পোড়ামাটির পুনর্নির্মাণ

লেখক:

Alam Khorshed pic-4-17-5-15

আলম খোরশেদ

দুটি ভিন্নধর্মী শিল্পমাধ্যম নন্দনতত্ত্বের সব শর্ত পূরণ করেও যে একই চিত্রপটে অনায়াসে পরস্পর অভিন্ন-হৃদয় সহচর হয়ে উঠতে পারে তা দেখার অনন্য অভিজ্ঞতা হলো সম্প্রতি ‘বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্সে’ অনুষ্ঠিত তরুণ ও মেধাবী শিল্পী শারদ দাশের ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ শীর্ষক প্রদর্শনীটিতে। এটি ছিল শিল্পীর তৃতীয় একক  চিত্র-প্রদর্শনী। এর আগে ২০১২ সালে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় অধুনালুপ্ত ঢাকা আর্ট সেন্টারের উদ্যোগে।

পেইন্টিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের পেইন্টিং বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে পেইন্টিংকে শিক্ষকতার বিষয় হিসেবে বেছে নিলেও দৃশ্যশিল্পে নিজের শিল্পীসত্তা প্রকাশের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে তিনি পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি ড্রইং, প্রিন্ট, স্থাপনা শিল্প, ভিডিও আর্ট ইত্যাদি মাধ্যমের রূপবৈচিত্র্য ও অন্তর্নিহিত শক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি শিল্পমাধ্যমকে বিষয়ের অনুগামী করতে ভালোবাসেন। তাই তাঁর বিষয়ভাবনা চিত্রভাষার সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে মিলে যায়। অন্তত আলোচ্য প্রদর্শনীতে তা যথার্থভাবেই দৃশ্যমান। তাঁর অাঁকা ছবিগুলোতে বর্ণচ্ছটা নেই, কিন্তু রূপমাধুর্যেরও কমতি নেই। সংযম ও মাধুর্যের হাত ধরাধরি করে সার্থক শিল্পের পথে চলা তাঁর সত্যিই প্রশংসনীয়। নন্দনতত্ত্বের শর্ত পূরণ করে বিষয়কে হৃদয়গ্রাহী করে তোলার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি ষোলো আনা। শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় তাঁর একটি রচনায় বলেছিলেন, ‘ভাবের জগতে প্রবেশ করা যেমন কঠিন, ভাবের সঙ্গে ভাষাকে যুক্ত করার কৌশল খুঁজে পাওয়াও কঠিন।’ শিল্পী শারদ দাশ সেই কঠিন কাজটিই বেশ সহজ ও সাবলীলভাবে সম্পন্ন করেছেন প্রদর্শনীভুক্ত তাঁর এসব চিত্তাকর্ষক শিল্পকর্মসমূহে।

‘সব চরিত্র কাল্পনিকে’ অধিকাংশ শিল্পকর্ম মিশ্রমাধ্যমে অর্থাৎ ড্রইং ও পোড়ামাটির ভাস্কর্যের মেলবন্ধনে রচিত। দ্বিমাত্রিক পরিসরে ত্রিমাত্রিক মাধ্যমের শৈল্পিক সুষমা ফুটিয়ে তোলার কাজে তিনি ঈর্ষণীয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। বোর্ডের ওপর কালির ড্রইংয়ের শৈল্পিক পরিস্ফুটন ছবিগুলোর মূল ভিত্তি। মানব-অবয়ব গঠনে কালির লাইন ড্রইং ও কখনো সলিড কালি ব্যবহারের মুন্শিয়ানা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। অন্যদিকে টেরাকোটায় তৈরি চরিত্রগুলোর মস্তক বা মুখমন্ডলকে অধিকাংশ ছবিতে ফ্রেমের বাইরে স্থাপন করার কৌশলটিও চমকপ্রদ। তাঁর উদ্ভাবিত এই মিশ্রমাধ্যমটি শিল্পীর নির্বাচিত বিষয়কে যথার্থভাবেই উপস্থাপন করে। এতে ছবি কিন্তু দৃশ্যগতভাবে দৃষ্টিনন্দন হওয়ার মহিমা থেকে বিচ্যুত হয়নি। টেরাকোটা প্রাচীন মাধ্যম হলেও শিল্পীর সৃজনশীলতার প্রয়োগ-নৈপুণ্যে তা বর্তমানের অর্থব্যঞ্জনা পায়। বর্তমান প্রদর্শনীটি দেখে অনুমান করা যায়, শিল্পী শারদ দাশ টেরাকোটা তথা পোড়ামাটির বৈশিষ্ট্য ও ব্যাকরণ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করেছেন, যা তাঁকে পোড়ামাটির পুনর্নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে এবং তিনি তাতে প্রশ্নাতীত সাফল্যও অর্জন করেন।

শিল্পী শারদ দাশ জগৎ ও জীবনকে যেভাবে দেখেন তাতে আছে গভীর সমাজসংলগ্নতা। আর এতে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সচেতনতা। মানুষের অন্তর্জগৎ বিশ্লেষণে তাঁর কল্পনাশক্তির প্রয়োগ চরিত্রগুলোকে তীক্ষ্ণতা দিয়েছে। কখনো কখনো ফ্যান্টাসি ও পরাবাস্তবতার আলোছায়াও দৃষ্টিতে অনুভূত হয়। সমসাময়িক কালে স্বদেশে ও বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া মানবিক বিপর্যয়মূলক বিভিন্ন ঘটনা যখন শারদের চৈতন্যে মৃত্যু ও ধ্বংসের নানা রূপকল্প বয়ে আনে তখন তিনি বস্ত্তজগতের বাহ্যিক বর্ণিলতা অতিক্রম করে অভ্যন্তরের সত্যের অন্বেষী হয়ে ওঠেন। তাঁর সময়ের স্বরূপ উদ্ঘাটন এবং বিপন্ন মানবতার অসহায়ত্ব প্রকাশের যথাযথ চিত্রভাষা তিনি খুঁজে নেন তাঁর নিজস্ব নিরীক্ষাসমূহ থেকে।

‘Important Conversation’ শিল্পকর্মটিতে পোড়ামাটির মুখভঙ্গির উপস্থাপনায় ড্রইংয়ের ভাষার সঙ্গে মেলানোর কাজটিতে এমন নৈপুণ্যের ছাপ রেখেছেন যে, চরিত্রগুলো প্রকৃত রূপে মূর্ত হয়ে ওঠে। চতুষ্কোণ স্পেসের যথার্থ বিভাজন তাঁর চিত্রবর্ণনাকে বুদ্ধিদীপ্ত করেছে। চারটি পৃথক স্পেসে কালির ব্যবহার টেবিলের চার অংশকে পরিস্ফুট করে। পোড়ামাটিতে রচিত মুখমন্ডলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যঙ্গরসাত্মক অভিব্যক্তিতে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক আবহ টের পাওয়া যায়। শিল্পীর রাজনৈতিক সচেতনতা ছবির ফিগারগুলোর অবয়ব প্রকাশে অন্তর্ভেদী গভীরতা যুক্ত করে।

এবার বলা যাক ‘Witness of a Fall’ ছবিটির কথা। কৌতূহলের সঙ্গে আমরা লক্ষ করি, শিল্পী এখানে একটি ছবিকে দুটি ফ্রেমে বিন্যস্ত করেছেন।  একটি ফ্রেমে বাস্তবানুগ দেহভঙ্গিতে মূর্ত হয়ে আছে একজনের পতনদৃশ্য। অপর ফ্রেমে অরেকটি চরিত্র ওপর থেকে সেই পতনের দৃশ্য গভীরভাবে অবলোকন করছে। দুটি ফ্রেমে বিবৃত বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ছবিটিকে বিশেষ ব্যঞ্জনাময় করে তোলে। এখানেও দ্বিমাত্রিক জমিতে ত্রিমাত্রিকতার প্রয়োগ নতুন এক শিল্পভাষা ও মাত্রা অর্জন করে।

একটি ছবি, দুটি ফ্রেম – এই প্রকরণের আরেকটি শিল্পকর্ম ‘Worship’-এর বিষয়ভাবনা ও উপস্থাপনাশৈলী দর্শকের মনে নানাবিধ ভাবনা ও বোধের জন্ম দিতে সমর্থ হয়। টেরাকোটায় রচিত মানুষের ভক্তিভাবপূর্ণ নিবেদনের ভঙ্গিমা একদিকে যেমন প্রার্থনার বিনম্র সৌন্দর্য নির্মাণ করে, অন্যদিকে রেখার ব্যঙ্গাত্মক বিন্যাসের কারণে এক ভিন্নতর অর্থেরও ইঙ্গিত দেয়। আল্পনার অলংকরণের মাধ্যমে দুটি পাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দৃশ্যমান করা হলে মানুষের সমগ্রতাকে ক্ষুণ্ণ করা হয়। এভাবে স্রষ্টার প্রতি মানুষের আধ্যাত্মিক আনুগত্যের সীমানা ছাড়িয়ে ক্ষমতাধরদের প্রতি আমাদের বশ্যতারও আভাস মেলে দুটি ফ্রেমে বিবৃত এই আকর্ষণীয় চিত্রপটে।

‘Made for Each Other : 1’ শীর্ষক ছবি দুটো ভাস্কর্য ও ড্রইংয়ের সম্মিলিত কৃৎকৌশল দক্ষতার আরো এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ছবিটির সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক হলো, দুজন মানুষের দুটো হাত তাদের দুটো হাঁটুর ওপর পোড়ামাটিতে পরস্পর নিবিড়ভাবে আবদ্ধ হয়ে আছে। ড্রইংয়ে অাঁকা হাতের বাকি অংশ দৃশ্যটিকে আরো নান্দনিকতা দেয়। ‘Made for Each Other : 2’ নামের আরেকটি ছবিতে বিষয়ের ভিন্ন রূপকল্প চোখে পড়ে।  চিত্রকর্মটির এরকম শিরোনামে দর্শকমনে প্রণয়-ভালোবাসার অনুভূতি জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই ছবিটি যেন অন্য এক বৈপরীত্যের নির্দেশক। দুটি ফিগারের মাঝখানে একটি ছুরির ব্যবহার দর্শককে প্রণয়ভাবনা থেকে তাৎক্ষণিক সরিয়ে দেয়। ঈষৎ গভীরভাবে দেখলে বিষয়টির আরেকটি মাত্রাও স্পষ্ট হয়। জীবনের আপাত সত্য ও প্রকৃত সত্য সবসময় একই সমান্তরালে চলে না। পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েও কোথাও একটা বিভ্রম ও বিরোধ বুঝি থেকেই যায় এবং তা নিয়েই জগৎসংসারে মানুষকে পথ চলতে হয়।

বক্তব্যের ঋজুতায় ও দৈহিক ভাষাভঙ্গি নির্মাণের দিক থেকে আরেকটি ছবি শিল্পরসিকদের এক অনন্য নান্দনিক অভিজ্ঞতা দেয়। ছবিটির শিরোনাম ‘Three Idiots’। চরিত্রগুলোর মুখমন্ডলের গড়নের ক্ষেত্রে পোড়ামাটির ট্রিটমেন্ট অত্যন্ত চমৎকার ও ব্যঙ্গরস-সঞ্চারী। দেহের মজবুত ফিগার ড্রইং ও বিশেষ অভিব্যক্তিসমৃদ্ধ টেরাকোটার মুখ – এই দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এক পরাবাস্তব অভিঘাত। তিনটি দীর্ঘ ফিগারের মুখমন্ডল ছবির ফ্রেমের কোণে মুখোমুখি স্থাপন করায় ছবিতে নাটকীয়তার মেজাজ অনুভূত হয়।

‘Dream of a Leader’ পরিমিত রেখাচিত্রে শিল্পীর কৃৎকৌশলগত দক্ষতার পরিচায়ক। পোড়ামাটির তৈরি করপুটে স্থাপিত বক্তৃতারত একজন নেতার বলিষ্ঠ দেহভঙ্গি তার চরিত্রের মৌলিক পরিচয় প্রকাশ করে। আর সেই নেতার হৃদপিন্ডের জায়গায় শিল্পী যখন তাঁর শ্রবণেন্দ্রিয়কে স্থাপন করেন তখন ছবিটি উপরিতলের অর্থকে অতিক্রম করে এক ভিন্নতর বোধের জন্ম দেয় দর্শকমনে।

প্রদর্শনীর আরো একটি ছবি বেশ কৌতুকজাগানিয়া – ‘Showing Muscles’। বর্তমানের এই মেধাশূন্যতার সময়ে আমাদের সমাজ-মানসে পেশিশক্তির বড় কদর-সমাদর লক্ষযোগ্য। এই ছবিতে দুটো দন্ডায়মান ফিগার পরস্পরকে তাদের গর্বিত বাহুবল প্রদর্শন করে। কিন্তু দুজনই তাঁদের নিজস্ব বলয়ে আপন ক্ষমতার মোহে আবর্তিত। কেউ কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। পোড়ামাটি ও রেখার ছন্দোময় চলনে যে-শ্লেষ আছে তাতে পেশিশক্তিসর্বস্ব সমাজের অন্তঃসারশূন্যতা প্রকট হয়ে ওঠে।

‘Falling’ শিরোনামে প্রদর্শনীর আরেকটি ছবিতে শুধু পতনের অভিব্যক্তি দৃশ্যমান করার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এখানে বিষয়ভাবনা স্রেফ সারফেসেই সীমাবদ্ধ থাকে, ভিন্ন কোনো অর্থ দ্যোতনায় ছবিটি বিশিষ্ট হয়ে ওঠে না। তবে প্রদর্শনীর পোস্টারে ব্যবহৃত এই ছবিটি শিল্পীর হাতে নির্মিত টেরাকোটার স্বতন্ত্র প্রয়োগশৈলীর আভাস দেয় ও প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবির নির্মাণপরিচয় নির্দেশ করে। এছাড়া, প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত দুটি ভাস্কর্য অন্য ছবিগুলোর পাশাপাশি দর্শককে ভিন্ন স্বাদের সন্ধান দেয়। দুটি মিক্সড প্রিন্টও প্রদর্শিত হয়েছে এতে, যেগুলোতে তেমন কোনো নতুন তাৎপর্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আর চিত্রকর্মসমূহের নামকরণে ইংরেজি ভাষার প্রতি এত পক্ষপাত কেন শিল্পীর, সেটাও বোধগম্য নয়। ভিন্ন ভাষার দর্শকের কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজনে অনুবাদ তো সবসময় হাত বাড়িয়েই আছে।

সে যাক, এ-কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়, শিল্পী শারদ দাশ তাঁর এই তৃতীয় প্রদর্শনীটিতে যথেষ্ট স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সহজাত নির্মাণকুশলতার হাত ধরে তিনি তাঁর জীবনচেতনা ও শিল্পভাবনাকে শিল্পরসিকের সংবেদনশীল হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি অব্যাহত রাখবেন নিশ্চয়ই। আশা করা যায়, তাঁর নন্দনভাবনা ও সাধনা একটা সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। তবে শিল্পমাধ্যম নিয়ে তাঁর নিরীক্ষাধর্মিতা প্রসঙ্গে একটি কথা বলা হয়তো অসমীচীন হবে না। শিল্পে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কল্যাণকর হয় যদি তার চমৎকারিত্বের মায়াবর্তে শিল্পী নিজেই জড়িয়ে না পড়েন। এই বিষয়ে শিল্পীর সচেতন দৃষ্টি কামনা করে অদূর ভবিষ্যতে শিল্পী শারদ দাশের আরো অনেক অনুপম প্রদর্শনী দেখার প্রতীক্ষায় রইলাম।