সম্পাদকীয়

লেখক:

বাংলাদেশের শীর্ষ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আকস্মিকই চলে গেলেন। তিনি ছিলেন কালি ও কলমের শিল্প-নির্দেশক, শিল্প ও শিল্পীর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য সকল অর্থেই হয়ে উঠেছে অপূরণীয় ক্ষতি। এ-ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না।

চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় আবর্তনের ছাত্র কাইয়ুম চৌধুরী দীর্ঘ ষাট বছরের চিত্র সাধনা ও চর্চার মধ্য দিয়ে স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল এক শৈলী নির্মাণ এবং বিষয়ের গুণে নিজস্ব ভুবন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই সৃজনে ধরা আছে বাংলা ও বাঙালির সংগ্রাম, মানুষের মর্মযাতনা, দুঃখ-কষ্ট এবং ঐতিহ্যিক প্রবাহ। কাইয়ুম চৌধুরীই বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পী যাঁর চিত্রপটে কোনো ধরনের বিমূর্তায়নের ছায়া নেই বা নির্বস্তুক বিষয় নিয়ে যিনি ছবি আঁকেননি। তাঁর চিত্রচর্চা, জীবনদৃষ্টি ও সমাজের প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে একজন প্রখর সমাজসচেতন শিল্পী করে তুলেছিল। সেই জন্যই বোধকরি বাস্তবধারায় ছবি অঙ্কনে তিনি প্রধান শিল্প হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি কতভাবে যে তাঁর পটে ঐতিহ্যিক ভাবনাকে আধুনিক বোধ ও ভাবনায় পুনর্নির্মাণ করেছেন, তা বলে শেষ করা যায় না। এই ঐতিহ্যিক প্রবাহে নিমজ্জিত হয়ে বাংলাদেশের লোকশিল্পের নানা অনুষঙ্গ থেকে পরিগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তিনি বাংলার এই লোক শিল্পের মধ্যে সৃজনের সমৃদ্ধ ভাবানুসঙ্গ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এই বিষয়কেই তিনি আধুনিক বোধে ও নিজস্ব শৈলীতে পুর্ননির্মাণ করেছেন। এক্ষেত্রে শিল্পীর যে জিজ্ঞাসা ও দেশভাবনার প্রকাশ আছে তা নবীন প্রজন্মকে শিল্প-সৃজনে প্রাণিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
সকল মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বিশেষত তেলরং, জলরং, গুয়াশ, প্যাস্টেল ও অ্যাক্রিলিকে করা তাঁর অজস্র কাজে তিনি যে বৈশিষ্ট্যের ও শৈলীর ছাপ রেখে গেছেন, তা এ-দেশের চিত্রকলায় অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এমনকি তাঁর রেখালেখ্যও হয়ে উঠেছে দীপ্ত। এই সৃষ্টিগুচ্ছের মধ্য দিয়ে তিনি জয়নুল-কামরুলের সুযোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠেছেন।
তিনি পঞ্চাশের দশক থেকে মৃত্যুকাল অবধি লব্ধজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে এ-দেশের গ্রন্থের প্রচ্ছদ, সচিত্রকরণ ও মুদ্রণ শিল্পকে এমন এক উচ্চস্তরে নিয়ে গেছেন যা হয়ে উঠেছে বিশ্বমানের, শিল্পসুষমামণ্ডিত ও আধুনিকতার প্রকাশে উজ্জ্বল। তিনি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন। এসব প্রচ্ছদে বিষয় তীক্ষ্ম ও তীব্রভাবে অর্থময় হয়ে উঠেছে। এছাড়া অসংখ্য নিমন্ত্রণপত্র এবং দীর্ঘবাদনের কয়েকটি প্রচ্ছদেও তাঁর শিল্পিত শক্তিময়তার প্রকাশ আছে। বৈচিত্র্যে ও শিল্পমূল্যে গ্রন্থের এইসব প্রচ্ছদ অসামান্য হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতির সকল শাখায় তাঁর সহজ বিচরণ ছিল। সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না এবং এই সকল ক্ষেত্রের শুদ্ধ ও পরিশীলিত চেতনাকে ধারণ করেই তাঁর শিল্প-সৃজন হয়ে উঠেছিল গহন ও গভীর।
কালি ও কলমের এই সংখ্যায় তাঁর নির্মাণ ও সৃষ্টি, সংস্কৃতির সকল শাখায় আগ্রহ, ষাট বছরের চিত্র-সৃজনে তাঁর বাঁক ফেরা এবং এই শিল্পীর ব্যক্তিত্বের নানা দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।
আশা করি সংখ্যাটি কালি ও কলমের বৃহত্তর পাঠক এবং শিল্পানুরাগীদের ভালো লাগবে।