ঊনত্রিশ

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতি প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা থেকে সরে যায়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে যে-চারটি লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল তা থেকে বিচ্যুতির লক্ষণ স্পষ্ট হতে থাকে। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতার পথ পরিহারের চেষ্টা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে থাকে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন করে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কার্যত সমঅধিকারবঞ্চিত করেন।

জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ ধর্মভিত্তিক যেসব রাজনৈতিক দল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে দালালি করেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জাতীয় ঐক্যের নামে জিয়া ওইসব ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে প্রচারণা বেড়ে যায়। ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখার মানসিকতা বাড়তে থাকে। আমরা ছেলেমেয়েদের বাঙালি পরিচয়ে বড় করতে চাইলেও সব পরিবারে একরকম অবস্থা ছিল না। অনেকেই ছেলেমেয়েকে ‘মুসলমান’ পরিচয়ে পরিচিত হতে এবং ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে অন্য ধর্মকে তাচ্ছিল্য করার শিক্ষা দিতেন। বাইরে গিয়ে আমার ছেলেমেয়েকেও শুনতে হতো, ‘তোমরা তো হিন্দু, হিন্দুরা ভালো না।’ এসব শুনে আমার ছেলেমেয়ের মন খারাপ হতো। বাসায় এসে আমার কাছে নানা প্রশ্ন করতো। জানতে চাইতো, আমরা আসলে কী – বাঙালি, না হিন্দু?

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মানুষ হিসেবে বড় হবে, নাকি ধর্মীয় পরিচয়ে – এটা ভেবে আমি কিছুটা অসহায় বোধ করতাম। আমি চাইতাম, আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষা লাভ করুক। এমনিতেই ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। কারণ অজয় রায় সংসারে থেকেও আসলে ছিলেন সংসারবিরাগী মানুষ। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে কারো কোনো সমস্যা থাকবে না – এই সুদূরের স্বপ্নে বিভোর থাকতেন এবং তার জন্য পুরোটা সময় ব্যয় করতেন রাজনীতির পেছনে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমি খুব স্বস্তি বোধ করতাম না। যদিও নিজে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতাম না, তবু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ঢেউ ঘরে এসে লাগতো। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই যেখানে সফল হচ্ছে না, সেখানে সমাজতন্ত্র তথা আরো উন্নত সমাজের স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে আমার সংশয় ছিল।

অজয় রায় রাজনীতি ছাড়া আর কিছু করবেন না, তিনি নিজেকে দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামে উৎসর্গ করেছেন, কাজেই সংসার এবং ছেলেমেয়ে সামলানোর দায় আমি স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। তিন সন্তানকে প্রকৃত শিক্ষায় কীভাবে শিক্ষিত করে তুলবো, তা নিয়ে আমার ভেতরে একটা উদ্বেগ কাজ করতো।

আমার কেন যেন মনে হতো, দেশে রেখে আমার পক্ষে ছেলেমেয়েদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। আবার আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অতোটা ভালো নয় যে, ওদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো। কলকাতায় আমাদের আত্মীয়স্বজন থাকায় সন্তানদের কলকাতায় পাঠানোর চিন্তা আমার মাথায় ঘুরতে থাকে; কিন্তু ছেলেমেয়েকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলে অজয় রায়ের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাইনি। আবার বিষয়টি আমার মাথা থেকে আমি বিদায়ও করতে পারি না। এ নিয়ে আমি আমাদের পরিচিত ব্যবসায়ী আর.এন. দত্তের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে একদিন বললেন, কলকাতার নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের বড় মহারাজ ঢাকায় এসেছেন। আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করে ছেলের পড়ার বিষয়ে কথা বলি। নরেন্দ্রপুর আশ্রমে একটি খুব নামকরা আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে বলে তিনি আমাকে জানান। সেখানে খরচও কম। আবার ভালো ছাত্র হলে বৃত্তিরও ব্যবস্থা হতে পারে।

আর.এন. দত্তের পরামর্শ অনুযায়ী আমি একদিন ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে গিয়ে নরেন্দ্রপুর আশ্রমের বড় মহারাজের সঙ্গে দেখা করি। প্রণাম করে তাঁর সামনে বসতেই তিনি আমাকে মা বলে সম্বোধন করে আমার সঙ্গে আমার স্বামী আছে কি না জানতে চান। আমি উত্তর দেওয়ার আগেই সেখানে উপস্থিত ঢাকা মিশন আশ্রমের কালীপদ মহারাজ বললেন, উনার স্বামী কমিউনিস্ট, দেশোদ্ধারে ব্যস্ত। স্ত্রীর সঙ্গে আশ্রমে ঘোরার সময় তাঁর নেই।

বড় মহারাজ আমার স্বামীর পরিচয় জেনে আমার দিকে বেশ সহানুভূতির চোখে চাইলেন। আমি সামান্য দু-একটি কথা বললাম। অজয় রায়ের বাবা যে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি,  বারানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন এবং অজয় রায়ও যে একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন, রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি করেন – এসব শুনে তিনি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলেন বলে মনে হলো। একপর্যায়ে আমি আমার ছেলেকে নরেন্দ্রপুর মিশন স্কুলে ভর্তি করতে চাই বলে জানালাম। সব শুনে তিনি বললেন, মা রে, নরেন্দ্রপুরে ভর্তি হতে হলে তো ওকে আগে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে। আমি বললেই তো ভর্তি করে নেবে না। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় বলে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভারতজুড়ে সুনাম।

আমি বলি, আপনি আশীর্বাদ করুন। ভর্তি পরীক্ষায়  ছেলে যাতে অংশ নিতে পারে সে-ব্যবস্থা আমি করবো।

ব্যস, এরপর আমার ধ্যানজ্ঞান হয় ছেলে কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারে সে-ব্যবস্থা করা। কলকাতায় আমি আমার দেবর মানস রায়কে নরেন্দ্রপুরে যোগাযোগ করে ভর্তি পরীক্ষার সময়, কী ধরনের প্রশ্ন হয় – এসব আমাকে জানাতে বলি। অন্য দু-এজন আত্মীয়কেও এই দায়িত্ব দিই। তাঁরা যথাসময়ে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করে আমার কাছে পাঠান। আমি আমাদের পুত্র জয়কে (অমিতাভ রায়) ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে থাকি। জয় তখন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। মেধাবী ছাত্র হিসেবে স্কুলে ওর সুনাম ছিল। ও পরীক্ষা দিলে নরেন্দ্রপুরে চান্স পাবে বলে আমার বিশ্বাস ছিল।

ভর্তি পরীক্ষার নির্দিষ্ট তারিখের মাত্র একদিন আগে জয়কে নিয়ে আমি কলকাতা রওনা হই। নৈশকোচে প্রথম যশোর যাই। সেখান থেকে কমিউনিস্ট নেতা কাজী রবিউল হক ও অশোক সেনের সহায়তায় সকালে বেনাপোল সীমান্তপথে ওপারে যাই। কলকাতা পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যায়। পরদিন নরেন্দ্রপুর মিশন স্কুলে গিয়ে জয়কে পরীক্ষার জন্য ভেতরে পাঠিয়ে আমি অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে অপেক্ষা করতে থাকি। আমি ছাড়া বাংলাদেশের আর কেউ ছিলেন না। পরীক্ষা শুরু হওয়ার অল্প পরেই বাংলাদেশের অমিতাভের অভিভাবকের খোঁজ করা হয়। আমি একটু অবাক হই। ভেতরে গিয়ে শুনি, আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সব পরীক্ষার্থীকেই জয়নগরের বিখ্যাত মোয়া খেতে দেওয়া হয়েছিল। কী কারণে যেন ওই মোয়া খেয়ে জয় বমি করতে থাকে। বমি করে ও এতোটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে, ওর পক্ষে আর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও হতভম্ব হয়ে পড়ি। এমন বিপদ হবে ভাবতেও পারিনি। জয়ের আর নরেন্দ্রপুরে ভর্তি হওয়া হয় না। আমি বড় মহারাজের সঙ্গে দেখা করি। সব শুনে তিনিও কষ্ট পান। এক বছর পর আবার ছেলেকে পরীক্ষা দিতে বলেন। বিফলমনোরথ হয়ে আমি দেশে ফেরার কথা ভাবি।

কলকাতায় গৌরী মাসির (গৌরী আইয়ুব) সঙ্গে দেখা করে তাঁর সঙ্গে শান্তিনিকেতনে মেয়েদের ভর্তি করা যায় কি না, সে-বিষয়ে কথা বলি। গৌরী মাসির সঙ্গে শান্তিনিকেতনে ভালো যোগাযোগ ছিল। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন। এছাড়া বর্ধমানে আমার এক কাকা ছিলেন, তাঁরও শান্তিনিকেতনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কাকাকেও ফোনে মেয়েদের ভর্তির বিষয়টি জানাই। তিনিও ভরসা দেন।

জয় নরেন্দ্রপুরে পরীক্ষা দিতে না পারলেও আমি একটু আশা নিয়েই দেশে ফিরে আসি। এবার হয়নি তো কী হয়েছে, পরের বার তিনজনই যেন কলকাতায় ভর্তি হতে পারে সে-ব্যবস্থা করার চিন্তা আমাকে পেয়ে বসে।

বড় মেয়ে পর্ণা (অনিন্দিতা রায়) তখন কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী।  ছোট মেয়ে অদিতি রায়ও ওয়ারীতেই সিলভার ডেল স্কুলে ভর্তি হয়েছে। জয় স্কুলে আসা-যাওয়া করতো স্কুলবাসে। টিকাটুলী মোড়ে বাস থামতো। সকালে আমি ওকে বাসে তুলে দিতাম। দুপুরে ছুটির পর যখন ফিরতো তখন একজন বুয়া ওকে বাসায় নিয়ে যেতো। দুই মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়ার ভারও ওই বুয়ার ওপরই ন্যস্ত ছিল। একবার পর্ণা স্কুলের পরীক্ষায় সমাজকল্যাণ বিষয়ে ফেল করলে আমি ওকে একটু বকাঝকা করে বলেছিলাম, ফেল করে বাসায় ফিরতে তোমার লজ্জা করলো না! তোমার বাবা কত মেধাবী, সেটা তুমি বোঝো? মেয়ে এতে খুবই দুঃখ পায়।

পরদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি পর্ণা ঘরে নেই। বুয়ার কাছে জানতে পারি, মেয়ে স্কুলেই বসে আছে, বাসায় ফিরবে না। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কী কারণে সেদিন অজয় রায় তখন বাসাতেই ছিলেন। আমি তাঁকেই বলি, মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসতে। বাবা গিয়ে বুঝিয়ে-শুনিয়ে মেয়ের মান ভাঙিয়ে বাসায় নিয়ে আসে। ছেলেমেয়েকে বেশি সময় দিতে না পারলেও বাবার প্রতি ওদের ছিল অন্যরকম দরদ এবং টান। মেয়ের মুখ ভার দেখে আমারও খারাপ লাগে। কোনো কারণে হয়তো ওই বিষয়ের পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি; কিন্তু ও তো ছাত্রী খারাপ নয়। অন্যসব বিষয়েই ভালো নম্বর পেয়েছে। বাচ্চাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করার কথাটি আমার মনে গেঁথে যায়। পরে আর কখনো আমি ছেলেমেয়েকে বকাঝকা করিনি।

পরের বছর তিন সন্তানকে নিয়ে আমি কলকাতা যাই, ওদের পড়াশোনার ব্যবস্থা ওখানে করার জন্য। এবার ভাগ্য আমার সঙ্গে আর অসহযোগিতা করেনি। জয় নরেন্দ্রপুরে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পায়। পর্ণা ও অদিতির ভর্তির সুযোগ হয় শান্তিনিকেতনে। গৌরী মাসি এ-ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতা করেন। ওদের স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে গৌরী মাসি এবং আমার বর্ধমানের কাকার নাম-ঠিকানা দেওয়া হয়। তিন ছেলেমেয়েকে এভাবে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে আমার যে কষ্ট হয়নি তা নয়। তবে ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমাকে এই আপাতকঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি : ‘কঠিনেরে বাসিলাম ভালো, সে কখনো করে না বঞ্চনা।’

ছেলেমেয়েকে দেশের বাইরে রেখে আসতে খুব খারাপ লাগছিল। ওই বয়সে বাবা-মায়ের স্নেহছায়া থেকে ওদের বঞ্চিত করার কাজটি আমি করেছি অনেকটা একক সিদ্ধান্তে। আমি ওদের কলকাতা নিয়ে যাওয়ার সময় অজয় রায় ঢাকায় ছিলেন না, কী একটা কর্মসূচি উপলক্ষে মস্কো গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে তিনি যখন জানলেন যে, তিন ছেলেমেয়েকেই আমি কলকাতায় রেখে এসেছি, তখন তিনি সবিস্ময়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, এটা তুমি করলেই?

পরে অবশ্য তিনি আমার সিদ্ধান্তকে ভুল বলেননি। নরেন্দ্রপুরে ছেলের থাকা-খাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু শান্তিনিকেতনে মেয়েদের খাওয়া নিয়ে সমস্যা হয়েছে বেশ কিছুদিন। কম পয়সায় থাকা-খাওয়া বলে শান্তিনিকেতনে তখন খাবারের মান ভালো ছিল না। বড় মেয়ে আমাকে বলতো, ওই খাবার গলা দিয়ে নামতে চায় না। সরষে তেল আর কাঁচা লংকা ডলে ওকে ভাত গলাধঃকরণ করতে হয়েছে।

আমার ছেলেমেয়ে একেবারে ছোট থেকেই কষ্ট করতে শিখেছে। ওরা জানতো ওদের মা-বাবার সামর্থ্যরে কথা। তাই অযথা কোনো বায়না-বাহানা ওদের ছিল না। অল্পে তুষ্ট হওয়ার ক্ষমতা ওরা একেবারে শিশুকাল থেকেই পেয়েছে। তাই কষ্টকর প্রবাসজীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ওদের তেমন সমস্যা হয়নি। ওর সব মেনে নিয়েছিল। নতুন পরিবেশের সঙ্গে তাড়াতাড়ি মানিয়েও নিয়েছিল। ওরা জানতো, ওদের বাবা অজয় রায়ের তাক লাগানোর মতো বিত্তের ঐশ্বর্য না থাকলেও চিত্তের ঐশ্বর্য ছিল অফুরান। তিনি যে মানুষের মঙ্গলচিন্তা ছাড়া আর কিছুকে বড় করে দেখেন না – ছেলেমেয়েদের তা নিয়ে আলাদা গর্ব বা অহংকার ছিল।

বছরে দুবার ছুটিতে ওরা দেশে আসতো। আসার সময় ওরা নিজেরাই চলে আসতো। প্রথমদিকে কোনো আত্মীয়ের সাহায্য নিত, পরে আর তার প্রয়োজন হতো না। ছুটিশেষে ফেরার পথে আমি ওদের সঙ্গী হতাম। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা খুব উন্নত ছিল না। রাতে যশোর, সকালে বেনাপোল, তারপর কলকাতা। আমি প্রথমে ছেলেকে নরেন্দ্রপুরে রেখে, দুই মেয়েকে নিয়ে রাতটা কলকাতায় কোনো আত্মীয়বাসায় কাটিয়ে ভোর ৫টায় কাঞ্চনজংঘা মেইল ট্রেন ধরে শান্তিনিকেতন যেতাম। এই ট্রেনযাত্রা আমার কাছে দুটি কারণে খুব আনন্দদায়ক ছিল।  প্রথমত, ট্রেনে মাত্র পাঁচ টাকায় বেশ মজাদার নাস্তা পরিবেশন করা হতো। সেলোফেন পেপারে মোড়ানো গরম বাটার টোস্ট, ডিম সিদ্ধ এবং গরম কফি – এ-নাস্তা আমার খুব পছন্দের ছিল। মেয়েরাও এই খাবার পছন্দ করতো। দ্বিতীয় আকর্ষণ ছিল লালনগীতি। ট্রেন চলতে শুরু করলেই নাম-না-জানা শিল্পীদের গাওয়া লালনের গান চলতো যাত্রাপথজুড়ে। দুই আড়াই ঘণ্টা সময় যে কীভাবে কেটে যেতো, তা বুঝতেই পারতাম না।

ত্রিশ

সন্তানদের কলকাতায় পড়াতে পাঠিয়ে আমরা যে নানা রকম বাঁকা কথা শুনিনি তা নয়। আমাদের অনেক কটূক্তি-গঞ্জনা সইতে হয়েছে। অজয় রায়কে এ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। পার্টির তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, নারী নেত্রী মালেকা বেগম তাঁর একটি লেখায় এ-বিষয়ে যা লিখেছেন সেটা এখানে হুবহু তুলে ধরছি। মালেকা আপা লিখেছেন :

একদিন পার্টির কেন্দ্রীয় সভায় শ্রদ্ধেয় অজয় রায় জনৈক সদস্য দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁর সন্তানরা ভারতের শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ছে কীভাবে? অর্থ কীভাবে জোগান দিচ্ছেন তিনি? হিন্দু ধর্মাবলম্বী অজয় রায় কীভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন? কমিউনিস্ট পার্টির কোনো সদস্যই যখন এই প্রশ্নকর্তাকে বা প্রশ্ন বিষয়ে কোনো আপত্তি জানালেন না তখন এত চমকে গিয়েছিলাম যে, এই ‘ছোট-সংকীর্ণ’মনা পার্টির আমি সদস্য? চুপ থাকতে পারিনি। কমিউনিস্ট পার্টির এরকম ‘সাম্প্রদায়িক’ অবস্থানে চুপ থাকতে পারিনি। কমিউনিস্ট পার্টির এরকম ‘সাম্প্রদায়িক’ অবস্থানের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধভাবে বলেছিলাম, অজয়দার আত্মীয়স্বজনরা ভারতেই আছেন। একমাত্র অজয়দা বাংলাদেশের নাগরিক। কাজেই তাঁর সন্তানরা ভারতে পড়ার অর্থ পাচ্ছে আইনিভাবেই। তাছাড়া তাঁর সন্তানরা ভারতে পড়াশোনা করলে কমিউনিস্ট পার্টিকে সাম্প্রদায়িক সংকটে পড়তে হবে কেন? ধিক্কার দিয়েছিলাম, অজয়দা নিশ্চুপ ছিলেন বলে। সার্বক্ষণিক বা হোলটাইমার সকল পুরুষ পার্টি সদস্যের ‘স্ত্রী’ চাকরি করে সাংসারিক ব্যয়ভার বহনের যে-নীতি কমিউনিস্ট পার্টি চালু করেছিল সারাদেশে – সেই নীতিমালায় জয়ন্তী রায় সম্মত হয়ে অজয় রায়কে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করে অজয় রায় এবং তাঁর যৌথ সংসার চালিয়েছেন। সেই বিষয়টিও সবাই জানেন। অজয় রায় সে-কথাও বললেন না। আমি অত্যন্ত ব্যথা পেয়েছিলাম।

নিন্দুকদের কথায় আমি বা অজয় রায় কেউ বেশি কান দিতাম না। আমরা কোনো অন্যায় করিনি। আমার উপার্জনের টাকা এবং কলকাতার আত্মীয়দের নানা ধরনের সহায়তা ও আমার ছেলেমেয়েদের নিরলস চেষ্টা, ভালো ফল করে বৃত্তি পাওয়া – এই সবকিছুর যোগফলেই সম্ভব হয়েছিল ওদের কলকাতায় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করা। আজ আমার গর্ব এটাই যে, আমার তিন সন্তানই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নিজেদের যোগ্যতায় আমেরিকা এবং জেনেভায় স্বামী, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছে। ছেলে অমিতাভ রায় কলকাতা থেকেই মাস্টার্স করে আমেরিকায় গিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে এখন ভালো চাকরি করছে। বড় মেয়ে অনিন্দিতাও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্সশেষে বাইরে থেকে ডক্টরেট করে এখন জেনেভায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করছে। ছোট মেয়ে অদিতি এমএ পাশ করেছে শান্তিনিকেতন থেকে। এখন ওর বাস আমেরিকায়। আমি যদি ওদের আগলে রাখতাম, যদি কলকাতায় পাঠানোর ঝুঁকি না নিতাম, ওরা যদি নিজের মতো করে আত্মসম্মানের সঙ্গে বড় হয়ে না উঠতো, তাহলে ওদের অবস্থা এখনকার মতো না-ও হতে পারতো। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমার মধ্যে ছিল না। আমার সন্তানরাও এসবের ঊর্ধ্বে।

নরেন্দ্রপুর এবং শান্তিনিকেতনের বিশেষ পরিবেশ এবং শিক্ষা আমার ছেলেমেয়েদের জীবনের ভিত্তি গড়ে দেওয়ায় ওরা মানবিক এবং হৃদয়বান মানুষ হয়ে উঠেছে। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির’ – এই হলো আমার সন্তানদের জীবনবোধ। নরেন্দ্রপুরের আশ্রমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি স্বামী বিবেকান্দের ভাবধারায় উজ্জীবিত। ধর্মভিত্তিক শিক্ষা নয়, দেশপ্রেম এবং উন্নত নৈতিক চরিত্রের সবল-সুস্থ মানুষ গড়াই ওই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অন্যদিকে শান্তিনিকেতন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনবদ্য প্রতিষ্ঠান। ইট-চুন-সুরকির কঠিন কাঠামোর বাইরে প্রকৃতির মুক্ত আবহে গাছের ছায়ায় প্রাণের মায়ায় খোলামেলা পরিবেশে উদার ও মুক্ত মনের মানুষ তৈরি করাই শান্তিনিকেতনের ব্রত ছিল। কেবল বইয়ের হরফের থেকে নয়, জীবন থেকে পাঠ গ্রহণের অমন পরিবেশ আর কোথায় আছে! শান্তিনিকেতন সংকীর্ণতা এবং ভেদবুদ্ধির শিক্ষা দেয় না। ‘দেবে আর নেবে, মিলাবে মিলিবে’ – এটাই শান্তিনিকেতনের শিক্ষাবৈশিষ্ট্য। শান্তিনিকেতন একই সঙ্গে একটি আশ্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

দুই মেয়ের কারণে আমি বহুবার শান্তিনিকেতনে গিয়েছি। সেখানে আমার একটি পরিচিতমণ্ডলও গড়ে উঠেছিল। কালুর দোকানে সুস্বাদু চা-শিঙাড়া সহযোগে বাঁশের মাচায় বসে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা পরিবেশে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি সারাজীবন মনে থাকবে। মনে থাকবে পৌষমেলা এবং বসন্তোৎসবে অংশগ্রহণের মধুর স্মৃতিও।

পৌষমেলা শান্তিনিকেতনের একটি প্রধান উৎসব। পৌষ মাসের ৭ তারিখে শুরু হয়ে তিনদিন চলে। সারামাসই অবশ্য দোকানিরা বিভিন্ন গ্রামীণ ঐতিহ্যের জিনিসপত্র নিয়ে দোকান সাজিয়ে বেচাকেনা করেন। তিনদিন চলে উৎসব-আনন্দ,  নাচ-গান, হই-হুল্লোড়। পৌষমেলার প্রথমদিন রান্না হয় হবিষ্যান্ন। আতপ চালের সঙ্গে সবজি মিশিয়ে খাঁটি ঘি দিয়ে রান্না এই হবিষ্যান্ন উৎসর্গ করা হয় যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে। এই হবিষ্যান্ন খেতে খুবই সুস্বাদু হয়। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বন্ধন সৃষ্টির এই মেলা নানা বয়সী মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে আয় আয় আয়’ গানের সঙ্গে বাহারি রঙিন পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষের নাচগান এক ভিন্নতর পরিবেশ তৈরি করে।

পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়

সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়,

আয়, আর একটি বার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়,

মোরা সুখের দুখের কথা কবো প্রাণ জুড়াবে তায়।

এই গানের রেশ আজো কানে বাজে। ভুলতে পারি না বাউলশিল্পীদের মন মাতানো চুল দোলানো সব গানের কথা।

শান্তিনিকেতনের দোল বা বসন্তোৎসবে উপস্থিত থাকার সুযোগও আমার হয়েছিল। বাসন্তি রং পোশাক পরে, খোঁপায় জড়িয়ে রঙিন ফুলের মালা খোল-করতাল বাজিয়ে –

ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল

লাগল যে দোল।

জলে স্থলে বনতলে

লাগল যে দোল

দ্বার খোল, দ্বার খোল

– বলে গান যখন অনেক কণ্ঠে গীত হতো, তখন মনের ভেতর এমন এক অনুরণন তৈরি হতো যা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। আবির ছিটিয়ে রাঙিয়ে দেওয়া হতো উপস্থিত সবাইকে। কিন্তু কোনো উদ্দাম-উন্মাদনা থাকতো না। সংযম ও সুন্দরের এমন আকুলতা মনকে মাতিয়ে তুলতো। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও এসব উৎসবে উপস্থিত হয়ে আনন্দ, হইচইয়ে মাতোয়ারা হতো। আবির দিয়ে কেবল বাইরে নয়, মর্মকে রঞ্জিত করার এমন আয়োজন রবিতীর্থ শান্তিনিকেতনেই সম্ভব।

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

তব অবগুণ্ঠিত জীবনে

করো না বিড়ম্বিত তারে

আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো

আজ ভুলিয়ো আপন পর ভুলিয়ো

– গানের সুরে মগ্ন হয়ে কখন যে মিলনমেলা ভাঙতো তা অনেক সময় টেরও পেতাম না।

কলকাতা বা শান্তিনিকেতনে আসা-যাওয়ার পথে স্মৃতির ভাণ্ডারে কম অভিজ্ঞতা জমা হয়নি। একবার ফেরার পথে বেনাপোল সীমান্তে দেখা হয় রবীন্দ্রানুরাগী ছায়ানটখ্যাত সংগীতসাধক ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে। তিনিও শান্তিনিকেতন থেকে ফিরছিলেন। বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য আমি ওয়াহিদভাইয়ের পাসপোর্ট নিয়ে দায়িত্বরত ব্যক্তির হাতে দিলে তিনি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জানতে চান, আপনারা কি একসঙ্গে যাচ্ছেন?

আমি বললাম, কেন  আপনার কোনো সমস্যা?

তিনি বলেন, আপনি হিন্দু, উনি মুসলমান!  এমনভাবে   কথাটা বললেন যেন হিন্দু-মুসলমানের সহযাত্রা একটি অপরাধ। যা  হোক, তিনি সিল-ছাপ্পর মেরে দিলেন বেজার মুখে। বাসে বসে ওয়াহিদভাইকে ঘটনাটি বললাম। তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘রেখেছে মুসলমান করে, মানুষ করেনি।’

আর একবার কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পথে কাঞ্চনজংঘায় একজন চা-কফি বিক্রেতা তার গরম কেটলি আমার হাঁটুতে এমনভাবে চেপে দেন যে, অসহ্য গরমে আমি ‘ও মা’ বলে চিৎকার করে উঠি। আমার সিনথেটিকের শাড়ি গরমে কুঁচকে যায়। কেটলিওয়ালা একটু বিব্রত হয়ে বলেন, ‘ইচ্ছা করে এটা করিনি দিদি। ভিড়ের চাপে লেগে গেছে।’ ক্ষমা চেয়ে বললেন, ‘বাড়ি ফিরে ছোট ভাইটির কথা মনে করবেন আর অভিসম্পাত দেবেন না।’ তাঁর কথা শুনে আমার ভালো লেগেছিল।

মানুষের এক জীবনে কত ঘটনাই তো ঘটে। জীবন তো আসলে ঘটনার সমাহার। তার সব যদি মনে থাকতো, তাহলে স্মৃতির ভার মানুষ বহন করতে পারতো না। আজ জীবনসায়াহ্নে এসে কিছু স্মৃতি প্রকাশ করে ভারমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি। (চলবে)

Leave a Reply