সময়

লেখক: রাশেদ আহমেদ

এক আশ্চর্য সন্ধ্যায় তোমার সঙ্গে আমার দেখা। সন্ধ্যার গা কেমন পিচ্ছিল আর সংক্ষিপ্ত। তুমি কালো গ্যাবার্ডিনের ওপর একটা লাল রঙের টপস পরেছ। গলায় কোনো ওড়না প্যাঁচানো নেই। তাতে তোমার বুকের ওঠানামা আমি দেখতে পেরেছিলাম।
আমি নেহায়েত একটা দোকানদার। দোকানের কর্মচারী। তোমার সঙ্গের ছেলেটা আমার পূর্বপরিচিত। আবার দোকানে আমার সহকর্মীও তোমার পূর্বপরিচিত। অপরিচিত কেবল আমি আর তুমি।
কিন্তু যত কথা সেদিন আমারা দুজন বললাম, সেটা কি পূর্বপরিচয় ছাড়া সম্ভব? সেটা সম্ভব কিংবা নয় – সেটা আমার জানার বিষয় নয়। কারণ সেক্ষেত্রে আমি বহুবার প্রমাণিত। আমি পারি না অপরিচিত মানুষের সঙ্গে এত কথা বলতে। সে যদি আবার হয় মেয়ে! কিন্তু তুমি? তুমি কি আমার পরিচিত ছিলে? না। তাই তোমার ব্যাপারটা আমি আলাদা ধরছি, কারণ তুমি নিজেই আলাদা।
আলাদা তুমি সেটা বহু কারণে। সেটা প্রথমত, তুমি বলেই। দ্বিতীয়ত, তুমি যেমন পাহাড়ের সান্নিধ্যে বড় হয়েছো, আমি বনেবাদাড়ে বড় হওয়া এক বুনো। সেটা তুমি জানো। অবশ্য তুমি আর যেটা জানো, সেটা হলো – এই আমি, চালচুলোহীন এমন একটা মানুষ যাকে দিয়ে উচ্চতর কিছু আশা করা বোকামি। বিশেষ করে যার রসাতলে যাওয়ার সমস্ত পথ পরিষ্কার, তাকে দিয়ে কী আর হতে পারে। কিন্তু আমি তো আমাকে ছাড়তে পারি না। নিজেকে ঠেলাটাই এখন আমার কাজ। ঠেলে একদিন হয়তো মুখ্য পেয়েও যেতে পারি। তবে তার জন্য আমার ক্ষোভ বা খেদ – কোনোটাই নেই। এর পেছনে আরেকটি কারণ হতে পারে, তোমার এসব জানাজানি আর ক্রমাগত বড় হতে হতে আকাশ স্পর্শের স্পর্ধা। সে তোমার থাকতেই পারে। তুমি আকাশের দেশের মানুষ। আকাশেই থাকো। আমি মাটির মানুষ; মাটিতেই ভালো আছি। সে যাক! তবে আমি এভাবে উঁচুতে তাকিয়ে অভ্যস্ত নই টুনু। সেটা পৃথিবীর সবাই জানে, এভাবে ঘাড় বাঁকিয়ে মুখ উঁচু করে ওপরের দিকে তাকিয়ে আমি থাকি না। আমি সোজাসুজি তাকিয়েও অভ্যস্ত নই। যদিও এটাই আমার পছন্দ। তোমার সঙ্গে আমার সে-সুযোগ নেই। সুতরাং তোমাকে আর আমার দেখা হবে না। আমাদের এ-দূরত্বের পেছনে আমার নিজেরও যে একটা ভূমিকা আছে সেটা অস্বীকার করব না। কারণ কে না জানে, আত্মসম্মানের সমুদ্রে আমরা একেকজন একেকটা অন্য-অন্য দ্বীপ।
সে যা হোক, পিচ্ছিল সময়ে আমাদের প্রথম দেখা। প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। অতঃপর আমাদের আর কোনোদিন যে দেখা হবে না – সেটা তুমি ভেবেছিলে? আমি ভাবতেও পারিনি। সত্যটা হলো, আমাদের আর দেখা হয়নি সেদিনের পর। তোমার আর দেখা পাইনি আমি। জীবনের নিরাভরণ যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধরত অনেক হাঙরে-ক্ষত-বুকে বেঁচে আছি। কিন্তু এখনো আমার যে-গোলাপটি দিয়ে রক্ত ঝরছে সেটা আমি তোমার কাছে উপহার পেয়েছি। তাকে লালন করি আমি। মাঝে মাঝে চুমু খেয়ে তোমার কথা স্মরণ করি।
ক্ষতটার এক অদ্ভুত চরিত্র আছে। সে কখনো কখনো বাড়ে। বড় হয়। গোলাপের থেকে সূর্যমুখী ফুলের সমান হয়। কখনো ছোট হতে হতে নয়নতারা; তারার মতো ক্ষীণ হয়ে আসে। কখনো কখনো চৈত্রের ছোট নদীর মতো ম্রিয়মাণ।
আমার এই ক্ষতের সূত্রপাতের ইতিহাস ঘাঁটলে অবশ্য এর একটা অতীত আছে। শৈশবের সেই অতীত। বলা যায় যাকে আমি প্রথম ভালোবাসি অথচ বুঝতে বুঝতে এতদিন লাগে। প্রায় বিশ বছর পর। অবশ্য একে যদি ভালোবাসা বলা যায়। তবে একে ভালোবাসা ছাড়া আমি অন্য কিছুই বলব না।
ঘটনাটা নানাবাড়ির। সমাজের ভেতর এই বাড়ির লোকদের চোখ-মুখ-কথা-পোশাক-চালচলনে যে কী রকম ভিন্নতা সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। পরবাসী একটা ভাব। দাড়ি-টুপি আর পর্দা। সমাজ থেকে একদম আলাদা, বিচ্ছিন্ন একটা পরিবার। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কসূত্র মাত্র একজন; সে এই বাড়ির কর্তা, আমার নানা। অথচ বাড়িটার ভেতর একটা এক সুতোর সুর। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না, দেখা করছে না; শুধু পালাই পালাই। কেউ এলে বাড়ির অন্দরমহলের নারীকুল ছিটকে সরে যাচ্ছে, পালাচ্ছে গিয়ে অন্য ঘরে। বহিরাগত চলে গেলে গুপ্তস্থান থেকে বেরোচ্ছে। সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! অকথিত সেই স্রোতের ভেতর অন্য এক স্রোত। ছোট কিন্তু একবারেই ভিন্ন খাতের, ভিন্ন হাওয়ার। সেটার নামই সুমিতি। বহিরাগতের সামনে বেরিয়ে আসছে বীরদর্পে, পথ দেখিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসছে, পথ দেখিয়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। আমার সুমিতি খালামণি! একটি গোঁড়া মুসলিম পরিবারে একজন ভিন্ন চেহারার, ভিন্ন পোশাকের, ভিন্ন খাওয়া-দাওয়ার নাম – সুমিতি মান্দি। এই বাড়ির কাজের মেয়ে; আমার সুমিতি, সুমিতি খালামণি।
মাংসল চোখের পাতা। চোয়াল চওড়া আর গালের ওপর হনুটা উঁচু। কথার ভেতর যার ধুয়া, যা আমাকে এক গভীর হতাশার সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে এমন কিছুর আভাস দিত যা কেবল রাজকন্যা আর রাজকুমারের গল্পেই দেখা যায়।
সুমিতির পোশাক ছিল ওর নিজের মতো। ওড়নাটা যেনতেন করে বুকের ওপর ফেলে রাখা। খাওয়াখাদ্যে ছিল বাছবিচার। আলাদা রাঁধত, আলাদা খেত। কাজের সময় শুধু বাড়ির সবার সঙ্গে হতো।
এর বাইরে ওর সঙ্গী বলতে এই আমি। ওর সঙ্গে আমি পালিয়ে কত খেয়েছি। ধরা পড়ে মা-খালার বকুনি খেয়েছি। আমরা দুজনেই। সুমিতিই বেশি খেয়েছে। তবু আমাদের একসঙ্গে ওর পাতিলে কচু সেদ্ধ করে খাওয়া থামাতে পারেনি। গলায় যখন কচুর চুলকানি ধরত আর আমি কান্না জুড়ে দিতাম, সবাই এসে পড়ত। শুরু হয়ে যেত বকুনি। সুমিতির মুখ শক্ত হয়ে যেত। ওর অদৃশ্য চোয়ালে চামড়ার ওপর দিয়ে হাড়ের ঢেউ আমি দেখতাম ওঠানামা করছে। যেন কঠিন পণ করে ফেলেছে আর আমাকে নিয়ে কচু খাবে না – বকুনি খেয়ে এভাবে আমার দিকে তাকাত সুমিতি। তখন ওর দিকে তাকাতে আমার ভয় হতো। কিন্তু পরে যখন আমি ওর কাছে এসে গা-ঘেঁষে বসতাম, ওর রাগ জল হয়ে যেত। আবার আমরা একসঙ্গে খেতাম, গল্প করতাম, ও আমাকে বুকে নিয়ে শুয়ে থাকত। তাছাড়া আমাকে ছাড়া ওর কচু খাওয়া জমতই না। আমার কৈশোরে পাওয়া একমাত্র বন্ধু। প্রথম নারীর শরীরের গন্ধ-উষ্ণতা চিনেছিলাম যার কাছে; তিনিই আমার সুমিতি। সেই বদ্ধপরিবেশের একমাত্র চিলেকোঠা; জানালা আমার। যদিও আমি দেখতাম ওর স্তনের নিচে কতগুলো হাড় হা-হয়ে বেরিয়ে আছে। তখনো আমি বুঝিনি এর কারণ। খাদ্যাভ্যাস ছাড়াও এখানে সুমিতি ছিল চরম বৈষম্যের শিকার।
সুমিতিকে কখন, কীভাবে হারিয়ে ফেলেছিলাম তা আমার আর আজকে মনে নেই। যতটা মনে আছে তোমার সঙ্গে সাক্ষাতের দিনক্ষণ। তবে সুমিতি মাংসল চক্ষু আর হনুউঁচু মুখের প্রতি আমার সেই যে দুর্বলতার বীজ বপন করে গিয়েছিল, তারপর থেকে কেন জানি না, এই মঙ্গলোয়াইট চেহারার প্রতি আমি এক আত্মীয়তা বোধ করতে থাকি। এমন কোনো মুখ দেখলেই মনে হতো, এ যেন আমার কত চেনা, কত আপন।
তারপর সেই অদ্ভুত পিচ্ছিল আর সংক্ষিপ্ত সন্ধ্যা। তোমার সঙ্গে আমার দেখা। তলকুঠুরিতে। আন্ডারগ্রাউন্ড; পৃথিবীর আলো-হাওয়ার বাইরে, নেটওয়ার্কের বাইরে। কাঁটাবন। কনকর্ড এম্পোরিয়ামের আন্ডারগ্রাউন্ডে বইয়ের দোকানে। এই বইয়ের দোকানেই আমি কাজ করি। চালচুলো, আত্মীয়-স্বজনহীন একটা কবিতামত্ত যুবক। পাগল। বসে বসে কম্পিউটারে একটা কবিতার পাণ্ডুলিপি টাইপ করছিলাম, দোকানেরই কাজ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মতো মাথার চুলের ছাঁট। টেবিলের আরেক কোণে বসা আমার সহকর্মী। মেঘদূতের একটা পাণ্ডুলিপি টাইপ করছিল। প্রচুর টীকা-টিপ্পনিসহ প্রতিটি সংস্কৃত শব্দের অর্থ এবং পুরো বাক্যের তর্জমা। আমাদের মাথায় ওপর একটা ফ্যান ঘুরছে। দোকানের বাঁ-কোণে একটা কুলুঙ্গিফ্যান পিনপিন করে ঘুরছে। তুমি এলে আমাদের এই অজ্ঞাতবাসের তলকুঠুরিতে। আসার মূলসূত্র আমার সহকর্মী আর তোমার সঙ্গীর বন্ধুত্ব। দিনের ক্লান্তিকর এই মধ্যপ্রহর, না আছে ক্রেতা, না আছে মালিক।
তুমি। ছোট্ট একটা মানুষ। পরনে কালচে গ্যাবার্ডিনের সঙ্গে লাল টপস। ওড়নাহীন তোমার বুকের প্রতিটি ওঠানামা আমি দেখেছিলাম। তোমার ক্লান্তমুখ আস্তে আস্তে ঘেমে উঠল। তারপর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘামকণা সোনামুখী সুইয়ের ডগার মতো বাল্বের আলোয় চিকচিক করতে লাগল। পরিচয়পর্ব শেষ হতেই আমরা কথার স্রোতে ভেসে গেলাম। মিথ্যার জোয়ারে আমি নিজেকে ছেড়ে দিলাম। সচরাচর যা আমার হয় না। নিজেকে অন্য মানুষ করার মজার খেলা পেয়ে বসল আমাকে। সেটা তোমাকে দেখাবার জন্যই। এর বাইরে যদি বলা যায় বলব, কী যেন আমাকে সেদিন পেয়ে বসেছিল। তোমার ছোট শরীরের ছোট মনটাকে জয় করার একটা বাসনাই বলা যায়, যা আমি পরে বুঝেছি। শুধু বাসনা বললে একে হয়তো ঠিক বিচার করা হবে না। কারণ পরবর্তীকালে তোমার প্রতি আমার উন্মত্ততাই তার প্রমাণ। সেদিন একটা প্রচণ্ড আকর্ষণে খেপে গিয়েছিলাম। এরপরই কেবলই বুঝতে পারলাম, প্রেম মানে প্রকৃতি, প্রেম মানে স্রোত, প্রেম মানে বয়ে যাওয়া। প্রেম আসে নিজের মতো করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে কৃত্রিমতার কোনো ঠাঁই-ই নেই। প্রেম নিজেই কৃত্রিম। প্রেম নিজেই মাটি, নিজেই শেকড়। প্রেম হলো সেই মহাপ্রলয় – আপন তালে আসে, ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
আমরা ভ্রমণ নিয়ে আলাপ করছিলাম। আমি শৈশবে স্কুলে যে-কটা ক্লাস পড়েছিলাম, তাতে ‘সমুদ্রের হাতছানি’ নামে একটা ভ্রমণগল্প ছিল। যেখানে ছেলেটা স্কুল-ছুটিতে সমুদ্রে যায় ঘুরতে। অথচ যখন সন্ধ্যাবেলা অস্তায়মান, সূর্যের ভেতর সমুদ্রকে বিদায় জানাতে হয় – সমুদ্র যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। কেন যেন সেই ঘোর আমি কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারিনি। সুতরাং যদিও আমি যাইনি তবু আমার সমুদ্রের অভিজ্ঞতা তোমাকে বললাম।
‘সমুদ্র আমার খুব প্রিয়’ – আমি বলছিলাম, ‘তোমার?’ ইতোমধ্যে আমরা তুমিতে চলে এসেছি। তার কারণ তুমি ছোট্ট একটি ময়নাপাখি আর জলের মতো মিশুক। তুমি পাদুটো মেঝেতে মৃদুভাবে ঠুকতে ঠুকতে বললে, ‘আমার পাহাড় প্রিয়।’ এরপর ধীরে ধীরে বোধহয় আমারও পছন্দের জায়গা পালটে গেল। আমার কাছে সমুদ্রের চেয়ে পাহাড়ই বেশি পছন্দসই বলে মনে হলো। যদিও কোনোটারই আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। অবশ্য এর আরেকটি কারণ হতে পারে, পাহাড় খুব সুন্দর আর তুমিও পাহাড়ি।
‘পাহাড় ভালো লাগে কেন?’ – আমি জিজ্ঞেস করলাম তোমাকে।
তুমি বললে, ‘পাহাড়, এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার নাম। একা একা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো সূর্য কোলে করে, মেঘ কোলে করে – তুমি যখন ওর কাছে যাবে তোমাকে এমন আত্মীয়তায় কাছে টানবে, তুমি হয়তো কেঁদেই ফেলবে।’ তখনই আমার প্রথম বিশ্বাস হলো, পাহাড়ই বেশি সুন্দর এবং আমার প্রিয়। পাহাড়ে যদিও যাইনি তবু তোমাকে পাহাড়ে যাওয়ার আমার আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বললাম। সেটা নিশ্চিতই সমুদ্রের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভালো বলেছিলাম। অবশ্য তারপর জীবনে প্রথম ভ্রমণটা আমি পাহাড়েই দিয়েছিলাম। রুমার পথে কেওক্রাডং।
তুমি টুনু। এত কথা বললে আর আমিও এতটা তোমাকে সঙ্গ দিলাম – তাতে নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গী দুজন অবাক হয়ে থাকেবে। মানে আমার সহকর্মী আর তোমার সাথের জন। কারণ তখনো তুমি না জানলেও ওরা তো আমাকে ভালো করেই জানে। আমি তো এমন ছিলাম না। অপরিচিত কারো সঙ্গে এত কথা আমি বলি না অথবা পরিচিতের সঙ্গেও যৎসামান্য; যদি না তার আর আমার রসায়নটা তেমন থেকে থাকে। আসলে স্বভাবত আমি স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিতের মধ্যে একটা নাম কামিয়েছিলাম। এমনকি ক্রেতার সঙ্গেও আমি কথা বলতাম খুব কম। মালিকের তরফ থেকে এত নাকানি-চুবানি খাওয়ার পরও যা আমার ঠিক হয়নি। তোমার সামনে ব্যাপারটা কী হলো! আজো আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। কথার স্রোতে ভুলেই বসেছিলাম স্থান-কাল। পরে আমাকে আমার সহকর্মী হেসে হেসে বলেছিল, ‘বাহ্, বেশ চমৎকার কথা বলতে পারেন তো?’ আমি মুচকি হেসে তার উত্তর দিলাম। আসলে আমি তখনো নিশ্চিত ছিলাম না, আসলে কী হয়েছে? তবে ভেতরে কিসের একটা বেখাপ্পা জিনিস গজগজ করে বিঁধছিল আর অস্বস্তি দিচ্ছিল। কী সেটা তখনো তা আমি জানি না। অবশ্য সেই বিশেষ দিনটি ছিল আমার কথার দুয়ার খুলে যাওয়ার মোক্ষম মুহূর্ত, যার চাবিটি ছিল তোমার হাতে। কেউ কেউ আমাকে দেখিয়ে এও বলত, ‘ছেলেটা বোবা নাকি?’ তবে সেদিনের পর আমি জানতে পারি, না, আমার ভেতর কথার পাহাড় আছে। আমি বোবা নই।
আমরা ফোনে প্রচুর কথা বলা শুরু করলাম। তুমি আমাকে অদ্ভুত বিষয়ে প্রশ্ন করতে আর আমিও তার উত্তর দিতাম। ফোনে ফোনে। সেটাতে যতটা রং ঢালা যায় তার কোনো কার্পণ্য হতো না। তুমি আমাকে প্রথম পতিতালয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলতে বললে। আমি বললাম। কারণ দেখলাম, তুমি ‘না’র চেয়ে হ্যাঁ বললেই খুশি হবে।
তারপর জানতে চাইলে, কবে শেষ গিয়েছ?
উত্তরটা যেন জিহ্বার ডগায় প্রস্তুতই ছিল, ‘তা মাসতিনেক।’
‘ওফ!’ তুমি মুখে এই শব্দ করলে ফোনের ওই পাশে। আমি হাসলাম এই পাশে। ফোন কেটে গেল। এরপর তুমি কিন্তু আর ফোন ফেরালে না। কেন যেন আমার মনে হয়, সেই থেকে আমাদের কথা কমে এলো। কেন? আমি জানি না। আমি তো কেবল তোমাকে খুশি করতে চেয়েছিলাম।
ততদিনে আমার দুঃখ-দুর্দশার কাল আবার শুরু হয়ে গেছে। এই যে আমি, বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুদের রেখে চলে এসেছি এই শহরে। আজকে আমি একজন উদ্বাস্তু, অর্ধাহারী, নিঃসঙ্গ। পরিবার ছাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় এবং প্রবল কারণ আমার ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি আকর্ষণ। আর তার পরপরই কবিতার প্রতি দুর্বলতা। তাদের অস্বাভাবিক সমাজবিচ্ছিন্ন জীবনে আমি আসলে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। আমি চেয়েছি একটা সাধারণ জীবন। যে-জীবন আজকে আমার। তাই অনাহারে যদি আজকে আমি মারাও যাই, তবু আমি খুশি। কিন্তু কেউ যদি বলে এখনো তো বাড়ি ফিরতে পারো। আমি বলব, না, সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। দূরত্ব পাথরের মতো ভারী হয়ে বসেছে পরিবার আর আমার মধ্যে। বাড়ি ফেরা হবে না।
হ্যাঁ, আজকে আমি বলব কবিতার জন্যই আমি ঘরদোর ছেড়েছি। যদিও তার দেখা পাচ্ছিলাম না। আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি আমার সেই অদেখা কবিতাকে নিয়ে আসবে। কেন এমন মনে হলো? জানি না। তবে লিখছিলাম। তোমাকে দেখার পর থেকে টুকটাক লেখার সঙ্গেই ছিলাম, আছি। একে যদি আসা বলে, তবে কাব্যদেবী এলেন বটে। কিন্তু যে সঙ্গে করে নিয়ে এলো সে তুমি না, তোমার ছায়া। তুমি তো কবেই হারিয়ে গেছ। সেই ছায়াকেই আমি জড়িয়ে ধরতে চাইলাম; কিন্তু বারবার ফসকে ফসকে গেল।
নদীর ধারে ক্লান্ত পথিকের শরীরে মৃদু হাওয়ার মতো এলে। তারও চেয়ে নিঃশব্দে চলে গেলে। এক হাজার ক্ষুধার্ত সিংহের গায়ের সমস্ত জোর নিয়ে দুর্ভাগ্যও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার সহকর্মীটিও চাকরি ছেড়ে দিলো মালিকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে। চালচুলোহীন দুর্ভাগ্য ভয়ংকর রূপ নিল। একেকটা দিন ক্ষুধার্ত বাঘের মতো হয়ে এগিয়ে এলো। আমি তার মুখোমুখি হলাম। আমার জীর্ণ শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে তাদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দিনশেষে আহত জন্তুর মতো ক্লান্তি এসে চেতনা লুপ্ত করে দিত।
কনকর্ডে যে-দোকানে কাজ করি, যার মাধ্যমে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয়; আমার কর্মস্থল। প্রতিটা দিন শেষে আধখানা করে ফেলে যায় আমাকে। কোনো অভিযোগ ছিল না আমার তার বিরুদ্ধে। কারণ পরিশ্রম তো আমি করতেই পারি। তবে, দোকান-মালিকের মানসিক নির্যাতনে বোধ হয় ইস্পাতও ফুটো হয়ে যেত। এর মধ্যে দুর্ভাগ্যের বর পাওয়ার মতো চলে গেল আমার সহকর্মীও। এখন আমি একা। শারীরিক কাজের চাপের পর মানসিক চাপ নেওয়ার আর জায়গা কোথায়! কিন্তু সেটাই আমাকে কষে চেপে ধরল। কেমন এক ধরনের কুরে কুরে খাওয়ার স্বভাব লোকটার। এতদিন যে-চাপ দুজন ভাগাভাগি করে নিতাম, সহকর্মী চলে যাওয়ার পর সেই চাপ এলো একা আমার ওপর। অথচ হেন কাজ নেই সে আমাকে দিয়ে করায় না। পাছে কথা বলতেও ছাড়ে না। আর কাজ বলতে মোটামুটি একটা ফিরিস্তি দিলে দাঁড়ায় – নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি টাইপ, প্রুফ দেখা, বই বিক্রি, চা বানিয়ে দেওয়া, মদে পানি মেশানো, জায়গায় জায়গায় বই পৌঁছে দেওয়া, প্রেসে যাওয়া, জুতো সাফ, নারী জোগান দেওয়া – আক্ষরিক অর্থেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। এর ওপর তো তার মানসিক নির্যাতন আছেই। তবু যে দুটো খেতে পারছি তাই বা দেয় কে? সুতরাং কোনো ‘রা’ কাটতাম না। মুখ বুজে অত্যাচারের লাঙল বয়ে নিয়ে যেতাম চৈত্রের খরখরে মাটির ওপর দিয়ে। ভেবে নিয়েছিলাম এই আমার নিয়তি। তবু তো আমার কবিতার যে-চারাটা, তাতে একটু একটু জল দিতে পারছি। পরিবারের পরাধীনতা থেকে মুক্ত। ভাবখান এমন যে, কেউ যদি এসে আমাকে খুন করে যায় আমার কোনো অভিযোগ নেই। পরিবারের ওপর আস্থাটা এত দৃঢ়ভাবে বুকে কেটে বসেছে। তাছাড়া সঙ্গে আছে তোমার ছায়াসঙ্গী। অনন্তকাল বোধহয় এভাবেই চলতে থাকত। আর আমিও থেকে যেতাম এই অজ্ঞাতবাসে। তোমার ছায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে রেখে। বাদ সাধল আমার রুমমেট। বন্ধু।
সেদিন পৃথিবীর রং ছিল সোনালি। সূর্য অস্তাচলে ঢলে পড়েছে। কাঁটাবনের পশুপাখির দোকানগুলোতে চলছে নিত্যদিনকার কাজিয়া। যে-পাখি বনে গেয়ে বেড়াত তারাই এখানে কাজিয়া করে চলেছে বলে আমার মনে হয়। কারণ বনের ভেতর পাখির কলতান তো আমি শুনেছি। পাখির দোকানগুলোর উলটো দিকে কনকর্ড টাওয়ার। গ্রাউন্ড ফ্লোরে নানা পাবলিকেশন আর বুকশপ।
তলকুঠুরির আমার অজ্ঞাতবাসে তখন আমি একা। সহকর্মীটি চলে গেছে। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও ছিল ভ্যাপসা আর সময় স্থবির। দমবন্ধ হয়ে আসা পরিবেশ। কাস্টমার নেই। তাক থেকে নামিয়ে কোনো একটা বই নাড়াচাড়া করছিলাম। হঠাৎ কোথা থেকে দোকান-মালিক বজ্রপাতের মতো নাজিল হলো। বিরাট তার টাকে এনার্জি বাল্বের আলো চিকচিক করে উঠল।
গলদঘর্ম হয়ে এসে সে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে হাঁসফাঁস করতে লাগল। ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে টেবিলে রাখল। তার ত্বরিত স্বভাবজাত দ্রুত এবং কম্পিত হাতে একটা সিগারেট ধরাল। লম্বা একটা টান দিয়ে ইটখলার চিমনির মতো একরাশ ধোঁয়া মুখ থেকে গলগল করে বের করে দিতে দিতে চালানো শুরু করে দিলো তার কথার তরবারি। ‘বইগুলো এখানে কেন?’
টেবিলের ওপরকার বইগুলো গোছাতে গোছাতে আমি বললাম, ‘এইমাত্র একজন কাস্টমার এসেছিল, বইগুলো টেবিলে রেখে গেল। বলল আসছি। নেব।’
‘আসছি, নেব …’ ভ্রু কুঁচকে উঠল তার। টেকোমাথায় একতাল আলো চিৎকার করে পালাল। ‘আরে শূকরছানা, কত মানুষই তো আসছে-যাচ্ছে। তাতে তোমার কী? আবার যখন আসবে, তখন আবার বের করে দেবে। এখানে এভাবে ফেলে …!’ সিগারেটে আরেকটা কষে টান দিয়ে, ‘তোমার মতো গেঁওচোদা, শূকরছানা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। বুঝলে বোকাহাঁদা কোথাকার।’
যারা তাকে চেনে শুধু তারাই বলতে পারবে। সে যখন কথা বলতে থাকে, তার এবড়ো-খেবড়ো টেকোমাথায় আলোর নানা রকম খেল শুরু হয়। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তাই দেখছিলাম আর তার কথা গলাধঃকরণ করে চলেছিলাম।
এরপর মাথায় আরো কয়েকটা আলোর নাচন খেলিয়ে সে এক বইয়ের নাম করল। আমি বললাম বইটা বিক্রি হয়ে গেছে। মাথায় যেন আলোর বাজ পড়ল এভাবে সে মাথা ঘোরাতে একটা আলো খেলে উঠল।
‘মানে কী? এটা একজন চেয়ে রেখেছে …। এই গাধার হাড্ডি, বইটা বিক্রি করেছিস কেন? আচ্ছা বল তো দেখি, কেমনতর হারামি বাপচোদা তুমি? এখন আমি তাকে কী বলব?’
‘আপনি তো কিছু বলেননি যে …’ আমার কথাটা সে শেষ করতেও দিলো না, ‘এত কিছু বুঝো এই হোগা বুঝো না। বইটা যে পেছনে রেখেছি। ভুল করেছিস আবার মুখে মুখে তর্ক করিস, শূকরছানা কোথাকার।’ তার কথা সে বলে গেল। বলতে বলতে কম্পিত হাতে বইয়ের তাকে বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। ঠোঁটে ঝুলছে আধপোড়া গোল্ডলিফ রেগুলার।
মালিক সাহেবের টেকোমাথার আলোর ঝলকে কিনা জানি না, নাকি চোখের ভেতর কিছু পড়লই কে জানে! চোখে অঝোরে জল গড়াতে শুরু করল। আমি পেছন থেকে টেকোমাথার দুদিকে বড় বড় কুলোর মতো কানদুটো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম এই কানদুটো যদি রামছাগলের কানের মতো লম্বা লম্বা হতো আর ঝুলন্ত হতো তাহলে কেমন হতো! তারপর হঠাৎ একটি প্রশ্ন মনে উদয় হলো, আচ্ছা মানুষ খুন করে কেন? কিংবা ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের রাশকলনিকভ বুড়িটাকেই বা খুন করল কেন? অদ্ভুত মানুষের মন ও তার মনঃস্তত্ত্ব। এর মধ্যে আরো কিছু গরল সিসা আমার কর্ণকুহরে বর্ষিত হলো। আমি চুপসে শুনে গেলাম।
‘আর, আর, আর অত পড়া কিসের? ওইসব উচ্চ বিলাস, উচ্চাশা ছেড়ে দাও তো হাঁদারাম। নিজের খাবারের প্লেট আর পরনের প্যান্টটা সামলাও আগে।’ বলতে বলতে দোকান মালিক টাকে একটা প্রবল ঝিলিক খেলিয়ে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে। হাতে একটা ঢাউস বই।
এখানে মনে পড়ছে শ্রদ্ধেয় এক বড় ভাইয়ের কথা, যিনি আমাদের ওপরের তলায় ফার্স্ট-ফ্লোরে একটি বইয়ের দোকানে বসেন। মাঝেমধ্যে এখানে এসে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে যান। বাঁ-দিকে সিঁথি কাটেন। সাদা ফকফকে মাঝারি মাপের চুল। তিনি আমাদের এখানে এসে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে যেতেন। বইটই নানান হাবিজাবি নিয়ে তার সঙ্গে আমার কথা হতো। তিনি হলেন পাঁড়পড়–য়া একজন মানুষ। কথা প্রসঙ্গে সেদিন তিনি চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে বললেন, ‘কখনো মালিকপক্ষকে নিজের দুর্বলতার কথা জানাবেন না।’ তিনি ছোট-বড় সবাইকে আবার আপনি করে সম্বোধন করতেন। বললেন, ‘এটা করেছেন তো বিপদে পা দিয়েছেন। কারণ আমাদের এদেশে মালিক আর কর্মচারীর মধ্যে নিছক দাস আর মনিবের সম্পর্ক – এটা যেই ভুলেছেন তো মরেছেন। বরং মালিক-কর্মচারী সম্পর্ক আগের মধ্যযুগের দাস-মনিবের চেয়ে জঘন্য। কারণ মনিবের দাসের জন্য একটা দায় থাকে। এখানে সে-দায়ও নেই; আবার দাসত্ব ষোলো আনা। যদি একবার সে আপনার দুর্বলতা ধরতে পারল, তাহলে আপনার দুর্বলতা ধরে ধরে সে পাইপাই করে সে-সুযোগ নেবে। যেমন আপনার হয়েছে।’ আমাকে সম্বোধন করে তিনি বললেন। শীর্ণকায়, কালো রঙের রঙিন মনের এই মানুষটি সেলাই করা গজ কাপড়ের প্যান্ট আর ফুলহাতা শার্ট গায়ে দেন। সেদিন তাকে আমি বললাম, ‘এই ভুল আমি আর করব না।’
সমাজ এক অদ্ভুত হিসাবে বিশ্বাসী। সে দাস পালবে। দরকার হলে দিনে গরিবদের বিনে পয়সায় একটা করে গরু খাইয়ে হলেও। সুতরাং দাসত্ব থাকবে; কিন্তু মনিব বা দাস থাকবে না। আর তা আমার মালিক ভালো করেই জানেন। আমার আগাগোড়া জেনেও নিয়েছিলেন কাজে যোগ দেওয়ার আগেই। আমিও খুশিমনে বলেছিলাম। কিছু সুবিধা, সহানুভূতি পাওয়ার আশায়। তা-ই শেষ পর্যন্ত আমার কাল হলো। বস্তুত পৃথিবী হলো যুদ্ধের জায়গা। এখানে তোমাকে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে। দয়াধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এসেছ। যুদ্ধ করো। বাঁচো। নয় অক্কা।
দোকানে বই পড়া নিয়ে সবসময়ই সে এটা-সেটা বলে থাকে। কাস্টমার নেই। বেচাবিক্রি নেই। কতক্ষণ এভাবে বসে থাকা যায়! তাই না বই নিই। তবে এই অকথ্য বকুনির পর মালিকের দোকানের বই ধরতে আমার কেমন জানি ঘৃণা লাগতে লাগল। নিজের ওপর ঘৃণা লাগছিল। রাগ লাগছিল। মরার চোখ নিয়ে হয়েছে আরেক যন্ত্রণা। চৈত্রমাসের খরায় সেখানে নেমেছে শ্রাবণধারা। টেকোমাথায় ঝলক তুলে মালিক বেরিয়ে যাওয়ার পরপর ঢুকল আমার রুমমেট, বন্ধু। সে কেবল মিনিটখানেক আমার দিকে চেয়েই রইল। ওকে দেখে আমার হৃদয় আরো আকুল হয়ে উঠল। খাঁচার পাখির মতো ছটফট শুরু করে দিলো। নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করে আমি আমার বন্ধুর দিকে চাইলাম। একটু-বা হাসলামও।
খানিক সময় এভাবে কাটানোর পর ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই যদি এখানে থাকিস তবে আর আমার সঙ্গে থাকিস না, কেমন? কারণ আত্মসম্মানহীন এমন মানুষের সঙ্গে আমি বসবাস করতে পারি না।’ ব্যস শেষ। অবশ্য এখানকার পরিস্থিতি কমবেশি ও আগে থেকেই কিছুটা শুনেছে। সেটা নিজ চোখে দেখার পর তার অভিব্যক্তি ছিল এরকম।
ছোটখাটো শরীরের তীক্ষ্ণ নাকের ভিক্টর হুগোর মতো দাড়িগোঁফওয়ালা আমার বন্ধু বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। টেকোমাথা দোকানে ফিরলে আমি বলে বেরুলাম, ‘বাইরে বন্ধু এসেছে, একটু যাব।’ সে পলকহীন চোখে আমাকে কয়েক মুহূর্ত দেখল। তার মুখের অভিব্যক্তি হলো, এত কিছুর পরও আমি বন্ধু বন্ধু করছি কেন! ‘উম্, আচ্ছা যাও।’ অনুমতি মিলল। যদিও সে জানত না এটাই তার দেওয়া শেষ অনুমতি আর আমারও শেষ আবেদন। অবশ্য বেরোনোর আগ পর্যন্ত আমিও জানতাম না।
পেছনে আর না তাকিয়ে আমি সোজা বেরিয়ে গেলাম বন্ধুর সঙ্গে। বাসার উদ্দেশে বাসে উঠে বসলাম। আমাদের কোনো কথা হচ্ছে না। বাসের সিটে আরাম করে বসার কিছুক্ষণ পর বন্ধু বলল, ‘এবার ফেসবুক, নম্বর ডিঅ্যাকটিভ কর।’ করলাম।
এর সঙ্গে আরেকটি যে ভালো লাগার ব্যাপার ঘটল সেটা হলে তুমি। টুনু! দেশের সবচেয়ে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হয়ে গেলে। তুমি বলেছিলে, চলো আমরা কোথাও চলে যাই। কিন্তু আমাদের কোথাও যাওয়া হলো না। তুমি যখন দেশের সবচেয়ে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, আমার এতদিন যাও একটা অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা ছিল, তাও ছেড়ে দিলাম। বন্ধু বলল, ‘কিছু তো একটা হবেই। হয়ে যাবে।’ কিন্তু এই মন্দার বাজারে চাকরিটা যে মোয়া নয় তা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝেছি সে-সময়। আর জেনেছি মানুষ কেন এত কিছুর পরও দাসত্ব মেনে নেয়।
