বিবেকানন্দকে স্মরণ

লেখক:

ড. এম মতিউর রহমান

 

ভারত নির্মাণ ও স্বামী বিবেকানন্দ

ড. মধু মিত্র

 

আর্ট পাবলিশিং

কলকাতা, ২০১৫

২২৫ টাকা

 

দার্শনিক বিবেকানন্দ : দুই সত্তার সহাবস্থান

নীলকণ্ঠ ঘোষাল

 

গাঙচিল,

কলকাতা, ২০১৪

২২৫ টাকা

সভ্যতার সেই ঊষাকাল থেকেই সুপ্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য নানা প্রকার ঘাত-প্রতিঘাত ও বহুধামুখী উত্থান-পতনের ব্যূহচক্রে আবর্তিত হয়েছে। অবিদ্যা আর কুসংস্কারের অচলায়তনে জাতি যেমন কখনো কখনো পিছু হটেছে, তেমনি আবার ন্যায়, সুনীতি ও মননচর্চার শানিত অস্ত্রে কখনো কখনো প্রগতির দিকে ধাবিত হয়েছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আদর্শের সংঘাত-সংঘর্ষে বাঙালি যখন নতুন হাওয়ায় উদ্বেলিত, আবেশে আপ্লুত হয়ে নিজের ভিত্তিকে শিথিল করতে বসেছিল, তখন সেই ক্রান্তিলগ্নে প্রতীচ্যের অন্ধানুকরণের পরিবর্তে তার যুক্তিবাদী ভাবাদর্শ মন্থন করে বাঙালির তথা ভারতের শাশ্বত ভাবাদর্শকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে এসেছিলেন ঐতিহ্যপন্থী ভাবধারার অনুসারীরা। এঁদের মধ্যে অন্যতম দার্শনিক হলেন প্রাচ্যবিদ্যা ও প্রতীচ্যদর্শন, ইতিহাস ও বিজ্ঞানে পরিপুষ্ট বিশিষ্ট বৈদান্তিক সন্ন্যাসী, কামিনী-কাঞ্চনত্যাগী নরেন্দ্রনাথ দত্ত, আধুনিক বিশ্বে যিনি স্বামী বিবেকানন্দ নামে সর্বাধিক পরিচিত।

ধর্মের পথে সমাজসমীক্ষার মাধ্যমে পরিণামে ব্যাপক ও স্থায়ী মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার দীক্ষামন্ত্র দিতেই বিবেকানন্দের আবির্ভাব। তাঁর অনুপম সংস্পর্শে উনিশ শতকের বাঙালির সমাজজীবন ও জনজীবনে এক নতুন কর্মচাঞ্চল্যের সূচনা দেখা দেয়। তিনি চিরাচরিত শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও নৈতিকতার এক যুক্তিবাদী ও বিচারনিষ্ঠ মূল্যায়নের মাধ্যমে বাঙালি চিত্তকে আলোড়িত করেন। তিনি কেবল একজন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদীই ছিলেন না, তিনি তাঁর অমূল্য জীবন, বাণী, কর্ম এবং আদর্শগুরু শ্রীরামকৃষ্ণের ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র আদর্শের মাধ্যমে বাঙালির নবলব্ধ জাতীয় ও মানবিক চেতনাকেও নানাভাবে সঞ্জীবিত করে বাঙালিকে মানবপ্রেমের দীক্ষামন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেন। বাঙালির তথা ভারতীয় মানবতাবাদীদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

মননচর্চা মানুষের এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণীরূপে মানুষকে যখন সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন এর মাধ্যমেই মানুষের এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করা হয়। যে-জীবনে মনন নেই, মননের চর্চা নেই, চর্যা নেই, সে-জীবনের তাই কোনো মূল্য নেই। সাধারণ মানুষের জীবনে যদি মননচর্চার ওপর এতো গুরুত্ব প্রদান করা হয়, যার ওপর তার মরণ-বাঁচন থেকে শুরু করে সমগ্র সত্তাকেই নির্ভর করে দেখা হয়, তাহলে যাঁরা মনস্বী, স্থিতধী পুরুষ তাঁদের যে একটা বিশেষ সক্রিয় মনন বা চিন্তাধারা আছে, যার আলোকে তাঁরা জগৎ ও জীবনকে দেখবেন, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি করবেন তা বলাই বাহুল্য। বিবেকানন্দ এ-ধরনেরই একজন মহাতপস্বী, মহাজ্ঞানী দার্শনিক, যাঁর জীবনবেদ সমগ্র মানবতাকে ব্যাপ্ত করে রেখেছে।

বিবেকানন্দের জীবনে তিনটি দুর্লভ জিনিসের মণিকাঞ্চন যোগ হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে মনুষ্যত্ব, মুমুক্ষত্ব ও মহাপুরুষসংশ্রয়। যথার্থ মানুষ হয়ে জন্মানোর ফলে তাঁর মধ্যে মননশীলতা দেখা দিয়েছিল। সেই মননশীলতা তীব্র পরাকাষ্ঠায় তাঁর মধ্যে মুমুক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল এবং সবশেষে এই মুমুক্ষত্বের প্রেরণাই তাঁকে সৌভাগ্যক্রমে এমন এক মহাপুরুষের সংশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিল, যিনি নিজে মুক্তিলাভ করে, অন্যকেও মুক্তির পথ দেখাতে পারেন। বিবেকানন্দের সংশয়ী চেতনাই তাঁকে সেই মহাপুরুষ-সংশ্রয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

বিবেকানন্দ দৃঢ়চিত্তে বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টির ধারা নিয়তই প্রবহমান, যার আদি বা অন্ত নেই। পেছনে আছে তিনটি সত্তা। প্রথমটি হলো অসীম ও পরিবর্তনশীল প্রকৃতি। সমগ্র আদি ও অনন্ত, কিন্তু তার ভেতরে চলছে বিবিধ পরিবর্তন। দ্বিতীয়ত আছেন ঈশ্বর, অপরিবর্তনীয় শাস্ততা। তৃতীয় আছে আত্মা, যা ঈশ্বরের মতোই অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত। কিন্তু সেই শাস্তার অধীনে ঈশ্বরই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্ম, কারণ ও উপাদান। বিশ্বের বিকাশ-অভিব্যক্তির কর্তা ঈশ্বরের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যেন সমগ্র বিশ্বভুবন প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হয়। কারণবিহীন সৃষ্টিশক্তি নিয়তই ক্রিয়াশীল এবং মন ও বাহ্যপ্রকৃতির গতি একই নিয়মে নির্দিষ্ট। অখন্ড  বিশ্বেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে জড়রূপে, বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবরূপে এবং আত্মার মাধ্যমে ঈশ্বররূপে প্রতিভাত হয়।

প্রকৃতপক্ষে বিবেকানন্দের সমগ্র দর্শনচিন্তার কেন্দ্রীয় বিষয়ই হচ্ছে মানুষ। অন্যান্য  বৈদান্তিকের মতো তিনিও মানবপ্রকৃতির চক্রবৎ বিকাশের ধারায় পুরোপুরি আস্থাশীল। চক্রবৎ পরিবর্তন হচ্ছে সেই মতবাদ, যার মূলকথা হলো – বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছুই এসেছে আদি উপাদান আকাশের বিবর্তন থেকে। বিশ্বভুবনের ক্রিয়াশীল তাবৎ শক্তি, তা প্রাণশক্তি হোক কিংবা মাধ্যাকর্ষণ, আকর্ষণ বা বিকর্ষণ শক্তিই হোক, তা সেই আদিশক্তি প্রাণক্রিয়ার পরিণতি। এই মতবাদ মনে করে চক্রাবর্তনের শুরুতে আকাশ থাকে নিশ্চল। তাই সে নিজেকে রাখে অব্যক্ত। তারপর শুরু হয় প্রাণের লীলা, ক্রমবর্ধমান আধেয় ও পরিমাণ নিয়ে প্রাণ সৃষ্টি করে গাছপালা, জীবজন্তু, মানুষ, নক্ষত্র, তারকা প্রভৃতি। লক্ষাধিক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই বিবর্তন তার শীর্ষে পৌঁছায়। তারপর আবার শুরু হয় অবরোহণ। এভাবেই অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলে বিবর্তনের লীলা। বিবর্তনের এ-লীলা বিশ্বভুবনে প্রকাশ পায় তরঙ্গের গতিতে।

এটা উত্থিত হয়, শীর্ষে পৌঁছায়, তারপর ভাটার কবলে পতিত হয়। ভাটা থেকে আবার উত্থান লাভ করে, শীর্ষে পৌঁছোয়। এভাবেই চলে চক্রবৎ পরিবর্তন। সমগ্র প্রকৃতি সম্বন্ধে   যে-কথা সত্য, তার অংশ সম্বন্ধেও সে-কথা প্রযোজ্য। মানুষ প্রকৃতিরই একটি অংশ। সে-কারণে মানবসমাজের ইতিহাসও এই চক্রবৎ পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রণাধীন। বিবেকানন্দ মনে করেন, প্রকৃতির অন্যান্য অংশের মতো বা উপাদানের মতো প্রতিটি মানুষকেই প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে সঙ্গে এই চক্রবৎ পরিবর্তন অতিক্রম করে যেতে হয়। প্রকৃতপক্ষে তাঁর দর্শনের মধ্যে ব্যক্তিসত্তার এ-সমস্যাটিই বোধকরি সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিবেকানন্দ নিজেই বলেছেন, ‘ব্যক্তিই আমার জপমন্ত্র, আমি ব্যক্তিমানুষ তৈরি করতে চাই।’ অন্যান্য বৈদান্তিকের মতো বিবেকানন্দও বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্বব্রহ্মান্ড হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মান্ডের সংশ্লেষিত রূপ বা অণুবিশ্ব। তাঁর মতে, ধাতুর ভৌতিক পদার্থ, উদ্ভিদজগতের প্রাণশক্তি, জীবজন্তুর বোধ ও ক্ষুধা-তৃষ্ণা, অধুনালুপ্ত উন্নত জন্তুর সরল বুদ্ধি এবং আত্মা, যা মানুষকে যথার্থ মানুষে পরিণত করেছে, তার সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মানবজীবনে। মানুষের প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে তার আত্মা; আত্মা মানুষের সারাৎসার ও জীবনধর্ম। এই আত্মার কোনো ধ্বংস বা বিনাশ নেই, এ নিত্য ও অবিনশ্বর। এখানে বিবেকানন্দ স্পষ্টত ভাববাদী, উপনিষদের ধারায় এখানে তিনি স্নাত, শাস্ত্রীয় অনুশাসনে তিনি ভাবসমাহিত।

অন্যদিকে বাস্তবতাকেও তিনি উপেক্ষা করেননি বরং দার্শনিকতায় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ   বাস্তবানুগ। অলৌকিকতার প্রত্যাশী তিনি আদৌ ছিলেন না। বাস্তব ও প্রত্যক্ষ জীবন-যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার আলোকে স্নাত হয়েছে তাঁর মননভূমি। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রধান সবকটি ধারাকে মন্থন করে তিনি তাঁর দার্শনিক সৌধ নির্মাণ করেন। এ সৌধের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল মানুষ। এর প্রত্যক্ষ ক্ষমতা তিনি লাভ করেছিলেন আদর্শগুরু ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছ থেকে। এই প্রত্যক্ষের প্রথম সুযোগ তিনি লাভ করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরে। হৃদয়ে অনুভূতি জাগল ঠিকই, কিন্তু সংশয়ী মন বা তাঁর মনীষা তখনো এই অনুভবের পেছনে কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না। অনেক পরে ধীরে ধীরে বেদান্তের সঙ্গে নিবিড় পরিচয়ের ফলে এই অনুভূতির পেছনে যে এক অভ্রান্ত যুক্তি রয়েছে, তা তিনি হৃদয়ঙ্গম করলেন এবং সারাজীবন ধরে সমস্ত জগদ্বাসীকে বেদান্তের এই অভ্রভেদী বাণী মেঘমন্দ্রস্বরে শুনিয়ে শুনিয়ে সকলের মধ্যে সেই অনুভূতি জাগিয়ে তোলার প্রয়াসেই আত্মনিয়োগ করলেন।

বিবেকানন্দের দর্শন যেমন তাই প্রত্যক্ষভিত্তিক বা অনুভবমূলক, তেমনি তা বেদান্তভিত্তিক বা যুক্তিমূলক। বিবেকানন্দ দেখলেন এই একটি মানুষের (শ্রীরামকৃষ্ণ) মধ্যে যাবতীয় ভেদ-বিভেদ এক পরম ঐক্যে এসে মিলিত ও মূর্ত হয়েছে। তাঁর কাছে ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সমাজে পতিত ও উন্নত সবাই সমাদরে আদৃত, একেরই প্রকাশরূপে গৃহীত। জগতে সবকিছু্ যেন ভিন্ন ভিন্ন, নানা এবং এই ভেদের দৃষ্টিই সমস্ত অনর্থের মূল। এই মানুষটি যেন সব ভেদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে পরম আনন্দে আছেন এবং তাঁকেও সেই আনন্দের সাক্ষাৎ আস্বাদন তিনি এনে দিয়েছেন। আস্বাদন বা অনুভব তিনি পেলেন, কিন্তু এর পেছনে যুক্তি কী? মানুষকে কেমন করে বোঝানো যাবে যে, ভেদবোধ একান্ত মিথ্যা, আসলে আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। এই যুক্তির অন্বেষাই বিবেকানন্দকে বেদান্তের দ্বারপ্রান্তে উনীত করল। ভেদবোধকে মিথ্যে প্রমাণিত করার জন্য বিবেকানন্দ তাঁর অনন্যসাধারণ মেধায় বেদান্তকে নবরূপে রূপায়িত করলেন, যার নাম তিনি নিজে দিলেন ব্যবহারিক বেদান্ত। এখানে তিনি পুরোপুরি বাস্তববাদী।

দর্শনের ইতিহাসে সেই প্রাচীনকাল থেকেই ভাববাদ ও বাস্তববাদের এক দ্বৈরথ চলে আসছে অনেকটা ঐতিহ্যগতভাবেই। প্রধানত জ্ঞানের বিষয়বস্ত্তকে কেন্দ্র করেই এই মতভেদের সূচনা। যাঁরা মনে করেন জ্ঞানের বিষয়বস্ত্ত একান্তভাবেই আমাদের মন বা ধারণার ওপর সর্বতোভাবে নির্ভরশীল, মন বা ধারণা ছাড়া জ্ঞানের বিষয়বস্ত্তর কোনো অধিষ্ঠান নেই, দর্শনের ইতিহাসে তাঁরাই সাধারণত ভাববাদী হিসেবে পরিচিত। প্রতীচ্যের সক্রেটিস, প্লেটো, বার্কলি, হেগেল, ব্র্যাডলি, গ্রিন এবং ভারতীয় আচার্য শঙ্কর, স্বামী রামানুজ, সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ, কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য, শ্রীঅরবিন্দ প্রমুখ দার্শনিক প্রখ্যাত ভাববাদী হিসেবে সর্বাধিক প্রণম্য। আর যাঁরা মনে করেন জ্ঞানের বিষয়বস্ত্ত মন বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল নয়, এদের মন বা ধারণা-নিরপেক্ষ বাস্তব অস্তিত্ব বিদ্যমান, তাদের বলা হয় বাস্তববাদী। প্রতীচ্যের লক, হিউম, রাসেল, ম্যুওর, হেয়োইটহেড এবং ভারতীয় লোকায়ত দার্শনিক ও জৈন দার্শনিক, ন্যায়দার্শনিক, অধুনা প্রণবকুমার সেন, বিমলকৃষ্ণ মতিলাল, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ দার্শনিক বাস্তববাদী হিসেবে সমধিক প্রণম্য হয়ে আছেন। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন ভাববাদী হয়েও বাস্তববাদী এবং বাস্তববাদী হয়েও ভাববাদী। তাঁর মধ্যে উভয় সত্তাই সমভাবে বিদ্যমান। এই বিবেকানন্দের সার্থক উত্তরসূরি হলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত দার্শনিক শহীদ ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেব পুরকায়স্থ।

বিবেকানন্দের দার্শনিক সত্তা থেকে ভাববাদ বা বাস্তববাদ কোনোটিকেই পৃথক করে দেখা যায় না। তাঁর মধ্যে আপাতবিরোধী এই দুই সত্তাই সহাবস্থান করছে। এই দ্বৈত সত্তার উদ্ঘাটনে নীলকণ্ঠ ঘোষাল-রচিত দার্শনিক বিবেকানন্দ : দুই সত্তার সহাবস্থান সর্বাঙ্গসুন্দর ও সার্থক হয়েছে বলে স্বীকার করতে হবে। লেখক স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন : ‘আমি বলেছি, আমি আলোচনা করার চেষ্টা করেছি, স্বামী বিবেকানন্দের মননের মধ্যে কীভাবে দুটি পরস্পরবিরোধী ও বিপরীত দর্শন (ভাববাদ ও বস্ত্তবাদ) এসে তাঁর মনোভূমিকে এক রণভূমিতে পরিণত করেছে। তাঁর গতিশীল সত্তাকে দখল করার চেষ্টা করেছে। তাঁকে যন্ত্রণা দিয়েছে মৃত্যুকাল পর্যন্ত। কোন দর্শন তাঁর মননে কতখানি সত্যিকার স্থান দখল করতে পেরেছে, তা অমীমাংসিত বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে’ (পৃ ১৪)। এ-বিষয়ে আমরাও লেখকের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। এ ধরনের একটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও তথ্যনিষ্ঠ গ্রন্থ উপহারের জন্য প্রকাশক ও লেখক উভয়কেই জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।

 

দ্বিতীয় আলোচ্য গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত একুশটি প্রবন্ধের শিরোনাম দেখেই গ্রন্থটি সম্পর্কে আমরা একটি ধারণা গঠন করে নিতে পারি। গ্রন্থটি  আকার-আয়তনে তেমন কোনো বৃহৎ কলেবরের না হলেও বিষয়বস্ত্তর বিচারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলনের মর্যাদা পাওয়ার দাবি করতে পারে। আমরা যারা বিবেকানন্দ সম্পর্কে পঠন-পাঠন কিংবা অধ্যয়ন-অধ্যাপন নিয়মিতভাবে করি, আমাদের কাছে গ্রন্থটি সত্যিই বিশেষ তাৎপর্যের অধিকারী। সম্পাদক মহোদয় সংকলনগ্রন্থের প্রবন্ধ-নির্বাচনে বেশ মৌলিকতার, একজন নিষ্ঠাবান গবেষকের পরিচয় রেখেছেন। গ্রন্থে যাঁদের প্রবন্ধ         অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাঁদের বেশিরভাগ প্রাবন্ধিকই ইতোমধ্যে গবেষণাকর্মে মৌলিকতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছেন। প্রথম প্রবন্ধটি লিখেছেন প্রফেসর ডক্টর আনিসুজ্জামান। ‘বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা’ শিরোনামে উপস্থাপিত প্রবন্ধে তিনি স্বামীজির ভাবভাবনা নিয়ে যে-কথাগুলো বলেছেন তা গ্রন্থটিকে একটি যথার্থ গবেষণাকর্ম হিসেবেই পরিচিত করে দিয়েছে। ইতিহাসের বিচারনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, ধর্মের যুগোপযোগী ব্যাখ্যা, দর্শনের আলোচনা এবং আত্মপ্রত্যয়ের শক্তি দিয়ে কীভাবে স্বামীজি ভারতমাতৃকার ভাবমূর্তি অঙ্কন করেছিলেন তার একটি স্পষ্ট বাণীরূপ পাওয়া যায় এই প্রবন্ধে। দ্বিতীয় প্রবন্ধের লেখক ড. তাপস বসু। স্বামী শুদ্ধানন্দ, স্বামী বিমলানন্দ, স্বামী বিরজানন্দ, স্বামী বোধানন্দ, স্বামী আত্মানন্দ, স্বামী স্বরূপানন্দ, স্বামী সারদানন্দ, স্বামী প্রকাশানন্দ, স্বামী অভেদানন্দ, স্বামী সদানন্দ প্রমুখ দশজন ভাবশিষ্য কীভাবে জীবন বাজি রেখে স্বামীজির জীবনদর্শন বিশ্বময় প্রচার করেছিলেন তার একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে এ-প্রবন্ধে।

তৃতীয় প্রবন্ধটি লিখেছেন ডক্টর দিলীপকুমার মোহান্ত। এখানে স্বামীজির সমন্বয়ী ধর্মভাবনা নিয়ে গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রাবন্ধিক আলোচনা করেছেন। পরবর্তী প্রবন্ধের নাম ‘বিবেকানন্দের নারীভাবনা’, প্রাবন্ধিক ডক্টর শান্তিনাথ ঝা। মাতৃশক্তি ছাড়া যে কোনো জাতির সার্বিক মুক্তি কখনো আসতে পারে না, এই চরম সত্য বর্তমান প্রবন্ধে উদ্ঘাটিত হয়েছে। পরবর্তী প্রবন্ধটি লিখেছেন আমার প্রাক্তন অগ্রজ সহকর্মী অধ্যাপক গোলাম মুস্তাফা। প্রচলিত অর্থে স্বামীজিকে একজন সমাজ-সংস্কারক হিসেবে অভিহিত করতে না-পারলেও প্রকারান্তারে তিনি যেভাবে ভারতীয় সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে অসি ও মসি চালিয়েছিলেন তাতে তাঁকে কেবল একজন যেমন-তেমন সংস্কারক বলেই অভিহিত করা যায় না, বরং তাঁকে ভারতীয় সংস্কারকদের অগ্রদূত বলেই স্বীকার করে নিতে হয়। এ-প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, স্বামী বিবেকানন্দই ভারতবর্ষে প্রথম নিজেকে একজন সমাজতন্ত্রী বলে ঘোষণা করেছিলেন। প্রাবন্ধিক  এ-বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। ডক্টর লায়েক আলি খানের প্রবন্ধটিও স্বামীজির সমাজভাবনার ওপর লিখিত। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ডক্টর বিকাশ রায় স্বামীজির জীবনদর্শনের ওপর আলোকপাত করেছেন। অধ্যাপক রাজর্ষি চক্রবর্তীর প্রবন্ধে বাঙালির ইতিহাসে স্বামীজির স্থান নির্ধারণের চেষ্টা আছে। বর্তমান সংকলিত গ্রন্থের সম্পাদক ডক্টর মধু মিত্র। নারীশক্তির উদ্বোধন ও নারীশিক্ষা বিস্তারে স্বামীজির আন্তরিক প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করেছেন। মাতৃজাতিকে সুশিক্ষায় স্বশিক্ষিত করে তুলতে না পারলে যে ভারতমাতৃকার মুক্তি নেই, বিবেকানন্দের এই চিরন্তন ভাবনারই এক সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে বর্তমান প্রবন্ধে। ডক্টর তপনকুমার পান্ডে আধুনিক ভারতবর্ষের যুগগুরু হিসেবে স্বামী বিবেকানন্দকে মূল্যায়ন করেছেন।

সুমন ভট্টাচার্য লিখেছেন ‘অধিকারের জ্যামিতি : কায়স্থ বিবেকানন্দ ও ব্রাহ্মণ সমাজ।’ কায়স্থ বিবেকানন্দ কীভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদের বেদিমূলে আঘাত হানলেন, এতে তাঁর বিপ্লবী ভূমিকা কী, এ নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে বর্তমান প্রবন্ধে। ডক্টর বিমলচন্দ্র বণিক লিখেছেন ‘স্বামীজির ভারতভাবনা ও বর্তমান প্রেক্ষিত।’ কুড়ি শতকের শুরুতে বিবেকানন্দ ভারতভূমি নিয়ে যে-চিন্তা করেছিলেন বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে তার মূল্যায়ন করা হয়েছে বর্তমান প্রবন্ধে। স্বামীজি যে কত দূরদ্রষ্টা ছিলেন, তার প্রতিও আলোকপাত করা হয়েছে। পরবর্তী প্রবন্ধে ডক্টর শিবশঙ্কর পাল বিবেকানন্দের ভারতচেতনার ওপর আলোচনা করেছেন। ‘উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্যবরাণ নিবোধতঃ। ক্ষুরস্যধারা নিশীথয়া দূরত্যয়া দুর্গম পথস্তৎ করয়ো বদন্তি’ – কঠোপনিষদের এই শ্রুতির দ্বারা স্বামীজি গভীরভাবে স্নাত হয়েছিলেন। তাই গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করেও তিনি ভারতচেতনার অন্তর্মূলে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। ডক্টর শ্যামলচন্দ্র দাস বিবেকানন্দের ভারতচেতনার ওপর আলোকপাত করেছেন। তবে এর সঙ্গে মাতৃভাষার প্রতি স্বামীজির আবেগও এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। সন্ন্যাসীর আবরণে স্বামীজি কীভাবে ভারতবর্ষকে এগিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দান করলেন,  রফিকুল ইসলামের প্রবন্ধে তা যথার্থভাবে ফুটে উঠেছে। ভারতীয় পরিপ্রেক্ষণায় স্বামীর সমাজভাবনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন শীলা মন্ডল। স্বামীজি কীভাবে তাঁর দর্শনভাবনায় প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করলেন, এ-বিষয়ে আশুতোষ বিশ্বাস আলোকপাত করেছেন। শ্রীতম মজুমদার বিবেকানন্দের দর্শনের একটিমাত্র লক্ষ্য ‘আশিষ্ঠোদ্ররিষ্ঠো বলিষ্ঠ’ মানুষ তৈরি করা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। অরিজিৎ ভট্টাচার্য টলস্টয়ের চোখে বিবেকানন্দকে মূল্যায়ন করেছেন। তনুকা চৌধুরী ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূল্যায়ন করেছেন। ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতিতে বেদান্ত এবং তাতে স্বামীজির ভূমিকা নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন দেবব্রত বড়াই।

আমাদের অবশ্যই স্বীকার করে নিতে হবে যে, প্রকৃতপক্ষে বিবেকানন্দের দর্শনচিন্তা ও মননভাবনার ব্যাপ্তি যেমন ছিল প্রসারিত, তেমনি ছিল সুগভীর। রামমোহন রায়ের মতো বিবেকানন্দও প্রাচ্য ও প্রতীচ্য উভয় দর্শন ও সংস্কৃতির ধারায় স্নাত হয়েছিলেন। তিনি উভয়ের অন্তর্লোকে প্রবেশ করে উভয়ের মর্ম উপলব্ধি করতে পুরোপুরি সমর্থ হয়েছিলেন। প্রতীচ্যের কর্মোদ্যম, ব্যবহার-কুশলতা, জাগতিক উন্নতির জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ সবই তাঁকে যেমন মুগ্ধ করেছে, তেমনি তা মন্থন করে প্রাচ্যের মানুষের মধ্যে সেই উন্নতিকে সঞ্চারিত করার তাগিদও তিনি অনুভব করেছেন। কিন্তু ভারতের শাশ্বত ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে প্রতীচ্যের জীবনধারার অনুবর্তনের তিনি পক্ষপাতী ছিলেন না। আবার ভারতের শাশ্বত ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে গিয়ে কখনো তিনি ঊর্ধ্ববাহু হয়ে কেবল ভারতবর্ষের গুণকীর্তনেও উন্মত্ত হননি। ভারতবর্ষের অধোগতি ও দৈন্যদশা সম্বন্ধেও তিনি পুরোপুরি সচেতন ছিলেন এবং সেসব বিষয়ে তাঁর ধিক্কারও নানাভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

ভারতবর্ষকে যেমন বিবেকানন্দ তাঁর নিজের অতীত ভাবাদর্শের মহত্ত্ব সম্বন্ধে সচেতন করেছেন, তেমনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিলনসেতুকেও ঐকান্তিকভাবে তিনি কামনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এতে প্রাচ্য-প্রতীচ্য উভয়েরই অপূর্ণতা দূর হয়ে পারস্পরিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাই তাঁর দর্শন ভারতভিত্তিক হলেও তা জগতের সমস্ত চিন্তাধারা থেকে যা কিছু কল্যাণকর তা আহরণ করে নিজেকে পরিপুষ্ট ও পরিবর্ধিত করেছে। অনেকে তাঁর মধ্যে মার্কসীয় চিন্তাধারার সাযুজ্য দেখতে পেয়ে পুলকিত বোধ করেন, আবার কখনো ধর্মীয় চিন্তাধারার ছায়ার পরশ পেয়ে প্রগতিশীলরা পিছিয়ে আসেন। তাঁরা মনে করেন বিবেকানন্দ প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু তাঁর দর্শন আবর্তিত হয়েছে শুধু একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে, আর তা হলো মানুষ। তাঁর দর্শনের একটিই লক্ষ্য, একটিই উদ্দেশ্য – মানুষ তৈরি করা। ‘আশিষ্ঠোদ্ররিষ্ঠো বলিষ্ঠ’ সেই মানুষকে তিনি চেয়েছেন, যার শরীর হবে ‘বিমর্ষণ’, জিহবা হবে ‘মধুমত্ততা’, যার কাছে ‘ইয়ং পৃথিবী সর্ব। বিত্তস্য পূর্ণাস্যাৎ’, অর্থাৎ সর্বদিক থেকে সমৃদ্ধ জীবন যার। সেই মানুষ হবে সবদিক থেকে অভী, ভয়শূন্য, কারণ তার বাইরে দ্বিতীয় বলে কোনো কিছু থাকবে না, যার থেকে তার ভয় সঞ্চারিত হতে পারে, এবং সেজন্যই সেই মানুষ হবে অদ্বৈতে প্রতিষ্ঠিত।

বর্তমান সংকলিত গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি প্রবন্ধে এ-কথাই বিঘোষিত হয়েছে। সম্পাদক ডক্টর মধু মিত্র অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রবন্ধগুলো নির্বাচন করেছেন। ডক্টর মিত্রের ভাষায় : ‘সংকলন গ্রন্থটি বিবেকানন্দের ‘ভারত-বিনির্মাণ’র সেই পাল্টা উদ্দেশ্যকে স্পর্শ করার অভিপ্রায়ে পরিকল্পিত। মোট একুশটি প্রবন্ধ এখানে সংকলিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও গুণী অধ্যাপকদের মননশীল ভাবনা-চিন্তার এক বর্ণময় কোলাজ নির্মিত হয়েছে এখানে – এমনই বিনম্র প্রত্যাশা সংকলকের’ (সম্পাদকের কথা : পৃ ১০)। সম্পাদক মহোদয়ের এমন প্রত্যাশার সঙ্গে আমাদেরও কোনো অসদ্ভাব নেই। এ ধরনের একটি সর্বাঙ্গসুন্দর গ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য প্রকাশক ও সম্পাদক মহোদয়কে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। মৌলিক প্রবন্ধ উপহারের জন্য প্রাবন্ধিক মহোদয়দেরও জানাই সশ্রদ্ধ প্রণতি। আমরা সংকলনগ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।