পটেশ্বরী

লেখক:

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

পঞ্চম কিস্তি

বাবা আর মা কীরকম ছিল আমাদের ছেলেবেলায়, সেটা আমরা নিজেরাও কি খুব বুঝেছি তখন? কী সিমলায়, কী প্যারিসে দিব্যি তো রাজার হালে রাখা হয়েছিল আমাদের, কোত্থেকে টাকার জোগান আসছে বুঝতে সময় লেগেছিল। এ-ব্যাপারে অমরি অনেক সেয়ানা ছিল, বাবা-মার টাকার কষ্টটা বোঝার চেষ্টায় থাকত। ওর অনেক চিঠি পরে পড়ে অবাক হয়ে গেছি। এতসব বেটি বুঝল কখন! যাক সেসব যথাকালে আসবে ওর বা আমার কথায়। এ-রচনা ওর-আমার সংলাপই তো শেষমেশ।

বাবা-মার কথাই হচ্ছিল। যদ্দুর বুঝি, মার ধারণা ছিল রাজবাড়ির ছেলে বাবার টাকার সরবরাহ অফুরান এবং সেটা খুব ভ্রান্তও ছিল না। কিন্তু বিদেশে থাকাকালীন যুদ্ধটুদ্ধ, হেনতেনা নানা কারণে টাকা আসার পরিমাণ আর গতি থেকে থেকেই বিগড়ে যাচ্ছিল। রাতে মার মেজাজ হঠাৎ হঠাৎ তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে যেত। সে-সময়ের নানা ফটোগ্রাফে মার সেই ডিপ্রেশনের চেহারা ও চাহনি ফুটে বেরোয়। টাকার টানাটানি আর টাকা এলে তার খরচের ধরনে আমাদের পরিবারের আজব লাইফস্টাইলের একটা গল্প বাঁধা আছে। আমি বা অমরি সেই কথায় এসে পড়ব কখনো না কখনো অমরির জীবন ও চরিত্র বোঝাতে।

মার ডিপ্রেশনের দরুন সিমলার বাড়িতে একটা চাপা উত্তেজনার পরিবেশ খেলা করত। সে উত্তেজনার বেশ ভালোই প্রভাব পড়েছিল অমরির সে সময়ের জলরং ছবি ও ড্রইংয়ে। একবার একটা ছবি আঁকল জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া একটা মেয়ের। আরেকবার আঁকল একটা মেয়ে বুকের ওপর একটা ছোরা ধরে আত্মহত্যার চিন্তা করছে। জিজ্ঞেস করলাম, ওর মরার চিন্তার কারণ কী?

অমরি অবলীলায় ব্যাখ্যা করল, ওটা তো আমি। মরার কারণ তো চারপাশে ঘুরছে।

ওকে আর বেশি বলতে হয়নি, বাকিটা আমি বুঝে গিয়েছিলাম।

মা এই সময় খারাপ মেজাজে থাকলে মরার চিন্তা করত। একদিন ঘরে ঢুকে মার ওই মুড দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আবার কী হলো মুচিকা?

মা একটা স্কেচ আমার দিকে ছুড়ে দিলো, অমরির আঁকা। দেখা যাচ্ছে একটা শায়িত পুরুষের বুকের ওপর চড়ে বসেছে এক নারী আগুনে রাগ নিয়ে। পারলে বুকে ছুরিই বসিয়ে দেয়। চমৎকার আঁকা, সন্দেহ নেই।

বললাম, বাহ্, বেশ দারুণ তো।

মা বলল, তাই ভাবছিস?

– কেন বলছ?

– ওটা যে তোমার বাবা আর আমাকে নিয়ে সেটা বুঝতে পারছ!

– দেখি, ভাবি।

মা ওঁর পাশে সোফার ওপর রাখা একটা রুপোলি হাতার ছুরি তুলে নিয়ে নিজের বুকে ঠেকিয়ে বলল, তোমার বাবার নয়, এটা এই বুকে ঢুকবে। তবেই শান্তি।

আমি ঘরের শান্তি বজায় রাখতে চুপ করে রইলাম। একটু বাদে অমরি এসে মার সোফার পাশে দাঁড়ানো সাইড টেবিল থেকে ছবিটা তুলে মার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। মা দিব্যি হেসে বলল, চমৎকার হয়েছে তোমার ছবি। বলতে বাধ্য হচ্ছি।

বলা বাহুল্য, ‘বলতে বাধ্য হচ্ছি’র মানে বুঝতে অমরির অসুবিধে হয়নি। কিন্তু আঁকাটা যে ওর পছন্দ সেটাতেই ও খুশি রইল। পরিবেশের চেহারা ও ভাব নিয়ে করা ছবির বিষয় যে মার চোখ এড়িয়ে যাবে না, তা ও ভালোই বুঝেছিল, ও আর কথা বাড়াল না।

আমাদের সিমলার বাড়ির এই আবহাওয়ার একটা ছবি আছে অমৃতার এক প্রেমিক, ইংরেজ সাংবাদিক ম্যালকম মাগারিজের ডায়েরির পাতায়। তবে সেটা অনেক দিন পরের কথা। জুন, ১৯৩৫। আমরা ততদিনে সিমলা ছেড়ে ছবছর প্যারিসে কাটিয়ে ফিরেও এসেছি বছরখানেক হলো। এরই মধ্যে ম্যালকম মাগারিজ কলকাতার বিখ্যাত কাগজের সিমলা অফিসে কাজে যোগ দিলো। টিপিক্যাল ইংরেজ; প্রবল সেন্স অফ হিউমার এবং প্রবল সিনিক। বেড়ে ইংরেজি গদ্য লিখিয়ে বলে নাম, চট করে প্রশংসা আসে না ঠোঁটে। হিলহিলে, বেশ সুপুরুষ। ম্যালকম আর অমরি যে দ্যাখ না দ্যাখ ঢলাঢলি শুরু করবে সেটা অবধারিতই ছিল। সে কাহিনি অমরিই না হয় বলবে, আমি ম্যালকমের ডায়েরির পাতাটা শোনাই। ও লিখেছে …

অমৃতার মাকে অপছন্দ করার মতো কিছু ছিল না, তবে অত্যন্ত ভালগার এক হাঙ্গেরীয় ইহুদি তো। আর বাবাটির তো একরাশ এলোমেলো দাড়ি, টলস্টয়ের মতো একজোড়া চোখ, এক বামনভূতের মতো চেহারা। … ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার যত যা কথাবার্তা হতো সব নানান চিন্তাভাবনা, আইডিয়া নিয়ে। থেকে থেকেই শের-গিল ফেটে পড়তেন একটা না একটা একগুঁয়ে বক্তব্য নিয়ে।

একবার সামনে রাখা চা, নানা চকোলেট ও কেক দেখিয়ে বলতে লাগলেন, এর মধ্যে কোনোটাই আমার খাওয়ার যোগ্য না। রীতিমতো খিঁচিয়ে বললেন কথাগুলো। প্রতি রাত উনি একটা ছোট্ট ছাদে কাটান দুরবিনে তারা দেখে দেখে। অন্য একটি যন্ত্র দিয়ে তিনি তারাদের গতিবিধি দেখে নিজের ঘড়ি মেলান। প্রায়ই ওঁকে ছাদে পেতাম, দাড়ি উড়ছে বাতাসে, চোখ জ্বলছে উত্তেজনায়, বেশ আকর্ষক মূর্তি।

ম্যালকমের এই বর্ণনা থেকে আমাদের সংসারে টেনশনের চোরা স্রোতটা আঁচ করা যায় না কি?

বাবা-মার সম্পর্কে যে-চিড় ধরেছে তা অমরির স্কেচেই ফুটত। বাবার লক্ষ্য ছিল একটা সরল, স্বাভাবিক জীবনধারা, যেটা পাকেচক্রে আমাদের পরিবার পেয়ে গিয়েছিল দুনাহারাস্তিতে। সিমলায় জীবনটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কেক, পেস্ট্রি আর সান্ধ্য সমাবেশ, হইচই, দেখনদারির। বাবা-মার জীবন ও চরিত্রের সমস্ত অসামঞ্জস্যগুলো দৈনিক সমস্যা হওয়ার জোগাড় হচ্ছিল। অমরি আর আমি পদে পদে তার শিকার। আমি পিয়ানো আর নাচে ভোলার চেষ্টায় থাকতাম, অমরি হয়তো শোপ্যাঁর রাতনামানো ‘নকতর্ন’ কী চাইকভস্কির ‘সেরেনাদ মেলানকলিক’-এ এবং নিজের ছবি আঁকায়। যেসব ছবিও পরিবারের গল্প শোনাত।

এবার সিমলার সেই প্রথম দিনগুলোয় ফিরব, যখন কনভেন্ট স্কুলে অন্য এক ঝামেলায় পড়েছে অমরি। আগেই বলেছি স্কুলের প্রার্থনাসভার আবশ্যিক হাজিরায় ঘোর আপত্তি ছিল অমরির। সেটা দিনে দিনে এমন জায়গায় পৌঁছালো যে-অমরি স্কুলে বসে এই আচারসর্বস্বতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদপত্র লিখল বাবা আর মাকে। যেটা তাঁদের হাতে আসার আগেই পড়ল কনভেন্টের মাদার সুপিরিয়ের হাতে। প্রায় তৎক্ষণাৎই অমরিকে বিতাড়িত করা হলো, যার অধীর অপেক্ষাতেই যেন ও ছিল অ্যাদ্দিন। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, কীরে, স্কুলটা গেল তো? ও উত্তর করল, হ্যাঁ। আর জীবনটা ফিরে পেলাম।

সেদিন সন্ধ্যায় বাগানে বসে ও বলল, দ্যাখ ইন্দু, এই জোর করে কোনো নিয়ম ফাঁদলে না আমার সেটার ওপর ভক্তি চটকে যায়।

আমাকে বলতেই হলো, কিন্তু একটা শৃঙ্খলা ছাড়া কি জীবন চলে?

ও বলল, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা তোমাকে নিজেকে আবিষ্কার করতে হবে। কত মেয়েই তো দেখি কী বেসুরোভাবে ‘মাস’-এ গলা মেলায়, তাতে গানের কী উপকার ঘটে? একটা কী জানিস তো, সব প্রার্থনাই শেষমেশ একটা নিঃসঙ্গ প্রার্থনা। একটা নিঃসঙ্গ রেখার মতো, যা আরো অজস্র সরল, বক্র, নিঃসঙ্গ রেখার সঙ্গে মিশে একটা ছবি তৈরি করে।

বললাম, রেখার সঙ্গে রেখার মিলনেরও তো শৃঙ্খলা আছে। তাও তো শেখার। ও বলল, রেখার সঙ্গে রেখার মিলনের শৃঙ্খলাও তোমায় নিজেকে আবিষ্কার করে নিতে হবে, তার পরেই তো শেখা। এরভিন মামা যখন এসেছিল সিমলায় তখন ওঁর কাছেই ছবির বিষয়ে সত্যিই কিছু শিখতে পারলাম, যা স্কুলে কখনো শুনিনি। সমানে বলত মামা, চারপাশে যা দেখছিস এটাই কিন্তু তোর শিল্পের বাস্তব। এই চেহারা, চরিত্র, পরিমন্ডলকে ছবিতে রূপান্তর করো। আর যা করবি নিজের দৃষ্টিকোণ, নিজের স্বাধীনতায় করবি, তবেই সেটা নিজের ছবি হবে।

বললাম, জানি। তার পরেই তো তুই এখানকার গরিবগুর্বো, কাজের লোকদের ধরে ছবি আঁকা শুরু করলি।

– ঠিক। আর তাতে একটা নতুন ব্যাপারও ঢুকে পড়তে দেখলাম কাজে। আমার মডেলদের দৈন্যদশা, আচার-ব্যবহার, সুখ-দুঃখ ভর করছে ছবিতে। এরভিন মামা যেমন বলত, তুই যখন এদের কোনো একজনকে আঁকিস তার সমাজকেও আঁকিস। সব ছবিই জানবি একটা সমাজ খোঁজে। আমাদের হাঙ্গেরির নাগিবানিয়া শিল্পধারার খোলা-হাওয়া ছবিতেও এটা লক্ষ্য করেছি।

– তাতে কাজে দিলো?

– নিশ্চয়ই! এখন অবধি যেটুকু-যা স্কিল রপ্ত করতে পেরেছি তাতে ওঁরই অবদান।

– তাহলে একটা কি জানিস?

– কী?

– এরভিন মামা সমানে বলে যাচ্ছে দুচি আর মুচিকোকে তোকে প্যারিসে পাঠাতে।

– সত্যি!

– না হলে আমি কি বানাচ্ছি?

– শুধু আমি একাই যাব? তোরা যাবি না?

– বাবার কিন্তু বেশ আপত্তি। বলছিল, ভারতের মেয়েকে ভারতেই গড়ে উঠতে হবে। ফরাসি স্টাইল শিখে ও কী করবে? ভারতীয় চোখ, ভারতের তুলিকালিই শেষ কথা।

– তাতে মামা কী বলল?

– বলল শিক্ষার কোনো দেশকাল নেই। যে-শৃঙ্খলার কথা তুই বলছিলি মামাও সেটা বলল। প্যারিসে ও নিজেকে আবিষ্কার করুক।

এরপর অমরি ক্লোদ দেবুসির ‘ক্লের দ্য লুন’ থেকে একটা সুর গুনগুন করতে লাগল।

এর কিছুদিন পর বাবা-মা, অমরি ও আমি বেশ কবছরের জন্য প্যারিসের বাসিন্দা হলাম। সবটাই হলো অমরিকে আর্ট শেখানোর আবেগ থেকে। শুধু কন্যাকে শিল্পী করার জন্য একটা গোটা পরিবার বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে, এটা তখন ভারতে বসে কল্পনাতেও আনা সম্ভব ছিল না। যেটা পাঁচ বছরের জন্য শের-গিলরা করে ফেলল। পাঁচ বছর সিমলায় কাটিয়ে ফের এক দীর্ঘ বিদেশবাস।

প্রথমে গররাজি বাবা শেষে রাজি হলো, পরে এই খেদের কথা লিখেও ছিল …

যদিও গিন্নির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষায় সায় দিলাম তবু আমার তীব্র অনীহা ছিল আরো একবার চটিবাটি গুটিয়ে ইউরোপ ছোটার ব্যাপারে। আমার ঢের খোঁয়ার গেছে বিশ্বযুদ্ধের সময় আট বছর ধরে হাঙ্গেরিতে আটকে পড়ে। প্রচুর শিখেছি সে যাত্রায় ঠিকই, কিন্তু তার আর পুনরাবৃত্তির বাসনা ছিল না। ফলে এক অতীব ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমার প্রিয় বইগুলোকে গোছালাম প্যারিস প্রবাসের জন্য। যে-প্রবাস পাঁচ বছরে গিয়ে ঠেকল। ভাইকে, পুরনো বন্ধুবান্ধবদের বিদায় জানিয়ে একদিন রওনা হলাম। …

এই প্যারিস যাত্রাটাই, দিনে দিনে খেয়াল করেছি, অমরির জীবনে এক নতুন মোড়। সে-কথা ও-ই ভালো বলবে। প্যারিসে গিয়ে তো অচিরে ফরাসিনীই হয়ে গেল অমৃতা শের-গিল। আমি ছায়ার মতো গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছি, দেখছি আর দেখছি।

বছরটা ১৯২৯ …

পাঁচ

আমি ষোড়শী! মধুরা ষোড়শী!! এবং প্যারিসে!!!

আমার বোধহয় দ্বিতীয় জন্ম হচ্ছে। ছিলাম তো মোটে কটা দিন এর আগের বার, তবু কেন মনে হয় একটা জীবনকালই কাটিয়ে গিয়েছি এখানে? একেকবার একেকটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে ভাবি, এটা কবে হলো?

কেন আবার প্যারিসের কোথাও কোথাও দাঁড়ালে মনে হয়, এত রহস্য কেন এ-শহরের? কেন এত অচেনা? এত নতুন?

বিকেলের নরম, পড়ন্ত বোদটা আমাকে তাজ্জব করে। একদিন ঘঁদ শো মিয়ের থেকে ফেরার সময় অ্যাঁভালিদে গিয়েছিলাম, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে শহরের একটা ম্যাপ দেখছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আর্ট পেপারের ম্যাপটার ওপর একটা সোনালি আলো ঝলমল করছে।

ভাবলাম কোত্থেকে এলো এ-রং এবং চমকে ওপরে চাইলাম। এবং তখনই চোখে এলো ওই আলো। ভারতের শরৎরোদের মতো এক স্বর্ণচ্ছটা, নির্মেঘ নীলাকাশ থেকে অপেরামঞ্চের আলোকসম্পাতের মতো এসে ভাসিয়ে তুলছে অ্যাঁভালিদের গোটা তললাট এবং সামনের বিস্তীর্ণ চক। সে-চকে যত সুবেশ নারীপুরুষ ও গাড়ির চলাচল সবই যেন জলছবি, আলোর পটে ভেসে চলেছে। কেমন একটা আনন্দে আচ্ছন্ন মেদুরতা এই দৃশ্যে এবং আলোয় যে-মুহূর্তে আমার মন চলে গেল সদ্য শুরু-করা একটা উপন্যাসে বর্ণিত ছবিতে। মার্সেল প্রুস্তের ‘রিমেমব্রেন্সেজ অফ টাইমজ পাস্ট’। হায়, এভাবে যদি ছবিতেও মনে করা যেত অতীত মুহূর্ত।

প্রুস্তের উপন্যাসের কথক চায়ে মাদলেন চুবিয়ে চুমুক দিয়ে সেই স্বাদ ও আমেজে চলে গেল দূর-দূরান্তের এক গ্রামের সকালে। আমি সদ্য পড়া সেই অপরূপ গদ্যের ছবি থেকে চলে গেলাম আমাদের সিমলার বাড়ির সকালে। না চেয়ে পাওয়া এক স্মৃতি।

দেখছি মা কাজ করাচ্ছে বাগানের মালিদের দিয়ে। দেখছি বাবা ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধরে রাখছে। আর আমি গাছপালা, ফুল দেখব কী? আমি দেখছি শুধু আলো। এক অদ্ভুত খেয়ালি রোদ মিঠে তেজে ভাসিয়ে রেখেছে গোটা পাহাড়, একটু পরেই হয়তো ঢেকে যাবে আলোকমেঘের আড়ালে। ওই আলোতে আমাদের বাড়িটা একটা চমৎকার ছবির মতো বসে। জলরঙে আঁকা।

আপাতত প্যারিসের তরল সোনালি রোদ আমাকে নতুন করে প্রেমে পড়াচ্ছে শহরটার। আলো কী করে জলের মতো হাওয়ায় ভাসে, ছড়িয়ে থাকা দৃশ্য থেকে ঝরে তা চাক্ষুস করতে প্যারিসের এই শরৎ-হেমন্তের জন্য আমায় অপেক্ষায় থাকতেই হতো। কিন্তু সেই আবিষ্কার যে এত আকস্মিক, এত আকর্ষক হবে তা কয়েক মুহূর্ত আমার ধারণায় ছিল না।

আমার সব গভীর অনুভূতিই বোধহয় আকস্মিক। প্রথা থেকে সরে যাওয়াই আমার শিল্পের রীতি, জীবনেরও। সেদিন যখন পরের পর স্কেচ করে যাচ্ছিলাম ন্যুড মডেলের প্রফেসর পিয়ের ভেইয়ঁ এসে বললেন, আমার মনে হয় ওই ছাত্রটির মতো আঁকলে পারতে।

আমি উঠে সেই ছেলেটির কাজ দেখে এলাম। দেখলাম সে যা দেখছে তা-ই খুব নিখুঁত এবং অবিকল আঁকছে। আমার মন তাতে সায় দিলো না। আমার চেষ্টা ছিল ছবির মধ্যে রঙের একটা নতুন গঠন আনা, আর প্রকৃতির সরল, সবল অনুকরণ থেকে সরে থাকা।

আমি আমার মতোই স্কেচ করে গেলাম আমার নগ্নিকা। স্যার বুঝলেন ওঁর চাওয়া আর আমার চাওয়া এক নয়।

আমার চাওয়াটা কী? সেটা কায়েম করতে সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে আয়নার সামনে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে বসলাম। ষোড়শীর নগ্নতার জৌলুস ধরার জন্য ড্রেসিং টেবলের পাশের হল-ল্যাম্পটা নানা ধারে, নানা কোণে বসিয়ে আমার শরীরের নানা অঙ্গ, বিভিন্ন প্রত্যঙ্গকে বিবিধ আলোর সম্পাতে বাঁধলাম। দেখছি আমার চোখ, ঠোঁট, স্তন, নাভি, যৌনাঙ্গ তাদের নিজের নিজের আলো, রং ও ভাষা খুঁজে নিচ্ছে। শরীরের যেখানে যখন আলো পড়ছে না সেখানে এক রঙিন ছায়া। আর তীব্র আলো যখন চোখ, ঠোঁট, স্তন ও যৌনাঙ্গে তখন সে অংশ যেন খোলা রোদের নিচে নির্মমভাবে স্পষ্ট।

কদিন বাদে আমার আরো কিছু নগ্নিকা দেখে প্রফেসর ভেইয়ঁ বলে ফেললেন, বেশ। তোমার ন্যুডদের তুমি নিজের করে নাও।

বললাম, তাহলে ফ্রসোয়াকে কী বলবেন? ওঁর নিখুঁত নগ্নিকারা তো আপনার খুব পছন্দ।

স্যার মশকরা করে বললেন, যাও, ওদের একটাকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও।

সামলে নিলাম যেটা বলতে যাচ্ছিলাম। কারণ সেটা খারাপ শোনাত। কারণ বলার ছিল যে সেই ছেলেটি – ফ্রসোয়া – ওর ন্যুড স্টাডিগুলো শেষ করে আমায় বলেছিল, খুব ইচ্ছে করে তোমার মতো কাউকে যদি আঁকতে পারতাম।

জিজ্ঞেস করলাম, কারণ?

বলল, কারণ যে-প্রাচ্যরহস্য তুমি বয়ে বেড়াও শরীরে, ব্যক্তিত্বে।

বললাম, এই রহস্য ধরতে হলে শুধু নিখুঁত আর অবিকল করলে চলবে না।

ও তখন খুব কেরামতি করে বলল, আগে তো দেখি।

সেদিন স্টুডিয়ো থেকে সবাই চলে যেতে আমরা দুজন থেকে গেলাম। ঘরটার অধিকাংশ আলো নিভিয়ে দিয়ে একটা সম্পূর্ণ সাদা, কুমারী ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমি একটা, একটা করে পরিধানের বস্ত্রগুলো পরিত্যাগ করে নিছক, বিশুদ্ধ আমি হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর দাঁড়িয়ে দেখি ফ্রঁসোয়া এক স্তম্ভিত মডেল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এভাবে কতক্ষণ ও চিত্রাপিত হয়ে আমায় দেখে গেল মনে নেই। শেষে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলল, না, তুমিই ঠিক। এ রহস্যের কিনারা করতে গেলে আমায় রং আর আলো নিয়ে পাগলামি করে যেতে হবে।

বললাম, পাগলামির আরো কত রংরূপ আছে আবিষ্কারের অপেক্ষায়।

আমরা এরপর কী অজস্র পাগলামি করলাম নিজেদের শরীর নিয়ে ঘ্রাঁদ শোমিয়েরের নির্জন, আলো-আঁধারি স্টুডিয়োতে। আর ফ্রঁসোয়া সমানে বলে চলল, রূপকে ধরা যায়, রূপের রহস্যকে নয়। এই শিক্ষাটা আজ পাচ্ছি অমৃতা।

গভীর সন্ধ্যায় যখন একটা মধ্যরাত্রি নীল সারা আকাশ ছড়িয়ে ফ্রঁসোয়া আমাকে ছাড়তে এলো পাসি পল্লিতে আমাদের ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটবাড়ির নিচের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিদায়ী চুম্বন দিয়ে বলল, শুভরাত্রি। কাল দেখা হচ্ছে।

বললাম, না।

ও চমকে গিয়ে বলল, না? কী দোষ করলাম?

বললাম, কাল থেকে আর স্টুডিওয় যাচ্ছি না।

– কেন?

একোল দে রোজার-এ যাচ্ছি এখন থেকে।

– ফের কী করে দেখা হবে?

– মন থেকে এঁকে ফেলো আমাকে, আর দেখো। তুমি তো নিখুঁত, অবিকল আঁকতে পারো।

– আর তোমার রহস্য?

আমি খিলখিল করে রাতের আকাশকে একটা হাসি ছুড়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে চলে গেলাম। (চলবে)