নদী কারো নয়

লেখক:

সৈয়দ শামসুল হক

\ ২৬ \

আমরা এতদূর এসে অবধি ধারাবাহিক একটি গল্পের জন্যে যদি এখনো অপেক্ষা করে থাকি তাহলে স্মিতমুখ হয়ে উঠব। দেখাই কি যাচ্ছে না যে, আমরা এখন গল্পের ভেতরেই বাস করছি? আমাদের চারদিকেই এখন গল্পের অণু, কণা ও পর্বত এবং সমুদ্র। সৃষ্টির আদিতে যেমন – জল, বিশাল জল, পরে সংক্ষুব্ধ সেই জল, জলতল থেকে পর্বতের জেগে ওঠা, ক্রমে রচিত স্থল সমতল, অতঃপর প্রবল বৃষ্টিধারা এবং জীবনের উত্থান; এখন আমাদের বাস্তবও সেরূপ। বাস্তব এক বিশাল জলরাশি, এবং তার ভেতরে জেগে ওঠা প্রস্তরের

শিখরসমূহ; স্বপ্ন ও শোকের বর্ষণ – অবিরাম, অযুত কোটি বৎসর। এবং এ-সংক্ষুব্ধ চিত্র থেকেই উত্থিত হচ্ছে নিশ্বাস। আমাদেরই নিশ্বাস বটে। আমরা এসব লয়ে পৃথিবীতে জীবিত, কিন্তু জীবন সম্পর্কে সকলেই সচেতন এমত বলা যাবে না। আমরা আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখি।

গল্পের জগৎ হয় সম্ভবপরতার জগৎ। আমাদের চারদিকে এখন এই সম্ভবপরতা জেগে উঠেছে পর্বতেরই শিখর যেনবা; আমরা কাঁকড়ার মতো দাঁড়া টেনে টেনে সেই শিখরের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। কখনো আমরা একই বৃত্তে ঘুরেছি, কখনো ফিরে ফিরে গেছি পুরাতন অনুচ্ছেদ বা বর্ণনায়, আবার খানিকটা এগিয়েছি এবং পিছিয়েছিও। আমরা এবার স্থির হয়ে খানিক তাকিয়ে দেখি গল্পের উঠে-পড়া শিখরগুলোর দিকে। এভাবেই তবে আমরা অতঃপর অগ্রসর হই। এভাবেই আমরা জলসাঁতরে প্রস্তরের গায়ে দাঁড় টেনে অগ্রসর হই না কেন?

ওই কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান। জলেশ্বরীর ধনী মানুষ। এখন তিনি বয়সে প্রবীণ ও মাননীয়। সমাজের মাথা মানুষ তিনি। ধনে জনে সম্পদে ও ভূমি অধিকারে তাঁর তুল্য সফল মানুষ জলেশ্বরীতে মেলা ভার। সহজে মানুষ তার দেখা পায় না। তাঁর দুয়ারে অর্থী ও সাহায্য বা করুণাপ্রার্থীরা দিনের পর দিন বসে থাকে। কিন্তু সেই তিনি কুসমীর মতো এক বিধবার বাড়িতে এই দুরন্ত নিশিপ্রহরেও কেন বসে আছেন? এবং বিদায় নেবার নাম নেই। গল্প তিনি ফেঁদে বসেছেন ও কুসমীকে শোনাচ্ছেন। কী সেই গল্প? দেশভাগেরই তো! দেশভাগ? কোন দেশভাগ? দেশকে কি ভাগ করা যায়? মাটিকে খন্ডবিখন্ড করা যায়? না, সে-বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য নাই। তিনি একে মজাদার এক গল্পকথা হিসেবেই যেন দেখে থাকেন আর সেই মজার গল্পটিই তিনি বলে চলেছেন। বলে চলেছেন ওয়াহেদ ডাক্তারের কথা, মোক্তার মইনুল হোসেনের কথা, হাকিম সাহেবের কথা, আজাদির ঝান্ডার কথা।

ওয়াহেদ ডাক্তারের গল্পটা বড় রসালো বলে তিনি উত্থাপন করেন। সেই যে লোকটা সাতচল্লিশের চোদ্দই ডিসেম্বর জলেশ্বরী থেকে আধকোশা নদী পার হয়ে হরিষালে চলে যায়, সেখানে গিয়ে অতঃপর এক ঘোষণা দেয়। কী সেই ঘোষণা? আমরা সেটারও আভাস পেয়েছি। হরিষালে গিয়ে ওয়াহেদ ডাক্তার ঘোষণা দেয় যে, আজ থেকে এই হরিষাল একটি রাজ্য এবং সে তার রাজা। – বিটিশ আর নাই! বিটিশ বিদায় নিছে! কইছে, আজ হতে তোমরা স্বাধীন। মুঁইও সেই স্বাধীনতা ঘোষণা করিলোম। এই হামার রাজ্য। আজ হতে হেথায় মোর শাসন চলিবে! – সাইদুর রহমান সেই পর্যন্ত কুসমীকে বলেছেন কি আমাদেরই বলেছেন। অতঃপর ওয়াহেদ ডাক্তারের কী হয় আমরা শুনবার জন্যে অধীর অপেক্ষা করছি।

ওদিকে মইনুল হোসেন মোক্তারের কথাটিও পড়ে রয়েছে। আধকোশা নদীতে ডুবে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু কি স্বাভাবিক, না সে আত্মহত্যাই করেছিল। বহুদিন পরে তার ছেলে, বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক মকবুল হোসেন জলেশ্বরীতে আসে বিস্তারিত জানতে। কী হয়েছিল? কী ঘটেছিল? মৃত্যু, না আত্মহত্যা? নাকি হত্যাই? আমরা ক্ষণকালের জন্যে থামি এবং ভাবি। হত্যা! একটি মানুষ একটি মানুষের জীবন নাশ করে, তাকেই তো বলে হত্যা! কখনো তো এমনও হয়, একজন নয় অনেকে মিলেই একটি মানুষকে হত্যা করে। আবার এও হয়, মানুষ নয়, কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, ঘটনা তাকে হত্যা করে, সময় তার প্রাণ কেড়ে নেয়। তখন কি বলা যাবে ইতিহাসই তাকে হত্যা করে? তখন কাকে বা খুনি বলে সাব্যস্ত করা যাবে? আর যদি আত্মহত্যাই হয়, আমাদের ভাবতে হয়, কখন একটি মানুষ আত্মহত্যা করে? যখন তার কাছে বাঁচা বা না-বাঁচা সমতুল্য হয়ে যায় – তাই কি? নাকি, এ-জীবন থেকে আর কিছু গ্রহণ করবার নাই দেখে মানুষ আলিঙ্গন করে মৃত্যুকে? অথবা, তার বাস্তবতা বোধ এতটাই বিনষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষের জীবনে একমাত্র অনিবার্য ও তর্কাতীত সত্য যে  মৃত্যু তা ভিন্ন তার কাছে আর কোনো কিছুই বিশুদ্ধ কাম্য বলে মনে হয় না।

সাইদুর রহমানের নিষ্কর্মা জামাই গফুর ঢাকা এসেছিলো চাকরির সন্ধানে। তাকেই সে মুরুবিব হিসেবে ঠাউরে নিয়েছিলো। আপনি যদি একটু চেষ্টা করেন তাহলে ব্যাংকের চাকরিটা আমার হয়ে যায়। তারই ফ্ল্যাটে উঠে এসেছিলো, আশ্রয় নিয়েছিলো গফুর। হাজার হোক গফুর তার জন্মশহরের মানুষ। যদিও সে জলেশ্বরীতে বহুদিন যায় না, তবু দেশের মানুষ বলে কথা। তাছাড়া ঢাকাতে তার থাকার জায়গা নেই। চাকরি সন্ধান করছে, অতএব পকেটেও পয়সা নেই। অগত্যা তার বাড়িতেই থাকা-খাওয়া। প্রথম রাতেই খাবার টেবিলে গফুর বলেছিলো, আহ্, আপনার বাবার কথা মনে করে এখনো টাউনের বুড়ামানুষেরা কান্দে! কেন কাঁদে? তার মৃত্যুর কথা মনে করিয়া কান্দে তারা। আইজকাল তো সকল কথাই সকলের বিস্মরণ হয়া গেইছে। বুড়া সকল চলিয়া গেলে কারো কিচ্ছু স্মরণে আর থাকিবার নয়। অতঃপর গফুর মৃত্যুকাহিনির অবতারণা করে। তার মনে হয়, বেকার যুবকটি তার বাড়িতে থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে একটি লোমহর্ষক কাহিনি উপহার দেয়। এমত আমরা সকলেই করি। উপকার যার কাছে পাই তাকে আমরা তার সন্তোষজনক বিষয়-কথাই শোনাই।

