‘দ্যাখ, বদ বেডায় কেমনে তাকায়। মনে হয়, গুঁতা দিয়া চউখ দুইটা গাইল্যা দেই।’ বকুল বেশ জোরেই কথাগুলি বলে। যে তাকিয়েছিল, সে হাসতে হাসতে ওদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে চোখ টিপে। 

‘ওই খানকির পুত, আরেকদিন যুদি তরে এইদিকে দেখি, পিডাইয়্যা হাড্ডিগুড্ডি ভাইঙ্গালামু।’ বলতে বলতে কাজল উঠে দাঁড়ায়। লোকটার দিকে তেড়ে যেতে উদ্যত হলে রোজিনা বাধা দেয়। 

‘থাকরে কাজল, যাইতে দে। কয়জনরে মারবি?’

‘ওই দ্যাখ, আরেক বেডায় কেমন নেশা নেশা চউখ কইরা বকুলরে দেখতাছে। মনে হয় পছন্দ হইছে অরে।’ চুলে বিলি কাটা থামিয়ে রোজিনা লঘু স্বরে বলে। ‘দেখবো না! যেই সুন্দর বকুল!’ 

‘দূর খানকি মাগি, বেডায় হইবো আমার বাপের বয়সী!’

‘বাপ কে সেইডাই জানস না, আবার বাপের বয়সী!’ রোজিনা বকুলের গায়ে ঠেলা দিয়ে হাসে।

‘অল্প বয়সী হইলে বুঝি তর অসুবিধা আছিল না?’ কাজল মুখ টিপে হেসে বলে। ও রোজিনার মাথায় বিলি কাটছে।

‘হ, বয়স কম হইলে বিবেচনা কইরা দেখতাম।’ বলতে বলতে বকুলও হাসে। হাসতে হাসতে তিনজন ওরা একজন আরেকজনের গায়ে গড়িয়ে পড়ে। পথিক বেচারা ততক্ষণে বড় বড় পদক্ষেপে পালিয়ে যাচ্ছে।

ফুটপাত ঘেঁষে হাত পাঁচেক মতো জায়গা। ওই হাত পাঁচেক জায়গা আর ফুটপাতের অনেকটা অংশ জুড়ে ওদের ঝুপড়ি। সারি সারি। বিভিন্ন জন বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এসে জড়ো হয়েছে এখানে। পুরুষরা কেউ দিনমজুর, কেউ রাজমিস্ত্রির জোগালি, কেউ ঠেলা চালায়, ভাঙাড়ির দোকান চালায় কেউ। কেউ কেউ রিকশা চালায়। বউ-ঝিরা হোটেলে কাটা-বাটার কাজে করে কেউ, কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করে, কেউ বাজারের দোকানে পানি দেয়। বয়সী মেয়েরা কেউ কেউ সন্ধ্যায় কী কাজে বের হয়! ফেরে শেষ রাতে। অথবা সকালে। 

দুপুর হয়েছে কখন! সবাই প্রায় বাইরে। ঝুপড়িগুলি এখন কেমন নিঝুম! বুড়ি ফজিলত বাজার ঘুরেফিরে রান্নার তোড়জোড় করে। বারবার খুঁজে আজ পাওয়া গেছে খাসির নাড়িভুঁড়ি। কসাইটা এমন চামার, এসবও বিক্রি করে। আজ কী মনে করে দিলো তাকে কে জানে! 

মাটির চুলাটায় পাতিলভর্তি পানি বসিয়ে বাটতে বসে ফজিলত।

ভাঙা পাটাটাতে কুড়িয়ে আনা আদা-রসুন-পেঁয়াজ-মরিচ বাটে। একটু জিরা আর গরম মসলাও এনেছে, টাকা দিয়ে। তাও বাটে। মনকাড়া কেমন একটা গন্ধ ছড়ায়। দেখতে দেখতে পাতিলের পানি ফুটে টগবগ করে।

খাসির নাড়িভুঁড়ির ভেতরের ময়লা বের করে পাতিলে ছাড়ে ফজিলত। ধীরে ধীরে পানির রং ঘোলাটে হয়ে আসে। ফজিলত চেয়ে দেখে। আরো খানিক্ষণ ফুটলে পাতিল নামিয়ে ফুটপাতের কিনারে ড্রেনে পানি ঝরায়। নাড়িভুঁড়ি হাতে ডলে ভালোভাবে পরিষ্কার করে। ধুয়ে রান্না বসায়। ছেলের বউটা যখন-তখন ফিরবে। ফজিলত নাড়িভুঁড়ি রান্না করছে দেখলে চেঁচামেচি করবে। ভিক্ষা করা সহ্য করতে পারে না হনুফা। 

 ঝুপড়ির সামনে পা ছড়িয়ে বসে আছে আকবর। বের হবে কি না ভাবছে। রেললাইনের ধারে গিয়ে বসলে কটা টাকা পাওয়া যায়; কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না। কাল বৃষ্টিতে ভিজেছিল।

গা-টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বরই আসবে বোধহয়। … বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে যায়। গন্ধটা নাকে এলে সোজা হয়ে বসে আকবর। মাংসের গন্ধ! গন্ধে পেটের ভেতর ক্ষুধাটা মোচড় দিয়ে ওঠে। … ফজিলত বুড়িই বোধহয় রান্না করছে। … ড্রেনের ধারে মনে হয় কারো বাচ্চা হাগছে, কাঁচা গুয়ের কেমন একটা বদগন্ধ আসছে। আকবর পা গুটিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

চোখদুটো এখন প্রায় বাদই হয়ে গেছে আকবরের। পাঁচ হাত দূরের কিছু ঠাওর হয় না ভালোমতো। আবছা ঠেকে। ধীরে ধীরে হয়তো পুরোপুরি অন্ধই হয়ে যাবে সে। … বছর দুয়েক আগে কী যেন হয়েছিল চোখে। কথা নেই বার্তা নেই, একদিন হঠাৎ ডান চোখ থেকে রক্ত পড়া শুরু করল। রাতে শুরু হয়েছিল রক্ত পড়া, সকাল না হতেই বন্ধও হয়ে গেল। … দেখত আগের মতোই। আর একদিন বাঁ চোখ থেকে রক্ত পড়তে শুরু করল। হঠাৎ আবার বন্ধও হয়ে গেল, ডানটার মতোই। পরে আর কোনোরকম জ্বালা-পোড়া না, ব্যথাও না। তবে আস্তে আস্তে দুচোখের দৃষ্টি কমতে লাগল। একবার অবশ্য ঢাকা মেডিক্যালে গিয়েছিল, ডাক্তারের কাছে চোখ দেখাতে। … ডাক্তার বলছিল, কি যেন বিরল রোগ… দেশে চিকিৎসা নেই। চিকিৎসায় মেলা খরচ। আরো কী কী সব। … আর যাওয়া হয়নি ডাক্তারের কাছে। 

‘চাচি, মাংস রান্ধো নাকি?’

ফজিলত চুলায় ফুঁ দিচ্ছিল, মুখ তুলে বলে, ‘তুই বলে চোখে দেখস না আকবর। ঠিকই তো টের পাইলি!’

‘চোখে না দেখলে কী হইব, নাকে তো গন্ধ পাই ঠিকই।’ আকবর হাসে। ‘… কী গন্ধ বাইর হইছে চাচি! গরুর মাংস নাকি?’

‘মাংস পামু কই! খাসির নাড়িভুঁড়ি। তাও কিনতে পঞ্চাশ টাকা নিল।’ মিথ্যে করে কেনার কথাটা বলতে একটুও খারাপ  লাগে না ফজিলতের। ‘… তুই যে আইজকা অহনতরি বাইর হইলি না আকবর?’

‘বাইর হমু। রইদাটা মরুক। গাটা কেমন জানি করতাছে, গতকাইল বৃষ্টিতে ভিজছিলাম তো।’

‘তুই একটা বিয়া কর। সারাদিন ভিক্ষা কইরা আবার নিজে রান্ধনবারণ। … বয়সও তো বেশি না তর।’

‘নাগো চাচি, আমিনার পরে আর …। নিজের মতো আছি, এই ভালা। মানুষ একজন, পেটের চিন্তা নাই। খাইলে খাইলাম, না খাইলে না খাইলাম।’  

