বঙ্গবন্ধুর জীবনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রেণুর ভূমিকা

লেখক: আনোয়ারা সৈয়দ হক

বিশ্বের অনেক বড় বড় মনীষীর নিজের লেখা জীবনীগ্রন্থ আমরা পড়ে থাকি; কিন্তু তাঁদের জীবনে কৃতিত্বের পেছনে তাঁদের ঘরনিদের কথা খুব কম লেখা থাকে। আর যাও বা ছিটেফোঁটা লেখা থাকে, প্রায়ই তাতে সেই রমণীদের প্রকৃত চেহারা ফুটে ওঠে না। সামান্য যা কিছু ফোটে তাতে করে তাঁদের সম্পর্কে কিছু লেখা প্রায় দুরূহ হয়ে পড়ে।

যেমন বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের স্ত্রীর কথা। এই দুর্ভাগা স্ত্রীটি ইতিহাসের পাতায় অত্যন্ত রাগী একজন মহিলা হিসেবে প্রতিভাত হয়ে আছেন, যিনি মহাত্মা সক্রেটিসকে নাকি সর্বদাই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন।একজন বিফল পিতা, একজন বিফল স্বামী হিসেবে যিনি সক্রেটিসকে গণ্য করতেন, তাও নীরবে নিভৃতে নয়, বরং সমস্ত পাড়ার মানুষকে জানিয়ে! শুনেছি তাঁর চিৎকার এবং বিলাপে পাড়ার কাকটিও গাছের ডালে বসতে সাহস পেত না!

এবং সক্রেটিস তাঁর এই স্ত্রীকে এতটাই ভয় পেতেন যে, ভয়ে তিনি বাড়ির আঙিনাতেও পা দিতেন না! এমনকি রাতের বেলাতেও কোনো একটি বাড়ির বারান্দাই ছিল তাঁর প্রিয় বসার জায়গা এবং ঘুমোবারও।সেখানেই তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তাঁর স্ত্রীর ভাষায় ‘নরক গুলজার’ করতেন এবং উঠতি বয়সী ছেলে-ছোকরাদের কচি মাথাগুলো ‘খারাপ’ করে দিতেন! এই উঠতি বয়সী ছেলে-ছোকরাদের ভেতরে মহামতি অ্যারিস্টটল এবং প্লেটোও ছিলেন।কিন্তু এই যে মহিলার চেঁচামেচি, হইচই, বাইরের মানুষের সামনে স্বামীকে হেনস্তা করার যে অসংকোচ সাহস, তার পেছনে দৈনন্দিন জীবনযাপনের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে, যা একজন রমণীকে ক্ষিপ্ত করে তুলতে সমর্থ, সে-দিকটি আমরা কখনো বিবেচনায় আনি না। কারণ মহামতি সক্রেটিসের দিকেই আমাদের সমগ্র মনোযোগ ধাবিত।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, সক্রেটিস নিজে তাঁর সংসার চালানোর অসমর্থতা বেশ ভালোভাবেই বুঝতেন, যাপিত জীবনের গ্লানির কথা জানতেন, যে-কারণে তিনি নিজের স্ত্রী সম্পর্কে, আমি যতদূর জানি, কোনো কটু কথা বলে যাননি।

তারপর আমাদের ঘরের কাছে আছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশের হাজারটা দোষ এবং নিষ্ঠুরতা মানুষের স্মৃতিপটে খোদিত হয়ে আছে। কিন্তু একজন আধা-পাগলাটে নিশ্চুপ প্রতিভাবান স্বামীকে নিয়ে সংসারজীবন যাপন করার যে-কষ্ট, যে-আশাভঙ্গ, যে দৈনন্দিন দীনতার ভেতর দিয়ে সংসারজীবনকে চালিত করার ক্ষোভ, সেটি বোঝার মতো লাবণ্য দাশ এখনো তেমন কোনো সহানুভূতিশীল সমালোচক পেয়েছেন বলে জানি না। জীবনানন্দ দাশ নিজেও কখনো স্ত্রীকে বুঝেছেন বলে মনে হয় না। কারণ মেয়েদের মনের যে-জটিলতা সেটি বোঝার ক্ষমতা কবিদের আছে বলে মনে হয় না! প্রকৃতিকে বোঝা যত সহজ, নারীকে বোঝা তত সহজ নয়। কারণ নারী প্রকৃতির মতো খোলামেলা নয়!

তবু জীবনানন্দ কাউকে তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে নিন্দা করেছেন বলে জানিনি।

একটি ব্যাপার বাইরের মানুষ বুঝতে হয়তো সমর্থ হয় না আর সেটা হলো স্বামীকে প্রতিভাবান জানলেও, এবং স্বামীকে যার যার মতো ভালোবাসলেও, দৈনন্দিন জীবনে সেই স্বামী শুধু আর দশজন সাধারণ স্বামীর মতোই।

তাই একজন অসামান্য প্রতিভাধর স্বামীকে নিয়ে ঘরসংসার করা কত যে কঠিন, এ-কথাটা পৃথিবীর মানুষ তাদের ইতিহাসে কখনো লেখে না। কারণ এসব লিপিবদ্ধ করলে নারীর দুঃখ, যন্ত্রণা, ক্ষোভ এবং মহত্ত্ব প্রকাশ পেয়ে যায়!

বিখ্যাত মানুষদের স্ত্রীকে নিয়ে এতগুলো কথা এই কারণে বলতে হচ্ছে যে, কারাগারে অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা পড়ে যে-কোনো নারীপাঠক অভিভূত হবেন। সেটা শুধু তাঁর নিজের জীবন-অভিজ্ঞতার বিচিত্র ঘটনার জন্য নয়, তাঁর লেখার স্বতঃস্ফূর্ততার জন্য নয়, বরং রাজনীতি নিয়ে জীবনব্যাপী এরকম একজন ব্যস্ত মানুষের ডায়েরিতে এবং জীবনকথায় নিজের ছেলেবেলার স্ত্রীর কথা মাঝে মাঝেই উঠে আসার জন্য।

বই দুখানি পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রকাশিত হওয়ার পর মাত্র কিছুদিন আগে আদ্যোপান্ত পড়ে সারতে পেরেছি। এবং পড়া শেষ করে অনেক কিছু ভাববার অবসর পেয়েছি। বইটি পড়বার সময় লক্ষ করলাম যে, বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে প্রায় ৩৬ বার তাঁর স্ত্রী রেণুর কথা উল্লেখ করেছেন এবং কারাগারের রোজনামচায় উল্লেখ করেছেন প্রায় ৭০ বার। এরকম উল্লেখ বইটিকে সৌন্দর্য দিয়েছে বেশি এই কারণে যে, একজন রাজবন্দির জীবনে, যিনি দেশের জন্য নিজেকে পুরোমাত্রায় উৎসর্গ করে দিয়েছেন, জেল এবং মৃত্যু যাঁর জীবনে ছায়ার মতো ঘুরপাক খেয়েছে সারাটি জীবন, তাঁর এভাবে নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করবার প্রেরণা এমনি এমনি তৈরি হয় না, যদি তার পেছনে দৃঢ় একটি আদর্শ, একটি আত্মবিশ্বাস না থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, এই আত্মবিশ্বাস এবং আদর্শের পেছনে যদি না থাকেন একজন স্ত্রী এবং সেই স্ত্রীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা।

নিজের পিতাও বঙ্গবন্ধুর জীবনে ভীষণভাবে ছায়াপাত করেছেন কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু ঘরের স্ত্রী যদি ন্যাগিং বা অসুখী হন তাহলে বহু রাজনৈতিক কর্মীও তাদের জীবনে চরম সাফল্য অর্জন করতে বিফল হন। এরকম দৃষ্টান্ত আমাদের জানা আছে।

ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত বহু মিলবে।

একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে আমি বঙ্গবন্ধুর নিজের জীবনসঙ্গিনীর প্রতি যে-মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লিখিত গ্রন্থদুটিতে, সেটি ওই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে তো বটেই, এখনো যেন ভাবলে বিস্মিত এবং চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়ি। এই বইদুটি পড়লে স্পষ্টতই মনে হয় বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রেণুই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের চালিকাশক্তি।

এবং ফজিলাতুন্নেছা রেণু যেভাবে ইতিহাসের পাতায় প্রতিভাত হয়েছেন, তা এত মানবিক এবং চক্ষুসজল যে, নিচে কিছু উদাহরণ না দিয়ে পারছি না।

রেণুও কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল আমাকে দিতে। আমি রেণুকে বললাম, ‘এতদিন একলা ছিলে, এখন আরও দুজন (দুটি শিশুসন্তান) তোমার দলে বেড়েছে। আমার দ্বারা তো কোন আর্থিক সাহায্য পাবার আশা নাই। তোমাকেই চালাতে হবে। আব্বার কাছে তো সকল সময় চাইতে পার না, সে আমি জানি। আর আব্বাই বা কোথায় এত টাকা পাবেন? আমার টাকার বেশি দরকার নাই। শীঘ্রই গ্রেফতার করে ফেলবে। পালিয়ে বেড়াতে আমি পারব না। তোমাদের সাথে কবে আর দেখা হয় ঠিক নাই।’

আবার আরেকটি অধ্যায়ে আমরা পড়ি,

রেণু আমাকে বিদায় দেবার সময় নীরবে চোখের পানি ফেলছিল। আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম না, একটা চুমা দিয়ে বিদায় নিলাম। বলবার তো কিছুই আমার ছিল না। সবই তো ওকে বলেছি।

গোপালগঞ্জের জেলে যখন ছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুর পরিবার তাঁর সঙ্গে জেলে দেখা করতে গেলেন। রেণুও ছিলেন সঙ্গে।

সকলের কথাবার্তা শেষ হলে যখন বঙ্গবন্ধুকে একাকী পেলেন, রেণু বললেন, ‘জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিৎ আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন, আমার কেউই নাই। তোমার কিছু হলে বাঁচব কি করে? – আমি রেণুকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তাতে ফল হল উল্টা।’

একবার বঙ্গবন্ধু তাঁকে অবৈধভাবে জেলে আটকে রাখার প্রতিবাদে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। এরপর জোর করে নাকে নল ঢুকিয়ে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। এতে তাঁর নাকে ঘা হয়ে যায়।অবশেষে অনেক নাটক করে পাকিস্তান সরকার তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেয়।

সেবার অনেক কষ্ট করে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে পৌঁছান।

বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘এক এক করে সকলে যখন আমার কামরা থেকে বিদায় নিল, তখন রেণু কেঁদে ফেলল এবং বলল, তোমার চিঠি পেয়ে আমি বুঝেছিলাম, তুমি কিছু একটা করে ফেলবা। আমি তোমাকে দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কাকে বলব নিয়ে যেতে, আব্বাকে বলতে পারি না লজ্জায়। নাসেরভাই বাড়ি নাই। যখন খবর পেলাম খবরের কাগজে, তখন লজ্জা শরম ত্যাগ করে আব্বাকে বললাম। আব্বা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাই রওনা করলাম ঢাকায়, সোজা আমাদের বড় নৌকায় তিনজন মাল্লা নিয়ে।

কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে? এদের কি দয়ামায়া আছে? আমাদের কারও কথাও তোমার মনে ছিল না? কিছু একটা হলে কি উপায় হত? আমি এই দুইটা দুধের বাচ্চা নিয়ে কি করে বাঁচতাম? হাসিনা, কামালের অবস্থা কি হত? তুমি বলবা, খাওয়া দাওয়ার কষ্ট তো হত না? মানুষ কি শুধু খাওয়াপরা নিয়েই বাঁচতে চায়? আর মরে গেলে দেশের কাজই বা কিভাবে করতা?’

এবং এই মর্মস্পর্শী অনুযোগের উত্তরে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি তাকে (রেণুকে) কিছুই বললাম না। তাকে বলতে দিলাম, কারণ মনের কথা প্রকাশ করতে পারলে ব্যথাটা কিছু কমে যায়। রেণু খুব চাপা, আজ যেন কথার বাঁধ ভেঙে গেছে।’

রেণু অবশ্যই চাপা ছিলেন, তবে ভীত ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু যখনই বাড়িতে ফিরে গেছেন, জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে বা অন্য কোনো কারণে, বালিকা রেণু, পরবর্তীকালে তরুণী রেণু সর্বদাই লোকচক্ষুর অন্তরালে মুজিবের হাতে অর্থ তুলে দিয়েছেন। এমন একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে না, যেখানে রেণু গোপনে কিছু টাকা হাতে নিয়ে চুপ করে বঙ্গবন্ধুর বিদায়ের সময় অপেক্ষায় না থেকেছেন। তার মানে কি এই নয় যে, রেণুর ভেতরে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, শেখ মুজিব একদিন নিশ্চয় বাঙালির মুক্তিদাতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন? এবং বঙ্গবন্ধুর নিরন্তর এই সংগ্রামের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা ছিল?

এবং সেই অর্থে রেণুও কি দেশের বন্ধন মুক্তির জন্য তাঁর মতো করে সংগ্রাম করেননি?

‘আর মরে গেলে দেশের কাজই বা কিভাবে করতা?’ এই বাক্যটির ভেতরেই নিজের মাতৃভূমির প্রতি রেণুর প্রেম এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

আমরা সাধারণত জানি যে, সংসারের কোনো একটি মানুষের আদর্শের পেছনে তার পরিবার সাহায্য করে থাকে। এখানে বঙ্গবন্ধুর পিতার বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে আস্থা এবং বিশ্বাস ছিল, রেণুর ভেতরেও সেই আস্থা এবং বিশ্বাসের কোনো প্রকার ঘাটতি ছিল না।

কিন্তু রেণুর সবকিছু ছিল নীরবে। লোকচক্ষুর আড়ালে।

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যে-নির্বাচন হয় তাতে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে এবং যুক্তফ্রন্টের বিজয় হয়। আওয়ামী লীগ ছিল এই যুক্তফ্রন্টের বৃহত্তম এক শরিক। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের অনেক বড় বড় এবং হোমরাচোমরা নেতা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কেন্দ্রীয় সরকার এই ঘটনায় ভীষণভাবে ঘাবড়ে যায়। যার ফলে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নেতারা মন্ত্রী হিসেবে লাটভবনে যখন শপথ নিতে যান, ঠিক সেই মুহূর্তে খবর এলো, আদমজী জুট মিলে বাঙালি এবং অবাঙালি শ্রমিকদের ভেতরে দাঙ্গা শুরু হয়েছে।

এদিকে নির্বাচনে জয়লাভের পরপরই রেণু অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন। হয়তো ভেবেছিলেন, যাক, এত যুগ পরে ঘরসংসার নিয়ে একটু থিতু হওয়া যাবে। ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো স্কুল-কলেজে ভর্তি করা যাবে। তাদের লেখাপড়ারও ঠিকমতো বন্দোবস্ত হওয়া দরকার।

বঙ্গবন্ধুও স্ত্রীকে দেখে খুশি হলেন। মনে মনে বললেন, ‘আমি খুশিই হলাম, আমি তো মোসাফিরের মতো থাকি। সে এসে সকল কিছু ঠিকঠাক করতে শুরু করেছে। আমার অবস্থা জানে। তাই বাড়ি থেকে কিছু টাকাও নিয়ে এসেছে।’

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যেদিন যুক্তফ্রন্টের নেতারা শপথ নিচ্ছেন লাটভবনে, তাদের শপথ নেওয়া শেষ হয়েছে, মোটামুটি দফতর বণ্টনও শেষ হয়েছে, সেই মুহূর্তে দাঙ্গার খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টের নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে রওনা হলেন সোজা নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলের দিকে।এই দাঙ্গা যে একটি অশুভ লক্ষণ, সেটি যে বর্তমানের নির্বাচনের ফলাফলকে নস্যাৎ করার একটি প্রচেষ্টা, সেটি বঙ্গবন্ধুর বুঝতে বাকি থাকল না।

সেদিন আদমজী জুট মিলের অভ্যন্তরে অগণিত নিরীহ বাঙালিকে রক্তগঙ্গার সাগরে মৃত পড়ে থাকতে দেখে বঙ্গবন্ধুর হৃদয় শোকে মুহ্যমান হয়ে গেল। বুঝতে বাকি থাকল না যে, কর্তৃপক্ষের উসকানিতেই অবাঙালি শ্রমিকরা এভাবে বাঙালি শ্রমিকদের হত্যা করতে সাহস পেয়েছে।

সেই রাতেই ঢাকায় ফিরে আসার পরপরই কেবিনেট মিটিং বসল। অনেক প্রকারের হইচই এবং আলোচনার শেষে রাত যখন প্রায় একটা, বঙ্গবন্ধু রাস্তায় বেরিয়ে দেখেন বাঙালিরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে এই জঘন্য হত্যার বদলা নেবে বলে। কারণ ততক্ষণে রটে গেছে যে, কর্তৃপক্ষের উসকানিতে শত শত বাঙালিকে জুট মিলের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। এবং এ-খবর শুনে গ্রাম থেকে হাজার হাজার বাঙালি এগিয়ে আসছে।

এখন ভয় পেয়ে অবাঙালি নেতারা বঙ্গবন্ধুর সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছে। বঙ্গবন্ধু সেই সংকট-মুহূর্তে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বক্তৃতা দিয়ে মানুষজনকে শান্ত করতে লাগলেন। তাঁর মনের ভেতর হাহাকার হতে লাগল। কারণ তিনি নিজের চোখে আদমজী জুট মিলে একাকী হেঁটে হেঁটে মৃতদেহ গুনে দেখেছেন অন্তত ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং বহু মৃতদেহ পুকুরেও পড়ে আছে, যার সংখ্যা ১০০-র নিচে নয়। এবং তারা অধিকাংশই বাঙালি।

জীবনের এই প্রথম শপথ নেওয়ার দিনটিতেই এরকম একটি ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলে বঙ্গবন্ধুর মনে দৃঢ় বিশ্বাস হলো। তাঁর মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বিষণ্নহৃদয়ে তিনি রাত সাড়ে চারটার সময় নিজের বাসার দরজায় হাজির হলেন।

সকালে শপথ নেওয়ার পর থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্যও তিনি বাসায় যেতে পারেননি। আর দিনভর পেটে একটি দানাও পড়েনি।

 তিনি সেদিন বাসায় ঢুকে দেখেন তাঁর রেণু ‘চুপটি করে না খেয়ে বসে আছে, আমার জন্য।’

এই ঘটনার পরপরই কেন্দ্রীয় সরকার ৯২ (ক) ধারা জারি করে মন্ত্রিসভা বাতিল ঘোষণা করল।

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বেশ ভালোভাবে শুরু হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু রেণুকে বললেন, ‘এতদিন বাদে এখানে এসে সংসারও ভাল করে পাততে পার নাই। আমার কাছে থাকবা বলে এসেছিলা, ঢাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ হবে, তা বোধহয় হল না।নিজের হাতের টাকাপয়সাগুলিও খরচ করে ফেলেছ।’

এরপর আসি তাঁর লেখা কারাগারের রোজনামচায়। এখানে অন্তত ৭০ বার রেণুর নাম উচ্চারিত হয়েছে।আমি জানিনে আর কোনো রাষ্ট্রনায়ক তাঁর দৈনন্দিন রোজনামচায় এতবার করে সেই বাল্যকালে বিবাহিত একজন স্ত্রীর নাম করেছেন কিনা। এই রোজনামচাটি সুখপাঠ্য একটি গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারাগারের বন্দিজীবনেও বঙ্গবন্ধুর পরিহাস করার ক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমেনি। তবে সবচেয়ে মনোযোগ কাড়ে রেণু যেদিন তাঁর স্বামীকে জেলখানায় দেখতে আসেন। ১৫ দিন পরপর পরিবারের সঙ্গে ‘দেখা’ হয়। এই দেখা হওয়ার দিনটি শেখ মুজিবের মনের ভেতরে যেন একটা অস্থির উতলা বাতাসের মতো ঘোরাফেরা করতে থাকে। যেন আজ দেখা, দেখা, দেখা হবে!

মাত্র একটি ঘণ্টার এক ‘দেখা’ সমস্ত দিন তাঁর হৃদয় ও মন জুড়ে থাকে।

একদিন জেলখানায় ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। শেখ মুজিব বই নিয়ে বসে আছেন। তারপর তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, ‘মনে করবেন না, বই নিয়ে বসলেই লেখাপড়া করি। মাঝে মাঝে বইয়ের দিকে চেয়ে থাকি সত্য, মনে হবে কত মনোযোগ সহকারে পড়ছি। বোধহয় সেই মুহূর্তে আমার মন কোথাও কোন অজানা অচেনা দেশে চলে গিয়েছে। নতুবা কোন আপনজনের কথা মনে পড়ছে। নতুবা যার সাথে মনের মিল আছে। একজন আর একজনকে পছন্দ করি, তবু দূরে থাকতে হয়, তার কথাও চিন্তা করে চলেছি।’

এইটুকু পড়লেই পাঠকের চোখ সজল হয়ে ওঠে এই কারণেই যে, যিনি এই চিন্তাটি করছেন তাঁর পক্ষে কোনোরকমেই সম্ভব নয়, হাজার ইচ্ছা করলেও, সেই মুহূর্তে তিনি তাঁর মনের মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

আবার এক জায়গায় লেখক লিখছেন, ‘জেলের বাইরে থাকতে মাথা ব্যথায় অনেক সময় কষ্ট পেতাম।স্যারিডন দুই তিনটা খেয়ে চুপ করে থাকতাম। আধ ঘণ্টা পরেই ভাল হয়ে যেতাম। আবার কাজে নেমে পড়তাম। রেণু স্যারিডন খেতে দিতে চাইত না। ভীষণ আপত্তি করত। বলত, হার্ট দুর্বল হয়ে যাবে। আমি বলতাম, আমার হার্ট নাই, অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে!

বাইরে তার কথা শুনি নাই। কিন্তু জেলের ভিতর তার নিষেধ না শুনে পারলাম না।’

এই ধরনের কত ছোটখাটো ঘটনা দিয়ে রোজনামচাটি ভরপুর।

একবার রেণু অসুস্থতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে দেখতে জেলখানায় আসতে পারেননি। যেহেতু প্রতি পনেরো দিন পরপর দেখা করার আইন, তাই প্রায় এক মাস বাদে রেণু এসেছেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ‘দেখা’করতে।সিকিউরিটি জমাদার এসে যেই খবর দিলো, ‘চলিয়ে, বেগম সাহেবা আয়া।’

খবরটা শোনার পরপরই বঙ্গবন্ধুর প্রতিক্রিয়া, (খবর শোনার পর) ‘আমি কি আর দেরি করি? তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবি পরেই হাঁটা দিলাম গেটের দিকে। … রেণুকে জিজ্ঞাসা করলাম, খুব জ্বরে ভুগেছ। এখন কেমন আছ?’

রেণু সেদিন তাঁর স্বামীর জন্য হরলিকস আর আম কিনে এনেছেন। আর স্বামী রেণুকে বলছেন, ‘আমার জন্য না কিনে বাচ্চাদের কিনে দাও।’

সেদিন কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। বঙ্গবন্ধু সেদিন তাঁর রোজনামচায় লিখছেন, ‘ওদের বিদায় দিয়ে আমার স্থানে আমি ফিরে এলাম। মনে মনে বললাম, আমার জন্য হরলিকস আর আম কিনে এনেছ। আমার জন্য চিন্তা করে লাভ কি? তোমরা সুখে থাক। আমি যে পথ বেছে নিয়েছি সেটা কষ্টের পথ।’

আরেক জায়গায় লেখক বলছেন, ‘আমার ভাল লাগে না কিছুই খেতে। আমার বেগমের দৌলতে কোনো জিনিসের তো অভাব নাই। বিস্কুট, হরলিকস, আম, এমনকি মোরব্বা পর্যন্ত তিনি পাঠান। নিজে আমি বেশি কিছু খাই না, কারণ ইচ্ছা হয় না।’

রোজনামচায় আবার এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু লিখছেন, ‘আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনদিন নিজে পালন করি নাই। বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটিতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধহয়, আমি জেলে বন্দী আছি বলেই। মনে মনে ভাবলাম, ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস!’

‘দেখে হাসলাম। মাত্র ১৪ তারিখে রেণু ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেখতে এসেছিল। আবার এত তাড়াতাড়ি দেখা করতে অনুমতি কি দিবে? মন বলছিল, যদি আমার ছেলেমেয়েরা ও রেণু আসত ভালই হত।’

সেদিন বঙ্গবন্ধু রেণুর দেখা পাওয়ার আশায় ধৈর্য ধরে বসে থাকলেন। দেখতে দেখতে সাড়ে চারটে বেজে গেল। ভাবলেন আজ বোধহয় তাঁর রেণু এবং ছেলেমেয়েরা দেখা করবার অনুমতি পায়নি।

একসময় পাঁচটাও বেজে গেল।

দেখা করার সময় শেষ।

ঠিক সেই মুহূর্তে জেলের জমাদার এসে খবর দিলো যে বঙ্গবন্ধুর পরিবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।

বঙ্গবন্ধু দ্রুততার সাথে জেলগেটের দিকে চললেন।

যখন তাঁদের বিদায় নেওয়ার সময় এলো, বঙ্গবন্ধু লিখছেন, ‘আমার ছোট মেয়েটা খুব ব্যথা পায় আমাকে ছেড়ে যেতে, ওর মুখ দেখে বুঝতে পারি। ব্যথা আমিও পাই, কিন্তু উপায় নাই। রেণুও বড় চাপা, মুখে কিছুই প্রকাশ করে না।’

১৪ই এপ্রিল ১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকার জেলখানায় বসে তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, ‘চার মাস হয়ে গেল, আজও (কোম্পানি) আমার টাকা দেয় নাই। রেণু বলল, যদি বেশি অসুবিধা হয়, নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে ছোট বাড়ি একটা ভাড়া করে নিব।’ রেণু বলল, ‘চিন্তা তোমার করতে হবে না।’

১৯৬৭ সালের সেই এপ্রিল মাসেই ছেলেমেয়েরা তাঁর সঙ্গে জেলখানায় দেখা করতে এলে বঙ্গবন্ধু তাদের বললেন, ‘তোমরা মন দিয়ে লেখাপড়া শিখ, আমার কতদিন থাকতে হয় জানি না। তবে অনেকদিন আরও থাকতে হবে বলে মনে হয়। … তোমার মা চালাইয়া নিবে। … আমি তো সারাজীবনই বাইরে বাইরে অথবা জেলে জেলে কাটাইয়াছি। তোমার মা’ই সংসার চালাইয়াছে।’

আবার ১৯৬৭ সালের মে মাসে রেণু একবার জেলে দেখা করতে এলে বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘রেণু, কেমন আছ?’ রেণু উত্তরে বললেন, ‘ভালো নেই।’

এর কদিন আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর নিজের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। প্রায় সাত সের ওজন কমে গিয়েছিল। কিন্তু রেণু সংবাদ শুনে অস্থির হবেন বলে তাঁকে নিজের শরীরের অবস্থা জানাননি। তবে রেণু অবশ্যই সে-খবর জানতেন। এবং মনে মনে অস্থির হয়ে ছিলেন। ফলে তাঁরও শরীর খারাপ হতে থাকল।

রেণু বললেন, ‘আমার পায়ে ব্যথা, হাঁটতে কষ্ট হয়।’

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ডাক্তার দেখাও।’

সেদিনই বিকেলবেলা রেণু চলে গেলে বঙ্গবন্ধু যখন দ্রুতপায়ে নিজের সেলের দিকে ফিরছেন, কারণ একটু পরেই জমাদার সেল তালাবন্দ করতে আসবে, তখন জেলের মাঠে বন্দি শাহ মোয়াজ্জেম এবং নূরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে দেখা হলো। ওরা মাঠে বেড়াচ্ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে ওদের সামনে মাঠ পার হতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাবি কেমন আছেন?’

উত্তরে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার শরীর খারাপ হওয়াতে বোধহয় তোমাদের ভাবিরও শরীর খারাপ হয়েছে!’

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ার পর মনে হলো এই প্রথমবারের মতো আমি যেন আমাদের দেশের রাজনীতি সম্পর্কে পূর্ণ একটি ধারণা পেলাম। রাজনীতির ভেতরে কত যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ, কত যে অদ্ভুত চমকপ্রদ ঘটনাবলি, রাজনীতিবিদরাও যে মানুষ এবং স্ত্রীর অদর্শনে তাঁদেরও মাথা খারাপ হতে পারে, কারাগারে যেভাবে সূক্ষ্ম চতুরতার সঙ্গে মানুষকে উন্মাদে পরিণত করার গভীর ষড়যন্ত্র হয়, আমি একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে তার খবর পেয়ে আতঙ্কিত, কিন্তু সেইসঙ্গে যেন বিমোহিতও।

সবচেয়ে আমি আশ্চর্য হয়েছি রাজনীতিবিদদের পরিবারের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা দেখে। শুধু কি কষ্ট? কষ্টের চেয়েও বেশি হলো আশাভঙ্গ। খোকা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, বাড়ি আসছেন, বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য নৌকা এসে ঘাটে লেগেছে, বাড়িতে মা-বাবা, বোন, স্ত্রী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে করাচি থেকে একটা রেডিওগ্রাম এসে জেলারের হাতে পৌঁছল!

আবার নতুন জেল!

আর সেই সংবাদ শুনে গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মায়ের চিৎকার করে বুকফাটা কান্না।

সেই কান্না যেন এত যুগ পরেও আমাদের বুকে এসে ধাক্কা দেয়।

এবং এই লেখা পড়ার সময় বারবার মনে হয় যেন এসব গল্পকথা, যেন এগুলো সত্যি নয়। মানুষ মানুষের প্রতি এত হিংস্র হয় কী করে?

কিন্তু না, পরবর্তী সময়ে যে-জাতি মুক্তিযুদ্ধ পার হয়ে এসেছে, তার জাতীয় জীবনে পাকিস্তান নামি একটি রাষ্ট্রের যে লোমহর্ষক অত্যাচারের নীলনকশা এবং সেই নকশার অকুণ্ঠ বাস্তবায়ন আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, মানুষের নামধারী হলেও কোনো কোনো জাতি পশুরও অধম হতে পারে।

সহ্যের অতীত যে-কষ্ট সে-কষ্ট ভোগ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, যার নাম যৌবন, সেই সময়ের সিংহভাগ তাঁর কেটেছে কারাগারের অন্তরালে।

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বছরের পর বছর কারাগারে সময় ক্ষেপণ করলেও যেন এক মুহূর্তের জন্যও নিজের পিতামাতা এবং পরিবারকে ভোলেননি। এবং কেন জানি আমার এই বই দুটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয় আসলে রেণুই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের চালিকাশক্তি।

স্ত্রী রেণুর প্রতি তাঁর যে-মনোভাব, স্ত্রীকে বোঝার যে অসাধারণ ক্ষমতা, রেণুর মনোবিশ্লেষণ, সবকিছু খুব অল্প কথায় বঙ্গবন্ধু তাঁর কারাগারের রোজনামচা এবং অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তুলে ধরতে পেরেছেন।

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, রেণু নিজের বুদ্ধিমতোই বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন সাধারণ হাতে লেখার কিছু খাতা বন্দিজীবনের সময় কাটাবার জন্য বা নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথা লেখার জন্য, তিনি হয়তো কল্পনায়ও আনতে পারেননি যে নিজের বন্দিজীবনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তাঁকেও সম্পৃক্ত করে নেবেন!

আমাদের দেশের আরো অনেক বড় রাজনীতিবিদ ছিলেন, কিন্তু তাঁরা কেউ তাঁদের জীবনের কর্মকাণ্ডের পেছনে তাঁদের স্ত্রী এবং পরিবারের কথা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করে যেতে পারেননি, অথচ ইচ্ছা করলে তাঁরা সেটা করতে পারতেন। কারণ তাঁদের প্রত্যেকেরই রাজনীতির সঙ্গে পরিবার কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

উপরিউক্ত বই দুটি পড়ে কখনো পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়নি যে, বঙ্গবন্ধু তাঁর রোজনামচা এবং জীবনীগ্রন্থে স্ত্রী রেণুর কথা জোর করে আরোপিত করেছেন। খুব সহজ, সরল এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই যেন রেণু মাঝে মাঝেই এসে হানা দিয়েছেন গ্রন্থ দুটিতে। সবশেষে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর জীবনে রেণু এসেছিলেন বলেই হয়তো তিনি সর্বতোভাবে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলেন।

Leave a Reply