শেষ ট্রেন

লেখক: বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

আমি বৃষ্টির কথা ভাবি : বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টি অনেকটা দুঃখের মতো আমাকে জড়িয়ে রাখে। আমি বৃষ্টির কথা ভাবতে ভাবতে দুঃখের কথা ভাবতে থাকি। দিনগুলো বদলে যায়, বদলায় না দুঃখ। অজ্ঞতার চেয়ে বেশি অন্ধকার কোথাও নেই। শেক্সপিয়র থেকে শিখেছি। হয়তো দুঃখের বদল হয় না। যে-দিনগুলো হারিয়ে যায় সেই দিনগুলোই বেঁচে থাকে। মানুষ খারাপ কাজ করে, সেগুলোকে ঢেকে রাখে আলখাল্লা পরা মানুষরা। নিজের থেকে নিজেকে শেকড় থেকে উচ্ছেদ করতে পারি না। এখানেই আমার পরাজয়। আমার বয়স বাড়ে, আমার ভালোবাসার বয়স বাড়ে না। তোমাকে বিদায় বলি : বিদায় বিদায়।

আমি বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকি, আর নিজেকে শুনিয়ে বলি : বিদায় বিদায়।

 

দুই

টবরমারির দিকে তাকিয়ে উত্তরের দিকে তাকিয়ে থাকি। টবরমারি হচ্ছে কানাডার উত্তর সীমান্ত। এই সীমান্তের শেষ বলে কিছু নেই। শূন্য এবং শূন্য। শূন্যের শেষ বলে কিছু আছে কি? কে এই প্রশ্নের জবাব দেবে, কেউ কি এই শূন্যের জবাব জানে? টবরমারি আমাকে শূন্য করে দেয়।

আমি শূন্যের দিকে তাকিয়ে শূন্য হয়ে যাই। ইচ্ছে করে শূন্যের দিকে সাঁতরে যাই। কিন্তু সে তো সম্ভব নয়।

টবরমারি একটি ল্যান্ডস্কেপ, এই ল্যান্ডস্কেপ তুমি ভালোবাস! এই ভালোবাসা অন্তহীন। যেদিন প্রথম জিনকে নিয়ে শুয়েছ তেমন একটা বোধ তোমাকে জড়িয়ে ধরে। চারপাশে ফিসফিস বাতাস, চারপাশে শৈশব, চারপাশে পাহাড়, পাহাড়ের দিকে তাকানো শেষ হয় না, এভাবে একটা জায়গার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাও। টবরমারি খুব সম্ভব একটা হাহাকার।

জিন জানে তোমার দেখার ধরন, কী করে একটা জায়গায় তুমি পৌঁছে যাও, তোমার বুকের মধ্যে একটা একটা জায়গা করে নেওয়া। জিন জানে কী করে বদলাতে হয়। এইটে একটা অনুভূতি, বারবার বদলাবার অনুভূতি। উত্তর সাগর কিংবা টবরমারির হাহাকারের দিকে তাকিয়ে চারপাশের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে খুঁজতে থাকা। আমি খুঁজি, তোমাকে খুঁজি। টবরমারির হাহাকার নিজের হাহাকার করে তুলি।

 

তিন

কখনো কখনো মনে হয় টবরমারি একটা চিৎকার। এই চিৎকার চারদিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে কী আছে, কে জানে। এখানে, এই শূন্যের ভেতর আমি আর জিন, শেষ চিৎকার শুনতে থাকি। ওই চিৎকার হয়তো সুন্দর, দুহাতের মুঠোয় এই সুন্দরকে ধরে নিয়ে সামনের দিকে এগোনো যায়। তারপর কোথায় পৌঁছব। আমি এসব ভাবি। আমি একটা জবাব চাই। জিন, তুমি কি জবাবটা জানো?

আসলে আমি এই শূন্যের মধ্যে একটা ঘর চাই, জিন তোমাকে নিয়ে এখানে থাকতে চাই।

 

চার

আমার ও জিনের বেডরুমে এখন সন্ধ্যা ঘিরে ধরবে, আমি জানালা খুলে দেবো বৃষ্টির দিকে, ছাদ কালো অথচ জ্বলজ্বলে, তুমি একমুঠো সূর্যের আলো। এই বৃষ্টিভেজা অন্ধকার, অপ্রত্যাশিত শেষ আলো, অন্ধকারে সব ডুবে যাবার আগে, একটা শরীরের খিদে জাগে, এই খিদেটা শহরের সঙ্গে জড়ানো। বড়ো একটা শহর, বুঝিবা লন্ডন, চেনাজানা রাস্তাঘাট, চেনাজানা শরীর, যে-শরীরের দিকে আমি চেয়ে আছি। আমি চিৎকার করে বলি, তুমি চিৎকার করে বলো : এখানে, এই বিরান জায়গায়, বাচ্চাদের এনো না রাত নটার পর। জিন, তোমার শরীর কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে।

গাড়ি ছেড়ে ট্রেনে উঠে বসি। আর ট্রেন গুমগুম করে ছুটছে উত্তরের শূন্যের দিকে। আমাদের ঘিরে ধরে বিষণ্ণতা। আমি তোমার হাত নিজের হাতের ভেতর ভরে নিই। বিষণ্ণতা, বিষণ্ণতা।

 

পাঁচ

বিষণ্ণতার কথা তোমাকে বলি। বিষণ্ণতার দিকে ট্রেন ছুটছে, বিরামহীন। আমি বলতে চাচ্ছি, একটা ভবন এবং একটা ভবন ঘিরে স্পেস আমাদের সাহায্য করে বেঁচে থাকতে। এ নিয়ে কথা বলার কী আছে, কী কী শব্দ ব্যবহার করা যায়। একটা ঘটনা এবং একটা ঘটনা তৈরি করার মধ্যে কোনো তফাৎ আছে কি। জানি না। একটা রাস্তা, একটা বন, একটা মোড়, আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে। আমি এখন একটা বিরাট ভবনের সামনে এসে দাঁড়াই, ভবনটা ঘিরে বিভিন্ন মোড়, আমার মনে হয় এখান থেকে বার হতে পারব না, আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া গত্যন্তর কী।

বিষণ্ণতার কথা বলি। ট্রেন ছুটছে বিষণ্ণতার দিকে; বিষণ্ণতার শেষ স্টেশন টবরমারি, শেষ স্টেশনে নেমে যাব, তারপর ইঞ্জিন ঘুরে যাবে। আমি হয়তো বাড়ির কাছেই, তোমাকে দেখা যাচ্ছে, কাপড় উড়িয়ে আমাকে ডাকছ। আমার বিষণ্ণতা আমাকে ঘিরে। আমার স্ত্রী বলেই তুমি শেষ ট্রেনে আমার সঙ্গে থাকো। ভালোবাসা আছে বলেই আমরা শেষ ট্রেনে সবসময় একসঙ্গে থাকি।

খুব সম্ভব কালেকটিভ ডেড বলে কিছু আছে। প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি জন্মানো; প্রতিটি জন্মানো প্রতিটি মৃত্যু এক একটা মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে চলে।

তখন কথা বলার কিছু থাকে না।

 

ছয়

আমি কত মধ্যরাত্রে দরজা খুলে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। টবরমারি হাতছানি দিয়ে ডাকে।

অতীত বদলায় না, কিংবা আমাদের প্রয়োজন-ও না। যা বদলায় সে হচ্ছে আমাদের দেখবার ধরন।

আমি তোমাকে ডিসটার্ব করতে চাই না। ডিসটার্ব করে লাভ কী। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ কী। হয়তো মৃত্যুর, হয়তো জন্মানোর অর্থ খোঁজার চেষ্টা। যেন শহরের মধ্যে শহর, দিন-রাত্রির মধ্যে দিনরাত্রি। টবরমারির দিকে যাত্রা, আগের রাত্রের তুষার ঝেড়ে ফেলা, আগের রাত্রের বৃষ্টি ঝেড়ে ফেলা।

শেষ পর্যন্ত কিছুই ঝেড়ে ফেলতে পারি না।

 

সাত

টবরমারির কথা আমাকে বলেছ তুমি। হ্যাঁ তুমি। এই কফিশপে আমি প্রায়ই কফি খেতে আসি। সেই সূত্রে আলাপ।

তুমি এখানে প্রায়ই আসো।

হ্যাঁ।

কেন?

