্যু। একদিকে কাপালিক,
আর-একদিকে নবকুমার সেই অবধারিত মৃত্যুর অবলম্বন। কপালকু-লার ছোট আকার ঔপন্যাসিক কুশলতাকে ঔপন্যাসিক কল্পনার সঙ্গে একেবারে অনুস্যুত করে দিতে পেরেছে। উপন্যাস-রচনা কোনো ইচ্ছাধীন প্রক্রিয়া নয়। কোনো-কোনো ঔপন্যাসিকের সারা জীবনেও কল্পনা ও ব্যূহরচনার সমন্বয় ঘটে না। কারো-বা একবার কী দুবার ঘটে। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো আত্মসচেতন ঔপন্যাসিক কপালকু-লার পর মৃণালিনীর ব্যর্থতা বুঝতে পারেন নি – এমন হওয়া খুব স্বাভাবিক নয়। একবারে গ্রন্থাকারে প্রকাশের ভিতর কিছুটা তো অনিশ্চয়তা থাকেই। বঙ্কিমচন্দ্রের ঔপন্যাসিক কল্পনা, ইতিহাস ও কল্পিত কাহিনির বেষ্টন থেকে মুক্তির আকাঙক্ষাও বোধ করে থাকতে পারে। আবার, তিনি তাঁর সমকালের মুখোমুখিও হতে চাইতে পারেন, সময়টা তখন এমনই ক্ষুব্ধ। ভাবতে চাই, বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসকে সন্দর্ভের আকারে অন্য অবলম্বন দিতে চাইলেন। তাঁর চতুর্থ উপন্যাস বিষবৃক্ষ প্রধানত ডিসকোর্স বা সন্দর্ভ ও প্যাশনের উপন্যাস। এই নতুন আকারের জন্য তাঁর একটা স্বতন্ত্র কাগজের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তিনি বঙ্গদর্শন প্রকাশ করলেন ও তার প্রথম সংখ্যা থেকেই বিষবৃক্ষ ধারাবাহিক বেরতে লাগল। বঙ্গদর্শন একটি পুরোপুরি লিট্ল ম্যাগাজিন – তার লক্ষ্য আছে, ভাষা আছে ও উদ্দেশ্য আছে। এমন একটি উদাহরণ খুব সুলভ নয় – যেখানে লেখক তাঁর নিজের প্রয়োজনে একটা কাগজ চাইছিলেন।

তিন
প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে। ঠাকুরবাড়ি থেকেই সাপ্তাহিক হিতবাদী বেরোতে শুরু করে। এই সাপ্তাহিক কাগজে রবীন্দ্রনাথ একটি করে ছোটগল্প লিখতে শুরু করলেন। একটি কথা এখানে বলে রাখা ভাল যে, ছোটগল্প এই সাহিত্য প্রকরণটি কে প্রথম আবিষ্কার করেন, তা নিয়ে নানা রকম মত দেখা যায়। ছোটগল্প বলতে যদি ছোট একটি কাল্পনিক কাহিনি বোঝায় – তাহলে এই প্রকরণ প্রথম আবিষ্কার করেন রবীন্দ্রনাথ। এডগার এলেন পো নন, চেকভ নন, মোপাসাঁও নন। বাংলা ভাষায় লেখা এই ছয়টি গল্প সাপ্তাহিক হিতবাদীতে প্রথম প্রকাশিত হয় ও এগুলিই বিশ্বের প্রথম পূর্ণাকার ও নিরুপলক্ষ ছোটগল্প। ১২৯৮-এ হিতবাদীতে পর-পর তাঁর সাতটি গল্প বেরয়। বাংলা পাঠক এমন রচনার জন্য প্রস্ত্তত ছিলেন না। তাঁরা এই গল্পগুলি পড়ে উঠতেই পারলেন না – এই ব্যর্থতাকেও আমরা সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব বলছি। আজও এই সাতটি গল্প পৃথিবীর যে-কোনো শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলনে সংকলিত হতে পারে। হিতবাদীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে গেল। কিন্তু তাঁর একটি কাগজের প্রয়োজন। ভ্রাতুষ্পুত্র সুধীন্দ্রনাথকে সম্পাদনার দায়িত্ব দিয়ে সাধনা বের করলেন রবীন্দ্রনাথ (১২৯৮, অগ্রহায়ণ)। সাধনা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প লেখার কাগজ হয়ে উঠেছিল। সাধনার চার বছরে গল্পগুচ্ছে অনেক প্রধান গল্প প্রকাশিত হয়েছে। কৌতুকের কথাও একটু
আছে – রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলি খুব কম সময়ে, ধরা যাক চার-পাঁচ বছরে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, নাট্যপ্রযোজক অমরেন্দ্রনাথ দত্ত গল্পগুচ্ছ নাম দিয়ে নাট্যাভিনয়ের টিকিটের সঙ্গে সেগুলি বিতরণ করতেন।
এতগুলি উদাহরণ দিয়ে এটুকুই শুধু বুঝতে চাইছিলাম যে – বাংলা সাহিত্য বা বাংলা ভাষা যখন শিক্ষিত বাঙালির কাছে অবোধগম্য, তখন লিট্ল ম্যাগাজিনই বাংলা সাহিত্যের নতুন বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে এই অবিচলিত লক্ষ্য যে, তার ভাষা নতুন, লক্ষ্য নতুন ও প্রতিপক্ষ একটা চিহ্নিত আছে।
লিট্ল ম্যাগাজিন সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক সমাজতত্ত্বকে বাতিল করে দেয় ও নতুন সমাজতত্ত্বকে সক্রিয় করে তোলে।

  • রাজশাহীতে চিহ্ন পত্রিকার লিট্ল ম্যাগাজিন মেলায় ১১ মার্চ, ২০১৯-এ লেখাটির প্রথম খসড়া পড়া হয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: