ঝাঁসি রাণী বাহিনী ইতিহাসে বিস্মৃত একটি অধ্যায়

লেখক: মৈত্রেয়ী সেনগুপ্ত

কয়েক বছর আগে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত একটি নারীর আত্মহনন (লেফটেন্যান্ট সুস্মিতা চক্রবর্তী, ২০০৬) প্রমাণ করেছিল একবিংশ শতকেও কর্মজীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মেয়েদের যোগ্যতা স্বীকার করতে আমাদের সমাজ নারাজ। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্র বহুদিন পর্যন্ত মেয়েদের অনধিগম্য ছিল, সেখানে মেয়েদের পদক্ষিপ কোনোক্রমে স্বীকার করা হবে না। পুরুষ সহকর্মীদের উপেক্ষা, ঔদাসীন্য, তাচ্ছিল্যমূলক মনোভাব, সর্বোপরি একজন নারী যে পদ স্বীয় যোগ্যতায় অর্জন করেছে, তাকে সেই পদানুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে না দেওয়া ইত্যাদি (নঞর্থক) প্রতিক্রিয়াগুলি নিঃসন্দেহে সুস্মিতা চক্রবর্তীর আত্মনিধনের পেছনে সক্রিয় ছিল। মেয়েরা যে রণকুশলতায় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণে পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে না, বরং তাদের উপস্থিতি যে শুধুমাত্র অবাঞ্ছিত পরিবেশ এবং অনাবশ্যক সমস্যা করে এমনও মন্তব্য করেছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন ভাইস চিফ মহোদয়। নারীবাদের ঢক্কাধ্বনি, নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে সমস্ত আস্ফালন অথচ রণপ্রথার আগ্রাসী আক্রমণ বা ক্রমবর্ধমান কন্যাভ্রূণ হত্যা মহাবস্থানের কোলাজে রচিত আমাদের সমাজের এই বৈপরীত্য ও দ্বিচারিতার মধ্যে সুভাষ চন্দ্রের ঝাঁসি রাণী বাহিনী গঠন একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্বে এ-অধ্যায় রচিত হয়েছিল সাত দশকের কিছু আগে। পরবর্তী দশকগুলিতে মেয়েদের যোগ্যতা অস্বীকার করার ক্রমান্বয় ইতিহাস প্রমাণ করেছে এখনো এ-অধ্যায়ের আলোচনা একান্ত প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে ঝাঁসি বাহিনী প্রতিষ্ঠার পঁচাত্তর বছরপূর্তি কালে।
মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ঝাঁসি বাহিনীর স্থান আলোচনা করতে একটু প্রাক-কথনের প্রয়োজন। ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম, তার আগে ঊনবিংশ শতাব্দীব্যাপী নারীশিক্ষার প্রসার এবং সমাজ সংস্কার-আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে নারীমুক্তি আন্দোলনের সূচনা। বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নারীশিক্ষা এক সম্পূর্ণ নতুন পর্বের সূচনা করেছিল, অসংখ্য বন্ধনের মধ্যে অনাস্বাদিতপূর্ব মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন শিক্ষিত মেয়েরা। সেই মুক্ত নারীসত্তার ক্রমপ্রকাশ ঘটল স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভূমিকা ছিল সীমিত, পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু আন্দোলনের বিসত্মারের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক্ষতা আলোকপ্রাপ্তাদের পাশে দেশের সর্বত্র অসংখ্য অনাম্নী অঙ্গনার অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছিল মেয়েরা কোনো নির্ধারিত গ–র মধ্যে, কোনো লক্ষ্মণরেখার বৃত্তে আবদ্ধ থাকবেন না। অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন বা ’৪২-এর রক্তক্ষয়ী চূড়ান্ত সংগ্রামের দিনগুলির ইতিহাসে মাঝে মাঝেই বিদ্যুচ্চমকের মতো কয়েকটি নাম ঝলসে ওঠে – বাসমত্মী দেবী, বাঈ আম্থা, সরোজিনী নাইডু অথবা প্রীতিলতা, ঊষা মেহতা বা অরুণা আসফ আলি। কিন্তু প্রায় দু-শতকব্যাপী দীর্ঘ এই আন্দোলনের ইতিহাসে মেয়েদের সামগ্রিক ভূমিকা সম্বন্ধে বহু তথ্য এখনো অজ্ঞাত যার ফলে সেই ভূমিকার প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্য নিরূপণ করা হয়নি। মেয়েদের সম্বন্ধে চেতনা বা অভিনিবেশের এই অভাব গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মতে, ঔপনিবেশিক ইতিহাস চর্চার বৈশিষ্ট্য। ‘Can the Subaltern Speak?’ (Marxism and the Interpretation of Culture, University of Illinois Press, 1988) নিবন্ধে তিনি বলছেন, ‘If in context of colonial production the subaltern has no history and cannot speak the subaltern as female is even more deeply in shadow.’ যুদ্ধকালীন পরিবেশে বিদেশে গঠিত ঝাঁসি বাহিনীর কার্যকলাপ তাই ইতিহাসে অজ্ঞাত একটি অধ্যায়, যেটুকু ধারণা সমসাময়িক জনমানসে ছিল তা আজ সম্পূর্ণ বিস্মৃত। বাহিনীর সর্বাধিনায়িকা লক্ষ্মী স্বামীনাথন, দ্বিতীয় পদাধিকারী জানকী আথিয়া নহপ্পন এবং আরো কয়েকজন সদস্যের স্মৃতিচারণ ও পরবর্তী কিছু গবেষণা, বিশেষ করে ঐতিহাসিক Joyce Lebra-র প্রামাণ্য গ্রন্থটি এই বাহিনীর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দ্ব্যর্থহীনভাবে চিহ্নিত করেছে। প্রথমত ঝাঁসি রাণী বাহিনী দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে গঠিত এক নারী সেনাবাহিনী, সশস্ত্র, পূর্ণ সামরিক শিক্ষাপ্রাপ্ত, যার সর্বাধিনায়ক একজন নারী এবং সদস্যেরা সকলেই নারী। নেতাজী যখন বিদেশের মাটিতে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে স্বাধীনতার শেষ যুদ্ধ শুরু করেন তাঁরই প্রত্যক্ষ প্রেরণায় আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি গুরত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে ঝাঁসি বাহিনী গঠিত – সদস্যরা সকলে পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নারী, যাঁরা মাতৃভূমি ভারতবর্ষ কখনো দর্শন করেন নি। অথচ সুভাষচন্দ্রের মন্ত্রশিষ্য এই মেয়েদের দৃঢ়সংকল্প ছিল সম্মুখ সমরে প্রবল পরাক্রান্ত শত্র‍ুর মোকাবিলা করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জন। দ্বিতীয়ত, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এ ধরনের বাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তারপরেও বহুদিন কোথাও গঠিত হয়নি। পৃথিবীব্যাপী মেয়েদের ইতিহাসে তাই ঝাঁসি বাহিনী এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। শেষ বৈশিষ্ট্য ভারতবর্ষের নারী আন্দোলনে ঝাঁসি বাহিনীর ভূমিকার অসাধারণ অবদান।
ভারতবর্ষে মেয়েদের সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যই সীমাবদ্ধ থাকে নি। রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা লড়াই করেছেন লিঙ্গবৈষম্য দূর করে সমাজের সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার অর্জনের জন্যে। মেয়েদের এই আন্দোলন প্রকৃত অর্থে তাদের সামগ্র্য আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মেয়েদের পুরোপুরি মানুষ হয়ে ওঠার প্রয়াসের ইতিহাস। যুগসন্ধিক্ষণের সেই পর্বে, মেয়েদের মানুষ হয়ে ওঠার সেই ইতিহাসে একজন মহিলা অধিনায়কের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি নারী সেনাবাহিনীর কাহিনি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। ভারতবর্ষে আন্দোলনরত মেয়েদের চরম সংকটের মুহূর্তে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছিল শুধুমাত্র নীরবে অত্যাচার সহ্য করা তাদের কাজ নয়, ‘Silent and dignified suffering is not the only badge of female sex,’ (Geraldine Forbes, Women in Modern India : The New Cambridge History of India)। রাজনীতি-সচেতন শিক্ষিতা যে তরুণীরা বিপস্নবের বহ্ন্যুৎসবে যোগ দিয়েছিলেন, অসহযোগ আন্দোলনে রাজপথে নেমে আসা নারী, আইন অমান্য আন্দোলনে সরোজিনী এবং তাঁর অনুগামীরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন শুধু আশ্রয় দেওয়া, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা বা গুপ্ত সংবাদ বহন তাঁদের কাজ নয়। পুরুষের সঙ্গে সমকক্ষতার দাবি মূর্ত হয়ে উঠেছিল যুদ্ধে আত্মহননের আগে প্রীতিলতার শেষ লেখায় – ‘I wonder why there should be any distinction between males and females in a fight for the country’s freedom? … Why should we, the modern Indian women, be deprived of joining this noble fight to redeem our country from foreign domination (‘Terrorism in India – The Roll of Honour’, Kalicharan Ghosh, Anecdotes of Indian Martyrs)। অসিত্মত্বের এই সংকট কিন্তু ঝাঁসি বাহিনীর সৈনিকদের বিচলিত করেনি। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গঠিত এই বাহিনীর জন্মলগ্নে সুভাষচন্দ্র ঘোষণা করেছিলেন, মেয়েদের সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে নয়, এ সংগ্রাম সর্বপ্রকার অসাম্য, শোষণ এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে – নারীপুরুষের সমান অধিকার স্বতঃসিদ্ধ, এই সত্য প্রমাণ করার জন্য। সংগ্রাম সার্থক করতে মেয়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণ যে কতখানি অপরিহার্য তা তিনি বলেছিলেন ঝাঁসি রেজিমেন্টের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরের উদ্বোধনী ভাষণে : ‘Today while we are facing the gravest hour in our history I have confidence that Indian womanhood will not fail to rise to the occasion. If for the independence of Jhansi India produced a Laxmi
Bai, today for the independence of whole India, India shall produce thousands of Ranis of Jhansi,’ (22nd October, 1943). নারীশক্তি সম্বন্ধে এই গভীর আস্থা এবং নারীকে যোগ্য স্বীকৃতিদানের এই প্রয়াস সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে লক্ষণীয়। তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ লতিকা ঘোষ, অক্সফোর্ডে শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষিকা বাংলাদেশে ‘মহিলা রাষ্ট্রীয় সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন ১৯২৮ সালে, যা সমকালীন মহিলা সংগঠনগুলির চেয়ে অনেক বেশি বৈপস্নবিক ধ্যানধারণায় বিশ্বাস করতো। সেই একই বছর সুভাষচন্দ্র সিদ্ধান্ত নেন কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে পুরুষদের পাশে মহিলা স্বেচ্ছাসেবীরা সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ করে অধিবেশনের উদ্বোধন করবেন। প্রবীণ নেতৃত্বের বিরূপতা অগ্রাহ্য করে তিনি লতিকা ঘোষকে কর্নেল পদাভিষিক্ত করেন স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীকে চালনা করার জন্যে। কলকাতাবাসী সেদিন সবিস্ময়ে দেখেছিলেন অভূতপূর্ব সেই দৃশ্য – মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে পা মিলিয়ে মার্চ করে চলেছেন রাজপথে একই ধরনের শাড়ি ইউনিফর্মের মতো পরিধান করে। তিনশো মেয়ের সেই দৃঢ়প্রত্যয়ী পদক্ষিপ ঝাঁসির রাণীদের প্রাণিত করেছিল পরবর্তীকালে। বিপস্নবী আন্দোলনে যুক্ত মেয়েরাও একান্তভাবে বিশ্বাস করতেন সমকালীন নেতৃবৃন্দের মধ্যে একমাত্র সুভাষচন্দ্রের পূর্ণ সমর্থন এবং সহানুভূতি আছে তাঁদের প্রতি। অমৃতবাজার পত্রিকা তাঁকে অভিহিত করেছিল ‘The greatest champion of women’s rights’ রূপে (Interview, Amritabazar Patrika, April 22, 1947)। জীবনের চূড়ান্ত সংগ্রামে নারী সেনাবাহিনী গঠন অতএব কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়, তাঁর সব ব্যতিক্রমী উদ্যোগের ফল, তাঁর সারা জীবনের আদর্শের সার্থক রূপায়ণ।
ঝাঁসি বাহিনী গঠন করার পরিকল্পনা যে বহুদিনের সে-কথা জানিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবিদ হাসান সাফ্রানী। জার্মানি থেকে এশিয়ায় আসছেন নেতাজী – পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তখন শত শত ভারতীয় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাঁর জন্যে। জাপানি সাবমেরিনে যুদ্ধবিধ্বস্ত দীর্ঘ সেই জলপথ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী আবিদ হাসান। চূড়ান্ত সংকটের সেই দিনগুলিতে নেতাজী ঝাঁসি বাহিনী সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা করতেন হাসানের সঙ্গে, হাসানের কাজ ছিল নেতাজীর বক্তব্য লিখে রাখা। একদিন আলোচনা চলার সময়ে হঠাৎ সাবমেরিনটি জলের ওপর ভেসে ওঠে এবং তৎক্ষণাৎ আক্রান্ত হয়। নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে সকলে যখন চরম উদ্ভ্রান্ত সুভাষচন্দ্র একমাত্র অবিচলিত। বিপদ কেটে যাওয়ার পর সংকটের মুহূর্তে আত্মস্থ না থাকার জন্যে তিনি হাসানকে তিরস্কারও করেছিলেন। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও তিনি ভোলেননি স্বাধীনতার এই শেষ যুদ্ধে মেয়েদের যোগ্য স্থান দিতে হবে, তারা সমান অংশীদার হবে পুরুষযোদ্ধার। সিঙ্গাপুরে পৌঁছে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করার আগেই এ বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছিল।
সুমাত্রার অখ্যাত দ্বীপ সাবাঙে নেতাজী এসে পৌঁছলেন
১৯৪৩-এর ৬ই মে তারিখে। তাঁর সামনে তখন বিশাল কর্মযজ্ঞ – পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শত শত ভারতীয় ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ ইত্যাদি রাজনৈতিক সংগঠনগুলো, ভারতীয় যুদ্ধবন্দি সেনাদের নিয়ে গঠিত প্রথম আইএনএ সৈন্যরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাঁর নেতৃত্বের। ঝটিকাগতিতে কাজ শুরু করে নেতাজী জুলাই মাসে সিঙ্গাপুর পৌঁছলেন – সিঙ্গাপুর তখন সকল কর্মকা–র কেন্দ্র। ৪ঠা জুলাই ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রবীণ বিপস্নবী রাসবিহারী বসু সুভাষচন্দ্রকে সংগ্রামের সম্পূর্ণ নেতৃত্বভার অর্পণ করলেন। গঠিত হলো আজাদ হিন্দ ফৌজ – বিদেশে শুরু হলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়। এই ক্রামিত্মকালে ঝাঁসি বাহিনীর জন্ম। ৯ই জুলাই সিঙ্গাপুরে এক বিশাল জনসমাবেশে সুভাষচন্দ্র ঘোষণা করলেন, এই নবগঠিত সৈন্যদল নিয়ে তিনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন এবং এই যুদ্ধে তাঁর ভাষায় :’ ‘I want total mobilization and nothing less, for this is a total war … . I also want a unit of brave Indian women who will wield the sword which the brave Rani of Jhansi wielded in India’s First war of Independence.’ (Speech at Singapore, 9th July, 1943)। অশ্রম্নতপূর্ব এ প্রসত্মাব নেতাজীর সহকর্মীদের কাছে সম্পূর্ণ অবাস্তব মনে হয়েছিল, পূর্বতন আইএনএ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ প্রসত্মাবটির তীব্র সমালোচনা করেন। একমাত্র লীগের তরুণ সদস্য ইয়েলস্নাপ্পা ব্যতীত প্রায় সকলে বলেছিলেন বর্মা, মালয়, সিঙ্গাপুরের মেয়েরা গৃহের অবরোধে থাকেন, শিক্ষার প্রসার তাঁদের মধ্যে ঘটেনি,
মাতৃভূমি তাঁদের কাছে অপরিচিত, বহির্জীবন সম্বন্ধে তাঁদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। এই পরিস্থিতিতে নারী সেনাবাহিনী গঠন একটি হাস্যকর প্রয়াস হবে। জাপানিরাও তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এই প্রসত্মাবের। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, মেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলে অস্ত্রের সদ্ব্যবহার তো হবেই না, প্রচুর অর্থেরও অপচয় হবে। সব বিরূপতা অগ্রাহ্য করে লক্ষ্মী স্বামীনাথন এগিয়ে এলেন নেতাজীর একান্ত সহযোগী হয়ে। লক্ষ্মী তখন সিঙ্গাপুরে ডাক্তারি পড়া শেষ করেছেন, সিঙ্গাপুরের নারীজগতে অগ্রগণ্যা, উজ্জ্বল, প্রাণচঞ্চল, অদম্য উৎসাহে ভরপুর এক তরুণী, দেশপ্রেমে জন্মসূত্রে যাঁর উত্তরাধিকার। তাঁর মা আম্মু স্বামীনাথন কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্যা ছিলেন, ভারতের আন্দোলনের সঙ্গে এ পরিবারের সকলের ছিল গভীর যোগ। লক্ষ্মীই প্রথমে শুধু মেয়েদের নিয়ে নেতাজীর সম্মানে একটি Guard of Honour-এর ব্যবস্থা করেন। নেতাজীর ঘোষণার পর তিনি পরপর মেয়েদের সমাবেশের ব্যবস্থা করেন, সে সমাবেশগুলিতে নেতাজী সকল ব্যস্ততা সত্ত্বেও মর্মস্পর্শী ভাষায় বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। তারপর যা ঘটল, লক্ষ্মীর ভাষায়, ‘he was cheered and applauded and women, young and old, and even those with babies in arms offered to join the regiment immediately. As the days and weeks passed the number of volunteers steadily increased.’ (The Oracle, April 1980, Netaji Research Bureau Publication)। জানকী তখন অষ্টাদশী, নেতাজীর ভাষণে উদ্বুদ্ধ সেই তরুণী ঝাঁসি বাহিনীতে যোগ দিয়ে ক্রমে দ্বিতীয় পদ অধিকার করেন। তাঁর স্মৃতিচারণেও লক্ষ্মীর কথার প্রতিধ্বনি, ‘Netaji made a clarion call to the women of S.E. Asia. The response was so to speak unbelievable… Women in their thousands, young and old, poor and rich, daughters and sisters of varying walks of life thronged the I.I. League office for enlistment,’ (The Oracle, January 1980) বাল্য যৌবন বার্ধক্যের এই অপ্রতিরোধ্য জলতরঙ্গ কেমন করে সম্ভব হয়েছিল ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে এ-কথা অনস্বীকার্য যে, বর্মা, মালয়, সিঙ্গাপুরের বহু রমণী মাতৃভূমির সঙ্গে যাঁদের সম্পর্ক ছিল ক্ষীণ, সেই অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে পরিবার, গৃহের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেননি। রেঙ্গুনের বিশ্বভারতী অ্যাকাডেমির শিক্ষিকা মানাবতী আর্য্য নেতাজীর ভাষণে ‘charmed soldier’-এ পরিণত হয়েছিলেন – আন্দোলনে যোগদান করে বর্মায় মহিলা বিভাগের সম্পাদকরূপে গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি। রেঙ্গুনের উচ্চবিত্ত পরিবারের দুই কন্যা মায়া এবং অরুণা গাঙ্গুলি, মালয়ের দুই কিশোরী শামিত্ম এবং অঞ্জলি ভৌমিক, সংগ্রামের শীর্ষস্থানীয় লক্ষ্মী, জানকী বা সত্যবতী সকলেই এসেছিলেন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে। স্মৃতিচারণে তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন, যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছেন কিন্তু নাম জানা যায়নি এমন অসংখ্য সাধারণ মেয়ের ভূমিকাও নগণ্য নয়। সমকালীন তথ্যের ভিত্তিতে এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায়, ‘The Regiment as a whole comprised young as well as elderly women belonging to all classes and communities of the Indian society in Burma and S.E. Asia.’ (Manabati Arya, The Oracle, April 1980)। মেয়েদের সমাবেশগুলিতে অলংকার থেকে নিজেদের শেষ সম্বল অর্থটুকু পর্যন্ত দান করেছেন এই সাধারণ মেয়েরা। Joyce Lebra প্রমাণ করেছেন, শুধু ভারতীয় নন, মালয়ের শ্রমিক মেয়েরাও ঝাঁসি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।
নেতাজীর বক্তৃতার পর সেনাসংগ্রহের কাজ শুরু হলো লক্ষ্মীর নেতৃত্বে। প্রথম সপ্তাহে পঞ্চাশজন মহিলা যোগ দিয়েছিলেন, ক্রমশ সংখ্যা বাড়তে লাগল। বার্ধক্য এবং শারীরিক অসুস্থতার জন্যে যেসব মহিলাকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া সম্ভব হয়নি তাঁরাও সাগ্রহে অন্যান্য কাজ যথা আইএনএর হাসপাতালগুলিতে সেবিকার দায়িত্ব গ্রহণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ, সৈনিকদের পোশাক প্রস্ত্তত করা ইত্যাদি শুরু করে দিলেন। ঝাঁসি বাহিনীর সৈনিকদের সংখ্যা সম্বন্ধে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা সংশয় ছিল। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এখন বলা যায়, সিঙ্গাপুর, মালয় এবং রেঙ্গুনের শাখাগুলি মিলিয়ে সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার, দুশো মেয়ে নার্সিং শাখায় ছিলেন আর ছিল অগণিত সাধারণ মেয়ের সহানুভূতি ও সমর্থন। ২১শে অক্টোবর ১৯৪৩-এ আজাদ হিন্দ সরকার গঠিত হলো, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গঠিত এক সার্বভৌম সরকার। ২২শে অক্টোবর ঝাঁসি বাহিনীর শিক্ষণ শিবিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, লক্ষ্মী স্বামীনাথন বাহিনীর সর্বাধিনায়িকা, সুভাষচন্দ্রের সদ্যগঠিত ক্যাবিনেটে যাঁর স্থান সুভাষচন্দ্রের পরেই। নেতাজী বারবার বলেছিলেন স্বাধীনতার এই শেষ যুদ্ধে ‘total mobilization’ বা সম্পূর্ণ সৈন্যযোজন একান্ত আবশ্যক। জনসমাজের প্রতিটি অংশ এই সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হবে নিজ নিজ ভূমিকা অনুযায়ী। ঝাঁসি বাহিনী তাঁর এ-স্বপ্ন বাস্তবায়িত করল। সুভাষচন্দ্র লক্ষ্মীকে বলেছিলেন, ‘After training I intend to send you to Burma : to fight in the jungles of Burma and it won’t be easy there.’ নারী সৈনিকদের কাছে তাঁর অকপট বক্তব্য, ‘Today I can only offer you strenous physical work, no comfort, the barest of food and probably death, but do not fear – the fight for freedom will continue with your efforts.’
সিঙ্গাপুরে কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ শিবির উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে বর্মা এবং মালয়ে ঝাঁসি বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্প চালু হয়। মেয়েদের প্রশিক্ষণ অবশ্য অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আইএনএর দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনানায়কেরা যাঁদের যোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। নেতাজী স্বয়ং তাঁদের নির্বাচন করেছিলেন, তাঁর নির্দেশ, ‘the training given to the Ranis must be similar in every way to the other infantry units.’ জানকী, লক্ষ্মী এবং আরো অনেকের লেখায় এই প্রশিক্ষণের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। সকাল ছটায় ব্যায়াম এবং শরীরচর্চা দিয়ে দিনের শুরু, তারপর ইনফ্যানট্রি ড্রিল এবং নিয়মিত মার্চ করে আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর মহড়া। গেরিলা যুদ্ধের রীতিনীতি, রাত্রিকালীন যুদ্ধের নিয়ম, নার্সিং ইত্যাদি সবকিছুই শিখতে হতো মেয়েদের। সন্ধ্যায় বসত ইতিহাস পাঠের আসর – ভারতবর্ষের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা পড়তেন রিজিয়া সুলতান, চাঁদবিবি, ঝাঁসির রাণী, রানী ভবানীর উপাখ্যান, নেতাজীর কাছে যাঁরা ভারতীয় নারীর আদর্শ – বীর্যে ও বুদ্ধিমত্তায় অনন্যা। ম্যাপ রিডিং বা রোমান হরফে হিন্দুস্থানি লেখা সবই ছিল শিক্ষার অঙ্গ। সামরিক শিক্ষার সঙ্গে বিদেশবাসী মেয়েদের মনে ভারতীয়ত্বের বোধ সঞ্চার করা ছিল প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য। ক্যাবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ কাজে লক্ষ্মী ব্যস্ত থাকতেন তাই সিঙ্গাপুর শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এম.এস. নাইডুকে, জানকী এবং মানাবতীও নিজ নিজ শাখার নেতৃতব দিয়েছেন সমান দক্ষতায়। লক্ষ্মী বলেছেন, এ সময়ে একটিও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি যা সেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক ছিল না। মেয়েরা তো অনেকে সেই প্রথম বহির্জগতে এসেছেন গৃহের জীবন ত্যাগ করে। আইএনএর অফিসাররাও বহুদিন গৃহত্যাগী, দীর্ঘকাল তাঁরা আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গ লাভ করেননি; কিন্তু মুহূর্তের জন্যে কেউ আদর্শভ্রষ্ট হননি, কন্যা বা ভগ্নিসম তরুণীদের তাঁরা পরম যত্নে শিক্ষা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল মাহবুব আলম এবং কর্নেল রাতুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রশিক্ষণের শীর্ষে ছিলেন আইএনএর এই দুই দক্ষ সেনানায়ক। সাম্প্রতিককালের ধর্ষণ ও পাশবিক আচরণের মহোৎবের পরিপ্রেক্ষিতে এ-কাহিনি অবিশ্বাস্য মনে হয়।
সামরিক প্রশিক্ষণের পর রানীরা ভারত-বর্মা রণাঙ্গনে যাওয়ার জন্যে প্রস্ত্তত হলেন। পাঁচশো সৈনিক পৌঁছলেন বর্মায়, আটজন তাঁদের মধ্যে কমিশনপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার, জানকী তাঁদের অন্যতম। ১৯৪৪-এর জানুয়ারি মাসে মেইমিয়োতে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ঘটে মেয়েদের। যুদ্ধ তখন তুঙ্গে, প্রবল পরাক্রান্ত শত্র‍ুপক্ষ প্রচণ্ড আঘাত হানতে উদ্যত। অবিরাম বোমাবর্ষণে সিঙ্গাপুর শহর, আইএনএ শিবির ও হাসপাতাল এবং ঝাঁসি বাহিনীর শিবির ধ্বংস হয়ে গেলে মেয়েরা ট্রেঞ্চগুলিতে আশ্রয় নেন যেগুলি তাঁরা নিজেরাই খনন করেছিলেন। ইম্ফল রণাঙ্গনে যোগ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে শিক্ষিত মেয়েরা তখন ভারতের মাটিতে তাঁদের পুরুষ সহযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াইতে অংশ নেওয়ার জন্য একান্ত উদগ্রীব। এর মধ্যেই কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় তাঁদের ট্রেনিং চলছে গভীর রাত্রে, ‘their only desire of the time was to go to the Imphal front where real fighting had started.’ (Laxrmi)। বিস্ময় লাগে ‘সমরে চলিনু হমু, হামে না ফিরাওরে’ – এ কথাটি এই মেয়েদের ক্ষেত্রে কী করে এমনভাবে সত্য হয়ে উঠেছিল। এরপর ইম্ফল ফ্রন্টের সাময়িক সাফল্যের পর ব্যর্থতা এবং পরাজয় যুদ্ধের বাতাবরণ সম্পূর্ণ বদলে দিলো। বোঝা গেল অন্তত সে-মুহূর্তে ইম্ফলে যাওয়া সম্ভব নয়।
যুদ্ধ করা সম্ভব হলো না কিন্তু সেই চরম সংকটে শত্র‍ুপক্ষের নিধনযজ্ঞের মধ্যে ঝাঁসির সৈনিকেরা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিলেন। শত শত আইএনএ সৈনিক ফিরে আসছেন তখন আহত, মুমূর্ষু অবস্থায়, অবিরাম বোমাবর্ষণে হাসপাতালগুলির ভগ্নদশা, প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতায় ‘carpet bombing was a happy game for the Anglo-American block over civil areas.’ ফলে শহরের বহু এলাকা বিধ্বস্ত। সব প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে তাঁরা আহত সৈনিকদের সেবার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন চিকিৎসা এবং শুশ্রূষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র অভাব সত্ত্বেও। ভগ্নপ্রায় ঝাঁসি শিবিরটি একটি বৃহৎ শুশ্রূষা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল – সে শিবিরের অন্যতম নেত্রী জানকী বলেছেন, কত তরুণ প্রাণ যে তখন জয় হিন্দ ধ্বনি উচ্চারণ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাটিতে মৃত্যুবরণ করেছে তার সঠিক তথ্য কোনোদিন উদ্ঘাটিত হবে না। এটুকু বলা যায়, তাঁদের পাশে অনলস সেবার প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ঝাঁসির মেয়েরা। জানকী বলেছেন লেফটেন্যান্ট নাজিরের কথা – বয়সে নিতান্তই তরুণ এই অফিসার মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে অস্ফুট স্বরে যেন বলেছিলেন ‘জৈন হিন্দ’ – জানকী বুঝেছিলেন তাঁর সহযোদ্ধা শেষবারের মতো উচ্চারণ করলেন ‘জয় হিন্দ’, সেই মন্ত্র যা একসূত্রে সহস্র প্রাণের বন্ধন ঘটিয়েছিল। পরাজয়ের ব্যর্থতা, যুদ্ধের আনুষঙ্গিক ভয়াবহতা তুচ্ছ হয়ে গেছে গভীর সহমর্মিতার এই আখ্যানের কাছে। আইএনএ এবং ঝাঁসি বাহিনী সেই চরম সংকটে পরম সখ্যে আবদ্ধ হয়েছিলেন, অনমনীয় মনোবল ও ক্লামিত্মহীন সেবার দায়িত্ব নিয়ে মেয়েরা দাঁড়িয়েছিলেন পুরুষ সহযোদ্ধার পাশে।
ঝাঁসি বাহিনী কিন্তু সামরিক অনুশীলন গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন সবসময়ে, আশা ছিল ১৯৪৫-এর শুরুতে তাঁরা আবার অভিযান শুরু করবেন – রণক্ষেত্রে তাঁদের যে যেতেই হবে। তারপর যুদ্ধের গতি সম্পূর্ণ পালটে গেল – জাপান সম্পূর্ণ পরাজিত, মিত্রশক্তি প্রবল বিক্রমে এগিয়ে আসছে রেঙ্গুনের দিকে। ইংরেজ সৈন্যবাহিনীর অগ্রগতি কোনোক্রমেই রোধ করা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকৃত অঞ্চলগুলি ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এ-অবস্থায় পশ্চাদপসরণ ছাড়া গত্যন্তর ছিল না – ঝাঁসি বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হলো তাঁদের প্রথমে রেঙ্গুন এবং রেঙ্গুন থেকে মালয়ে ফিরে যেতে হবে। যুদ্ধ করার বাসনায় তখনো তাঁরা উদগ্রীব, রক্তের অক্ষরে তাঁরা নাকি নেতাজীকে আবেদন করেছিলেন পিছু হঠার আদেশ প্রত্যাহার করতে। বাস্তবে তা সম্ভব ছিল না – নারী সৈনিকরাও প্রকৃত সৈনিকদের মতো জানতেন সর্বাধিনায়কের আদেশ লঙ্ঘন করা যায় না। রেঙ্গুন থেকে বর্মার সব মেয়েকে স্ব-স্ব গৃহে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। অধিকাংশ মেয়ে এসেছিলেন মালয় থেকে। সেই বিপজ্জনক মুহূর্তে নেতাজী নিজে সঙ্গে থেকে তাঁর নারী বাহিনীকে রেঙ্গুন থেকে ব্যাংকক পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন। এ বাহিনী যে তাঁর নিজের সৃষ্টি, তাই ব্যর্থতার দিনে তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ এই তরুণীদের অপরিসীম শারীরিক ক্লেশ ও মানসিক যন্ত্রণার অংশীদার হয়েছিলেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতায় ‘yet another episode of the INA saga began with this historic journey.’ সীমান্তের গভীর অরণ্যের মধ্যে এই বিপদসঙ্কুল পদযাত্রায় মেয়েরা শত্র‍ুপক্ষের বোমাবর্ষণের সম্মুখীন হয়েছেন বারবার। অবিরাম বর্ষণ, গভীর অন্ধকার, দুর্গম পাহাড়ি পথ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লামিত্ম – এ ছিল তাঁদের পাথেয়। জাপানিরা নেতাজীকে যে গাড়িটি দিয়েছিলেন সেটি মাত্র একশ কিলোমিটার যাওয়ার পর ভেঙে পড়ে। জাপানিদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এরপর তিনি গাড়ি বা পেস্ননে যেতে রাজি হননি। জাপানি জেনারেল ইসোডার সনির্বন্ধ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছিলেন, ‘Look, my women soldiers are marching over there … I cannot leave them’ (A Beacon Across Asia, Orient Longman)। অপরদিকে রাণীদের গর্ব ছিল তাঁরা চলেছেন তাঁদের প্রিয় নেতার সঙ্গে – চলেছেন তাঁর রক্ষী হয়ে। ২৩ দিনের বেশি এই দীর্ঘ যাত্রায় দুজন সৈনিক প্রাণ হারান। জাপানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের সংবাদ এই পথেই জানতে পারেন মেয়েরা। ‘স্বাধীনতার যুদ্ধকে দমন করা যায় না – সে সংগ্রাম চলতেই থাকে’ নেতাজীর এই মন্ত্র যেন সঞ্জীবনীর মতো কাজ করেছিল পরাজিত আপাতবিধ্বস্ত এই মেয়েদের মধ্যে। লক্ষ্মী অবশ্য এ-যাত্রায় ঝাঁসি বাহিনীর সঙ্গী হননি, চিকিৎসক হিসেবে তাঁর মনে হয়েছিল রণক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের কাছে তাঁর উপস্থিতি বেশি প্রয়োজনীয়। মেইমিয়োর আইএনএ হাসপাতাল এবং জেয়াওয়াদি হাসপাতালে কাজ করার পর শান প্রদেশের গভীর জঙ্গলে কালাওয়ের নবগঠিত হাসপাতালে তিনি চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। সেখানেও ছিল অবিরাম বোমাবর্ষণ, ওষুধপথ্য এবং রসদের একান্ত অভাব। অবশেষে রেঙ্গুনে প্রত্যাবর্তনের পর ইংরেজ সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভারতবর্ষে পাঠিয়ে দেয়।
বর্মা এবং মালয়ে ইংরেজ শাসন পুনঃপ্রবর্তিত হলে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঝাঁসি বাহিনীর সেনাদের প্রবলভাবে জেরা করে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা যে তাঁদের বলপূর্বক ঝাঁসি বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং তাঁদের উপর নানাবিধ অত্যাচার করা হয়েছিল। যাঁরা জেরা করছিলেন তাঁদের চরম বিস্ময়ের উদ্রেক করে ঝাঁসি বাহিনীর প্রতিটি সৈনিক ছিন্ন অথচ পরিচ্ছন্ন সামরিক পোশাকে জেরার সম্মুখীন হন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সামরিক মর্যাদাবোধ অক্ষুণ্ণ ছিল – ঘরে ঢুকে তাঁরা ধ্বনি তোলেন, ‘নেতাজী জিন্দাবাদ, আজাদ হিন্দ ফৌজ জিন্দাবাদ’! তাঁরা এককণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, সেনাবাহিনীতে তাঁরা স্বেচ্ছায় যোগদান করেছিলেন এবং তাঁদের একমাত্র আক্ষেপ তাঁরা ইংরেজ শক্তিকে পরাস্ত করতে পারেননি, সুযোগ এলে আবার তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেবেন। তাঁদের বা তাঁদের পরিবারবর্গের জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধার প্রসত্মাব তাঁরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন, চাকরি বা বিশেষ রেশনের প্রসত্মাব তাঁরা গ্রহণ করেননি। তাঁদের একমাত্র দাবি ছিল লক্ষ্মীর সাথে তাঁদেরও ভারত ভূমিতে যুদ্ধবন্দিরূপে পাঠানো হোক যাতে পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁরাও ইংরেজদত্ত শাসিত্মর ভাগ নিতে পারেন। স্বাধীনতার যুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা স্বীকৃত হোক এই ছিল তাঁদের কাম্য। তাঁরা আশা করেছিলেন, দেশবাসী মনে রাখবেন তাঁদের স্বপ্ন দেখার কাহিনি, আদর্শের প্রতি অটুট আনুগত্যের কথা। স্বাধীনতার উত্তরপর্বে ভারতবর্ষে রাণীদের এ-আশা কতটুকু পূর্ণ হয়েছিল? স্বাধীন ভারতে ঝাঁসি বাহিনীর মূল্যায়ন হয়নি এ-কথা লক্ষ্মী সায়গল বারবার বলেছেন গভীর আক্ষেপের সঙ্গে। যেসব মেয়ে বর্মা থেকে বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। মালয় এবং সিঙ্গাপুরের মেয়েরা আশা করেছিলেন সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জনে করবেন, সে আশা পূর্ণ হয়নি। যে মাতৃভূমির জন্য তাঁরা সংগ্রাম করেছিলেন অনেকে সে-দেশ দর্শন করার অনুমতি পাননি। পরে মালয়ে এবং সিঙ্গাপুরে জানকী এবং আরো কিছু মহিলা সমাজে উচ্চপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কিন্তু স্বাধীন ভারতে তাঁদের স্থান হয়নি। মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন নারী দেশে ফিরে এসেছিলেন তাঁদের অবস্থা অবর্ণনীয় – নিতান্ত দুর্দশায় তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। প্রামাণ্য কাগজপত্র ছিল না বলে এঁদের পক্ষে লালফিতের বাঁধন কাটানো সম্ভব হয়নি এবং এঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামীর ভাতা ইত্যাদি কিছুই পাননি। স্বাধীন ভারত যে শুধু ঝাঁসির রাণীদের বিস্মৃত হয়েছে তা নয়, বাহিনীর স্রষ্টার স্বপ্নও তো সার্থক হয়নি। নেতাজী বলেছিলেন, মেয়েদের সংগ্রাম শুধু বহিঃশত্র‍ুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নয়, দেশের ভেতরেও সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে, প্রগতিবিরোধী সংস্কার ও প্রথার বিরুদ্ধে, সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে। মুক্তসমাজে মেয়েদের সামগ্রিক মুক্তির যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে আদলে তাঁর সেনাবাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তার কতটুকু প্রভাব পড়েছে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে, যে-ভারতবর্ষ চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হিংস্র দংষ্ট্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত, যেখানে মেয়েরা ক্রমবর্ধমান অবমাননা এবং হিংসার শিকার? এখানে আর একটি কথা বলা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না, সুভাষচন্দ্রের আর একটি স্বপ্নও তো সফল হয়নি। সাম্প্রদায়িক হিংসার হানাহানি যখন ভারতের রাজনীতিতে তুঙ্গে সেই সময়ে তিনি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বিশ্বাসে ভালোবাসায় সহমর্মিতায় ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন ভারতবাসীকে। তাঁর সাবমেরিন যাত্রার সঙ্গী আবিদ হাসান, শেষ বিমানযাত্রার সঙ্গী হাবিবুর রহমান। আজাদ হিন্দ সরকারের ক্যাবিনেটের চারজন মুসলমান সেনানায়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। রাণী বাহিনীর প্রশিক্ষণ ছিল মেহবুব আলমের হাতে। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ – এই দুটি বছরে যখন আজাদ হিন্দ বাহিনীর সাফল্যের সংবাদ জানা যেত বেতারে, যখন সুভাষচন্দ্রের আবেগদীপ্ত ভাষণ ভেসে আসত, বাঙালি হিন্দু মুসলমান সত্যিই হয়তো বিশ্বাস করতেন ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’ – এই আশ্চর্য পুরুষ এনে দেবেন অখ- ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে। সে-স্বপ্ন যে কিভাবে চূর্ণ হয়েছিল সে তো জানা ইতিহাস।
ঝাঁসি বাহিনী সম্বন্ধে দু-একটি উল্লেখযোগ্য কথা বলেছেন ঐতিহাসিক Peter Fay The Forgotten Army বইটিতে। তিনি বলেছেন, আইএনএ যদি তার বিশাল সৈন্যসংখ্যা এবং সামরিক
কৃতিত্ব সত্ত্বেও এক বিস্মৃত সেনাবাহিনীতে পরিণত হয় তবে ঝাঁসি বাহিনী যে বিস্মৃতির অন্তরালে বিলুপ্ত হবে তা নিতান্ত স্বাভাবিক। তার কথায়, ‘This regiment of women faded away completely with Transfer of Power and there has not been any space for it in India’s pantheon.’ স্বল্পকালীন অসিত্মত্বে ঝাঁসি বাহিনী কোনো সামরিক সাফল্য দাবি করতে পারে না – যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি এই বাহিনীর। কিন্তু ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কেই ধরার ধুলায় হোক হারা বলে যতি চিহ্ন দেওয়া যায় না। পরবর্তীকালে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাসের পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়ায় ঝাঁসি বাহিনীর বিভিন্ন দিকের ওপর বিশেস্নষণী আলোকপাত প্রয়োজন। সুভাষচন্দ্রের বাণী প্রবাসী কিছুসংখ্যক মেয়ের জীবনে যে আমূল পরিবর্তন এনেছিল, সংখ্যা যতই অল্প হোক, এ বৈপস্নবিক ঘটনা কেন এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভব হয়েছিল তার ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। লক্ষ্মী বা অন্য শিক্ষিত মেয়েদের কথায় বোঝা যায় – ভারতের আন্দোলন সম্পর্কে তাঁরা অবহিত ছিলেন। রেঙ্গুনের মেয়েরাও শিক্ষায় ও রাজনৈতিক জ্ঞানে অগ্রণী ছিলেন। কিন্তু অন্য মেয়েরা, যাঁরা নেতাজীর বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘরের বন্ধন ছিন্ন করেছিলেন, অলঙ্কার থেকে শেষ সম্বল অর্থটুকু দান করে নানাভাবে নেতাজীর কর্মযজ্ঞে শামিল হয়েছিলেন, এঁরা তো সাধারণ মেয়ে। তৎকালীন নেত্রীদের স্মৃতিচারণায় কিছুটা অতিকথন থাকলেও এ ঘটনা যে ঘটেছিল তাতে সন্দেহ নেই। সুভাষচন্দ্র তাঁদের মধ্যে এক ধরনের আত্মসচেতনতার বোধ সৃষ্টি করেছিলেন যার ফলে, Joyce Lebra বলছেন, ‘There is no doubt about the fact that the response of a large section of women was tremendous at that moment of crisis.’ এ পরিবর্তন কেমন করে সম্ভব হয়েছিল, নানা বিভেদ সত্ত্বেও এঁরা কতটা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, যুদ্ধে এঁদের কী অবদান – সবকিছু নিয়েই পূর্ণাঙ্গ আলোচনার অবকাশ আছে। বিস্মৃত এই বাহিনীর প্রতীকী মূল্য অনস্বীকার্য – আখ্যানের শেষে নির্দ্বিধায় এ-কথা বলা যায়। নারীবাদের সেই আদিযুগে সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী কর্নেল জে. কে. দত্ত বলেছিলেন, ‘The decision to mobilize women throughout E. Asia for national service meant a very big step forward in the fight for complete enfranchisement of the Indian women.’ Joyce Lebra বলছেন, ‘this experiment certainly amounted to a significant enlargement of women’s role in nationalist politics from the passive role model of mythic Sita to that of the heroic activism of historic Rani of Jhansi.’ স্বাধীনতা যুদ্ধের শুধু সেই পর্বে নয়, আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য মেয়েরা যখন যেখানে যে সংগ্রাম করেছেন বা করছেন ঝাঁসি বাহিনীর মেয়েরা তাঁদের সমগোত্রীয় সহযোদ্ধা – তাঁদের কাহিনি চির প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে মেয়েদের ভূমিকা ছিল অনন্য, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ – এই অজানা, অচেনা মেয়েরা তাঁদের পূর্বসূরি বললে হয়তো ইতিহাসের অপলাপ ঘটবে না।

তথ্যসূত্র
ক. The Forgotten Army, Peter W. Fay, New Delhi, Rupa Co. 1974.
খ. Brothers Against the Raj, Leonard A Gordon, New York, Columbia University Press, 1990.
গ. A Beacon Across Asia, Sisir K. Bose, Alexander Werth. S.A. Ayer (eds.), Orient Longman, New Delhi, 1973.
ঘ. The Oracle – Netaji Research Bureau, Calcutta, January 1980.
ঙ. The Men From Imphal, Abid Hasan Safrani, Netaji Research Bureau, Calcutta, 1971.
চ. Lakshmi Swaminathan Sahgal, Interviews, 1976, Kanpur.
ছ. JAI HIND – Diary of a Rebel Daughter of India, Janmabhumi Prakashan, Mumbai.
নেতাজী রিসার্চ ব্যুরোর সঙ্গে বহুদিন যুক্ত থাকার ফলে ঝাঁসি বাহিনীর নেত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলোচনার বিরল সুযোগ ঘটেছিল – নেতাজী ভবনে তাঁরা ছিলেন নিত্য-অতিথি। মনে হয়েছিল ইতিহাসের এই বিস্মৃত অধ্যায় ঝাঁসি বাহিনীর আখ্যান লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। পুরনো সেই দিনের কথায় বর্মা, রেঙ্গুন ইত্যাদি পুরনো নামগুলিই ব্যবহার করা সমীচীন মনে হয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: