নরম্যান মেইলার

অনেক আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, নরম্যান মেইলারের নাম এবং প্রধান উপন্যাসটি দি নেইকেড অ্যান্ড ডি ডেড পড়েছিলাম। একজন লেখকের প্রথম উপন্যাসটিই যদি পাঠক-সমালোচকের বিচারে একটা সম্মানের আসন পেয়ে যায় এবং এজন্য ওই লেখক দ্রুত খ্যাতিমান হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁকে নিয়ে পাঠকের প্রত্যাশাটা বাড়ে। মেইলারের এ-উপন্যাসটি বেরোয় ১৯৪৮ সালে, তাঁর বয়স যখন মাত্র পঁচিশ। আমি এটি পড়ি তারও কুড়ি-বাইশ বছর পর। ততদিনে তাঁর আরো ছ’টি উপন্যাস এবং ছ’-সাতটি নন-ফিকশন অর্থাৎ মননশীল বই বের হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় উপন্যাস দি নেইকেড অ্যান্ড দি ডেডের ধারেকাছেও যেতে পারেনি, অন্তত সেরকমই সিদ্ধান্ত ছিল সমালোচকদের। সে-কারণে ওই প্রথম উপন্যাসটি পড়ে আমারও উৎসাহ হয়নি বার্বারি শোর (১৯৫১) অথবা দি ডিয়ার পার্ক (১৯৫৫) জোগাড় করে পড়ার। অবশ্য জোগাড় করাটাও খুব সহজ ছিল না – এখনো না (কেননা, প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই ঢাকা শহরে এখনো এমন কোনো বইয়ের দোকান নেই, যেখানে বিপুল একটি সংগ্রহ থেকে নিজের ইচ্ছামতো একটি বই কিনে নিতে পারি – ঘরের কাছে কাঠমান্ডুতে যদিও সেরকম দোকান আছে গোটা তিনেক)। ইউএসআইএস লাইব্রেরিতে মেইলারের বইয়ের কিছু সংগ্রহ ছিল, যেখান থেকে দি নেইকেড উপন্যাসটি পেয়েছিলাম। তাঁর সম্পর্কে যেটুকু সমালোচনা পড়েছি, তাও ওই ইউএসআইএসের লাইব্রেরিতে বসে; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ঢুকতে মেইলারের আরো কিছুদিন লেগেছিল। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে মেইলারের আরো দু-এক লেখা পড়েছি। দি আর্মিজ অফ দি নাইট (১৯৬৮) অথবা তাঁর পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া উপন্যাস দি এক্সিকিউশনারস সংগ (১৯৭৯)। তাঁর লেখা আমাকে কখনো খুব আকর্ষণ করেনি, অবিস্মরণীয় কোনো চরিত্রও তিনি তৈরি করেননি; তাঁর শৈলী, তাঁর ভাষা এমন কিছু অসাধারণ নয় যে, একটা নতুন বই বেরুলেই পড়ে ফেলার কোনো তাগিদ তৈরি হবে। এ-বছর নভেম্বরের ১০ তারিখ তিনি মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম দি নেইকেড অ্যান্ড দি ডেড বইটি আবার পড়ে দেখব অথবা কেন বার্বারি শোর বা দি ডিয়ার পার্ক উপন্যাস হিসেবে অসফল হলো, তার কারণটা অনুসন্ধান করব। কিন্তু উপন্যাসগুলো আমার জানা কারো সংগ্রহে নেই। ইউএসআইএস লাইব্রেরিতে যে একবার যাবো, সে-সম্ভাবনাও নেই। লাইব্রেরিটি এখন এমন এক স্থাপনায়, যেখানে ঢোকা আর পেন্টাগনে ঢোকা একই কথা।

মেইলারকে নিয়ে কিছু একটা লেখা এজন্য নিশ্চয় কঠিন একটা কাজ। তাতে তাঁর লেখক পরিচিতি যেটুকু তুলে ধরা যাবে, তা নিশ্চয় অসম্পূর্ণ অথবা খণ্ডিতই হবে, ভুল না হলেও। তারপরও এই লেখার অবতারণা তিনটি কারণে : এক, মেইলার নিঃসন্দেহে আমেরিকান সাহিত্যের একজন শক্তিশালী লেখক, এবং অন্তত তাঁর প্রথম উপন্যাসটি বিবেচনায় এনেও কতটা তিনি শক্তিশালী, তার একটা খতিয়ান দেওয়া যায়। দুই, শুধু লেখক, নাট্যকার হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখক, পরিচালক, অভিনেতা, সক্রিয় সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনকারী, সাংবাদিক ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একজন সৈনিক হিসেবে তাঁর যে বর্ণাঢ্য জীবন ও প্রভাব ছিল, সংক্ষিপ্ত হলেও তারও একটা মূল্যায়ন করা যায়। এবং তিন, তাঁর মৃত্যুর পর দি নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের ‘দি টক অফ দি টাউন’ বিভাগে যে-সংক্ষিপ্ত অথচ মর্মস্পর্শী লেখা ছাপা হয়, সেটি পড়ে মনে হলো, দোষে-গুণে মিলিয়ে যে নরম্যান মেইলার, তাঁকে জানা থাকলে পাঠকের জন্য তাঁর যে-কোনো লেখা নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করবে। নিউ ইয়র্কারের লেখাটিতে তাঁর সফলতা এবং ব্যর্থতার বর্ণনা রয়েছে। সাধারণত একজন লেখকের মৃত্যুর পর প্রকাশিত লেখালেখিতে তাঁর মূল্যায়নে ইতিবাচক দিকগুলোই বড় করে দেখা হয়। কিন্তু এই লেখাটি ব্যতিক্রমী। মেইলারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও তাঁর অসফলতার বিবরণ দেওয়া হয়েছে বস্তুনিষ্ঠভাবে। কিছু লেখক আছেন, যাঁরা তাঁদের লেখা বইয়ের পাতার বাইরেও সমানভাবে বিচরণ করেন, সমাজেও নানা ক্ষেত্রে, নানা কাজে তাঁদের অংশগ্রহণ থাকে। টেলিভিশন যখন থেকে মানুষের মনোজগতের অনেকটাই দখল করে ফেলল, তখন এর পর্দায় যাঁরা উপস্থিত হতে শুরু করলেন, তাঁদের কেউ কেউ তারকা বলে বিবেচিত হতে থাকলেন। একজন লেখক দীর্ঘদিন লেখালেখির পর যেটুকু পরিচিতি পান, টেলিভিশনের একজন অভিনেতা, এমনকি অনুষ্ঠান-উপস্থাপক, তার থেকে বেশি পরিচিতি পান আরো অনেক কম সময়ে। এবং একজন সফল লেখক যদি সিনেমা বা টিভির পর্দায় নিয়মিত হন, তাহলে পরিচিতির পরিধিটা অনেক বাড়ে। মেইলার এই অর্থে নিজ দেশে ব্যাপক পাঠক ও দর্শক পরিচিতি পেয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশংসা ও নিন্দা জুটেছে তাঁর নানা কর্মকাণ্ডের জন্য। নিন্দার জন্য দায়ী তাঁর উন্নাসিকতা, অপরকে খাটো করার প্রবৃত্তি এবং অসম্ভব আত্মাদর। প্রশংসার কারণ তাঁর লেখালেখি, তাঁর রাজনৈতিক-সামাজিক সক্রিয়তা, যা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যক্তির অবস্থানকে এবং তাঁর অধিকারগুলোকে সংহত করতে সাহায্য করেছে।

মেইলার মারা যাওয়ার পর ইন্টারনেটে তাঁকে নিয়ে লেখা অবিচুয়ারিগুলির কয়েকটি পড়লাম। সুলিখিত সন্দেহ নেই, যেমন নিউ ইয়র্ক টাইমসের শ্রদ্ধাভাষ্যটি। তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই বলা হয়েছে, কিন্তু হয়তো প্রথার কারণে খুব একটা বিতর্কে যায়নি এ-লেখাগুলো। সে-তুলনায় নিউ ইয়র্কারের লেখাটিতে সোজাসাপ্টা অনেক কথা আছে। আমার মনে হয়েছে, অবিচুয়ারি এরকমই হওয়া উচিত। মেইলার ছিলেন একজন পারফর্মার – লুই মেনান্ড লিখেছেন নিউ ইয়র্কারে। পারফর্মার কথাটির বাংলা করা কঠিন : অভিনেতা নয়, কারণ পারফর্মারের কার্যক্ষেত্র অনেক বড়। যে-মানুষ সক্রিয়তা দেখান – এরকমও বলা যায়। কিন্তু তাতেও ওই সক্রিয়তার রূপ বা মাত্রাটি বোঝা যায় না। যিনি নিজেকে নানা কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চান, তিনিও পারফর্মার। অতএব, ইংরেজি শব্দটিই থাক, অনুবাদ-দুরূহ একটি শব্দ হিসেবে। মেনান্ড মেইলারের সক্রিয়তার বিবরণ দেন – টেলিভিশন টক শো থেকে নিয়ে পাবলিক বিতর্ক এবং সংবাদ সম্মেলন। সর্বত্রই নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদ। চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন, অভিনয় করেছেন, মাতাল পার্টি দিয়েছেন, মাতলামো করে পার্টির দফারফা করেছেন। কিন্তু, মেনান্ড বলেন, ‘এটি স্বীকার করা জরুরি যে, তিনি ছিলেন খুব বাজে একজন পারফর্মার। তিনি মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, কিন্তু মানুষকে বিরক্ত করেছেন, দূরে সরিয়ে দিয়েছেন, হতবাক করেছেন, তাদের ঘৃণার উদ্রেক করেছেন।’ এসবই সত্য। কিন্তু সত্যপ্রতিষ্ঠা একজন চরিত্রের পুরোটা তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয়।

লুই মেনান্ড আরো একটি বিষয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। বিষয়টি আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। বিশেষ করে কোনো লেখক বা শিল্পী সম্পর্কে যখন আমরা আমাদের মতামত দিই। মেনান্ডের কথাই বরং শোনা যাক : ‘নরম্যানের নানা প্রকাশকে অনেক পাঠক ন্যক্কারজনক হিসেবে দেখেছেন, তাঁর আত্মম্ভরিতার প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু মেইলার এমন একটি বিষয়কেই শুধু খোলাসা করতে চাইছিলেন, যা আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে আধুনিক সাংবাদিকতা আড়াল করতে পছন্দ করে এবং তা হচ্ছে, একটি বই একজন মানুষ লিখে থাকেন, যে-মানুষের পেশাগত উচ্চাশা, আর্থিক প্রয়োজন, রুচি বা অরুচি আছে এবং এই মানুষ তার গল্পেরই একটি অংশ – তা তিনি সেই গল্পে থাকুন অথবা না থাকুন। ওই মানুষটিকে পছন্দ করা পাঠকদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না, প্রয়োজনীয় ছিল তাঁকে জানা। মেইলার সাংবাদিকতায় প্রথম পুরুষটিকে ঢুকিয়ে দেননি, তিনি তাকে ঘেরাটোপ থেকে বের করে এনেছিলেন।

মেইলার সম্পর্কে তিনটি মূল্যায়ন অথবা মন্তব্য এই উদ্ধৃতি থেকে পাওয়া যায় : তিনি নিজেকে নানাভাবে তুলে ধরতে গিয়ে পাঠকের বিরাগভাজন হয়েছেন অনেক সময়, তিনি তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং সাফল্য-বিফলতা নিয়েও শেষ পর্যন্ত একজন মানুষ, যাঁকে জানাটা পাঠকের জন্য লাভজনক, এবং উত্তম-পুরুষ সাংবাদিকতা তাঁর হাতে কোনো সস্তা জিনিস ছিল না, বরং একটি ভুল প্রচলের গণ্ডি থেকে তাকে বের করে তিনি এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ক্রিয়েটিভ নন-ফিকশনের যে-ধারাটি চালু করেন, যাকে ‘নতুন সাংবাদিকতা’ বলে অভিহিত করা হয়, তার মূলেও ছিল বিষয়ের সঙ্গে ব্যক্তির জড়িত হয়ে পড়া। এসব অবলোকনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই।

নরম্যান মেইলার খুব সহজ মানুষ ছিলেন না। তিনি অন্যকে কাছে টানতেন না, বরং দূরেই সরিয়ে দিতেন; তাঁর অহমিকা ছিল চড়া, এমনকি তাঁর উপন্যাসেও যেসব চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরতেন, সেগুলোর অহমিকা ছিল বিশাল। এই শেষ মন্তব্যটি অবশ্য সমালোচকদের – আমি নিজে যে কটি বই পড়েছি তাঁর, তাতে এমন কারো সাক্ষাৎ পাইনি। তবে তাঁর যে ঘটনাবহুল বাইরের জীবন ছিল – যাকে ‘পাবলিক লাইফ’ বললে এর নানা সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো আরো নির্দিষ্ট হয় – তার বিবরণ তো আমাদের অনেকেরই জানা। এক সময় ১৯৫৫ সালে – নিউ ইয়র্কের গ্রিনিচ ভিলেজ থেকে তিনি এড ফ্যাঞ্চার এবং ভ্যান ওলফের সঙ্গে দি ভিলেজ ভয়েস নামে
শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি-বিষয়ক সাপ্তাহিক কাগজ বের করেন। তাকে অনেকে একটি অভিনব ঘটনা বলে বর্ণনা করেছিলেন। অভিনব কারণ মেইলার সাংবাদিকতায় এতখানি সক্রিয়তা দেখাবেন, তা অনেকে ভাবতে পারেননি। তবে এই বর্ণনার আরো বড় কারণ, অন্য কারো সঙ্গে মিলে একটা প্রকল্পে নেমেছেন মেইলার, এটিও কেউ ভাবতে পারেননি। সবাই ধরে নিয়েছিলেন, কাগজটা স্বল্পজীবী হবে। না, দি ভিলেজ ভয়েস স্বল্পজীবী হয়নি, হয়েছিল ওই তিনজনের অংশীদারিত্ব। এসব কথাও সংবাদপত্রের পাতা থেকে যে কেউ জানতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই অহমিকা, এই দ্বন্দ্বসংকুল জীবন, অন্যকে তাচ্ছিল্য করার মনোভাব, এগুলো যেন মুখ্য হয়ে তাঁর লেখক সত্তাটিকে আড়াল না করে। ভালো যা তিনি লিখেছেন সেগুলো যেন অবহেলা না করা হয় এ-কারণে যে, মিডিয়াতে তাঁকে ছোটখাটো একটা দানব বলে দেখানো হয়েছে অনেক সময়।

বাংলাদেশের দূরত্বে বসে আমেরিকার মিডিয়া জগতের ভালোমন্দের অনেক খবরই রাখা যায় না, প্রয়োজনও হয়তো নেই। নরম্যান মেইলার এজন্য আমাদের হাতে নিরাপদ; আপাতত তাঁর সাহিত্যকীর্তির দিকেই আমরা নজর দিতে পারি। কেউ কেউ বলেন, আমেরিকার পণ্য সংস্কৃতি মিডিয়ামুখী লেখকদের যেমন আকাশে তুলতে পারে, তেমনি নামাতেও পারে। মেইলারের ক্ষেত্রে ১৯৬০-এর দশক ছিল সেরকম একটা সময়। তখনো ক্যাবল টিভি আসেনি, রঙিন টিভিও সীমিত; কিন্তু ছাপানো মাধ্যমের ছিল জয়-জয়কার। টিভি আর পত্রপত্রিকা মিলে তাঁকে অনেক দূর নিয়ে গেল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি মাঠে, তাঁর বানানো ছবিগুলো আর্ট ফিল্ম হিসেবে দেখানো হতো সর্বত্র, একটা পুলিৎজার পুরস্কারও তিনি তখন পেয়ে গেছেন। সব মিলে তাঁর বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। কিন্তু সত্তরের দশক এলো, আর মেইলার হঠাৎ করেই সরে যেতে থাকলেন পাদপ্রদীপের আলো থেকে। তারপর তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি বেশ কটি উপন্যাস লিখেছেন, মননশীল বই লিখেছেন, সেইসঙ্গে তাঁর প্রিয় অন্যান্য কাজও করেছেন, রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন, একজন প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু ষাটের খ্যাতির সঙ্গে তেমন কিছু যোগ করতে পারেননি। তারপরও তাঁর সাহিত্যকৃতি নিয়ে যে লেখালেখি হয়নি, তা নয়। মেইলার মারা যাওয়ার পর দেখা গেল, তাঁকে নিয়ে শ’দুয়েক পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভ লেখা হয়েছে সারা বিশ্বে, গত তিরিশ বছরে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে – শুধু সাহিত্য নয়, সাংবাদিকতা বিষয়েও – তিনি অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

নিশ্চয় প্রসাদগুণ ছিল তাঁর কলমের, না হলে পাঠক-সমালোচকের আকর্ষণ ধরে রাখাটা সম্ভব হতো না তাঁর পক্ষে, এত দীর্ঘকাল।

ঘুরেফিরে সেই নেইকেড অ্যান্ড দি ডেডের কাছেই ফিরে যেতে হয়, তাঁর সাহিত্যকৃতি সম্পর্ক ধারণা পেতে হলে। বইটি তিনি লিখেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে ফিলিপাইনের একটি দ্বীপে তাঁর প্রত্যক্ষ সমরাভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। মেইলার অবশ্য ঠিক যাকে বলে সম্মুখসমরের যোদ্ধা ছিলেন না। তিনি তাঁর সেনাদলের সহায়ক কাজকর্মে নিয়োজিত ছিলেন – টেলিফোন মিস্ত্রি অথবা বাবুর্চি হিসেবে যদিও বন্দুক হাতে একটি অনুসন্ধানী প্লাটুনের সঙ্গে ঘুরেও বেড়িয়েছেন। তাঁর সঙ্গী এক সৈন্য তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শত্রুর চাইতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সঙ্গে বেশি যুদ্ধ করেছেন।’ এই মন্তব্য মেইলারের বদমেজাজী চরিত্রকে তুলে ধরে বটে, কিন্তু তিনি যে সহজে কারো রাগ-বিরক্তি বা ধমকে ভয় পেতেন না, এটি তারও একটা প্রমাণ। সে যাই হোক, ফিলিপাইনের ওই দ্বীপে তাঁর যুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা হয়েছিল এবং উপন্যাসটিতে এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই চমৎকার গল্প তিনি বুনেছিলেন।

এই উপন্যাসের পটভূমি জাপানি সৈন্যদের দ্বারা অধিকৃত ওই দ্বীপ। যেখানে চোদ্দজনের একটি পদাতিক প্লাটুনের অবস্থান। এই প্লাটুনটিকে যারা পাঠিয়েছেন, সেই অফিসারবৃন্দ বেশ আয়েশি জীবন কাটাচ্ছিলেন – খাদ্য বা পানীয়ের তাদের অভাব ছিল না, তাদের থাকার জায়গাও আরামদায়ক। তাদের কাছে সাধারণ সৈনিকরা ছিল অনেকটা দাবার ঘুঁটির মতো। এদের খরচ করতে বাধা নেই, এদের প্রতিবাদেরও কোনো পথ নেই। ওই প্লাটুনটির নেতৃত্বে যে-সার্জেন্ট, তাকে মনে হবে বিবেকহীন, নিষ্ঠুর। কিন্তু যুদ্ধ মানুষকে এভাবেই তৈরি করে, যুদ্ধে একজন সৈনিক মারে অথবা মারা পড়ে। এই সার্জেন্টের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এক তরুণ অফিসার – একজন লেফটেন্যান্ট। কিন্তু সার্জেন্টের কাছে তার ওপর দেওয়া দায়িত্বই বড়। উপন্যাসটিতে মেইলার যুদ্ধের বাস্তবতার পাশাপাশি বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামের একটি মহাকাব্যিক বর্ণনা দিয়েছেন। এই উপন্যাস প্রকাশের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে যে-সংস্করণটি বেরোয় তার ভূমিকায় মেইলার লিখেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই সত্যটি তুলে ধরা যে, সহমর্মিতা তখনই আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে যখন তা হয় কঠোর। মানুষের চরিত্রে ভালো যেমন আছে, মন্দও আছে, কিন্তু সব মিলিয়ে খারাপ থেকে ভালোর পাল্লাটা হয়তো সামান্য ভারী। মেইলারের এই বিশ্বাসটি টলস্টয় থেকে পাওয়া বলে তিনি স্বীকার করেন, এবং লেখেন : ভালোমন্দ যা-ই হোক, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন হচ্ছে মল্লযোদ্ধাদের ভূমির মতো, যা আমাদের আত্মার সমুন্নতির সহায়ক, যেহেতু যারা যুদ্ধ করে টিকে থাকে তাদের থেকে আমরা শক্তি পাই এবং যারা পারে না, তাদের জন্য থাকে আমাদের করুণা এবং শ্রদ্ধা। দি নেইকেড অ্যান্ড দি ডেড পাঠকের মধ্যে এই বিপরীত অনুভূতিগুলো জাগায়। এর বর্ণনা আকর্ষণীয়, এর চরিত্রায়ন বিস্ময়কর। যেন নিজের পূর্ণ শক্তি দিয়েই মেইলার এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন।

মেইলারের অন্য যে-উপন্যাসটি আমি পড়েছি, দি এক্সিকিউশনারস সংগ ছিল সত্যিকার একটি গল্প নিয়ে। এর প্রধান চরিত্র গ্যারি গিলমোর ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি। ১৯৭৭ সালে ইউটাতে গিলমোরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এই উপন্যাসের অর্ধেক গিলমোরকে নিয়ে, তার নিজের কথাগুলোই সে বলে। কিন্তু উপন্যাসের এক বড় অংশ জুড়ে মেইলার গিলমোরের জীবনী, বিশেষ করে তার শেষ দিনগুলো নিয়ে বইয়ের প্রকাশক ও টেলিভিশন প্রযোজকদের দৌড়ঝাঁপকে উপজীব্য করেছেন। একজন মানুষের মৃত্যু কীভাবে ব্যবসায় পরিণত হয়, মেইলার খুব ক্ষমাহীনভাবে তা দেখিয়েছেন। অবশ্য তিনি নিজেও যে গিলমোরকে নিয়ে বই লিখছেন, এবং গিলমোরগাথার পয়সা যে তিনি নিজেও কামাচ্ছেন, এ-সত্যটাও ভুলতে দেন না। তবে উপন্যাসটি অনেকটা সাংবাদিকতার ভাষায় ও শৈলীতে লেখা বলে এতে উপন্যাসের বোধ বা আমেজটি নেই। সে-তুলনায় তাঁর নন-ফিকশন দি আর্মিজ অফ দি নাইট অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরোধী প্রায় দু’লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিল লিংকন স্মৃতিসৌধের নিচে, এবং পেন্টাগন পর্যন্ত মিছিল করে গিয়েছিল। মিছিলটি চলেছিল তিনদিন ধরে। এক শুক্র থেকে রবিবার, এবং প্রতিটি দিন ছিল ঘটনাবহুল। মেইলার যদিও মিছিলের শুরুর দিকেই গ্রেফতার হন – তিনি স্বেচ্ছায় গ্রেফতার বরণ করেন – এবং রোববার ছাড়া পান, পুরো মিছিলের গল্পটিই তাঁর উত্তম পুরুষ বর্ণনা। মিছিলের সামনে থেকে তিনি পুরো মিছিল বা সব ঘটনার মাত্র সামান্যই দেখেছেন। বইটির মাঝামাঝি তিনি জেলের বর্ণনা দেন, যুদ্ধবিরোধীদের আদর্শবাদের পক্ষে অনেক কথা বলেন। এবং বইয়ের শেষে শোনা কথা, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে মিছিলের শেষ পর্যায়ের বর্ণনা দেন। কিন্তু সকল বর্ণনা এমনি অনিবার্যতায় উঠে আসে, এতটা শক্তি নিয়ে যে, পাঠক অনুভব করে, মেইলার হয়তো সারাক্ষণই উপস্থিত ছিলেন ওই মিছিলে।

দি আর্মিজ অফ দি নাইট মেইলারের প্রতিবাদী চরিত্র ও সাহসিকতার একটি প্রামাণ্যচিত্র। তাঁর আদর্শ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে কোনো সন্দেহ কারো থাকে না। তাছাড়া তাঁর আদর্শ যেখানে যুদ্ধ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, একে নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, তাঁরা রক্ষণশীল এস্টাব্লিশমেন্টের মানুষ। এঁরাও শেষ পর্যন্ত মেইলারকে সমীহ করেন তাঁর নিষ্ঠার জন্য।

মেইলার অনেক কাজে নিজের জীবনশক্তি ব্যয় করেছেন। এ নিয়ে তাঁর নিজের কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ ছিল না। কিন্তু তাঁর পাঠকদের মনে হওয়া স্বাভাবিক, জীবনের বিচরণের ক্ষেত্রটি আরেকটু সীমিত করে, উপন্যাসের দিকে মনোযোগ ধরে রাখলে হয়তো দি নেইকেড অ্যান্ড দি ডেড থেকেও ভালো উপন্যাস তিনি লিখতে পারতেন।

কে জানে!

চতুর্থ বর্ষ, দ্বাদশ সংখ্যা, মাঘ ১৪১৪, জানুয়ারি ২০০৮