মকবুলা মনজুর (১৯৩৮-২০২০) আমাদের

কথাসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক। শক্তিশালী লেখক হয়েও তিনি এ-সময়ে তেমন পাদপ্রদীপের আলোয় আসেননি। কোনোদিন প্রচারও চাননি। প্রচারবিমুখ এ-লেখক গল্প-উপন্যাস মিলে একটা সময়ধারায় নিছক কম লেখেননি। তাঁর লেখালেখির কিছু উদাহরণ : আর এক জীবন (১৯৬৮), জলরং ছবি (১৯৮৪), অবসন্ন গান (১৯৮২), বৈশাখে শীর্ণ নদী (১৯৮৩), আত্মজ ও আমরা (১৯৮৮), অচেনা নক্ষত্র (১৯৯০), পতিতা পৃথিবী (১৯৮৯), প্রেম এক সোনালী নদী (১৯৮৯), শিয়রে নিয়ত সূর্য (১৯৮৯), কনে দেখা আলো (১৯৯০), নদীতে অন্ধকার (১৯৯৬), লীলা কমল (১৯৯৬), নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস (১৯৯৩) প্রভৃতি। আরো লিখেছেন কিশোর উপন্যাস : ডানপিটে ছেলে (১৯৭৮), কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস (১৯৮৮), মহেশখালিতে মুকুট (১৯৯০), সাহসী ছেলে (১৯৯১), দুরন্ত মুকুট (১৯৯৬) ইত্যাদি। তবে তাঁকে বিশেষভাবে আমরা আমলে আনি পরিশ্রমী ও দায়বদ্ধ লেখা কালের মন্দিরা (১৯৯৭) উপন্যাসের জন্য। এটি বেশ আকর্ষক ও দীর্ঘায়ত উপন্যাস। বক্ষ্যমাণ আলোচনাটি এ-উপন্যাস ঘিরেই। আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিনিধিত্বশীল কালজয়ী উপন্যাসের ভেতর দিয়ে মকবুলা মনজুরকে স্মরণ করতে চেষ্টা করব। বস্তুত, এর ভেতরেই মকবুলা মনজুরের কথকশক্তির পরিচয় পাওয়া সম্ভব। কালের মন্দিরা বস্তুত লেখকের জীবনেরই মন্দিরা। রুচিশীল, উন্নত মননের, অভিজাত সাংস্কৃতিক রুচির চিন্তাপ্রবণতায়

তাঁর ‘নারী’ পরিচয়টি – বলা যায় এখানে একপ্রকার ছাপিয়ে গেছে। প্রগতিশীল এবং রবীন্দ্রমনস্কতায় ঋদ্ধ মকবুলা মনজুর বাংলাদেশের অগ্রগণ্য লেখকদের একজন বলে মনে করি।

দুই

কালের মন্দিরা উপন্যাসটি প্রায় এক শতাব্দীর প্রজন্মান্তরের দ্বন্দ্ব, জীবন ব্যবস্থাপনার স্বরূপ ও ব্যক্তি-সম্ভাব্যতার প্রশ্নদীর্ণ সম্ভাব্যতায় উত্তীর্ণ। আত্মজীবনীমূলক এ-উপন্যাসটি কয়েক প্রজন্মের জীবনবার্তা। এর ফ্ল্যাপে আছে : ‘এই সুবিশাল উপন্যাসের পটভূমিকায় রয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর অবসান থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত দীর্ঘ এক ধাবমান কাল। যে কাল বয়ে চলে অনন্তকাল ধরে অনন্ত জীবন প্রবাহে।’ এটি লক্ষ্যনির্দিষ্ট প্লট। ৭২ খণ্ডের উপন্যাসের শুরু এভাবে : ‘কালের যাত্রার ধ্বনি কি কেউ শুনতে পায়? শুনতে পায় কি তার দুই হাতের মন্দিরার ঝংকার? যার রথ প্রতিনিয়তই উধাও, সেই ধাবমান কাল কি কিছুই ফেলে যায় না? যায়। আর সেই ফেলে যাওয়া লক্ষকোটি সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সাফল্য আর ব্যর্থতার হীরা চুনি পান্না দিয়ে গাঁথা জীবনের মালাখানি সম্পূর্ণ করে তোলার জন্যই বুঝি আজ শায়লা হোসেনের স্মৃতিসমুদ্রে এমন উথাল-পাথাল। এই মন্থনে সুধা অথবা বিষ, অমৃত অথবা গরল সব তিনি থরে থরে সাজিয়ে নেবেন নিজের হৃদয় মন আর বিবেকের সামনে।’ উপন্যাসের শুরুতেই শায়লা হোসেনের জীবনকাহিনি, তার পরিণতি ও উত্থানপর্বের মুখবন্ধ উল্লেখ করেন লেখক। এটি শায়লা হোসেনের কাহিনি, আর সে-কাহিনি বয়ান ও পটভূমি নির্ণয়ে লেখক বেছে নেন তার ‘মা মাসুদা খাতুনের কালের কথা, শায়লা হোসেনের আব্বা আমিনুর রহমান শেখের কালের খণ্ড  খণ্ড   কাহিনি   অথবা   ঘটনার   কথা। এই দুজন মানুষ বহুদিন আগেই তাঁদের সাথে পারিবারিক গোরস্তানের ছায়াঘেরা মাটির সাথে মিশে মাটি, ঘাসের সঙ্গে মিশে ঘাস হয়ে গেছেন। তাঁদের সুযোগ্য পুত্র-কন্যারাও কেউ কেউ এখন জীবনের অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়ে বার্ধক্যের ভারে ক্লান্ত’ –    অনিবার্য এবং পঠনঘনিষ্ঠ এক কাহিনিকথনে নিজের ভেতর দিয়ে কয়েক যুগ আগের সময়ে (flashback) ফিরে যান শায়লা হোসেন। সেই কাল তার কাছে স্পষ্ট। তখনো তো ভারত ভাগ হয়নি। ‘বিরাশী বছরের বৃদ্ধা মাসুদা খাতুনের জরায় ন্যুব্জ দেহ আর কাশফুলের পুঞ্জের মতো চুলের কথা নয়, নয় তাঁর স্মৃতিভ্রষ্ট জীবনের অসংলগ্ন চিন্তার কথা। তার চেয়ে ফিরে যাই সত্তর বছর আগের মাসুদা বেগমের কথায়। সেই যখন বারো বছর বয়সে সোঁদাল পুলের মতো সোনার বরণ আর ফিঙ্গেপাখির পালকের মতো কালো চুলের পুচ্ছ নিয়ে ইব্রাহীম মিয়ার দ্বিতীয় কন্যা মাসুদা ডাকের সুন্দরী হয়ে উঠলো তখনকার কথা বলি। সেই মাসুদা খাতুনের কথা বলি’ – এমন উচ্চারণেরও নিবিষ্টতায়, কাল ও সমাজ প্রতিপার্শ্ব নির্মাণের অঙ্গীকারে কালের মন্দিরার কাহিনি বিরচিত। সময়ের সূত্রে একে একে কাহিনিতে প্রবিষ্ট হতে থাকে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতির আবহে বিচিত্র জীবন। মাসুদা বেগম, আমিনুর রহমান একটা পর্যায়ে বা এক প্রজন্মের নায়কের অভিনয় করলেও তাদের পশ্চাদপটে অঙ্কিত হন ইব্রাহীম মিয়া, আবদুল হামিদ, মজিবর মিয়া, আবদুস শাহেদ মিয়া, অন্যদিকে মীর বাড়ির মোয়াজ্জেম মীর প্রমুখ। মুগবেলাই গ্রামে তখন সামন্তবাদী ব্যবস্থায় জাতপাত, আচার-মর্যাদা ভেদাভেদ বেশ উজ্জ্বল। উপন্যাসে ইব্রাহীম মিয়ার মেয়ে মাসুদা বেগমের আমিনুর রহমানের সঙ্গে বিবাহ অবধি মুগবেলাই গ্রামের আলাদা একটা পরিচয় এখানে পাওয়া যায়, যার মধ্যে লুকায়িত আছে সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থার রূপায়ণ এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একপ্রকার আধা সঞ্চালনের প্রলেপ। যে-সমাজব্যবস্থায় আমিনুর রহমান শিক্ষকতা ছেড়ে পুলিশে চাকরি নেন – অনেকটা শহুরে নাগরিক হন; মর্যাদা ও প্রতিপত্তিতেও উল্লেখযোগ্য প্রসারণ ঘটে তার – যেটা একটা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নজরে আসে। তবে উপন্যাসে আমিনুর রহমান যে-সময় নিয়ে চিত্রিত সেখানে শিল্পিত বিশ্বাসে তার বড় ছেলে এবং সংসারে অন্যান্য ছেলেমেয়ের জন্ম – শিক্ষা-দীক্ষা শৈশব-কৈশোর অতিক্রমণের পর্ব কিংবা আমিনুর রহমানের বাড়ন্ত বয়সের ক্লান্তি, মাসুদা বেগমের পতিপ্রেমের পরাকাষ্ঠার প্রতিরূপ একদিকে যেমন উপন্যাসের সময়কে এগিয়ে নিয়ে যায়, অন্যদিকে তেমনি মানবসম্পর্কের নিরিখে আধা-পুঁজিবাদী মধ্যবিত্ত সমাজের বিবর্তনের পরিকাঠামোও নজরে আসে। উপন্যাসটির প্লট সংগঠন বেশ ঋজু ও দৃঢ়। মহাকাব্যিক পরিসরের এ-উপন্যাসের কাহিনিতে বিচিত্র চরিত্রের সমাগম ঘটালেও প্লট-নির্মাণ দক্ষতায় তা তেমন অসংলগ্ন মনে হয় না। প্রসঙ্গত, শিল্পীর দক্ষতাকে যৌক্তিক প্রশংসায় এনে এমনটা মনে রাখতে হয় যে, দীর্ঘায়ত পরিসরে অনেক চরিত্র-কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রেখেও শুধু নিছক কল্পনা-আদৃত আত্মজীবনীর ফ্রেম নয় বরং এর আষ্টেপৃষ্ঠে বিবৃত হয়েছে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবাচ্ছন্ন  জীবনের প্রবৃত্তি প্রসঙ্গ ও সমৃদ্ধ মানবের সামগ্রিক রূপায়ণ।

তিন

কয়েকটি প্রজন্মকে চিত্রিত করা হয়েছে সমাজ ও সময় ভাবনার পরিপ্রেক্ষিত থেকে। বাঙালির ভূমিকাঠামোয় প্রতিটি প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব উৎপাদন-সম্পর্কের সূত্রে সমাজ-উপযোগিতার (social utility) বন্ধনে নিজস্ব বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আকরে নির্ধারিত হয়। মকবুলা মনজুর একেকটি প্রজন্মকে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ণীত ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস-মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে। ইব্রাহীম মিয়া, আমিনুর রহমান, সূর্য, রণজয় এক একটি প্রজন্মের প্রতিভূ। এরা যে মূল্যবোধ ও আচারে বেড়ে ওঠে তা অন্য সময়ে পরিবর্তিত হয়। সমাজে আধুনিকতা এলে নবীন-প্রবীণ, প্রাচীনপন্থা-নব্যপন্থা, অতীত-বর্তমান ইত্যাদিতে বিশ্বাস ও মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব চলে। সমাজের এমন বিশ্বাসগুলো সভ্যতার প্রণোদনায়, অনিবার্য উত্তাপের তাগিদে বদলে যায়। এজন্য উপন্যাসে শিউলি (শায়লা রহমান) প্রলম্বিত এক সময়কে অবলোকন করেন – আধা-সামন্ত ও আধা-পুঁজিবাদী সমাজে কীভাবে প্রথাগত-প্রাচীন বিশ্বাস ও সংস্কারের পাদপীঠে জন্ম নেয় অন্য মূল্যবোধের কিংবা মধ্যবিত্ত চরিত্রের ধ্যান-ধারণা যখন বদলে যায়, অতিশয় ভোগবাদী হয়ে ওঠে তখন বিচ্ছিন্নতা বা অবক্ষয়ী প্রবণতা ব্যক্তিমানসের ভেতরে কীভাবে প্রগাঢ় রূপে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে – এসব প্রশ্ন কালের মন্দিরা উপন্যাসে ‘ব্যক্তি’ তৈরি করে। পরিবারকে ঘিরে আর পরিবারের মূল্যবোধ, আধুনিক চিন্তাধারা, প্রজন্মান্তরের প্রণোদনা এক ধরনের দ্বন্দ্বমুখরতাকে সামনে নিয়ে আসে। এ-প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকে চরিত্রের ইতিহাস, সংস্কার, আড়ষ্ট মূল্যবোধ, প্রণোদনা এবং সম্ভাবনার প্রতীকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চাঞ্চল্যকর শক্তি। শিউলি এ-উপন্যাসে খুব সম্ভাব্য চরিত্র; শিউলি শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করে – আর এর মধ্যেই উপন্যাসের পরিবেশ ভিন্ন প্রতিকূলতায়, প্রণোদনায় তাৎপর্যপূর্ণতা পায়। শিউলির বাবা আমিনুর রহমানের চাকরিসূত্রে তার একাধিক শহরে থাকার অভিজ্ঞতা এবং সে-পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা; বড়ভাই সূর্য তার আদর্শ; শিউলির মনস্তত্ত্বে পলে পলে বিবিধ পর্যায়ের আবেগ যুক্ত হয়, বই পড়ে, প্রকৃতি দেখে, পরিবারের অন্য সবার সান্নিধ্যে থেকে শিউলি নিজের অনিবার্যতাকে স্বীকার করে নেয়। শিউলি একটা পর্যায়ে সবকিছু উপেক্ষা করে ইশতেয়াককে গ্রহণ করে – যে-ইশতেয়াক অতি দ্রুত তার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। পুরুষতন্ত্রের প্রাবল্য শিউলিকে মনঃকষ্ট দেয়; তাৎক্ষণিক পারিবারিক বিপর্যয়ে তাকে নানাভাবে প্রতিহত করলেও ঔপন্যাসিকের লক্ষ্য-অভিসারী প্রবণতায় শিউলির জীবনে পরবর্তীকালে যুক্ত হয় মুনীরের কাহিনি। বৈচিত্র্যময় জীবনে জীবনবাদের নানা নিরীক্ষা চলতে পারে আর সে-কারণেই বুঝি অতি দ্রুত অপসৃত হয় শিউলি-ইশতেয়াক পর্ব। আখ্যানে যদিও ইশতেয়াকের ঔরসজাত সন্তান কেকা তার জীবনকে ঘিরেই বড় হয় এবং নিরবচ্ছিন্ন নির্বিঘ্নতায় শিউলির সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়। মকবুলা মনজুরের ব্যক্তিজীবনের প্রভাব উপন্যাসের প্লটকে গড়ে দেয় – সে-কারণেই জীববৈচিত্র্যের নিরীক্ষা-প্রবণতাকে সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়া বুঝি সহজ হয়। নায়ক চরিত্র হিসেবে সময়ের আঁচড়ে শিউলি গ্রথিত হলেও যে-প্রতিবন্ধকতায় এ-চরিত্রটি বিশাল জীবনাগ্রহকে ধারণ করে তা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ও শিল্পিত বাঞ্ছা পায়। বিশ্লেষক বলেন, কালের মন্দিরায় শিউলি ইতিহাসেরই চরিত্র, এই ইতিহাসেরই নিয়ন্ত্রক ও দর্শক। ‘চরিত্র’ হতে পারি আমরা অনেকেই বা সকলেই, কিন্তু নিয়ন্ত্রক হতে পারি না সবাই। আর দর্শক হওয়া তো সহজ নয় মোটেও। এই কঠিন কাজটি করানো হয়েছে শিউলির হাতে নিপুণ ভঙ্গিতে। একটি বিবর্ণ শতাব্দী বর্ণিল হয়ে উঠেছে শিউলির উপলব্ধির গুণে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক পক্ষপাত মনে হয় গ্রাস করেছে লেখককে –    প্রচণ্ড মনঃপীড়ার সময়ও শিউলি চটজলদি উপন্যাস রচনা করে এবং বাজারে হটকেকের মতো তা বিক্রিও হয়, শিউলির পড়াশোনা চলতি পুরুষ-প্রতাপের সমাজে বিঘ্নিত হয় না, (যদিও প্রথম স্বামী পরিত্যক্ত বা দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণকৃত নারীকে সমাজ কী রূপে গ্রহণ করে কিংবা ঘরে-বাইরে তার পীড়ন!) কোনো সময়ই চাকরির ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়নি – এ-বিষয়গুলো একটু আরোপিতই মনে হয় বইকি। মুনীরের বন্ধু মাহতাবের মধ্য দিয়ে শিউলি অনেক সমস্যা সমাধানের পথ পায় কিংবা দুর্বিষহ মানসিক চাপে মুহূর্তগুলি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়, তবু অনেক ক্ষেত্রে উপন্যাসে নিছক কিছু সিচুয়েশনের জন্ম দিয়ে শিউলি চরিত্রটির ব্যাপ্তি ও সম্ভাব্যতার  নিরীক্ষা একটু বেশিই আরোপিত ও সরল মনে হয়েছে। শিউলি মানব-সম্পর্কের  সূত্রে যে-বিশালতায় অঙ্কিত সেখানে তার মা-বাবা থেকে শুরু করে অনেক ভাইবোন এবং পরবর্তীকালে ইশতেয়াক প্রসঙ্গ এবং তারপর তার সন্তানাদি, স্বামী-শাশুড়ি; নিজের ব্যক্তিজীবন, সমাজ-প্রতিপত্তি-মর্যাদা ইত্যাদি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তাকে উপন্যাসে উজ্জীবিত করে। এ বিশাল চরিত্রকে উপস্থাপনে ঔপন্যাসিকের কিছু দায় ও চরিত্রটির ভারবহনের সামর্থ্যরে প্রশ্ন একটু থেকেই যায় বইকি!

চার

‘কালের মন্দিরা যে সদাই বাজে ডাইনে বাঁয়ে দুই হাতে/ সুপ্তি ছুপে নৃত্য উঠে নিত্য নতুন সংঘাতে।’ লেখকের এই অনুপ্রেরণায় যে-সময়ের উপন্যাস – সে-সামন্ত সমাজে বাঙালি মুসলমানদের আধুনিকতা অর্জনের পথে অনেক সংস্কার ও প্রতিবন্ধকতা, ভেদ, এক বংশের সঙ্গে অন্য বংশের মানুষের বংশমর্যাদার পার্থক্য ইত্যাদিতে মানুষের সমাজ-মর্যাদা বাঁধা থাকত। আবার তেমনি তার নিমিত্তেই গড়ে ওঠে মূল্যবোধ। শিল্পীর সচেতন সমাজবোধে আমিনুর রহমান যে-সমাজচিন্তা ও দৃষ্টিকে পরিমার্জন করে পুলিশে যোগ দিলেন সে-মূল্যবোধেই সূর্য, জুঁই, শিউলী, রংকু, ঝন্টুরা বেড়ে ওঠে। আধা-সামন্তবাদী ও আধা-পুঁজিবাদী সমাজের যে-প্রকোপ আর বিশ্বাস-মূল্যবোধের যে-বিবর্তন তা আমিনুর রহমান আর মাসুদা বেগমের দাম্পত্য জীবনের মধ্য দিয়ে অনুমান করা যায়। মুগবেলাই গ্রাম থেকে আমিনুর রহমানের বেরিয়ে পড়া আবার কর্মব্যাপদেশ শেষ করে সেখানেই ফিরে যাওয়া এবং জীবনের চিত্রনাট্য থেকে অন্তর্ধান হওয়া – একটা দীর্ঘ আখ্যান – এটি ঝুলে যায় না। মুগবেলাই গ্রামের বর্ণনা আর তার পিঠে আতাউর, বেলীসহ গ্রামের অন্যান্য মানুষের জীবনব্যবস্থাপনার রূপায়ণও সুন্দর ও সাবলীল। সূর্য ও শিউলির ‘হয়ে-ওঠা’র পর্বে স্কুল-কলেজের শিক্ষাদীক্ষা, শিক্ষকের মূল্যবোধ, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং গ্রামের আর্থ-সামাজিক বুনিয়াদের চিত্রার্পণ লেখক সফলভাবে অঙ্কন করেন। এ-ধারায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্রোত, অবিভক্ত ভারতে মাহমুদ তথা সূর্যের বাবার পুলিশের চাকরি, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সঙ্গে মাহমুদের সংযোগ, বিপ্লবী হওয়ার বাসনা ইত্যাদি স্থান-সময়ের ‘ক্রোনোটোপ’ – বিনির্মাণের প্রয়াস :

খড়গপুর শহরটা গড়ে উঠেছে বিরাট রেলওয়ে জংশনকে কেন্দ্র করে। সে-সময়ে রেলওয়ের বেশিরভাগ কর্মচারীই হতেন এ্যাংলো ইন্ডিয়ান অথবা ইংরেজ। শহরটাতে তেলেগু, মাদ্রাজি আর মাড়ওয়ারিও ছিল প্রচুর। প্রচুর উর্দুভাষী মুসলমানও ছিল ওখানকার আদি বাসিন্দা। কিন্তু খড়গপুরের জেলাশহর মেদিনীপুর বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল স্বদেশী আন্দোলন আর সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি বলে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম যারা জনত না তারাও জানত ক্ষুদিরামের নাম। মানুষের মুখে মুখে সেই গান সারাক্ষণ বাতাসে কান্না ছড়িয়ে দিত, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’।

এখানে মিহির স্যারের প্রশিক্ষণ আখড়ায় যোগ দিতে চাওয়া উঠতি তরুণ মাহমুদ আর সূর্যের মধ্য দিয়ে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের একটা রূপ উপন্যাসে উঠে আসে। উঠতি তরুণ সূর্য জাত-পাত ভেদ বোঝে না, নিজের লেখাপড়া-বিদ্যাবুদ্ধির প্রভাবে সূর্য সেন ও ক্ষুদিরাম তার আদর্শে পরিণত হয়। ডি.এল. রায়, গিরিশ ঘোষ, অতুলপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আলোয় উজ্জীবিত সূর্য দেশপ্রেমের তাগিদে বিপ্লবী হয়ে উঠতে চায়। উপন্যাসের সূর্য সংস্কৃতিবানরূপে বুদ্ধির দীপ্তিতে বেড়ে ওঠে। পাশাপাশি সরকারি চাকুরে বাবা আমিনুর রহমান নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসার হিসেবে বর্ণিত হওয়ায় রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির বা জনমানসের সংঘাত এবং দ্বন্দ্বের কারণগুলো নিরূপণ করা সম্ভব হয় :

শহরে হঠাৎ করে একটা তোলপাড় কাণ্ড  ঘটে গেল। বড়  বাজারের সামনে বিলিতি কাপড়ের বহ্ন্যুৎসব করার সময় পুলিশের হাতে বেধড়ক মার খেলো সূর্যদের ক্লাসের কয়েকটি ছেলে, গ্রেফতার হলেন ড্রিল স্যার মিহির সেন। খবর পেয়ে স্কুলের ছেলেরা অনেকে হই হই করে বেরিয়ে এলো ক্লাস ছেড়ে, তারা মিছিল বের করে স্লোগান দিতে লাগলো, ব্রিটিশ সামাজ্যবাদ ধ্বংস হোক। পুলিশ জুলুম চলবে না।

স্কুল-কলেজে নিছক শিক্ষা অর্জন নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষ হওয়ার পরিমণ্ডল এবং সেজন্য যে সাংস্কৃতিক আবহ সেটা সূর্যের বড় হওয়ার মধ্য  দিয়ে লক্ষ করা যায়। আমিনুর রহমানের পুলিশের চাকরির সূত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নজরে আসে। সূর্য সেনের মৃত্যু, সাঁওতালদের বিদ্রোহ, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ – এসব কালপ্রবাহ পারিবারিক চরিত্রের মধ্য দিয়েই উঠে আসে। আমিনুর রহমানের পরিবারে জন্ম হয় শিউলির, বিশ্বযুদ্ধের কারণে নিত্যব্যবহার্য জিনিসের দাম যেমন বাড়ে, তেমনি পরিবারের অস্থিরতাও বাড়তে থাকে। 

পাঁচ

আখ্যানে কুড়ি পরিচ্ছেদের পর শিউলি পঞ্চাশের দশকের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আবহে বড় হতে থাকে। এ-পর্যায়ে বগুড়ার পর শিউলি ভর্তি হয় টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলে। এক্ষেত্রে তাকে পারিবারিকভাবে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। প্রাচীনপন্থা আর নব্যপন্থার দ্বন্দ্বে শেষমেশ জয়ী হয় শিউলির সিদ্ধান্ত। নতুন পথচলায় শিউলি নিজস্বতা নিয়েই বড় হয়। এরপর শিউলির সংসারজীবন এবং প্রতিকূল-অনুকূল পরিবেশে তার যে-জীবনপ্রবাহ সেটা উপন্যাসকে পূর্ণাঙ্গ ও পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। এবং উপন্যাসে সাংস্কৃতিক ও কর্মজীবী শিউলি, সাহিত্যিক শিউলি নিয়ে ঔপন্যাসিকের প্লট-পরিকল্পনা – এমনটা এ-আলোচনায় আগেই উল্লিখিত হয়েছে; এখানে এটুকু বলা চলে, বিন্দুবাসিনী স্কুলের মেধাবী ছাত্রী শিউলি এক দীপ্ত চেতনায়  ভাইয়ের হাত ধরে বাবা আমিনুর রহমানের পরামর্শ অমান্য করে পড়তে এসেছিল এবং সাফল্যের সঙ্গে তা শেষ করেছিল। কিন্তু ঢাকার জীবনে শিউলি প্রবেশের আগে মুগবেলাই গ্রাম, তার মা-বাবা-চাচা-চাচি তাদের সংস্কার-কুসংস্কার, বংশপরম্পরার মূল্যবোধ, মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের মহিমায় সন্তানবাৎসল্য কিংবা বাংলার হাজার গ্রামের প্রতিনিধিত্বকারী মুগবেলাই গ্রামের মানুষের বসবাস চিন্তা-বিশ্বাস ইত্যাদি পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় আখ্যানে স্থিত হয়। এখানে উপন্যাসটিতে একটি পরিবারই সমাজ ও সময়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। এ-প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণের প্রবণতায় মকবুলা মনজুর বাংলাদেশের অনেক জাতীয় ব্যক্তিত্বকে সামনে আনেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অনেক সাহসী বাঙালি চরিত্র, বিভাগোত্তর বাংলাদেশের বায়ান্ন, বাষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তরের অনেক চরিত্র এতে অংশ নেয়। ১৯৯৬ পর্যন্ত এ-উপন্যাসের কালপরিধিতে অনেক রুচিশীল  সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পুনর্মূল্যায়িত হয়েছেন। এসব চরিত্র শিউলি-চৈতন্যের ভিত্তি যেমন গড়ে দিয়েছে :

রাত্রে ওদের দুজনেরই ঘুম আসছিল না সারাটা বাড়ি ঘুমে তলিয়ে গেছে। মুনীর আর শিউলি দুটো চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসে। এই রাজার দেউড়ির ঝুলন বাড়ি এলাকা যেন বিশাল একটা রাতজাগা পাখি। এ এলাকা কখনো ঘুমোয় না। স্বর্ণকারেরা সারারাত রেডিও আর ক্যাসেট-প্লেয়ার বাজিয়ে আর হাতুড়ির ঠকাস ঠকাস শব্দ তুলে পাড়া সরগরম করে রাখে। এ ছাড়াও আছে তাদের রাস্তার ধারে অথবা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা আর খিস্তি। আজ রাতেও তারা জটলা করছে; কিন্তু কিছুটা চাপা উত্তেজনায় থমথমে লাগছে পরিবেশ। মোড়ের লাইট পোস্টের সামনে সাতই মার্চের পর এ-পাড়ার আওয়ামী লীগ কর্মীরা বিশাল একটা ছইওয়ালা নৌকা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এই হিন্দুপ্রধান এলাকায় সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের ঘরের দেওয়ালে রামকৃষ্ণ অথবা গুরুদেবের ছবির পাশে শেখ মুজিবের ছবি ঝুলতে দেখা যায়। ফয়েজ একদিন শিউলিকে ঠাট্টা করে বলেছিল, ‘কি ভাবী খুব তো মিছিল মিটিং করছো, শেখ সাহেবের ছবি যে লটকাওনি দেওয়ালে?’

শিউলি উত্তর দিয়েছিল, ‘শেখ মুজিবকে নেতা বলে মানি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ঘরের দেয়ালে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কোনো অনাত্মীয় মানুষের ছবি রাখবার কথা আমি ভাবতেও পারি না।’ ফয়েজ তার স্বভাবসুলভ বাঁকা হাসিটা হেসে বলেছে, ‘রবীন্দ্রনাথ তাহলে তোমার আত্মীয় কি বলো?’ শিউলি উত্তর দিয়েছে, ‘তার চেয়েও বেশি। আত্মার আত্মীয়।’

মহাকাব্যিক উপন্যাসটিতে ৪৩তম পর্বে শিউলির পরিবারকে ঘিরেই মুক্তিযুদ্ধ-পর্ব চিত্রিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ছবি নয় –    বস্তুত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একটি পরিবারে আতঙ্ক-হতাশা এবং পরিবারের মানুষগুলির চোখে প্রতিপার্শ্বের দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থপর বা স্বার্থহীন মানুষের গতিপ্রকৃতি কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে মধ্যবিত্তের আবেগ, প্রণোদনা ইত্যাদি চিত্রিত হয়েছে। ২৬ মার্চের আগুনলাল রাত্রি কেটে এলো কয়লা কালো সকাল। একবেলার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলো। মানুষ পালাচ্ছে। দাবানলগ্রস্ত পশুর মতো মানুষ ছুটছে ঢাকা শহর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। রাজার দেউড়ি, তাঁতিবাজার এলাকার মানুষেরা ছুটছে বুড়িগঙ্গার দিকে। সদরঘাটে গিয়ে যেভাবে হোক নদী পার হয়ে তারা গ্রামের দিকে চলে যাবে। পেছনে পড়ে রয়েছে তাদের সাজানো সংসার। এক বস্ত্রে ছুটছে সবাই। বড়জোর পুরুষেরা একটা পোঁটলা মাথায়, সামান্য টাকা পকেটে নিয়ে। মেয়েদের কাঁখে বাচ্চা, পেট-কাপড়ে বাঁধা কিছু অলংকার। চলতি পথে পড়ে আছে চেনা মানুষের লাশ। তাকাতে নেই, ওদিকে তাকাতে নেই। কত বাড়ির ভেতরে পড়ে আছে মৃতদেহ। হয়তো সেই দেহগুলো পচে পচে একদিন কংকাল হয়ে যাবে। যদি কখনো স্বাধীনতা আসে তখন তাদের আপনজনেরা ফিরে এসে দেখবে তাদের প্রিয়জনের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অস্থিপিঞ্জরের উপহাস। কিন্তু তার আগেই দলে দলে অবাঙালি এসে ঢুকে পড়ে দখল করতে শুরু করে দিয়েছে শূন্য বাড়িঘর। তারা মিরপুর থেকে আসছে, মোহাম্মদপুর থেকে আসছে। শোনা যাচ্ছে লালমনিরহাট, পার্বতীপুর আর সৈয়দপুর থেকেও কদিন থেকে ট্রেনে করে দলে দলে বিহারি এসেছে ঢাকায়। তারা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। কালের মন্দিরার এ-বয়ান শিউলির চোখে-দেখা ইতিহাসের উচ্চারণ। উপন্যাস ইতিহাসের বয়ান নয়; কিন্তু উপন্যাসের চরিত্রগুলি ইতিহাসের অংশ হতে পারে। ‘ইতিহাসকে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রবণতা বাস্তবতারই একটি নতুন মাত্রা। তার ভেতর দিয়ে আসলে সামাজিক চাহিদারই প্রতিফলন ঘটানো হয়।’ কারণ সময়ের অংশীদার মানুষ আর সে-মানুষই সময়ের চরিত্র। মূলত এখানে উপন্যাসের কাহিনি স্বতোৎসারিত ইতিহাসকে তুলে এনেছে প্রাসঙ্গিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে।

ছয়

আখ্যানের সময়ধারায় মুক্তিযুদ্ধোত্তর পর্বের শিউলি পরিপক্ব, অভিজ্ঞ। উপন্যাসের পঞ্চাশ পর্বের পর এক পর্যায়ে শিউলির সন্তান-সন্ততি, সংসার-চাকরি একটা পরিণতির দিকে এগিয়ে চলে। এ-সময়ে শিউলি ও মুনীরের কলকাতা-দার্জিলিং ভ্রমণের পর্বে দুই বাংলার সম্পর্ক, মনস্তত্ত্ব, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ইত্যাদি বর্ণিত হয়। সংস্কৃতিমনা শিউলি মুগ্ধ দৃষ্টিতে

প্রকৃতিশোভিত দার্জিলিং, টাইগার হিল উপভোগ করে। লেখক-আত্মজীবনীর মিলবিন্যাস থেকেই হোক কিংবা দুই বাংলার সাংস্কৃতিক রুচি বা সম্পর্কের বিন্যাস থেকেই হোক – এ্রপিসোডটির এটি এক বাড়তি অনুষঙ্গ। তামাঙ মনাস্ট্রি, শান্তিনিকেতন ইত্যাদির বর্ণনা উপন্যাসে বেশ মনোহর-উদ্দীপক। ঔপন্যাসিকের কালপর্বে শিউলির এ-ভ্রমণের সময়কাল ১৯৮৪। এ-সময়ের প্রচ্ছদপটে ঔপন্যাসিক মূলত শিউলির পরিবারের বিবিধ সম্পর্ক – সূর্যের সামাজিক অবস্থান, রংকু, ঝন্টু এদের সংসার ও প্রতিপত্তি শিউলির সন্তান কেকা, কুহু, সুদীপ্ত – তাদের বড় হওয়া, প্রতিশ্রুতিময় জীবনের স্বপ্ন দেখা, দেশের বাইরে-ভেতরে সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের প্রয়াস ইত্যাদি বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের বাংলাদেশের প্রজন্ম-ভাবনার একটি প্রতীকী চিত্ররূপ। শিউলির ছেলে সুদীপ্ত যা ভাবে, যে-মূল্যবোধে জগৎ-জীবন ও সামাজিক প্রতিপত্তির চিন্তা করে নিশ্চয়ই তা পঞ্চাশের দশকের সূর্য বা দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকের আমিনুর রহমানরা ভাবেন না। উপন্যাসের শেষাংশ আর প্রথমাংশের কাহিনিবিন্যাসে বিশ্বাস ও মূল্যবোধের ব্যবধান চোখে পড়ে। এ-ব্যবধান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে – নতুন প্রজন্মের বইকি। এবং নিশ্চয়ই তা একটা সময়ের বিবর্তিত অনুধ্যানে চিহ্নিত।

নব্বইয়ের স্বৈরশাসনের পর গণতন্ত্রের যে-আকাঙ্ক্ষা তা পূরণ হয়নি – ‘শিউলির মনে হয় সে যেন সবার চোখেই সংশয়ের ছায়া দেখতে পায়, দেখতে পায় অবিশ্বাস। সে জানে না সামনে কী আসছে। তবে এটাই জানে যে, যাই আসুক তাতে এ দেশের দুঃখী মানুষদের ভাগ্যের কোনো রদবদল ঘটবে না। ধনী আরও ধনবান হবে, গরিব তার বেঁচে থাকার খুদকুঁড়োটুকুও আর খুঁটে খেতে পারবে না। এর একটাই কারণ তা হচ্ছে এ-দেশের রাজনৈতিক নেতারা কেউ দেশকে ভালোবাসে না। যদি দেশপ্রেমের ক্ষীণ একটু অনুভব কারো ভেতর থাকে সে হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিছু সংখ্যক সাধারণ মানুষই দেশকে ভালোবাসে। এ দেশের জন্য যারা যুদ্ধ করেছিল। যারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছিল তারাও ছিল সাধারণ মানুষ। আত্মত্যাগের গৌরব কেউ তাদের দেয়নি। কারণ তারা ছিল ছাত্র, শ্রমিক, গ্রাম্য যুবক, বেকার তরুণ। সেইসব যোদ্ধার ভেতর যারা বেঁচে আছে, তারা এখন হতাশায় আচ্ছন্ন। তবু হয়তো দেশপ্রেমের প্রদীপটি নিবু নিবু হয়ে তাদের বুকের ভেতরে আজো জ্বলছে –    জ্বলবে।’ এমন আশাবাদের মধ্য দিয়েই উপন্যাস শেষ হয়। মূলত যে সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন লেখক, যে-বিবর্তনের প্রহরা চলে তাঁর উপন্যাসে তা প্রজন্মান্তরের সময় ও সমাজ বাস্তবতার ইতিহাস। উপন্যাসের আঙ্গিক ঋজু, গদ্য দ্যুতিময়, ভাষা প্রসাদগুণসম্পন্ন। তবে দীর্ঘায়ত উপন্যাসটির বর্ণনাভঙ্গি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ পরিমণ্ডলে মনে হয় আটকে যায়; কখনো কখনো তা সরল, একঘেয়েমি দোষে দুষ্ট। তবে বিশুদ্ধ উপমা ও কল্পনাশক্তির গুণে লেখক তা অতিক্রমও করেছেন। স্বতঃস্ফূর্ত বাচনভঙ্গি মকবুলা মনজুরের লেখার বিশেষ গুণ। বড় কলেবরের এ-উপন্যাসের কালের কালোচ্ছ্বাসকে ধরতে গিয়ে লেখক কোথাও থমকে দাঁড়াননি – পথ নির্মিত হয়েছে – ওই শিল্পীসত্তার অনিবার্য প্রেরণা থেকেই। মকবুলা মনজুরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

Leave a Reply