শহীদ কাদরীর কবিতার সীবনগুচ্ছ

লেখক:

শহীদ ইকবাল

লেখার সংখ্যা সামান্য হলেও কবিতায় বাঙ্ময় জীবনদর্শন অসামান্য এবং সম্পূর্ণ, দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট ও নিঃসংশয়, পর্যবেক্ষণ তীক্ষন ও সূক্ষ্ম, প্রকাশ অনবদ্য ও মেদহীন। তাঁর কবিতার অমত্মর্গত যাবতীয় বোধ দেশকালের সীমানাকে ডিঙিয়ে আধুনিকতার নির্মাল্য হয়ে উঠেছে’ – পঞ্চাশোত্তর কবিতায় আধুনিকতা ও নাগরিক জীবনবোধের সংযোগ ঘটিয়ে এমন শহীদ কাদরীর (১৯৪২-২০১৬) আত্মপ্রকাশ। ভিন্ন পরিপ্রেক্ষে প্রকৃষ্টরূপে প্রাঞ্জল তাঁর কবিতায়। সমসাময়িক – এ প্রবণতায়, অন্য কেউ তেমন উদ্ভাসিত – এমনটা বলা কঠিন, বিশেষ করে ওইকালে। পুরোদস্ত্তর নাগরিক প্রতিপাদ্য, প্রকাশে আধুনিকতম ও নিঃশর্তরকম নান্দনিকও তিনি। বুদ্ধদেব বসু যেমনটা বলেন : ‘এই ‘জীবনে’ (বা সমাজে) কবির আর স্থান নেই; একা সে, উদ্বাস্ত্ত, স্থিতিহীন; এখন সে সার্থক হ’তে পারে শুধু নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরভাবে প্রতিবার শক্তিকে দাঁড় করিয়ে।’ এ-সত্য শহীদ কাদরীর জীবনানুষঙ্গ। একপ্রকার ক্ষেণ্ণতার কালে কবি আত্মবিবৃতিময় বা আত্মস্বীকারোক্তিপ্রবণ হয়ে তৈরি করেন নবতর ধ্বনিতরঙ্গ। স্মরণে নিই, উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮) – তিনটি কাব্যগ্রন্থ, এবং পরে বেরোয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯)। এর মধ্যে প্রথমটি বইঘর, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এসব লেখা আর গ্রন্থ-প্রকাশ – একপ্রকার ব্যবধান পরিলক্ষে। বলতেই হয় এ-প্রবণতায় নাগরিক স্বরূপে তাঁর প্রসিদ্ধির কথা। কেন এবং কোন অর্থে তিনি নাগরিক? কীভাবে নতুন ও স্বাতন্ত্র্য? শহীদ কাদরী অন্য অনেকের মতো নগরের কবি কিন্তু ভাব প্রকাশে তাঁর টেকনিক পূর্ণ আলাদা। তাঁর কবিতাক্রমে উত্তরণ আছে, নিজের ভেতরের রূপামত্মর ও পরিণতি প্রবলরূপে কায়েমি। প্রাচুর্যময়, পদার্থময়ও। আবেগের সততা ও পরিচ্ছন্ন হৃৎ-অনুভবে কবি স্বয়ম্ভু। প্রথম থেকে  নগরের ব্যস্ত জীবন, নস্টালজিয়া, ক্লিন্নতা, রুগ্ণতা, হীনতা, অবক্ষয় ও শূন্যতার চিত্র সেখানে অন্য প্রবণতায় প্রতিষ্ঠিত। প্রসঙ্গত বলি, ‘বোদলেয়ারীয় প্রেমের আর্তিই তাঁর কবিতায় সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়।’ কিন্তু কেন বোদলেয়ার? ‘য়োরোপের যে-কবিরা, সদ্য আগত যন্ত্রযুগে, সমাজের সঙ্গে কবির বিচ্ছেদ বিষয়ে প্রথম সুতীব্রভাবে সচেতন হন, তাঁদের মধ্যে প্রধান পুরুষ বোদলেয়ার; তাঁর কবিতার মধ্যে প্রতিষ্ঠা পেল আর্টের আধুনিক ধারণা, রূপায়িত হ’লো প্রকৃতির সঙ্গে চিত্তের সেই দ্বন্দ্ব… তাই বোদলেয়ারের কবিতা কৃত্রিমের বন্দনায় মুখর; ভূষণের ধাতু ও রত্নদাম, বসনের রেশম ও সাটিন, সুরা, সুগন্ধ, আর স্বপ্নে দেখা সেই প্যারিস, যেখানে সব উদ্ভিদ লুপ্ত হয়েছে, কোথাও আর তরুপলস্নব নেই, চারিদিকে ছড়ায়ে আছে শুধু ধাতু, পাথর ও প্রদীপ্ত রত্নমণির কারুকার্য, জল পর্যমত্ম তরলিত সোনা, আর কালোর মধ্যেও বহুবর্ণ বিচ্ছুরিত – এই সব চিত্রকল্পের সাহায্যে সবলে প্রত্যাখ্যাত হ’লো প্রকৃতি, ঘোষিত হ’লো প্রতিভার পীড়া, নিঃসঙ্গতা ও মহিমা।’

