শামসুর রাহমানের কবিতায় সময়- চেতনা

লেখক: আবুল হাসনাত

শামসুর রাহমানের ব্যক্তিস্বরূপ ও কবিসত্তা এবং সৃজন-ক্রমবিকাশের ধারা খুবই বিসত্মৃত।

তিনি যখন কবিতা চর্চা ও সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, তখন তিনি সাহিত্যের উৎসাহী পাঠক। তাঁর কবি হয়ে-ওঠা এবং প্রারম্ভ থেকে অমিত্মম যাত্রার যে-বিবর্তন তা খুবই আগ্রহোদ্দীপক। এই বিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ এবং আধুনিক কবিতার বিবর্তনের সঙ্গে সুখপ্রদভাবে সংশিস্নষ্ট। একজন কবির জন্য এ খুবই গৌরবের। এই ক্রমবিবর্তনের ধারা নিয়ে হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর শিক্ষক খান সারওয়ার মুরশিদ, সতীর্থ জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী এবং সখা হাসান হাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশের কবিতা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নানা
ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে সাবালকত্ব অর্জন করেছে। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন এই অঞ্চলের বাঙালিকে স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপিত করেছিল, শিল্প ও সাহিত্যের পথ নির্মাণে এবং ভাষাচেতনায় ও ঐতিহ্যভাবনায় যে ভাষা-আন্দোলন নিঃসন্দেহে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে।

পঞ্চাশের দশকের কবি সংঘের দিকে তাকালে আমরা প্রত্যক্ষ করি, কী প্রচ- অঙ্গীকার নিয়ে তাঁরা বাংলাদেশের কবিতাকে নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছেন! চলিস্নশের দশকের ভাষা ও প্রকরণের বলয়, বিশেষত রূপকল্প ও শব্দচয়ন থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ নবীন এক কাব্যভাষা তাঁরা নির্মাণ করেছেন। প্রথাশাসিত সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই যে সাহিত্যিক অর্জন, এ খুবই তাৎপর্যময় বিষয় বলে পরবর্তীকালে বিবেচিত হয়েছে। তাঁরাই কবিতা ও কথাসাহিত্যে যে-বীজ বপন করেছিলেন তা ফলবান বৃক্ষ হয়ে উঠেছে। প্রকরণ, বিষয়, অভিব্যক্তি, উপমা ও চিত্রকল্পও হয়ে উঠেছিল এঁদের প্রযত্নে সম্পূর্ণ নতুন। তিরিশের কবিতার ভুবনে এই কবি সংঘের অনেকেরই নিমজ্জন হয়েছিল সন্দেহ নেই  এবং যৌবনের ঊষালগ্নে বুদ্ধদেব বসু ও কবিতা পত্রিকা তাঁদের অনেকের কাছে সমীহজাগানিয়া বিষয় হয়ে উঠেছিল। পঞ্চাশের দশকের  বাংলাদেশের কবি সংঘের দুজন কবি কবিতা পত্রিকায় তাঁদের কবিতা প্রকাশের জন্য কীভাবে উন্মুখ ও অধীর হয়ে থাকতেন, সে-প্রসঙ্গে উলেস্নখ করেছেন এবং বুদ্ধদেবের সাহিত্যবোধ ও সাহিত্যরুচি কতভাবে যে তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল স্মৃতিচারণে সে-কথা বলেছেন। আর কবিতাপ্রেমিক বুদ্ধদেব সাহিত্যচৈতন্যে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর হওয়া সত্ত্বেও প্রশ্রয় দিয়ে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে যে-প্রতিমান সৃষ্টি করেছিলেন তা তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছিল সাহিত্যরুচি গঠনেরও এক সোপান। এ-কথাটির সত্যতা আমরা দেখি কবিতা পত্রিকা ও বুদ্ধদেব-রচিত কালের পুতুল গ্রন্থে। তাঁদের কাব্যধর্মে নৈরাশ্য, হতাশা, অন্তর্মুখিনতা, আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা ও মার্কসীয় বীক্ষার স্পন্দন প্রত্যক্ষ করা যায়। সকলেই অভিজ্ঞতা ও পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে তাগিদ উপলব্ধি করেছিলেন এ-অঞ্চলের সাহিত্যচর্চা ও সাধনায় আধুনিকতার বোধ সঞ্চার করতে। 

এই কবি সংঘের মধ্যে নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শামসুর রাহমানও হয়ে উঠেছিলেন পরিণত মনের অধিকারী ও শৈল্পিক গুণান্বিত এক কবি।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ১৯৬০ সালে। পঞ্চাশের দশকে রচিত হয়েছিল এ-গ্রন্থের কবিতাবলি। আজো আমরা মুগ্ধ হয়ে তাঁর এ-কাব্যগ্রন্থ পাঠ করি। অন্তর্মুখিনতা, আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা এ-কাব্যগ্রন্থের প্রধান বিষয় হলেও ১৯৬০ সালেই এই কবিতাবলির মধ্যে এক সম্ভাবনাময় কবিকে শনাক্ত করেন অনেক সমালোচক। বিশেষত হাসান হাফিজুর রহমান ও হায়াৎ মামুদের এ-গ্রন্থ নিয়ে সহৃদয় সমালোচনা আমাদের অভিজ্ঞ করে এবং শামসুর রাহমানের কবিকৃতি ও কাব্যশৈলীর  সম্ভাবনাকে পর্যবেক্ষণ করে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন তাঁরা। এই কাব্যগ্রন্থের ‘রূপালি স্নান’, ‘মনে মনে’, ‘আত্মজীবনীর খসড়া’, ‘কাব্যতত্ত্ব’ ও ‘একান্ত গোলাপে’র পঙ্ক্তি আজো উৎকৃষ্ট কবিতা হিসেবে পঠিত হয়। বাংলাদেশের কবিতার চিদাকাশে এ-কাব্যগ্রন্থ নবীন মাত্রা পেয়ে যায়।

প্রথম কাব্যগ্রন্থেই শামসুর রাহমানের মার্জিত ছন্দ ও চিত্রকল্পের উদ্ভাবন এদেশের কাব্য-আন্দোলনে অনুকূল সাড়া ফেলেছিল। সতীর্থ সৈয়দ শামসুল হক এ-প্রসঙ্গে বলেন, ‘কবিতায় শামসুর রাহমান একজন শামসুর রাহমানই; প্রথমদিকে তাঁর কবিতায় জীবনানন্দের কিছুটা আলো পড়লেও, কখনো তাঁর কবিতায় শেকড় হারায়নি, এই কবিতাগ্রন্থের ‘রূপালি স্নান’, বা ‘তাঁর শয্যার পাশে’ ধরনের ওই সময়ের কয়েকটি কবিতা বাদে – বুদ্ধদেব বসুর কবিতার প্রভাব প্রত্যক্ষ করি বটে; কিন্তু তিনি বাঁক ফেরেন ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের প্রভাবেই। এই বাঁক ফেরার ও বিবর্তনের সঙ্গে শামসুর রাহমান গভীর অনুরাগে ও অঙ্গীকারে জড়িয়ে পড়েন ষাটের দশকের প্রভাবসঞ্চারী আন্দোলনের সঙ্গে; প্রতিদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রত্যক্ষণ ও এই আন্দোলনের অন্তর্নিহিত আবেদন তাঁর কবিসত্তাকে ভিন্নভাবে বিকশিত ও উচ্চ মানে অধিষ্ঠিত করে; তাঁর কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ হয়েছিল এক দশক আগে। তিনি ছিলেন নিম্নস্বরের মৃদু উচ্চারিত নৈঃসঙ্গ্যপীড়িত কবি, এই আন্দোলনে দুর্মর চেতনা নির্মীয়মাণ প্রয়াসে নবীন ভূখ– অভ্যুদয় ও বাঙালি সমাজের স্বপ্ন-আকাঙক্ষার নবীন প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এ অনুধাবনে আমাদের এতটুকু দ্বিধা হয় না। এই সময়ে যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন তাঁরা সকলে জানেন কীভাবে তাঁর সময়চেতনা ও দেশচেতনা নিরালোকে দিব্যরথে, নিজ বাসভূমে গ্রন্থে প্রকীর্ণ হয়ে আছে। বিষ্ণু দে-কে খুব শ্রদ্ধেয় মনে হয় তাঁর
সময়-চেতনায়। এই চেতনারই প্রসার দেখতে পাই পরবর্তী কাব্যগ্রন্থাবলিতে।’ একই সময়ে বিষ্ণু দে এবং তাঁকে ঘিরে সাহিত্যপত্র পত্রিকা মার্কসীয় বীক্ষায় যে-আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং জনজীবনের সঙ্গে সাহিত্যের নিবিড় সংযোগের যে-প্রয়াস গ্রহণ করেছিল তা হয়ে ওঠে শামসুর রাহমানের জন্য ফলপ্রসূ।

ষাটের দশক থেকে মানুষের সংগ্রামী-চেতনা যে-পরিপ্রেক্ষিতে ঋদ্ধ হয়েছে, তারই যেন আশ্চর্য রূপকার হয়ে ওঠেন শামসুর রাহমান। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে নিরালোকে দিব্যরথে পৌঁছতে সময় লেগেছিল আট বছর। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ রৌদ্র করোটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে; প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের চারিত্রের দিক থেকে সাদৃশ্য আছে। বিধ্বস্ত নীলিমা তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলো ১৯৬৭ সালে। এই কাব্যগ্রন্থেও অবশ্য উপলব্ধি করা যায় তিনি বাঁক ফেরার জন্য প্রস্ত্তত। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে নিরালোকে দিব্যরথে পৌঁছতে সময় লেগেছিল আট বছর। এই সময়ে তিনি অনুবাদ করেছেন রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা। বিশেষত নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮) কাব্যগ্রন্থে তাঁর মানবিক চেতনা প্রখর রূপ নিয়ে উন্মোচিত হয়েছিল। এতদিন তিনি ছিলেন মৃদুকণ্ঠ। এই কাব্যগ্রন্থ থেকেই তিনি বোধকরি প্রবল এক অঙ্গীকার নিয়ে জীবনানন্দীয় ছায়া ও বোধ থেকে বাঁক ফিরলেন। নিম্নকণ্ঠের খোলস ও নিসর্গচেতনা ভেঙে যেন বেরিয়ে এলেন বৃহত্তর জগৎ-সংসারে।

তাঁর পঠন-পাঠনের দিগন্ত ছিল বিসত্মৃত ও ব্যাপক। ছাত্রজীবন থেকেই শুরু হয়েছিল বিশ্বের কবিকৃতি সম্পর্কে আগ্রহ। ঢাকায় বই পাওয়া যেত না তখন ঠিকই, কিন্তু কৌতূহল ও আগ্রহ থাকায় রুচিশীল বই সংগ্রহে কোনো অসুবিধা হয়নি তাঁর। তিরিশের কবিতারও তিনি ছিলেন অনুরাগী পাঠক – এ-কথা আগেই বলেছি।

এছাড়া চলিস্নশ ও পঞ্চাশের দশকের কবিতায় গণমানুষের জীবনসংগ্রাম যেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল সে-সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন এবং ছন্দ, শৈলী ও প্রকরণে যে নিত্যনতুন উদ্ভাবন হচ্ছিল তা তাঁর মনোজগৎকে আলোড়িত করেছিল। তিরিশের
কবিতা-ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেও বাংলা কবিতার দিগন্তে চলিস্নশ ও পঞ্চাশের নব-উদ্ভাসনে নবীন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। পাশ্চাত্যের কাব্যাঙ্গনে তখন যে শৈল্পিক ও প্রতিবাদী সুষমার নবীন বীজ রোপিত হয়েছিল সে-সম্পর্কেও শামসুর রাহমান খুবই আগ্রহী ছিলেন।

শামসুর রাহমান-লিখিত কাব্যগ্রন্থ নিজ বাসভূমে বন্ধু মুর্তজা বশীরের প্রচ্ছদে বের হলো ফেব্রম্নয়ারি ১৯৭০ সালে। এই কাব্যগ্রন্থ এদেশের বিপন্ন মানুষ, তরুণ ও যুবাদের স্বপ্ন-আকাঙক্ষার দলিল হয়ে উঠল। চেনা শামসুর রাহমান এই কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে গণমানুষের স্বপ্ন-আকাঙক্ষার রূপকার হয়ে উঠলেন। তাঁর সৃজনে স্বদেশচেতনার ভিন্ন আলোক আমাদের মানসচেতনাকে প্রখর করে তুলেছিল।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি ছিল প্রবলভাবে উত্তাল। প্রতিদিনই যুব সমাজের মিছিলে ধ্বনিত হয়েছে সামরিক শাসনবিরোধী সেস্নাগান। ২০ ও ২৪ জানুয়ারি বামপন্থি আসাদুজ্জামান ও কিশোর মতিউর রহমানকে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। ওইদিনই আসাদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট নিয়ে মিছিল করে ছাত্রজনতা। শামসুর রাহমানের হৃদয়মনে এই মিছিলটি প্রবলভাবে ছুঁয়ে যায়। আসাদের এই শার্ট নিয়ে তিনি লিখলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। আসাদ-মতিউরের এই আত্মাহুতি, সরকারি নির্যাতন ও দমননীতির প্রতিবাদে ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা শহর। সমগ্র শহরে প্রতিবাদে ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটিতে সেদিনটির প্রতিবাদ নানাভাবে রূপায়িত হয়েছে। ‘আসাদের শার্টে’র সঙ্গে এ-সময়টি তাঁর কবিতায় প্রবল প্রতিবাদী-চেতনা নিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।  গণঅভ্যুত্থানের পরই এলো একুশে ফেব্রম্নয়ারি উদ্যাপন। এই সময়ে রচিত তাঁর কয়েকটি কবিতাও সময়চেতনার দিক থেকে ঐতিহাসিক মূল্য পেয়েছে। কী অসাধারণ সব পঙ্ক্তি, যা উদ্দীপিত করেছিল সংগ্রামরত ছাত্র ও জনতাকে। সংগ্রাম ও কবিতা সমার্থক হয়ে-ওঠা বাংলা কবিতার পথযাত্রায় এক দায়ই বহন করেছে।

নিজ বাসভূমে গ্রন্থভুক্ত ’৬৯-এ রচিত তিনটি কবিতা আমাদের হৃদয়ে অমোচনীয় হয়ে আছে – ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ফেব্রম্নয়ারি, ১৯৬৯ ও ‘পুলিশ রিপোর্ট’ নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬৯ সালের  ছাত্র ও  রাজনৈতিক আন্দোলন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরশাসককে উৎখাতের জন্য অদম্য হয়ে যে-প্রণোদনা সঞ্চার করেছিল, শামসুর রাহমানের কবিতাবলিতে তা উজ্জ্বল হয়ে ধরা আছে। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা অনুভূতিপ্রবণ শিল্পিত মানুষ হিসেবে শামসুর রাহমানকে বিচলিত করেছিল। তাঁর বাসভবনের সন্নিকটে ২৭ মার্চ নয়াবাজারকে অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। এ নিয়ে তাঁর রচিত কবিতা পাকিস্তানি নির্মমতার এক দলিল। এ-সময় তাঁকে অনিশ্চয়তা তাড়া করেছে। শহরের আবাস ছেড়ে তিনি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে আশ্রয়ের সন্ধান করতে হয়েছে তাঁকে। তবু বেঁচে থাকার আর্তি ও যুদ্ধজয়ের সম্ভাবনা তাঁর ভেতর অমিত শক্তি সঞ্চার করেছিল। কিন্তু অনিশ্চয়তা, বিপন্নতা ও শহরের আবাস ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও কবিতা রচনা করেছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতার বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধদিনগুলোতে রচিত কবিতায় তার প্রকাশ আছে। পাবলো নেরুদা, পল অ্যালুয়ার কিংবা লুই আঁরাগর প্রভাব থাকলেও তিনিই একমাত্র কবি যাঁর সৃজনবোধের গভীরে যুদ্ধদিনের অসহায়তা, পাকিস্তানিদের নির্মমতা গভীর অনুষঙ্গ নিয়ে পাঠকের হৃদয়ে অমোচনীয়ভাবে উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়েছিল। এই কবিতাগুলো হয়ে উঠেছিল মানবিকবোধের প্রকাশে আশ্চর্য আলেখ্য। মানুষের অসহায়তা, দুঃখ, যাতনা ও আকাঙ্ক্ষার সম্মিলনে তাঁর কবিতা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর জীবনচেতনাকে ধরে রেখেছে। যুদ্ধজয়ের অনিবার্য প্রেরণা এবং তাড়না তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে অসাধারণ সব পঙ্ক্তি রচনায়। এই প্রেরণা ও তাড়না শামসুর রাহমানকে মহত্তর ও শ্রেয়তর এক জীবন-ধারণায় নিয়ে গেছে। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২-এ প্রকাশিত হলো বন্দী শিবির থেকে, ১৯৭৩-এ দুঃসময়ের মুখোমুখি, ১৯৭৪-এ ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭৪-এ আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি। এই কয়টি কাব্যগ্রন্থ হয়ে উঠল যুদ্ধদিনের অসামান্য দিনলিপি। অন্যদিকে যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনের বিশেষত আশা-নিরাশা ও স্বপ্ন-আকাঙক্ষার নানা অনুষঙ্গও প্রতিফলিত হলো। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিতায় সর্বাধিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল সেই সময়ে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনিই বোধকরি সর্বাধিক সার্থক কবিতা রচনা করেছেন। গণহত্যা ও যুদ্ধজয়ের আকুলতা তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে।

জীবদ্দশায় তিনিই বোধকরি বাংলাদেশের একমাত্র কবি, যিনি জাতীয় সংকটকালে সর্বাপেক্ষা আন্দোলিত ও স্পন্দিত হতেন। মানুষের মর্মবেদনা ও মর্মযাতনার শৈল্পিক রূপায়ণে তিনি সিদ্ধহস্ত হয়েছিলেন। তিনি এমন এক কবি, যিনি উচ্চারণ করেছিলেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ – এই বোধ ও উচ্চারণ থেকে প্রতীয়মান হয়েছে তাঁর অনুধাবনে সমাজের সংকট ও স্বরূপ কত তীব্র হয়ে হৃদয়ে বেজে উঠত।

বিশেষত এরশাদের শাসনামলে স্বৈরশাসকবিরোধী গণআন্দোলনে শামসুর রাহমানের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁর সৃজনে নবীন মাত্রা সঞ্চারিত করেছিল। এই দশকের কবিতায় মানুষের জীবন সংগ্রাম এবং ছাত্র ও গণমানুষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম ভিন্ন ভাষায় কখনো প্রতীকে কখনো ভিন্ন ব্যঞ্জনায় রূপায়িত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা ভেবেছিলাম, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ও ভেদ উচ্ছেদ হয়েছে; কিন্তু এ উচ্ছেদ তো হয়নি; বরং ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সমাজদেহ কতভাবে যে কলুষিত করছে তার সীমা-পরিসীমা নেই। সেজন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হয়েছিল। দৈনিক বাংলার সম্পাদক পদ ছাড়তে হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও মানুষের মঙ্গল চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার মধ্যে একজন কবির অঙ্গীকার পরবর্তী প্রজন্মকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। দেশের একজন শীর্ষ কবি হিসেবে এই অর্জন খুবই তাৎপর্যময়।

আমরা সকলে জানি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের ভাষা, নির্মিতি ও বোধ পালটে গিয়েছিল নিরালোকে দিব্যরথে এসে। তারপর তাঁর কবিতা শিল্পিত হয়ে উঠল মানুষের দুঃখ-বেদনাকে কেন্দ্র করে। ভাষা ও অভিব্যক্তি হয়ে পড়েছিল জীবনলগ্ন, অন্যদিকে দেশ-আত্মার সংকট উপলব্ধি শামসুর রাহমানের দেশচেতনাকে প্রখর করে তুলেছিল। এক্ষেত্রে তিনি বোধকরি অনন্য। এসব সত্ত্বেও কোনোদিনই তাঁর কবিতা উচ্চকণ্ঠ ও সেস্নাগানধর্মী হয়নি। পরিশেষে একটি কথা প্রসঙ্গত উলেস্নখ করতে চাই। বর্তমানে সমাজজীবনে যে-সংকট, সাম্প্রদায়িকতার ও মৌলবাদের যে-উত্থান ষড়যন্ত্র ও আস্ফালন – এই সময়ে তাঁর অভাব আমরা খুবই অনুভব করি।  অনেক বিরূপতার মধ্যে তিনিই তো লিখেছিলেন ‘সুদর্শন যাবে না’র মতো কবিতা। আমরা এই ধরনের সংকটকালে তাঁকে বিনিদ্র রাত্রি যাপন ও অস্থির হয়েও প্রতিবাদী হতে দেখেছি। এই প্রতিবাদ তাঁর কাব্যধর্মে ও সৃজনেও ছাপ ফেলেছিল। সেজন্য আজ তাঁকে, তাঁর অঙ্গীকারকে, তাঁর কাব্যচেতনাকে খুব মনে পড়ে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: