রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর, ইয়ানুশ কোরচাকের পোচতা

লেখক:

হাসান ফেরদৌস

১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই। সে-সময় পোল্যান্ড হিটলার বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। দেশজুড়ে চলছে নাৎসি সন্ত্রাস, যার প্রধান লক্ষ্য দেশের পঁয়ত্রিশ লাখ ইহুদি। ইতোমধ্যে নিজস্ব ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করে তাদের এনে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’। সরাসরি হত্যার বদলে অনাহার ও রোগভোগে তাদের মৃত্যু হোক, নাৎসি বাহিনীর সেটাই লক্ষ্য। এরপরও যারা বেঁচে থাকবে, তাদের নিয়ে যাওয়া হবে গ্যাস চেম্বারে, একটি গুলি খরচ না করেই হত্যা করা হবে হাজার হাজার ইহুদিকে। এই হচ্ছে হিটলারের এনট্লো এজুং, – ইহুদি সমস্যার ‘চূড়ান্ত সমাধান’।

ইয়ানুশ কোরচাকের বয়স তখন ৬৪। ওয়ারশ শহরে তাঁর নিজস্ব অনাথ আশ্রমে যে শ-দুয়েক অনাথ বালক-বালিকা তাঁর তত্ত্বাবধানে ছিল, সেখান থেকে অনেক আগেই তাদের জোর করে পাঠানো হয়েছে সেই শহরের ইহুদি ঘেটোতে। মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন, উঁচু পাঁচিলঘেরা সে-ঘেটো বস্ত্তত একটি বড়সড় জেলখানা, ভেতরে ও বাইরে চৌ-প্রহর সামরিক প্রহরা। বিনা কারণে কোনো উস্কানি ছাড়াই প্রতিদিন নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে নারী-পুরুষ, এমনকি শিশু। তাদের একমাত্র অপরাধ, তারা ইহুদি। বছরের মাঝামাঝি থেকে সে-ঘেটো থেকে দলবেঁধে ইহুদিদের সরানো শুরু হয়, তাদের গন্তব্য ত্রেবলিনকার মৃত্যুকূপ। কোরচাক জানতেন, তাঁকে ও তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিটি শিশুকেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে গ্যাস চেম্বারে। অনিবার্য মৃত্যু কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু এই অবোধ শিশুদের কাছে আসন্ন সে মৃত্যুর সংবাদ তিনি কী করে পৌঁছে দেবেন? নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য কি কাউকে প্রস্ত্তত করা যায়, বিশেষত এইসব শিশু-কিশোর যাদের পুরো জীবনই এখনো অযাপিত?

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন রবীন্দ্রনাথের নাটক ডাকঘর – পোলিশ অনুবাদে পোচতা – মঞ্চস্থ করবেন। শুধু শিশুদের নিয়ে হবে সেই নাটক। মৃত্যুপথযাত্রী এক বালকের গল্প, আসন্ন মৃত্যুকে যে বরণ করছে আবিষ্কারের আগ্রহে, প্রাত্যহিক কৌতূহলে ও বিমল আনন্দে। সেই আনন্দ এইসব অনাথ শিশুর মধ্যে সঞ্চারিত হোক, এই বিশ্বাস থেকে ওয়ারশর ঘেটোতে ডাকঘর মঞ্চস্থ হলো ১৮ জুলাই। আড়াই সপ্তাহ পর, ৬ আগস্ট ১৯৪২, নির্দেশ এলো কোরচাক, তাঁর সকল সহকর্মী ও অনাথ আশ্রুমের ১৯৫ শিশুকে অবিলম্বে চলে যেতে হবে ত্রেবলিনকায়।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় ৭ আগস্ট ১৯৪১ সালে। অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর ঠিক এক বছর পরের এই ঘটনা। পৃথিবী এক ভয়াবহ দুঃসময়ের মুখোমুখি, একথা রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেই অাঁচ পেয়েছিলেন, যে-কারণে সে অশনিসংকেত জানিয়ে লিখেছিলেন প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’। কিন্তু ডাকঘর নাটক লেখা ভিন্ন সময়ে, ১৯১২ সালে, যখন মনের ভেতরে-বাইরে এক ভিন্ন ডাক তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত কল্পনাও করেননি তাঁরই লেখা সে-নাটক মঞ্চস্থ হবে বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে, সম্পূর্ণ ভিনদেশি আবহে, এমন একসময়ে যখন বিশ্ব এক গভীর সংকটের মুখোমুখি, যখন ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত দুর্যোগের ভেতর সকল ভেদরেখা মুছে গেছে।

অন্য কোনো নাটক নয়, পোল্যান্ডে স্বল্পপরিচিত এই বাঙালি কবির নাটক ডাকঘরকেই কেন বেছে নিয়েছিলেন কোরচাক?

কোরচাকের উত্তর ছিল, শিশুরা যেন মৃত্যুকে স্মিতমুখে বরণ করতে পারে, সে-উদ্দেশ্যেই এই নাটকের মঞ্চায়ন। নিজের ব্যক্তিগত রোজনামচা ঘেটো ডায়েরিতে কোরচাক অবশ্য এ-বিষয়ে কোনো  মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেননি। শুধু অনুষ্ঠানের সভানেত্রীর কথা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, মহিলা বললেন, ‘কোরচাক একজন জিনিয়াস। ইঁদুরের গর্ত থেকেও আশ্চর্য জিনিস বানানোর ক্ষমতা রয়েছে তার।’

(১৯৩৯ সালে পোল্যান্ডে জার্মান আক্রমণের কয়েক সপ্তাহ পর কোরচাক একটি ব্যক্তিগত রোজনামচা লেখা শুরু করেন। সপ্তাহ দুয়েক লেখার পর রোজনামচাটি তিনি সরিয়ে রাখেন। ওয়ারশতে ইহুদি ঘেটো নির্মিত হলে কোরচাকের অনাথ আশ্রম সেখানে সরিয়ে আনা হয়। এই নতুন আশ্রমে আসার পর এক লেখক বন্ধুর অনুরোধে কোরচাক রোজনামচাটি পুনরায় শুরু করেন। ঠিক রোজকার ঘটনা লিপিবদ্ধ করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং যখন তাঁর মনে যে ভাবনার উদয় হয়, তা কিছুটা অনিয়মবদ্ধ – এমনকি এলোমেলো – ভাবে লিখে রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি ডায়েরিটি ব্যবহার করেন। সব সময় তাতে দিনের তারিখটিও লিখে রাখেননি। ৬ আগস্ট ১৯৪২ কোরচাক ও তাঁর আশ্রমের শিশুদের ত্রেবলিনকায় অপসারণের আগ পর্যন্ত কোরচাক তাতে অনিয়মিতভাবে লিখে গেছেন। অধিকাংশ সময়েই গভীর রাত্রে, সারাদিনের কর্মব্যস্ততার শেষে লিখতে বসতেন। ত্রেবলিনকায় চলে যাওয়ার পর অজ্ঞাতনামা এক বালক কোরচাকের হাতে লেখা ডায়েরিটি উদ্ধার করে তাঁর সেই লেখক বন্ধু ইগর নেভারলির কাছে দিয়ে আসে। নেভারলি সে-ডায়েরিটি আশ্রমের দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। ১৯৫৬ সালে, মুক্ত পোল্যান্ডে, ডায়েরিটি উদ্ধারের পর নেভারলির উদ্যোগে প্রথমবারের মতো তা প্রকাশিত হয়। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। বর্তমান নিবন্ধে সেই সংস্করণটি ব্যবহৃত হয়েছে)।

ডাকঘর প্রসঙ্গে কোরচাকের এই মন্তব্য থেকে আমাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব, পোল্যান্ডের ইহুদি-ঘেটোতে ডাকঘর মঞ্চস্থ করতে তাঁকে ঠিক কী অনুপ্রাণিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ততোদিনে বিশ্ববিখ্যাত, শুধু ডাকঘর নয়, তাঁর আরো অনেক গ্রন্থই পোলিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অনুমান করা দুষ্কর নয়, ঋষি হিসেবে ইউরোপীয় বোদ্ধাজনের কাছে সুপরিচিত বাঙালি কবির লেখার সঙ্গে কোরচাকের পরিচয় ছিল। কিন্তু এ-বাঙালি কবির ভেতর ঠিক কী তিনি আবিষ্কার করেছিলেন? এ-প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের কোরচাকের জীবন ও কর্মের দিকে চোখ ফেরাতে হবে।

হলোকস্ট – অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির হাতে ষাট লাখ ইহুদির নিধনযজ্ঞ – তার ইতিহাস যাঁরা কমবেশি অনুসরণ করেছেন, তাঁদের ইয়ানুশ কোরচাকের নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা। কোরচাক – এই নামে আন্দ্রেই ভাইদার ১৯৯০ সালে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটিও পোল্যান্ডের বাইরে তাঁকে সুপরিচিত হতে সাহায্য করেছে। কোরচাক পেশায় ডাক্তার, তাঁর সময়ের খ্যাতনামা লেখক ও শিক্ষাবিদ। হলোকস্টের নির্মম অভিজ্ঞতায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি কোরচাককে ইতিহাসের পাতায় একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে, কিন্তু সে-অভিজ্ঞতার উল্লেখ ছাড়াই শুধু লেখক হিসেবেও সম্মানজনক স্থান তাঁর জন্য নির্ধারিত। একশটির বেশি গ্রন্থের তিনি লেখক, যার মধ্যে গল্প-উপন্যাস-নাটক এই জাতীয় লেখা রয়েছে। চিকিৎসা-সংক্রান্ত ফরমায়েশি লেখা রয়েছে বেশ কয়েকটি, এছাড়া নানা বিচিত্র বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ জাতীয় এমন লেখার সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। কোরচাকের অন্য পরিচয়  তিনি বিশ শতকের অন্যতম প্রধান শিশু অধিকার-প্রবল প্রবক্তা।            এ-ব্যাপারে অধিকাংশই একমত, ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক যে-‘শিশু অধিকার সনদ’ গৃহীত হয়, তার আদি প্রণেতা ছিলেন কোরচাক। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রতিটি শিশুর মানব হিসেবে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ অধিকারের পক্ষে অর্থপূর্ণ প্রস্তাবনা রেখেছিলেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত শিশু আশ্রমে তিনি নিজেই সেসব অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম বাস্তব উদ্যোগ নেন।

কোরচাকের জন্ম ১৮৭৮ সালে, রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৭ বছর পর, ওয়ারশর এক অবস্থাপন্ন ইহুদি পরিবারে। জন্মকালে নাম ছিল হাইনরিশ গোল্ডস্মিথ, যে-নাম তিনি পরিত্যাগ করে ছদ্মনাম ইয়ানুশ কোরচাক গ্রহণ করেন লেখক হিসেবে অধিক গ্রহণযোগ্যতা পাবেন এই আশায়। পিতা জোসেফ গোল্ডস্মিথ তাঁর সময়ের নামজাদা কৌঁসুলি ও ইতিহাস গ্রন্থের লেখক। পোল্যান্ড ও জারীয় রাশিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন বুদ্ধিজীবী ও নেতা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। মধ্যবয়সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন জোসেফ, আশ্রয় পান মানসিক রোগীদের হাসপাতালে। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। শৈশবে সামাজিকভাবে অতি-ব্যস্ত পিতার সান্নিধ্য কোরচাক কার্যত পাননি। পরে, মস্তিষ্ক-বিকৃতির পর, সে-সংযোগ পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়। মা-ই ছিলেন তাঁর শৈশবের প্রথম শিক্ষক। ইহুদি আচার-আচরণের সঙ্গে সেই গৃহিণী নারীর তেমন পরিচিতি ছিল না, পুত্রকেও সে-শিক্ষা তেমন দিতে পারেননি। বস্ত্তত ইহুদি নয়, ক্যাথলিক আচার-আচরণেই কোরচাকের আস্থা ও পরিচয় ছিল বেশি। শোনা যায়, তাঁর শোবার ঘরে ইহুদি প্রথামাফিক ফির বৃক্ষের বদলে একটি ক্রিসমাস বৃক্ষ ছিল।

ছাত্রাবস্থায় পিতৃহীন হওয়ার পর কিছুটা উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েন কোরচাক। আর্থিক সচ্ছলতার বদলে সর্বগ্রাসী দারিদ্র্য তাঁর পরিবারকে গ্রাস করে। মানসিক ভারসাম্যহীনতা একটি পারিবারিক ব্যাধি, এই ধারণা তাঁকে পেয়ে বসে, ফলে হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হন তিনি। না ঘর-না বাহির, কোথাও ঠিক নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। কলেজে পড়ার সময় সমাজবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, সাংবাদিকতায় হাত লাগান, একটি চার অঙ্কের নাটকও লিখে শেষ করেন। এমনকি কবিতা লেখাতেও হাত পাকান। এই সময়েই নিজের ইহুদি নাম বর্জন করে পোলিশ নামটি গ্রহণ করেন।  কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক করলেন, লেখক নয়, ডাক্তার হবেন। ‘লেখক হয়ে কী লাভ, ডাক্তার হলে মানুষ বাঁচানো যায়।’  ডাক্তার হলেন বটে, কিন্তু লেখালেখি বিসর্জন দিয়ে নয়। ‘ডাক্তার হয়ে চেখভ অনেক বড় লেখক হতে পেরেছিলেন। আমিও পারব।’ ওয়ারশর অভাবী ও অনাথ শিশুদের সঙ্গে কোরচাকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় এ-সময়। লেখক নয়, বন্ধুর আগ্রহ নিয়েই ওয়ারশর শিশুদের কাহিনি শুনতেন তিনি, শিশুরাও উন্মুখ একজন শ্রোতা পেয়ে তাঁর কাছে এসে ভিড় করত। এসব শোনা গল্পের ভিত্তিতেই লিখিত হয় তাঁর উপন্যাস রাস্তার শিশুরা (চিলড্রেন অব দ্য স্ট্রিট নামে অনূদিত)। তাঁর পরের বই, বসার ঘরের শিশু (দ্য চাইল্ড অব দ্য ড্রইং রুম এই নামে অনূদিত) বহুলাংশে আত্মজৈবনিক। আত্মহত্যা-প্রবণ একজন বালকের গল্প, যে-সারাজীবন কেবল বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জীবন কাটাতে চেয়েছে। এ-বইটি যখন কিস্তি আকারে পোল্যান্ডের এক নামজাদা সাহিত্যপত্রিকায় ছেপে বেরোচ্ছে, তখন ডাক এলো সেনাবাহিনীর বাধ্যতামূলক চাকরিতে।

সেনাবাহিনীতে যাওয়ার আগে কোরচাক ওয়ারশর একটি শিশু হাসপাতালে যোগ দিয়েছিলেন। সৈনিক হিসেবে তাঁকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে হতো, একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে অবৈতনিক চিকিৎসক হিসেবেও স্বেচ্ছাশ্রম প্রদান করতেন তিনি। সেনাবাহিনীর চাকরিশেষে কোরচাক কোনো বড় হাসপাতালে যোগ দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি আগের শিশু হাসপাতালেই ফিরে যেতে মনস্থ করেন।

এ-হাসপাতালেই কোরচাক মৃত্যুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। নিজে পরে লিখেছেন, প্রধানত গৃহহীন ও অভাবী শিশুদের পরিচর্যাতেই তিনি অধিক সময় ব্যয় করতেন, কারণ তাদের সঙ্গে এক ধরনের নৈকট্য বোধ করতেন। এসব শিশু, যাদের অনেকেই কঠিন, কখনো কখনো দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত ছিল, আসন্ন মৃত্যু বিষয়ে তারা সচেতন ছিল, অথচ সে-মৃত্যুকে হাসিমুখে, প্রবল আত্মমর্যাদা সহকারে গ্রহণে সমর্থ ছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি এসব শিশু ছিল ধীর-স্থির, যেন ভীষণ পরিণত।

অনুমান করি, ডাকঘরের অনেক অমলকেই তিনি সে-সময় দেখেছিলেন।

১৯০৭ সালে, তখন কোরচাক দেশের নামজাদা লেখক, একটি গ্রীষ্মকালীন অবকাশ নিবাসে শিশুদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ কাটান। শিশু অধিকার নিয়ে নানা ভাবনা তাঁর মাথায় অনেক আগেই এসেছিল, এই অবকাশ নিবাসে এসে, শিশুদের সঙ্গে দিন-রাত সময় কাটিয়ে, তিনি তাদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্যক উপলব্ধি করেন। চিরাচরিত প্রথায় এদের শিক্ষা দিলে কাজ হবে না। গল্প, গান ও খেলাধুলার ভেতর দিয়েই এদের শিক্ষিত করা সম্ভব, এই উপলব্ধিতে তিনি শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কার্যক্রম নির্মাণ শুরু করেন। প্রথামাফিক পাঠ্যপুস্তক অনুসরণের বদলে চালু করলেন গল্প বলা, সাঁতার-চর্চা, গান শোনা। একটি পুরনো গ্রামোফোন যন্ত্র তিনি এইসময় সংগ্রহ করে পাঠচর্চার কাজে লাগান। গান শুধু শিক্ষণীয় নয়, শিশুদের ভেতর অধিকতর সম্প্রীতি ও আন্তঃযোগাযোগ বাড়ায়,               এ-ব্যাপারটিও তিনি ধরতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাধারার সঙ্গে কোরচাক পরিচিত ছিলেন, একথা ভাবার কোনো কারণ নেই, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা-আহরিত জ্ঞান থেকেই সে-ধারার উপকরণ তিনি হাতে-কলমে প্রবর্তন করেন। এই গ্রীষ্মনিবাসেই কোরচাক শিশু অধিকার বিষয়ে তাঁর বিপ্লবী ধারণা, শিশুদের নিয়ে একটি শিশু বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নিত্যদিনের নানা ছোটখাটো অপরাধের বিচার সেখানে হতো, একদিকে কাঠগড়ায় শিশু অপরাধী, তার পক্ষে কৌঁসুলি-শিশু, বিচারপতিও শিশু। পরিণত বয়সের কেউ অপরাধী হলে তাকেও শিশু বিচারকের মুখোমুখি হতে হতো।

এই সময়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোরচাক লিখে শেষ করেন শিশুতোষ গ্রন্থ ইয়োস্কি, ইয়াস্কি ও ফ্রাঙ্কি। বস্ত্তত তাঁর এই গ্রন্থের কারণে কোরজাক ছোট-বড় সব মহলেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম, নানা জায়গা থেকে আসে বক্তৃতার আমন্ত্রণ। কাকতালীয়ভাবেই রাজধানীর কেউকেটা বড়লোকেরা এই সময় পোল্যান্ডের গৃহহীন অনাথদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলার উদ্যোগ নেন। তিনি সঙ্গে থাকলে তাঁদের সুবিধা হয়, এই ভেবে তাঁরা কোরচাককে অনুরোধ করেন দাতব্য কেন্দ্রটির সঙ্গে যুক্ত হতে।  ১৯১০ সালে, যখন তাঁর বয়স ৩২, কোরচাক ওয়ারশর ইহুদি শিশুদের অনাথ আশ্রমের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। আমৃত্যু সে-কেন্দ্রের দায়িত্ব বহন করেন তিনি।

সুপরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতনামা সাহিত্যিক হওয়া সত্ত্বেও কোরচাক কেন এমন সাধারণ একটি অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব নেবেন, তা অনেকের কাছেই বোধগম্য হয়নি। এখন আমরা জানি, খ্যাতি নয়, শিশুদের নিকটবর্তী থাকা যাবে – এই বোধই কোরচাককে উৎসাহিত করেছিল। শিশুদের তিনি সেরা শিক্ষক বলে বিবেচনা করতেন, নিকটস্থল থেকে তাদের প্রকৃতি ও ব্যবহার অনুসরণ করা গেলে শিশুর মানসিক বিকাশের শ্রেষ্ঠ কৌশলগুলো উদ্ভাবন সম্ভব,  এ-বিষয়ে তিনি স্থির-নিশ্চিত ছিলেন। তাছাড়া, চিকিৎসা শাস্ত্র তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন মানবের সেবার উদ্দেশ্যে। জ্ঞানদান ও সেবা ছিল তাঁর জীবনের প্রধান ‘মিশন’। এখন এই অনাথ আশ্রমের মাধ্যমে দুটো কাজই করা সম্ভব, এই ভেবে দারুণ আশান্বিত হলেন তিনি। কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই ৯২ ক্রচমালনা সড়কে অবস্থিত সাদা রঙের চারতলা ভবনে এসে আস্তানা গাড়লেন কোরচাক।

এই পর্যন্ত আমরা যে কোরচাকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, পারিবারিক সম্পর্ক-সূত্রে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। শৈশবে রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে, কোরচাকের পিতৃবিয়োগ। এই মিলটুকু ঠিকই আছে, কিন্তু নিয়মবদ্ধ পারিবারিক জীবনের পুরোটাই পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নীতিপ্রিয় ও কঠোর নিষ্ঠাবান পিতা তো ছিলেনই, ঘরভরা ভ্রাতা ও ভগিনীর স্নেহের ছায়ায় তিনি লালিত হয়েছেন। প্রথামাফিক স্কুলভিত্তিক বিদ্যালাভ তিনি করেননি বটে, কিন্তু সে অর্থকষ্টের জন্য নয়। স্কুল তাঁর কাছে ছিল দমবন্ধ করা জেলবাসের মতো এক অভিজ্ঞতা। একদম শৈশব থেকেই লেখালেখিতে জড়িত হন রবীন্দ্রনাথ, নিজের পরিবারের ভেতরেই তার সকল আয়োজন পূর্ণ ছিল। যৌবনে জমিদারি তদারকির দায়িত্ব পান, জনহিতৈষীমূলক ব্যবসায়ও হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু যাকে কায়িকশ্রম বলা যায়, এমন কোনো কাজ তাঁকে করতে হয়নি, কোনো নির্দিষ্ট পেশাও তাঁকে অনুসরণ করতে হয়নি।

কোরচাকের অবস্থা বহুলাংশে ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথ বিলাসে অভ্যস্ত না হলেও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। কোরচাক সফল আইনজীবী পিতার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সচ্ছল জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন, কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তাদের অবস্থা রাতারাতি বদলে যায়। মস্তিষ্ক-বৈকল্যে পিতার মৃত্যু, আশৈশব সেই লজ্জার ভার তাঁকে বইতে হয়েছে। তাঁর নিজের মধ্যেও মানসিক অস্থিরতার – কারো কারো ভাষ্যে ভারসাম্যহীনতা – লক্ষণ দেখা দেয়। রবীন্দ্রনাথ কৈশোর ও    প্রাক-যৌবনে একাধিক ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যুর কারণে প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, সন্দেহ নেই। ধার্মিক পিতার সাহচর্য, সংগীত ও সাহিত্য তাঁকে বৈকল্য থেকে দূরে রাখে। অন্যদিকে কোরচাক যে শেষ পর্যন্ত বৈকল্যের শিকার হননি, তার এক কারণ সাহিত্য, তবে তার চেয়েও বড় সহায়ক ছিল নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা।

কোথায়, কীভাবে কোরচাকের মনে মানবসেবার চেতনার জন্ম হয়, তার প্রমাণ নেই, তবে মানবসেবাতে তিনি নিজ ধর্ম খুঁজে পাবেন, সে-পরিচয় অতি শৈশবেই স্পষ্ট হয়। তাঁর স্মৃতিকথা থেকে আমরা জানি, যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, কোরচাক তাঁর দাদিমাকে বলেছিলেন, সারা পৃথিবীর শিশুরা যাতে কোনোদিন অনাহারে না থাকে, তা নিশ্চিত করবেন তিনি। কেমন করে, তা অবশ্য জানা ছিল না। অতিথিঘরের শিশু গ্রন্থ থেকেই স্পষ্ট হয় শিশুদের প্রতি তাঁর শর্তহীন পক্ষপাতিত্ব। ইয়ানেক নামক যে বালকের জবানিতে এখানে গল্পটি বলা, তা যে কোরচাকের অলটার – ইগো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘরের বন্ধন, পিতা-মাতার আরোপিত নিয়মবিধির অনুশাসন অগ্রাহ্য করে সে-বালক একসময় অজানার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, যাওয়ার আগে বাবা-মাকে বলে যায়, ‘সরো তো আমার পেছন থেকে, না হলে আমি কামড়ে দেব।’ গৃহহীন ও অনাথ বালক-বালিকাদের পরিচর্যাতে নিজেকে উৎসর্গ করে ইয়ানেক। ক্রিসমাসের সন্ধ্যায়, সবাই যখন উৎসবে মত্ত, ইয়ানেক তখন ব্যস্ত অভাবী, অনাহারী বালক-বালিকাদের গল্প শোনাতে। ইয়ানেকের কাছ থেকে ক্রুশ উপহার পেয়ে একটি বালক প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি যিশু?’ ইয়ানেকের উত্তর ছিল, ‘হ্যাঁ, আমি যিশু।’

ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ রবীন্দ্রনাথ। অনতিতরুণ বয়সে সাহিত্য রচনায় হাত দেন তিনি, কিন্তু বিষয়বস্ত্তর বিবেচনায় কোরচাকের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব যোজন-পরিমাণ। যে-বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রেম ও নারী-পুরুষ সম্পর্ক, এমনকি যৌনতা বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন, কোরচাক তখন কঠিন-কঠোর-নির্মম বাস্তবতার কষ্টিপাথরে নিজের পরিপার্শ্বকে বোঝার চেষ্টায় রত। চিকিৎসক হওয়ার কারণে তাঁকে মৃত্যু দেখতে হয়েছে অতি-নিকট থেকে। কার্যত নারী-সঙ্গ থেকে তিনি বঞ্চিত ছিলেন, যুবা বয়সে অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব নেওয়ার পর স্তেফানিয়া ভিলজিন্সকা নামে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, কিন্তু প্রথাগত প্রণয় তাকে বলা যাবে না। কোরচাক নিজে কোথাও কোনো প্রমাণ রেখে যাননি যে, স্তেফার প্রতি তাঁর পেশাদারিত্বের বাইরে কোনো অনুভূতি বা চিন্তা ছিল। আন্দ্রে ভাইদার কোরচাক চলচ্চিত্রে কোরচাক ও স্তেফার ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত রয়েছে মাত্র একটি, তাও সেখান থেকে শ্রম-ক্লান্ত দুই সহকর্মীর পেশাগত দায়িত্ব পালনের বাইরে অন্য কোনো সম্পর্কের রেখাচিত্র আমরা বড়জোর কল্পনা করতে পারি, ভাইদা তার কোনো স্পষ্ট পরিচয় পর্দায় তুলে ধরেন না। ঘেটো ডায়েরি কোরচাকের গভীরতম ব্যক্তিগত ভাবনার প্রামাণ্য দলিল, তাতেও ব্যক্তিগত প্রেম-ভালোবাসার সকল বিবেচনা তিনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন।

আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। প্রথম যে-মৃত্যু তাঁর মনে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে তা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা। কোরচাকের ক্ষেত্রে প্রথমে পিতা ও পরে মাতার মৃত্যু তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হয় বটে, কিন্তু সে-মৃত্যু তাঁকে প্রবলভাবে বিচলিত করেছিল, এ-কথার প্রমাণ নেই। বরং সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও অপরিচিত বালক-বালিকার মৃত্যু ঘটনা দ্বারা তাঁর মনোজগৎ নির্মিত হয়েছিল, সে-কথার স্পষ্ট প্রমাণ কোরচাকের নিজের লেখাতে – তাঁর গল্প-উপন্যাসে রয়েছে। ১৯০৫ সালে, রুশ-জাপান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কোরচাককে সামরিক দায়িত্ব নিয়ে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে হয়েছিল। নিঃস্ব ও অভাবনীয় দারিদ্রে্যর সঙ্গে এইখানে তাঁর পরিচয় হয়। খাদ্যাভাবে মৃত্যুর ঘটনাও তাঁকে সেখানে প্রত্যক্ষ করতে হয়। যে-কোনো যুদ্ধের সবচেয়ে নির্দয় শিকার যে শিশুরা, এ-সত্যটি কোরচাক এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই প্রত্যক্ষ করেন।  পরবর্তীকালে শিশুর অধিকার বিষয়ে তাঁর অবস্থান – কোনো অবস্থাতেই শিশুকে তার জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না – তাও এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উপলব্ধ।

রবীন্দ্রনাথকে কঠিন কায়িক শ্রমের মুখোমুখি হতে হয়নি, সে-কথা সুবিদিত। একইভাবে, তাঁকে কখনো রাজনৈতিক নিবর্তনেরও মুখোমুখি হতে হয়নি। কোরচাকের ক্ষেত্রে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইহুদি হওয়ার কারণে নিত্যবৈষম্য তাঁকে ভোগ করতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে তিনি প্রগতিশীল – যা বামপন্থী বলাই সমীচীন হবে – সে-কারণে জারের গোপন পুলিশ তাঁর পিছু নিয়েছিল। ১৯০৯ সালে, বিপ্লবের সম্ভাবনা অাঁচ করতে পেরে জার রাশিয়ার ও পোল্যান্ডের বিপ্লবী ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের জেলে ঢোকানো শুরু করেন। কোরচাক তাঁদের অন্যতম ছিলেন। জেলের অভিজ্ঞতা কোরচাকের প্রতিবাদী মানসিকতাকে আরো সংহত করতে সাহায্য করে। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি ডাক্তারি পেশা অনুসরণের বদলে অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কোরচাক এই আশ্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি শিশুকে তাদের শ্রেষ্ঠ শৈশব প্রদানে ব্রতী হন।

রবীন্দ্রনাথের কাছে শৈশবের স্কুল ছিল ভয়ানক কষ্টকর এক অভিজ্ঞতা। প্রচলিত স্কুলকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘শিক্ষা দিবার কল।’ একই নামের একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন :

ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারের মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন। ছাত্ররা দুই-চার পাতা কলে ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফিরে। তারপর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়। কলের একটা সুবিধা, ঠিক মাপে, ঠিক  ফর্মাশ-দেওয়া জিনিশটা পাওয়া যায়। এক কলের সঙ্গে অন্য কলের উৎপন্ন সামগ্রীর বড়ো একটা তফাৎ থাকে না, মার্কা দিবার সুবিধা হয়।

কোরচাকের অভিজ্ঞতাও অভিন্ন। হোয়েন আই শ্যাল বি লিটল অ্যাগেইন গ্রন্থে নিজের স্কুল-অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে :

আমার সময়ে কোনো ভালো বিদ্যালয় ছিল না। শুধু আইনের কড়াকড়ি ও একঘেয়েমিতে ভরা। কোনো কিছুই করা যাবে না। চতুর্দিকে কেবলই বিচ্ছিন্নতা, শীতল ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। অনেক বছর পরে, পরিণত বয়সে অনেক সময় রাত্রে স্কুলের স্বপ্ন দেখে ভয়ে ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছি, সারা শরীর ঘামে ভেজা। এটা সত্যি নয়, শুধু স্বপ্ন, তা জেনে আশ্বস্ত হয়েছি।

(দেখুন : আদির কোহেনের দি গেইট অব লাইট, ফেয়ারলি ডিকেন্সন ইউ., ১৯৯৫, পৃ ২০, গ্রন্থে উদ্ধৃত)।

একই গ্রন্থে শিশু নিজেকে কীভাবে দেখে তার একটি বিবরণ দিয়েছেন কোরচাক। সে-বিবরণ থেকে স্পষ্ট, ক্রমোচ্চ শ্রেণি ও বয়ঃবিভক্ত সমাজে শিশু নিজেকে কেবল অধিকারহীনই ভাবে না, নিজেকে পরিত্যক্ত ও অপাঙক্তেয় এমন একজন হিসেবেই বিবেচনা করে। শিশুদের পক্ষে সওয়াল-জবাব করতে গিয়ে তাদের জবানিতে তিনি লিখেছেন :

(তোমাদের কাছে হয়তো মনে হয়) আমাদের ভাষা-শক্তি সীমিত, কারণ ব্যাকরণ-সম্মত কথা বলা আমরা শিখিনি। হয়তো সেজন্য আমাদের অগভীর ও বিভ্রান্ত মনে হয়। আমাদের (ধর্ম) বিশ্বাস হয়তো অতি-সরল, কারণ আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি শুধু গ্রন্থ-আহরিত নয়, যদিও পৃথিবী বিশাল। আমরা (বড়দের অনুশাসনে) পীড়িত ক্ষুদ্রাকৃতি একদল মানুষ, যারা অনবরত দীর্ঘদেহী মানুষদের দ্বারা শাসিত।

কোরচাক বিশ্বাস করতেন, শিশু – তা সে যে-বয়সেরই হোক না কেন, তার রয়েছে জটিল ব্যক্তিত্ব। কোনো একটি অভিন্ন আধারে রেখে সব শিশুকে ঢালাওভাবে একই ছাঁচে ফেলে বিচার সম্ভব নয়। তাঁর কথায় :

(সারাদিনে) সে একবার হয় এমন এক এস্কিমো ও কুকুর ছানা যে নীতিবাগিশদের গা থেকে উকুন খুঁজে বার করতে ব্যস্ত, কখনো যে পরাস্ত ও পরিস্থিতির নির্যাতনের শিকার, কখনো সে স্নেহশীল বন্ধু বা স্পর্শকাতর সহপাঠী, দার্শনিক ও চিত্রকর, ক্রীড়াবিদ ও স্বাপ্নিক।

কোরচাক শিশুকে কেবল অবোধ ও সম্পূর্ণ বয়োজ্যেষ্ঠদের ওপর নির্ভরশীল না দেখে তাদের পূর্ণ মানব হিসেবে দেখার পক্ষপাতী, সে-কথা উল্লেখ করে এম.জে. শায়ার লিখেছেন, ‘কোরচাক শিশুর ওপর সমাজ-নির্ধারিত কোনো প্রচলিত ধ্যান-ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন। সবাই যখন একই নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হয়, তখন সবাই অভিন্ন ভাবনা-চিন্তার মানুষ হয়ে ওঠে, শিশুর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। কোরচাক বরাবর শিশুর সর্বাধিক নিজস্ব বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক এমন আবহ সৃষ্টির পক্ষপাতী ছিলেন। (দেখুন : ইন্টারন্যাশনাল হ্যান্ডবুক অফ জুইশ এডুকেশন,  পৃ ৩০৮, স্প্রিঙ্গার, ২০১১)।

তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-ভাবনার পূর্ণ সঙ্গতি রয়েছে। প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে বিদ্যালয় নির্মাণ রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য ছিল, যদিও তপোবনে শিক্ষক-শিষ্যের যে আনুগত্য-নির্ভর সম্পর্ক, রবীন্দ্রনাথ তার পুনরাবৃত্তি চাননি। তিনি ছাত্রদের বিদ্যালয়ের আবদ্ধ পরিবেশ থেকে বের করে উন্মূক্ত পরিবেশে আনতে চেয়েছিলেন। যে-বিদ্যালয় তিনি নির্মাণ করেন, সেখানে তপোবনের আদর্শে বৃক্ষতলে ছাত্রদের পাঠ গ্রহণ চলত, কিন্তু যে-বিদ্যাশিক্ষা তারা লাভ করত, তা সে-সময়ের জন্য তো বটেই, চলতি সময়ের জন্যও অধিকতর অগ্রসর। নিয়মমাফিক পাঠ গ্রহণের পাশাপাশি সংগীত, শরীরচর্চা ও ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত কার্যাবলি সে বিদ্যালয়ে নিয়মিত অনুসরণ করা হতো। কোরচাকের আশ্রম তপোবন না হলেও সেখানে অনুরূপ শিক্ষাসূচি তিনিও কঠোর নিয়মানুবর্তিতার ভেতর দিয়ে অনুসরণ করেছেন।

শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে যে সম্পর্ক, সে-ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের খুব সুনির্দিষ্ট উপদেশ ছিল। ভালোবাসার কাছে বন্ধন ভিন্ন প্রকৃত শিক্ষা প্রদান অসম্ভব। সে কথা ব্যক্ত করে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘Only he can teach who can love. The greatest teachers of men have been lovers of men.’ এ-কথাটাই আরো স্পষ্ট করে বলেছেন এইভাবে : ‘যে আদর্শের কথা গোড়ায় বলেছি তাকে রক্ষা করতে হলে ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকের সম্বন্ধ কেবল শিক্ষাদানের সম্পর্ক হলে চলবে না, যথার্থ আত্মীয়তার সম্বন্ধ হওয়া চাই। যিনি শিক্ষা দেবেন, তাঁকেও অনবরত জ্ঞান আহরণের ভেতর থাকতে হবে, যে শিক্ষক অনবরত নিজেকে আবিষ্কারে অক্ষম, তিনি আদর্শ গুরু নন।’

তাঁর কথায়, ‘A teacher can never truly teach unless he is learning himself. A lamp can never light another lamp unless it continues to burn its own flame.’

(বিস্তারিত দেখুন : ইংলিশ রাইটিংস অব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ ৫৯-৬০, সাহিত্য অ্যাকাডেমি, ২০০৬)।

কোরচাকের অবস্থানও কার্যত অভিন্ন। তিনি বরাবর বলে এসেছেন, শিশুদের সঙ্গে যেন কোনো চাতুরীর আশ্রয় না নেওয়া হয়। শিক্ষকদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল, নিজেদের লালিত মূল্যবোধের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। ‘শিশুকে জানার চেষ্টা করার আগে নিজেকে জানুন’, কোরচাক পরামর্শ দিয়েছিলেন (দেখুন : কোরচাক, ডায়ালগ অ্যান্ড ইউনিভার্সালিজম, অন্টারিও ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ ইন এডুকেশন, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ ৪৪-এ উদ্ধৃত)। কোরচাক শিক্ষকের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছেন, যাকে শিক্ষা দেবে, সেই শিশু – তার মন ও ব্যক্তিত্ব – যতটা সম্ভব জানার চেষ্টা করবে। ‘একটি শিশুর জগৎ বিশাল, তাকে জানার জন্য আমি নিজে একবার, দুইবার, তিনবার – বার বার অধ্যয়নের চেষ্টা করি।’ শিশুকে তাঁর অধীনস্ত এমন একজন না ভেবে তাকে নিজের সমকক্ষ – একজন পার্টনার – ভাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন কোরচাক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন শিক্ষক যে-ভুলটি করে তা হলো, শিশু নিজে কী হতে চায় তা না জেনে শিক্ষক শিশুর জন্য কী মঙ্গলজনক, সেই ধারণাই তার ওপর চাপিয়ে দিতে চান। এই মানসিকতার বিরোধী ছিলেন কোরচাক।

কোরচাক লিখেছেন : ‘আমি শিশু চুম্বন করি আনত দৃষ্টিতে,  চিন্তায়, প্রশ্নে। তুমি কে, যে আমার কাছে এমন এক আশ্চর্য হেঁয়ালি। আমার সকল মনের জোর দিয়ে তোমাকে আমি চুম্বন করি। তোমাকে আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি? আমি তোমাকে সেইভাবে চুম্বন করি, যেভাবে একজন নভোচারী চুম্বন করে নক্ষত্রকে।’

এর সঙ্গে তুলনা করুন শিক্ষকদের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য : ‘আমাদের যা কিছু দুঃখ-দুর্দশা, এমনকি, ক্ষুদ্র শিশুটির কাছেও যেন আমরা গোপন না করি। আশ্রমের দায়িত্ব বহনে তাদের অংশ আছে – এ কথা মনে করেই তারা যাতে গৌরব বোধ করে, আমাদের তাই দেখা উচিত। অর্থাৎ তাকে অংশীদারিত্বের মর্যাদা দিয়ে প্রথমত তার মূল্যকে স্বীকৃতি দান ও সেই সূত্রে তার দায়িত্ববোধকেও উদ্বোধিত করা সম্ভব হয়। এ মানুষ জ্ঞানী না হলেও তার দায়িত্ববোধ ও নিরহঙ্কার শ্রমে মনুষ্যত্বের মাপকাঠিতে সে উচ্চতর কোটিতে স্থান পাবে।’ (রবীন্দ্রনাথ, মুসলিম মানস ও বাংলাদেশের অভিযাত্রা, আবুল মোমেন, প্রথমা, ২০১১, পৃ ১৭৪-এ উদ্ধৃত।)

এটা মোটেই কাকতালীয় নয় যে, কোরচাকও শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক অংশীদারিত্ব বলে চিহ্নিত করেছিলেন। শিশু-কিশোর কীভাবে শিক্ষকের অধীনস্ত হওয়ার বদলে তার ‘পার্টনার’ হয়ে ওঠে, কোরচাক সে-কথা নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই শিখেছিলেন, যার বিবরণ দিয়েছেন কীভাবে শিশুকে ভালোবাসবে (হাউ টু লাভ এ চাইল্ড এই নামে অনূদিত) গ্রন্থে। ওয়ারশর দরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের মাঝে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁর সে-অভিজ্ঞতা হয়। সেটা ১৯০৭-এর কথা, একটি গ্রীষ্মকালীন শিশু ক্যাম্পে পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন কোরচাক। গোড়াতে তিনি শিশুদের যার যার বসার জায়গা ও ঘুমাবার বিছানা নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ছেলেমেয়েরা একে ওপরের সঙ্গে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে, এমনকি মারামারি পর্যন্ত। একদিন দুই দল ছাত্র লাঠিসোঁটা নিয়ে একে অপরের ওপর লাফিয়ে পড়তে উদ্যত হয়। কোরচাক বুঝলেন তাঁকে ভিন্ন পথে এগোতে হবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বসবেন। কী করা উচিত তার নির্দেশ না দিয়ে সে-ব্যাপারে শিশুদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নিলেন। অর্থাৎ, যারা এতদিন তাঁর অধীনস্ত ছিল, এবার তারা হয়ে উঠল সমকক্ষ। সমতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার পর সমস্যার ফয়সালা হলো। কোরচাক লিখেছেন, সেই প্রথম তিনি বুঝলেন শিশুদের কাছ থেকে বড়দের অনেক কিছু শেখার আছে। শিশুদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণের, নিজের মত প্রকাশের ও ভিন্নমত পোষণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

(বিস্তারিত দেখুন : সিলেক্টেড ওয়ার্কস অব ইয়ানুশ কোরচাকে অন্তর্ভুক্ত ‘হাউ টু লাভ এ চাইল্ড’, ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, ওয়াশিংটন ১৯৬৭)।

শিশু ক্যাম্পে তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোরচাক নিজের অনাথ-আশ্রমে শিশুদের নিজের পরিচালনায় তাদের ‘আইনসভা’ (পার্লামেন্ট), এমনকি শিশু আদালতও চালু করেছিলেন। সে-আদালতে বিচারক, জুরি ও কৌঁসুলি সবই ছিল শিশু। বড়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সে-বিষয়ে বিচার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের    দায়-দায়িত্ব ছিল এই আদালতের শিশুদের। কোরচাক নিজে একবার এই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন। এই আদালত পরিচালনার জন্য যে-গঠনতন্ত্র কোরচাকের উদ্যোগে রচিত হয় তার ভিত্তিভূমে ছিল এই নীতি যে, আদালতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকে – সে ছোট হোক বা বড় – একে অপরকে সমজ্ঞানে গ্রহণ করবে। তাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র অধিকার রয়েছে এবং সে-অধিকারের পূর্ণ স্বীকৃতির ভিত্তিতেই সমতাভিত্তিক এই সম্পর্ক নির্মিত হবে।

ভিন্ন ভিন্ন পথে অগ্রসর হলেও শিক্ষার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ও কোরচাক কার্যত প্রায়-অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছান। প্রথাগত ব্যবস্থায় শিশুকে গ্রন্থভূক করা সম্ভব, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত করা সম্ভব নয়। এ-কথা রবীন্দ্রনাথ শৈশবে স্কুলজীবনেই বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে । পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়, যা পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় – সেখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষাভাবনার ভিত্তিতে একদিকে ভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন, অন্যদিকে শিশুর মনোজগৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকার নতুন মূল্যায়ন উপস্থিত করেন। কোরচাকও এই দুই কাজে হাত দিয়েছিলেন, তবে সে-কাজের ভিত্তিতে ছিল ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়, শিশুদের কাছ থেকে গৃহীত পাঠ।

শিশু-শিক্ষা প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ও কোরচাকের দৃষ্টিভঙ্গির অবশ্য একটি মৌলিক তফাৎ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যেখানে শিশুর নান্দনিক মনোজগৎ নির্মাণে অধিক আগ্রহী, সেখানে কোরচাকের আগ্রহ ছিল নাগরিক – অথবা ব্যক্তি হিসেবে শিশুর অধিকারের স্বীকৃতি। শিশু আগামীকালের নাগরিক নয়, সে আজকের সন্তান, ফলত তার সকল অধিকারের স্বীকৃতি চাই আজই, এখনই। রবীন্দ্রনাথ যে শিশুর অধিকার বিষয়ে অজ্ঞ অথবা সে-প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন, তা নয়, তবে তা বিবেচনা করেছেন অভিভাবকের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে। শিশুকে প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা ক্ষুদ্র অর্থে অভিভাবকের এবং বৃহত্তর অর্থে সমাজের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোরচাকের জন্য এই অধিকারের নৈতিক ভিত্তি অবশ্যই আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সে-অধিকারের সামাজিক ও আইনগত ভিত্তি রয়েছে। শিশুকে সে-অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা হবে অলিখিত সে আইনের লঙ্ঘন। কোরচাকের মৃত্যুর প্রায় অর্ধশতক পরে, ১৯৭৯ সালে, জাতিসংঘ ‘শিশু অধিকার ঘোষণা’ সনদ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের মাধ্যমে কোরচাকের প্রস্তাবিত অধিকার-নীতিমালাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জানায়।

উদাহরণত ‘শিশু অধিকার সনদে’র ১২/১ ধারায় বলা হয়েছে : ‘এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহ এই মর্মে আশ্বাস দিচ্ছে যে, প্রতিটি শিশু তার নিজের মতামত গঠনের যোগ্যতা রাখে এবং শিশু স্বার্থ সংক্রান্ত সকল বিষয়ে নিজের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশের অধিকার রাখে।’

কোরচাকের সারাজীবনের সাধনাই ছিল পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে শিশুদের সকল অধিকারের স্বীকৃতি। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গৃহীত শিশু অধিকার চুক্তিতে সেই অধিকারেরই স্বীকৃতি দেওয়া হলো।

রবীন্দ্রনাথ ও কোরচাক কেউই শিক্ষা-প্রশ্নে গবেষক অথবা বিশেষজ্ঞ নন। তাঁরা দুজনেই ‘প্র্যাকটিশনার,’ ফলে তাঁদের প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতিমালা কখনো সুসংগঠিত ও পর্যায়ভিত্তিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে না। দৃশ্যত, তাঁদের ব্যক্তগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় কোনো আপাত অন্বয় না থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ও কোরচাকের দৃষ্টিভঙ্গির অভিন্নতা লক্ষণীয়। তাঁরা দুজনেই বিশ্বাস করতেন, ওপর থেকে চাপিয়ে দিলেই শিশুদের মধ্যে সুস্থ মূল্যবোধ সঞ্চার সম্ভব নয়। সুস্থ মূল্যবোধ বলতে রবীন্দ্রনাথের বেলায় নান্দনিক ও কোরচাকের বেলায় নৈতিক, এইভাবে বুঝলেই তাঁদের প্রতি সুবিচার হবে। অধ্যাপক সারাহ এফরনের কথা ধার করে বলা যায়, কোরচাক শিশুকে মানবসভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান করতেন। কিন্তু সে-শিশুর গঠন সম্ভব শিক্ষার মাধ্যমে। এ-কথার অর্থ এই নয়, শিশুকে তাবত নীতিকথা এবং ধর্ম ও সমাজ বিষয়ে পন্ডিত বানাতে হবে। এর জন্য যা দরকার তা হলো, শিশুর মধ্যে নীতিবোধ, সততা ও ন্যায়ের পক্ষে প্রকৃত আকুলতা (‘লংগিং’) জাগানো। অধ্যাপক এফরন তাঁর এই কথার পক্ষে ১৯১৯ সালে ছাত্রদের উদ্দেশে কোরচাকের দেওয়া একটি ভাষণের উল্লেখ করেছেন। সেখানে কোরচাক বলেন, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে নেবার মতো শুধু একটি জিনিস দিয়ে দিচ্ছি : উন্নত জীবনের জন্য আকুলতা। আমি এমন জীবনের কথা বলছি, যে-জীবন হয়তো এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু একদিন হবে। সে-জীবন হবে ন্যায় ও সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (দেখুন : কারিকুলাম কোয়ার্টারলি, ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ ৪৩)।

রবীন্দ্রনাথ শিশুর নিজস্ব প্রয়োজন কী তা জানতে শিশুর কাছে যাননি, নিজের শিশুমনকে প্রশ্ন করেছেন ও যে-উত্তর পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে সে-প্রয়োজনের ফর্দ লিপিবদ্ধ করেছেন। অতি পরিণত বয়সেও নিজেকে শিশুর মতো ভাবার ক্ষমতা তিনি রাখতেন। শিশুদের জন্য যে-রাজত্ব তিনি কল্পনা করেছিলেন, তাতে ‘সবাই রাজা’। কিন্তু একজন বড় রাজার কথাও তিনি মাথায় রেখেছিলেন, ফলে শিশুরা সবাই রাজা হলেও তিনি নিজে ছিলেন সেই কল্পরাজ্যের শিশুতোষ রাজাধিরাজ। এই জায়গায় কোরচাকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভিন্নতা।

শিক্ষা-প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ও কোরচাক উভয়েই জীবনাভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা-প্রশ্নে তাঁদের যাবতীয় সিদ্ধান্ত ও উপসংহারে পৌঁছান, এ-কথা যদি মেনেও নিই, যা আমাদের বোধগম্যের বাইরে রয়ে যায় তা হলো, মৃত্যু-প্রশ্নে তাঁদের অভিন্ন মানসিকতা। ভিন্ন সংস্কৃতির ও ধর্মীয় এতিহ্যের অনুবর্তী ছিলেন তাঁরা, অথচ ভিন্ন ভিন্ন পথে অগ্রসর হয়ে তাঁরা দুজনেই অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছান। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে পাঠ নিয়েছিলেন, জীবনের চক্রাবর্তে তাঁর আস্থা ছিল। শরীরের মৃত্যু মানেই জীবনের মৃত্যু নয়, কারণ মানব মাত্রই অমৃতের পুত্র, তার দেহ পুড়ে ভস্মীভূত হয়, কিন্তু বেঁচে থাকে তার চৈতন্য। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন যে, ‘ঐ যা কিছু পূর্ণ তা পূর্ণ, এই যা কিছু তাও পূর্ণ, পূর্ণ হতেই পূর্ণ উদিত হয়।’ মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যদি তুলনা করি তাহলে এই কথার অর্থ সম্ভবত দাঁড়ায় এই : যে অসীম থেকে মানবের উদ্ভব, সেই অসীমেই সে লীন হয়, ফলে যা অসীমের অন্তর্গত তা কখনো নিঃসীমে মিলিয়ে যায় না। গানের ভাষায় এই কথাটি রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন এভাবে :

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই –

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু,

কোথাও বিচ্ছদ নাই।

কোরচাক দার্শনিক নন, কবিও নন। উপনিষদের পাঠ তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। অথচ মৃত্যুবিষয়ে তাঁর উপলব্ধির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অনুধাবনের কোনো মৌলিক প্রভেদ নেই। অতি-সম্মুখে মৃত্যু, এ-বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন হয়েই তিনি ঘেটো ডায়েরি লেখা শুরু করেছিলেন। গভীর রাতে, যখন আশ্রমের সকল শিশু নিদ্রায়, যখন সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে নিজের চৈতন্য-গৃহে প্রবেশ করেছেন, সেই সময় তিনি এই আশ্চর্য কথাগুলি লিখেছিলেন :

Man feels and ponders death as though it were the end, when in fact death is merely the continuation of life. It is another life. You may not believe in the existence of the soul, yet you must acknowledge that your body will live on as green grass, as a cloud. For you are, after all, water and dust.

তাঁর এই কথা পড়ার পর আমাদের বুঝতে অসুবিধার হওয়ার কথা নয় কোরচাক কেন রবীন্দ্রনাথের ডাকঘরকেই জীবনের চূড়ান্ত প্রহরে মঞ্চায়নের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। অনাথ-আশ্রমের শিশুদের জন্য তো বটেই, তাঁর নিজের আত্মার শুশ্রূষার জন্যও অমলের প্রতীকের সাহায্য তাঁর প্রয়োজন ছিল। অমল তো মরণকেই আহবান করেছিল, কারণ মৃত্যুর ভেতরে সে মুক্তি তথা অমরতার সন্ধান পেয়েছিল। মৃত্যু তো জীবনেরই অবিরাম ধারা। মৃত্যু, সে তো আসলে আরেক জীবন। অমলের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ এ-কথা বলেছিলেন, এ-কথা কোরচাকেরও।

আগে উল্লিখিত হয়েছে চিকিৎসক হিসেবে সম্পূর্ণ অপরিচিত বালক-বালিকার পরিচর্যায় এসে তাঁকে যে মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে হয়, কোরচাকের মনে তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। রুশ-চীন যুদ্ধের সময় রণাঙ্গনেও তাঁকে মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে হয়, যার বিবরণ তিনি লিখে পাঠাতেন ওয়ারশের সাময়িক পত্র ভয়েসের জন্য।

‘শীতকালের কথা মনে পড়ে। ঘোড়ার গাড়ি এসে থামল, সেখান থেকে সাবধানে নামানো হলো গরম কাপড়ে মোড়া অসুস্থ এক শিশুকে। ঘণ্টা বাজছে, ডাক্তারবাবুর ডাক পড়েছে। আসছি, আমি আসছি! পরিবারের নিজের একটি কম্বল, প্রতিবেশীর – কখনো কখনো একাধিক প্রতিবেশীর – কম্বলে মোড়া শিশু। সে-সব কাপড়ের নিচে শিশু, সংক্রামক জ্বরে ভুগছে। ছোঁয়াচে রোগের ইউনিটে কোনো আসন খালি নেই। অর্থহীন অনুনয়-বিনয়। ডাক্তার, একে রাখতেই হবে। আমি আপনাকে এক রুবল দেব, দয়া করুন। না, একে ঘরে ফিরিয়ে নিন। কখনো কখনো ক্রুদ্ধ তিরস্কার।’ (দি কিং অব চিল্ড্রেন-এ উদ্ধৃত, পৃ ৪৬)

নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রী শিশুর মৃত্যু যাতে সম্মানের সঙ্গে হয়, যার কথা কোরচাক পরে শিশু অধিকার বিষয়ক তাঁর একাধিক রচনায় উল্লেখ করেছেন, তার ভিত্তি চিকিৎসক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। সম্ভবত চিকিৎসক বলেই মৃত্যুকে তিনি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণে সমর্থ ছিলেন। পাশাপাশি মৃত্যুপথযাত্রী প্রতিটি শিশু যাতে পূর্ণ সম্ভ্রমের সঙ্গে সে-মৃত্যু গ্রহণে প্রস্ত্তত হয়, সে-চেষ্টাও তিনি অবিরত করে গেছেন। সব শিশু শুধু তার জননীর সন্তান নয়, তার ভিন্ন নিয়তিও থাকতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিটি প্রকৃতিবিজ্ঞানী জানেন, বীজ মাত্রই শস্যকণার জন্ম দেবে না। প্রতিটি মুরগি ছানাই দীর্ঘজীবী হবে না, অথবা প্রতিটি চারা গাছ বৃক্ষে পরিণত হবে না।’

অন্যকথায়, যে-মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করাই অধিক সংগত। ওয়ারশ ঘেটোতে মাসের পর মাস তাঁকে জীবন্মৃত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছে, তিনি একা নন, অনাথ-আশ্রমের প্রতিটি শিশু ও তাঁর সকল সহকর্মীকে। অন্য কেউ না হোক, তিনি জানতেন এদের প্রত্যেকের মৃত্যু অনিবার্য। আমরা এ-কথা জানি, তিনি নিজে নাৎসির কবল থেকে বেঁচে যেতে পারতেন, খ্যাতনামা লেখক ও চিকিৎসক হিসেবে তাঁকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার অনেক প্রস্তাবই তাঁকে দেওয়া হয়েছে। এমনকি, ত্রেবলিনকার পথে ট্রেনে রওনা হওয়ার আগেও তাঁর হাতে নিরাপদে প্রস্থানের পাসপোর্ট গুঁজে দেওয়া হয়। তিনি সে-প্রস্তাবে সম্মত হননি। সমাহিত চিত্তে, সম্মানের সঙ্গে শিশুদের নিয়ে মৃত্যুবরণকে তিনি শ্রেয়তর মনে করেছিলেন। সম্ভবত ডাকঘরের অমলের কাছ থেকেও তিনি নিজ প্রত্যয়ের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।

আরো একটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও কোরচাকের অভিজ্ঞতায় আমরা অন্বয় খুঁজে পাই। তাঁরা দুজনেই জীবনের এক সংকট মুহূর্তে আত্মহননের কথা ভেবেছিলেন। কোরচাকের ক্ষেত্রে, পিতার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সে-ভাবনার উদয়। আত্মহত্যা নামে একটি উপন্যাস রচনাও সেই বয়সে তিনি শুরু করেন। ঘেটো ডায়েরিতে কোরচাক স্মরণ করেছেন, সে-উপন্যাসের নায়ক নিজের জীবনকে ঘৃণা করত, তার ভয় ছিল সে একসময় উন্মাদে পরিণত হবে। তিনি একজন উন্মাদের সন্তান এবং নিজে একসময় উন্মাদে পরিণত হবেন, এই ভাবনা কোরচাককে দীর্ঘদিন কুরে কুরে খেয়েছে। নিজের ভগ্নির কাছেও একসঙ্গে আত্মহত্যার প্রস্তাব করেছিলেন, যার স্বীকারোক্তি ঘেটো ডায়েরিতে রয়েছে। সে-গ্রন্থের একটি অধ্যায় তিনি ব্যয় করেছেন স্বেচ্ছা-মৃত্যু বা ইউথ্যানাসিয়া বিষয়ে আলোচনায়। করুণা হিসেবে মৃত্যুপথযাত্রী শিশু অথবা বৃদ্ধকে স্বেচ্ছা-মৃত্যুবরণের অধিকারের স্বীকৃতির পক্ষে সেখানে তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। কোরচাক লিখেছেন, ‘যে ভালোবাসে ও (মৃত্যুপথযাত্রীর সঙ্গে) সমানভাবে আহত বোধ করে, করুণা-হত্যার অধিকার তার অবশ্যই আছে।’

আত্মহননের কথা রবীন্দ্রনাথের মনেও উঁকি দিয়েছে। তরুণ বয়সে ভ্রাতৃবধূ কাদম্বরীর মৃত্যু তাঁকে কী প্রবল রকম নিঃসঙ্গতা ও মানসিক বৈকল্যের সম্মুখীন করে, সে-কথার সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। এমনকি পরিণত বয়সে, নোবেল পুরস্কারের মতো সম্মানজনক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পরেও, রবীন্দ্রনাথ আত্মহননের কথা ভেবেছেন। পুত্র রথির কাছে তারিখবিহীন একটি পত্রে – সম্ভবত ১৯১৪ সালের শেষ ভাগে কোনো এক সময় লেখা – তাঁকে ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা তাড়না করছে’ বলে জানিয়েছেন। ব্যক্তিগত ও সম্ভবত পারিবারিক সংকটই এই তাড়নার কারণ। তিনি লিখেছেন, ‘মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে না, আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ; – অন্যদের সকলের সম্বন্ধেই নৈরাশ্য এবং অনাস্থা।’ ঋষি-পিতার কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষা পেয়েছিলেন, সংসারের কূট-ঝামেলা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখে মানবের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গে ব্রতী হতে আত্ম-প্রতিজ্ঞ ছিলেন। অথচ ব্যক্তি-জীবনে সকল সাংসারিক মায়াজাল তাঁকে জড়িয়ে রেখেছিল, খ্যাতির মোহও তাঁকে আবিষ্ট করেছিল। নিজের নোবেল পুরস্কার ও গীতাঞ্জলির অনুবাদ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের ভেতর থেকে তাঁর সে-আবিষ্টতার প্রমাণ মেলে। কিন্তু আমরা এও জানি, তাঁর ভেতরের সন্ন্যাসীটি কখনো মরে যায়নি। বাহির যখন তাঁকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করার উপক্রম, সেই সন্ন্যাস মনটি তাঁর বিগড়ে উঠল, সে বিদ্রোহ করল। সম্ভবত এই দোটানা থেকেই জন্ম নেয় আত্মহননের চিন্তা। একই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘রামগড়ে যখন ছিলুম তখন থেকে আমার conscience-এ কেবলি ভয়ংকর আঘাত করেচে যে বিদ্যালয় জমিদারী সংসার প্রভৃতি সম্বন্ধে আমার যা কর্তব্য আমি কিছুই করিনি – আমার উচিত ছিল নিঃসংকোচে আমার সমস্ত পরিবারের লোককে একেবারে চূড়ান্ত ত্যাগের মধ্যে টেনে আনা; সেইটে যতই হচ্ছিল না ততই নিজের ওপর এবং সংসারের ওপর আমার গভীর অশ্রদ্ধা  ঘনিয়ে আসছিল এবং কেবলি মনে হচ্ছিল যখন এ জীবনে আমার ideal-কে realise করতে পারলুম না তখন মরতে হবে, আবার নতুন জীবন নিয়ে নতুন সাধনায় প্রবৃত্ত হতে হবে।’ (দেখুন : চিঠিপত্র ২, বিশ্বভারতী, ১৩৪৯, পৃ ২৮)।

কোরচাক অথবা রবীন্দ্রনাথ কেউই যে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ অনুসরণ করেননি, সে আমাদের পরম সৌভাগ্য। জীবন থেকে যা কিছু পাওয়ার, তা জীবন ধারণের ভেতর থেকেই অর্জন করতে হবে, এই শিক্ষা তাঁদের দুজনের জীবনে ও কর্মে রয়েছে। সেবা ও ত্যাগই যখন মোক্ষ, সে-মোক্ষ অর্জনের একমাত্র পথ তো এই  মানব-জীবন। মৃত্যুর অমোঘতায় তাঁরা উভয়েই বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু সে-মৃত্যুতে ভীত হওয়ার বদলে তাকে সমাহিত চিত্তে বরণ করার শক্তি অর্জনের সাধনাই করেছেন আমৃত্যু।

 

দুই

ওয়ারশ ঘেটোতে আসন্ন মৃত্যুর সম্ভাবনা কোরচাককে উদ্বিগ্ন করেছে, সে-কথা তাঁর ডায়েরি থেকে আমরা জেনেছি। কিন্তু এই উদ্বেগ নিজের মৃত্যুর সম্ভাবনায় নয়, নিজের দায়িত্বে ন্যস্ত প্রায় দুশো শিশুর আসন্ন মৃত্যুই তাঁকে বিভ্রান্ত করে তোলে। মনে মনে তিনি ভীত হয়েছিলেন, কিন্তু বাইরে সে-ভীতির সে-সন্ত্রাসের কোনো প্রকাশ ছিল না। আশ্রমের নির্ধারিত প্রতিদিনের কার্যক্রম – পাঠাভ্যাস থেকে নাট্যাভিনয় – তিনি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে গেছেন। শিশুদের সম্ভাব্য নির্ভাবন শৈশব প্রদান তাঁর লক্ষ্য ছিল। তাদের মৃত্যুর জন্য প্রস্ত্তত করাও ছিল তাঁর অলিখিত এক উদ্দেশ্য। ডাকঘর নাটকের মঞ্চায়ন সেই লক্ষ্যেই।

ঠিক কখন, কীভাবে ডাকঘর নাটকের সঙ্গে পরিচয় ও সে-নাটক পাঠে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া কী ছিল, আমরা তা জানি না। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক হিসেবে নোবেল বিজয়ী বাঙালি লেখককে তিনি জানতেন, এ-কথায় বিশ্বাস করা মোটেই কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। নোবেল পুরস্কারের ফলে ইউরোপের সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে। পোল্যান্ড তার ব্যতিক্রম ছিল না। ১৯১৪ সালে প্রথমবারের মতো গীতাঞ্জলির নির্বাচিত কিছু কবিতা পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করেন কবি জ্রেবভিৎস। চার বছর পর জ্রেবভিৎসের অনুবাদে সমগ্র কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। আরেক পোলিশ কবি শেজলাভ মেসাকভস্কি প্রায় একই সময়ে গীতাঞ্জলির নির্বাচিত কিছু কবিতা অনুবাদ করেন। ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ পোল্যান্ড সফরের একটি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন, এর ফলে সে-দেশে কবির রচনার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়।  কবির ইংরেজি গ্রন্থ, ফ্রুট গ্যাদারিং ও রাজা নাটকের ইংরেজি অনুবাদ দি কিং অব দি ডার্ক চেম্বার এই সময়ে পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রায় একই সময়ে অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর নির্বাচিত ছোটগল্প ও আধ্যাত্মিকতা বিষয়ক বক্তৃতা সংকলন সাধনা। অনুমান করি, কবির এইসব রচনার সঙ্গে কোরচাক পরিচিত ছিলেন। জাতীয়তাবাদ বিষয়ক কবির বিখ্যাত গ্রন্থ অন ন্যাশনালিজম এই সময় পোল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের নজরে আসে ও সে-গ্রন্থে প্রকাশিত জাতীয়তাবাদবিরোধী মনোভাবের কারণে কবি স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রবল আক্রমণের সম্মুখীন হন। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য সময়াভাবে শেষ পর্যন্ত পোল্যান্ডে সফরে আসতে পারেননি, এই ক্রুদ্ধ সমালোচনাও সে-সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে ।

(পোল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন : এ টেগোর সেন্টেনারি, সাহিত্য অ্যাকাদেমি, কলকাতা ১৯৯২-এ অন্তর্ভুক্ত তাদিউস পাবোজনিয়াকের প্রবন্ধ ‘টেগোর ইন পোল্যান্ড’, পৃ ৩৫০)।

ডাকঘর পোলিশ ভাষায় প্রথম অনূদিত হয় ১৯১৯ সালে, লাওরা কানোপনিকা-পিতলিন্সকায়ার হাতে। তিন বছর পর, ১৯২২ সালে ইয়ান সুর একই গ্রন্থের আরো একটি অনুবাদ প্রকাশ করেন। এই দুই অনুবাদের কোনটি কোরচাক মঞ্চায়নের জন্য বেছে নেন, তা স্পষ্ট নয়। ঘেটোতে স্থানান্তরের পর থেকেই কোরচাক তাঁর আশ্রমের সদস্যদের ব্যক্তিগত ডায়েরি রাখতে উৎসাহিত করেছিলেন। নিয়মিত ক্রীড়া ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজনও হতো আশ্রমে। প্রায়-বন্দি সে-জীবনে শিশুদের যতটা স্বাভাবিক জীবন দেওয়া সম্ভব, সেটাই ছিল কোরচাকের মূল লক্ষ্য। সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, কোরচাক ততই বুঝতে পারছিলেন, মৃত্যুর ভীতি থেকে শুধু নজর সরিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়, তাদের মৃত্যুকে শান্ত-সমাহিত চিত্তে গ্রহণ করার মানসিকতাও অর্জন করতে হবে। কোরচাকের জীবনীকার জিন লিফটন (দ্য কিং অব চিল্ড্রেন, ফারার, স্ট্রস অ্যান্ড জিরো, ১৯৮৮, পৃ ৩১৮-৩১৯) জানিয়েছেন, শিশুরা যাতে তাদের নিয়তির সঙ্গে সংহতি বোধ করে ও শান্তি খুঁজে পায়, সেজন্যে কোরচাক একটি যথোপযুক্ত নাটক খুঁজছিলেন। ডাকঘর ছিল সেই নাটক। লিফটনের কথায় : ‘মৃত্যুপথযাত্রী অমল – যে নিজেও ছিল অনাথ ও অন্যের আশ্রিত – তার চরিত্র এমন নির্মল ছিল যে তার সংস্পর্শে যে-ই এসেছে তারাই উজ্জীবিত হয়েছে। এটি এমন এক গল্প ছিল যা মনে হতে পারে কোরচাকের নিজের লেখা। কারণ যে-কল্পজগতের কথা তিনি নিজে নির্মাণ করতেন ও শিশুদের প্রতি তাঁর যে-মনোভাব, এই নাটকে তার পূর্ণ প্রতিফলন ছিল।’

ডাকঘর নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে মৃত্যুপথযাত্রী বালক অমল। পিতা-মাতাহীন এই বালক মাধব দত্তের আশ্রিত, তার মাত্রাতিরিক্ত পরিচর্যায় অমলের স্বাস্থ্য ক্রমশ অবনতির পথে। চার দেয়ালে ঘেরা এই যত্নের বন্ধন ছেড়ে বাইরে বেরোতে চায় সে। জানালার ধারে বসে অমল কাছের ও দূরের দৃশ্য দেখে, ফুল দেখে, মানুষ দেখে। তার ইচ্ছা এই ঘর ছেড়ে বাইরের পৃথিবীতে যেতে। ক্রীড়ারত বালকদের দেখে তার ইচ্ছা হয় তাদের সঙ্গে খেলতে, দইওয়ালাকে দেখে ইচ্ছা হয় দই বিক্রি করতে। জানালার পাশ দিয়ে চলে যায় মালিনীকন্যা সুধা, অমলের ইচ্ছা হয় সেও ফুল কুড়াবে। মাধবের ধারণা জানালার ধারে থাকায়, বাইরের বাতাসে অমল আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছে, কবিরাজের নির্দেশে সে জানালাও বন্ধ হয়ে যায়। অমল তার ঠাকুরদার কাছ থেকে জানতে পারে, অনতিদূরে নতুন ডাকঘর বসেছে, সেখান থেকে রাজার নামে তার কাছে চিঠি আসবে। সে-চিঠির অপেক্ষায় দিন গোনে অমল। এক রাতে অমলের গৃহে এসে হাজির হয় রাজদূত, সঙ্গে রাজকবিরাজ। বন্ধ দরজা খুলে তারা ঢোকে, নির্দেশ দেয় সব দরজা-জানালা খুলে ফেলতে। মুক্ত বাতাস এসে ঘরে ঢোকে, অমল দেখে আকাশের জ্বলজ্বলে তারা। সে ঘুমিয়ে পড়ে। ফুলের ডালা নিয়ে দেখা করতে আসে সুধা। অমল ঘুমিয়ে পড়েছে জানতে পেরে ফিরে যাওয়ার সময় মাধবকে বলে যায়, অমলকে বোলো যে সুধা তাকে ভোলেনি।

রবীন্দ্রনাথ ডাকঘর নাটকটি খুব দ্রুত লিখে শেষ করেন। শান্তিনিকেতনের ছাত্র-শিক্ষকদের কাছে তিনি ডাকঘর রচনার পটভূমি বর্ণনা করেছিলেন। রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল কালীমোহন ঘোষের অনুলিখনে সে-কথা জানিয়েছেন –

‘ডাকঘর’ যখন লিখি তখন হঠাৎ আমার অন্তরের মধ্যে আবেগের তরঙ্গ জেগে উঠেছিল। …চল চল বাইরে, যাবার আগে তোমাকে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে হবে – সেখানকার মানুষের সুখ-দুঃখের উচ্ছ্বাসের পরিচয় পেতে হবে। সে সময় বিদ্যালয়ের কাজে বেশ ছিলুম। কিন্তু হঠাৎ কি হল। রাত দুটো-তিনটের সময় অন্ধকার ছাদে এসে মনটা পাখা বিস্তার করল।  যাই যাই এমন একটা বেদনা মনে জেগে উঠল। পূর্বে আমার দু’একটা বেদনা এসেছিল। আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটবে, হয়ত মৃত্যু। স্টেশনে যেন তাড়াতাড়ি লাফিয়ে উঠতে হবে সেই রকমের একটা আনন্দ আমার মনে জেগেছিল। যেন এখান থেকে যাচ্ছি। বেঁচে গেলুম। … কোথাও যাবার ডাক ও মৃত্যুর কথা উভয়ে মিলে, খুব একটা আবেগে সেই চঞ্চলতাকে ভাষাতে ‘ডাকঘরে’ কলম চালিয়ে প্রকাশ করলুম। …যাওয়ার মধ্যে একটা বেদনা আছে, কিন্তু আমার মনের মধ্যে বিচ্ছেদের বেদনা ততটা ছিল না। চলে যাওয়ার মধ্যে যে বিচিত্র আনন্দ তা আমাকে ডাক দিয়েছিল।

পরে, ১৯২১ সালে, সি. এফ. অ্যান্ডরুজের কাছে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ডাকঘরের মূল বাণী এইভাবে বর্ণনা করেছেন : ‘Amal represents the man whose soul has received the call of the open road – he seeks freedom from the comfortable enclosure of habits sanctioned by the prudent and from walls of rigid opinion built for him by the respectable.’ (উভয় উদ্ধৃতির জন্য দেখুন : রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল, ষষ্ঠ খন্ড, পৃ ২৩৫-২৩৬, আনন্দ, কলকাতা, ১৯৯৩)।

কোরচাক ডাকঘরের এই বাণীটি ঠিক ধরতে পেরেছিলেন। যেতে হবে সে-কথা নিশ্চিত, কিন্তু সে-গমন যেন আনন্দ ও সমাহিত চিত্তে হয়, সেই উদ্বেগ তাঁর মনেও কাজ করছিল। শুধু মুখে বলে এই কথা আশ্রমবাসীদের বোঝানো তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। অধিকাংশ আশ্রমবাসী অমলের সমবয়সী, তার ভেতরের বেদনা ও একাকিত্ব তাদের বোঝার কথা। যে-বাহিরের ডাক সে শুনেছিল, তার ধ্বনি এইসব শিশুরও শোনার কথা।

নাটকটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোরচাকের একসময়ের পরিচিত, বিজ্ঞানের ছাত্রী এস্তেরকা ভিনোগ্রনকে। লিফটন জানিয়েছেন, এস্তেরকা কোরচাকের খুবই প্রিয় পাত্রী ছিলেন, তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নাটকটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে আশ্রমের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শিল্পী বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। অমলের চরিত্রে অভিনয়ের দায়িত্ব পায় আব্রাসা নামে এক কিশোর, ভায়োলিন বাদক হিসেবে যে আশ্রমে খুবই জনপ্রিয় ছিল। বিনামূল্যে সে অভিনয় দেখার আমন্ত্রণপত্রটি কোরচাক নিজেই লেখেন : ‘দিতে পারব না এমন কোনো কিছুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া আমাদের অভ্যাসের অন্তর্গত নয়। আমাদের বিশ্বাস এক ঘণ্টার এই নাটক – যার লেখক একাধারে দার্শনিক ও কবি – তার অভিনয় আপনাদের সর্বোচ্চ সংবেদনশীল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করবে।’

সেই ঘেটোতে সে-সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন তরুণ কবি ভ্লাদিসলাভ জেঙ্গল। কোরচাকের অনুরোধে সে-আমন্ত্রণপত্রে তিনি আরো তিনটি বাক্য জুড়ে দেন –

(এই নাটক) সকল পরীক্ষার ঊর্ধ্বে – কারণ সে আত্মার আয়না

তা সকল ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে – এ এমন এক অভিজ্ঞতা

এ কেবল অভিনয় নয় – কারণ এটি শিশুদের মঞ্চায়ন

১৪ জুলাই, বিকেল সাড়ে ৪টায় নাটক মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু তার আগের দিন এক অভাবনীয় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন কোরচাক। নাটকের প্রধান চরিত্রসহ অনেকেই পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়। নাটক শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হতে পারে, এই উদ্বেগে বিপন্ন হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর সৌভাগ্য, পরদিন অভিনয় শুরুর আগেই শিশু অভিনেতারা সুস্থ হয়ে ওঠে, সফলভাবে অভিনীত হয় ডাকঘর।

ডাকঘর মঞ্চায়নের সময় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন হলেন ইরিনা সেন্দেলরোভা। কোরচাককে তিনি চিনতেন; নাৎসি অবরোধের সেই ভয়াবহ সময়ে কয়েকশো ইহুদি বালক-বালিকাকে তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। ২০০৭ সালে কাউন্সিল অব ইউরোপের উদ্যোগে কোরচাকের স্মরণে আয়োজিত বিশেষ স্মারক ভাষণে তিনি সেই নাট্যাভিনয়ের সময়ে থাকার অভিজ্ঞতার কথা এইভাবে বর্ণনা করেছেন –

তাদের জানালার বাইরে কী ঘটনা ঘটছে, তা থেকে শিশুদের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোরচাক ডাকঘর নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। কোমল হৃদয় এই ডাক্তার জানতেন কী ভয়াবহ দুর্যোগ এইসব শিশুর জন্য অপেক্ষা করছে।  তিনি এমন একটি নাটক বেছে নিয়েছিলেন যার মূল বাণী ছিল আশাবাদে পূর্ণ। নাটকের শেষে আমরা দেখি রাজার কাছ থেকে সেই চিঠি এসেছে যাতে শিশুদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে মুক্ত, স্বাধীন এক নতুন জগতে আগমনের জন্য। এই অসাধারণ শিক্ষাবিদ ডাক্তার চেয়েছিলেন শিশুদের ও তাদের জন্য অপেক্ষমাণ নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব নির্মাণ করতে। গ্যাস চেম্বারে নিশ্চিত মৃত্যুর আগে ক্ষণকালের জন্য হলেও শিল্পী হিসেবে তাদের শেষ আনন্দপূর্ণ অভিজ্ঞতার উপহার দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

সেন্দেলরোভার বিবেচনায়, যে রাজার চিঠির অপেক্ষায় ছিল অমল, ঘেটোর শিশুদের জন্য সেই রাজা ছিলেন স্বয়ং কোরচাক। বৃদ্ধ ডাক্তারের পিছু পিছু যে দুশো শিশু শান্ত ও সুশৃঙ্খলভাবে ত্রেবলিনকার উদ্দেশে ট্রেনে রওনা হয়, সেন্দেলরোভা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে না ছিল উদ্বেগ, না ছিল ক্রন্দন।

‘কোরচাক শিশু সদন থেকে অনাথদের নিয়ে যাচ্ছেন, এই দৃশ্য আমি দেখেছি। অনাথ আশ্রম থেকে মৃত্যুর ঘরে। কোরচাক সে সময় নানারকম রোগশোকে ভুগছেন। সোজা হয়ে তিনি হাঁটছিলেন, কিন্তু মুখে যেন একটি মুখোশ আটা ছিল, তাতে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তার ছাপ নেই, দেখে মনে হবে পরিস্থিতি তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।’

(দেখুন : ইয়ানুশ কোরচাক, দি চাইল্ড’স রাইট টু রেস্পেক্ট, লেকচারস, কাউন্সিল অব ইউরোপ, ২০০৯)।

লিফটন জানিয়েছেন, ডাকঘর মঞ্চায়ন শেষ হলে পুরো হলঘরে গভীর নীরবতা নেমে আসে। তাদের নিঃশব্দ অভিব্যক্তি থেকে স্পষ্ট হয়, ছেলে-বুড়ো সবাই তাদের বর্তমান দুর্মর জীবন থেকে মুক্তির একটি আলোর খোঁজ পেয়েছে। ‘যে রাজার আগমনের প্রতীক্ষায় অমল, সে কি মৃত্যু, না ঈশ্বর, অথবা মৃত্যুরূপী ঈশ্বর, সে-বিবেচনার ঊর্ধ্বে গিয়ে হলঘরে উপবিষ্ট প্রতিটি মানুষ ক্ষণকালের জন্য হলেও এই ঘেটোর বাইরে এক মুক্ত জীবনের আলো-হাওয়ার সন্ধান পেয়েছিল।’

যে তারার জগতে চলে যেতে চেয়েছিল অমল, কোরচাকও কি চেয়েছিলেন তাঁর শিশুরা তেমন কোনো অজ্ঞাত আনন্দময় জগতে পাড়ি দিক? কোরচাকের ডায়েরি থেকে আমরা জানি, ১ আগস্ট তারিখে ডাকঘর নাটকের পরিচালক এস্তেরকাকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর অতিপ্রিয় এই মেয়েটি, যে একসময় যুদ্ধের পর সুন্দর জীবনের কথা তাঁকে বলেছিল, তার মুক্তির জন্য কোরচাক হন্যে হয়ে ঘুরেছেন, দ্বারে দ্বারে করাঘাত করেছেন, এমনকী উৎকোচের কথাও ভেবেছেন। না, এস্তেরকার কোনো খোঁজ আর পাওয়া যায়নি। কোরচাক আশা করেছেন, অন্য কোথাও হয়তো তাদের আবার দেখা হবে। কোথায় সে ‘অন্য কোথা’? কোরচাকের জীবনীকার লিফটন স্বগতোক্তি করেছেন, হয়তো সেই তারার দেশে, যেখানে পাড়ি দিয়েছিল অমল।

তিন

৬ আগস্ট ওয়ারশ ঘেটোয় কোরচাক ও তাঁর আশ্রমের শিশুদের শেষ দিন। সবেমাত্র তারা প্রাতরাশ সেরেছেন, অকস্মাৎ আশ্রমের বন্ধ দরজায় জার্মান সৈন্যের বুটের আঘাত, সঙ্গে মাইকে নির্দেশ, সব ইহুদি অবিলম্বে বের হও। প্রায় এক মাইল হাঁটাপথে গিয়ে তারপর রেলগাড়ি। কোরচাক ও তাঁর সহকর্মীরা আশ্রমের প্রতিটি শিশু জড়ো করলেন, তাদের পরনে যার যার সেরা পোশাক, কারো হাতে প্রিয় খেলনা। কী কথা বলে আশ্বস্ত করেছিলেন কোরচাক মৃত্যুপথযাত্রী সেইসব অমলদের? লিফটন কিছুটা কল্পনা-কিছুটা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তার বিবরণ দিয়েছেন এইভাবে –

শিশুরা তাদের পানির বোতল, প্রিয় বই, তাদের ডায়েরি ও খেলনা হাতে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল, সন্দেহ নেই কোরচাক তাদের আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি, সারাজীবন শিশুদের কাছে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন, এখন তাদের ও নিজের আশা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ না করে অন্য কী কথা বলতে পারতেন? কেউ কেউ বলেছেন, কোরচাক হয়তো শিশুদের গ্রীষ্ম নিবাসে যাবার কথা বলে থাকবেন, কিন্তু কোরচাক শিশুদের মিথ্যা বলবেন, তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। হতে পারে তিনি শিশুদের বলেছেন, যেখানে তারা যাচ্ছে সেখানে পাইন ও বার্চ বৃক্ষ আছে, যেমন ছিল তাদের গ্রীষ্ম নিবাসে। আর সেখানে যদি বৃক্ষ থাকে, তাহলে অবশ্যই পাখি থাকবে, থাকবে কাঠবিড়ালি, থাকবে খরগোশ ছানা।

কোরচাকের নিজের ডায়েরির শেষ পাতাটিতে কোনো তারিখ নেই, আমরা অনুমান করতে পারি সম্ভবত আশ্রমে তাঁর শেষদিন – অর্থাৎ ৬ আগস্ট – অতি প্রত্যুষে তিনি লিখেছিলেন। জানালার পেছনে ঝোলানো ফুলের টবে পানি দিতে তার কপাট খুলেছিলেন, জানালার শিকের ফাঁকে তাঁর চুলবিহীন মাথা। দূরে বন্দুক তাক করে দাঁড়ানো একজন জার্মান সৈনিক। লোকটা এমন শান্ত, ভাবলেশহীনভাবে তাঁর দিকে তাকাচ্ছে কেন? কোরচাক ভাবলেন, হয়তো গুলি করার নির্দেশ নেই। ‘সৈনিকটি হয়তো অন্য সময় সাধারণ নাগরিক হিসেবে কোনো গাঁয়ের স্কুলের শিক্ষক, অথবা সরকারি কর্মচারী, বা লাইপজিগের একজন ধাঙড়, বা কোলনের কোনো রেস্তোরাঁর কর্মচারী। আচ্ছা, আমি যদি ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ি, বা বন্ধুর মতো হাত দোলাই, তাহলে সে কী করবে?’

সেন্দেরলোভা কোরচাক ও তাঁর আশ্রমের শিশুদের দলবেঁধে প্রায় নিঃশব্দে যেতে দেখেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘সেই শবমিছিলের শিরোভাগে ছিলেন কোরচাক। সবচেয়ে কনিষ্ঠ শিশুটি তাঁর কোলে, অন্য আরেকজনের হাত তাঁর হাতে। যে যা-ই বলুক, এ-কথায় কোনো সন্দেহ নেই, নিশ্চিত মৃত্যুর কথা তিনি জানতেন, মিছিলে অংশগ্রহণকারী শিশুরাও। অনাথ আশ্রম থেকে উমশ্লাগপ্লাজ – বা বন্দিদের যেখানে জড়ো হওয়ার নির্দেশ ছিল – তার মধ্যে লম্বা দূরত্ব ছিল। আমি নিজ চোখে দেখলাম জেলেঞ্জা সড়ক থেকে লেজনো সড়কে দলটি মোড় নিল।’

কোরচাক অথবা তাঁর আশ্রমের শিশুদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারার রাজ্যে যারা এইভাবে হারিয়ে গেল, তারা আশ্রয় নিল আমাদের স্মৃতি ও চৈতন্যে।

অমলকে সুধা কথা দিয়েছিল, সে তাকে ভুলবে না। এমন একসময়ে এ-কথা বলা যখন অমল ঘুমিয়ে পড়েছে, হয়তো অন্য আরেক জগতে সে পাড়ি দিয়েছে। সে-সময় সুধাকে ঠিক এই কথাটিই কেন বলতে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তার কোনো ব্যাখ্যা করে যাননি। অনুমান করি, তিনি বলতে চেয়েছিলেন মানুষ মরে গেলেও সে যে মানব হয়ে বেঁচে থাকে, তার কারণ আমরা তাদের ধারণ করি স্মৃতিতে। জন্মজন্মান্তর সে-স্মৃতি জেগে থাকে।

এ-কথার প্রমাণ কোরচাক।