বেঙ্গল শিল্পালয়ের বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের প্রদর্শনী নগরনামা

লেখক: মোবাশ্বির আলম মজুমদার

পাহাড় আমাকে ডাকে, থেমে থাকে অনড় অচল,
আমি তার বুক খুঁড়ে খুঁজে ফিরি ঝরনার জল।
Ñ স্বার্থে ও শর্তে, কাচের চুড়ি বালির পাহাড়,
Ñ জাফর আহমদ রাশেদ

নগরায়ণ মানবসভ্যতার শক্তিশালী প্রক্রিয়া। আমাদের শহর কেমন হওয়া দরকার? এ-বিষয়ে কমবেশি সবাই এক সুন্দর চিত্রকল্প নিয়ে নাগরিক জীবন যাপন করেন। নানান মাধ্যমের উপস্থাপনায় আগামীর নগরের রূপভাবনা প্রকাশ করেছেন একদল গবেষক। আমাদের নগরগুলো বিস্তৃত হচ্ছে। ক্রমে দখলে যাচ্ছে জলাভূমি, নদী, নদীপ্রবাহ। এমন প্রকৃতিপীড়নের বিপক্ষে সচেতন শহরবাসী কী ভাবেন। কেমন করে এ-সভ্যনগরী গড়ে তোলা যায়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে নানামাত্রিক দৃশ্যপট। বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের গবেষণাকর্মের মধ্যে গুরুত্ব পেয়েছে Ñ ভবিষ্যতের ভাবনায় নতুন রূপকল্প রচনা করা। সে-পরিপ্রেক্ষিতে গবেষণালব্ধ জ্ঞান, তথ্য ও পরিকল্পনা, প্রত্যাশা সবার সামনে উপস্থাপন করা।
‘নগরনামা’ প্রদর্শনীর মূল সেøাগান Ñ বসবাসের ভবিষ্যৎ। প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত বিষয়ের মধ্যে দেখা যায় বর্তমানের নগর আর ভবিষ্যতের নগর স্থাপত্যের তুলনামূলক চিন্তার প্রকাশ।
নগর-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ভাবনায় Ñ ‘নগরায়ণ হলো নগরীয় হওয়ার প্রক্রিয়া। কিছুটা বিস্তারে বলা যায়, নগরায়ণ হচ্ছে একটি অঞ্চল বা দেশের জনসংখ্যার তুলনায় নগরবাসী জনসংখ্যার আনুপাতিক হার
বাড়তে থাকবে এবং একপর্যায়ে গোটা অঞ্চল বা দেশই সম্পূর্ণভাবে নগরায়িত সমাজে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।’
এমন হতে থাকলে আমাদের নতুন করে নগর নিয়ে ভাবতে হয়। নতুন ভাবনা উপস্থাপন করার জন্য বেঙ্গল ইনস্টিটিউট দীর্ঘসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহর নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে গবেষণা করেছে, বিভাগীয় শহরের উল্লেখযোগ্য চেনা স্থান নিয়ে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করে। উন্মুক্ত জলাভূমি, কৃষিভূমি, নদী-নালা, খাল-বিল এগুলো আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য জরুরি। আধুনিক নগর গড়ে তোলা যায় এসব ধ্বংস না করেই।
বাংলাদেশের উর্বর ফসলি জমি, জলা-হাওর, নদী, খাল মানুষকে পুষ্টি দেয়। উন্নয়ন ও নগর গড়ার অপরিকল্পিত আকাক্সক্ষা মানবিক জনপদ গড়ে তুলতে পারে না। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য শহর গড়ে উঠেছে নদীকে ঘিরে। ফলে উন্নয়নের অপরিকল্পিত আগ্রাসন সেসব জলাভূমি, নদীকে গ্রাস করছে। বেঙ্গলের গবেষণা বলছে Ñ ‘নগরনামার পূর্বশর্ত হওয়া উচিত জলজ পরিকল্পনা। পানি ও পানির প্রবাহ ছাড়া বাংলাদেশের জীবন-যাপন অসম্ভব। প্রগতি,
প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন এই তিনের নতুন মোহনা, জীবন ধারণ ও বসবাসের নতুনতর চিন্তাভাবনা ও রূপকল্পনা।’
শহর সবার জন্য Ñ এ-কথা সত্যে পরিণত করে শহরকে সাজাতে হলে দরকার প্রকৃতিবান্ধব স্থাপনা। সবুজায়নের সঙ্গে যোগ করতে হবে জলাশয়, নদী, খাল। কংক্রিটের বিল্ডিং যেমন শহর গড়তে প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পরিকল্পিত সবুজ, জল-জঙ্গল। বেঙ্গলের নানামুখী গবেষণার প্রকাশ এ-প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের এ-আয়োজন থেকে আমরা পরিকল্পনামাফিক বিস্তৃত স্থাপত্যের নান্দনিক চিন্তা খুঁজে পাই। প্রদর্শনীতে রাখা নগর পরিকল্পনার নকশাগুলোতে বারবার দেখা গেছে উন্মুক্ত খেলার মাঠ, সবুজায়ন, পরিকল্পিত নাগরিক সুবিধার দৃশ্যায়ন। ঢাকার নাগরিক সুবিধা ছড়িয়ে যেতে দেখা যায় পার্শ্ববর্তী শহর নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জের দিকে। সেসব শহরকে পরিকল্পনা করা হয়েছে সে-অঞ্চলের খাল অথবা নদীকে ঘিরে। দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের একটি খাল সুন্দর নকশার মাধ্যমে শহরের প্রাণস্পন্দন হিসেবে বিবেচনায় এসেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ গবেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নগরব্যবস্থা সম্পর্কে মত হলো Ñ ‘এখন চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট মেট্রোপলিটন শহর হয়ে গেছে। … ভবিষ্যতে আমরা দেখতে পাব, ৬৪টি জেলা শহর, যদিও এর অনেকগুলো এখনো বেশ ছোট, ২০৫০ সাল নাগাদ এই জেলা শহরগুলো মাঝারি বা বড় শহরে রূপান্তরিত হবে। পাশাপাশি উপজেলা শহরগুলো আরো বড় হবে। ইউনিয়ন কেন্দ্রগুলো ক্রমশ শহরে রূপান্তরিত হবে।’
এ-গবেষণার বার্তা জানান দেয়, আমরা পুরো বাংলাদেশকেই এক সময় নগর হিসেবে দেখতে পাব। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে এখনই ভবিষ্যৎ শহরায়ণ বা নগরায়ণের ধরন নিয়ে আয়োজিত এ-প্রদর্শনী আমাদের কাছে এক নতুন নগরনামা হিসেবে স্থান করে নেবে।
বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান চিত্রশালায় গত ২ নভেম্বর শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ১৫ ডিসেম্বর।

Leave a Reply

%d bloggers like this: