মালিবাগ লেভেল ক্রসিং থেকে সোহাগের ডাবল ডেকার কোচ সকাল ৭টায় ছাড়ার কথা। টিকিটে এমন কথা লেখা থাকলেও সময়মতো বাস ছাড়েনা। কোনো কারণে পথের দেরি তো হিসাবের বাইরেই থাকে, মানুষ মেনে নেয়। এছাড়া লোকাল বাসের মতো লাক্সারি বাসগুলিও দেরিতে ছাড়াটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল, সময় ঠিক রাখাটা নয়। ফলে হিসাব কষে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে কোনো বাসযাত্রীর জীবনের আলোকিত দিন যে রাতের আঁধারে মোড় নিতে পারে, এমন ভাবার মতো কাণ্ডজ্ঞান আমাদের মগজ থেকে যেন নেই হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার প্রায়ই যাওয়া-আসায় আমার অভিজ্ঞতা এমনই বলে। তবু মন্দের ভালো, সোহাগ এসি বাসটি সোহাগী আদরে আলসেমি ঝেড়ে ফেলে বিশ মিনিট দেরিতে গজগমনে কাউন্টার ছাড়লো একসময়। নিরিবিলি জলের ওপর দিয়ে রাজহংসী কোচ মৃদুমন্দ বাতাসের দোলায় সকালের আলোয় হেলেদুলে চললো।

 কে কী ভাবে জানি না, ভেতরে বসে থেকে আমার কাছে মনে হয়, সুদৃশ্য এই বাসগুলির চলন অনেকটা যেন পোয়াতি নারীর মতো। বাইরে চাকার ওপর গতি থাকলেও ভেতরে তেমন মনে হয় না। ভারী, ঝাঁকুনি কম। ওদের চলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নরম গদিতে হেলান দিলে ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরও ঝিমুনি আসবে সন্দেহ নেই। সেদিন সকালের দৈনিক পত্রিকায় চোখ বোলানো শেষ হলে দেখলাম, গাড়ি কাঁচপুর ব্রিজ থেকে ঢালে নামছে। চোখের পাতাজোড়া চাইছে একটু ঘুমিয়ে নিতে। অ্যাটেনডেন্টের কাছ থেকে একটা কম্বল চেয়ে নিয়ে সেটার হালকা ওম নিতে নিতে আরামে চোখ বুজলাম।

 কতক্ষণ ঘুমিয়েছি বোঝার জন্য ঘড়ি দেখতে হলো না, তীব্র ব্রেক কষা ও হর্নের আওয়াজে প্রায় সব যাত্রীর ঘুম, আলসেমি ভেঙে গেল আচমকা। আমরা কেউ বুঝতে পারছিলাম না, কী হয়েছে। সবাই যার যার, নিজের জায়গা থেকে সামনের দিকে উঁকি মেরে বাস থামার কারণ বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু নিচতলা থেকে কয়েকটি উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা ছাড়া ওপরে আর কিছুই বোঝা গেল না।

সচরাচর যা হয়, বাস আবার চলবে মনে করে দোতলার কেউ উঠে গিয়ে কারণ জানার আগ্রহ প্রকাশ করলো না, আটাশ কি তিরিশের একজন সুদর্শন যুবক বাদে। ইতোমধ্যে বাসটি থামার পর মিনিট পাঁচেক হয়ে গেছে, শুনতে পাচ্ছি, আমাদের বাস ড্রাইভারের চেঁচামেচি আর আশপাশের কিছু লোকের হইচই কমছেই না, বরং বাড়ছে। শীতাতপের ভারী শীতল বাতাসের ফাঁক গলে আমাদের কানে চেঁচামেচি ক্রমশ ঘোলাটে হতে থাকলে আমাদের কারোরই বুঝতে বাকি থাকলো না, ব্যাপার গুরুতর। বিষয়টি আন্দাজ করে সবচেয়ে আগে সাঁই করে আমার পাশের সিট থেকে উঠে নিচের দিকে ছুটলো, বলেছি, ওই যুবক ছেলেটি। জানি আমি, এই বয়সের ছেলেদের কৌতূহল তো আছেই, সেইসঙ্গে যে-কোনো ঘটনায় তাদের অংশগ্রহণ থাকে সবার আগে। ওর দেখাদেখি আমরাও কজন বাস থেমে যাওয়ার কারণ জানার জন্য সিঁড়ি ভেঙে অগত্যা নিচে নেমে এলাম।

হাইওয়ের ওপরে সিলেট রোডের তেমাথা থেকে মাইলখানেক এগিয়ে এসে একটা পেট্রোল পাম্পের সামনে আমরা থমকে আছি। আমাদের বাস যেখানে থেমে আছে তার থেকে হাত দশেক দূরে একটা টয়োটা করোলা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটির পেছন দিক ভারী কিছুর ধাক্কায় দোমড়ানো-মোচড়ানো। আমাদের ঝকঝকে দোতলা সোহাগ যানটিও দেখলাম অক্ষত নেই। ওর পেলব যুবতী শরীরের সামনের দিকের বাঁ-পাশ ওই প্রাইভেটকারটির সঙ্গে গুঁতা খেয়ে একজন মুষ্টিযোদ্ধার বোঁচা নাকের মতো হয়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে একে দুর্ঘটনাই বলতে হবে। তবে মারাত্মক নয়। কেউ হতাহত হয়নি। এটা দেখে অদৃষ্টবাদীরা হয়তো বলবেন, মারাত্মক হতে পারতো। আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। 

একটা জটলার মাঝখানে যুবকটি দাঁড়ানো। সেখানে ফোনে মালিকের সঙ্গে গলায় জোর ঢেলে আলাপ করছে ড্রাইভার। সে ফুরসত পেলে জিজ্ঞেস করে জানলাম, অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা রঙের টয়োটা করোলা গাড়িটি, যার পেছনের অংশ আমাদের বিশালদেহী বাসটির ধাক্কায় ভেতরে ঢুকে গিয়ে বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেছে, সেটি কোনো কারণে অকস্মাৎ ব্রেক কষাতে আমাদের বাস সামলে উঠতে উঠতে গিয়ে ধাক্কা দিয়েছে। ইচ্ছাকৃত নয়। সোহাগের বাস ড্রাইভার দুই হাতের তালু চিৎ করে ঠোঁট বাঁকিয়ে লোকের দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, তার কোনো দোষ নেই। প্রাইভেটকারের ড্রাইভার যদি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ ব্রেক না কষতো, তাহলে ধাক্কা লাগতো না। বললো সে, – আমারও তো ক্ষতি কম না। নতুন গাড়ি, বাঁদিকের চেসিস কেমুন থেঁতলাইয়া গেছে। দেখেন!

সোহাগের ড্রাইভারকে সায় দিয়ে মাথা নেড়ে আমরা ওর কথায় সোহাগ দেখাতেই টয়োটার ড্রাইভার আমাদের দিকে এগিয়ে এলো ত্রস্তব্যস্ত হয়ে কৈফিয়ত দিতে। কথায় তার বাড়ি চট্টগ্রাম না নোয়াখালী বোঝা গেল না। দাড়ি টুপি পাঞ্জাবি-পাজামা শোভিত হুজুর টাইপের একটা চেহারা। বেশ চটপটে। কথা বলার সময় দুই হাত তার অভিব্যক্তি অনুসরণ করে। দুই পায়ের পাতাও সেই সঙ্গে জায়গা বদল করে আশপাশে। তবে ভঙ্গিটা মারমুখী নয়। সহনীয়। কমনীয়। তার ভাষায় সে বললো, – ব্রেক না করি আঁই কী কইত্যাম? মাইনষের লাহান বেদিশা কুত্তা একটা রাস্তা পার হইবার লাইগছে আঁর গাড়ির সামনে দি। ন থামাইলে কুত্তারে মারি ফালান পরের। তো ইতারে বাঁচাইবার লাই আঁর ব্রেক করন পইজ্জে। ব্রেক কইজ্জি তো সোহাগের ড্রাইভার আঁর পাছাত মারি দিয়ের। আই মানবিক ন অইলে কুত্তারে মারি দিতাম। কইলাম, আঁরে ক্ষতিপূরণ ন দিলে ইতারে আই যাইতে দিতাম ন।

ঠিক কথা। মানুষ বাঁচালে যদি মানবিক হয় তাহলে পশু বাঁচাতে গেলেও তাই হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ঘটনার সমাধান তো আবেগ দিয়ে হবে না। এর জন্য আইন-আদালত আছে। দুই ড্রাইভারই আমাদের সাক্ষী মানাতে আমরা বিপাকে না পড়ে ঘটনাস্থল থেকে বুদ্ধিমানের মতো দূরে সরে এলাম। এই অবস্থায় যা হয়, তাই হতে লাগলো। আশেপাশে নানা কিসিমের মানুষ জমা হয়ে দুই পক্ষের তর্কাতর্কি, সমাধানের অছিলায় মধ্যস্থতার চেষ্টা, কথার প্যাঁচাল চলতেই লাগলো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো না সহজে এর মিটমাট হবে। দুই ড্রাইভার নিজ নিজ বোঝা হালকা করার উদ্দেশ্যে মোবাইলে এদিক-ওদিক ফোন করতে লাগলো। ঘণ্টাখানেকের মাথায় স্থানীয় শুভাকাক্সক্ষী একজন বললো, – চলো, মেঘনা ব্রিজের গোড়ায় হাইওয়ে পুলিশের দফতরে যাওয়া যাক। কেস হোক, ক্ষতিপূরণ হোক, সমাধান ওখানেই হবে।

অগত্যা দুই পক্ষ হাইওয়ে পুলিশের দরবারে রওনা দিলো। বাসের জনা তিরিশেক যাত্রী বরাবরের মতো অনিশ্চিত সময়ের হাতে সমাধানের ভার ছেড়ে দিয়ে যার যার সিটে এসে বসলাম। হাইওয়ে পুলিশের দফতরে কার ও বাস পৌঁছলে আমরা কেউ বাস থেকে আর নামলাম না। দরজা থেকে মাঝামাঝি জায়গায় এফ রোর ডাবল সিটে জানালার পাশে আমি বসেছি। কোনো কারণে বের হতে হলে পাশের জনকে ডিঙিয়ে যেতে হয়। অস্থির সেই যুবকটি বসেছে করিডোর লাগোয়া আমার পাশের সিটে। লক্ষ করলাম, হাইওয়ে পুলিশ বক্সে বাসটি থামতে না থামতেই যুবকটি হন্তদন্ত হয়ে আবার নিচে নেমে গেলো।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই যুবক চোখে-মুখে রাজ্যের উৎকণ্ঠা ও বিরক্তির ছাপ নিয়ে ফিরে একটা যন্ত্রণাকাতর শব্দ করে তার সিটে বসলো। এরই মধ্যে ওর অস্থিরতা লক্ষ করে আমার কৌতূহল বাড়ছে। আজকাল যে-কোনো বাহনের যাত্রায় দু-চার ঘণ্টা দেরি হতেই পারে। তার জন্য কেউ এমন অস্থিরতা দেখায় না, যেমনটি সে করছে। নিচ থেকে যুবক ফিরে এসেছে দশ মিনিটও হয়নি, আবার সে উঠে নিচে গেল। ফিরে এলো আগের মতোই মুখ গোমড়া করে। এবার আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, – কোনো সমাধান হলো? নাক-মুখ কুঁচকে সে জবাব দিলো, – না না কীসের কী! দুই পক্ষের মালিকের আসার জন্য ওসি আর ড্রাইভাররা অপেক্ষা করছে। মালিকপক্ষ নাকি ঢাকা থেকে রওনা হয়েছে। ডিস্গাসটিং!

– কোনো সমস্যা?

জবাব দিলো না যুবক। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে কিছুক্ষণ, তারপর মুখটা কোলের ওপর নামিয়ে চুপ করে থাকলো। হাতের মোবাইল দুই হাতে বিনিময় করতে করতে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে গুম মেরে থাকলো। বুঝলাম, সে ব্যক্তিগত কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। অগত্যা আমিও আমার চেয়ার পেছনে নামিয়ে দিয়ে চিৎ হলাম।

ঘুম আসার কথা নয়। নিজেরও অস্থিরতা লাগছে। ভেবেছিলাম, ঢাকা থেকে বাসটা সময়মতো সাতটায় ছাড়লে সাড়ে নটার মধ্যে মিয়ার বাজারে হোটেল ইন-এ পৌঁছাতো। ইচ্ছে ছিল তখন সকালের নাস্তা খাবো। ঘড়ি দেখেছি, প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে, এখনো আমরা মেঘনার পাড়েই বসে আছি।

মনে হচ্ছে, আজ সকালের নাস্তা দুপুরের ভাত দিয়ে সারতে হবে! খালি পেটে অ্যাসিডিটি না হওয়ার জন্যে বিরতি দিয়ে এক ঢোক করে পানি খাচ্ছি কেবল। চোখ খুলে পানির বোতল নিতে গিয়ে দেখলাম, যুবক ছেলেটি আবার কখন নিচে নেমে গেছে। আমি আর ওর বিষয়ে মাথা ঘামাবো না ভেবে ব্যাগ থেকে একটা কাগজের এবারের ঈদসংখ্যা বের করে পড়ায় মনোযোগ দিলাম।

পড়ায় খুব যে মনোযোগ দিতে পারছি তা না, কেননা যুবক ছেলেটি মিনিট দশেক হলো ফিরে এসেছে নিজের সিটে। চিৎ হয়ে শুয়ে ঝিম মেরে আছে বটে তবে কিছুক্ষণ পরপর ওর নড়াচড়ায় বোঝা যায় সে কতটা অস্থির। না পড়া হচ্ছে, না ঘুমাতে পারছি! অগত্যা যুবককে আবার জিজ্ঞেস করি, – কিছু  বোঝা গেল কখন বাস ছাড়বে? এবার সে প্রশ্নের জবাব সঙ্গে সঙ্গেই দিলো, – মালিক দুজন এসেছে। এফআইআর লেখা হচ্ছে, তারপর ক্ষতিপূরণের হিসাব হবে, তারপর উভয় পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর হবে, তারপর –

পরিবেশ হালকা করার জন্য আমি শব্দ করে হাসলাম, – তারপর?  – তারপর বিরক্তিকর অপেক্ষা –

– ও, সময়মতো বাস গন্তব্যে না পৌঁছলে তোমার তো তাহলে বড় কোনো সমস্যা হয়ে যেতে পারে, নাকি?

সহানুভূতির আওয়াজ পেয়ে যুবক আমার এই প্রশ্নে থমকালো, তারপর নিম্নকণ্ঠে বললো, – আপনার অনুমান মিথ্যে নয়। কী করে বুঝলেন?

– বুঝলাম, পাশে থেকে তোমার সকালের টেলিফোনের কথায়, তারপর বাস অঘটনের পর থেকে তোমার অস্থিরতায় – এবার যুবকের বুকের মুখের বন্ধ দরজার কপাট খুলে গেল। বললো, – আঙ্কেল, বাস সময়মতো চিটাগাং কাউন্টারে না পৌঁছালে আমার বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম, তিনটের মধ্যে পৌঁছতে পারবো; কিন্তু এখন তো দেখছি পাঁচটার মধ্যেও পৌঁছতে পারবো কি না সন্দেহ!

– কেন? তোমার কেউ কি অসুস্থ? আমার প্রশ্ন। ত্রস্তে জবাব দিলো সে,

– না না আঙ্কেল, তা না। অন্য ব্যাপার – জবাবটা দিয়ে যুবক চুপ করে রইলো।

আমার জানামতে, যুবক-যুবতীর মুখে সংসারের অন্য ব্যাপারগুলি সাধারণত প্রেমঘটিতই হয়ে থাকে। আর এই বয়সে যুবকটির বয়সে এর চেয়ে বড় সমস্যা আর কী হতে পারে! আমি ফিরতি কিছু জিজ্ঞেস না করে অপেক্ষায় রইলাম ওর মুখ থেকে কথা শোনার জন্য।

দুই

এই যুবকের নাম আনিস। চুয়েট থেকে গত বছর ট্রিপল ই-তে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। এ-বছর মার্চে রাজশাহীতে একটি মাল্টিন্যাশনাল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে। জয়েন করে গত দুই মাসে একটু গুছিয়ে নিয়েই  মল্লিকাকে জানিয়ে দিয়েছে, আমি আসছি। পালানোর জন্য তৈরি হও।

এই মল্লিকার সঙ্গে যখন তার দেখা হয়, তখন সে চুয়েটে ট্রিপল ই-র দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র। মল্লিকা গেছে সে-বছর ট্রিপল ই-তে চান্স পেয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে। রেজিস্ট্রার অফিসে লাইনে দাঁড়ানো মল্লিকাকে আনিস মোটামুটি দূরত্ব থেকে দেখেছে। প্রথম দেখাতেই অজানা মেয়েটিকে ভালো লেগে যাওয়াতে ভর্তির সপ্তাহখানেক পর ক্লাস শুরু হলে আনিস নিজে থেকেই খুঁজে বের করে মল্লিকাকে। পরিচয় দিয়ে নিয়ে সরাসরি প্রস্তাব দেয় আনিস। শর্ত একটাই, কোনো তাড়া নেই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার। রাজি সে না হলেও হতে পারে। তবে রাজি হলে সম্পর্ক কোনো কারণেই ভাঙা চলবে না।

মল্লিকার জীবনে আঠারোটি বসন্ত পার হয়েছে। এভাবে কেউ কথা বলেনি কোনোদিন। আনিসের প্রস্তাবে বিস্মিত হলেও সে রাগ করেনি। অভদ্রতার লেশ ছিল না অগ্রজ সহপাঠীর কথায়, আচরণে। যেজন্য মল্লিকা স্মিত মুখে ‘আচ্ছা’ বলে দুরু-দুরু বুকে হোস্টেলে ফিরে এসেছে। নতুন এসেছে সে এই ক্যাম্পাসে। তেমন কোনো বন্ধুও নেই তার যে মনের কথাটা বলা যাবে। কেবল নিজে নিজেই ভেবেছে। ভেবেছে, সমানের চলার পথটা যেহেতু তার নিজের, সিদ্ধান্ত নিতে হলে তো তাকেই নিতে হবে। কারো পরামর্শের দরকার পড়েনি। 

যেদিন এ-কথা মল্লিকা ভেবেছে, তার পরদিন বিকেলে হল থেকে বের হয়ে সে আনিসকে খুঁজে বের করেছে। একে অপরকে জানার আগ্রহ থেকে ওরা দুজন সেদিন থেকে প্রায় দিন বিকেলে একসঙ্গে হতে লাগলো। তখন আনিস জেনেছে, মল্লিকা চট্টগ্রাম শহরের শিপিং ব্যবসায়ী পরিবারের ছোট মেয়ে, তার বড় দুই ভাই আছে। পারিবারিক ধারায় ভাইয়েরাও ব্যবসায়ী। বিজ্ঞান নিয়ে সে পাশ করেছে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। পছন্দ-অপছন্দ জানানোর পর মল্লিকা আনিসকে ইঙ্গিত দিয়েছে, শরীরের সৌন্দর্য দেখে আনিস যতটা মুগ্ধ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি সে প্রাধান্য দিয়ে থাকে মনের প্রসন্ন সুন্দরকে। তাকে বিয়ের আগে অপবিত্র করা যাবে না।

আনিস মল্লিকার ইঙ্গিত বুঝে সুন্দর হেসে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছে। তারপর নিজের পরিচয় দিয়েছে। তার বাড়ি রাজশাহীতে। শহরে নয়, গাঁয়ে। কৃষক পরিবারের চার ভাইবোনের মধ্যে ওরা তিন বোন, এক ভাই। বোনেরা ওর বড়। সে ছোট। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা বেশি লেখাপড়া করেনি। সে ছাত্র ভালো। বরাবর ভালো রেজাল্ট করাতে সকলের ইচ্ছাতেই এতদূর আসা। অবশ্য তার নিজের আগ্রহ তো আছেই। বাড়িতে বাবা-মায়ের দেখভাল করার ভার এখন ওর ওপর। অবস্থাপন্ন কৃষক। বাড়িঘর সম্পত্তি যা আছে সব গ্রামে। পাশ করার পর চাকরি যেখানেই হোক, বাবা-মাকে নিয়ে শহরে বাসা ভাড়া করে থাকতে হবে। ওদের গাঁয়ে ফেলে রাখা যাবে না।

বলা যায়, এভাবেই ওরা দুজন দুজনের সরলতার সৌন্দর্য নিয়ে একে অপরের দিকে এগিয়ে গেছে। সম্পর্কের দুই বছরের মাথায় মল্লিকা ওর মাকে জানাতেই বাবা-ভাই ভীষণ ক্ষেপে গেলো। একসময় অবস্থা এত খারাপের দিকে গেল যে, মল্লিকার দুই ভাই আনিসকে একদিন তাদের অফিসে ডেকে নিয়ে অপমান তো করলই, গায়েও হাত তুললো। এরপর মল্লিকাকে ঘরে আটকে রাখা হলো এক সেমিস্টার। পরিবার থেকে হলে থাকতে দিলো না।  বাড়িতে এনে মোবাইল কেড়ে নিয়ে মল্লিকাকে চোখে চোখে রাখা হলো। শহর থেকে নিজেদের গাড়িতে চুয়েটে পরীক্ষা থাকলে তাকে একজন গার্ডসহ পাঠানো হতে লাগলো। এ-অবস্থায় দুজনকে আলাদা করা গেল বটে, তবে একেবারে নয়। মল্লিকার এক সহপাঠীর মাধ্যমে চুয়েটে গেলে মোবাইলে কথা হতো ওদের। ইতোমধ্যে আনিস পাশ করে বের হয়ে গেছে গত এক বছর হলো। মল্লিকাও পাশ করার অপেক্ষায় ছিল। গত মাসে মল্লিকার রেজাল্ট হয়েছে। আনিসের চাকরি হয়েছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে কোনো বাধা নেই! 

গত সপ্তাহে বান্ধবীর ফোনে কথা হয়েছে আনিসের সঙ্গে মল্লিকার। কথা হয়েছে, চুয়েটে রেজাল্ট শিট আনতে যাওয়ার নাম করে সে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হবে। মাকে বলবে, আসার পথে সে দামপাড়া বান্ধবীর বাসায় যাবে। ইচ্ছে হলে থেকে যেতে পারে।  ড্রাইভার নেবে না সেদিন। বান্ধবীর গাড়িতে আসবে-যাবে। গত এক বছরে অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। সন্দেহ করবে না। তবে মল্লিকার মোবাইল ব্যবহার করার অনুমতি এখনো নেই। তারপর বেলা তিনটার দিকে সোহাগ কাউন্টারে এসে সে অপেক্ষা করবে। আনিস পৌঁছেই ওকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যে-বাস পাবে তাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবে।

এদিকে সকাল সাতটার বাস কোনো সমস্যা না হলে দুটার মধ্যে চট্টগ্রাম পৌঁছার কথা। কিন্তু বাস দুর্ঘটনায় পড়ে ওদের প্ল্যান ওলটপালট করে দিচ্ছে। সকালে একবারই মাত্র দোকান থেকে মোবাইলে কথা বলেছে মল্লিকা। জানিয়েছে, আনিস যেন কোনো চিন্তা না করে। সময়মতো সে ঠিক জায়গায় থাকবে। কেউ টের পাবে না।

কিন্তু বিধি বাম। বেলা ৩টার দিকে সীতাকুণ্ডে এসে বাস আবারো যানজটে আটকে আছে, সেও প্রায় এক ঘণ্টা হতে চললো।

অস্থিরতায় উদ্বেগে যুবক ছেলেটির মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তার জীবনের সবকিছু জেনে এখন আমারই খারাপ লাগছে খুব। মনে মনে ওদের দুজনের জন্য শুভকামনা করে আমি একবার ওর ডান হাতে মৃদু চাপ দিলাম। বললাম, দুশ্চিন্তা করো না আনিস, মল্লিকা তোমারই হবে।

তিন

জটমুক্ত হয়ে চট্টগ্রামের দিকে শেষ পথটুকু আসতে সোহাগ তারপর খুব বেশি সময় নেয়নি। আমরা দামপাড়া কাউন্টারে পৌঁছেছি পাঁচটা চল্লিশে। বাস থামতে না থামতে আনিস হুড়মুড় করে নেমে দৌড়ে গেল কাউন্টারের ভেতরে। কৌতূহল দমন করার জন্য আমি স্বাভাবিকভাবে নেমে আমার গন্তব্যে চলে না গিয়ে সোহাগ কাউন্টারে ঢুকলাম। দেখলাম, প্রায় ফাঁকা কাউন্টারের ওয়েটিং রুমের শেষ সোফায় নেকাবে চোখ ছাড়া মুখ ঢাকা বোরখা পরা এক মহিলা অথবা মেয়ে বসে আছে কোলের ওপর চোখ নামিয়ে। এছাড়া আর কেউ নেই। আনিস হতাশায় নিমগ্ন হয়ে মাথার চুল দুই হাতের আঙুলে চেপে ধরে মুখ নিচু করে সামনের একটা খালি সোফায় বসে আছে।

 আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে সে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালো। এই পরিস্থিতিতে কোনো প্রেমিক যুবকের চেহারার বর্ণনা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কোনো কথা না বলে নিজের ফোন নম্বর লেখা এক টুকরো কাগজ আমি আনিসের হাতে দিয়ে মাথায় হাত রেখে শুধু বললাম, – অপেক্ষা করো আনিস, চলে যেও না। ধৈর্য ধরো। আমার মন বলছে, তুমি ব্যর্থ হবে না। আর হ্যাঁ, ফিরে যাওয়ার আগে আমাকে ফোনে জানাতে ভুলো না যেন।

আনিস বিষণ্নবদনে উঠে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে হাত মেলালো। ওর দুই হাতের ভেজা কিন্তু উষ্ণ কাঁপন আমি খুব টের পেলাম, যা কি না ফিরে আসার সময় আমার দুই চোখ আর শুকনো থাকতে দিলো না।

কিন্তু এই অশ্রু আমার আনন্দাশ্রু হলো রাত আটটা দশে যখন আনিসের এমন ফোন পেলাম। জানালো সে,

– ঘরের এক কোণে নেকাব-বোরখা পরা মহিলাটিই ছিল মল্লিকা। এমন পোশাক সে নিয়েছিল ইচ্ছে করেই বিপদমুক্ত থাকার জন্য। আমাকে কাউন্টারে ঢুকতে দেখে মল্লিকা সামনে আসেনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার গ্রিন লাইনের গাড়িতে ওরা দুজন এখন ঢাকার পথে সীতাকুণ্ড পার হয়ে গেছে।

আমার বুকের ভেতর থেকে স্বস্তির শ^াস পড়তে না পড়তেই টের পেলাম, একটা মরিচা পোকা ঠিক ঠিক সময় বুঝেই আমার চোখে পড়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়ে গেলো। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। মনও শুকনো থাকলো না!

Leave a Reply