প্রস্থানের আগে l হরিশংকর জলদাস l অন্যপ্রকাশ l ঢাকা, ২০১৯ l ৭০০ টাকা

প্রস্থানের আগে (২০১৯) উপন্যাসটিতে কথাকারিগর হরিশংকর জলদাস তাঁর আত্মজীবনের বয়ান যে জীবনাভিজ্ঞতায় বুনন করেছেন, তাতে তাঁর জীবনসত্যের খুব একটা অপলাপ ঘটেনি। বরং এতদিনের লেখকজীবনের বিচিত্র বাঁকবদল ও অনেক অজানা সত্য; কল্পনা ও বাস্তবের সংমিশ্রণে জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে তা একদিকে যেমন লেখককে আত্মানুসন্ধানে নিমগ্ন করেছে; অন্যদিকে এ-কাহিনিরস পাঠককে উদগ্র এক জীবনতৃষ্ণার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বৃহদায়তন এই উপন্যাসের সৃজনভূমিতে দাঁড়িয়ে লেখক তাঁর জীবনের অন্ধ্রেরন্ধ্রে ঘূর্ণায়মান নোনাজলের নোনাসংগ্রামের দলিত ইতিহাসের মেদ-মজ্জা-অস্থি-কংকাল পুনর্খননের মধ্য দিয়ে পুরুষানুক্রমে সে-ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার ও পুনর্পাঠ ঋজু গদ্যে উপস্থাপন করেছেন।

হরিশংকর জলদাসের সুপ্ত মনোরথের সার্থক রূপায়ণ লক্ষ করা যায় প্রস্থানের আগে উপন্যাসের কাহিনিবৃত্তে। বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে থাকা সাতষট্টি বছর বয়স্ক শিবশঙ্কর জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে। তার জীবনের চিত্রার্পিত পর্দা উন্মোচনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনিসূত্র গ্রন্থিত হলেও পরবর্তী পরিচ্ছেদেই লেখক শিবশঙ্করের আঁতুরঘর উত্তর পতেঙ্গার জেলেজীবনে প্রবেশ করেন। সমুদ্রের নোনাজলের বিক্ষুব্ধ ঝঞ্ঝা, মাছের আঁশটে গন্ধে ভারি হয়ে ওঠা বাতাস অপরিসর-অপরিচ্ছন্ন যে-জেলেপাড়াকে সবসময় সভ্য দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, উত্তর পতেঙ্গার সেই জেলেপাড়ার কর্মঠ জেলে সুধাংশু জলদাস জীবনের ঊষালগ্নেই চেয়েছেন তার পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ সন্তানদের অন্তত যে-কোনো একজনকে জলদাস পরিচয় হতে মুক্ত করতে। তার জ্যেষ্ঠপুত্র শিবশঙ্কর পিতার এই সংকল্পকে স্বানুভাব দ্বারা লালন করে মাধ্যমিক পাশের মধ্য দিয়ে অশিক্ষিত জেলেসমাজে এক ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। জীবনযুদ্ধে হার-না-মানা দ্বৈরথ সুধাংশুর স্বপ্নরথে চালকের আসনে উপবিষ্ট হয় শিবশঙ্কর। যে-গ্রামে বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা, শিক্ষার আলো নেই – এমন একটি পশ্চাৎপদ গ্রামের জেলেপুত্র শিবশঙ্কর পতেঙ্গা হাইস্কুলে থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে সে মূলত নিজেকে নয়, বাবা সুধাংশু জলদাসকেই জয়ী করে তুলেছে। উপন্যাসে তিন ধরনের যাপিত জীবনের সঙ্গে শিবশঙ্কর ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। উত্তর পতেঙ্গায় জীবনের যে-শাঁসবীজটি তিনি পূর্বপুরুষ থেকে জন্মসূত্রে পেয়েছিলেন; কলেজজীবন ও মাইজপাড়ায় সে-বীজটি প্রতিকূল প্রতিবেশে ভ্রূণায়িত হয়েছে এবং আমৃত্যু জীবনযুদ্ধে শিবশঙ্করকে লড়ে যাওয়ার ‘দম’ জুগিয়েছে। মাইজপাড়ার মতো ছোট্ট জেলেপাড়য় মানবজীবনকেন্দ্রিক নানা নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। জেলেপাড়ায় নিম্নবংশজাত জেলে সম্প্রদায়ের অনেক পাত্র-চরিত্র সে-নাটকের কুশীলবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। হরিবন্ধু, ফুলমালা, অধরচন্দ্র, জগবন্ধু, বিজয়া, মানিক, মঙ্গল, তুফান, কেষ্ট, বৃন্দাবন ঠাকুরের মতো অনেকের জীবনের আলো-আঁধারের গল্প জীবননাট্যের অনুষঙ্গ হয়ে মাইজপাড়ায় জেলেজীবনে মঞ্চায়িত হয়েছে। শিবশঙ্করের বহতা জীবন এ-নাট্যমঞ্চের বাইরে থাকেনি। তবে সে এ-পাড়ায় জীবননাট্যের স্থায়ী নট নয়, তার জীবনগাথা নোনাজল থেকে নগরজীবন পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত।

উত্তর পতেঙ্গার সমুদ্রজীবী সুধাংশু জলদাসের এক বর্ধিষ্ণু জেলেপরিবারে জন্ম শিবশঙ্করের। বাবা-মা ও সাত ভাইবোনের হাঁ-করা অভাবের সংসার। মাইজপাড়ার জীবন তাকে সে-অভাব থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখলেও যখনই তিনি উত্তর পতেঙ্গার জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তখনই দারিদ্র্যপীড়িত সংসারের ধুক্ধুক্ হৃদস্পন্দনটি শুনেছেন এবং অন্তর দিয়ে তা অনুভব করেছেন। মাইজপাড়ায় তিনি চট্টগ্রাম কলেজে অনার্সে পড়া স্বপ্নকাতর এক শিক্ষিত যুবা, যিনি ‘আলোর পথযাত্রী’ শিক্ষিত জনজাতির গর্বিত অংশ। উত্তর পতেঙ্গায় ফিরলে তিনি যেন নিমিষেই সেই গর্বিত আলোর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জলজীবনের উত্তরাধিকারলালিত জলপুত্রের একজন হয়ে ওঠেন। বাবার অর্থনৈতিক অক্ষমতা, ভাইদের শিক্ষাবিচ্যুৎ হয়ে বাবার সঙ্গে সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নেওয়ার দৃশ্য তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিত। তাদের সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে মৎস্য শিকার করতে হতো। পরিবারের অন্য সদস্যদের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত দুর্বার সংগ্রাম করতে দেখে শিবশঙ্কর মনে মনে এক ধরনের মর্মপীড়া অনুভব করতেন।

উপন্যাসে শিবশঙ্কর ঔপন্যাসিকের ধৈর্য ও অধ্যবসায়কে জীবন-উৎকর্ষের চাবিশব্দ বিবেচনা করে তরঙ্গসংকুল পথ অশঙ্কচিত্তে অতিক্রমে অভিনিবিষ্ট হয়েছেন। বহুধাবিভক্ত জীবনের তেতো অভিজ্ঞতাকে অবিমৃষ্যকারীর মতো নঞর্থকতার ছাঁচে ফেলে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলেননি। জীবন নিয়ে শ্লাঘা বোধ না করলেও বিষাদের নোনাজল যে সে-জীবনের চারপাশে ঘোঁট পাকায়নি এমনটা নয়। অপমান, অপযশ, লাঞ্ছনা, নিন্দা, দলিত জনগোষ্ঠী হওয়ায় উচ্চবংশজাতদের ঘৃণা, অবজ্ঞা, সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার ছোবল, প্রিয়জন হারোনোর অন্তর্দাহ, আপনজনদের কাছ থেকে আসা অপ্রত্যাশিত আঘাত শিবশঙ্করের জীবন ভাঁড়ারে এসে থরে থরে সঞ্চিত হয়েছে। অব্যক্ত ব্যথাকে বুকের ভেতর পুষেছেন কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের সংকল্পে ছিলেন অটল। পরিশ্রম, সততা, জীবনের প্রতি দায়বোধ, প্রান্তিক বর্ণপরিচয়কে ঘুঁচিয়ে দেবার অবিনত প্রত্যয় তাঁকে কর্তব্যকর্ম প্রতিপালনে অবিচল করে তুলেছে। পূর্বপুরুষের জলজীবনের সংগ্রামকে তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। পূর্বপুরুষের নোনাজীবন তার ভেতরে গভীরতর এক জীবনবোধের জন্ম দিয়েছে। মাইজপাড়ার কলেজজীবন থেকে যখনই উত্তর পতেঙ্গার নিজ বাড়ির জেলেজীবনে শিবশঙ্কর ফিরেছেন, তখনই বাল্যবন্ধু সুনীল, অসমবয়সী  চৈতন্য  খুড়ার  সঙ্গে  সমুদ্রপারে  বসে  তাদের  সাথে ফেলে-আসা জীবনের গল্প নিয়ে মেতে উঠেছেন। জল-জীবনবোধ ও জেলেজীবন দর্শন তাকে ক্ষণকালের জন্য ভাবুক করে তুলেছে।

পঁয়তাল্লিশটি পরিচ্ছেদে বিভাজিত প্রস্থানের আগে উপন্যাসটি কৈবর্তসন্তান শিবশঙ্করের নোনাজীবনের, নোনাচেতনার; জলজ-অভিজ্ঞতার অর্গল ভেঙে আলোকোজ্জ্বল উজানে পৌঁছাবার অক্ষরসমুদ্র। প্রকারান্তে শিবশঙ্করের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাসের জলজীবন ছেড়ে জ্ঞানজীবনে প্রবেশের শব্দতোরণ এই উপন্যাস। তাই জীবনের দারিদ্রতাকে পরাজিত করে, অশিক্ষার অভিশাপ হতে মুক্ত হয়ে, ভদ্রসমাজের একজন হয়েও শিবশঙ্কর কৈশোরে কাঁধে লইট্যা মাছের ভার বহনের চিত্রটি বিস্মৃত হননি। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পর তার সহকর্মী গণিতের সহকারী অধ্যাপক রঞ্জিতকুমার দত্ত শিবশঙ্করের অধ্যক্ষ হওয়ার পর ‘কোন কথাটি প্রথমে মনে পড়ছে’ এমন প্রশ্ন করলে উত্তরে শিবশঙ্কর বলেন – ‘আমার  চোখের  সামনে  দিয়ে  একটি   চৌদ্দ-পনেরো বছরের বালক দৌড়ে যাচ্ছে। তার কাঁধে মাছের ভার। মাছের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে ছেলেটা। তারপরও দৌড় থামাচ্ছে না। তাকে যে মাছের ভারটি নিয়ে তিন মাইল দূরের কমল মহাজনের হাঁটে পৌঁছাতে হবে। মাছ বেচা টাকায় কেনা চালডালে যে তার মা, বাবা ভাইবোনদের ক্ষুন্নিবৃত্তি হবে। আর এই বালকটি আর কেউ নয় আমি। বালকবেলায় দিনের পর দিন এরকমই করতে হয়েছে আমায়।’(পৃ ৩১৪)

শিবশঙ্করের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকার চিত্র দিয়ে ঔপন্যাসিক উপন্যাসের যে-পট উন্মোচন করেছিলেন তার যবনিকাপাত ঘটিয়েছেন বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকা শিবশঙ্করের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। উপন্যাসের কাহিনি একটা বিন্দু হতে গোলাকার একটি রেখার মতো ঘূর্ণায়মান হয়ে আবার সেই বিন্দুটিকেই স্পর্শ করেছে। শিবশঙ্করের প্রস্থানের আগের চিত্রটি উপন্যাসের শুরুতে প্রতিস্থাপন করে পুরো গল্পের সমাপ্তি টেনে শেষ দৃশ্যে তাঁর প্রস্থানের চিত্রটি অঙ্কন করে হরিশংকর জলদাস উপন্যাসটিকে বিন্দু থেকে বৃত্তায়নের দিকে নিয়ে গেছেন। মাঝের সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার সুপরিসর সৃজনভূমিতে তিনি জলজীবনের কাহিনি বয়ন করেছেন। এ যেন শিবশঙ্করের জীবন উলটেপালটে জলজীবন থেকে জ্ঞানজীবনে উত্তরণের এক শৈল্পিক জলভাষ্য রচনা করেছেন হরিশংকর জলদাস। নায়ক শিবশঙ্করের জীবন-উত্তরণের সন্ধিক্ষণে উপন্যাসের আদ্যোপান্তে তিনি পাঠককে বিচিত্র কৈবর্তজীবনের বিস্ময়কর জলগদ্যের কাহিনিই শুনিয়েছেন।

প্রস্থানের আগে উপন্যাসের সংলাপ ও ব্যবহৃত ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে চরিত্র-উপযোগী হয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বিশেষত জেলেদের উপযোগী কথ্যভাষার ব্যবহার উপন্যাসটিতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। সে-ভাষা শিক্ষিত সভ্যজনের ভাষার মতো প্রমিত ও পরিমিত নয়। খিস্তি, খেউড়, গালাগালিতে ব্যবহৃত শব্দের মিশেল ভাষাকে গল্প ও চরিত্রানুগ করেছে। উপন্যাসে অপূর্ব ও শিউলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাতিজা চণ্ডী ও চাচা নিতাইয়ের মধ্যকার সংলাপ এক্ষেত্রে লক্ষণীয় –

চণ্ডী কর্কশ গলায় বলল, ‘আমার মনে হইতাছে শিউলি বাওনাইয়ার ঘরেই আছে। অহন কী কইরবা ভাইবে দেখো।’

নিতাই বলল, ‘বজ্জাতিনিরে ধইরে আন। কোপাইয়া দুই টুকরা কর। খানকির পোলা অপূর্বর চনু কাইট্যা লমু আমি।’

… শিউলীকে চাপা স্বরে ডেকে অপূর্বর ঘর থেকে বের হয়ে আসতে চণ্ডীচরণ বলেছিল, – ‘শিউলি, হে শিউলি। বাইরাইয়া আয়। চোদমারানির পোলা বওনাইয়ার ঘরত্তোন বাইরাইয়া আয়।’ (পৃ ১১৭)

খিস্তি-খেউড়ের পাশাপাশি ক্রিয়াপদের আঞ্চলিক ও এলায়িত ব্যবহার এখানে লক্ষ করা যায়। যেমন : করবে-কইরবা, ভেবে-ভাইবে, ধরে-ধইরে, বের হওয়া-বাইরাইয়া প্রভৃতি। শব্দ-ব্যবহারের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উপভাষার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জেলেজীবন ও জেলেসমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ উপন্যাসে লেখক দক্ষতার সঙ্গে ঘটিয়েছেন।

কাহিনির অনুষঙ্গে পৌরাণিক নাম সংযোজনে লেখক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

জেলেদের বাড়িঘর, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব উপন্যাসটি পরিলক্ষিত হলেও প্রস্থানের আগে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রজীবী জেলেদের এবং বিশেষভাবে শিবশঙ্করের নোনাজীবনের সংগ্রামের কাহিনি। লেখক তাঁর জীবনযুদ্ধ ও জেলেজীবনের গল্পই শিবশঙ্করের জীবনচিত্রের মধ্যে প্রতিঅঙ্কিত করে তুলেছেন। তাই ঘুরেফিরে লেখকজীবনের নানা ঘটনা-উপঘটনার অনুষঙ্গ বাস্তব ও কল্পনার সংশ্লেষণে শিবশঙ্করের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে। উপন্যাসে শিবশঙ্করের ছায়ামূর্তির ভেতর দিয়ে মূলত ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাসই এই উপন্যাসের অদৃশ্য নায়কের আসনে সমাসীন হয়েছেন।

ঔপন্যাসিক প্রস্থানের আগে উপন্যাসটি লেখার সময়কালে এর দুটি অংশের প্রথমটি একী লাবণ্য পূর্ণ প্রাণে নামে অন্যদিন পত্রিকার ২০১৭ সালের ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং অন্য একটি অংশ ঢেউ নামে সমকালের ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সমগ্র উপন্যাসটি একাত্তর পেরিয়ে নামে প্রকাশের ইচ্ছে থাকলেও ঔপন্যাসিকের সাহিত্যিক বন্ধু মোহিত কামালের পরামর্শে লেখক নাম পরিবর্তন করে উপন্যাসটির নামকরণ করেন প্রস্থানের আগে। জেলেজীবনবৃত্তে শিবশঙ্করের জীবনগাথাকেই যে লেখক উপন্যাসে বিভাসিত করে তুলেছেন তাঁর নামকরণের মধ্যে সেই সুরটিই যেন স্পষ্টভাবে বেজে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৩৬), অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৫৬), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৭), হুমায়ুন কবীরের নদী ও নারী (১৯৪৫), সমরেশ বসুর গঙ্গা (১৯৫৫), আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৬), আলাউদ্দিন আল আজাদের কর্ণফুলীর (১৯৬২) মতো কালজয়ী নদীভিত্তিক উপন্যাসের সারিতে হরিশংকর জলদাসের প্রস্থানের আগে উপন্যাসটি এক নবতর সংযোজন; যেখানে সমুদ্রজীবী জেলেদের জীবনবাস্তবতাকে ঔপন্যাসিক ভাষারূপ দিয়েছেন। নদী ও জলজীবন নিয়ে লেখা অন্যান্য উপন্যাস যেখানে বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়াচ্ছে, সেখানে সমুদ্রের নোনাজীবনকে হরিশংকর জলদাস তাঁর প্রস্থানের আগে উপন্যাসে কাহিনির মূল বিষয় করে তুলেছেন, যা কালের পরিক্রমায় হয়তো একদিন ভিন্নতর জীবনের সুর ও স্বরের দ্যোতক হয়ে উঠবে।

Leave a Reply