সব কেন-র কি জবাব আছে।

তা নেই।

জায়গাটা তোমার পছন্দ?

হ্যাঁ।

তাহলেই তো সব ঠিক হলো।

মানে?

তোমার পছন্দ আর আমার পছন্দ একটাই।

হয়তো তাই।

 

একদিন দুপুরের লাঞ্চ করার পর চুপচাপ বসে আছি। তুমি হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকো।

চলো।

কোথায়?

টবরমারি।

সে তো অনেক দূর।

সেখানেই যাচ্ছি।

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চোখে তাগিদ, এখানে না থাকার ইচ্ছা। আমাদের যেতে হবে বহুদূর। তুমি কি বোঝ না : সবকিছু মেলানো-মেশানো, ইতিহাস হঠাৎ করে জ্বলজ্বল করে ওঠে, যেমন সব দূরত্ব ছাড়িয়ে টবরমারি। টবরমারির পরে কিছু নেই। তোমার হাত ধরে সকল দূরত্ব পেরিয়ে সেখানে যাব।

তুমি বলতে চাও : ভালোবাসা, সবসময় অন্য কিছুতে বদলে যায়, যেমন তিক্ততা, আকুতি, হিংসা। হয়তো একটা ভালো শব্দ আছে, তার খোঁজ জানি না।

আমি আসেত্ম করে বলি, শব্দ হয়তো একটি নৈতিক প্রশ্ন, শব্দের অন্য অর্থ আছে, শব্দ হচ্ছে নমিত উচ্চারণ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, এ-কথাটা বলা।

আমি ঠোঁটের মধ্যে কথাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আমার হাসবেন্ড বলে কোনো-একজন কখনো ছিল। এখন নেই। কিংবা দরকার নেই।

আমি বলি : আমি বিয়েই করিনি।

তাহলে তো ভালোই হলো।

আমি তোমার সঙ্গে থাকব, যতদিন থাকা যায়। সেজন্যই তো টবরমারি যাওয়া।

গাড়িতে যা যা নেওয়া সব তুলে নিয়ে যাত্রা করা।

তুমি অর্ধেক পথ গাড়ি চালাবে। বাকি অর্ধেক আমি।

আমি চুপ করে থাকি। এ যেন অনন্ত যাত্রা। ভালোবাসার অন্য নাম কি অনন্ত যাত্রা?

 

আট

টবরমারির দিকে মোড় নিতে একটা সেমিটারি দেখা দেয়। এপ্রিলের ঠান্ডার দিন। একটা জোর বাতাস চার্চ এবং গ্রেভইয়ার্ডের মধ্যকার লম্বা ঘাসগুলো মুড়িয়ে মুড়িয়ে দেয়। তুমি হঠাৎ করে গাড়ি থামাও, গাড়ি থেকে নেমে তিনটে স্টোনের সামনে দাঁড়াও। এই প্রথম একটা মার্কারের সামনে নিজকে দাঁড় করাও তুমি : কয়েকটা শব্দ, যে-মেয়ে তোমার সঙ্গে গেছে, কয়েকটা শব্দে একটা তারিখ।

কাদামাটিতে তুমি বসে পড়ো। তোমার প্রথম বাগান। তোমার প্রথম বাগান হচ্ছে কবর। তুমি চোখ বুজে ঘুমিয়ে যাও। তুমি সেমিটারি ছেড়ে ওপরে উঠে আসো। আমার চোখে পানি : এবার তুমি নিজের জন্য কাঁদো।

এই বোধহয় শেষ ট্রেন যাত্রা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: