রাক্ষস

লেখক:

অনুপ সান্যাল

সাইকেল চালাতে চালাতে রাগে গজরাচ্ছিল নুর মহম্মদ। উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা কনকনে বাতাস ওকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল ঠকঠক করে, গায়ের র‌্যাপারটায় মাথা-কান ভালো করে জড়িয়ে নিয়েও পৌষ মাসের শেষরাতের হাড়-কাঁপানো ঠান্ডাকে বাগে আনা যাচ্ছিল না, তার ওপর সাইকেল চালানোর কারণে বাতাসের ঝাপটা আরো বেশি করে আক্রমণ করেছিল তাকে, শরীরের ওপরের অংশটা ঢাকা থাকলে কী হবে, নিম্নাঙ্গে তো একটা পাতলা লুঙ্গিই কেবল, সাইকেলের প্যাডেল করতে সে-লুঙ্গিও তো আবার হাঁটুর নিচ থেকে অনাবৃত হয়ে পড়ছিল বারবার। আবরণহীন সেই দুপা বেয়ে ঠান্ডা উঠে এসে ছড়িয়ে পড়ছিল সারা-শরীরে। সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে

আছে যে-হাত দুটো, ঠান্ডায় সে-হাত দুটো তো অবশ হয়ে গেছে অনেক আগেই। মাঝে মাঝে তাই এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে অন্য হাতটা চাদরের তলে এনে উষ্ণ শরীরের স্পর্শে সেঁকে নিতে হচ্ছিল নুর মহম্মদকে।

এসব কষ্ট সহ্য করতে আপত্তি ছিল না নুর মহম্মদের, যদি পাওনা টাকাটা আদায় করতে পারে হজরতের কাছ থেকে। আজ পাঁচ মাস হয়ে গেল ৫০০ টাকা হাওলাত নিয়েছিল হজরত তার কাছ থেকে। বলেছিল, ‘বিবি সাহেবার ব্যারাম। হাত খালি, হাজারখানেক টাকা হাওলাত দাও দোস্ত, সপ্তাহখানেক পরে শোধ করে দেব ইনশাল্লাহ।’ নুর মহম্মদের তখন টাকার আমদানি ভালোই। রামনগর ঘাট থেকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের ইলিশ মাছবোঝাই ঝুড়ি বয়ে এনে লালগোলা স্টেশন লাগোয়া সারি সারি মাছের আড়তে ফেলতে পারলেই পয়সা, ঝুড়িপ্রতি হিসাব, যত বইতে পারো তত ইনকাম, তা দিনে বেশ কয়েক খেপ মারতে পারত নুর মহম্মদ। মা-ব্যাটার সংসার চলে গিয়েও হাতে কিছু জমতো বইকি। এই লাইনে নেমে কাজের অভাব হয়নি নুর মহম্মদের। সর্বদা যে ইলিশ মাছ বইতে হতো তা নয়। কখনো ভাঙরি, কখনো কাপড়ের গাঁটরি, কখনো বা দারুচিনি, লবঙ্গ – যখন যেটার চালান আসত, তখন তা-ই বয়ে আনত নুর মহম্মদরা। আবার ইন্ডিয়া থেকে চিনি যেত বাংলাদেশে। মহেশ সাহার চিনির ব্যবসা, প্রতিদিন লরিবোঝাই চিনি এসে লাগত তার আড়তের সামনে, সেই চিনির বস্তা চলে যেত বাংলাদেশে।

বছরের রোজদিনই চিনি বা অন্য কোনো পণ্য বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ পাওয়ার অসুবিধে হতো না নুর মহম্মদের। লালগোলার পুবদিকে পদ্মা নদী। নুর মহম্মদ ছেলেবেলায় পদ্মা নদীকে তার গ্রাম দেশওয়ালিপাড়ার একেবারে কাছেই বয়ে যেতে দেখেছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা হেঁটে গেলেই পদ্মার ঘাট। সেখানে কত দাপাদাপি করেছে সঙ্গীসাথির সঙ্গে, ছিপ নিয়ে বসে থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বর্ষার সময় নদী আরো অনেকটা এগিয়ে আসত। এখন পদ্মার যে কী অভিমান হয়েছে, বহুদূরে সরে গেছে নদী। নদীর জল পর্যন্ত পৌঁছোতে গেলে অনেকটা বালির চড়া পেরোতে হয়। ওপারে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে মাল পাচার করে অথবা ওখান থেকে বেআইনিভাবে মাল এনে পেট চালাতে হয় নুর মহম্মদের মতো অনেককেই। চুরি-ছিনতাই করতে হতো না তাদের। হাতে বেশকিছু টাকা জমেছিল নুর মহম্মদের। হজরতকে তাই টাকা ধার দিতে তার অসুবিধেও হয়নি। তাছাড়া ও তো বিনা সুদের টাকা ধার দেয়নি হজরতকে। বাজারে ১০০ টাকায় মাসে যে পাঁচ টাকা সুদে হারের প্রচলন আছে, হজরত নুর মহম্মদকে সেই হারে সুদ দেবে বলেছিল। হজরতটা এমনি বেইমান যে সুদের নাম তো দূরে থাক, আসলটাই দেওয়ার নাম করে না। আজ পাঁচ মাস হয়ে গেল একটা পয়সাও ঠেকায়নি হজরত।

টাকা ধার দিয়ে তাগাদা দিতে নুর মহম্মদের খারাপ লাগে। কিন্তু না দিয়েও তো উপায় নেই তার। আজ মাস কয়েক হলো বর্ডার বন্ধ। কোনো মাল এপার থেকে ওপার বা ওপার থেকে এপারে যাওয়া-আসা করছে না। এপারে বিএসএফের সব স্টাফ বদলি হয়ে গিয়ে নতুন স্টাফ এসেছে। স্মাগলারদের সঙ্গে তাদের হপ্তা নিয়ে কিছু রফা হয়নি এখনো। শোনা যাচ্ছে, ওপারে নাকি বিডিআরও এখন হঠাৎ মাল পারাপারে খুব কড়াকড়ি করছে। তাই বেশ কিছুদিন বর্ডার বন্ধ। নুর মহম্মদের রুজিতে টান পড়েছে। যা সামান্য টাকা যে জমিয়েছিল সেটা ভেঙে খেতে খেতে সেটাও ফর্সা, হাত এখন একেবারে শূন্য। কিছুদিন আগে লালগোলা বাজারে হজরতের সঙ্গে বারদুয়েক দেখা হওয়ায় টাকাটা চেয়েছিল নুর মহম্মদ। হজরত ভালো মানুষের মতো বলেছিল – ‘এখন তো হাতে টাকা নেই। তোমাকে চাইতে হবে না। তোমার বাড়িতে টাকা হামি পাঠ্যে দিবো।’

পরের বারও হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে হজরত কাঁদো কাঁদো হয়ে নুর মহম্মদের হাত ধরে বলেছিল –  ‘তুমার বাড়িতে টাকা নিয়েই যেদিন গেছিনু নুর ভাই, কিন্তু কী বুলব তুমাকে দোস্ত, এই দেখো’ – বলে জামার পাশের একটা পকেটে হাত ঢুকিয়ে সেখান থেকে দুটো আঙুল বার করে নুর মহম্মদকে বলেছিল – ‘কুন শালা যে পকেট কাটলে, হামার মতো সেয়ানাও শালা বুঝতে পারলে না।’ বলেই নুর মহম্মদের দুটো হাত ধরে বলেছিল – ‘মিছে কথা বুলব না দোস্ত, তোমার আসল টাকাটাই খালি এনিছিলাম, সুদ পরেকে দিতুম, যাক আমার যা ক্ষেতি হয় তা হয়েছে। এদিন তুমাকে আমি সুদ সুদ্ধা আসল টাকা দিয়ে দিব।’ হজরতের কথা নুর মহম্মদের বিশ্বাস না হলেও মুখে কিছু বলেনি।

তো, সে তো হয়ে গেল ২০-২৫ দিন। হজরত টাকা তো দেয়ইনি, দেখাও করেনি একবারও। তাই নিজেই হজরতের বাড়ি গেছিল নুর মহম্মদ একদিন সকালে। বাড়িতে ছিল না হজরত, দরজার আড়াল থেকে একটা বউ মুখ বার করে বলেছিল – ‘বাড়িতে নাই খোউ।’ নুর মহম্মদ অনুমানে বুঝেছিল বউটি হজরতের। সে জিজ্ঞেস করেছিল – ‘কোতি গেলছে উ?’ বউটা জবাব দিয়েছিল – ‘কিঝ্নি (কী জানি), কুনঠে গেলছে উ, বুলতে পারভো না খো।’ বলেই বউটা চলে গেছিল সেখান থেকে। একটু অপেক্ষা করে নুর মহম্মদ চলে এসেছিল। বুঝেছিল, হজরতকে ধরতে গেলে এ-সময়ে এলে চলবে না। আসতে হবে খুব ভোরবেলায় বা শেষরাতে। তখন সে নিশ্চয়ই বাড়িতে থাকবে।

তো সেই যাচ্ছে আজ। বাড়ি থেকে যখন বেরোয়, তখন বোধহয় ভোর তিনটেও হয়নি। শীতের রাতে সে-সময় কার আর বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে। তবু উঠতে হয়েছিল নুর মহম্মদকে। আগের দিনই মাকে বলে রেখেছিল সে, শেষরাতে তাকে যেন ঘুম থেকে তুলে দেওয়া হয়। মা বুড়ি মানুষ, হাঁপানির টান আছে, সারারাত ভালো ঘুমাতে পারে না। রাত তিনটে বাজার আগেই নুর মহম্মদকে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছিল সে।

বিছানা ছাড়তে কিছুতে ইচ্ছে করছিল না নুর মহম্মদের। মা ডাকতে কাঁথাটা আরো ভালো করে টেনে পাশ ফিরে আরাম করে শুয়েছিল সে। তবু মায়ের বারবার ডাকাতে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছায় বিছানা ছাড়তে হয়েছিল নুর মহম্মদকে। একবার মনে হয়েছিল ধুত্তোর। এই ঠান্ডার মধ্যে শেষরাতে তাগাদায় যাবে না আর; কিন্তু তার পরক্ষণেই যখন মনে হয়েছে, আজ হাতে একটাও পয়সা নেই, দিন চলবে না। তাছাড়া হজরতকে এ-সময় ছাড়া ধরা যাবে না, তখন সব আলস্য ঝেড়ে ফেলে সে যাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হয়েছিল। সাইকেল নিয়ে বেরোতে উদ্যত হলে পেছন থেকে তার মা জিজ্ঞেস করেছিল – ‘কোতি যেছিস বাপ নুরু?’ নুর মহম্মদ মাকে খেঁকিয়ে ওঠে – ‘ক্যানে, তোর কাম কী জেনে?’

– না, এমনি। এত রেতে তো কুনুদিন বের‌্যাস না খো, তাই।

– তাই তো কী?

–  হামি ভাবনু, বুঝিন বো আনতে যেছিস।

নুর মহম্মদ একটু সময় চুপ করে থেকে সাইকেলে উঠে প্যাডেলে পায়ের চাপ দিয়ে বলে – উ ছাড়া তোর কি কুনু কথা নাই? তোকে বুলেছি না, উ শালিকে হামি আর লিব না।

– বহুকে লিবি না, ক্যানে? তালাক তো দিসনি যে লিবি না। অমুন কাজিয়া হয়েই থাকে। যা ব্যাটা, বহুকে নিয়ে আয় বাপ।

মায়ের এই অন্যায় আবদারে চটে যায় নুর মহম্মদ। বলে, ‘ক্যামুন গরম দেখিয়ে চলে গেল, দেখলি না তু, ফের উ বহুকে লিয়ে আসতে বুলছিস তু? হামি পারভো না খো অকে আনতে যেতে।’

নুর মহম্মদের মা অন্যান্যবারের মতো এবারও একই প্রস্তাব দেয় – ‘তবে বুল ব্যাটা, হামি গিয়ে বহুকে লিয়ে আসি, তোকে যেতে হবে না।’

ফের রেগে ওঠে নুর মহম্মদ। বলে – ‘খবরদার! যদি শুনি তু বো আনতে গেল্ছিস, তেবে বুড়ি তোকে হামি আস্ত থুবো না – বুলে দিচ্ছি। উ শালির বিটি শালি ফুলবেড়িয়া মাগির গরম কতটা হামি তাই দেখভো।’

রাগে গজরাতে গজরাতে নুর মহম্মদ দাওয়া থেকে উঠোনে নেমে আসে। হজরতের বাড়ি নুর মহম্মদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। সারারাস্তা নুর মহম্মদ ভাবতে ভাবতে গেছে, হজরত যদি আজকেও টাকা না দেয় তবে কী কী কথা তাকে শোনাবে। ঠান্ডায় মাঝে মাঝে তার দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি হয়ে যাচ্ছিল। জনমনিষ্যিহীন ফাঁকা অন্ধকার রাস্তায় নুর মহম্মদের স্প্রিং ছাড়া সাইকেলের ঘণ্টিটা কোনো অশরীরীর উদ্দেশে আপনা থেকেই ক্রিং-ক্রিং শব্দে বেজে যাচ্ছিল অহেতুক। রাস্তার দুপাশের গাছগাছালির জমাটবাঁধা অন্ধকারে জোনাকি জ্বলে, বিরামহীনভাবে ঝিঁঝি পোকা ডেকে চলে। এই ঠান্ডায় একটা বিড়ি খেতে বড্ড সাধ যায় নুর মহম্মদের। পকেট হাতড়ে দেখে বিড়ি আর লাইটার বাড়িতে ভুলে ফেলে রেখে এসেছে। নিজের ওপর রাগ হয় নুর মহম্মদের।

নতুন বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে পশ্চিম দিকে যে কাঁচা রাস্তাটা চলে গেছে, সেদিকে অভ্যাসবশে তাকায় নুর মহম্মদ। এ-পথে এক বছর আগেও মাঝে মাঝেই যেত, হাটপাড়া, শ্রীরামপুর ছাড়িয়ে বাবুপুরে তার শ্বশুরবাড়ি। ধানু হাজির আপন চাচাতো ভাই আফসার আলি তার শ্বশুর। এখন আর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার দরকার হয় না নুর মহম্মদের। রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে আসে সে। আকাশের অসংখ্য তারার ক্ষীণ আলো ঘন অন্ধকারকে একটু যেন ধূসর করেছে। তবে সে-আলোতে রাস্তার কিছুই ঠাওর করতে পারে না নুর মহম্মদ। উত্তর দিক থেকে একটা হাড়-কাঁপানো হিমেল বাতাস বয়ে এলো, গা গরম করতে সাইকেলের গতি বাড়িয়ে দেয় সে।

 

দুই

নুর মহম্মদের দোস্ত জাববার সেখ, তার সাদির পান-চিনি অনুষ্ঠানে বাবুপুরে গিয়েছিল নুর মহম্মদ। সেখানেই দেখেছিল সে আলিয়ারাকে। ভারি মিষ্টি মেয়েটার মুখটা, গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। চোখ দুটো বড় বড়। ভারি নিষ্পাপ চাউনি মেয়েটার – হাসলে বাঁদিকের গালে টোল পড়ে। পান-চিনি অনুষ্ঠানে সবাই মেয়ের মুখে চিনি ছুঁইয়ে দিচ্ছে। সবাই যখন এই অনুষ্ঠান দেখতে ব্যস্ত, তখন নুর মহম্মদের চোখ বারবার কাছেই দাঁড়িয়ে-থাকা গালে টোলপড়া মেয়েটার দিকে চলে যাচ্ছিল। মেয়েটাও লুকিয়ে লুকিয়ে বারবার নুর মহম্মদের দিকে তাকাচ্ছিল, মাঝে মাঝে দুজনের চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা তখন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল। নুর মহম্মদ লক্ষ করছিল, চোখাচোখি হয়ে গেলে মেয়েটার মুখ কেমন আরক্ত হয়ে যাচ্ছিল।

জাববারের ভাবি শ্যালক মুস্তাফার কাছে মেয়েটার নাম-ধাম সব জেনে নিয়েছিল নুর মহম্মদ, মেয়েটার নাম আলিয়ারা। বাড়িতে আছে বলতে তার বেওয়া মা, বড় ভাই, তার বউ আর তাদের দুটি মেয়ে। আলিয়ারার একটা বড় বোন ছিল। তার বিয়ে হয়ে গেছে বছর কয়েক আগে। এখন সে থাকে তার শ্বশুরবাড়িতে। আববা নেই। বছর দুই আগে মারা গেছে, সামান্য জমি আছে। আলিয়ারার বড় ভাই নিজেই চাষাবাদ করে, কষ্টেই দিন চলে ওদের। মুস্তাফা জানাল যে, আলিয়ারা ভারি শান্তশিষ্ট মেয়ে, স্বভাব-চরিত্র ভালো। বাড়ি ফিরে এসে তার মাকে আলিয়ারার কথা বলেছিল নুর মহম্মদ। আলিয়ারাকে শাদি করার ইচ্ছের কথাও সে জানিয়েছিল তাকে।

নুর মহম্মদের মাও চাচ্ছিল ছেলের শাদি দিতে। নুর মহম্মদের প্রস্তাবে খুশিই হয়েছিল সে। আলিয়ারার খোঁজখবর নিয়েছিল সে, নুর মহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে বাবুপুরে গিয়ে আলিয়ারাকে দেখেও এসেছিল একদিন। আলিয়ারাকে পছন্দও হয়েছিল তার, দেখতে-শুনতে ভালোই। রংও, মায়ের চোখে পরিষ্কার বলেই মনে হয়েছিল। একটা বিষয়েই খালি মা একটু খুঁতখুঁত করছিল। নুর মহম্মদরা শেরশাবাদি আর আলিয়ারারা ফুলবেড়িয়া। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কথাবার্তা, আচার-আচরণে বেশকিছু অমিল রয়েছে। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়েতে কোনো বাধা নেই অবশ্য। তবু নুর মহম্মদের মায়ের আপত্তি। নুর মহম্মদের মা অনুযোগের সুরে বলল – ‘ফুলবেড়েরা ‘রাতকে কহে ‘আত’, ‘রাস্তা’কে’ কহে ‘আস্থা’, ‘আমি’কে ‘হামি’ কহে, ‘আমাদের’কে উরা কহে ‘হামারঘে’। আমি নিজে কানে শুনলু আলিয়ারা ইভাবেই কথা কহিছে। নুরু রে, উ বিটিকে তু বিহা করিস না খো।’

নুর মহম্মদ হেসেছিল। বলেছিল – ‘তু বিহা ফাইনাল কর মা, আর শুন, অরা গরিব মানুষ। বেশি কিছু দিতে-থুতে পারভে না। যা দিতে চাহিবে, অতেই রাজি হয়ে যাস, বুঝলি? আর ‘রাত’কে ‘আত’ কি ‘আমি’কে ‘হামি’ কহিলে কী আছে? উ ছাড়া আমি আর কাহুকে বিহ্যা করভো না, ই কথা আমি তোকে কহে দিনু। বুঝলি তো?’

তা-ই হয়েছিল। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল। আলিয়ারার মা বেশি কিছু দিতে পারেনি মেয়েজামাইকে। মেয়ের গলায় সোনার তাবিজ, হাতে দুগাছা করে চারগাছা ব্রোঞ্জের চুড়ি। আর জামাইকে দিয়েছিল একটা দামি রিস্টওয়াচ আর নগদ পাঁচ হাজার টাকা। নুর মহম্মদের ইচ্ছে ছিল একটা নতুন সাইকেলের। কিন্তু আলিয়ারাদের অবস্থার কথা চিন্তা করে সে আর সাইকেলের দাবি তোলেনি। অবশ্য সে তার পুরনো সাইকেলটা বেচে যৌতুকের টাকা থেকে কিছুটা দিয়ে নতুন একটা সাইকেল কিনতে পারত ঠিকই। কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবকে গোস্ত-ভাতের একটা খানা দিতেই সে-টাকার পুরোটাই ফুরুত ফাঁই।

সে-সময়ে নুর মহম্মদের ছিল মুরগি কেনাবেচার ব্যবসা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মুরগি কিনে বেড়াত সে। মুরগি কেনার কাজ দিনের বেলায় তেমন হয় না। সারাদিন মুরগিরা ছাড়া থাকে। চরে বেড়ায় বাড়ির এখানে-সেখানে। আদারে-বাদাড়ে। এই দেখছ তোমার নাগালের মধ্যে, হাত বাড়ালেই বুঝি ধরে ফেলবে। ওমা! যেই ধরতে গেছ, অমনি ফুরুত। দেখবে, ক্বক-ক্বক করতে করতে বিদ্যুতের গতিতে ১০ হাত দূরে গিয়ে শরীরটা টানটান করে তোমার দিকে ঘাড় কাত করে গোল গোল চোখে পিটপিট করে তাকাচ্ছে। আর মুখে ‘কক্কর ক্ক’ ডাক। তুমি রেগে গিয়ে তোমার কাঁধের ডোমকলের চারহাতি ডোরাকাটা গামছাটা ছুড়ে দিয়ে ওকে ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে আবার দেখবে তোমার গামছাটাই ধুলোয় লুটোপুটি আর শয়তান নধর মোগরটা বনতুলসীর ঝোপের আড়াল থেকে ময়ূরকণ্ঠী রঙের গলাটা বার করে সেই গা-জ্বালান ‘কক্কর ক্ক’ ডাকছে। তুমি যেন ওর খেলার সঙ্গী। তোমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলা জুড়েছে। যতই চেষ্টা করা যাক, ওকে ধরা যাবে না কিছুতে। তাই নুর মহম্মদকে মুরগি কিনতে বেরোতে হয় সূর্য ডোবার পর। অন্ধকার হয়ে গেলে। যখন সব মুরগি সারাদিন চরে বেড়িয়ে তাদের আস্তানায় ঢুকে পড়েছে – তখন। নুর মহম্মদ ওর লঝ্ঝর-মার্কা সাইকেলটা নিয়ে বেরোয় মুরগি কিনতে। সাইকেলটার না আছে কোনো রং, না আছে মাডগার্ড কি ব্রেক বা পা রাখার প্যাডেল। বেল একটা আছে বটে, তবে তা বাজানোর জন্য নুর মহম্মদকে কোনো চেষ্টা করতে হয় না। সাইকেল যখন গ্রামের এবড়োখেবড়ো পথ ধরে ছোটে, তখন সেই ঝাঁকুনিতে স্প্রিংবিহীন বেল সমানে বেজে চলে, ক্রিং-ক্রিং। যেমন দমকলের গাড়ি ছুটলেই ঢং-ঢং বাদ্যি। পথ ছাড়, না হলে মর। ঠিক তেমনি, নুর মহম্মদ ওই ব্রেকবিহীন সাইকেল যে কীভাবে সামলায়, তা ও-ই জানে, সাইকেলের ব্রেক তো নেই, তাই প্রয়োজনে নিজের লম্বা লম্বা পা দুটো ব্যবহার করে সে ব্রেকের বিকল্প হিসেবে। আকাশ থেকে নিচে নেমে আসার সময় চিল-শকুন যেমন তাদের পা দুটো টানটান করে প্রসারিত করে দেয়, নুর মহম্মদও তেমনি তার লম্বা সরু পা দুটো প্যাডেল ছেড়ে মাটি ছুঁয়ে সাইকেল থামায়। নুর মহম্মদের সাইকেলে আর যাই থাক বা না থাক, একটা শক্তসমর্থ জবরদস্ত মস্ত ক্যারিয়ার আছে। ক্যারিয়ারের ওপর বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি একটা চওড়া ফ্রেম শক্ত করে বসানো। তাতে ক্যারিয়ারটা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেশ কিছুটা বেড়ে গেছে। এর প্রয়োজন রয়েছে। বাতা দিয়ে তৈরি এই ক্যারিয়ারের ওপর থাকে মস্ত ঝাঁকা। বাঁশের তৈরি, ঝাঁকাটার ওপর দিকটা দড়ির জাল দিয়ে আবৃত, দড়ির জালের ফাঁস খুলে ইচ্ছেমতো সেই ঝাঁকায় মুরগি রাখা যায় বা মুরগি বার করা যায়। দড়ির ফাঁস টেনে বন্ধ করে দাও মুরগিরা বিলকুল বন্দি। ঝাঁকার মধ্যে ডাকাডাকি, ডানা ঝাপটাঝাপটি, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে সব, বেরিয়ে আসার সাধ্যি কিন্তু নেই।

নুর মহম্মদ রাত্রে যখন মুরগি কিনতে যায়, তখন তার সাইকেলের হ্যান্ডেলে একটা লণ্ঠন ঝোলান থাকে। জ্বালান অবস্থায়, সেই লণ্ঠনের অবস্থাও জরাজীর্ণ, তার সাইকেলের মতোই।

নুর মহম্মদ গ্রামে ঢুকে অন্য যারা মুরগি কেনার কারবার করে, তাদের মতো মুখে ‘মুরগি বেচো গো’ বলে হাঁক দেয় না। ওর একটা বাঁশি আছে। টিনের তৈরি, লম্বায় ইঞ্চি-দশেক। সাইকেল রিকশাতে যে-হর্ন ব্যবহার করা হয় – সে-রকম। তবে সেই হর্নের যেখানে রবারের বেলুনের মতো জিনিসটা লাগানো থাকে, সেখানে নুর মহম্মদ মুখ লাগিয়ে দুই গাল ফুলিয়ে প্রাণপণ ফুঁ দেয়। আর তাতেই বাঁশিতে ভ্যাঁপোর-ভ্যাঁপোর একটা শব্দ হয়। শব্দটা আদৌ শ্রুতিমধুর নয়। প্রথম প্রথম বিতিকিচ্ছিরি এই আওয়াজটা শুনে গ্রামের কুকুরগুলো বিরক্ত হয়ে ঘেউ-ঘেউ করে ডেকে উঠে নুর মহম্মদকে তাড়া করত। এখন আর তা করে না তারা। চিনে নিয়েছে নুর মহম্মদকে। কেবল গাছে গাছে সদ্য ঘুমিয়েপড়া পাখিরা কাঁচা ঘুম ভেঙে ফরফর ডানা ঝাপটায় খালি, আর কিছু না।

নুর মহম্মদ কোনো বাড়ির দরজার বাইরে থেকে ডাকে – বুবুগে, তুমাদের গলাকাটা মোরগখান বেচবা গো? ‘গলাকাটা’ মোরগটা আগের দিন দরে পোষায়নি বলে নুর মহম্মদ সেটা কিনতে পারেনি। যেসব মুরগির গলার রোঁয়া উঠে গিয়ে গোলাপি চামড়া দেখা যায়, সেইসব মোরগ-মুরগিকে ‘গলাকাটা’ বলা হয়।

গ্রামে ছাগল, হাঁস-মুরগি – এসব মেয়েদের সম্পত্তি। এগুলো থেকে যা আয় হয় তা মেয়েদের প্রাপ্য। এই পয়সা দিয়ে মেয়েরা তাদের শখের জিনিস কেনে। চুড়ি, টিপ, কুমকুম, আফসান, আলতা, চুলবাঁধার রঙিন  ফিতে, নখপালিশ এমনকি ঠোঁটপালিশ পর্যন্ত। এছাড়া আছে কাঁথা সেলাইয়ের ধাগা অথবা দাঁতে ঘষার জন্য নেশার দ্রব্য – কৌটোভরা গুল বা গুরাখু।

গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কেনা সেই খাঁচাভর্তি মুরগি নিয়ে নুর মহম্মদ যায় লালগোলা বাজারে। সেখানে নাজিবুরের আড়তে সেগুলো বেচে দেয়।

আলিয়ারাকে ঘরে আনার পর ভালোই চলছিল ওদের। নুর মহম্মদের মা ফুলবেড়ে বলে কোনোরকম অবজ্ঞা করে না। বরঞ্চ তার মুখের কথা নিয়ে নির্দোষ রসিকতা করে মাঝে মাঝে। নুর মহম্মদ তাকে ঠিক কথা বলেনি। আলিয়ারা অন্য ফুলবেড়িয়াদের মতো ভাষাতে কথা বলে, নুর মহম্মদের মা আলিয়ারার সঙ্গে যে-ধরনের রসিকতা করে, তার একটা উদাহরণ এরকম –

– হ্যাঁ টে বহু।

আলিয়ারা নারকেলের পাতা কেটে ঝাঁটার কাঠি বার করছিল। হাতের কাজ থামিয়ে সে বলে – বলেন,

– কী কাম করছিস?

– দেখতেই তো পেছেন, নারকেলের পাতা ছিলছি। সাহার (ঝাঁটা) বানাভো।

একটু থেমে জিজ্ঞেস করে – কিছু বুলভেন?

– বুলছি কী, মুই আঝ আতে উটি খাভো না খো।

আলিয়ারা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে – ক্যানে, শরীর খারাপ বুঝিন? বলেই শাশুড়ির নিদন্ত মুখের হাসির প্রতি লক্ষ যায় তার। তার হঠাৎ খেয়াল হয়, শাশুড়ি তার কথার নকলে ‘আমি’, ‘রাতে’ বা ‘রুটি’র বদলে ‘মুই, ‘আতে’ আর ‘উটি’ বলেছে। আলিয়ারার মুখ রাঙা হয় লজ্জায়। বলে – আপনি খালি অমন করেন ক্যানে? আর কদিন দ্যাখেন, মুখের ভাঁষা মুই ঠিক করে লিব, আপনার ঠিকিন।

শাশুড়ি বলে – হামার ঠিকিন?

দুজনে হেসে ওঠে একসঙ্গে।

কিন্তু তাদের মুখের হাসি বেশিদিন থাকে না। নুর মহম্মদের ব্যবসা বন্ধের মুখে। গ্রামে গ্রামে হাঁস-মুরগির মড়ক লেগে যায়। এলাকাজুড়ে মুরগিরা মরতে থাকে পটাপট। গ্রামের লোক জানত মুরগির এক মারণ রোগের কথা – ‘রানিক্ষেত’। এ রোগে মুরগি চুনের মতো পায়খানা করে আর সর্বদা ঝিমিয়ে থাকে। এতে মরণ অবধারিত। মুরগিদের নতুন যে-রোগ এলো, তাতেও মুরগির মৃত্যু নিশ্চিত। রোগের নাম ‘বার্ড ফ্লু’। এই রোগে আক্রান্ত মুরগি খেলে মানুষের এই রোগ হয়ে যাবে। মানুষ ভয়ে মুরগি খাওয়াই ছেড়ে দিলো। মুরগি কেনাবেচা একেবারে বন্ধ। লালগোলার মুরগির আড়তগুলো মুরগি আর কিনতেই চায় না। নুর মহম্মদের ব্যবসায় একেবারে বন্ধ। বার্ড ফ্লু রোগ দ্রুত ছড়িয়ে যায় গ্রাম থেকে গ্রামে। নুর মহম্মদ প্রতিরাতে সাইকেল চেপে লণ্ঠন নিয়ে মুরগি কিনতে বেরোয় ঠিক, রাত করে ফিরে আসে শূন্য খাঁচা নিয়ে।

গরমেন্টের লোক গ্রামে গ্রামে ঘুরে সব অসুস্থ মুরগি মেরে ফেলছে। গ্রামের কোথাও আর মুরগি নেই তো নুর মহম্মদ কিনবে কী। আর মুরগি পেলেও তো আড়তদার তা কিনবে বলে মনে হয় না। নুর মহম্মদের বাঁশির আওয়াজে গ্রামের বো-বিটিরা আগের মতো আর বেরিয়ে আসে না। হাসি-তামাশাও করে না আর তেমন করে, মহামারিতে তাদের ঘর মুরগিশূন্য হয়ে গেছে যে।

নুর মহম্মদ একেকদিন একেক গ্রামে যায় মুরগি কিনতে। আজ যদি রাজারামপুর, বিরামপুর কি হরিপুর যায় তো, কাল যায় উলটো দিকে। শিশারমজানপুর, সিমলা, ধুমপাড়া কি জাগরপাড়া। কিন্তু সব গ্রামই নুর মহম্মদকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়।

দুশ্চিন্তায় নুর মহম্মদের চোখ গর্তে ঢুকে গেছে। গাল বসে হনু জেগে উঠেছে। আলিয়ারার চোখের কোণেও গভীর কালির রেখা। নুর মহম্মদের মা যে-কাজ কোনো দিন করেনি, অভাবে দুটো পয়সার জন্য সেই কাজ করতে বেরোয়। অাঁটি বাঁধা, জাগ দেওয়া পাটগাছের অাঁশ ছাড়িয়ে পাট বার করে, মজুরি হিসেবে ক-অাঁটি ভিজে পাট পায়। ওই পাট বিক্রি করে তিনজনের কোনোমতে চলে যায়। অভাব সহ্য করেও কিন্তু নুর মহম্মদ তার মুরগির ব্যবসায়ের মূলধনে হাত দেয় না। দিন ফিরলে তো আবার তা দিয়েই ব্যবসা করতে হবে তাকে।

এই দুর্দিনে আলিয়ারার বড় বোন তাঞ্জেরা একদিন তার এক বছরের ছেলে সেলিমকে নিয়ে বোনের বাড়ি বেড়াতে এলো। তাঞ্জেরাদের অবস্থা ভালো। তাদের বেশকিছু জমিজমা আর গ্রামে একটা মুদিখানার দোকান আছে। কুটুমবাড়ির লোকের আদরযত্ন করতে নুর মহম্মদের ব্যবসার জন্য জমিয়ে রাখা সামান্য পুঁজিটুকু খরচ হয়ে গেল। এই অভাবের মধ্যেও সে এতদিন সেই পুঁজিতে হাত দেয়নি। কিন্তু এখন মেহমানের খাতির করতে সেটা পুরোটাই খরচ হয়ে গেল।

তাঞ্জেরা যেদিন ফিরে যাবে, সেদিন সকালে একটা ঘটনা ঘটে গেল। যাওয়ার জন্য সেলিমকে তৈরি করার জন্য তাকে বাড়িতে দেখতে না পেয়ে তাঞ্জেরা ওকে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির বাইরে এসে দেখে, সেলিম হাতে একটা পাটকাঠি নিয়ে একটা ছাগলকে নড়বড়ে পায়ে তাড়া করছে। ছাগলটা যেন বাচ্চা ছেলেকে খেলা দিচ্ছে এমন ভাব করে সেলিমের তাড়া খেয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে যাচ্ছে। তাঞ্জেরা সেলিমের কান্ড দেখে হেসে খুন। তাড়াতাড়ি সেলিমকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়িতে এসে ঢোকে।

ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ করে আলিয়ারা। সেলিমের হাতের সোনার তাগাটা কোথায় গেল। সোনার চেন দিয়ে ভালো করে হাতের বাজুতে বাঁধা ছিল। হাত থেকে খুলে পড়ে যাওয়ার কথা নয়। তবু বলা যায় না। এক ভরিরও বেশি ওজনের গয়নাটা গেল কোথায়। খোঁজ খোঁজ। বাড়িতে তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো। বাইরে যেখানে সেলিম খেলছিল, সেখানে খোঁজা হলো। কোথাও পাওয়া গেল না। অথচ কিছুক্ষণ আগেও সেলিমের বাহুতে সেটা পরানো ছিল। ওর ফর্সা হাতে তাগা পরে থাকার স্পষ্ট ছাপ, কেউ হাত থেকে ওটা খুলে নিয়েছে নিশ্চয়। নইলে তাগা যাবে কোথায়?

তাঞ্জেরা বিলাপ করে, কাঁদতে কাঁদতে বলে – ওগে মা গে, হামি শাশ্ড়িকে কী বুলবো গে। আজ তিন মাস হয়নি গে, বুঢ়ি ধীরেন স্যাকরার কাছ থিকা পোতার লেগে তাগা বানিয়ে দিলে গে। ই কাম কে করলে গে। তাঞ্জেরার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে টপটপ করে।

আলিয়ারা লজ্জায় অধোবদন। ওর বাড়িতে এসেই তো তাগাটা হারাল, সে সেলিমকে কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে – সেলিম, বুলো তো ধন, কে লিলে তুমার তাগাখান? বুলো বুলো?

সেলিম তার কচি কচি আঙুল দিয়ে খালার গালে নিবিষ্ট মনে অঁকিবুঁকি কেটে যায়। আলিয়ারা অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।

বিলাপ করতে করতেই তাঞ্জেরা গোছগাছ করে। তার টিনের সুটকেসে জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়ে সেলিমকে জামা পরায়। চোখে কাজল পরিয়ে দেয় যত্ন করে। নিজেও সাজে, চুল বাঁধে, মুখে সস্তা পাউডার ঘষে, চোখে সুরমা টানে, কপালে টিপ পরে, সিঁথিতে, দুগালে আর দুচোখের পাতায় আফসানের গুঁড়ো ছোঁয়ায় একটু করে। প্রসাধনের মাঝে মাঝে ক্রমাগত চলে তার বিলাপ, উত্তপ্ত চোখের জল তার সুরমা ও পাউডারের প্রলেপ ধুয়ে দেয় বারবার।

আলিয়ারা সহোদরাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। বলে – ‘বুবু, তু আঝ্কের দিনটা যাস না খো। দেখ, তাগা ফের কুন্ঠে যাবে। ঠিক ঢুঁরে পাওয়া যাবে। মোর এখ্যানে এসেই ছেল্যার তাগা হারালে, মোর কী খারাপ লাগছে তা তুকে কী বুলবো।’

তাঞ্জেরা বোনকে প্রবোধ দেয়, ‘তু কী করভি বুন। তোর ফের কী দোষ, দোষ মোর তকদিরের’। তাঞ্জেরা আঙুল দিয়ে নিজের কপাল নির্দেশ করে।

আলিয়ারার শাশুড়ি ব্যস্ত হয়ে বাড়ির বাইরে খুঁজে এসে জানায়, সেখানে তাগা পড়ে নেই কোথাও। নুর মহম্মদ এতক্ষণ বাড়িতে ছিল না। এইমাত্র সেলিমের তাগা হারানোর কথা শুনে চোটপাট আরম্ভ করে দেয়। তার মতে, প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ নিশ্চয় সেলিমের হাত থেকে তাগা চুরি করে নিয়েছে। সে গলার শিরা ফুলিয়ে চেঁচায় – ‘কুন শালার ব্যাটা শালা ছেল্যার সুনার তাগা চুরি করলে রে।’ তারপর তাঞ্জেরার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ছিঃ ছিঃ! বুবু। হামার ঘরে এসে আপনার নুকসান হয়ে গেল।’

নুর মহম্মদ তাঞ্জেরার টিনের সুটকেসটা হাতে তুলে নিয়ে তাকে বাসে তুলে দিতে যায়। তাঞ্জেরার কোল থেকে সেলিমকে নিজের কোলে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে – ‘সেলিম ব্যাটা, তুমার তাগা কে লিলে, বুলো তো বাপ।’ সেলিম কথা বলতে শেখেনি, সে কেবল নুর মহম্মদের গোঁফের প্রান্ত ধরে জোরে টান দেয়। নুর মহম্মদ যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে একবার।

নুর মহম্মদ উঠোনে উবু হয়ে বসে তার লঝ্ঝরে সাইকেলটা একটা ন্যাকড়া দিয়ে মুছছিল। আলিয়ারা ঘর থেকে মুখ বার করে ডাকে – একবার ঘরে আসেন তো জি।

আলিয়ারার দিকে না তাকিয়েই নুর মহম্মদ বলে – ক্যানে?

– টপ করে আসেন। কথা আছে। – আলিয়ারার গলার স্বর থমথমে।

নুর মহম্মদ একবার পেছন ফিরে আলিয়ারাকে দেখে, তারপর সাইকেল মোছার কাজ ছেড়ে তার কাছে যায়।

আলিয়ারার হাত দুটো পেছনে। মনে হয় হাতের কোনো জিনিস নুর মহম্মদের কাছে গোপন করার জন্যই হাত দুটো পেছনে রাখা। নুর মহম্মদ তা খেয়াল করে না। আলিয়ারার মাথার ঘোমটাটা তার অতিকায় খোঁপাটায় কোনোমতে আটকে রয়েছে। নুর মহম্মদকে দেখেও ঘোমটাটা মাথা পর্যন্ত টেনে দেওয়ার খেয়াল হয় না তার। দীর্ঘ চোখ দুটো সে নুর মহম্মদের দিকে মেলে তাকিয়ে থাকে ক্ষণকাল। নুর মহম্মদ দেখে আলিয়ারার মুখ ঈষৎ আরক্ত, ঘামে চকচক করছে। উত্তেজনায় তার লোভনীয় বুক দুটো দ্রুত ওঠানামা করছে। নুর মহম্মদ হেসে তার চিবুক স্পর্শ করতে যায়। আলিয়ারা দুপা পিছিয়ে যায়। তারপর তার হাত দুটো সামনে এনে নুর মহম্মদের চোখের সামনে মেলে ধরে। তার হাতের তালুতে সেলিমের হারিয়ে যাওয়া সোনার তাগাটা ধরা। তীব্র স্বরে আলিয়ারা বলে – ছেল্যার হাত থিকা ইটা আপনে চুরি করেছেন ক্যানে, বলেন।

নুর মহম্মদ একটু সময় থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বলে – তু কোতি পেলি ইটা? ইটা তো আমার পকেটে ছিল।

– আখা ধরাবার লেগে সলাই ঢুঁড়তে আপনের পকেটে হাথ দিতে ইটা পেলাম।

নুর মহম্মদ হাত বাড়ায়, বলে – দে।

আলিয়ারা সেটা নুর মহম্মদকে ফেরত না দিয়ে আবার তার হাত দুটো মুঠোবন্ধ করে পেছনে লুকিয়ে ফেলে। রাগতস্বরে বলে – ওই কচি ছেল্যার হাত থিক্যা আপনে ইটা চুরি করলেন? আপনের মুনে একটু বাধল না খো। ছিঃ! কী করবেন ইটা লিয়ে আপনে? কচি ছেল্যার ঠিকিন হাথে পরবেন?

নুর মহম্মদের রাগ হয়ে যায়। বলে – তোর বুবু ব্যাটা লিয়ে ই কদিন যে বসে বসে খেলে, সে-খরচার টাকা আমি কুনঠে পাই বুল দেখি। আমার ব্যবসার লেগে যে কটা টাকা পুঁজি ছিল, তা বিলকুল গাইব হয়ে গেল। এখন আমি কী লিয়ে ব্যবসা করব। সে-খ্যাল আছে তোর? হাত বাড়িয়ে আবার সে আলিয়ারার কাছ থেকে তাগাটা নিতে যায়।

আলিয়ারা জোরের সঙ্গে বলে – ইটা মোর কাছে থাকবে, মুই ইটা বুবুকে ফিরত দিবো।

– খেপীর পারা কথা বুলিস না আলিয়ারা। এখনি ইটা বাজারে বেচতে যাব আমি, ফের বুলছি ইটা আমাকে দিয়ে দে।

আলিয়ারা গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাগাটা নুর মহম্মদকে ফিরিয়ে দেওয়ার উৎসাহ দেখায় না। নুর মহম্মদ তার দিকে এগিয়ে যেতে আলিয়ারা চেঁচিয়ে বলে – মোর শরীলে হাথ দিবেন না বুলে দিছি।

– ক্যানে হাথ দিলে কী হবে? শরীল গলে যাবে নাকি?

– আপনাকে দেখে আমার ঘিন্না লাগছে। আপনে ইখান থিক্যা হঠে যান।

– তাগা দে, হটে যেছি।

– জিন্দেগি থাকতে তাগা দিব না।

– তুই দিবি না শালি, তোর বাপ দিবে, – বলেই আলিয়ারার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নুর মহম্মদ।

নুর মহম্মদের আকস্মিক আক্রমণ সামলাতে সামলাতে আলিয়ারা বলতে থাকে – মোর মরা বাপ তুলবেন না কক্ষুনো, বুলে দিচ্ছি।

নুর মহম্মদ তার কথায় ভেংচি কেটে বলে – খালি মরা বাপ ক্যানে, তোর চৌদ্দগুষ্টি তুলবো বে শালি, বজ্জাত মেয়েছেল্যা কোতিকার। তোর বুবুকে খাওয়াতেই তো আমাকে ফকির হতে হল রে শালি। মেহেমান! উঃ, কত আমার মেহেমান রে।

আলিয়ারার হাতের মুঠো খোলার জন্য নুর মহম্মদ তার কব্জিতে প্রাণপণ চাপ দিতে থাকে। আলিয়ারার শরীর থেকে শাড়ির অাঁচল খসে পড়ে। সে বসে পড়ে, তবু মুঠো খোলে না। নুর মহম্মদের জ্ঞান থাকে না। প্রাণপণে সে আলিয়ারার মণিবন্ধে তার তীক্ষ্ণ নখ চেপে ধরে। আলিয়ারা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠে – মোল্যাম গে, মোল্যাম।

নুর মহম্মদের মা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল। আলিয়ারার চিৎকার শুনে ঘরে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে – কী হল বহু?

তার কথায় কেউ কোনো জবাব দেয় না। নুর মহম্মদ আলিয়ারার শিথিল মুঠো থেকে তাগাটা উদ্ধার করে নেয়। তবু তার রাগ পড়ে না। সে আলিয়ারার চুলের মুঠি ধরে তাকে দাঁড় করায়। গালে সজোরে একটা চড় মেরে দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে – এখনি তুই বাড়ি থিক্যা বেঢ়্যা বুলছি, শালির বিটি শালি।

আলিয়ারা হাঁপাতে হাঁপাতে স্থির চোখে নুর মহম্মদের দিকে তাকায় একবার। তারপর নুর মহম্মদের প্রতি তার মনের সমস্ত ঘৃণা উগরে দিয়ে শব্দ করে ঘরের মেঝেতেই তার উদ্দেশে একগাদা থুথু ফেলে। নুর মহম্মদ এতে রাগে ফেটে পড়ে। আলিয়ারার দিকে তেড়ে গিয়ে বলে – বেঢ়্যালি তু। বলেই আলিয়ারার পেট লক্ষ্য করে সজোরে একটা লাথি মারে। আলিয়ারা সময়মতো পেছনে সরে গেলেও তার পেটে নুর মহম্মদের লাথি ছুঁয়ে যায়। ‘বাবা গে’ – বলে আলিয়ারা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। নুর মহম্মদের মা ভয় পেয়ে ব্যাকুল হয়ে বলে, – ওগে মা গে, আমার কী হবে গে – বলে সে আলিয়ারার কাছে গিয়ে তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস করে – বহু রে, কী হয়্যাছে বল ধিনি।

আলিয়ারা মেঝে থেকে উঠে পড়ে। তার সামান্য যে-কয়েকটা জামা-কাপড় ছিল, সেগুলো একটা পুঁটুলি বেঁধে বেরোনোর উদ্যোগ করে। নুর মহম্মদের মা নুর মহম্মদকে বলে – বহু যে বেরিয়ে যেছে। অ-কে থামা ব্যাটা।

নুর মহম্মদ বলে – উ মাগির সঁতে আমি আর ঘর করভো না। আমি তুকে নতুন বহু এনে দিব। তু ভাবিস না খো। বলে আলিয়ারার দিকে তাকিয়ে বলে – বেঢ়্যালি তু? বেঢ়্যা বুলছি। এখনি –

নুর মহম্মদের মা আলিয়ারার কাছে এসে বলে – আমি তো কিছু বুঝতে লারছি। কী হয়্যাছে যে তু ঘর ছেড়্যা চলে যেছিস। শুনরে বো। আমার কথাখানটা শুন। তু অমনি করে চলে যাস না খো। আমার মাথা খা।

নুর মহম্মদ তার মাকে ধমক দেয় – তু চুপ কর, বুড়ি।

আলিয়ারা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না। নুর মহম্মদের মা খালি হতভম্ব হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।

 

তিন

নিজের মনে গজরাতে গজরাতে ফিরে আসছিল নুর মহম্মদ। সেই শেষরাতেও হজরতের দেখা মেলেনি। অনেক ডাকাডাকিতে হজরতের বউ ঘর থেকেই চেঁচিয়ে বলেছিল – বাড়তে নাই উ।

নুর মহম্মদকে চারপাশ থেকে কুকুর ঘিরে ধরে ক্রমাগত চেঁচিয়ে যাচ্ছিল। তাদের চিৎকারের মধ্যেই নুর মহম্মদ জিজ্ঞেস করেছিল – কোতি গেল্ছে উ, বুলে গেল্ছে কিছু?

বিরক্তির গলায় উত্তর এসেছিল – কিছু বুলে যায়নি খো।

নুর মহম্মদ আবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল – আসবে কবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর এসেছিল – কিঝ্নি (কী জানি)।

নুর মহম্মদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাড়িতেই আছে হজরত। শীতের এই শেষরাতে হজরতের বউ তার বাহুপাশে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েই নিশ্চয় নেপথ্যে থেকে হজরতের শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো আওড়ে গেল। নুর মহম্মদের অন্তত তেমনটাই মনে হলো। মুহূর্তের জন্য আলিয়ারার মুখটা ভেসে ওঠে নুর মহম্মদের চোখের সামনে। একগাদা থুথু ফেলে ওকে ঘিরে-ধরা কুকুরগুলোকে ‘চুপ কর শালারা’ বলে জোরে এক ধমক দিয়ে সাইকেলে উঠে পড়ে সে। কুকুরগুলো একটু তফাতে গিয়ে দ্বিগুণ চিৎকার জুড়ে দেয়। নুর মহম্মদের স্প্রিংহীন বেল আপনা থেকে টিং-টিং বাজতে থাকে। হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা কাঁপিয়ে দেয় নুর মহম্মদের শরীরটা। হজরতের উদ্দেশে গালাগাল করতে করতে নুর মহম্মদ ভাবে, এই শীতভোরে কষ্ট করে এখানে আসাটাই ব্যর্থ হলো। ওর ইচ্ছে করছিল, ওদের ঘরের দরজা ভেঙে হজরতকে ওর বউয়ের আলিঙ্গন থেকে টেনে তুলে আচ্ছা করে কিল-চড় মেরে শায়েস্তা করে।

সাইকেলটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাস্তা থেকে একটুকরো মাটির ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে নুর মহম্মদ ঝোপের আড়ালে ছোট প্রাকৃতিক কাজ সারতে বসে। মাটির ঢেলাটা কুলুখ হিসেবে এসতেনজারের শেষে দরকার হবে।

বসে বসেই নুর মহম্মদ দুজন মেয়েলোকের গলার স্বর শুনতে পেল, তারা কথা বলতে বলতে তার পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল। তারা অন্ধকারের জন্য অথবা নিজেদের মধ্যে কথা বলায় ব্যস্ত থাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়-করা তার সাইকেলটা লক্ষ করেনি। নুর মহম্মদ বসে বসেই তাদের দিকে তাকিয়ে দেখে, দুজনেই মেয়েমানুষ। অন্ধকারে প্রায় কিছুই ভালোমতো দেখা না গেলেও নুর মহম্মদ বুঝতে পারে মেয়েমানুষ দুটির বয়স খুব বেশি নয়, যুবতী। শাড়ির ওপর গা-মাথা গরম চাদরে ভালো করে জড়ানো। হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধ রাস্তায় তাদের পায়ের হাওয়াই চপ্পলের চটাস চটাস শব্দ উঠছে। কথা বলছে একজনই। অপরজন শ্রোতা। ওদের টুকরো টুকরো দু-একটা কথায় নুর মহম্মদ বুঝতে পারে তারা ভোরের লালগোলা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে নদীয়ায় চাল আনতে যাচ্ছে। নীরব শ্রোতা এ লাইনে নতুন। নুর মহম্মদ জানে এরকম অনেক মেয়ে প্রতিদিন ট্রেনে করে বাইরে থেকে কিছু সস্তা দরে চাল কিনে নিয়ে আসে। এদের কেনার ক্ষমতা বেশি নয়। বড়জোর এক-দেড় মণ। চাল নিয়ে ট্রেনেই ফিরে এসে সেই চাল সামান্য লাভে বিক্রি করে দেয় লালগোলা বাজারে। এই লাভের অংশ অবশ্য সম্পূর্ণটাই নিজেরা পায় না। ট্রেনে চেকার বাবুকে, গেটে যে টিকিট নেয় তাকে, জিআরপিকে, মাস্তানদের চাহিদাও মেটাতে হয় সেই যৎসামান্য লাভের অংশ থেকে।

নুর মহম্মদ সহসা কিছু একটা চিন্তা করে সাইকেলটা নিয়ে দ্রুত সেই মেয়েমানুষদের দিকে এগিয়ে যায়। নিঃশব্দে যাওয়ার জন্য নুর মহম্মদ বুদ্ধি করে তার সাইকেলের সদাসরব বেলটা ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে তার কণ্ঠরোধ করে।

মনে মনে পরিকল্পনা ছকে নেয় নুর মহম্মদ। মহিলা দুজনকে একা সে সামলাতে পারবে না। যে মহিলা নীরব শ্রোতা, তার স্বাস্থ্য তত ভালো নয়। রোগা ধরনের। এবং অনভিজ্ঞা। চাল কেনার জন্য তার কাছে নির্ঘাৎ শ’পাঁচেক টাকা পাওয়া যাবে। টাকা সাধারণত তারা কোমরে গুঁজে রাখে যত্ন করে। নুর মহম্মদ উত্তেজনা বোধ করে। শীতটা যেন আর তেমন করে অনুভব করে না সে।

নুর মহম্মদ মেয়েমানুষ দুজনের পিছনে গিয়ে অতর্কিতে স্বাস্থ্যবতী মহিলাটিকে সজোরে ধাক্কা মারে। মহিলাটি সেই অতর্কিত ধাক্কা সামলাতে না পেরে ‘ওগে মাগে’ বলে চিৎকার করে খোয়া-ওঠা পিচের রাস্তায় পড়ে যায়। নুর মহম্মদ মুহূর্তমাত্র দেরি করে না। মহিলার ওপর তার সাইকেলটা চাপিয়ে দিয়েই অপর মহিলাটিকে জাপটে ধরে তার সারা শরীর হাতড়াতে থাকে। মেয়েটি যুবতী, তার সঙ্গিনীর মতো স্বাস্থ্যবতী না হলেও নিতান্ত ক্ষীণাঙ্গীও নয়, তন্বী। নুর মহম্মদের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য অসহায়ভাবে ছটফট করে। এই তীব্র শীতেও যেন মেয়েটি ঘামতে থাকে। তার উষ্ণ শরীরের স্পর্শে নুর মহম্মদ আরাম বোধ করে। মেয়েটি হাঁ করে হাঁপাতে থাকে। উত্তেজনা ও এই সামান্য পরিশ্রমে সে অবসন্ন হয়ে পড়ে। তার মুখ থেকে সদ্য খাওয়া রসুন-পেঁয়াজের তীব্র গন্ধ নুর মহম্মদের নাকে আসে। নুর মহম্মদ নির্লিপ্ততার সঙ্গে অঁতিপাঁতি করে তার অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যায় মেয়েটির নীবিবন্ধে। নুর মহম্মদের অনুমান সত্যি। মেয়েটির কোমরে কিছু গোঁজা রয়েছে। নুর মহম্মদ তৎপরতার সঙ্গে সেই গোঁজা জিনিসটা ছিনিয়ে নেয়। হাতের অনুভবে সে বুঝতে পারে সেটা একটা টাকার বান্ডিল। মহিলাটি তার সঞ্চিত তাবৎ মূলধন লুণ্ঠিত হওয়ায় সে একবার কেবল প্রাণপণ চেষ্টায় নুর মহম্মদের বাঁ-হাতের কব্জিতে দাঁত বসিয়ে কামড়ে দেয়। নুর মহম্মদ সজোরে মেয়েটির মাথাটা ডান হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চলে আসে তাকে ছেড়ে। হতভম্ব মেয়েটি আকস্মিক এই ঘটনায় ভয়ে, বিস্ময়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোয় না তার। নুর মহম্মদের জবরদস্তির আর কোনোরকম প্রতিরোধ করতে পারে না সে। নুর মহম্মদের হেঁচকানিতে সম্ভবত তার নিম্নাঙ্গের অন্তর্বাসের বাঁধন শিথিল হয়ে গেছিল। সে সেই শিথিলবাস সামলাতে ঈষৎ কুঁজো হয়ে দুহাতে শাড়ি-সায়া অঁকড়ে থাকে আর সর্বস্ব লুণ্ঠিত হওয়ায় অসহায়ভাবে ফোঁপাতে থাকে।

যে-মহিলাটিকে নুর মহম্মদ ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে সাইকেলচাপা দিয়ে রেখেছিল, সে-মহিলা ডাকাবুকো। এর মধ্যে সে তার শরীর থেকে নুর মহম্মদের সাইকেলটি সরিয়ে উঠে বসেছে। ততক্ষণে নুর মহম্মদেরও কাজ শেষ হয়ে গেছে। সাইকেলটাও সে রাস্তা থেকে তুলে নিয়েছে। প্যাডেলে পা দিয়ে দ্রুত সিটে উঠে বসেছে। রাস্তায় বসে থাকা মহিলাটি তার সঙ্গিনীকে বলে – ‘আলিয়ারা বুন, দেখ মোর নাক দিয়া অক্ত পড়ছে গে।’ তারপরই নুর মহম্মদের কানে আসে দুই মহিলার মিলিত আর্তনাদ।

নুর মহম্মদ একবার পেছনে তাকিয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে সাইকেল চালিয়ে দেয়। সাইকেলের স্প্রিংহীন বেলটা দ্রুতলয়ে বাজতে থাকে। তাড়াতাড়ি এই পথটা পার হতে হবে তাকে। কাছাকাছি গ্রামের মানুষজন এতক্ষণ নিশ্চয় ওখানে পৌঁছে গেছে। উত্তুরে বাতাস হু-হু করে ঝাপটা মারে নুর মহম্মদের শরীরে। কই, তেমন শীত বোধহয় না তো তার। কেবল বাঁহাতের মণিবন্ধে, যেখানে মেয়েটি একটু আগে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল, সেখানে সামান্য চিনচিনে জ্বলুনি অনুভব করে। এরই সামান্য জ্বলুনি নুর মহম্মদকে তেমন কাহিল করতে পারে না। নুর মহম্মদের মনে পড়ে, এই তো কিছুদিন, আগে বাড়ির পেছনের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে তাকে ঢোঁড়া সাপে কামড়ে দিয়েছিল। নির্বিষ সাপের দংশনে তার প্রাণ সংশয়ের কোনো আশঙ্কা না থাকলেও তাতে কিছু জ্বলুনি অবশ্যই ছিল। আজকে মানুষের কামড়ের জ্বলুনির থেকে সে কামড়ের জ্বলুনি কিছু বেশি হলেও সেদিন তার সদ্য বিবাহিতা বউ আলিয়ারা তার জন্য কাতর হয়ে পড়েছিল খুব। ‘আলিয়ারা’ নামটা একবার শব্দ করে উচ্চারণ করেই থমকে যায় নুর মহম্মদ। পকেটে টাকার বান্ডেলটা হাত দিয়ে অনুভব করে সহসা তার খেয়াল হয়, অপেক্ষাকৃত বয়স্কা মহিলাটি তার সঙ্গিনীকে কী নাম ধরে ডেকেছিল যেন! আলিয়ারা, এ কোন আলিয়ারা তবে। কাছের ওই গ্রামেই তো থাকে সেই আলিয়ারাও। টাকার খোঁজ করতে গিয়ে তার শরীরের যে-অন্ধিসন্ধি হাতড়েছিল নুর মহম্মদ, এখন সেই শরীরটা যেন কেমন চেনা চেনা মনে হয় তার। শরীরের সেই পেলবতা, সেই উষ্ণতা, সেই মনোরম বন্ধুরতা কত রাত সে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেছে। আচ্ছা, আলিয়ারার নাভির ঠিক ডান পাশেই এঁটুলির আকারের একটা খয়েরি রঙের উঁচু তিল ছিল। কত রাতে ওই তিলটার ওপর আঙুল বুলিয়ে সুড়সুড়ি দিতেই, আলিয়ারা খিলখিল করে হাসত আর শরীর মনোরম ভাংচুর করত। আর বলত – ওটা লিয়ে আপনে অমন করেন ক্যানে বলেন তো? নুর মহম্মদ বলত – এটা তুই আমাকে দিয়ে দে। আমি কিসমিস কর‌্যা খেয়্যা লিই। আলিয়ারা হেসে কুটিকুটি হতো। বলত – আপনে একটা আক্ষস। নুর মহম্মদ আলিয়ারার ফুলবেড়িয়া উচ্চারণের নকল করে বলত – আর তুই একটা ‘আক্ষসী’ – আমাকে খেয়েছিস।

নুর মহম্মদের অস্পষ্ট মনে হয় সে যখন টাকার খোঁজে মেয়েটার শরীর হাতড়াচ্ছিল, তার নাভির পাশে মাংসের একটা ছোট্ট পিন্ড সে যেন স্পর্শ করেছিল। দস্যুর ভূমিকায় যে শরীরকে নিস্পৃহভাবে স্পর্শ করেছে সে, এখন সেই স্পর্শের স্মৃতিই তাকে রোমাঞ্চিত করে তোলে। নুর মহম্মদের সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। সেকি তীব্র শৈত্যের কারণে, না আলিয়ারা নামের সেই যুবতীর আসঙ্গ স্মৃতিতে – নুর মহম্মদ বুঝে পায় না।

 

চার

সারাদিন নুর মহম্মদ অলসভাবে শুয়েবসে কাটাল। অন্যদিন বাড়িতে সে প্রায় থাকেই না। কোথায় কোথায় নিজের ধান্ধায় ঘুরে বেড়ায়। ওর বুড়িমা মাঝে মাঝে এসে খোঁজ নেয় নুর মহম্মদের। বলে – নুরু রে, তোর কি শরীল খারাপ? এমন তো কুনুদিন তু ঘরে বস্যা থাকিস না খো। উন্মনা নুর মহম্মদের মায়ের কথা যেন কানেই যায় না। একদৃষ্টে সে তার ডান হাতের কব্জির দিকে তাকিয়ে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করে যায়। সেই দ্রষ্ট স্থানে ফুটে-ওঠা দাঁতের চিহ্ন কখন মুছে গেছে। খালি একটা চিনচিনে সুখকর যন্ত্রণা যেন টের পায় নুর মহম্মদ। সেই যন্ত্রণা যেন কখন দংশনের জায়গা ছেড়ে সারা বুকজুড়ে ছড়িয়ে গেছে। শূন্য শয্যায় নুর মহম্মদ ছটফট করে খালি।

শীতে ছোটবেলা একটুতেই ফুরিয়ে আসে। নুর মহম্মদের উঠোনে এখনো একটু রোদ পালাই পালাই করে পড়ে রয়েছে নিষ্পত্র আমড়া গাছটার তলায়। নুর মহম্মদ দ্রুত অপস্রিয়মাণ সেই রোদটুকুতে বসে তার লঝ্ঝরে সাইকেলটা ন্যাকড়া দিয়ে ভালো করে মুছে তাতে পোড়া মবিল লাগিয়ে তার শ্রী ফেরানোর চেষ্টা করছিল।

সাইকেলের পরিচর্যার পর সরকারি টিউবেলে গিয়ে ভালো করে হাত-মুখ ধোয় নুর মহম্মদ। এক টুকরো সুগন্ধি সাবান খুঁজে এনে সেটা মুখে-হাতে ঘষে খুব করে। তারপর ঘরে এসে সাজগোজ করে। গত ঈদের চেককাটা লুঙ্গি আর গাঢ় সবুজ রঙের বুকে-ঘাড়ে কাজ করা টেরিকটের কলিদার পাঞ্জাবিটা গায়ে দেয় নুর মহম্মদ। আয়নায় ভালো করে মুখ দেখে। তিনদিনের না-কাটা দাড়িতে মুখটা যেন একটু কালো দেখাচ্ছে। তা দেখাক, এখন দাড়ি কামানোর সময় বা ধৈর্য নেই নুর মহম্মদের। ভালো করে চুল অাঁচড়ায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, দুচোখে সুরমা অঁকে সরু করে। আতরের শিশিটা নিয়ে দেখে তাতে সামান্য তলানি পড়ে আছে। সেটুকুই সে পাঞ্জাবির বুকে লাগায়, যত্ন করে গোঁফের প্রান্ত দুটোতেও লাগায় সামান্য। সামান্য আতর তুলোতে ভিজিয়ে কানে গুঁজলে ভালো হতো। কিন্তু তা হলো না। শিশি একেবারে শূন্য। প্রসাধন সেরে এবার নুর মহম্মদ বাংলাদেশ হয়ে আসা সেকেন্ড হ্যান্ড বিদেশি কোটটা গায়ে চাপায় আর গলায় একটা লাল মাফলার পেঁচিয়ে নেয়।

শেষরাতে লুট করা টাকার বান্ডেলটা পকেটে ভরে নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে আবার কী ভেবে ঘরে এসে চৌকির তলা থেকে টিনের বাকসটা বার করে। সেটার ডালা খুলে ঘরের ঝুপসি অন্ধকারে তার ভেতরটা কিছুই চোখে ঠাহর হয় না নুর মহম্মদের সুরমা অঁকা চোখে, ডালা খোলা অবস্থায় বাকসটা দরজার কাছে এনে তার ভেতর থেকে সবুজ রঙের পোশাকি গরম চাদরটা বার করে। তারপর চকচকে একটা সুদৃশ্য ধাতুখন্ড বার করে একবার সেটা চোখের সামনে মেলে ধরে। সেটা কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে কোটের পকেটে রেখে দেয় যত্ন করে।

বাকসটা আগের জায়গায় রেখে নিজের মনে অস্ফুটে বলে – উপিনের দোকান থেকে এক হাঁড়ি মেঠাই লিতে হবে হাওলাতে। আর একবার আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখার চেষ্টা করে সে। অন্ধকারে দেখা যায় না কিছুই। পাঞ্জাবির বুকের কাছের কাপড়টা, যেখানে আতর মাখান হয়েছে, নাকের কাছে নিয়ে বুক ভরে একটা ঘ্রাণ নেয়। এবার কোটের বোতামগুলো লাগিয়ে কাঁধে ভাঁজ করা চাদরটা রাখে।

ঘর থেকে উঠোনে বেরিয়ে আসে নুর মহম্মদ। এতক্ষণে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। আমড়াগাছে সাইকেলটা ঠেস দিয়ে রাখা ছিল। সেটা নিয়ে নুর মহম্মদ মাকে ডাকে। বুড়ি কুপি হাতে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। নুর মহম্মদ বলে – সাবধানে থাকিস, আমি যেছি। আজ রেতে আর ফিরব না। – বলেই সাইকেল নিয়ে বেরোনোর উদ্যোগ করে সে। বুড়ি নুর মহম্মদের সাজগোজ মরা আলোতেও লক্ষ করে। বলে – রেতে ক্যানে ফিরবি না বাপ?

নুর মহম্মদ মায়ের সে-কথার কোনো জবাব দেয় না। সাইকেল ঠেলে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে।

বুড়ি কুপি হাতে দাওয়া থেকে নেমে এসে উঠোন পেরিয়ে বাইরে আসে দ্রুত পায়ে। নুর মহম্মদ ততক্ষণে সাইকেলে চেপে বসেছে। তার স্প্রিংহীন বেল যথারীতি ক্রিং-ক্রিং বাজতে শুরু করেছে।

বুড়ি ফের চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে – কোতি যেছিস নুরু? বলে যা বাপ আমার।

বুড়ি ফের চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে – কোতি যেছিস নুরু? বলে যা বাপ আমার।
নুর মহম্মদ সাইকেল চালাতে চালাতেই একবার পেছন ফিরে তার মায়ের দিকে তাকায়। তারপর সাইকেলের ব্রেক কষে সাইকেল থামিয়ে মাটিতে একটা পা রেখে দাঁড়ায়। কুপির আলোয় মায়ের বলিবহুল প্রাচীন মুখের দিকে তাকিয়েই তার মুখে একটা মৃদু হাসি খেলে যায়। তারপর সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। সাইকেল চলতে থাকে। রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যেতে যেতে নুর মহম্মদ চেঁচিয়ে বলে – বাবুপুরে যেছি। তোর ব্যাটার বহুকে লিয়ে আসতে।