বাংলার রাজনীতির সমাজতত্ত্ব

লেখক: আবু জাফর শামসুদ্দীন

অনুবাদ : সুব্রত বড়ুয়া

আমাদের রাজনীতিকদের, যাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হয় রাষ্ট্রের সেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও যাঁরা পুরোপুরি তাঁদের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার কারণেই বেশ কয়েকবার তাঁদের দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন, সবচাইতে লক্ষণীয় যোগ্যতা হলো ইতিহাস ও ইতিহাসের শিক্ষার প্রতি বিস্ময়কর অনীহা।
একজন নিরাবেগ দর্শকের মনে হবে যে, তাঁরা অতীতের অনুধাবন ও বর্তমানকালের বাস্তবতার প্রতি এতটাই বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিলেন যে – সময়ের জরুরি চাহিদা অনুযায়ী কাজ করার চেয়ে তাঁরা বরং মৃত্যুবরণ করাটাই শ্রেয় বিবেচনা করতেন। কোনো একটি আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা নিশ্চয়ই একটি মহৎ গুণ। অতএব তাঁদের আচরণ প্রকৃতই গৌরবজনক হতে পারত, যদি না তা যে-যন্ত্রটি তাঁরা বিগত চব্বিশ বছর ধরে চালিয়ে আসছিলেন, সেটিকে প্রায় অচলাবস্থায় নিয়ে আসত। তবু অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার বিজ্ঞানে আমাদের অতীত অবদানসমূহকে গৌরবদীপ্ত করার বিষয়টি যখন আসে তখন আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রপরিচালন ক্ষমতার জনকদ্বয় তথা ইবনে খলদুন ও নিজাম-উল-মালিকের প্রশংসা ও স্তুতির ক্ষেত্রে তাঁদেরকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেন না। বিদ্বজ্জনরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে যে সত্যানুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন, সে-বিষয়ের প্রতি সামান্যতম মনোযোগ প্রদান ব্যতিরেকেই, তাঁদেরকে গৌরবান্বিত করার এই অসংগতি তো নিজেই ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের একটি বিষয়; তবে সে-কাজটি আমি কোনোরকম দ্বিধা বা কুণ্ঠা ছাড়াই সেই উচ্চাভিলাষী যুবকদের জন্য ছেড়ে দিচ্ছি যাঁরা আমাদের স্বনামধন্য বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্থান লাভের জন্য প্রয়াস চালাতে চান। এই মুহূর্তে আমি বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপতত্ত্ব ও সেগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আগ্রহী। আমি সচেতন যে আমার এই অনুসন্ধান আমাকে আপাতদৃশ্যমানতা ও বাস্তবতার এখনো পর্যন্ত অসমাধানকৃত দার্শনিক সমস্যার দিকে চালিত করছে। কিন্তু আমার পাঠকদেরকে আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে, পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলিতে আমি বিশুদ্ধ দর্শন আলোচনা করতে যাচ্ছি না এবং যেসব সাধুসন্ত সব বাস্তবতাকে ‘মায়া’ বলে বিবেচনা করেন তাঁদের সঙ্গে পরিচয়ের তেমন কোনো সুযোগ আমি পাইনি। এ-ধরনের জ্ঞানগর্ভ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ‘চেয়ার’ (অধ্যাপকের পদ) রয়েছে। ভূমিকা হিসেবে এই-ই যথেষ্ট হবে বলে আমার মনে হয়।
বর্তমানে যে-ভূখণ্ডটি পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) নামে অভিহিত এই মুহূর্তে তার জনসংখ্যা ৭ কোটি। তাদেরকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইল আয়তনের একটি এলাকায়। ফলে প্রতি বর্গমাইলে এর জনঘনত্ব প্রায় ১৩০০। ১৯৬০ সালের কৃষি-শুমারি অনুসারে পূর্ব বাংলায় বসতবাড়ির সংখ্যা ৬৪,৬৪,৪০০। মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ২১,৭২৫,৮২৭ একর, যার মধ্যে প্রায় ২১ কোটি ১০ লাখ একর জমিতে ১৯৬৬-৬৭ অর্থবছরে চাষাবাদ করা হয়েছিল। কৃষিকাজে নিযুক্ত পরিবারের সংখ্যা ৬৪,১৬,৯৫০। এলাকা অনুযায়ী শ্রেণিবিভক্ত, ৭৮% কৃষি জমির আকার ৫ একরের কম এবং মোট আবাদকৃত এলাকা ৪৩%; ১৯% কৃষিজমি ৫ থেকে ১২.৫% যার মধ্যে আবাদকৃত এলাকা ১৪% এবং মাত্র ০.৫% এলাকা ২৫ একর ও তার অধিক, যার মধ্যে আবাদকৃত এলাকার পরিমাণ ৫%। পূর্ব বাংলায় গড় কৃষিজমির আয়তন মাত্র ৩.৫ একর। ১৯৬০ সালের জনগণনা বা আদমশুমারি অনুসারে শহরবাসী মানুষের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৫%। যদি অনুমান করা হয় যে, বিগত বছরগুলোতে আরো ৩% অধিক মানুষ শহরবাসী হয়েছে তাহলে বর্তমানে পূর্ব বাংলায় (বাংলাদেশ) শহরবাসী মানুষের মোট সংখ্যা ৫.৬ মিলিয়ন বা ৫৬ লাখ; অবশিষ্ট প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তাদের জীবনধারণের জন্য কোনো-না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অতএব মাথাপিছু লভ্য আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হচ্ছে ০.৩ একরের কম। কিন্তু, শুধু জীবন ধারণের জন্যই একজন মানুষের ন্যূনতম এক একর জমি প্রয়োজন। এর ফলে কৃষিনির্ভর মানুষদের মধ্যে ৪৪% পুরো বছরজুড়ে অলস সময় কাটায়, অবশিষ্ট ৫৬% অলস থাকে চার মাস। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, মোট কর্মঘণ্টার ৭০%-ই অব্যবহৃত থেকে যায় সারা বছর জুড়ে। সম্ভবত এই পরিস্থিতির মর্মার্থ অনুধাবনের জন্য অর্থাৎ তা যে আগ্নেয়গিরির মতো পরিস্থিতি সে-কথা বুঝতে পারার জন্য মহাজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
ব্রিটিশ আসনের প্রথমদিককার দিনগুলি থেকেই, এমনকি সামান্য হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলিতেও, কৃষিজীবী মানুষদের মধ্যে মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখন তা আরো বেশি। বর্তমানে পূর্ব বাংলার মোট হিন্দু জনসংখ্যা, যাদের অধিকাংশই তফসিলী, সম্ভবত ৮০ লক্ষের বেশি হবে না, যা মোট জনসংখ্যার ১১%-এর সামান্য বেশি। এই হিন্দুদের অধিকাংশই নৌকার মাঝি, নাপিত, কামার, করাতি, মিষ্টি বিক্রেতা, জেলে, কাঠমিস্ত্রি, তাঁতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। অতএব মুসলমান চাষিদের সংখ্যা নিরাপদেই মোট জনসংখ্যার ৯২%-এর বেশি বলে গ্রহণ করা যায়। পূর্ব বাংলায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণি এই চাষি শ্রেণিরই সন্তান; সেজন্য গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতি তাদের স্মৃতিবিধুরতা এবং উদ্বেগমূলক দায় উভয়ই রয়েছে। পুরুষানুক্রমে শহর ও নগরাদিতে বসবাসকারী গ্রামের প্রতি কোনো আকর্ষণহীন মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত কম, যেহেতু পূর্ব বাংলা এর বিচিত্র ইতিহাসের কোনো কালে শহর ও নগরে পরিপূর্ণ ছিল না। সমগ্র মুসলিম শাসনামলে বর্তমানে পূর্ব বাংলা নামে অভিহিত এই দেশটিতে এমনকি অর্ধডজন বড় শহরও গড়ে ওঠেনি। এরূপ সীমিতসংখ্যক নগরের মধ্যে শুধু ঢাকার গুরুত্বই ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিনগুলি পর্যন্ত টিকে ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র এক লাখ। এরূপ ভারসাম্যহীন বৃদ্ধির মূল কারণ সম্ভবত এই যে, মুসলিম শাসনামলে নগর ও শহরগুলি গড়ে উঠেছিল গ্যারিসন বা দুর্গকেন্দ্রগুলিকে ঘিরে। আকবরের রাজস্বকালের পূর্বে পর্যন্ত বাংলা প্রকৃতপক্ষে দিল্লির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ছিল। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এটি আবার স্বাধীন হয়ে যায় এবং প্রায় ৫০ বছর ধরে সেরূপই থাকে। মান সিংহের বিজয়ের পূর্বের সময়কালে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের রাজধানী মাত্র অল্প কিছুকালের জন্য পূর্ব বাংলায় অবস্থিত ছিল। সোনারগাঁওয়েই প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যবিশিষ্ট মাত্র অল্প কয়েকটি স্মারকস্তম্ভ এখনো পর্যন্ত রয়েছে। প্রায় ১২৫ বছরের মোগল শাসনামলে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী ছিল সেই সময়কালের সর্বোচ্চ অর্ধাংশকাল। মুরশিদ কুলি খান, আলীবর্দী খান ও সিরাজউদ্দৌলার আমলে স্বাধীনতার শেষ ৫০ বছরকালে সরকারের অবস্থানকেন্দ্র ছিল পশ্চিম বাংলায়। সেজন্যে পূর্ব বাংলার মানুষ ছিল গ্রামীণ এবং এমনকি আজো মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ৯২% গ্রামীণ, সে-কথা আমরা ইতোমধ্যেই বলেছি।
এরূপ ভারসাম্যহীন প্রবৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো পূর্ব বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান। জালের মতো বিস্তৃত শত শত শাখানদীসহ তিনটি বড় নদীর বদ্বীপ হওয়ার কারণে এর যোগাযোগ ব্যবস্থা সবসময়ে ছিল নদীভিত্তিক এবং বর্ষাকালে ব্যাপক বন্যার কারণে সকল ঋতুতে শহরভিত্তিক বসবাসের উপযোগী স্থানের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম।
এখন বিবেচনা করে দেখা যাক, এই অতিব্যাপক গ্রামীণ জনসংখ্যার চরিত্র-প্রলক্ষণ কি। অন্য সকল এলাকার মতো পূর্ব বাংলার গ্রামীণ মানুষজনও অত্যন্ত রক্ষণশীল। এবং বিশ্বের মানুষজন আমি যা দেখেছি, তাদের সম্পর্কে যা পড়েছি ও শুনেছি তাতে এ-কথা বলা সম্ভবত অতিশয়োক্তি হবে না যে, পূর্ব বাংলার মানুষ সকল জলবায়ু, অঞ্চল ও দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষ। একজন পাকিস্তানির কাছে, বিশেষত সেই সব পাকিস্তানি যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানুষের ধার্মিকতাকে ব্যবহার করে আসছিল, এটি ছিল আসলেই অত্যন্ত উৎসাহজনক এবং আপাতভাবে তাদেরকে অনাগত দীর্ঘ সময়ের জন্য স্বস্তিদায়ক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে। বাংলার মানুষেরা কি অসংখ্যবার ধর্মীয় নেতাদের আহ্বানের প্রতি সাড়া দিয়ে তাদের ধর্মপ্রাণতার বিষয়টি প্রমাণ করেনি? অবশ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও সাবেক গভর্নর জেনারেল ফিরোজ খান নুনের মতো রাজনীতিকরা, যাঁরা তাঁদের গৌরবের কালে ইসলাম ও যা কিছু ইসলামি তার প্রতি যে প্রেম দেখিয়েছেন সে-বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, তাঁরা পূর্ব বাংলার মানুষের ইসলামসম্মত আচার-আচরণের প্রতি যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেন। অবশ্য সেটি একটি আলাদা বিষয় এবং তাঁদের সে-সন্দেহ মূলত নিজেদের হীনম্মন্যতারই প্রকাশ। তাঁরা দুজনই আপাতত বাতিল হয়ে যাওয়া মানুষ এবং সমকালীন চিত্র থেকে নির্বাসিত। বর্তমানে সক্রিয় রাজনীতিকরা নিশ্চয়ই বাঙালি মুসলমানদের ধর্মপ্রাণতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে তেমন কোনো সন্দেহ পোষণ করেন না। না, মনে হয় তাদের প্রতি তাঁরা বরং বিশেষ পক্ষপাত পোষণ করেন। রাজনীতিকরা এখন পূর্ব বাংলার মানুষের ইসলামি জোশ উচ্চকিত করে তোলার প্রতি যে বিশেষ মনোযোগ প্রদর্শন করছেন তা এই মৃতপ্রায় লোকদের সম্পর্কে তাঁদের অনুকূল বিবেচনার প্রমাণের চেয়েও বেশি। একজন অগভীর পর্যবেক্ষকের ক্ষেত্রে এর সবই সত্য।
কিন্তু আমরা যদি সতর্কতার সঙ্গে বাংলার মুসলমান কৃষকদের ইতিহাস পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, সবসময়ে তাদের ধর্মপ্রাণতার ভিত্তি ছিল যে জমি তারা চাষ করে, যে খাজনা তারা দেয় এবং তাদের পরিশ্রমের বিনিময়ে যে আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা তারা পায় সেখানে। ইতিহাসে স্মরণীয় আছেন এমন লোকদের দ্বারা পরিচালিত ও নির্দেশিত ধর্মীয় আন্দোলনগুলি যদি ধর্মপ্রাণতার প্রকাশ হয়ে থাকে, যে-বিষয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ আছে বলে আমি মনে করি, – তাহলে এসব আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক দিকের পর্যালোচনা আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে। আমি উদ্দেশ্যপূর্ণভাবেই আমার আলোচনা ব্রিটিশ শাসনামল কালে বাংলার ধর্মীয় আন্দোলনগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি। ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে এর সমাপ্তিকাল পর্যন্ত বাংলার মুসলমানদের সকল লিপিবদ্ধ ধর্মীয় ও আধা-ধর্মীয় আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটেছে শাসকদের এবং তাদের প্রতিভূ ও সামাজিক সহায়কশক্তি তথা নীলকর, দেশীয় জমিদার, তালুকদার, মহাজন ও ধর্মবিশ্বাস নির্বিচারে অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট লোকদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। হিন্দু জমিদার ও সেই সঙ্গে তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি তারা লড়েছিল মুসলিম জমিদার ও তালুকদারদের বিরুদ্ধেও। আন্দোলনগুলির ধর্মীয় সূচনা ও পরবর্তী ধর্মীয় চরিত্র-লক্ষণগুলি ছিল শুধু বাইরের চেহারা; বাস্তবে এই আন্দোলনগুলি ছিল অর্থনৈতিক বন্ধন ও সীমাহীন শোষণ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তিলাভের সংগ্রাম। আমি এখানে মাত্র অল্প কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখের মধ্যেই আমার আলোচনা সীমিত রাখব যেগুলি আমাদের ইতিহাসে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এবং গর্ব ও আবেগের সঙ্গে আজো স্মরণ করা হয়।
এ-ধরনের প্রথম উল্লেখযোগ্য আন্দোলন হলো অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকের ফকির বিদ্রোহ। এর নাম থেকেই বোঝা যায় যে, এটি ছিল ধার্মিক ও ধর্মভীরু মুসলমানদের আন্দোলন। এর নেতা মজনু শাহ এবং তাঁর সহগামী মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, পরাগল শাহ প্রমুখ ছিলেন বিভিন্ন সুফি ঘরানার অন্তর্ভুক্ত। বাংলার মহাদুর্ভিক্ষগুলোর সময় এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল (১৭৭১-৭৩)। এ ছিল সুসংগঠিত সশস্ত্র আন্দোলন এবং তাতে অনেক ধর্মীয় উত্তাপ থাকলেও, এর আক্রমণ অবশ্য পরিচালিত হয়েছিল কোম্পানি রাজের লোভী লেজুড় বাংলার অত্যাচারী জমিদার ও তালুকদারদের বিরুদ্ধে। সেই সময়ে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে হিন্দু সাধুদের একটি আন্দোলনও সংঘটিত হয়েছিল। তাদের পরিচিত নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক। কায়েমি স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে ফকিরদের আক্রমণে সন্ন্যাসীদের সংগঠন তাদের সহায়তা করেছিল। প্রকৃতপক্ষে পুরো ফকির আন্দোলনই ঐতিহাসিকভাবে ফকির-সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসী-ফকির আন্দোলন নামে পরিচিত। এ-সময় বিপদাপন্ন বন্ধুদের রক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। মজনু শাহ তাঁর উগ্রবাদী অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁদের সম্মিলিত শত্রুদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে জমিদার-তালুকদার, ব্রিটিশ, সেনা-ক্যাপ্টেন ও তাদের ভাড়াটিয়া বাহিনীদের হত্যা করেন। তাঁরা খাজনা ও অন্যান্য কর পরিশোধ করা বন্ধ করে দেন। বস্তুত ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলার একটি অঞ্চলসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গই ব্রিটিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এসব বিদ্রোহের সূচনা ঘটে ১৭৬০ সালের দিকে এবং তা আঠারো শতকের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৩ সালে লেখেন যে, ফকিরদের একটি দল আক্রমণ চালিয়ে ঢাকার কুঠি দখল করেছে। ১৭৬৯ সালে তারা রংপুর অভিযান করে লে. কিনের অধীনস্থ একদল সৈন্যকে আক্রমণ করে। লে. কিন সংঘর্ষকালে নিহত হন। ১৭৭০ সালের দিকে ফকিররা একটি প্রকৃত শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। ১৭৭২ সালের ৩০শে ডিসেম্বর প্রায় ১৫০০ ফকির রংপুরের কাছে শ্যামগঞ্জে সমবেত হয়। ক্যাপ্টেন টমাস একদল সিপাহী নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। ফকিররা বীরত্বের সঙ্গে এই আক্রমণ প্রতিহত করে। এদিকে ফকিরদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের কারণে সিপাহীদের গুলিগোলা শেষ হয়ে গেলে ক্যাপ্টেন টমাস তার সিপাহীদের নির্দেশ দেয় শত্রুদের ওপর বেয়নেট চার্জ করতে। দেশীয় সিপাহীরা এই আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়। ফকিররা আক্রমণ চালিয়ে তলোয়ার দিয়ে টমাসের দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে। কিছুক্ষণ পর ফকিররা ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। ফলে ফকির বাহিনী ও কোম্পানির সিপাহীদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘর্ষে সার্জেন্ট মেজর ডগলাস ও ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড তাদের অনেক সঙ্গীসহ নিহত হয়। এবারেও কোম্পানির সিপাহীদের দেশীয় নেতারা ব্রিটিশদের সাহায্য করতে অস্বীকার করে। এর ফলে দেশীয় নেতাদের হত্যা করা হয় এবং এই হত্যাকাণ্ড কার্যকর করা হয় কামানের গোলার মাধ্যমে।১
ময়েদপুর, লস্করপুর ও রাজশাহীর কালেক্টরদের রিপোর্ট এবং সিক্রেট ডিপার্টমেন্টের ১৭৭৩ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ফকিররা তাদের নিকটবর্তী সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল।২ মজনু শাহের সঙ্গে সন্ন্যাসীদের নেতা ভবানী পাঠকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, যাঁকে ব্রিটিশ দলিল-দস্তাবেজে ডাকাত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।৩ দেশীয় সিপাহীরা সহ হিন্দু-মুসলমান কৃষকদের মধ্যে সবচাইতে গরিব অংশ সমবায়ে গঠিত এই দুটি সংগঠনের মধ্যে এমন নিবিড় সম্পর্ক ছিল যে, কোম্পানি সরকার এদের মধ্যে পার্থক্যবিচার প্রয়োজন মনে করেনি। আন্দোলনে কেবল হিন্দু-মুসলমান সমন্বয় নয়, বরং দেশীয় সিপাহীদের সঙ্গে এর সংযোগের বিষয়টিও গোবিন্দ গিওর নামে একজন হিন্দু সন্ন্যাসী সমর্থন করেছেন। তাঁর সাক্ষ্যে তিনি বলেছেন, ‘তাদের এক হাজার জনের মধ্যে ৪০০ জন মুসলমান ফকির ও ১০০ জন হিন্দু সন্ন্যাসী, ৪০০ সিপাহী, ২০ জন বৈরাগী ও অবশিষ্টরা বিভিন্ন ধরনের’ (কুচবিহারের কমিশনার মি. ব্রুসকে লেখা বসন্ত লাল আমিনের ২৭.০৮.১৭৯৪ তারিখের পত্রে উদ্ধৃত)৪। যদিও ফকিররা স্থানীয় শোষক তথা ব্রিটিশ রাজের সামাজিক ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা পালনকারী তালুকদার, জমিদার ও নীলকর প্রভৃতির অবস্থানসমূহে আক্রমণ চালিয়েছিল, তা সত্তে¡ও তারা বিভিন্ন সময়ে দেশীয় জনদরদি ব্রিটিশরোধী জমিদার ও তালুকদারদের সাহায্য প্রার্থনা ও তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। নাটোরের রানী ভবানীকে লেখা একটি চিঠিতে (সম্ভবত ১৭৭২ সালে) মজনু শাহ লিখেছিলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় খয়রাত করেছি এবং সেখানে সাদরে গৃহীতও হয়েছি; এবং আমরা কারো কোনোরূপ বাধা বা নির্যাতন ছাড়াই বিভিন্ন মাজার ও দরগাহে আল্লাহর এবাদত-বন্দেগি করে আসছি। এতদসত্তে¡ও গত বছর ১৫০ জন ফকিরকে বিনা কারণে হত্যা করা হয়। তারা বিভিন্ন দেশে ভিক্ষা করেছে এবং এভাবে যেসব কাপড়-চোপড় ও খাদ্যদ্রব্য তারা পেয়েছিল সবই তাদের হারাতে হয়েছে। এইসব অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের হত্যা করে যে খ্যাতি ব্রিটিশরা লাভ করেছিল তা ঘোষণা করে বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এর আগে ফকিররা আলাদা আলাদাভাবে ও বিচ্ছিন্নভাবে দলবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াত, কিন্তু এখন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছি ও একত্রে ভিক্ষা করছি। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে তারা (ইংরেজরা) মাজার ও অন্যান্য স্থানে যাওয়ার সময় আমাদের বাধা দিচ্ছে। এর কোনো যুক্তি নেই। আপনারা দেশের শাসক। আমরা ফকির, সবসময় আমরা আপনাদের কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করি। আমরা আশাবাদী।’৫ এই পত্র থেকে তিনটি বিষয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে : ১. ফকির বিদ্রোহের ধর্মীয় চরিত্র, ২. এর ব্রিটিশবিরোধী ভূমিকা এবং ৩. স্থানীয় জমিদার ও তালুকদারদের সঙ্গে এদের সংযোগ, যারা ছিল ব্রিটিশবিরোধী। কৃষকরাই যে ছিল ফকিরদের মূল ভিত্তি এবং সময়ে সময়ে তারাই যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের চামচাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল সে-বিষয়টি সমসাময়িক দলিল-দস্তাবেজে স্বীকার করা হয়েছে। ১৭৭২ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ভোরে মজনু শাহের অনুসারীগণ ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রকাশ্য যুদ্ধে দেশীয় সিপাহীরাই শুধু ফকিরদের ওপর বেয়নেট চার্জ করতে অস্বীকার করেনি। এছাড়াও, ‘রায়তরা তাদের কোনো সহায়তা করেনি, বরং লাঠি নিয়ে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে এবং যেসব সিপাহী লম্বা ঘাস ও জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল তাদের দেখিয়ে দিয়েছে এবং কোনো সিপাহী তাদের গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করলে গোলমালের শব্দ করে সন্ন্যাসীদের নিয়ে এসেছে ও সেই সিপাহীর মশাল লুট করেছে।’৬ ফকিররা তাদের সর্বশেষ বড় যুদ্ধ করেছিল ১৭৮৮ সালে দিনাজপুর জেলায় মুসা শাহের নেতৃত্বে। সরকারি বাহিনী ছিল লে. ক্রিস্টির অধীনে। মূল যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় চাঙ্গিরপুর গ্রামে। এবারও কৃষকরা ফকিরদের সমর্থন দেয় অথবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। সমকালীন একটি সরকারি প্রতিবেদনে নৈরাশ্যজনক সুরে মন্তব্য করা হয়েছে যে, যদি স্থানীয় লোকেরা সাহায্য করত তাহলে মুসা শাহকে গ্রেফতার করা সম্ভব হতো। কিন্তু সরকারকে সাহায্য করার বদলে, ‘গ্রামবাসীরা এসব ক্ষেত্রে ফকিরদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং বিপদের কালে যা তাদের দায়িত্বে নিয়েছিল সেসব জিনিস নিরাপদ সময়কালে তাদের ফিরিয়ে দেয়।’ (মুর্শিদাবাদের কালেক্টরকে লেখা দিনাজপুরের কালেক্টরের পত্র, তাং ২রা জুন, ১৭৮৮)৭
এই ফকিরদের সম্পর্কে লর্ড মিন্টো ১৮১০ সালে বলেছিলেন, ‘তারা ফ্রেঞ্চ রিপাবলিকানদের ক্ষমতার ভিত্তির অনুরূপ ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল এবং বাস্তবে এমনকি সেই ফকির দলের সর্দার ও ক্যাপ্টেনদের সম্মান করে বলা হতো হাকিম বা শাসক দল। অন্যদিকে সরকার মানুষজনের ওপরে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারে কোনো কর্তৃত্ব বা প্রভাব খাটাতে পারত না। যদি সম্পূর্ণ গ্রামও ধ্বংস করার হতো, একজন মানুষও পাওয়া যেত না যে সেজন্য অভিযোগ জানাবে।৮ বিদ্রোহী ফকিরদের প্রতি কৃষকদের সক্রিয় সমর্থনের বিষয়ে এর চেয়ে জোরালো প্রমাণ পাওয়ার কথা ভাবা কঠিন হবে।
মজনু শাহ ১৭৮৭ সালের মার্চ অথবা মে মাসে তাঁর নিজ গ্রাম মাখনপুরে মৃত্যুবরণ করেন বলে কথিত আছে। আশ্চর্যের কিছু নেই যে, প্রায় এই সফরে কোম্পানি রাজ ব্রিটিশ দখলদার বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ বা ভর্তি করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় এবং এই নীতি তারা তাদের রাজত্বের প্রায় শেষ সময়কাল পর্যন্ত অনুসরণ করে।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে দ্বিতীয় ধর্মীয় আন্দোলন হচ্ছে ফরায়েজি আন্দোলন নামে পরিচিত আন্দোলন। এই আন্দোলন সৈয়দ আহমদ শহীদের জেহাদি কেন্দ্রগুলিতে তাঁর জীবিতকালে ও তার পরে ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত, অবাধ্যতামূলকভাবে জনশক্তি ও অর্থ সরবরাহ করা ছাড়াও, এই সময়ে, বাংলায় এর বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডের কারণে, ছিল ব্রিটিশ সরকারের প্রকৃত মাথাব্যথার কারণ। মূলত ইসলামকে সকল বেদাত থেকে মুক্ত করে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে এর প্রকৃত শুদ্ধতায় ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ কর্তৃক সূচিত এই আন্দোলন সূচনার প্রায় পরপরই স্থানীয় জমিদার, তালুকদার ও অন্যান্য কায়েমি স্বার্থবাদীর সঙ্গে হিংসাত্মক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। শেষোক্তরা যখন নিজেদের বিপদাপন্ন বোধ করে, তখন যথারীতি ব্রিটিশ সরকার তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে।
হাজী শরীয়তউল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ফরিদপুর জেলার পরগনা বন্ধুরখুল্লায় অজ্ঞাত পিতামাতার পুত্র হাজী শরীয়তউল্লাহর প্রথম জীবন সম্পর্কে আসলে তেমন কিছু জানা যায় না, শুধু এটুকু ছাড়া যে – ১৮ বছর বয়সে তিনি মক্কায় গিয়েছিলেন। একটি রিপোর্ট অনুসারে – তিনি আল-শাইখ-তাহির-আস সম্বল- আল মাক্কির নিকট শিক্ষালাভ করেছিলেন এবং প্রায় ২০ বছর অনুপস্থিত থাকার পর দেশে ফিরে এসেছিলেন।
‘ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে শরীয়তউল্লাহ বাংলায় ফিরে এসেছিলেন … কথিত আছে যে, দীর্ঘকাল মক্কায় অবস্থানকালে শরীয়তউল্লাহ ওয়াহাবীদের দ্বারা প্রভাবিত হন। তিনি যখন পবিত্র নগরীগুলিতে অবস্থান করছিলেন তখন ওয়াহাবীরা প্রথম যুগের ইসলাম থেকে সকল বিচ্যুতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশ্য শরীয়তউল্লাহর যে ওয়াহাবীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল বা তিনি তাদের মতবাদগুলির কোনো বিষয় পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলেন এমন প্রমাণ নেই। পক্ষান্তরে তিনি মদিনার এমন কিছু ধর্মীয় সাধকের শিষ্য ছিলেন যাঁরা ইতিপূর্বেই ধর্মত্যাগী হিসেবে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন …। তবে সম্ভাবনা থেকে যায় যে, ওয়াহাবীদের মধ্যে সংস্কারবাদীরা সম্ভবত তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর নিজের দেশে কমবেশি সেই নীতিতেই সংস্কার আন্দোলন শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
‘শরীয়তউল্লাহ তাঁর আন্দোলন শুরু করেছিলেন মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত কৃষক শ্রেণি ও কারিগর শ্রেণির মধ্যে – যাদের প্রতি এমনকি তাদের তুলনামূলকভাবে অধিক সৌভাগ্যবান স্বধর্মীয়রাও ছিল উদাসীন। … তাঁর সমবেদনা ও সহানুভূতি দিয়ে তিনি শিগগিরই গরিব রায়তদের হৃদয় জয় করে নিতে সমর্থ হলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই রায়তরা অনতিবিলম্বে তাদের অনৈসলামিক রীতিনীতি ও আচার-সংস্কার ত্যাগ করল এবং ‘ফরজ’ বা কর্তব্য নামে অভিহিত নির্দেশাবলি অনুযায়ী জীবনযাপন করতে শুরু করল। এ জন্যই তাঁর অনুসারীরা ফরায়েজি নামে পরিচিত হলেন।
‘শরীয়তউল্লাহ প্রথমত ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়াদি নিয়েই চিন্তাভাবনা করেছিলেন এবং তা ধর্মীয় আন্দোলন রূপেই পরিচালিত হয়েছিল।’৯
শরীয়তউল্লাহ প্রসঙ্গ এ পর্যন্তই। এই আন্দোলন সম্পূর্ণ ভিন্ন একদিকে মোড় নেয় তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী মোহাম্মদ মহসিন বা ব্যাপকভাবে পরিচিত দুদু মিয়া তাঁর জীবিতকালে যখন এই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সেই একই ইতিহাসবিদ লিখেছেন, ‘তাঁর বলিষ্ঠ ও অধিকতর উদ্যমশীল নেতৃত্বে ফরায়েজিরা অত্যন্ত সংগঠিত ও সুসংবদ্ধ এক দলে সংগঠিত হয় যার প্রধান ছিলেন দুদু মিয়া নিজে, যাঁকে বর্তমানে পীর বলা হয়ে থাকে। এটি ছিল তাঁর পিতার শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি। দুদু মিয়া পূর্ব বাংলাকে বিভিন্ন সার্কেল বা অঞ্চলে ভাগ করেন এবং প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন করে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন, যাদের দায়িত্ব ছিল অন্যদের নিজেদের বিশ্বাসে দীক্ষিত করা, নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলনকে সুসংহত করা ও আন্দোলনের লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা। শিগগিরই তাঁর মধ্যে ব্যতিক্রমী গুণাবলি প্রকাশ পায় এবং বাকেরগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর ও পাবনা জেলার মুসলমান কৃষক ও কারিগর শ্রেণির ওপর তাঁর বিশেষ প্রভাব পড়ে, যাদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি তাঁর সব সম্পদ কাজে লাগাতেন।
… ‘দুদু মিয়া তাঁর সবচেয়ে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ অবস্থান নিয়েছিলেন জমিদারদের বেআইনি সেস্ আরোপের বিরুদ্ধে। একজন মুসলমান প্রজা/রায়ত তার হিন্দু জমিদারের দুর্গা প্রতিমার অলঙ্করণের জন্য অথবা অন্য যে কোনো প্রকার পৌত্তলিক পূজার জন্য অর্থ প্রদানে বাধ্য থাকবে – এ ছিল অসহনীয় অত্যাচার। … তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন, যখন তিনি ঘোষণা দিলেন যে, এ দুনিয়ার সকল জমির মালিক আল্লাহ এবং উত্তরাধিকার হিসেবে তা অধিকার করার অথবা তার জন্য কর আরোপ করার কোনো অধিকার অন্য কারো নেই।’১০
স্বাভাবিকভাবেই জমিদাররা ও বড় বড় জমিদারির মালিকে পরিণত নীলকররা এতে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং দুদু মিয়ার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। কিন্তু নির্যাতন ও জুলুমবাজির ফলে আন্দোলনের উৎসাহ আরো বৃদ্ধি পায়। দুদু মিয়ার অনুসারী এবং জমিদার ও নীলকরদের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে অনেক সংঘর্ষ ও বিচ্ছিন্ন লড়াই হতে থাকে। জমিদার ও নীলকরদের তহসিলদার ও অন্যান্য কর আদায়কারীকে পালিয়ে যেতে হয়; জমিদারের কাছারি ও নীলকরদের কারখানা লুণ্ঠিত হয় এবং একটি ক্ষেত্রে নীলের কারখানার একজন কর্মচারী নিহত হয়। নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সম্পর্কে সরকারি দলিলে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘আমি আপনাকে নিশ্চয় জানাতে চাই যে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দিল্লির পর আমি অধিকতর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছি এবং সেই দিন থেকে আমার এই অনুভূতি হচ্ছে যে, একজন বেওকুফ নীলকরের রাগের কারণে বা ভয়ে ছোঁড়া বন্দুকের একটি গুলিও নিম্নবঙ্গের প্রতিটি কারখানায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।’১১
বাংলার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জে.পি. গ্রান্ট স্টিমারযোগে সিরাজগঞ্জ ভ্রমণ থেকে ফিরে লিখেছিলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য রায়ত ভিড় করেছিল এবং তাদের একমাত্র প্রার্থনা ছিল, সরকার যেন তাদের নীলের চাষ করতে হবে না এমন একটি আদেশ প্রদান করে। কয়েকদিন পর আমার ফেরার পথে সেই একই দুই নদীর উভয় তীরে, প্রায় ৬০ মাইল জুড়ে সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানুষ আর তাদের দাবি ছিল এ ব্যাপারে ন্যায়বিচারের। এমনকি নদী তীরবর্তী গ্রামগুলির মহিলারাও নিজেরাই সেখানে জড়ো হয়েছিল এবং নদীর দুপাশের অনেক দূরের গ্রামগুলি থেকে পুরুষেরাও এসেছিল ও দাঁড়িয়েছিল ছোট ছোট ভিড় করে সেখানে। আমি জানি না, ১৪ ঘণ্টা ধরে স্টিমারে ভ্রমণকালে আর কোনো ভারতীয় অফিসারের এরূপ তীর ধরে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভিড়ের এই দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছিল কিনা; তারা সবাই ছিল অত্যন্ত শান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের দাবির ব্যাপারে আন্তরিক। এমনটা ভাবা নিশ্চয়ই বোকামি হবে যে – হাজার হাজার মানুষ তথা পুরুষ, নারী ও শিশুদের এই উপস্থিতির কোনো অর্থ নেই। এই বিশাল বিক্ষোভের পেছনে সে সংগঠিত শক্তি ও তাদের ক্ষমতার যে প্রকাশ দেশজুড়ে ঘটেছিল তা নিশ্চয়ই বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে।’১২
‘সদয়’ ব্রিটিশ সরকার অবশ্য তাদের পদলেহীদের উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিল এবং দুদু মিয়াকে কারান্তরালে পাঠিয়েছিল; তবে তা করতে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল।
এই সময়কার সমপ্রকৃতির আরেকটি ধর্মীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মীর নিসার আলী – সাধারণভাবে যিনি পরিচিত ছিলেন বারাসতের তিতুমীর নামে – বারাসত এখন চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত। তিতুমীরের দুঃসাহসিক ও বীরত্বপূর্ণ কাজগুলি এখন আমাদের অত্যন্ত ভালোভাবে জানা এবং এগুলি সম্পর্কে পুনর্বার বলার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। ড. বারী তাঁর পূর্বোদ্ধৃত রচনাটিতে এগুলিকে ‘উল্লেখযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছিলেন; এসব কাজের পেছনে ‘কৃষকদের স্থিরসংকল্পবদ্ধ অভ্যুত্থানের জন্য – যে অভ্যুত্থানে তা রূপান্তরিত হয়েছিল নিজে নিজেই।’ তিতুমীর জমিদার ও অন্য কায়েমি স্বার্থবাদীদের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি এই ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ সরকার যথাসময়ে এগিয়ে এসেছিল শেষোক্তদের উদ্ধারের জন্য, তবে মানুষ, মালামাল ও মর্যাদার মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ব্যতীত তা সম্ভব হয়নি। তিতুমীর যুদ্ধ করেছিলেন সিংহের মতো এবং বেশ কয়েকবার তিনি জয়লাভও করেছিলেন। সর্বশেষ যুদ্ধে তিনি সম্মুখীন হন মেজর স্কট হার্ডিংয়ের অধীনস্থ নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে, যাদের সঙ্গে কামানও ছিল। তিতুমীর তাঁর বাঁশের কেল্লা থেকে বেরিয়ে আসেন অনুসারীদের নিয়ে এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই যুদ্ধে তিনি ও তাঁর ৫০ জন বীর সহযোদ্ধা শাহাদত বরণ করেন।
হাজী শরীয়তউল্লাহ, তাঁর পুত্র দুদু মিয়া এবং তিতুমীর প্রমুখের নেতৃত্বে সংঘটিত এসব কৃষক অভ্যুত্থান সম্পর্কে অধ্যয়ন একটি আকর্ষণীয় পাঠ। স্বাধীনতার এসব সাহসী যোদ্ধাকে ‘ওয়াহাবী’ নামে শ্রেণিচিহ্নিত করে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তাঁর বিখ্যাত বই The Indian Musalmans-এ লিখেছেন, ‘ওয়াহাবীরা তাদের নিজ দেশের লোকদের কাছ থেকে বিনা বাধায় সারা বাংলায় তাদের রাজনৈতিক প্রতারণাপূর্ণ যোগাযোগ-জাল প্রসারিত করতে পারেনি। এছাড়া ধর্মতত্ত্বভিত্তিক ঘৃণা ও বিদ্বেষ, ক্রিস্টানদের মতো, মুসলমানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যেভাবে জেগে উঠেছিল তার ফলে কোনো জেলায় ওয়াহাবীদের উপস্থিতি স্থায়ী হুমকি বলে গণ্য হতো হিন্দু-মুসলিম কিংবা ধনী বা কায়েমি স্বার্থবাদী নির্বিশেষে সবার কাছে। রাজনীতি ও ধর্মের ক্ষেত্রে একইভাবে বিপ্লবীরা তাঁদের কাজ করতেন লুথার অথবা ক্রমওয়েলের মতো সংস্কারবাদীর মতো নয়, বরং রোবসপিয়েরে অথবা অ্যান্টওয়ের্পের তাঞ্চেলিনের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ ধ্বংসকারীদের মতো। ইউট্রেকটের যাজক মহোদয় যেমন সর্বশেষ বিপদ দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন, তেমনি নিজের মসজিদ বা পথি-পার্শ্বের মাজার সংলগ্ন বারো একর জমির মালিক প্রত্যেক মুসলমান মৌলবী বিগত অর্ধশতাব্দী জুড়ে ওয়াহাবীদের দেখা পেলেই তীব্র চিৎকার করে আসছিলেন। … অন্যত্র যেমন তেমনি ভারতেও জমির মালিকদের ও যাজক/ পুরোহিত/ মোল্লা-মৌলবীদের স্বার্থ বাঁধা রয়েছে একই অভিন্ন সুতার বাঁধনে। ইংরেজ জমিদাররা সেভাবে তাদের প্রতিষ্ঠিত গির্জাগুলির স্বার্থ রক্ষা করে হুবহু সেভাবেই মুসলমান জমিদাররা তাদের মসজিদের স্বার্থ রক্ষা করে। যে-কোনো ধরনের অসন্তোষ, ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক যাই হোক না কেন, কায়েমি স্বার্থের পক্ষে বিপজ্জনক। উভয় ক্ষেত্রেই ভারতীয় ওয়াহাবীরা অত্যন্ত বেশি ভিন্নমতাবলম্বী; অ্যানাক্যাবটিস্টগণ, তথা পঞ্চম সাম্রাজ্যের ব্যক্তিগণ, রিপাবলিকান … ১৮৩১ সালে কলকাতার চারপাশে বর্তমান অভ্যুত্থানকালে তারা নিখুঁত নিরপেক্ষতার সঙ্গে মুসলমান ও হিন্দু জমিদারদের বাড়িঘরে আক্রমণ চালিয়েছিল। বস্তুত মুসলমান জমির মালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। … ১৫ বছর পরে সরকারি বিবরণীতে বলা হয় যে, ৮০ হাজার মানুষের এই সমাবেশ, যেখানে তারা নিজেদের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতা বজায় রেখেছিল কঠোরভাবে – সেখানে তারা এসেছিল নিম্নশ্রেণি থেকে পৃথিবীর যে-কোনো ভূম্যধিকারীকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিতে পারত।১৩
আমি কেবল এটুকু আশা করতে পারি যে, ড. হান্টার, যাঁকে তাঁর মুসলমান ভক্তগণের কেউই, আমার জানা মতে, কমিউনিস্ট বা অনুরূপ মতের পথিক বলবেন না, যদি এখন বেঁচে থাকতেন তাহলে এমনকি তাঁর সে-বই লেখার শত বছর পরেও, দেখতে পেতেন – তিনি যাদের জমিদার-ভদ্রলোক বলেছেন, সেই নিজস্ব মসজিদের সঙ্গে বারো একর সংযুক্ত মুসলমান মৌলবীরা এবং তাদের নবাগত সহযাত্রী পুঁজিপতিরা ‘ইসলাম-পসন্দ’ লেবাস গায়ে চড়িয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ভাসানী এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সম্ভবত হাজারভীর নেতৃত্বাধীন স্বধর্মীয়দের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে। তবে এক্ষণে আমার মন্তব্য কেবল এ পর্যন্ত; কারণ আমাকে আবার আমার রচনার বিষয়ের যথার্থ স্থানে ফিরতে হবে।
আমি এখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের কয়েকটি ঘটনার কথা বলব এবং সেগুলি বিশ্লেষণ করব। অল বেঙ্গল প্রজা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে। এর পূর্ববর্তী বছরে অর্থাৎ ১৯২৮ সালে কলকাতায় মুসলিম লীগ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস
এই উভয় প্রতিষ্ঠানেরই বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আশা করা গিয়েছিল যে, প্রয়াত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বেঙ্গল প্যাক্টের নীতিমালা নিয়ে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে একটি সমঝোতা হবে। কিন্তু বরাবরের মতো কংগ্রেসের অনমনীয়তার কারণে সে-প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায়। এই ঘটনা সম্পর্কে ডা. বি. সি. রায়ের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ বিষয়ে স্যার আবদুর রহমানের মন্তব্য পুনরায় তুলে ধরার উপযুক্ত বলে মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখুন ডা. রায়, আপনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, আপনারা হিন্দুদের কেবল একজন শত্রু রয়েছে, আপনাদের লড়াই করতে হচ্ছে শুধু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, অথচ আমরা মুসলমানদের লড়াই করতে হচ্ছে তিন শত্রুর বিরুদ্ধে : সামনে ব্রিটিশ, ডানে হিন্দু এবং বাঁয়ে মোল্লাদের বিরুদ্ধে।১৪ এই ফাটল সম্পূর্ণ হয় যখন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির (বঙ্গীয় আইনসভা) কংগ্রেস দলীয় সকল সদস্য একযোগে ১৯২৮ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন (বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যাক্ট) সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেন।
এর ফলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমঝোতাপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সকল আশা অন্তর্হিত হয়। এতে অসন্তুষ্ট মুসলমানরা একত্রে বসে সারা বাংলা বঙ্গীয় প্রজা সমিতি (All Bengal Proja Samity) গঠন করেন স্যার আবদুর রহিমের সভাপতিত্বে। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁকে এর সম্পাদক করা হয়। সংগঠনটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রজাদের, যাদের গরিষ্ঠসংখ্যক মুসলমান, অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং সেই সঙ্গে তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ আদায়। এর নাম যেমনটি নির্দেশ করে সেরূপ এটিই যদিও ছিল বাংলার মুসলমান প্রজাদের প্রথম সংগঠন, তবে এর ভবিতব্য ছিল শিগগিরই বিলুপ্তি ঘটা। প্রজা বলতে বোঝায় খাজনা প্রদান করে এমন একজন ব্যক্তি। এ-সংগঠনে মুসলমান জমিদার ও তালুকদারদের ঢুকে পড়ার ফাঁক-ফোকর অবশ্য ছিল; যেহেতু তারাও তাদের ভূসম্পত্তির জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে খাজনা প্রদান করত। কিন্তু যা ঘটার তা ঘটছিল নিজস্ব নিয়মেই এবং অনতিবিলম্বে (১৯৩০-৩১) প্রকৃত কৃষকেরা অথবা জমির আসল চাষিরা (মুসলিম) মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইল মহকুমার, বর্তমানে যা জেলা, জমিদারদের সংগঠিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। দেলদুয়ারের গযনবী এবং ধনবাড়ির মীররা সন্তোষের মহারাজাকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেন এবং তাদের সম্মিলিত শক্তি রক্ষক ব্রিটিশ সরকারের মাধ্যমে মওলানা ভাসানীকে শুধু ময়মনসিংহ জেলা থেকে নয়, বরং পার্শ্ববর্তী পাবনা জেলা থেকেও বহিষ্কার করে। মওলানা ভাসানীকে আসামে গিয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু তিনি সেখানে অলস হয়ে থাকলেন না। ১৯৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরাজগঞ্জে বাংলার ইতিহাসে তখনো পর্যন্ত অজানা এরূপ বৃহৎ প্রথম কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করেন মওলানা ভাসানী। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বর্তমানে প্রয়াত খান বাহাদুর আবদুল মুমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রায় এক লাখ চাষির এ-সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও বক্তৃতা করেন। বস্তুত জনাব সোহরাওয়ার্দী সম্মেলন উদ্বোধনও করেন। সব দিক বিচারে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক সম্মেলন। অন্যান্য প্রস্তাবের সঙ্গে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ, মহাজনদের সুদ নিয়ন্ত্রণ, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বিলোপ এবং কৃষি ঋণদাতাদের ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বিলম্বনাধিকারের প্রস্তাবও সম্মেলনে গৃহীত হয়।১৫ এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাংলার অন্যান্য সমসাময়িক মুসলিম নেতার মতো ভূসম্পত্তিতে জনাব সোহরাওয়ার্দীর কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণির প্রলেতারিয়েত বনে-যাওয়া বুদ্ধিজীবী। এই সম্মেলনের অনতিকাল পরে ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমায় আরেকটি গুরুতর ঘটনা সংঘটিত হয়। সংগঠিত কৃষকরা স্থানীয় একজন হিন্দু মহাজন-জমিদারের বাড়ি আক্রমণ করে সেটি জ্বালিয়ে দেয়। এই ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত হয়নি। এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই সাম্প্রদায়িকতার রূপ নেয় এবং ময়মনসিংহ জেলার জমিদাররা এই ঘটনায় গফরগাঁওয়ের একজন স্থানীয় পীর ও সক্রিয় প্রজা কর্মী মওলানা শামসুল হুদাকে জড়িত করে অভিযোগ করেন। এসব ঘটনা অবশ্যই নিশ্চিতভাবে ইঙ্গিত দেয় বাতাস কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছিল। ১৯৩৩ সালে ঝুঁকিরহিত ঋণের জন্য ১৫% ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের জন্য ২৫% সুদ ধার্য করে বেঙ্গল মানি লেন্ডারস বিল গৃহীত হয়। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের হার ১০%-এর মধ্যে সীমিত করে দেওয়া হয়। এছাড়াও এতে সংযুক্ত করা হয় যে, ‘কোনো আদালত এই আইন জারি হইবার পর কোনো ঋণের ক্ষেত্রে আমলের পরিমাণ হইতে অধিক পরিমাণ সুদ প্রদেয় বলিয়া রায় প্রদান করিতে পারিবেন না।’ ১৯৩৬ সালে, ১৯৩৫ সালের শাসনতন্ত্রের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক বছর পূর্বে, বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস অ্যাক্ট অনুমোদিত হয়। উক্ত অ্যাক্টের প্রস্তাবনা অংশে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যেহেতু কৃষিঋণ-গ্রহীতাদের ঋণগ্রস্ততার উপশম এবং কৃষিঋণ-গ্রহীতা ও তাহাদের উত্তমর্ণদিগের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী আইনের সংশোধন জরুরি বিবেচিত হইতেছে’ ইত্যাদি এবং ব্যক্তির ঋণ যাতে মূল ঋণের দ্বিগুণের অধিক না হয় সে বিষয়ে অনুসন্ধান ও তাহা নির্ধারণের জন্য ঋণ সালিশি বোর্ডসমূহ (Debt Settlement Boards) স্থাপনের ক্ষমতা সরকারকে প্রদত্ত হয়েছে। এই আইনে সহজ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রহীতাদের ২০ বছর সময়ও দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জমির স্বত্বাধিকার বন্ধকমুক্ত করা। অন্যভাবে বলা যায় যে, গৃহীত ব্যবস্থা ছিল বিলম্বনাধিকার ২০ বছর নির্ধারণ। কায়েমি স্বার্থের অধিকারী বর্ণহিন্দুরা প্রাদেশিক আইন পরিষদে প্রাণপণে এর বিরোধিতা করে, কিন্তু আইন-বহিতে এর অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করতে তারা পারেনি। এই আইনটিকে বাস্তবে রূপদান করলেন জনাব এ. কে. ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে এবং প্রায় রাতারাতি বাংলার কৃষকদের মুকুটহীন রাজা হয়ে গেলেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জনাব এ. কে. ফজলুল হক নিজেও ছিলেন একজন ক্ষুদ্র জমিদার এবং অত্যন্ত অভিজাত পরিবারের সন্তান। কিন্তু সারাজীবন তিনি বাংলার কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন এবং যখনই তারা কুলকাঠি ও রায়পুরা এবং অন্যান্য আরো বহু জায়গার মতো আইনি বিপদে পড়েছে তখনই তিনি ফিস নিয়ে বা ফিস না নিয়ে তাদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়েছেন।
এর আগে, ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক পূর্বে জনাব এ. কে. ফজলুল হক তাঁর তৎকালীন অনুসারীদের, যাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সর্বজনাব আবুল মনসুর আহমদ ও শামসুদ্দীন আহমদ, সহায়তায় তহবিলশূন্য অবস্থায় প্রায় বিলুপ্ত অবস্থা থেকে এবং মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও প্রজা পার্টির অন্যদের বিরোধিতার মুখে কৃষক প্রজা পার্টি নামে একটি নতুন দল গঠন করেন, যার নামই এই ইঙ্গিত দেয় যে – এটি নিশ্চিতভাবে ১৯২৮ সালের প্রজা পার্টি থেকে এক ধাপ অগ্রগতি। জনাব ফজলুল হকের এই নতুন দলের বিরুদ্ধে বাংলার ছোট-বড় সব মুসলমান জমিদার ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির ব্যানারে অবস্থান নেয় ও প্রচুর টাকা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। কিন্তু ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির ৩৮টি আসনে জয়লাভের বিপরীতে জনাব ফজলুল হকের দল ৪৩টি আসনে জয়লাভ করে। মরহুম স্যার খাজা নাজিমুদ্দীন ৭০ হাজার টাকা ও সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে (তিনি সে-সময় দ্বৈতশাসন প্রক্রিয়ার অধীনে একজন মন্ত্রী ছিলেন) পটুয়াখালিতে পেলেন তাঁর ওয়াটারলু। কিন্তু উদারহৃদয় বিজয়ী ফজলুল হক, মি. জিন্নাহর পরামর্শক্রমে, তাঁর পূর্বের শত্রুদের নিজের পকেটে নিয়ে নিলেন এবং মন্ত্রিসভা গঠন করলেন তাঁর প্রজা পার্টির মাত্র দুজন সহকর্মীকে তাতে অন্তর্ভুক্ত করে। মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেলেন তথাকথিত ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির লোকজন এবং তফসিলী সম্প্রদায়ের কয়েকজন, যাঁরা নির্বাচনকালে তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি সহজেই কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশন করতে পারতেন এবং সমাজকল্যাণের সংস্কারবাদী কর্মসূচির প্রতি কংগ্রেস উদার মনোভাব দেখালে জনাব ফজলুল হক বাংলায় তাঁর নিজের পথে চলতে পারতেন। ইতিহাসের সেই সংকটময় মুহূর্তে জনাব ফজলুল হকের উদারতা ও নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি ভালোবাসা অথবা, বলা উচিত কি না তা জানি না, রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণ না ঘটলে বাংলায় মুসলিম লীগের অস্তিত্ব থাকত না। তথাকথিত ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির নওয়াব-নাইটরা কখনো এই পার্টিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হতেন না, যেহেতু দারিদ্র্যপীড়িত মুসলমান কৃষকদের সঙ্গে তাঁদের কোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ ছিল না। বাস্তবে, তাঁরা বরাবরই গরিব মুসলমান কৃষকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছিলেন এবং কখনো কখনো, হান্টার যা ইঙ্গিত বা নির্দেশ করেছেন সেরূপ নির্লজ্জতায় হিন্দুদের ও বিদেশি কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। বাংলার কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত এই অধ্যায়টির সমাপ্তি টানার আগে আমাকে অবশ্যই বলতে হবে এবং এটি আমার দৃঢ় অভিমত যে, প্রদেশে এরপর মুসলিম লীগ যে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছিল তা পূর্বেকার কৃষক আন্দোলনেরই প্রত্যক্ষ ফল। অর্থনৈতিক দাসত্বের শিকল ভাঙার মনোভাব আগে থেকেই সেখানে ছিল। সেখানে একটি সংগঠনের কেন্দ্রবিন্দুও অবস্থিত ছিল। জনাব ফজলুল হক শুধু নামটি কৃষক প্রজা পার্টি থেকে মুসলিম লীগে পরিবর্তিত করেছিলেন। এবং লীগে তাঁর উত্তরসূরিরা যথা সর্বজনাব সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও অন্যরা কেবল সাধারণ মানুষদের এবং তাদের সন্তানদের – অর্থাৎ শহরবাসী কেরানি, পিয়ন ও ছাত্রদের জ্বলন্ত অনুভূতিরই সুযোগ নিয়েছিলেন। এ-কথা বলা সত্যের বিকৃতি করা হবে যে, বাংলার মুসলমানরা তাঁদের ধর্মীয় চারিত্র্যের কারণেই মুসলিম লীগের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। বস্তুত এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বাংলার ক্ষেত্রে মুসলিম লীগই ছিল অর্থনৈতিকভাবে শোষিত ও রাজনৈতিকভাবে দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ মুসলমানদের একমাত্র মুখপাত্র।
বাঙালি মুসলমানরা অর্থনৈতিক বিষয়হীন কোনো রাজনৈতিক আহ্বানের প্রতি কখনো সাড়া দেয়নি। বস্তুত বাংলায় দেশবিভাগপূর্ব মুসলিম লীগ ছিল বিত্তশালীদের বিরুদ্ধে বিত্তহীনদের একটি শ্রেণি-সংগঠন। একে যে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়া যায় বা কখনো কখনো এটি তা গ্রহণ করত তার কারণ ছিল বিত্তশালী ও বিত্তহীনদের মধ্যে বিভাজন, ঐতিহাসিক কারণে যা সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে।
এখন আমরা বাংলার প্রজাস্বত্ব প্রবিধিসমূহ তথা কৃষক আন্দোলনের ক্রমোত্তরণ পরীক্ষা করে দেখব। ইতোমধ্যে যেমন বলা হয়েছে, কৃষক আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের সূচনা ঘটে ১৭৬০ সালের দিকে, সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে লর্ড ক্লাইভের বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ইত্যাদির দেওয়ানি লাভের পাঁচ বছর পূর্বে এবং এর সমাপ্তি ঘটে ১৮০০ সালের দিকে, ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের অবসান ঘটার পর। ১৭৮৯ সালের পূর্বে, ভূমি রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট বিধি ও প্রবিধি ছিল না। মুসলিম শাসনামলে জমিদাররা জমির মালিক ছিলেন না। আধুনিক পরিভাষা অনুযায়ী তাঁরা ছিলেন নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য ঠিকাদার। এই নিয়ম কর্নওয়ালিসের সময়কাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। লর্ড কর্নওয়ালিসই প্রথম জমিদারদের সঙ্গে দশ বছরমেয়াদি চুক্তি করেন। এর সময়কাল ছিল ১৭৮৯-১৭৯০। এ-সময়ে প্রচারিত ঘোষণায় জমির মালিকদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, সম্পাদিত বন্দোবস্ত স্থায়ী করা হতে পারে দশ বছর সময়কাল শেষ হওয়ার পর। কিন্তু দশ বছর সময়কাল শেষ হওয়ার আগেই ১৭৯৩ সালের বেঙ্গল রেগুলেশন নং-১ আইনটি প্রণীত ও ১-৫-৯৩ তারিখ থেকে বলবৎ হয়। এটি পরিচিতি পায় বেঙ্গল পার্লামেন্ট সেটেলমেন্ট রেগুলেশন নামে। এ-আইনে জমিদারদের জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় এবং চিরস্থায়ী জমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তবে তা এই শর্তাধীনে যে, ‘কাউন্সিলে গভর্নর জেনারেল, যখন তিনি যথার্থ মনে করবেন, নির্ভরশীল তালুকদার, রায়ত ও ভূমির অন্যান্য চাষীর সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য তিনি যা প্রয়োজন মনে করবেন সেইরূপ প্রবিধিসমূহ প্রণয়ন করতে পারবেন …।’ এই দফার (অনুচ্ছেদ ৮) উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে ‘সব শ্রেণির লোক এবং বিশেষ করে যারা তাদের পরিস্থিতির কারণেই অসহায় তাদের রক্ষার জন্য শাসক শক্তির কর্তব্য …’ সম্পন্ন করতে সমর্থ করা।
এই বিশেষাধিকার রাখা ছাড়াও, কর্নওয়ালিস সরকার জমিদার ও স্বাধীন তালুকদারদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুলিশ স্থাপনাও প্রত্যাহার করে নেয়, যে-স্থাপনার জন্য তখনো পর্যন্ত তাদের অতিরিক্ত ভাতা প্রদান করা হতো। পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়।
কিন্তু এমনকি যে কালি দ্বারা উপর্যুক্ত বিধিবদ্ধকৃত আইন লেখা হয়েছিল সে-কালি শুকানোর আগেই সরকার ১৭৯৩ সালের প্রবিধি ৮ প্রণয়ন করে, যে প্রবিধিতে আবওয়াব, মাথট ও অন্যান্য নামে রায়তদের ওপর আরোপিত ‘আর্থিক দায়’ নিষিদ্ধ করা হয়। এসব দায় সেগুলির ‘সংখ্যা ও অনিশ্চয়তার কারণে সমন্বয় করা দুষ্কর এবং রায়তদের ওপর নির্যাতনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল …।’ অতএব ‘জমির সকল মালিককে’ নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ‘তাঁরা এইসব প্রাপ্য রায়তদের সহযোগে আদায় করবেন এবং তার সবটাই ‘আসল’-এর সঙ্গে একটি বিশেষ পরিমাণ হিসেবে জমা করবেন।’ এই প্রবিধিতে বিনির্দিষ্টভাবে জমিদারদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করা হয় – তারা যেন বাংলা ১১৯৮ সন শেষ হওয়ার পূর্বেই সকল দাবি বিনির্দিষ্ট করে রায়তদের পাট্টা প্রদান করে। অতঃপর কৃত সকল বৃদ্ধি বর্ধিত পরিমাণের তিনগুণ পরিমাণ জরিমানা ধার্য করত শাস্তিযোগ্য বলে বলা হয়।
উপর্যুক্ত দুটি প্রজাস্বত্ব প্রবিধির (Tenancy Regulations) সঙ্গে ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের সমকালীনতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এটা বুঝতে বেশি জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও পরবর্তী প্রবিধিগুলিও ছিল –
১. জমিদারগণকে সাধারণ মানুষের সামন্ত প্রভু হিসেবে স্থায়ী মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে বিদেশি সরকারের জন্য সামাজিক ভিত তৈরি করা,
২. চাষিদের কাছ থেকে সকল খাজনা আদায়ে তাদের ক্ষমতা প্রদান করা, এবং
৩. সুনির্ধারিত এলাকাসমূহের মধ্যে তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ।
এক হাতে জমিদারদের হাতে আপাতদৃষ্টিতে সকল ক্ষমতা প্রদান করে ও অপর হাতে জমিদার-রায়তের সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি বিষয় নিয়ন্ত্রণের বিশেষাধিকার রেখে দিয়ে সরকার উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে চেয়েছিল। এখানে উল্লেখ করা উচিত হবে যে, উপর্যুক্ত দুটি প্রবিধি অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ১৭৯৩ সালের প্রবিধি নং ৮ ছিল অবশ্যই জমিদারদের নির্যাতন নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার ব্যাপারে এক ধাপ অগ্রসরমূলক একটি পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, সেই সময়কার পরিপূর্ণ বিশৃঙ্খলার মধ্যে এগুলি ছিল শৃঙ্খলা আনয়নের পথে সহায়ক হাতিয়ার। আমার মতে, এ-কথা বলা নিশ্চয় অতিশয়োক্তি হবে না যে, উপরিউক্ত দুটি আইনেরই প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।
এখন আমরা জমিদার-রায়ত সম্পর্কের সঙ্গে ফরায়েজি আন্দোলনের সম্পর্ক বিষয়ে দ্বিতীয় সুদূরপ্রসারী ভূমি প্রবিধির তুলনা করে দেখব। ফরায়েজি আন্দোলন শুরু হয় ১৮৩০ সালের দিকে এবং ১৮৭২ সালের দিকে তা প্রশমিত হয় যখন এই আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে বহুসংখ্যক রাষ্ট্রীয় মামলা দায়ের করা হয়।
ইতিপূর্বে যেমন আলোচনা করা হয়েছে – ফরায়েজি ও তিতুমীরের অনুসারীরা জমির মালিক আল্লাহ বলে ঘোষণা দিয়ে জমির খাজনা ও সকল প্রকার আবওয়াব পরিশোধ বন্ধ করে দিয়েছিল বা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল নীলকরদের বিরুদ্ধেও যারা নীল চাষ করতে চুক্তিবদ্ধ হতে চাষীদের বাধ্য করছিল। সরকার প্রায় বিদ্রোহ করতে যাওয়া রায়তদের শান্ত করার জন্য দুটি সুদূরপ্রসারী ভূমি প্রবিধি নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, যেমন – ১৮৫৯ সালের বেঙ্গল রেন্ট অ্যাক্ট (বঙ্গীয় খাজনা আইন) ও ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যাক্ট (বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন)। ১৮৫৯ সালের বেঙ্গল রেন্ট অ্যাক্টের প্রস্তাবনা অংশে বলা হয়, ‘যেহেতু পাট্টা প্রদান ও জমির দখল, খাজনার দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত অবৈধ ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আদায় ও এতদ্সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে রায়তদের অধিকার বিষয়ে আইন পুনঃপ্রণয়ন জরুরি … সেহেতু উক্ত আইন নিম্নরূপে প্রণীত হলো …।’
এই আইন প্রণীত হওয়ার ফলে রায়তগণ তাদের অধিকারভুক্ত বা চাষের অধীন জমির জন্য যে ব্যক্তিকে খাজনা প্রদান করবে সে ব্যক্তির কাছ থেকে নিম্নোক্ত বিবরণাদিসহ পাট্টা পাওয়ার অধিকার লাভ করবে : ১. জমির পরিমাণ, ২. বার্ষিক খাজনার পরিমাণ, ৩. যে কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে হবে এবং ইজারার কোনো বিশেষ শর্ত, ৪. যদি খাজনা দ্রব্যের আকারে প্রদেয় হয় তবে উৎপাদিত দ্রব্যের অনুপাত … এবং সময় ও তা সরবরাহ করার পদ্ধতি।’
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকে নির্ধারিত খাজনার হারসমূহ অনুযায়ী যেসব রায়ত জমির অধিকার ভোগ করে আসছে তারাও সেইসব হারে পাট্টা লাভ করার অধিকার লাভ করবে। মামলা শুরুর পূর্বে বিশ বছর সময়কালকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সূচনার কাল বলে গণ্য করা হয়।
যেসব রায়ত বারো বছর ধরে কোনো জমি চাষ করেছে বা তাদের নিজেদের দখলে ছিল তাদের অনুরূপভাবে চাষকৃত বা দখলে রাখা জমির দখলস্বত্ব দেওয়া হয়, পাট্টা থাক বা না থাক যাই হোক না কেন, যতদিন তারা আইন অনুযায়ী প্রদেয় খাজনা পরিশোধ করবে। এই আইনে জমির দখলস্বত্বধারীদেরকে উত্তরাধিকারের অধিকারও প্রদান করা হয়। পাট্টায় নির্দিষ্ট পরিমাণের অধিক অর্থ আবওয়াব হিসেবে বা অন্য কোনো বাহানায় আদায় বা পরিশোধিত অর্থের রসিদ প্রদান না করা এভাবে আদায়কৃত অর্থের দ্বিগুণ পরিমাণ জরিমানা ধার্য করে শাস্তিযোগ্য করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে ‘ইতিপূর্বে তাদের প্রজাদেরকে খাজনার সমন্বয় বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হাজিরা দেওয়ার ব্যাপারে জমিদার ও জমির অধিকারীদের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তা প্রত্যাহার করা হয়।’ এছাড়াও ‘প্রজা বা রায়তদের অবৈধভাবে আটকে রাখা বা অন্যান্য প্রকার উৎপীড়ন’ বেআইনি করা হয় এবং এই আইন ভঙ্গ করা ‘অনুরূপ বল প্রয়োগের মাধ্যমে আহত করার জন্য অনধিক ২০০/- টাকা’ ক্ষতিপূরণ আদায়মূলক শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষিত হয়। রায়তদেরও জমি ছেড়ে দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়।
এই প্রবিধি জমিদার-রায়ত সম্পর্কের ব্যবস্থার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত না হওয়ায়, সরকার অবশেষে এগিয়ে এলো ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যাক্ট নিয়ে, যা সময়ে সময়ে প্রণীত সংশোধনীসহ বলবৎ ছিল ১৯৫১ সাল পর্যন্ত। এটি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা। এতে প্রজাদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয় এবং সবাইকে ভোগদখলের স্থায়িত্ব, নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে স্বত্ব হস্তান্তর – এই শর্তে, নিবন্ধন ফিস ও জমিদারের ফিস যথাক্রমে কমপক্ষে এক টাকা ও অনধিক একশ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে; চারা রোপণের অধিকার; নিজ দখলি সম্পত্তির ফুল, ফল ও অন্যান্য উৎপাদ ভোগ করার; জমিতে অবস্থিত যে-কোনো গাছ কাটার ও সেই কাঠ ব্যবহারের বা বিক্রি/ হস্তান্তর করার; নির্দিষ্ট অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রদান করা হয়। এই আইনে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী ব্যতীত জমিদার কর্তৃক রায়তকে তার জমি থেকে উচ্ছেদ করা রহিত করা হয়। আইনটির অধীনে বারো বছর ধরে জমির দখলে থাকা প্রজাকে স্থায়ী রায়ত গণ্য করা হবে বলে বলা হয়। দখলস্বত্বধারী রায়তরা জমিতে চাষাবাদ, জমির ফুল, ফল ও অন্যান্য উৎপাদিত দ্রব্য ভোগ এবং অনুরূপ জমিতে যে-কোনো গাছ কাটার অধিকার ভোগ করতে পারবে। জমি প্রজাস্বত্বের অনুপযোগী করার জন্য এবং আইনের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে উৎখাতের আইনি নির্দেশ ব্যতীত কোনো প্রজাকে উৎখাত করা যাবে না বলেও এই আইনে বলা হয়। নির্দিষ্ট হারে খাজনা পরিশোধকারী রায়তকে ভূমিস্বত্ব ছাড়াও, দখলস্বত্বধারী রায়তকে তার নিজের জমির উত্তরাধিকার ও জমি হস্তান্তরের অধিকারও প্রদান করা হয়। স্থায়ী ভোগদখলকারী, নির্দিষ্ট খাজনার হারে খাজনা প্রদানকারী রায়তদের, অথবা জমির দখলে থাকা রায়তদের বকেয়া খাজনার দায়ে উচ্ছেদ করা যাবে না। কিন্তু আদালতের রায় বাস্তবায়নের জন্য এই দখলি সম্পত্তি বিক্রয় করা যাবে। আবওয়াব ও মাথট এবং সেই সঙ্গে ১৭৮০ সালের সেস্ আইনের ৪১ ধারা অনুযায়ী প্রদেয় নিট পরিমাণের অতিরিক্ত রোড সেস্ ও গণপূর্ত সেস্ ইত্যাদি বেআইনি ঘোষিত হয়। প্রজাদেরকে কৃষিকাজের জন্য অথবা পানি পান করার জন্য দেয়াল নির্মাণ, পুকুর খনন, পানির প্রবাহপথ নির্মাণ ও অন্যান্য পূর্ত কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। তাদেরকে কাঠ, ইট, পাথর বা অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে বাসগৃহ নির্মাণের অনুমতিও দেওয়া হয়। এ-ধরনের কাজ, আইনটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জমির উন্নয়ন বলে বিবেচিত হওয়া আবশ্যক। যদি অনুরূপ উন্নয়ন জমিদার তাঁর নিজ খরচে করে থাকেন, তাহলে তাঁকে টাকাপ্রতি দুই আনার অনধিক খাজনা বৃদ্ধি করতে দেওয়া হয়। দখলস্বত্বধারী প্রজার ভূসম্পত্তি উৎপাদিত ফসলাদি ক্রোক বা ক্রোক করার চেষ্টা বেআইনি ও ফৌজদারি অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশের সমতুল্য বলে ঘোষণা করা হয়।
আইনের কয়েকটি ত্রুটি অপসারণের উদ্দেশ্যে ১৯০৩ সালে এই ঘোষণা দিয়ে আইনটি সংশোধন করা হয় যে, জমিদারের ফিস পরিশোধ করা হয় নাই শুধু এই কারণে প্রজাস্বত্বের হস্তান্তর অবৈধ হয়ে যাবে না।
১৯২৮ সালে বাকি খাজনা বা মূল্যের দায়ে মাল ক্রোক সম্পর্কিত সকল অংশ যথা, ১২১-১৪২ অনুচ্ছেদ বাতিল করার মাধ্যমে ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যাক্ট কঠোরভাবে সংশোধন করা হয়। এখানে স্মরণ করা যেতে পার যে, এই বছরই স্যার আবদুর রহিমের সভাপতিত্বে মওলানা আকরম খাঁকে সম্পাদক করে প্রজা পার্টি গঠিত হয়। ১৯৩৮ সালে জনাব এ. কে. ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা আরো কঠোরভাবে আইনটি সংশোধন করে। এই সংশোধনীর দ্বারা জমি হস্তান্তর বাবদ জমিদারের ফিস ও জমিদারের অগ্রক্রয়াধিকার সম্পূর্ণভাবে অবলুপ্ত করা হয়। এই সময়ে রাজস্বমন্ত্রী ছিলেন একজন বড় জমিদার স্যার বি. পি. সিংহ রায়। এ-সম্পর্কিত তাঁর উদ্বোধনী বক্তৃতা ছিল একটি করুণ পাঠ। তিনি বলেন, ‘বিলটির গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলির মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে জমিদারদের হস্তান্তর ফিস ও অগ্রক্রয়াধিকার বিলোপ। ব্যক্তিগতভাবে আমি বেশি চাইতাম রায়তদের আর্থিক স্বস্তি প্রদানের সোনালি উপায় হিসেবে হস্তান্তর ফিস-এর পূর্ণ বিলুপ্তির পরিবর্তে জমিদারদের প্রাপ্য ফিস হ্রাসকরণের ভিত্তিতে একটি সমঝোতা, কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে যতদূর জানতে পারা গেছে – প্রজাদের প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাবের প্রতি অনুকূল সাড়া প্রদান করেননি। এই প্রস্তাব জমিদারদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে বড় ধরনের স্বার্থত্যাগ, যেহেতু তাঁরা এমনকি বর্তমান বাজারের হিসাবেও বছরে ৩০-৩৬ লাখ টাকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবেন। এ-কথা অস্বীকার করা কঠিন হবে যে, এসব প্রস্তাবে জমিদারদের অধিকার-হানির বিষয়টি নীতিগতভাবে সম্পর্কিত।’ এ-বিষয়টি স্মরণ করা আকর্ষণীয় ব্যাপার হবে যে, মাত্র দু-বছর আগে প্রণীত ও বলবৎকৃত বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটর অ্যাক্ট দ্বারা বাস্তবে ছিল সকল প্রকার
কৃষিঋণের ক্ষেত্রে বিলম্বনাধিকার। এর গ্রন্থিমোচন ঘটে ১৯৫১ সালে। পূর্ববঙ্গ সরকার ১৯৫১ সালের ২৮ সংখ্যক আইনবলে ১৮৮৫ সালের টেনেন্সি অ্যাক্ট রহিত করে এবং জমিদারি ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটায়। এই ক্রমোন্নতিকে অবশ্যই বিচার করতে হবে সমাজের ক্রমিক রূপান্তর এবং আইনগত ও ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য জনগণের ক্রমবর্ধিত দাবির সঙ্গে মিলিয়ে। ১৮৮৫ সালের টেনেন্সি অ্যাক্ট যেমন ছিল ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলনের দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ক্রমসমূহের উপশম ঘটানোর শেষ পরিণতি, তেমনি কথিত টেনেন্সি অ্যাক্টের পরবর্তী সকল প্রধান প্রধান সংশোধনী থেকে শুরু করে ১৯৫১ সালের চ‚ড়ান্ত রহিতকরণ ছিল কখনো ক্ষুদ্র জমিদার ও পাতি বুর্জোয়াদের
নেতৃত্বে এবং কখনো মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ময়মনসিংহের পাচভাগের মওলানা শামসুল হুদা ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতার নেতৃত্বে বাংলার কৃষকদের দ্বারা সৃষ্ট ক্রমাগত চাপেরই চূড়ান্ত ফসল। জমিদারি বিলোপসাধন, মহাজনদের সুদ নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিঋণ আদায়ে বিলম্বনাধিকারের দাবি প্রথম উচ্চারিত হয় ১৯৩২ সালে অনুষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের কৃষক সম্মেলনে, যা মওলানার বিরোধী প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদের১৬ মতে ছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একক প্রচেষ্টাসমূহের পরিণতি। সেই সময়ে কেউই মওলানা ভাসানীকে কমিউনিস্ট বলেননি এবং সিরাজগঞ্জের সমাবেশকে কমিউনিস্টদের বা কমিউনিস্টদের দ্বারা আয়োজিত সমাবেশ বলেননি। বস্তুত কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ড ছিল সেই সময়ে ভ্রূণ পর্যায়ে। ১৯৩২ থেকে ১৯৫২, যে-বছর জমিদারি প্রথা অবলুপ্তির আইনটি বাস্তবে বলবৎ করা হয় – সে মাত্র ২০ বছর সময়। এই উত্তরণের গতি এবং সাফল্যের পরিমাণ, স্বীকার করতে হয়, অনেক বড় এবং তা এ প্রসঙ্গে ফরাসি বিপ্লবের কথা স্মরণ করতে বাধ্য করে।
আমার কিছু পাঠক, বিশেষত পরিশীলিত পণ্ডিতরা, এ-ধরনের তুলনায় সম্ভবত সুখী হবেন না। ফরাসি বিপ্লবের গুরুত্ব এত বিরাট, এর সফলতা এত মর্মান্তিক ও এর প্রভাব এত সুদূরপ্রসারী ও চিরন্তন যে, শেষ পর্যায়ে সার্বিক অবলোপনসহ বাংলার জমিদার-রায়ত সম্পর্কের বিবর্তন-প্রক্রিয়া অত্যন্ত সাধারণ তুলনা বলে মনে হবে, যদি উদ্ভট বলে মনে নাও হয়। তবুও আমি তা করতে প্রলুব্ধ হয়েছি। এই দুটি ঘটনার মধ্যে সাদৃশ্য কেন টানা যাবে না তার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।
অবশ্যই ১৭৮৯ সালের পূর্বে ফ্রান্স যে-ধরনের দার্শনিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল এখানে তেমন কোনো কিছু ঘটেনি। আমাদের কোনো রুশো এবং ভলতেয়ার ছিলেন না। ছিলেন না দেদিরোর মতো বিশ্ববিদ্যাবিদ এবং কুইনেসির নেতৃত্বাধীন স্কুল অব ফিজিওক্র্যাটসের অর্থনীতিবিদ। কিন্তু ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, একজন প্রকৃত মুসলমান জন্মগতভাবেই বিদ্রোহী। তার আনুগত্য কেবল আল্লাহর প্রতি, অন্য কারো প্রতি নয়। পৃথিবী ও বেহেশতের মধ্যেকার সবকিছুর মালিক আল্লাহ, অন্য কেউ নয়। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদির মতো ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক থাকা কোনো মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। উত্তরাধিকার আইন শুধু প্রযোজ্য যদি কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে। হজরত মুহম্মদের জীবন মুসলমানদের জন্য সুন্নাহ। একটি ছোট খেজুর গাছের বাগান ছাড়া তিনি আর কিছু রেখে যাননি আর সেটিও খলিফার নির্দেশে তাঁর উত্তরাধিকারীদের উত্তরাধিকার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। এবং শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেস দেহলভী কি বলেননি যে, শাসকশ্রেণি যখন আমোদ-প্রমোদ ও সুখের জীবন বেছে নেয় তখন তাদের ইন্দ্রিয়পরতন্ত্রতার বোঝা পড়ে শ্রমজীবী মানুষদের ওপর এবং ফলে তাদের জীবন মানবেতর পর্যায়ে চলে যায়? তারা পশুর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। জনগণ যখন অর্থনৈতিক দাসত্বের জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়, তখন সমাজের নৈতিক চরিত্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই মানুষকে পশুর মতো পরিশ্রম করতে বাধ্য হতে হয়। মানুষের এই চরম দুঃখের কালে আল্লাহ্ নিজেই বিপ্লবের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি নিজেই ক্ষমতা থেকে জবরদখলকারীদের সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেন।
আমি ইতোমধ্যেই দেখিয়েছি এবং আবার জোর দিয়ে বলতে চাই যে, মুসলিম বাংলা মুসলিম লীগের প্রতি এর ধর্মের নামে আহ্বানের কারণে আকৃষ্ট হয়নি। এবং মুসলিম লীগ কখনো কোনো ধর্মীয় সংগঠন ছিল না। দেশভাগের পূর্বে বাংলার মুসলমান জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল করুণ। তৎকালীন বাংলা সরকারের বেশ কিছু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাদের দুঃখ-কষ্টের সত্যতার সমর্থন রয়েছে। পুরো কৃষক সমাজ ছিল তাদের পরিশোধের ক্ষমতার বাইরে ঋণগ্রস্ত, তাদের জমি ছিল বন্ধক দেওয়া, তাদের যেসব ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় পাশ করত তারাও কোনো চাকরি পেত না। বর্ণহিন্দু ও বিদেশি শাসকরা তাদের নিচু জাতের অনুরূপ ঘৃণা করত, সাহিত্য-শিল্পে তাদের সম্পর্কে খারাপ কথা তুলে ধরা হতো। এই চিত্র ১৭৫৭ সালের ঠিক পরের বছরগুলিতে যেমন ছিল তেমনি ১৮৮৫ সালের পরের বছরগুলি থেকে প্রায় ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত। করের প্রায় সব বোঝাই বহন করতে হতো তাদের, কিন্তু এর কোনো প্রতিদান তারা পেত না। কর আরোপের সে-পদ্ধতি এখনো বর্তমান। তারা শহরবাসীদের খাতির ও পরিচর্যা করত, কিন্তু বিনিময়ে পেত ঘৃণা। ১৯৩৭ সালে বাংলার কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের মতোই।
এমনকি বাংলায় কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বকেও তৎকালীন ফ্রান্সের কৃষক-বুর্জোয়াদের অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের সঙ্গে কিছুটা তুলনা করা যেতে পারে। গ্রামের পুরোহিতগণ শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, বুদ্ধিজীবী প্রমুখ নিয়ে গঠিত হয় ফ্রান্সের বিপ্লবী নেতৃত্ব। বাংলায় বর্তমান শতাব্দীর (বিংশ শতক) তিরিশের দশক পর্যন্ত কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল শ্রেণিবিচ্যুত ও মালিকানাচ্যুত ধর্মীয় যাজকদের হাতে। মজনু শাহ থেকে মওলানা ভাসানী – এঁদের কারোরই জমিতে উল্লেখযোগ্য কায়েমি স্বার্থ ছিল না, অথবা এমনকি থাকলেও তাঁরা কেউ সম্প্রদায়ের স্বার্থের ওপরে ব্যক্তিগত স্বার্থকে স্থান দিতেন না। আমি দেখিয়েছি যে, ১৭৬০ থেকে ব্রিটিশ শাসনের প্রায় শেষ পর্যন্ত বাংলার মুসলিম কৃষক সম্প্রদায়ের ইতিহাস হচ্ছে বিদ্রোহের ইতিহাস। কখনো কখনো এই বিদ্রোহ ছিল সশস্ত্র যা প্রতিবারই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সশস্ত্র শক্তি দ্বারা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কখনো কখনো সেগুলি ছিল জনতার ইচ্ছার সংগঠিত প্রকাশরূপে। এমনকি ব্রিটিশ শাসনের লৌহনিগড় দৃঢ়মূলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও বাংলায় ক্ষুদ্র প্রকৃতির বেশ কিছু সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে যথা সন্তোষে ভাসানীর নেতৃত্বে সংঘটিত বিদ্রোহ এবং অপরটি কিশোরগঞ্জে। বিশ শতকের শেষের দিকে ভূমিপুত্র উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণিও এতে শামিল হয়।
এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি জনাব ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত মুসলিম লীগে ও অন্যরা কেন্দ্রীয়ভাবে মি. জিন্নাহ্র নেতৃত্বে সারা ভারত পর্যায়ে নিজেদের সংগঠিত মুখপাত্র খুঁজে পায়। পূর্বেকার বিদ্রোহী মৌলানারাও এই অভিন্ন মঞ্চে যোগদান করেন। কিন্তু তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তথা অর্থনৈতিক শোষণ থেকেও মুক্তি কখনো পরিবর্তিত হয়নি। মুসলিম লীগের আহ্বান ছিল পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, কিন্তু নতুন কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠা নয়, অথবা এমনকি প্রতিষ্ঠিত ধর্মের অপসারণ বা সংস্কার নয়, কারণ ইসলাম তখনো যেমন এখনো তেমনি মুসলমানদের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত – এর পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো প্রয়োজন নেই। নতুন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নির্যাতিত মানুষের পার্থিব আকাঙ্ক্ষা পূরণ তথা রাজনৈতিক বন্ধন ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্ত করে জীবনকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত করা।
বাংলার মুসলমানদের কাছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল মহান ফরাসি বিপ্লবের প্রায় অনুরূপ একটি বিপ্লব। উপমহাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি ঘটনা ঘটেছে সেখানে একটি দেশের নির্যাতিত কৃষিজীবী মানুষ অত্যাচারী বিদেশি শাসকদের এবং বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থবাদী তথা বর্ণহিন্দু জমিদার, তালুকদার, মহাজন, পেশাজীবী, বণিক শ্রেণি ও শিল্পমালিকদের একটিমাত্র আঘাতের মাধ্যমে অপসারিত করে তাদের নিজেদের জন্য একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই দুই শক্তিকে অপসারিত করে তারা মুসলমান কায়েমি স্বার্থবাদীদের অপসারণের পথও দেখিয়ে দিয়েছে। এটি ছিল ১৮৭ বছর আগে সূচিত একটি আন্দোলনের যৌক্তিক উপসংহার। ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্রতা একবার বিদীর্ণ করা গেলে সেটি কার ব্যক্তিগত সম্পত্তি তাতে কিছু যায়-আসে না। মুসলিম কায়েমি স্বার্থকে স্পর্শহীন রাখা কেবল তখনই সম্ভব যখন অন্যান্য শোষক তথা হিন্দু কায়েমি স্বার্থও যদি অনিগৃহীত ও স্পর্শহীন থাকে। বস্তুত মুসলিম কায়েমি স্বার্থ অপসারণের দাবি বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগই জানিয়েছিল জনাব আবুল হাশিমের পরিচালনাধীনে থাকার সময়। এবং মুসলিম বাংলা তাদের হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস করত যে, এর অন্যথা হতে পারে না, যেহেতু সমসাময়িক নেতৃত্ব কি হজরত ওমরের খিলাফতের আদর্শে শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ ও প্রচার করেনি? এবং আসাম প্রদেশের মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী কি আসাম সরকারের, যার মূল ব্যক্তি ছিলেন একজন অত্যন্ত উৎসাহী মুসলিম লীগার স্যার মো. সাদুল্লাহ, বাঙালি-খেদা নীতির (যার অর্থ আসাম থেকে গরিব বাঙালি মুসলমানদের উৎখাত করা) বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের সূচনা করেননি? জনাব এ. কে. ফজলুল হক কি ১৯৩৭ সালের নির্বাচনী প্রচারকালে ‘ডাল-ভাত’-এর প্রতিশ্রুতি প্রদান করেননি? তাঁর কৃষক প্রজা পার্টি কি ১৪ দফা কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনী প্রচার করেনি, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণগুলি ছিল – ১. ক্ষতিপূরণ ব্যতীত জমিদারি প্রথার অবসান, ২. খাজনার হার হ্রাস, ৩. জমিদারদের সালামির অবলুপ্তি, ৪. প্রতিটি থানায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, ৫. বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং সর্বশেষ কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন।১৭ দাবি করা হয় যে, এই কর্মসূচির খসড়া তৈরি করেছিলেন জনাব আবুল মনসুর আহমদ, পাকিস্তানের একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং তা সর্বসম্মতভাবে একটি জনসমাবেশে গৃহীত হয়, যেখানে সবাই ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলমান। মওলানা ভাসানীর হাত এখানে ছিল না, যেহেতু তখন তিনি আসামে তাঁর পেশাগত পীরের জীবন যাপন করছিলেন। অতএব যুক্তিবিদ্যার সকল বিধি ও ইতিহাসের তথ্যানুযায়ী বেঙ্গল মুসলিম লীগ যেহেতু বিজয়ী জনাব ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং পরাজিত ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সংযুক্ত প্রতিষ্ঠান ছিল, সেহেতু এর সংগ্রাম ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম। ধর্মীয় আন্দোলনের সঙ্গে এর বিভ্রান্তি ছিল এবং মুসলিম, ব্রাহ্মণ ও বেনিয়াদের পক্ষ থেকে তা হচ্ছে বাংলার কৃষকদের মনোযোগ প্রকৃত লক্ষ্য থেকে সরিয়ে বায়বীয় লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাকৃত প্রয়াস। এই প্রয়াস ১৯৫৪ সালে চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং এরূপ প্রয়াস যতবার পুনরায় চালানো হবে ততবারই তা ব্যর্থ হবে। নিজেদেরকে দৃশ্যের আড়ালে রেখে কায়েমি স্বার্থের প্রভাবশালীরা ধর্মের বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার আছে বলে দাবি করা লোকদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক-ধর্মীয় সংগঠনগুলির কাজগুলি ব্যবহার করতে পারে, তবে এই ছল-চাতুরী তাদেরকে দেশভাগপূর্বকালের দিনগুলোতে তাদের ভাইদের তথা বর্ণহিন্দু শোষক ও বিদেশি শাসকদের ভাগ্যে যা ঘটেছিল তা থেকে রক্ষা করবে না। এক কায়েমি স্বার্থবাদী জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অপসারিত অপর কায়েমি স্বার্থবাদীর জুতায় পা রাখতে পারে না। এমনকি শক্তিমত্তা কখনো জাগ্রত জনতার আরো অনেক কম শক্তিশালী স্লোগানও স্তব্ধ করতে পারেনি। যে রাজনৈতিক-ধর্মীয় আন্দোলনের মাধ্যমে তারা বাঁচতে চায় সেটি নিজেই হঠাৎ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয় এবং তাদেরকে গ্রাস করে; কারণ পৃথিবীর কোনো ধর্মই প্রকাশ্যত মানুষের দ্বারা মানুষকে শোষণের অনুমোদন দেয় না, এ-বিষয়ে ধর্মগুলির মধ্যে ইসলাম সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ। প্রথমদিকের খিলাফত ছিল এক ধরনের আদি সাম্যবাদ। অতএব ইসলাম নিয়ে খেলা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। ইসলামে শূকরের মাংস ভক্ষণ, মদ্যপান ও ব্যভিচারসহ সকল প্রকার সুদ নিষিদ্ধ। তারা কি বুঝতে পারছে যে, সুদের বিলুপ্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ পুঁজিবাদী প্রক্রিয়াও শেষ হয়ে যাবে? ইন্দোনেশিয়ার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি সেদেশের আইনগত ও ন্যায্য অধিকারের দাবিরত জনগণের দাবি চেপে রাখার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছিল। তারা এতে সফল হয়, কিন্তু নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনের জন্য যেসব শক্তিকে তারা ব্যবহার করেছিল সেসব শক্তি তাদের পূর্বতন প্রভু ও অর্থদাতাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। ইন্দোনেশিয়ার সিংহাসন এখন আর কুসুমাস্তীর্ণ নয়।
আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬৮-৬৯ সালের আন্দোলন বাংলার মুসলমান কৃষকদের বিদ্রোহী চরিত্রের আরো একটি দৃষ্টান্ত। বাস্তবে সেই সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বধারী সরকার ছিল না, জনগণ নিজেরাই নিজেদের কমিটি গঠন করেছিল এবং সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্ন করেছিল। তারা গরুচোর ও অন্য অপরাধীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারে, স্থানীয় অত্যাচারীদের প্রকাশ্য দিবালোকে উল্লাসসহকারে হত্যা করে, আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রীদের বাড়িঘর লুট, জরিমানা ও অন্যভাবে কঠোর শাস্তি প্রদান করে, যাদের আইয়ুব খান সৃষ্টি করেছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিসের অনুরূপ তাঁর শাসনের সামাজিক ভিত্তি হিসেবে সৃষ্ট জমিদারদের মতো। আল্লাহ্র প্রতি শোকর, তখন ‘সকল ক্ষমতা জনগণের কমিটির’ – এই আহ্বান জানানোর কেউ ছিল না, এবং যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা আন্দোলনের রূপ দেখে, আন্দোলন যখন তুঙ্গে, পিছিয়ে আসে। আন্দোলন সংগঠিত নেতৃত্ববিহীন হয়ে পড়ে এবং কায়েমি স্বার্থ ও সরকারের ছায়া তাদের জন্য অপেক্ষমাণ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। এ-কথা সত্য যে, এখানে রোবেসপিয়েরেসরা ছিলেন না এবং ষোড়শ লুইয়ের রাজদরবারের অনুরূপ কোনো কর্মকর্তা ছিলেন না, যিনি সে-সময়ের ঘটনাবলি সম্পর্কে আইয়ুবের কাছে রিপোর্ট করবেন এবং আইয়ুব যখন বলবেন, ‘এ হচ্ছে বিদ্রোহ’ তখন তিনি বলবেন, ‘না স্যার, এ হচ্ছে বিপ্লব।’ কিন্তু যাই হোক না কেন, ১৯৬৮-৬৯-এর আন্দোলন ছিল একটি বিদ্রোহ এবং শুধু সংগঠিত নেতৃত্বের অভাবেই এটি বিপ্লবে পরিণত হতে পারেনি। আইয়ুবের কারাগার থেকে যেভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করা হয়েছিল তার তুলনা হতে পারে বাস্তিলের দেয়াল ভাঙার সঙ্গে। কিন্তু কে জানে, ভবিষ্যতের অনাবিষ্কৃত উদর থেকে কোন জিনিস বেরিয়ে আসবে? সত্য, মওলানা ভাসানী এখন একজন অশীতিপর ব্যক্তি এবং বর্তমানে তিনি হয়তো যথেষ্ট কার্যকর একটি শক্তি হবেন না, কিন্তু অনেক মজনু শাহ, দুদু মিয়া ও তিতুমীর তখন বাংলার আপাতকোমল রোদে গা এলিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন কেবল যথাসময়ে নিজেদের তুলে ধরার জন্য। তৃতীয় এলাকাটি হচ্ছে ক্ষুধার্ত ঘুমন্ত সিংহ। এর সঙ্গে এবং এর অনুভূতিগুলোর সঙ্গে খেলা করা সবসময় বিপজ্জনক; কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত না একে জাগানো হয়, ততক্ষণ এটি শান্ত ও নিজের ভাগ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু একবার জেগে উঠলে এটি অবশ্যই আক্রমণ করবে এবং জেগে ওঠা ক্ষুধার্ত সিংহের মতো যা সামনে পাবে তা-ই খেয়ে ফেলবে।
এই খেলার দৃশ্যের আড়ালের খেলোয়াড়দের ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ ও বেশি দেরি হওয়ার আগেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করার সুপরামর্শ দেওয়া উচিত হবে। সম্ভবত এখনো সত্যিকারের জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় আছে যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ দেশের সরকারের সকল শাখায় অসংরক্ষিত ও সমানভাবে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা পাবে। এগুলো মৌলিক অধিকার। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গিও সেটিই দাবি করে। অতএব গৃহশীর্ষে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের একমাত্র হেতু হচ্ছে ধর্ম – এই ঘোষণা দেওয়ার পরিবর্তে এখন সময় হচ্ছে আন্তঃপ্রাদেশিক সমস্যাবলি সরাসরি ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করা। ধর্ম আধুনিক জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং ইসলাম আরো কম। অভিন্ন ভূগোল, অভিন্ন ধর্ম, অভিন্ন ভাষা ও অভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি বিশ্ব বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত। প্রকৃত ইসলাম ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের কথা বলে না এবং তা এর মৌলিক নীতিসমূহের পরিপন্থী। ইসলাম-পসন্দ ব্যক্তিদের কাছেও তা অজানা নয়। অতএব তাদের উচিত থেমে যাওয়া ও চিন্তা করা এং কপটতা পরিহার করে, যা ইসলামে গুরুতর পাপ কাজ, বর্তমানে বিবাদ-বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত পাকিস্তানকে একটি বিকশিত হতে ও টিকে থাকতে সক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য এগিয়ে আসা। তাদের এক মুহূর্তও ভুলে থাকা চলবে না যে, উভয় অঞ্চলের জনগণই একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিক এবং ভৌগোলিক অবিচ্ছিন্নতার অনুপস্থিতির কারণে তাদের ওপর এই দায়িত্ব বর্তায় যে – তারা রাষ্ট্রের অর্থ ও সম্পদ দুই অংশের মধ্যে সমহারে বণ্টনই শুধু নয়, বরং এসবের ফলপ্রসূ বিতরণের ক্ষমতা যেন সমানভাবে উভয় অংশের হাতে থাকে তার উপায় খুঁজে বের করবে। রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে উনিশ শতকীয় ঔপনিবেশিক অর্থনীতির দিনও চলে গেছে। বুদ্ধিমান পুঁজিপতির জন্য সর্বোত্তম নিশ্চয়তা হচ্ছে লাভজনক ব্যবসার নিশ্চয়তা। রাজনৈতিকভাবে ভারতের সিংহাসন ত্যাগের পর ব্রিটিশরা আর্থিকভাবে আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় নেই। তারা ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গেই এখনো লাভজনক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এবং বিদেশিদের মধ্যে, ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের কাছেই, তারা হৃদয়ের সব থেকে কাছের। অতএব উভয় অংশের কায়েমি স্বার্থগুলির উচিত নানাবিধ বিচ্ছিন্ন উপায়ে সাধারণ মানুষের ন্যায্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রয়াস বানচাল করার পরিবর্তে, তাদের নিজেদের স্বার্থেই, সেই মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাওয়া।

(এই প্রবন্ধটি ১৯৭০ সালে ১৯-২৩শে নভেম্বরের ঢাকা থেকে প্রকাশিত মর্নিং নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। – অনুবাদক)

তথ্যসূত্র
১. J. M. Ghose : Sannyashi and Fakir Raiders, Published by Govt. of Bengal, p 59.
২. ওই, পৃ ৬২।
৩. ওই, পৃ ১৮০-১৯০।
৪. ওই।
৫. ওই, পৃ ৪৭।
৬. ওই, পৃ ৫০-৫১।
৭. ওই, পৃ ১০২।
৮. ওই, পৃ ১০।
৯. History of the Freedom Movement, vol 1 – article ‘The reform movement in Bengal’ by Dr. A. Bari – pp 545-547.
১০. ওই, pp 547-548.
১১. ‘Bengal under the Lt. Governors’-এ অন্তর্ভুক্ত লর্ড ক্যানিংয়ের রিপোর্ট থেকে উদ্ধৃত, পৃ ১৯৭।
১২. ওই, পৃ ১৯২।
১৩. W. W. Hunter, The Indian Musalmans : Comrade Publishers Edition.
১৪. আবুল মনসুর আহমদের রাজনৈতিক আত্মজীবনী, পৃ ৫২।
১৫. পূর্বোক্ত, পৃ ৭৮।
১৬. দ্রষ্টব্য আবুল মনসুর আহমদের রাজনৈতিক আত্মজীবনী।
১৭. আবুল মনসুর আহমদের বাংলায় লেখা রাজনৈতিক আত্মজীবনী।

Leave a Reply