 

দুই

পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে যখন কবিতাচর্চা; প্রথম কাব্য উত্তরাধিকারে সমুপস্থিত – শহীদ কাদরী, তখন তাঁর পঁচিশ বছর বয়েস, ধারণ করেছেন পূর্ণ শহরকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগের হননকালকে, জিজ্ঞাসাতাড়িত নাগরিক জীবনের ক্লেদ ও অবক্ষয়কে। তবে প্রশ্ন, এসব কোত্থেকে এলো? ষাটে যেন কী এক অবক্ষয়! বিটনিক-হাংরি-স্যাড করে ধু-ধু খাঁ-খাঁ শূন্য হাহাকারে নিপতিত
সব, হতাশায় ডুবে গেল জীবন, অপ্রাপ্তি-উদ্ভটত্ব পেয়ে বসলো – কী হবে এর ভবিষ্যৎ! মকশো করা ছাড়া কী আছে সাহিত্যে, শূন্য-জীবনের আর কী প্রকাশ! প্রেমিক-বিপস্নবী সব তার প্রথাকে ভাঙতে চায়, নতুনের আবাহন এসেছে : ‘জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে’ – যেন চিরাচরিত আর বহুব্যবহৃত উক্তি। তিমিরগ্রস্ত সন্ত্রস্ত চারিদিক, আততায়ী আর বেশ্যা কু-লী পাকিয়ে ঘুরছে রাতের রাসত্মায়, হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বস্ব স্মৃতিকিশোর, বিচ্ছিন্ন কপর্দকশূন্য নঞর্থক কালবেলার কেচ্ছা শোনাচ্ছে সৈনিকদল :

এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা

এবং আমাকে নিষ্কপর্দক, নিষ্ক্রিয়, নঞর্থক

করে রাখে; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা!

কিংবা,

রক্তপাতে, আর্তনাদে, হঠাৎ হত্যায় চঞ্চল কৈশোর-কাল

শেখালে মারণ-মন্ত্র আমার প্রথম পাঠ কি করে যে ভুলি,

গোলাপ-বাগান জুড়ে রক্তে-মাংসে পচেছিল একটি রাঙা বৌ

পাশ্চাত্য কবির (ইউরো-আমেরিকান) প্রতিধ্বনি কি? তবে তা সত্ত্বেও এখানে শহীদ কাদরীর কণ্ঠস্বর আলাদা – ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠেছি নটরাজের মতো।’ সুগভীর নেতিবাচক চেতনা দৃঢ়তর, উন্নিদ্র-উন্মূল-উদ্বাস্ত্ত জীবনের রক্তপাতে প্রলুব্ধ – এক গভীর আঙ্গিকের ভেতর আটকায়, সেটি অভিনবত্বে আকুল, সংকটে ভারগ্রস্ত, উচ্ছ্রিত দুর্মর দ্বিধাহীন আত্মঘাতী বাচনিক অপরূপ পঙ্ক্তিমালায় :

বাঁকা-চোরা টেলিফোন পোল, দোল খাচ্ছে ওই উঁচু

শিখরে আসীন, উড়ে আসা বুড়োসুরো পুরোন সাইনবোর্ড

তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি

কেননা সেপাই, সান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,

পালিয়েছে ভয়ে।

‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’র এসবের আত্মস্থ অমত্মরঙ্গতায় শহীদ কাদরী সন্দিগ্ধ-স্নিগ্ধ। ‘কণ্ঠস্বরে’র আবদুলস্নাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘নিজ দেশে আমরা বহিরাগত। একটা অনিকেত উন্মূল পৃথিবীর আত্মপরিচয়হীন বাসিন্দা। উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের ব্যক্তিগত একাকিত্বের মধ্যে অপচিত। পশ্চিম ইউরোপ আর আমেরিকার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যসর্বস্ব, রুগ্ণ ও অবক্ষয়ী সংস্কৃতির-ধারার খুবই কাছাকাছি এ। এ কারণেই ওইসব সাহিত্যের ঘুণেধরা ও বিকারগ্রস্ত প্রবণতাগুলো এত তাড়াতাড়ি আমাদের অমত্মরঙ্গ হয়ে উঠেছিল।’ ষাটে গোটা সমাজজীবনের পথ এ ‘নতুন আর নষ্টের’ মধ্যে উন্মুক্ত। শহীদ কাদরী এ-বিনষ্টিকে উদ্যাপন করেন, জাগিয়ে তোলেন উত্তেজনা, সমস্ত নষ্ট-অপচয়-অন্ধকার যেন শিল্পিত হয়ে ওঠে। পাপ ও পতনকে পবিত্র করে তোলেন। সেক্ষেত্রে ক্লেদজ কুসুমের শার্ল বোদলেয়ার বা নরকে এক ঋতুর আর্তুর র্যাঁবো তো পরিবেষ্টিত হবেন – এ আর নতুন কি! ‘অগ্রজের উত্তর’ কবিতায় তাঁর স্বীকারোক্তি :

সভয়ে দরোজা খুলি – এইভাবে দেখা পাই তার – মাঝরাতে;

জানি না কোথায় যায়, কী করে, কেমন করে দিনরাত কাটে,

চাকুরিতে মন নেই, সর্বদাই রক্তনেত্র, শোকের পতাকা

মনে হয় ইচ্ছে করে উড়িয়েছে একরাশ চুলের বদলে!

 

না, না, তার কথা আর নয়, সেই

বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো – শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।

প্রথম কাব্যে এরূপ প্রস্ত্ততির পর শহীদ কাদরীর আরো বিসত্মার তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা কাব্যগ্রন্থে। আত্মভাষায়, নগরনিবাসী আখ্যানে – ১৪৪ ধারা, পোস্টার, রেসেত্মারাঁ, ট্যাক্সি, টাইপরাইটার, সেলুন, রেফ্রিজারেটর, রেসকোর্স, পেভমেন্ট প্রভৃতিতে এ-কাব্য পূর্বের চেয়ে ব্যতিক্রম। মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত দেশ, নব-রাষ্ট্রের প্রত্যাশা এখানে প্রদীপ্ত। অভিজ্ঞতায় পেরুনো ষাটের প্রতিরোধী আন্দোলন ও বৈশ্বিক উপাচার, গণঅভ্যুত্থান পূর্বের নিরর্থকতা থেকে প্রত্যাবর্তিত নতুন ভাষা। ‘স্বাধীনতা, তোমার জরায়ু থেকে/ জন্ম নিল নিঃসঙ্গ পার্কের বেঞ্চি’, ‘চকলেট, টফি আর লজেন্সগুলো/ প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে/ কেবল তোমার উঠানে প্রিয়তমা’ – এরূপ অভিবাদনে অর্গল অবমুক্ত। বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিপরীতে শামিত্মর সপক্ষে, জাতিসংঘ কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের উপহাস, সামরিক বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতার দীর্ণতায় শহীদ কাদরী প্রিয়তমাকে অভিবাদন জানান – যাবতীয় শ্রেয়ো-সান্নিধ্য; তারপরে পৌঁছান আরেক উচ্চতায়, নৈঃসঙ্গ্যতায়, মর্মকাতরতায়, অমত্মরঙ্গ এক সংগতিশোভনরূপে। বোহেমিয়ান কবি খুঁজে ফেরেন টিয়ের মুক্তি আর উড়মত্ম পাখির শামিত্ম, পরিতৃপ্ত মাছের অবাধ সাঁতারে। তখন শহীদ কাদরী অগ্রবর্তী টেকনিকে সমকালীন পৃথিবী আর তার বৈরী সভ্যতাকে প্রকৃতিক্ষেত্রে তুলে আনতে সমর্থ হন। তাঁর প্রেরণাদাত্রী বাংলা কবিতার (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী) পাশাপাশি পাশ্চাত্যে এলিয়ট, অডেন, পাউন্ড আছেন, আর বোদলেয়ার-র্যাঁবোর প্রণোদনার বিষয়টি তো আগেই উলেস্নখ করেছি। এ-প্রবণতায় কিছু নমুনা হাজির করা যায় :

(ক) রাষ্ট্র মানেই স্ট্রাইক, মহিলা বন্ধুর সঙ্গে

এনগেজমেন্ট বাতিল

রাষ্ট্র মানেই পররাষ্ট্র নীতি সংক্রামত্ম

ব্যর্থ সেমিনার

(খ) আবাল্য তোমার যে নিসর্গ ছিলো নিদারুণ নির্বিকার,

সুরক্ষে দুর্গের মতন, আমাদের প্রতিরোধে সে হলো সহায়,

বস্ন্যাক আউট অমান্য করে তুমি দিগমেত্ম জ্বেলে দিলে

বিদ্রোহী পূর্ণিমা। আমি সেই পূর্ণিমার আলোয় দেখেছি;

আমরা সবাই ফিরছি আবার নিজস্ব উঠোন পার হ’য়ে

নিজেদের ঘরে।

(গ) সীমামেত্মর ট্রেঞ্চগুলো পাহারা দেবে সারাটা বৎসর

লাল নীল সোনালী মাছ –

ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে,

প্রিয়তমা

ভয় নেই

আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে

যাবে

শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন

‘একুশের স্বীকারোক্তি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার’ কবিতায় কবির বাঙালিচেতনা, ঐতিহ্যিক ধারা বহমান। তবে নগরের চেতনায় এক আধুনিক মাত্রা অর্জন (সেটি পূর্ণায়ত কাব্যচেতনায়) শামসুর রাহমান বা সমসাময়িক অন্যদের থেকে তিনি পৃথক – কাদরীর গৃহীত শব্দের পেছনে অবসাদ-ক্ষয়-বিষাদ-বিচ্ছিন্নতা যা-ই থাক তীক্ষনধীরূপে একামত্ম-অমত্মর্বাসী হয়ে যায় এবং তাতে মধ্যবিত্তের সমস্ত রাগ-বিরাগ বা স্বসিত্ম-শামিত্ম ইমেজে অধিষ্ঠান পায়, ফর্মে তা কখনো পরা-পরিকাঠামোও হয়ে ওঠে :

মাথার উপরে সূর্য

পশ্চিমে হেলান দিয়ে বসে আছেন বাদশার মতো

একটু পরেই রাত,

তারপর জল

তারপর ঠান্ডা করাত দিয়ে ফালি ফালি

কাটবে দুজনকে।

বাংলাদেশের কবিতায় এ-প্রবণতার চিত্রকল্প বা সে নির্দেশিত প্রতিবেশ পৃথিবী পরের কাব্য কোথাও কোনো ক্রন্দন নেইতে শামত্ম শামিত্মর প্রবারণারূপে মূর্তমান। ‘শালিক’, ‘খরগোশ’, ‘টিয়ে’, ‘হরিণ’ রূপকল্পে তাঁর কবিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়, ইতিবাচক বোধ তাতে স্থান নেয়। উন্মূল, বিচ্ছিন্নতার বদলে ফিরতে চান নির্জনতায়, এতে স্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি হয়, ব্যস্ততা থেকে স্বাভাবিকতায় ফেরার আকুতি হয় প্রতিধ্বনিত :

(ক)  আজ সকাল থেকে একজোড়া শালিক

গোয়েন্দার মতো আমার

পেছনে পেছনে ঘুরছে

যেন এভিনিউ পার হয়ে নির্জন সড়কে

পা রাখলেই আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে ঠিক!

(খ)   হরিণ হননকামী ব্যাধের মাংসল মুঠো থেকে ছুটে-যাওয়া

বলস্নমের মতো তোমরা ব্যস্ত

(গ)   সরল গ্রাম্যজন খরগোশ শিকার করে নিপুণ ফিরে আসে

পত্নীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে, চুলস্নীর লাল তাপে

একটি নরম শিশু খরগোশের মাংস দেখে আহ্লাদে লাফায় কাব্যটি কবিজীবন-পরিক্রমার একটি রূপ। পরিপক্ব কবিমেধাই শুধু নয়, এতে পূর্ণ-রুচির লব্ধ উপস্থিতি লক্ষণীয়। প্রাণী-প্রকাশে তার কূলে ফেরা, ঐতিহ্যে ফেরা ইত্যাকার শব্দসম্ভারে তা মানবতার জয়, আশাপ্রদ ও আরো পরে শব্দহীন একাকার ঐকতান। আধুনিকতার

 

একটি চূড়ায় পৌঁছাতে সমর্থ হয় এরূপ বার্তা।

আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও-এ প্রবাস বা নির্বাসন জীবনের মেসেজ। এ কাব্যের বিষয় : মূলের টান, মৃত্যুচিমত্মা, পরবাসীর স্বদেশ আকুতি। আলাপনে তিনি বিচ্ছিন্ন, এলোমেলো, বিক্ষেপ্ত। কবিভাষায় তা রপ্ত। রোমান্টিক প্রবণতায় ‘যে আমাকে জানিয়েছিল বিদায়’, ‘সেদিন দেখেছি তিনটে শালিক যথার্থ দার্শনিকের মতো/ গভীর পরামর্শে বসেছে তোমাদের বাড়ির উঠোনে’ – খুব একটা পরিবর্তন নয়, তবুও প্রেম-বিপস্নবের প্রজ্ঞাসমূহ প্রবল আমত্মরিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। লেনিন-মাও-চে কিংবা সালাম-বরকত অমত্মর্লীন কামনায় অভিব্যঞ্জিত। তবে তাঁর সীমানা সীমিত, অগভীর রোমাঞ্চসম্ভূত, আত্ম-অভীপ্সাব্যঞ্জক। অদ্যকার নগরবাসীর মর্মে তিনি জনপ্রিয়, কাব্যটির ‘একা’ ও ‘স্বগতোক্তি’ কবিতা থেকে :

(১) বাতাসে বাতাসে এখন তীব্র শীত

ভেঙে যায় দেহ

পুরনো বাড়ির ভিত।

বিপাশার তীরে জ্যোৎস্না জোয়ারে তোমাকে দেখেছি ফের,

অথচ আখের

গোছগাছ হ’তে এখনো অনেক দেরি,

তবুও তো চেরি

ফোটে অযত্নে, বেড়ে যায় ঋণ

চক্রবৃদ্ধি হারে

(২) তোর বান্ধবেরা একে একে উঠে গেছে

মসৃণ মিনারে প্রত্যেকের মূল আছে,

শেকড়-বাকড় আছে। তুই, শুধু তুই

তল্পিতল্পা গুটিয়ে কোথায় চললি ফের, বল

নামেই (‘একা’ ও ‘স্বগতোক্তি’) কৌশল ও প্রবণতাটুকু অনুধাবন করা যায়, বাতাসে এখন তীব্র ‘শীত’, শীত বহুবর্ণবিচ্ছুরিত, মহিমা ছড়ানো, বিষাদপূর্ণ। নেতি তবে অজর রোমান্টিক, সসত্মা অযত্নের চেরি। মসৃণ মিনারে বর্ণহীন বিশেষ ব্যঞ্জনার। ষাটের এ-স্পন্দনটিতে অনেকেই বিচরণ করেছেন; কিন্তু শহীদ কাদরীর বোধের ও সৃজনের শক্তি হয়েছে তীব্রতর আলাদা। শব্দ-আধারে এটি লক্ষযোগ্য।

তীক্ষনধী উইটে ও রঙ্গরসে (‘আমি কিছুই কিনবো না’, ‘বিপরীত বিহার’, ‘নিসর্গের নুন’ প্রভৃতি কবিতা) লক্ষ্যভেদ করতে চান কবি। তির্যক, গদ্যপরায়ণ প্রকরণ নির্মিতি পায়; সর্বাত্মক ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ঋজুরেখ দৃষ্টিকোণে। নগর জীবনচেতনায় নিরঙ্কুশ ও সর্বপস্নাবী, বুদ্ধিদীপ্ত, শব্দকুশলী শহীদ কাদরী। আত্মজৈবনিক আচরণে কবিতার বহির্মুখী আদেশ যেন অমত্মরপ্রবাহকে প্রতিষ্ঠা দেয়। আর আধুনিক নাগরিক ক্ষেত্রটি সর্বাতিক্রমী হয়ে ওঠে, দাঁড়ায় দারুণ দৃঢ়তার প্রত্যয়ে।

 

তিন

উত্তরকালে শহীদ কাদরী আমাদের কবিতাধারার অনেককেই প্রভাবিত করেন। স্বতন্ত্র শক্তি জোগান। তাঁর শব্দ যতটা আবেগের তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিস্নাত। বুদ্ধিটুকু অবচেতন-চেতন-অর্ধচেতন বৃত্ত থেকে উৎসারিত। ‘প্রিয়তমা’ ও ‘স্বদেশ’ স্বপ্নজাত মিথপ্রবণ বলয়ে প্রতিভাসিত। এটি উত্তর-উপনিবেশী (post-colonial) চিমত্মাস্রোতে পরিমাপ্য। একইভাবে সমাজ-সচেতনতায় কবি, অপরতার (otherness) বৃত্তে আঘাত করেছেন আত্মবিনষ্টির কারণ অনুসন্ধানে, পুঁজির বিকার-দম্ভ ও উপনিবেশ-আধিপত্য এক ভেল্কি, তাই তাঁর ‘অমনিসেন্ট’ আর্তি (শব্দ) হয়ে উঠেছে কঠোর আক্রামত্মপ্রবণ – ‘মাংসশিকারী একদল হায়নার দাঁতের মতো ধারালো বাতাসে আক্রামত্ম আমি।’ এই তো মনে হয় আমাদের কবিতাধারার প্রধান অভিমুখ।

বর্ণনায় নয়, চিত্রকল্প-চারণে কাব্যচতুষ্টয়ের ১৪২টি কবিতায় নিরঙ্কুশ সীবন-কাঠামোর উদ্যাপন ঘটেছে শহীদ কাদরীর
কবিতায়। এক্ষেত্রে সবরকম শব্দই (ধেই ধেই, সেন্টের শিশি, আইডেনটিটি কার্ডহীন ডানা, টো-টো কোম্পানি) স্বতঃস্ফূর্ত ও অতিক্রমী। এটি আমাদের কবিতায় অতিক্রমণও। যে মূল চেতনাধারায় অটল-অবিসংবাদ। বায়ান্ন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরে চার দশক পর্যমত্ম – মৃত্যুচিমত্মার স্বরও ওই নাগরিক ছন্দে ও উপমান-উপমেয়ের শিল্পত্ব সাবলীলতা পেয়েছে। তাই ‘স্বতন্ত্র শতকের দিকে’তে লিখছেন তিনি :

শতবর্ষ পরমায়ু নয় যে আমার আমি তা জানি। তবু

আমার নিজস্ব শতকের গোধূলির দিকে তোমার মতন

অগ্রসরমান আমিও, এবং সেই সঙ্গে দেখে যাই

অস্তরাগ মানবিকতার।

 

আমাদের মধ্যে যারা, স্বপ্নকরোজ্জ্বল চোখে, পৌঁছে যাবে

নবীন শতকে, তারা কি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমার?

অথবা আমি কি সহোদর তাদের? জানি না। কিন্তু অনবরত

বিদ্যুতে বিদ্যুতে স্বপ্নে স্বপ্নে ঝলসে উঠছে ফলপ্রসূহীন

আমার আকাশ।

প্রশ্ন-পরবর্তী সংশয়হীনতায় ওই অমনিসেন্ট ‘আমি’-ফলপ্রসূহীন। সঙ্গহীনতার খেদ, একত্বের শূন্যতা এই শতকেও বা মৃত্যুপর্যমত্ম যদি বিসত্মার পায় তবে আগের সেই মদ আর আফিমসেবীদের বিশৃঙ্খলা – তাতে মন্দ কী? এ কবিতায় সাম্য, সোভিয়েত বিপর্যয়, বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, কট্টর অভিজ্ঞতা নিজেকে নিঃশব্দ শূন্যতার ভেতরে যেন ঠেলে দিয়ে চলে। সে-কারণেই তাঁর ফিরিয়ে নেওয়া চুম্বনগুলো প্রজন্মামত্মরে পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা থাকে।

 

চার

এসব ক্যাজুয়াল বাকরীতি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কবিতাধারায় আর আড়ষ্ট হয় না। তাই তো অমোঘ আজ্ঞায় পুনরুক্তি করে বলা চলে : ‘শব্দে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, বুদ্ধি ও মসিত্মষ্কই সে শব্দের নির্মাল্য, এলিয়টীয় ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’ প্রবণতায় যুক্ত হয়ে
নির্বাচিত শব্দ-সারাৎসারে, বিশশতকী ইমেজিস্ট ধারায় সেই শব্দে বিদ্রূপ-ব্যঙ্গ-পরিহাস বয়ে আনে নাগরিক সংকোচঘুণ-মস্নান মূল্যবোধ আর ‘মুমূর্ষু স্তনে’র অসুস্থ স্পন্দন।’ তাই তো শহীদ কাদরীর সীবনগুচ্ছ হয়ে ওঠে পর্যাপ্ত প্রকৃত নাগরিক আইডল, যা পরবর্তীালে অন্যদের হাতে সম্প্রসারিত হয় এবং ক্রমবিবর্তন পায় – কিন্তু উৎসশক্তির আখরে তাঁরই চিরঅধিষ্ঠান ঘটে।