‘কী রান্ধোগো দাদি, গন্ধে সারা বস্তি ম-ম করে!’ ঝুপড়ি থেকে বের হয়ে এসে বকুল ওদের সামনে দাঁড়ায়। হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙে। বয়স ষোলো-সতেরো হবে ওর। চেহারা যেমন-তেমন, শরীরখানা ভরাট। সবাই জানে বকুল শরীর বেচে খায়।

ফজিলত জবাব দেয় না। চুলার আগুনটা একটু উসকে দেয়। হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে একবার নাড়ে। তাতে গন্ধটা আরো ছড়ায়।

‘আমারে একটু তরকারি দিবা দাদি। কয়টা ঠান্ডা ভাত আছে রাতের। মাইখ্যা খাইতাম।’ বকুল পাছা ঠেকিয়ে মাটিতে বসে।

‘ওই ছেমড়ি, সইরা ব। গায়ের ওপর আইসা বসলি যে।’ 

‘তরকারিই তো চাইছি একটু। দিলে দিবা না দিলে নাই। অত দূর ছাই করো কিয়ের লাইগ্যা! মনে হয় আমি মানুষ না।’

‘মানুষ হবি না কা। মানুষেরই তো সব।

হাত-পাও-মুখ-গতর!’ 

‘যাউগ্যা। হটেলত্যে আইন্যা খামু। টাকা থাকলে আর চিন্তা কী!’ বকুল হাই তুলতে তুলতে চলে যায়।

‘হ টাকাত থাকবই। গতরবেচুনি। বেশ্যা!’ নিচু স্বরে বলে ফজিলত। রান্নাটা হয়ে এসেছে, সাবধানে নামায়। চুলার আঁচ গনগন করছে। একটু পানি ছিটায়। চুলা থেকে ধোঁয়া ওঠে।

আকবর পলকহীন চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফজিলত রান্না করা মাংসের পাতিল ঝুপড়ির ভেতরে নিয়ে গেলে উঠে দাঁড়ায়। ‘যাইগো চাচি।’ 

ফের ঝুপড়ির কাছে এসে পা ছড়িয়ে বসে আকবর। মাংসের গন্ধটা এখনো নাকে লেগে আছে। ক্ষুধা যেন আরো জোরালো হয়েছে। তা এই নিয়ে ভাবনা নেই অবশ্য। ক্ষুধার সঙ্গেই তো বসবাস। পেটের ক্ষুধা একসময় পেটেই মরে যাবে। শরীরটা কাঁপছে, জ্বরটা এসেই গেল বোধহয়। নাহ্, আজকে আর বের হওয়া হবে না। ঝুপড়িতে ঢোকার আগে বুঝতে পারে, আমিনা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে আর তরকারি কুটছে। ভালোমতো দেখা যায় কি যায় না। তবু সে বোঝে, ওটা আমিনাই। গড়নগাড়নটা তো আর অপরিচিত নয়।

গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় না এলেই কি ভালো ছিল, মাঝে মাঝে ভাবে আকবর। ভালো আর কী, অভাব না থাকলে, বাধ্য না হলে কি আসত? তা ঢাকায় এসে রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে ভালোই রোজগার হতো। তখন চোখ ভালো ছিল। শরীরে শক্তিটাও বেশি ছিল। সেসব প্রায় বছরসাতেক আগের কথা। মালিবাগ রেললাইনের কাছে এই ফুটপাতের ধারে তখন তার মতো কেউ কেউ পলিথিন আর বাঁশ দিয়ে ঝুপড়ি তুলেছে। আকবরও সংসার পেতে বসল। আমিনা ঘরেই থাকত, কাজটাজ করত। আকবরের রোজগারে দুজনের ভালোই চলত। আমিনাকে নিয়ে, নিজের রোজগার নিয়ে সুখীই ছিল সে। আর কোনো চাহিদা ছিল না তার। 

তবে আমিনার যে চাহিদা ছিল, তা সে জানতো না। কীভাবে কীভাবে যে সালামের সঙ্গে সম্পর্ক হলো তার! ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি আকবর। তবে একদিন সন্ধ্যায় আমিনা সালামের ঝুপড়িতে চলে গেলে মেনেই নিয়েছিল সে। তার বুক ঠেলে শুধু একটা দীর্ঘশ^াসই বের হয়ে এসেছিল। আর কিছু না। প্রতিবেশীরাও কেউ কিছু মনে করেনি। হয়তো ওরা ব্যাপারটা জেনে গেছে। এসব কি আর চাপা থাকে!

এখন বেশ আছে আমিনা। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। সালামও ভালো মানুষ। শক্তপোক্ত জোয়ান। মালিবাগ বাজারে নাকি মাছ কাটার কাজ করে। রোজগার বোধহয় খারাপ না। আমিনার গা-গতর দেখার মতো হয়েছে। বাইরে কাজ করতে যায় না, তাতেও বোঝা যায়। 

রাস্তার ধারে ট্যাপের পানিতে গোসল করছে বকুল। গায়ে পানি ঢেলেছে। ভিজা কাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে এখন সাবান ডলছে। পথচলতি পুরুষরা কেউ কেউ যেতে যেতে ফিরে ফিরে তাকায়। বকুলের খারাপ লাগে তা নয়। পুরুষদের চাহনিতে নিজের দামটা যেন বুঝতে পারে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে পায়ের পাতায় সাবান ঘষে।

 প্রতিবেশীরা জানে তার চরিত্র খারাপ। জানে পাপপথে রোজগার করে সে। তা বকুল তাদের গনায় ধরলে তো। নিজের রোজগায় খায় বকুল। কে কী বলল তাতে কী আসে-যায়। বলতে কী, তার জন্মটাই তো পাপের। কোন বয়সে যে মা তাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে ফেলে গেছে মনেও করতে পারে না বকুল। 

বারো বছর বয়স পর্যন্ত রেলস্টেশনটাই ছিল বকুলের বাপ-মা। দিনে ভিক্ষা করত, টুকটাক বোঝা বইত। রাতে ঘুমাত প্ল্যাটফর্মের এক কোণে। সে-রাতেও ঘুমিয়েছিল। ছেলে তিনটা তারচেয়ে কত আর বড় হবে। প্রায় সমবয়সীই বলা যায়। একসঙ্গেই তো সারাদিন দৌড়ঝাঁপ হয়। মাঝেমধ্যে খেলাধুলা, খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি। সে-রাতে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল খুব।  বকুল ছিল ঘুমে। ঘুমের মাঝে একজন মুখ চেপে ধরল। আরেকজন পা। যাওয়ার সময় একশ টাকা দিয়ে গিয়েছিল অবশ্য। রক্ত আর ব্যথা ভুলে বকুল টাকাটা সামলে রেখেছিল। বুঝেছিল, তার শরীরের দাম আছে। বকুল ধুন্দুলের খোসা দিয়ে পায়ের পাতা ঘষে। ঘষার কারণে ফর্সা পা লাল হয়ে যায়। অদেখা মায়ের ওপর বকুলের এখন রাগ নেই। হয়তো মায়ের ওপরও তার মতোই আক্রমণ হয়েছিল। বছর না ঘুরতেই বকুল সমবয়সী মনির কাছ থেকে আদিমতম পেশাটার অলিগলি চিনে গেল। মনিই তাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। এখন অবশ্য ঝুপড়িতে বকুল একাই থাকে। মনি কোথায় চলে গেছে কে জানে! 

ফজিলত ঝুপড়িতে বসে বসে ছিনাল বকুলের নষ্টামি দেখে। রাস্তার ওপর কেমন গতর খুলে গোসল করছে খানকিটা।  বিড়ালটা বোধহয় পাড়া বেড়াতে গিয়েছিল। এখন এসে ঝুপড়িতে ঢুকেছে। লেজে ঢেউ তুলে ফজিলতের গায়ে গা ঘষছে। গন্ধ পেয়েছে মাংসের, এখন আর ফজিলতের কাছছাড়া হবে না। ফজিলত চালের খোঁজ করে। কোথায় যে রেখেছে হনুফা। ধাড়ি মুরগিটা ডিমে তা দিচ্ছে। ফজিলতের সাড়া পেয়ে শব্দ করে।  ঝুপড়ির মাথায় দেয়াল ঘেঁষে হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন ও পানির গ্যালন, লাকড়ি, কাঁথা-বালিশ। রশিতে কাপড়চোপড়। ফজিলত এসবের মাঝে চালের কৌটা খোঁজে। পেয়েও যায়।

পানির গ্যালন দুটো প্রায় খালি। পানি যেটুকু আছে ভাত রান্নায় লেগে যাবে। গ্যালনে খাওয়ার পানি ভরে রাখতে হবে। অন্যদিন কাজে যাওয়ার আগে পানি এনে রেখে যায় হনুফা। আজ বোধহয় ভুলে গেছে। ক্ষুধাটা লেগেছে জবর। ভাতটা বসিয়ে পানি আনতে যাবে। পানি এনেই খেতে বসবে ফজিলত। ততক্ষণে ছেলেও চলে আসবে। চাল ধুতে ধুতে কী ভেবে ফজিলত দু-মুঠো চাল বেশি ধোয়। আকবরটা তখন দেখে গেল রান্না হচ্ছে। না হয় সেও একটু খেল। 

বকুলের গোসল শেষ। ঝুপড়ির দরজায় বসে হোটেল থেকে আনা মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খায়। বিড়ালটা ভাতের গন্ধে দৌড়ে এসে পায়ের কাছে বসে। পাতের শেষের কয়েক মুঠো ভাত ফুটপাতের ওপর ঢেলে দেয় বকুল। বিড়ালটা কৃতজ্ঞ চোখে একবার বকুলের দিকে চায়। নরম গলায় মিউ করে  ডাকে। তারপর চেটে চেটে ভাত খেতে থাকে।

খাওয়া শেষে ঝুপড়ির সামনে পা ছড়িয়ে বসে সাজগোজ করে বকুল। চুল আঁচড়ায়। ঠোঁটে লিপস্টিক লাগায় যত্ন করে। চোখে কাজল। মুখে পাউডার। হাত আয়নায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজের মুখ দেখে। সন্তুষ্টই হয় দেখে। হাসে। জিভ বের করে ভেংচি কেটে উঠে দাঁড়ায়। বিকেল হতে দেরি নেই। বের হতে হবে। কাজল আর রোজিনা বোধহয় বের হয়ে গেছে। বকুল সংসদ ভবন যাবে আজ। হেঁটে যেতে যেতে সন্ধ্যাই হয়ে যাবে। তা হোক। বকুলের কাজ তো রাতের আঁধারেই।

বকুল এখানে এসেছে দু-বছর হয়ে এলো প্রায়। প্রথম প্রথম রমনা কী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই যেত। এখন কত জায়গায় যায়! সংসদ ভবন। ফার্মগেট। গুলিস্তান পার্ক। ওসমানী উদ্যান। ধানমন্ডি লেক। হাতির ঝিল। গুলশান, বনানী। বাসায়, মেসে। যেতে চাইলে জায়গার অভাব নেই। 

ভানিটি ব্যাগ-কাঁধে ঝুপড়ি থেকে বের হয় বকুল। এখন ওকে অন্যরকম লাগছে, কলেজে পড়া ভদ্রঘরের মেয়েদের মতো। জানে বকুল। দেখে কেউ বুঝবেই না ও রাস্তার পাশের ঝুপড়িতে থাকে।

 মিন্টু দাঁড়ানো ফুটপাতে। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চেহারাটা গাধার মতো! 

আজকাল যেন একটা বিষয় টের পায় বকুল। তা বিষয়টা একটু ভাবনারই। একেবারে শেষ ঘরটাতে থাকে মিন্টু।

চব্বিশ-পঁচিশ বছর হবে বয়স। কালো। লম্বা। শক্ত-সমর্থ শরীর। মা আছে, আর ছেলেসহ পঙ্গু এক বোন। মাস কয়েক আগে এসেছে ওরা। মিন্টু ভাঙাড়ির দোকানে কাজ করে।

আয়-রোজগার বোধহয় খারাপ না। পরনে সবসময় দামি শার্ট-প্যান্ট। বকুলকে দেখলেই আশেপাশে ঘুরঘুর করে। মুখে কখনো কিছু বলে না। তাকিয়ে থাকে। চোখ গরুর মতো বড় বড়। তবে চোখের চাহনিটা অন্যরকম। দৃষ্টিতে খারাপ কিছু নেই অবশ্য। পুরুষের চোখের দৃষ্টি তো চেনে বকুল। মিন্টুর চাহনিতে অন্য কিছু আছে। তবে আর যাই হোক সাহস নেই ছেলেটার। আর সেটাই ভাবনার কথা। বকুল বিকাল হলে সেজেগুজে কোথায় যায় জানে তো সবাই-ই। মিন্টু কি বোঝে না কিছু! 

ঘর, সংসার! ওসব কেমন কে জানে! ভাবতেও ইচ্ছে করে না। তাহলেও মাঝে মাঝে মনের ভিতর উঁকি দেয় না তা নয়। বয়স আর থাকে কদিন। বয়স গেলে একা জীবন কাটাতে হয়, ভয় সেখানেই। রমনায় গেলে প্রায়ই দেখা হয় হাজেরার সঙ্গে। ওকে বকুলরা সবাই খালা ডাকে। বয়সকালে ওদের মতোই কাজ করত। এখন শরীর শুকিয়ে গেছে। ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে। হাজেরাই একদিন বলেছিল, ‘বয়স থাকতেই সুযোগ পাইলে কাউরে বিয়া কইরা সংসার করিস। শইল আর কয়দিন। বয়স গেলে কেউ ছুঁইবও না। আমারে দেখস না।’ 

মাঝে মাঝে আশেপাশের বউ-ঝিদের বকুল খেয়াল করে দেখে। দেখে মনে হয়, সংসার ব্যাপারটা খুব সুখের না। বকুলের পাশের ঘরের মরিয়ম তো কারণে-অকারণেই মারধর খাচ্ছে স্বামীর কাছে। সারাদিনই খাটে মরিয়ম, তবু গালি ছাড়া কথা বলে না রমিজ। আমিনা তো আকবরকে ছেড়েই চলে গেল সালামের ঘরে। মিন্টু-ই-বা কত ভালো হবে। যতই আলাভোলা আর বোকাসোকা দেখাক, পুরুষরা ভালো হয় নাকি! যাকগে। মিন্টুকে নিয়ে অত ভাবনার কাজ কী বকুলের।

সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি। চালের ফুটো দিয়ে হড়হড় করে গায়ে পানি পড়তে একটু সরে শোয় আকবর। দুদিন ধরে আকাশ-পাতাল জ্বর । একবার-দুবার বোধহয় হুঁশও হারিয়েছিল। এই দুদিন পেটে কিছুই পড়েনি। খালি উঠে কয়েকবার পানি খেয়েছে। শেষ খেয়েছে দুদিন আগে দুপুরে। ফজিলত খাবার দিয়ে গিয়েছিল। তাও খেতে কী পেরেছে সবটা। দু-এক লোকমা খেয়েছে কোনোমতে। বিড়ালটাই বোধহয় চেটেপুটে খেয়ে গেছে সব।

 মাথায় খুব যন্ত্রণা। পাথরের মতো ভারী লাগছে। শরীরটা এত দুর্বল, উঠে বসার সামর্থ্যও নেই। কিন্তু একবার বাইরে যাওয়া দরকার। প্রস্রাব করতে হবে। কোনোমতে টলতে টলতে বের হয়ে আসে আকবর। ঝুপড়ির দরজার কাছেই ড্রেন। ড্রেনের ওপরই বসে, কাজ সেরে দুর্বল পায়ে কোনোরকমে হেঁটে  ঝুপড়ির ভেতরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় ভেজা বিছানায়। 

আমিনা কাজেকামের ফাঁকে ফাঁকে সবই খেয়াল করেছে। আকবর ঝুপড়ি থেকে দুদিন ধরে বের হচ্ছে না। এখন বের হলো যেন মাতালের মতো। শরীরটা কেমন শুকিয়ে গেছে। আহা, মানুষটাকে দেখার তো নেই কেউ। সেবাযত্নই বা কে করবে। 

বৃষ্টিটা একটু ধরে এলে সন্ধ্যার মুখে আমিনা ভাত আর বোয়াল মাছের তরকারি নিয়ে আকবরের ঝুপড়িতে ঢোকে। সালাম গতকাল চারটা বোয়াল মাছের টুকরা এনেছে। হয়তো কুটতে কুটতে সরিয়ে রেখেছিল। আমিনা মানা করেছে অনেকবার, এমন করে মাছ না আনতে। সালাম শুনলে তো!

দেখ, কী অবস্থা! মাটিতে বিছানো বিছানা ভিজে সপসপ করছে। চাল চুঁইয়ে এখনো ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। আকবরের শরীরও ভেজা। বোধহয় হুঁশ নেই। না হলে আমিনা এসেছে তাও চোখ মেলে চাইবে না। অবশ্য চোখে দৃষ্টি-ই-বা কই যে চাইবে। তা হলেও আমিনা এসেছে নড়াচড়া তো করবে।

ইতস্তত করে আমিনা শেষে আকবরের কপালে হাত ছোঁয়ায়। হাতে যেন ছেঁকা লাগে। মাগো, জ্বর এত! মাথায় পানি কি জলপট্টি দেওয়া দরকার। এই দিকে সালামেরও আসার সময় হয়ে এলো। কী যে করে আমিনা। এদিক-ওদিক তাকায়। আধভেজা একটা গামছা পায় খুঁজে। আকবরের মাথার কাছে কলসিতে পানি আছে। কলসির পানিতে গামছা ভিজিয়ে আকবরের কপালে জলপট্টির মতো চেপে ধরে। অনেকক্ষণ পরেও সাড়া পাওয়া যায় না। শেষে মাথায় পানি ঢালা শুরু করে আমিনা। একসময় গুঙিয়ে ওঠে আকবর। পাশ ফেরে। 

‘জ্বরে একবারে বেহুঁশ হইয়্যা আছো। কতক্ষণ ধইরা মাথায় পানি দিতাছি। আমি তো ভয়ই পাইছিলাম।’

আকবর মুখ হা করে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। ‘আমিনা!’ 

‘খাওন নিয়া আইছিলাম। জানি তো, দুইদিন ধইরা খাও নাই কিছু। ভাতটা রাইখ্যা গেলাম, খাইয়ো। তা কতদিন আর একলা থাকবা। না হয় একটা বিয়া-টিয়া …’ বলতে বলতে চুপ করে যায় আমিনা। ভাবে মনে মনে, বিয়া করলে বউ কি থাকবো। মানুষটা নপুংসক বইলাই না আমিনা …। ‘এইখানে পইড়া আছোই বা ক্যান। বাড়ি গেলে, মা-বইন আছে, যেমনই হোক তারা দেখবো।’ 

‘বাড়ি গেলে যে তোমারে আর দেখতে পারমু না।’

‘এখনই যেন কত দেখছ! দুই চউখই তো গেছে।’

‘দেখা কি শুধু চোউখ্যেই হয়! তুমি কাছাকাছি হাঁটো, চলো, কথা কও, এতেই আমার দেখা হয়। … তুমি যাও। সালাম আসার সময় হইয়্যা আইল।’ একটানা অনেক কথা বলে হাঁপায় আকবর। বড় করে শ্বাস টানে।

আমিনা কোনো কথা বলে না। অন্ধকার হয়ে আসছে, আবারো বৃষ্টি শুরু হবে কি না কে জানে! খুঁজে নিয়ে কুপিটা জ্বালায়। ঝুপড়ির ভেতরটা একটু আলোকিত হয়। আমিনার মেয়েটা কাঁদছে, শব্দ শোনা যায়। সালামও বোধহয় ফিরল। মেয়ের সঙ্গে যেন কথা বলছে। এখনই আমিনার খোঁজ করবে। খেতে চাইবে। 

আমিনার যাওয়ার দরকার।

আকবর চোখ বুজে আছে। একটু দেখে আমিনা। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। যেতে যেতে দরজার কাছে গিয়ে ফিরে আবার দেখে। কেমন শিশুর মতো কুঁকড়েমুকড়ে শুয়ে আছে মানুষটা। চোখদুটো করকর করলে চোখ ফিরিয়ে নেয় আমিনা।

‘আমিনা!’

কে ডাকল! যেতে গিয়ে থমকায় আমিনা। চকিতে একবার পেছনে দেখে। না আকবর মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে। ডাকল সালামই বোধহয়।

যাওয়া দরকার আমিনার।