কিন্তু তার মনে একটি প্রশ্নেরও উদয় হয়। পিতার অপঘাতে মৃত্যুর কথা কি কারো জন্যে সন্তোষজনক হতে পারে? গফুর         সবিস্তারে বয়ান করে চলে। আমরা শুনিছি তখন ভরা বষ্যাকাল। নদী পাগল হয়া গেইছে। ঘোলা পানি চক্কর মারি মারি ছুটিয়া চলিছে। সেই পানিতে, আহ্, ক্যানে যে তিনি ঝাঁপ দিয়া পড়ে তার নির্ণয় না হয়। কাঁইও না কবার পায়। বুড়া মানুষেরাও আফসোস করি কয়, মাথাটায় বা তাঁর বিগড়ি গেইছিলো। শুনতে শুনতে তার স্মরণ হয় মায়ের সেই শেষ কথা – একবার পাকিস্তানে, একবার ইন্ডিয়ায়! একটি ধাঁধার মতো কতকাল সে করোটিতে বহন করে চলেছিল মায়ের শেষ ওই কথাটি। কতকাল ধরে থেকে থেকে তাকে আছাড় দিয়েছে হাসপাতালে মায়ের সেই শেষ মুহূর্তটি আর শেষ ওই কথাটি। একবার পাকিস্তানে, একবার ইন্ডিয়ায়। গফুরের কাছে সবিস্তারে সব শুনবার পরেও সে কোনো কূল পায় না। গফুরও তো সেদিনের যুবক। তারও তো সব শোনা কথা। এবং উপকারীর জন্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে অতিরঞ্জিত করে সব বলা। সত্যের ভাগ বা আভাস বা তাতে কতটুকু!

সাইদুর রহমানের নিষ্কর্মা জামাই গফুর; শহরে সে বাবু হয়ে ঘুরে বেড়াত; বুঝি তার অপেক্ষা ছিল শ্বশুর কবে গত হয়, তবে সে সম্পত্তির ভাগ পায়, পায়ের ওপর পা দিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেয়। সাইদুর রহমান সবই বোঝেন, কিন্তু সহজ মানুষ তো তিনি নন, নিজে কত ধান্দা, কত কূটকৌশল করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন, সে-সম্পদের দিকে শকুনের মতো চোখ দিয়ে আছে জামাই! অতএব জামাইকে একদিন তিনি স্পষ্টই বলে দেন যে, কাজকামের তালাশ করো, নয় আমার বেটিকে তালাক দেও, হামার সম্পত্তি তোমার ভোগে যাবার নয়! অতএব গফুর ঢাকা আসে চাকরির সন্ধানে। তার জানা ছিল যে, রাজধানীর মানী মানুষ লেখক মকবুল হোসেনের জন্ম জলেশ্বরীতে, আর জলেশ্বরীর কথা তার বহু লেখায় বড় করে উঠে আসে। গফুর তত্ত্বতালাশ করে মকবুল হোসেনের ঠিকানা বের করে, তারই ফ্ল্যাটে উঠে আসে, আশ্রয় নেয়। হাজার হোক গফুর তার জন্মশহরের মানুষ। যদিও সে জলেশ্বরীতে বহুদিন যায় না, তবু দেশের মানুষ বলে কথা। তাছাড়া ঢাকাতে তার থাকার জায়গা নেই। চাকরি সন্ধান করছে, অতএব পকেটেও পয়সা নেই। অগত্যা তার বাড়িতেই থাকা-খাওয়া। প্রথম রাতেই খাবার টেবিলে গফুর বলেছিল, আহ্, আপনার বাবার কথা মনে করে এখনো টাউনের বুড়া মানুষেরা কান্দে!  – কেন কাঁদে? – তার মৃত্যুর কথা মনে করিয়া কান্দে তারা। আইজকাল তো সকল কথাই সকলের বিস্মরণ হয়া গেইছে। বুড়া সকল চলিয়া গেলে কারো কিচ্ছু স্মরণে আর থাকিবার নয়। অতঃপর গফুর মৃত্যুকাহিনির অবতারণা করে। মকবুল হোসেনের মনে হয়, বেকার যুবকটি তার বাড়িতে থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে একটি লোমহর্ষক কাহিনি উপহার দেয়। এমত আমরা সকলেই করি। উপকার যার কাছে পাই তাকে আমরা তার সন্তোষজনক বিষয়-কথাই শোনাই।

কিন্তু মকবুল হোসেনের মনে একটি প্রশ্নেরও উদয় হয়। পিতার অপঘাতে মৃত্যুর কথা কি কারো জন্যে সন্তোষজনক হতে পারে? গফুর সবিস্তারে বয়ান করে চলে। আমরা শুনিছি তখন ভরা বষ্যাকাল। নদী পাগল হয়া গেইছে। ঘোলা পানি চক্কর মারি মারি ছুটিয়া চলিছে। সেই পানিতে, আহ্, ক্যানে যে তিনি ঝাঁপ দিয়া পড়েন তার নির্ণয় না হয়। কাঁইও না কবার পায়। বুড়া মানুষেরাও আপসোস করি কয়, মাথাটায় বা তাঁর বিগড়ি গেইছিলো। শুনতে শুনতে মকবুল হোসেনের স্মরণ হয় মায়ের সেই শেষ কথা – একবার পাকিস্তানে, একবার ইন্ডিয়ায়! একটি ধাঁধার মতো কতকাল সে করোটিতে বহন করে চলেছিল মায়ের শেষ ওই কথাটি। কতকাল ধরে থেকে থেকে তাকে আছাড় দিয়েছে হাসপাতালে মায়ের সেই শেষ মুহূর্তটি আর শেষ ওই কথাটি। একবার পাকিস্তানে, একবার ইন্ডিয়ায়। গফুরের কাছে সবিস্তারে সব শুনবার পরেও সে কোনো কূল পায় না। গফুরও তো সেদিনের যুবক। তারও তো সব শোনা কথা। এবং উপকারীর জন্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে অতিরঞ্জিত করে সব বলা। সত্যের ভাগ বা আভাস বা তাতে কতটুকু! সেই সত্যের সন্ধানেই মকবুল আসে জলেশ্বরীতে।

আমরা কাহিনির এ-পর্যায়ে এতটুকু জেনে গেছি যে, যে-আধাকোশা নদীতে ডুবে তার বাবার মৃত্যু হয়, সেই আধকোশা সাতচল্লিশের চোদ্দই আগস্ট তারিখে পড়ে হিন্দুস্থানে। আগস্টের সেই ভোরবেলায় নদীর পাড়ে স্থির স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে মকবুলের বাবা মইনুল হোসেন মোক্তার। তার মনে চাবুকের মতো একটা সত্য পড়ছে অবিরাম – এ নদী আর আমার নয়! নদী এখন হিন্দুস্থানের! এই সেই নদী, সেই উন্মত্ত নদী, যার ভাঙনের গ্রাসে প্রতি বছর ক্ষয় হচ্ছে জলেশ্বরী শহর, যার ভাঙনে দু-দুবার ভিটে নাশ হয়েছে তার। দ্বিতীয় ভাঙনের পর মইনুল আশ্রয় নেয় তার বন্ধু দেবদত্ত মোক্তারের বাড়িতে। না, আর সে নতুন ভিটে গড়বে না, বরং নদীকেই সে শাসন করবে, নদীর বিকট রাক্ষুসে চোয়ালকে সে পারলে নিজের দু’হাতে চেপে ধরবে। আমাদের স্মরণ হবে, এ-কথা আমরা কিছু আগেই বলে উঠেছি – মইনুল হোসেন মোক্তারের বাড়ি ছিল নদীর পাড়েই। সেই দুর্ভিক্ষের বছরে, পঞ্চাশের সেই মন্বন্তরের কালেও আধকোশার বিরাম ছিলো না, বরং সে-বছর যেন বাংলার মানুষের মতো আধকোশাও ছিলো দীর্ঘ এবং আশাহীন অনাহারে; সে বছর আধকোশা এক লপ্তে পুরো একটা মহল্লাই গিলে খেয়েছিলো। মইনুল হোসেন মোক্তারের বাড়িটাও সে-বছর আধকোশার উদরে যায়। সে তার বসত সরিয়ে আনে নদীর আরেক প্রান্তে। আর এখানেও পঁয়তাল্লিশ সালে আরো একবার মইনুল হোসেন বর্ষার এক মাঝরাতে জেগে উঠে দ্যাখে, নদীর ছোবল তার ভিটের গোড়ায় প্রবল আঘাত হানছে। আমাদের আজকের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেন তখন মায়ের কোলে দুগ্ধপোষ্য শিশুটি। তাকে কোলে নিয়ে মা ভীতস্বরে চিৎকার করে ওঠে – আল্লা গো! আর বিপরীতে মইনুল হোসেন তীব্রকণ্ঠে গাল দিয়ে ওঠে – হারামজাদি! না, স্ত্রীর প্রতি নয়, নদীর প্রতি, আধকোশার প্রতি। – হারামজাদি, ফির খেপি উঠিছে। এইবার তোরে একদিন কি মোরে একদিন! কত খাবু তুই মাটি! এইবার মুই দেখি নেমো! মইনুল হোসেন নতুন ভিটে স্থাপনের কথা আর ভাবে না। পাগলি নদীকে শাসন করবার চিন্তায় সে বেঘোর হয়ে ওঠে। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বন্ধু মোক্তার দেবদত্তর বাড়িতে। দিন পরে দিন যায়। আমরা জেনেছি, একদিন দেবদত্ত তাকে বলে, অ্যামন করি আর কদ্দিন! ধন্দ মারি থাকা কোনো কাজের কথা নয়। যা গেইছে তা গেইছে। নত্তুন করি ফির শুরু করো। দরকার হইলে মুঁই তোমাক সব সুসার করি দেমো। দম্ ধরি বসি না থাকো। কথাটা শুনেই হুঁকো ফিরিয়ে দিয়ে মইনুল বলে, তোমার হেথায় কি মুঁই ভার হয়া গেইছোঁ? কও তো আইজের রাইত গেলে মুঁই অন্য জাগা চলি যাঁও। – না, না, সে-কথা নোয়ায়, তোমরা ভার হইবেন ক্যানে! থাকেন না, যদ্দিন খুশি থাকেন, মোর এতবড় বাড়ি, দুইটা মানুষের কি জাগা হবার নয়! ভার হয়া গেইছো, এগুলা কী কথা কও? বাড়ির তিনি তো কয়, আহা, মকবুলের মা ঝ্যান হামার মায়ের প্যাটের বুইন। দ্যাখো না, দুই সই মিলি কত আল্লাপ-সাল্লাপ করে, বাগানে ঘুরিফিরি বেড়ায়, মন্দিরে আসি বসে, সে এক দেখিবার শোভা। – তবু মইনুলের মুখে ভাবান্তর না দেখে দেবদত্ত শেষে বলে, তার বাদে শোনো, একখান জমির খবর পাওয়া গেইছে, ডাকবাংলার নিকটে, নদী হতেও দূরে, বাড়ি করিলে দশ বিশ বচ্ছরে নদী না নাগাল পাইবে। জমির দরও শস্তা, মোরে এক মক্কেলের। কন তো বায়না করি দেই, ট্যাকা পরে দিলেও চলিবে।

মইনুলের চোখেমুখে ভাবান্তর নাই। তার কঠিন চেহারা দেখে দেবদত্তর সন্দেহ হয় লোকটার বুঝি মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে। ধীরে সে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। স্ত্রীকে গিয়ে বলে, ভিটার যে কী মায়া, সে আমি মইনুলকে দেখিয়া আইজ বুঝিলোম। পাগলে না হয়া যায় কী হয়া গেইছে! দেবদত্তর স্ত্রী বাস্তববোধের পরিচয় দেয়। দেবদত্তর স্ত্রী বলে, ভিটার মায়ার কথা কী কন? মায়া তো হয় ভিটা পুরানকালের হইলে। এই যে নদীতে তার ঘর গেইছে, সে-ঘরও তো মোটে দুই বচ্ছর আগের। আরেক ভাঙনে সরি আসি এই ভিটা করিছিলো। তার জইন্যে এত মায়া জন্মিবে যে, পাগল হয়া যাইবে! – হাঁ, এটা একটা কথা বটে। মইনুলের এ-ভিটা তো মাত্র সেদিনের। দেবদত্তর মনে পড়ে, তখন এত করে বলেছিলো সে মইনুলকে – নদীর এত কাছে ফির না ঘর তোলো! নদীর গতিক তো জানো! দুই-তিন বচ্ছরেই ফির আসি ছোবল দিবে। নদী নয় তো, গোক্ষুরা সাপ! বিষ ঢালিবেই! – আমরা এখানে একটু থেমে লই; নদীর তবে এ-উপমাও হয় – সাপ!

মইনুল কিন্তু দেবদত্তর সে-পরামর্শ শোনে নাই। পরদিন ভোরে কাছারি যাবে দেবদত্ত মোক্তার, যাবার আগে মইনুলকে বলে, কী হে, ঘরে থাকিবেন, না কাছারি একপাক ঘুরি আসিবেন হামার সঙ্গে। আজ কয়েকদিনই কাছারি যাবার আগে বন্ধুকে এমন ডাক দিতো দেবদত্ত, প্রতিবারই জবাব আসতো – না, তোমরা যাও। আজ মইনুল তাকে অবাক করে দিয়ে বলে, যামো। একজল্লা অপেক্ষা করো, মুই গোসলটা সারি আসি। চোখের পলকেই প্রায় মইনুল হোসেন তৈরি হয়ে যায়। সেই মোক্তারি পোশাক আজ তার অঙ্গে ওঠে, আধকোশার গহবরে সেই ভিটানাশের পর এই প্রথম। দেবদত্ত খুশি হয় – যাক! এতদিনে তবে ভিটার শোক কাটিয়ে উঠতে পেরেছে তার বন্ধু। এ শোক তো পুত্রনাশের সমান। সন্তানেরও অধিক তবে ভিটাবাড়ি – লোকের কথা তবে সত্য দেখা যায়! দেবদত্ত তার মুহুরি গণেশকে আড়ালে হুকুম করে, যাও, যায়া আবজল মিয়াকে খবর দেও যে, মইনুল মিয়া ফির কাছারি যাইচ্ছে।

কাছারিতে এসে মইনুল মোক্তার সোজা লাইব্রেরিতে ঢোকে, মোক্তারদের উকিলদের এটাই নিত্যকার করণ। এখানেই তারা প্রথমে আসে, এখানেই মক্কেলদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে হাকিমের কাছে হাজির হবার আগে, আর মক্কেল বা মামলার তারিখ না থাকলে চেয়ারের ওপর আয়েশে গা ঢেলে, কী প্রাচীন হলে টেবিলের ওপর আধখানা পা তুলে দিয়ে পান-তামাক খায়, গল্পগাছা করে। আজও লাইব্রেরি ঘর উকিল-মোক্তার-মক্কেলে ভরপুর। আবজাল মিয়াকেও দেখা যায়, সে বড় উৎসুক মুখে দরোজার কাছে, কখন তার ডাক পড়ে – আইসো, কাছে আইসো, কেস্ কিছু আসিলো কি? অথবা, আবজল, পান দ্যাখো তো! জরদা ঝ্যান না দেয়! কাঁচা গুয়া হইবে। কিন্তু আবজলের দিকে মইনুল আজ দৃষ্টিপাতমাত্র করে না। বরং অনেকক্ষণ সে সমবেত উকিল-মোক্তারদের জটলা দ্যাখে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে, শোনেন তবে, হামার একখান কথা আছে, ধ্যান করি শোনেন সবায়। মইনুল হোসেন মোক্তারের নামডাক অনেকদিনের। হিন্দু-মুসলমান সকলের চোখেই তার একটা আলাদা সম্মান আছে কাছারিতে। সকলেই ফিরে তাকায় তার দিকে।

মইনুল হোসেন মোক্তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সকলে একটু অবাক হয়। কথাটা তবে গুরুতর, নইলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে কেন? মক্কেল-মুহুরিরা নীরব হয়। উকিল-মোক্তারেরা নড়েচড়ে বসে। মইনুল হোসেন বলে, কথা আর কিছুই নয়, সর্বনাশা নদীর কথা! আধকোশার কথা! আধকোশার ভাঙনের কথা! এই পাগলিকে শাসন করিবার কথা! আর তার জন্যে মোর একখান প্রস্তাব আছে। বিশদ তবে খুলিয়া কই। – তারপরে তো আমরা জেনেছি তার নদী শাসনের পরিকল্পনার কথা, বাংলার লাট লর্ড কেসির কাছে তার দরখাস্ত পৌঁছানোর কথা। শহরে আজো সে এক রূপকথাই হয়ে আছে।

জলেশ্বরীতে ঘণ্টাখানেকের জন্যে এসেছিলেন বাংলার লাট লর্ড কেসি, এখন তিনি শহরের গণ্যমান্যদের সঙ্গে মিটিং করে আবার উঠবেন ট্রেনে, এই তিনি বেরিয়ে এলেন ডাকবাংলা থেকে, আমরা স্পষ্ট দেখে উঠেছি লাট সাহেবকে, মিছিল করে তার পেছনে মহকুমার হাকিম সাহেব, পুলিশের বড় দারোগা, বাজারের মাতবর মার্চেন্ট কয়েকজন আর কংগ্রেস লীগের নেতারা; ওই ট্রেনের কাছে এসে গেছে তারা, গেট পার হলো, লর্ড কেসি ট্রেনের পাদানিতে পা রাখলেন, দরোজা পর্যন্ত উঠে গেলেন তিনি, তারপর জনতার দিকে হাত তুলে ধরলেন, ঠিক সেই সময়! মইনুল হোসেন মোক্তার ভিড় ঠেলে একেবারে লাটসাহেবের প্রায় কাছে পৌঁছে যায়। – ছার! ছার! মাই লর্ড! অধীনের এই পিটিশন! মইনুল হোসেন দরখাস্তের কাগজটা, আধকোশাকে বাঁধ দিয়ে শহর রক্ষা করবার সেই পিটিশন, শহরবাসী শতেক মানুষের স্বাক্ষর সংবলিত সেই আর্জিখানা লাটসাহেবের সমুখে পতাকার মতো তুলে ধরে; কবেকার সেই রানী ভিকটোরিয়ার প্রতি জাতিস্মর নাম ধরে ডেকে ওঠে, মহারানীর দোহাই! অধীন ভারতবাসী জলেশ্বরীর অধিবাসীকে দয়া করেন!

পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে মইনুল হোসেনের ওপর। কিন্তু লাটসাহেব হাত তুলে ধরে উচ্চস্বরে বলে ওঠেন, লেট হিম! লেট হিম! ভিড়ের ভেতরে এবার এগোতে পায় মইনুল হোসেন। – ইয়েস, মাই ফেলো! হোয়াট ইজ ইট! হাকিম নেয়ামতউল্লাহ মইনুল হোসেনের হাত থেকে প্রায় ছোঁ মেরে কাগজখানা নিয়ে এক পলক চোখ বুলিয়েই লাটসাহেবকে বিষয়টা অবগত করান। – স্যার ইট ইজ আ পিটিশন টু ইয়োর লর্ডশিপ টু সেভ দি টাউন ফ্রম দি রিভার! – সেভ দি টাউন ফ্রম রিভার? হোয়াট রিভার? – রিভার আডকুশা, মাই লর্ড।  –  হোয়াট অ্যাবাউট ইট? কাম, মাই ডিয়ার ফেলো, কাম টু মি! লেট মি হিয়ার ফ্রম ইউ!

এ একটা গল্পকথাই হয়ে আছে জলেশ্বরীতে – লাটসাহেব নিজে ডেকে কাছে নিয়েছেন মইনুল হোসেন মোক্তারকে, আর মোক্তারের ব্যাটা কী দাপটেই না ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বর্ণনা করেছে আধকোশা নদীর ভাঙনের ইতিহাস। এমনকি খোদ হাকিম সাহেব তার বাংলা বয়ানকে ইংরেজি করে লাটসাহেবকে মুহুর্মুহু শুনিয়েছেন! বোঝো তবে! সাহসখানা একবার দ্যাখো মইনুল হোসেন মোক্তারের! কংগ্রেসের রাজেনবাবু না তল পায়, মুসলিম লীগের নজিরমিয়া না সেলামের অধিক না বক্তব্য দিবার পায়, মইনুল হোসেন মোক্তার এক নয় দুই নয় দশ মিনিট লাটের সঙ্গে আলাপ করে! – ওয়েল, আই উইল টেক দ্য পিটিশন। আই উইল সি টু ইট। ঘাবড়াও নেহি। – বলিছে কী বলে নাই লাটের ব্যাটা! বলিতে তাকে বাইধ্য করিছে মোক্তার, হামার মইনুল হোসেন মোক্তার। আর ঝা বলিছে লাটসায়েব, হাকিম তার বাংলা বয়ানও দিছে কি দেয় নাই! কইলকাতা যায়াই মুই দেখমো ইয়ার ব্যবস্থা কী করা যায়! কাতারবন্দি দুনিয়ার মানুষ নিজ কানে শুনিছে লাটসায়েবের ওয়াদা।

এই ঘটনা যত চমকপ্রদ আর মইনুল হোসেনের পক্ষে যত সাহসেরই বলে আমরা মনে করি না কেন, এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্যে; শহরের গণ্যমান্য সবাই তার বিরুদ্ধে চলে যায়। আমরা সহজেই লক্ষ করি মানুষের ঈর্ষা! নেতা নয়, মার্চেন্ট নয়, নিতান্তই এক মোক্তার, সে কিনা সকলের ওপরে এতবড় বাহাদুরিটা নিয়ে গেল! বাজারঘাটে যত প্রশংসাই সাধারণ লোকেরা করুক না কেন, দোকানে দোকানে মইনুল হোসেনের সঙ্গে লাটসাহেবের বাতচিত নিয়ে যত কথাই পল্লবিত হোক না কেন, কাছারির মোক্তার বার, উকিলদের বার, লীগের অফিস, কংগ্রেসের অফিস, সব জায়গায় একই রব – মইনুল এটা কী করলো! দেশে যখন স্বাধীনতার আন্দোলন, এতকাল পরে যখন ইংরেজ পড়েছে কেঁচিকলে, সারা ইন্ডিয়া যখন ইংরেজের রাজত্ব শেষের জন্যে আন্দোলনের রাস্তায়, গান্ধীর অনশন, জওয়াহেরলালের কৌশল, জিন্নার মুখে পাকিস্তান-পাকিস্তান এই এক কথা, তখন কিনা কোথাকার কোন মফস্বল এক জলেশ্বরী আর তার একখান নদী আধকোশা, তাই নিয়ে ঝাঁপাঝাঁপি! ইংরেজের লাটের কাছে পিটিশন! – আরে, ইংরাজ তো এমন মওকাই চায়! স্বাধীনতার ঝইন্যে আন্দোলন না করো, নদীর কথা চিন্তা করো! ইন্ডিয়ার কথা না ভাবো, জলেশ্বরী রক্ষায় মাতোয়ারা থাকো! আধকোশা! কত আর ভাঙিবে! সাতচল্লিশের চোদ্দই আগস্ট, সকাল তখন আটটা, সেই আধকোশার দিকে অপলক চোখে এখন মইনুল হোসেন মোক্তার তাকিয়ে আছে। এ নদী এখন হিন্দুস্থানে! এ নদী পাকিস্তানের ভাগে পড়ে নাই। এ নদী তবে আর আমার নয়! আর, এই নদীর জন্যেই কিনা ছিল তার এত সাধ্যসাধনা!

আমরা কি বলেছি, না বলি নাই? – যে, চোদ্দই আগস্টের পর কয়েকদিনের মাথায় সংবাদ আসে – না, ইংরেজের একটা ভুল হয়েছে, র‌্যাডক্লিফ সাহেবের লাল পেনসিলের দাগ ভুল জায়গায় পড়েছে, আসলে আধকোশা নদী পাকিস্তানের ভাগেই থাকবে, শুধু আধকোশা নয় – আরো উত্তরে হরিষাল পর্যন্ত পাকিস্তান! তাই? তাই! নদী তবে আমার! আমার!! আবার ফিরে এসেছে আমার কাছে? ফিরে এলেই কি আমার হয়ে যায়?

এই প্রশ্ন ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেনেরও। তবে নদীর বিষয়ে এই প্রশ্ন তার নয়। মকবুলের মেয়ে প্রিয়লিও ফিরে আসবে তার বাবার কাছে। ফিরে যে আসে সে কি আবার সেই আগের মানুষই ফিরে আসে? যে প্রিয়লি চলে গিয়েছিল সেই প্রিয়লিই কি ফিরেছে বা ফিরবে? r (চলবে)