নদীটি ও জারুল গাছ 

লেখক:

nodi-o-jarul-gach

দেবেশ রায়

নদীছুট বলে কাকে?

যে-জায়গা থেকে সেই জায়গার নদী ছুটে গিয়েছে। জায়গা না হয়ে মানুষও হতে পারে।

যে-মানুষ থেকে তার নদী ছুটে গিয়েছে।

মানুষ না হয়ে একটা গাছও হতে পারে।

যে-গাছের তলা থেকে তার নদী ছুটে গিয়েছে। গাছটা তো নদীর পাড়ে এক বিরল ভঙ্গিতে বরাবর ছিল। অতবড় একটা জারুল গাছ নদীর একটা আড়ড়ির ওপর এখন খাড়া থাকতে পারে? তার তলার মাটি নদী খেয়ে নিয়েছে, আর কী

আশ্চর্য, পাড়টা যেখানে উঁচিয়ে উঠেছে ঠিক তার তলা থেকে নদী তার পাড়ভাঙা থামিয়ে দিয়েছে। আবার সেই উচলটা যেখানে গড়িয়ে গেছে পাড়ে, সেখানে আবার পাড় খাওয়া শুরু করেছে নদী। যেন, জারুল গাছটাকে শিকড় গাড়তেই ওই উচলটুকু ছাড়। জারুলও তা বোঝে। সে শিকড় চাড়িয়ে দিয়েছে মাটিতে, মাটির  ভিতরের মাটি আঁকড়াতে-আঁকড়াতে – মাটি না হলে এতবড় গাছের ওজন বইবে কে? কিন্তু তার কা- ক্রমেই নদীর ওপর কেৎরে গেছে আর কা–র যে-জায়গা থেকে ডালপালা বেরোতে শুরু করেছে সেখান থেকে তার আকাশজোড়া মাথা একেবারে নদীর ওপরে, যেন নদীর স্রোতের সমান্তরাল হয়ে উঠেছে।

বা, জারুল যেন নদীতে রাতদিন, দিনরাত, তার নিজের ছায়া দেখেই যায়।

বা, নদী যেন জারুলের সেই ছায়া রাতদিন, দিনরাত, নিজের জলে বয়ে-বয়ে স্থির হয়ে থাকে।

কী অদ্ভুত, না?

নদী তো বয়েই যাচ্ছে। না বইলে তো নদী আর নদী থাকে না। বড়জোর হাওড় হয়ে যায়। জারুলের ছায়া নিয়ে নদী বয়ে যায় অথচ ছায়াটা নড়ে না। বরং সূর্য ওঠার পর থেকে পরের সূর্য ওঠা পর্যন্ত জারুল তার অত বড় মাথার ছায়া তার নদীর ওপর দিয়ে ঘোরাতেই থাকে। জারুলের শিকড় তো মাটিতে গাড়া। সে তো ইচ্ছে করলেও নিজেকে এড়াতে পারবে না। তেমন ইচ্ছে তার হবেই-বা কেন? অমন কোনো ইচ্ছে তৈরি হওয়ার মত মনই নেই জারুলের। বা, কোনো গাছেরই। কিন্তু জারুলের মাথার ওপরে, ও নদীর ওপরেও, ও দেখা যায় না এমন অপারে, যে-আকাশ, আর সেই আকাশে যে-আলো, সূর্যের, রোদের, চাঁদের, মেঘের, তারার, ছায়াপথের, বজ্রপাতের, বিদ্যুতের, সেইসব আলো তো নদীর ওপর, জলের ওপর, স্রোতের ওপর জারুলের ছায়াটাকে সরিয়ে-সরিয়ে দেয় আর নদীর জল ও স্রোত যে সেই নানা রকমের আলোর প্রতিফলন ঘন করে তোলে বা পাতলা করে তোলে, তাতে এমনটাই তো সত্য হয়ে ওঠে যে, ওই নদীর জলে ছায়াময় জারুল, নদীর স্রোতে, নিশিদিন ভেসেই আছে, ভেসেই আছে, যেন জারুলের শিকড়টা মাটিতে গাঁথা না, যেন জারুল নদীর জলের ভিতরই তার শিকড় চাড়িয়ে দিয়েছে। আকাশের তারারাই যখন আলোর একমাত্র উৎস আর সেই তারারা সারা রাত জুড়ে যে তাদের জায়গা বদলায় – তাতে জলের ভিতরের জারুলের ছায়াটাও জায়গা বদলায়। নদীর ভিতরের দূরের কোনো নৌকো থেকে যখন কেউ পাড়ের দিকে তাকায়, তখন সে এমন অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখেই নিজে কোথায় আছে, তার একটা আন্দাজ চোখের পলক ফেলে করে নিতে পারে – ওই তো নদীর ভিতর জারুল গাছটা বুড়ো আঙুলের মত খাড়া হয়ে আছে। বুড়ো আঙুলটা কার – সেটা অবিশ্যি খুব স্পষ্ট নয়, মানুষজন স্পষ্ট করে উপমা দেয় না, অস্পষ্টতাকে উপমায় বোঝে, নিজের মনে রাখার জন্য ভাবা। জারুল গাছটা বুড়ো আঙুলের মতই মনে হতে পারে, যদি চার-আঙুল জোড়া রেখে বুড়ো আঙুলটাকে আলাদা করা যায় – ফাঁকগুলো হয়ে যায় নদী আর বুড়ো আঙুলটা জারুলের সীমানা। আর নদীটা তাকে বাঁচিয়ে রেখে, তাকে নিজের ভিতর রেখে তাকে ঘিরে আবার ভাঙা পাড়ের দিকে ঘুরে যায়। ওই জারুল গাছ নদীর অতটা ভিতর থেকে নিশানা দেয় এমন এক অদ্ভুত বাঁকের, যেখানে নদী তার গাছ ভাঙে নি। যে-গাছ নদীও ভাঙে না, সে তো শুধু গাছ  হতে পারে না। তার ওপর কোনো কিছু ভর করে, এমন কোনো কিছু যা নদীও জানে। নদীও যে-গাছকে মান দেয়, মানুষজন তো তাকে মান দেবেই, যদি মানুষ বুঝতে পারে যে, এ-গাছের ওপর ভর আছে। এমন ভর বুঝতে মানুষ সবসময়ই এতই তৈরি থাকে!

নদীর ভাঙনের ফলে পাড়ের গ্রাম খালি করে, মানুষজন যখন বেশ প্রান্তরের মত জায়গা নদীছাড় দিয়ে সরে গিয়ে নতুন গ্রাম বসায় পুরনো গ্রামেরই নামে, আর নিজেদেরই তৈরি প্রান্তরের সীমায় সেই জারুল গাছের মাথা ফণা উঁচিয়ে নদীকে তার পাড় ভাঙতে নিষেধ করছে বলে দেখে – তখন আর তার মানতে বাধা কোথায় যে জারুল গাছটাতে কিছু ভর আছে। একই জন নদীর ভিতর থেকে জারুল গাছটাকে বুড়ো আঙুলের উপমায় দেখে, তার প্রান্তরের প্রান্ত থেকে কেউটে সাপের ফণার উপমায় দেখে।

গাছ আর নদীর সম্পর্ক দেখা ও বোঝার যেন শেষ নেই। মানুষজন সেই জারুল গাছটাকে তাদের মত করে যখন পুজো দেয় তখন নদী আর গাছের ভিতর কোনো পার্থক্য করে না। শুধু নিজের অজ্ঞানতা স্বীকার করতে চায়। সেটাই যেন পুজো – আমি যা জানি না। তেমন পূজার কোনো রীতিনীতি তৈরি হয় না। যেন, রীতিনীতি তৈরিই থাকে। চৈত্র মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে বারুণী পূজার দিন যেখানে যে-জল থাকে, খাল-বিল-পুকুর-ডোবা-হাওড়-বাঁওড় – ছোট, বড়, সরু, মোটা, জ্যান্ত, মরা, নতুন, পুরনো, সব নদী হয়ে যায়, সেই নিজের নদীতে স্নান করতে হয়, মেলা বসাতে হয়। যার যে-নদী, সেখানেই তার বারুণী। চৈত্র তো সবচেয়ে খরার সময়। সেই শুখার সময় নিজের জলের কাছে পুজো দিয়ে বলতে হয় – তার এই জলটুকুতে যেন মেঘ ভেঙে পড়ে – যখন মেঘ আসবে, তার এই জলটুকুতে যেন বান ডাকে – যখন বান আসবে, তার এই জলটুকু যেন তার পাড় ভাঙে – যখন ভাঙন আসবে, তার এই জলটুকু যেন তার ঘরে ঢোকে – যখন জল আসবে।

এমন বারুণী পুজোর দিন ওই চৈত্র মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর দিন এই বুড়ো আঙুল ও কেউটিয়া বাঁকের কাছে গ্রামের মানুষজন নদীকে পূজা দেয়, জারুল গাছটাকেও দেয়। জারুল গাছের পাতা দিয়ে নৌকো বানিয়ে নদীতে ভাসায় আর নদীর জল দিয়ে জারুলের কা- ধুয়ে দেয়। আলাদা মন্ত্রও পড়ে – ‘যাও নদী, বও গিয়া/ যাও জারুল, খাড়াও গিয়া/ নদীরে ছায়া দিয়ো জারুল/ জারুলরে বাঁক দিয়ো নদী।’

এই এমন জারুলের তলা থেকে নদী যদি ছুটে যায়, তা হলে নদীছুট জারুলের দশা কী দাঁড়ায়?

জারুলের তো আর-কোনো নিজের বাঁচাই থাকে না। সে তো আর-দশটা জারুল গাছের মত একটা জারুল গাছ ছিল না। সে তো মাঝনদী থেকে ছিল বুড়ো আঙুলের মত জারুল। সে খাড়া থাকত আর তাকে ঘিরে, কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে, নদীর ভাঙন চলত। সেই ভাঙা পাড়ে মাটির কোন গভীরে শিকড় আঁকড়ে, নদীর কোন ভিতরে ছায়া ফেলার খেলাই তো থাকল না। নতুন এক ভাঙনের প্রান্তরের সীমা থেকে ফণা তুলে নদীকে শাসনের ভরসাই তো থাকল না। জারুলের তো কোনো নিজের মত করে বাঁচাই থাকল না।

নদীর ছুটে-যাওয়া প্রথমে বা একবারে বোঝা যায় না।

কোনো এক বড় বন্যায় হয়তো নদী নতুন দিকে বয়ে যায়। সে তো পুরনো খাতে তার জল ধরছে না বলেই নতুন একটা খাতে বয়ে যাওয়া। বান নেমে গেলে, তো আর নতুন খাতের দরকারই পড়বে না – তখন নদী তার পুরনো খাতেই বইবে – পুরনো মানে, চিরকালের খাতে, যেন সব পুরনোই চিরকালের। এক-বছরে যদি ঘরের ওপর মেঘ ভেঙে পড়ে বাড়িঘর ভেঙে ভাসিয়ে দেয়, তা হলেই কি সেই বাড়িঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া যায়? এক বর্ষায় মেঘ ভেঙেছে বলে কি পরের বর্ষাতেও মেঘ ভাঙবে? এক বন্যায় নদীর জল অন্য খাতে গেছে বলেই কি পরের বছরও নদীর অন্য খাত দরকার হবে? নদীর খাত তো নদীর বাড়িঘর।

মানুষজন নিজে বুঝে নিতে উপমা খোঁজে।

কিন্তু নদীর স্রোত তো সে-উপমা মেনে চলে না।

বড় বানার জল বওয়াতে নতুন খাতে নদীর জল যে-বয়ে গেছে, সেই বয়ে যাওয়ার বেগ তো নদীর স্বাভাবিক গতির দশগুণ-একশগুণ। সেই দশগুণ-একশগুণ স্রোতের ধাক্কায় নতুন খাতের তলার মাটি উপড়ে গেছে। সেই দশগুণ-একশগুণ স্রোতের ধাক্কায় নতুন খাতের ডান-বাঁ দুদিকের সব নতুন পাড় নতুন নদীতে ভেঙে পড়ে নদীর নতুন স্রোতকে পথ করে দিয়েছে। আর দুটো পাড় তৈরি করতে-করতে ভাঙতে-ভাঙতে নদী যেন গোটা একটা নদী হয়ে বহু দূরের আর-এক অপেক্ষমাণ নদীতে গিয়ে পড়ে তার স্রোতে নিজের স্রোত ঢালে।

পুরনো নদীর মানুষজন, গাছপালা, জারুল গাছ কিছুতেই মানতে চায় না, নদী চলে গেছে, তারা নদীছুট হয়ে পড়ে আছে। পরের বর্ষায় নিশ্চয় নদী ফিরে আসবে। কেন আসবে না? তারও পরের বর্ষায়?

তারপর নদীর পুরনো খাতে পুরনো জল আটকা পড়ে যায়। কোনো স্রোত থাকে না, ঢেউ থাকে না, জল কালো হয়ে যায় কিন্তু জল থাকে বেশ গভীর। তাতে কোত্থেকে সব ভাল-ভাল নতুন-নতুন মাছের সংসার হয়। হয়তো পুরনো নদীর জলেই এই মাছরা ছিল – বাঁওড় হয়ে যাবার পর স্থির জলে তাদের সংসার বড় হয়েছে, নতুন হয়েছে। পুকুরের চাইতে বড়, দিঘির চাইতেও লম্বা, নদীর চাইতে অনেক নিশ্চিত। কোনো অজানা নেই, নদীর মত কোনো অনিশ্চয় নেই, ভাঙন নেই, স্রোত হারানো নেই, মাছচাষ করার, ধরার কাজ সহজ, রয়েসয়ে করা যায়। যেন নদী নিজে সরে গিয়ে বাঁওড় বানিয়ে দিয়ে গেল – তাতে উপকারই হল। বসত পাকা হল, বাণিজ্যও বাড়ল। এত লাভের মধ্যে খরচের খাতায় তো এক নদী।

কিন্তু জারুল গাছটার কী হল?

জারুল গাছটা তো নদীর একেবারে ভিতর থেকে আকাশে উঠেছিল। সত্যি করেই একেবারে ভিতর থেকে নদীর একেবারে ভিতর থেকে, নদীর জলের একেবারে ভিতর থেকে। মাটি না হলে তো আর মাটির ভিতরে কোনো গাছই শিকড় গাড়তে পারে না। সে দূর্বাঘাসই হোক, তুলসী গাছই হোক আর ধান গাছই হোক। ধান গাছের মত ফলনের গাছ যাতে মাটির ভিতর শিকড় চাড়াতে পারে সেই জন্য শীত শেষ হওয়ার আগে থেকে মাটি চষা শুরু হয়। লাঙল দিয়ে জমিটায় যে একটা শক্তপোক্ত আস্তর পড়েছে আর সেই আস্তরে গর্ত খুঁড়ে-খুঁড়ে পোকামাকড়, ছোট-বড় লালকালো সব পিঁপড়ে যে বাসা বেঁধেছে, কোনো-কোনো জায়গার মাটি যে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে গেছে, কিছু ছোটখাটো ঝোপও যে গজিয়েছে ধানকাটা মাঠে – সেসব লাঙলের খোঁচায় উপড়ে দিয়ে মাঠটাকে এবড়োখেবড়ো করে দিতে হয়, যাতে, যদি একটা বৃষ্টি পায়, তা হলে মাঠটা কাদা-কাদা হয়ে থাকে। ধানচারা রোয়া গাড়তে তো সেই শ্রাবণের শেষ। কিন্তু সব চেষ্টা রোয়া গাড়ার পর ধানের ওইটুকু রোয়া যেন শিকড় গজিয়ে তুলতে পারে। রোয়া ধানের শিকড়? সে তো ফুঁ দিলে উড়ে যায়, রক্ত নেই, সাদা। কিন্তু সেই শিকড়ই তো মাটির তলার মাটিকে আঁকড়াবে, আঁকড়ে মাটির তলা থেকে রস শুষে মাটির ওপরে তার ল্যাতপেতে কা– পাঠাবে আর মাটির তলার মাটিটাকে আঁকড়ে ধরবে যাতে সেই মাটিও ওইটুকু একটা শিকড়কে খাড়া রাখার জন্য একটু-একটু চাপ দেবে। এই কাজটা যাতে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে ঘটে তার জন্যই তো যত মেহনত।

জারুল গাছের তো ক্ষেত হয় না। জারুল গাছ তো একা গাছ। কিন্তু তাকেও তো খাড়া থাকতে হয় মাটির ভিতরে শিকড় ঢুকিয়ে, মাটি আঁকড়েই। জারুল গাছ তো বড় গাছ – তার শিকড়ের জোর থাকে, কাঁটা থাকে, তাকে ছিঁড়ে ফেলতে গেলে গায়ের জোর লাগে, আর যদি-বা ছেঁড়া যায়, যে ছেঁড়ে তার আঙুলেও কাঁটা ঢুকে যায় আর যদি তার হাতের চেটো শক্ত আর খড়খড়ে হয়ে গিয়ে না থাকে, তা হলে, শিকড় যে ছেঁড়ে, যদি কেউ ছেঁড়ে, তা হলে রক্তারক্তিও ঘটে। তবে, কোথাও একটা জারুল গাছের চারা দেখলে সেটা উপড়ে ছিঁড়ে ফেলতে যাবেই-বা কেন একজন। বরং কেউ-কেউ তো জমি থাকলে জারুল গাছের চারা পুঁতে দেয় – জারুল তো লাভের গাছ, একটা বড় জারুলের দাম কত? কিন্তু জারুল তো বুনোও খানিকটা। কোথায় কোন নদীপাড়ে কিংবা প্রান্তরের মধ্যে বা গ্রামের শেষ আলে, শিকড় গেঁথে বড় হয়ে উঠতে থাকে, নিজেরই জোরে মাটির ভিতরে শিকড় চাড়াতে-চাড়াতে। জারুল গাছ লাগাবে বলে কেউ তো আর
তিন-চার মাস ধরে ক্ষেত তৈরি করে না। এই নদীও তো এই জারুলকে নিমন্ত্রণ করে তার পাড়ে শিকড় চাড়াতে বলে নি।

কেন এই জারুল এই নদীপাড়েই শিকড় চাড়িয়েছিল তার কোনো হিসেব হয় না।

কিন্তু যখন ওই নদী এই জারুলের পাড়টা ভাঙতে শুরু করে, তার একটা সোজা হিসেব হয়। নদী যখন পাড় ভাঙে তখন কি নদী কোনো হিসেব কষতে পারে – পাড়ে কী-কী পড়ছে তার ভাঙনের মুখে? নদীর কি কোনো বাছাই থাকতে পারে? নদীর জল আর স্রোত তার পথ কেটে চলেছে। সেই পাড়টা ভেঙে সে একটা ঢাল পাবে বলে পাড় ভাঙছে। মন্দিরও ভাঙছে, রাজবাড়িও ভাঙছে, প্রান্তরও ভাঙছে। নদীর পাড়-ভাঙার মধ্যে নদীর কোনো ইচ্ছেও কাজ করে না, কোনো লক্ষ্যও কাজ করে না।

নদী তো মাটির ঢাল মেনে বয়ে যায়। আর, তার জল তো স্রোতের নিয়মে ঢাল তৈরি করে বা খুঁজে পায়। সে-স্রোত তো তৈরি হয় – নদীর খাত জুড়ে কত বৃষ্টির জল কত সময়ের মধ্যে জমা হয়েছে, কোন হিমবাহ থেকে কতটা জল, কতটা জল, গলে, কতটা সময়ে নদীর এই খাতে নেমে এসেছে। এসব তো হিসেব-নিকেশে বের করে ফেলা যায়।

এমন বের করার মধ্যে একটা ভুল নিশ্চয়তা কাজ করে, যা সব সময়ই নদীর খাতভাঙা, পাড়ভাঙা, পাহাড়ভাঙার পর সক্রিয় হয়। সেই নিশ্চয়তা নদীর বা নদীগুলির এমন ব্যবহারকেও কেমন স্বাভাবিক করে দিতে পারে যখন এমন কী পাহাড়ের মাথা ভেঙে পড়ে, এমন কী গিরিপথ লুপ্ত হয়ে যায় গিরিস্রোতের তলে, এমন কী পর্বতশিখর ভেঙে পড়ে আটকে দেয় পাহাড় থেকে স্রোতের নেমে আসার পথ, যখন ড্যাম ফেটে যায় জলের চাপে, জল যেন রুদ্ধতার প্রতিশোধ নেয়। নদী প্রতিশোধ নেয়।

অথচ এমন প্রতিশোধ ক্ষমতাকেও প্রতিরোধ্য ভেবে নিয়ে মানুষ সেই নদীর পাড়ে তার ঘরবসত বানিয়ে নদীর ওপর জীবনের স্বভাব আরোপ করে।

যেন, নদীর ইচ্ছে আছে, স্বভাব আছে, রাগ আছে, অভিমান আছে, সন্ন্যাস আছে, আসক্তি আছে, ঔদাস্য আছে, নিয়তিও আছে। নদী যেন কাছে আসতে পারে, দূরে চলে যেতে পারে, ফিরেও আসতে পারে, নিজের মুখটাকে শরীরের গতির উল্টো দিকে ফেরাতে পারে, ফিরিয়ে রাখতেও পারে, হারিয়েও যেতে পারে, নিজেরই একটা অংশ লুকিয়ে ফেলতে পারে – নিজের সম্পূর্ণতা নষ্ট করে, নিজের প্রকাশ্যতা দিয়ে সব গোপনতা শেষ করে দিতে পারে, মাটির তলা দিয়ে তার অন্য একটা যাত্রাও থাকতে পারে, সেই অমত্মঃসলিলা নদীর সঙ্গে ভূতলে প্রবহমান নদীর কোনো সম্পর্ক না-ই থাকতে পারে,  আবার বিপরীত সম্পর্কও থাকতে পারে।

এই জারুল তো আর বেছে-টেছে পছন্দ করে এই নদীর স্রোতের ভিতরের মাটিতে তার শিকড় চাড়ায় নি। যখন জারুলের চারাটা মাথা চাড়িয়েছিল তখন হয়তো স্রোত এখানে ছিলই না। নদী যেমন বর্ষায়-বর্ষায় পাড় বদলাতে পারে, জারুলের মত বড় গাছ, বা কোনো গাছই, তো আর এক জন্মে তার জায়গা বদলাতে পারে না। যেখানে তার চারা প্রথম গজায়, সেখানেই তার মাথা আকাশ ছোঁয়, দিক আড়াল করে, আকাশ ও জল থেকে যত রকম আলো তাকে বেয়ে নামে ও ওঠে তার সঙ্গে মিলিয়ে সেই জলেস্থলে তার ছায়া নানা আকারে তৈরি হতে থাকে ও মুছে যেতে থাকে – জারুলের তো সারা জীবনের ব্যাপার আর তার সারা জীবন তো একটাই জীবন। নদীরও সারা জীবনেরই ব্যাপার বটে কিন্তু নদীর সারা জীবন তো অনেক জীবনের ব্যাপার। নদী যখন জারুলের বাঁ-হাতি জমি ভাঙছিল তখন তো সবাই-ই দিন গুনত, কবে নদী জারুলের মাটির তলার শিকড় উপড়াবে। তবে নদী আর নদীপাড়ের গাছ দেখা মানুষজনও জানত যে, জারুলের শিকড় ওপড়াতে নদীর সময় লাগবে। জারুলের শিকড় মাটির অনেক গভীরে জালের মত ছড়ানো ও জড়ানো। কুড়ুল দিয়ে, করাত দিয়ে, কা- থেকে কেটে নামাতেও, এমন একটা সারা জীবনের জারুল গাছে, সময় নেয়, যদিও সেই কাটাকুটি তো চোখের সামনে দেখা যায়, মাপা যায় ও যখন যেমন দরকার কাটাকুটির ধরন তত বদলানো যায়। দড়ি দিয়ে তার মাথার ডালগুলোকে, মাটিতে, যেদিকে জারুলের মাথাটা ফেললে সুবিধে, সেদিকের মাঠে পোঁতা খুঁটোর সঙ্গে বেঁধে, একটা টানা তৈরি করা যায়। সে তো জারুল উৎপাটন নয়, জারুল কেটে বের করা। মাটির তলার যে-শিকড় জারুলের এত বড় আকারের ওজনকে মাটিতে ছড়িয়ে দেয়, সেই শিকড়টাকে মাটিতেই, মাটির ভিতরেই, রেখে দেওয়া হয়।

আর, নদী তো সেই শিকড়টাকেই মাটি থেকে ছিঁড়বে – নইলে নদী পথ পাবে কী করে। নদীর এমন গাছ-উপড়নো যারা এক-আধবার দেখেছে, বা শুনেছে, বা কাছাকাছি কোনো নদীর পাড়ে, দেখে এসেছে যে অমন এক মহীরুহ নদীর জলে পঁচিশ বছর পরেও কেমন ঝুলে আছে, যেন বাজ পড়ে তাকে ওপর থেকে তলায় দোফালা করে দিয়েছে। কিন্তু বাজ তো ওপর থেকে পড়ে নি, বাজ নদীর স্রোতের ভিতর থেকে সেই মহাবৃক্ষের মাথা পর্যন্ত উঠে আকাশে মিলিয়ে গেছে। সেই মহাদ্রম্নম সেই বজ্রছিন্ন শরীর নিয়ে এখনো, আজও, পঁচিশ বছর, সেই স্রোতে দাঁড়িয়ে আছে।

নদী যে জারুলের তলায় মাটিতে ঘা না দিয়ে, কয়েক হাত শান্ত থেকে, পাড়ের ওপর ঝাঁপায়, তাতে লোকজন যেন একটা যুদ্ধের আঁচ পায় – জলের তলে সে-যুদ্ধ চলছিল জারুলের শিকড় আর নদীর স্রোতের ভিতর। ওই লোকজনের মধ্যে এমনও কেউ-কেউ তো নদীর ভিতরের মাটি এক-ডুবে তুলে নিয়ে আসে শীতের সময়, তাদেরও কেউ-কেউ এমন সাক্ষ্যও দেয় যে, জারুলের দুটো মোটা শিকড় নদীর তলায় বাঁধের মত খাড়া – স্রোত যাতে জারুলের ভিত না কাটে। কিন্তু সেসব তো এমন সাক্ষ্য, যার কোনো প্রমাণ দরকার হয় না। প্রমাণ ছাড়াই লোকজন খুব তাড়াতাড়ি মেনে নেয়, মেনে নেওয়াটা এতই জরুরি হয়ে ওঠে। এমন একটা যুক্তির আভাস পেলে, লোকজন, জারুলের ভিটেটাকে স্রোতের ভিতর থেকে বুড়ো আঙুলের মত, বা প্রান্তরের প্রান্ত থেকে কেউটের ফণার মত, দেখতে পারে ও বারুণী স্নানের দিন নদীর জল দিয়ে জারুলের কা- ধুয়ে জারুল-পাতার নৌকো বানিয়ে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিতে পারে। উপমা তৈরি করতে হলে ও সেই উপমার প্রশ্রয়ে নদীর পাড়-ভাঙার মত সাম্বৎসরিক নিত্য ঘটনাকে নিজেদের নিত্য বোধবুদ্ধির বাইরের ব্যাপার বলে মেনে নিতে চাইলে, এমন কোনো সাক্ষ্যকে যুক্তিযুক্ত মনে করে নিতেই হয় যে, নদীর অতল তলে, জারুল, তার শিকড়ের বাঁধ বেঁধে রেখেছে।

সেই অতল তলের অদৃশ্য শিকড়, নদী ও জারুলকে নিয়ে যে-বিশ্বাস তৈরি করে তুলেছে সে-বিশ্বাস কখনো ভাঙে না। সেই বিশ্বাসকে অভগ্ন ও অখ- রাখতে আরো কত নতুন বিশ্বাস তৈরি হতে থাকে। বিশ্বাস তখনই বিশ্বাস হয়ে ওঠে যখন তা পুরুষানুক্রমিক হয়। বিশ্বাসের কোনো বিনাশ হতে দিতে নেই। একটা বিশ্বাস তৈরি হতে – কত জন্ম কেটে যায়। সব জন্মেই তো নতুন করে একটা বিশ্বাস জন্মাতে পারে না। মানুষকে বাপ-পিতামহের বিশ্বাস নিয়েই জীবন চালাতে হয় ও জীবন শেষ হওয়ার আগেই নিজের ছেলেপুলে নাতি-নাতনিদের সেই বিশ্বাস জানিয়ে দিতে হয়। যদি তোমার ভাগ্যে থাকে, তা হলে তোমার নিজের জীবনে পাওয়া কোনো বিশ্বাসও তার সঙ্গে যুক্ত করতে পারো। কিন্তু সেই বিশ্বাসটা যে পাবেই এমন ভরসা করো না।

বিশ্বাস ছাড়া তো মানুষের এক দ-ও চলে না। সব বিশ্বাসই তো আড়াল থেকে আসে। তুমি তো দেখছ – আকাশ জুড়ে জ্বলজ্বলে দিন, পিঠের চামড়া পুড়ে কুঁচকে যাচ্ছে সে-রোদে, সেই পোড়া শরীর তো একটু আরাম পেতে গাছের তলায় দাঁড়ায় – চেনাজানা তেপান্তর, পায়ের পার হওয়ারও সাবেকি অভ্যেস, গাছ তো ছায়া দেয় একজনকে একটু ছায়া দিতেই। যে-আকাশ রোদ দিচ্ছিল, সেই আকাশই ছায়া দিচ্ছিল, এমন সব কথা মনে আসতে শুরু করলে, তাকে এমন নদীর স্রোতের মতই সে-কথাগুলোকে মনে আসতে দিতে হয়, যে-নদীর ভিতরে পাহাড়-পর্বতের কোনো বন্যা ঢুকে পড়ে নদীর নিজের জলের সঙ্গে মিশে যায় নি। আবার যদি মনে আসে যে, আকাশই রোদ ঢালছিল আর গাছটাই ছায়া বিছিয়েছিল, তাকেও মনে আসতে দাও এমন, যেন রোদ-দেওয়া আর ছায়া-দেয়া একটাই কাজ, আকাশও ছায়া দেয়, গাছও রোদ দেয়। আবার যখন কোনো মাঝরাতের অন্ধকারে, ওই প্রান্তরটাই তোমাকে পেরোতে হয় পায়ের অভ্যেসে, আর নাকের গন্ধ নেওয়ার জোরে, তখন, যদিও আকাশ থেকে জলই পড়ছিল অঝোর, তবু, যেমন রোদ থেকে, তেমনি ওই অঝোর ঝরণ থেকেও একটু বাঁচতে তো সেই চেনা গাছের তলাতে তোমাকে দাঁড়াতেই হয়। মনের অভ্যাসে। আর সেই গাছটার মাথা দিয়ে কোনো বাজ তোমাকে মাটিতে গেঁথে দেয়। তখন গেঁথে যেতে-যেতেই তোমাকে ভাবতে হয় ওই তেপান্তরের বৃষ্টি, তেপান্তরের গাছ, আর তেপান্তরের বজ্রপাত একটাই ঘটনা। গাছ যেমন তেপান্তরে মাথা উঁচিয়ে ছিল, তুমিও তেমনি সবচেয়ে মাথা উঁচু করে থাকতে পারতে এই গাছেরই মত সবচেয়ে উঁচু, থাকতে পারতে বজ্রটাকে মাথায় নিতে। এই সব কখনো মাপামাপি করতে নেই। মাপামাপি করলেই বিশ্বাসে চিড় ধরে যায়। বিশ্বাসে চিড় ধরতে দিলেই তো অনেক রকমের সর্বনাশ। যে-বিশ্বাসগুলো বাপ
ঠাকুরদার কাছ থেকে পেয়েছ, সেগুলোরও সর্বনাশ, আর যে-বিশ্বাসগুলো তুমি নিজেই পেতে পারতে, সেগুলোরও সর্বনাশ। নদী, মানুষ, ভাঙনের মুখেও বেঁচে থাকা জারুল গাছ, সরে-যাওয়া নদীর বুকেও জারুল গাছের ঝুঁকে থাকা, নদীর অতল তলেজারুল গাছের অদৃশ্য দুই মোটা শিকড়ের বাঁধের স্রোতশাসন – যাতে সেই ভাঙনের স্রোত জারুল গাছের শিকড়ের মাটি থেকে দূরে থাকে, নদীর ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা, চৈত্র মাসের কৃষ্ণ-চতুর্দশীতে যেখানে যে-জল আছে, তাকেই নদী করে নিয়ে তারই পাড়ে বারুণী মেলা।

এখন চৈত্র মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে সেই নদীর পাড়ে ছেড়ে-যাওয়া নদীর জল যে-বাঁওড় হয়ে পড়ে আছে, শাদা স্রোত হয়ে গেছে কালো জল, মানুষের বসতভাঙা যে-নদী হয়ে গেছে কালো রঙের মাছের সংসার, সেই নদীর ফিরে আসার জন্য সেই বাঁওড়ের পাড়ের বালুভূমি নির্জন ও অপেক্ষমাণ নদীতল হয়ে আছে – যেন  নদী যখন ফিরবে তখন পুরো নদীটাকে সে বুকে নিয়ে নদীর জলের তলায় আবার আত্মগোপনে চলে যেতে পারবে ও সেই আত্মগোপনে জারুল গাছের সেই দুটো মোটা শিকড়ও থাকবে স্রোতের বিরুদ্ধে বাঁধ হিসেবে।

নদীর ওপর দিয়ে যেসব হাওয়া বয়ে এসে, জারুল গাছের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে, অষ্টপ্রহর এমন একটা দিকভুল তৈরি করতে থাকত, যেন জারুল গাছটাই তার ডালপালা পাতা-পল্লব থেকে হাওয়াদের ন-দশ দিকে বইয়ে দিচ্ছে আর সেই জলমেশানো হাওয়া জারুল গাছের পাতাগুলোকে ধুইয়ে দিয়ে সব সময় এমন ঝলমলে রাখত, এমন কাঁপিয়ে রাখত, যে, মনে হত, তারা, পাতাগুলো এইমাত্র মাটির হাওয়াহীন, আলোহীন অন্ধকার থেকে মাটির ওপরে উঠে এল – এখন তো সেই হাওয়া নেই। জারুল গাছের ডালপালা পাতা-পল্লব কা–শিখর পুরু ধুলোয় এমন ঢাকা যে চৈত্র মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে বারুণী মেলার দিন সেই পাতাগুলো তুলে এনে, সেগুলোকে সেই-নদীর ফেলে-যাওয়া বাঁওড় হয়ে-থাকা কালো জলে ধুয়ে নিতে হয়, তাতেও সেই পাতার স্তবক থেকে শুধু কাদাই বেরোয়। বাঁওড়ের কাদা জল আর জারুলের পাতার ধুলো ধুয়ে দেবে কী করে। সেই মোটা হয়ে যাওয়া জারুলপাতা দিয়েই বারুণী পুজোর নৌকো বানাতে হয়। পুজোর পর সেই পাতার নৌকো বাঁওড়ের কালো জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। নৌকোগুলো ভাসে। কিন্তু বাঁওড়ের জলে তো স্রোত নেই, তাই নৌকো এগোয় না। দুই হাতের পাতায় জল তুলে জল ঢেলে, জারুলপাতার নৌকোগুলোতে পুরনো নদীর গতি আনতে হয়, নতুন করে ফিরে আসা নদীর ঢেউয়ের ধাক্কা দিতে হয়, আর বারুণী পুজোর গানটা গাইতে হয় –

যাও নদী, বও গিয়া।

যাও জারুল, খাড়াও গিয়া।

জারুল, নদীরে দিও ছায়া

নদী, জারুলরে দিও হাওয়া।

জারুল, নদীরে দিও ঘাট

নদী, জারুলরে দিও বাঁক।

বারুণী পূজার দিন, যার যা জল, হাতের আঁজলা-ঘটি, কুয়ো-ডোবা-পুকুর-দিঘি-খাল-বিল-হাওড়-বাঁওড়ের, ছোট-বড়-সরু-মোটা-মজা-সোঁতা-নতুন-পুরনো-খাত-ডালা-খাত-হারানো, ফিরে-আসা নানা আকারের আর স্বভাবের – সব জল, নদী হয়ে যায়। বারুণী পুজোয় যার যা সুর, তাইতেই গাইতে হয় –

আমার এই জলখানে মেঘ ভাঙ্গি পড়ুক,

আমার এই জলের ভিতর বানা ঢুকি পড়ুক,

আমার এই জল যেন পাড় ভাঙ্গে,

আমার এই জলখান যেন আমাক ভাসায়

আমার এই জারুল গাছখান যেন খাড়ি থাকে। r