তবে সেই দিনটি আমি ভুলব না কোনোদিন। সেই মুক্তির স্বাদ! মুক্তবিহঙ্গের সুখ বুঝি এমনই হয়! আমি এটা জানতাম না। আহ্, আমার চারদিকে সুখ খেলা করছিল। বাসে ওঠার পর পৃথিবীর আর সব আমি ভুলে গিয়েছিলাম মুক্তির আনন্দে। আমাদের সামনের সিটে এক জোড়া প্রবীণ দম্পতি বসেছিল। তারা একে অপরের খুব ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে বসেছিল – যেখানে আশ্চর্য ভালোবাসা গোলাপের মতো ফুটে উঠেছিল। বন্ধুকে ইঙ্গিত করলাম। সেও মাথা নাড়াল।
বাসটা শংকরের সামনে এসে জ্যামে আটকা পড়ল। রাস্তায় একটা শিশুকে দেখলাম ময়লায় চুল জট বেঁধে আছে। চোখে পিচুটি। মুখে ময়লার ছোপ। ফ্রকটা জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। অন্ধ। মেয়েটির হাতে একটা সিসার বাটি, ঝাঁকাচ্ছে : ‘সাব, কিছু, কিছু দিয়া যান। সাব, সাব, সাব, কিছু দ্যান …।’
বাটিতে দু-একটা কয়েন। ঝাঁকানোর কারণে পয়সাগুলো ঝনঝন করছে। সবাই মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি কেঁদে ফেললাম। বন্ধু সেটা লক্ষ করল হয়তো। আমার চোখে কেবল ভাসছিল কনকর্ডের আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই বিভীষিকাময় বইয়ের দোকান। যেখানে কিছুক্ষণ আগেও আমি বন্দি ছিলাম।
জ্যামটা ছেড়ে দিলো। বাসটায় আবার গতি সঞ্চারিত হলো। হাওয়ায় বাড়ি খেয়ে এগিয়ে গেল বাস। বাতাস ঘূর্ণি খেয়ে আমার চোখমুখে এসে আছড়ে পড়ল। মুহূর্তে আমি পৃথিবীর আর সব ভুলে গেলাম।
চাকরি ছেড়েছি মাস দেড়েক হয়ে এলো। জীবন ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। পরাজয় স্পষ্ট। বাড়ির পথটা আমার দিকে হা-মুখো অজগরের মতো চেয়ে আছে। মাসের পর মাস বাসায় বসে আছি। চারদিক থেকে যেন শূন্যতা ধেয়ে আসছে।
বন্ধু গেছে ভ্রমণে। একা একা বাসার বাতাস পাথরের মতো ভারী হয়ে বুকের ওপর চেপে বসে আছে। পেটে থাকলে নাকি পিঠে সয়। টাকা হলে নাকি বাঘের চোখও মেলে। কিন্তু পকেট খালি থাকলে চারদিক যে কতটা সংকুচিত হয়ে যায়, তা আমি জানি। পৃথিবীটা যেন বাসার দুয়ার পর্যন্ত এসে থেমে গেছে। হাতে টাকা-পয়সা না থাকলে খাবারেরও তো কোনো ঠিকানা থাকে না। দারিদ্র্যের কারণে তো ক্ষুধাও থেমে থাকে না। ওদিকে বাসায় খাবার নেই কিচ্ছু। একতলা বাড়িটার সামনে আম কাঁঠাল মেহগিনি তালগাছ। কত পাখি এসে কিচিরমিচির করে যায়। আমি ঘরের সামনের লনের মতো জায়গাটায় গিয়ে বসলাম। পাখির গানের ভেতর এক নরম শক্তি আছে, যা ক্ষুধার তাড়না ভুলিয়ে দেয়। পাখির গানের ভেতরই সন্ধ্যা নেমে এলো। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে গেলাম। একটা নাম-না-জানা পাখি ডেকে উঠল। আদুরে, করুণ আর বুক চিরে কলজে বিদ্ধ করার মতো। অসহায়ত্ব মানুষকে ব্যক্তিত্বহীন এক সত্তায় পরিণত করে। আমি আর্তচিৎকারে ভেঙে পড়লাম। নিঃশব্দ সেই চিৎকার আমি গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে চেপে ধরলাম যাতে পৃথিবীর কেউ শুনতে না পায়। আমি কাঁদছি। কেন কাঁদছি? বোধহয় পাখির গানটা আমার খুব করুণ মনে হয়েছিল।
রাত নেমে এলো। প্রকৃতি নিজের মতো লুকালো রাতের ঠান্ডা বুকে। কেমন উষ্ণ আর জীবনীশক্তি ছড়ানো একটা বাতাস এলো। বড় করে আমি একটা শ্বাস টানলাম। আমার বুকটা ফুলে উঠল। ফুলে-ওঠা বুকটার তলেই টের পেলাম পেট আমার কত কাতর হয়ে উঠেছে। আগ্রাসী। প্রায় জ্ঞানশূন্য হয়ে এ-রুম ও-রুম করতে লাগলাম। পৃথিবীটাকে মনে হলো চিবিয়ে খেয়ে ফেলি। পাগলের মতো চুলার এদিক ওদিক হাতড়ালাম। কিছু নেই। মশলা রাখার পিঁড়িটার তলে হাত দিতে গোল গোল কী যেন ঠেকল। বের করে দেখি আলু। বিক্রমপুরের খাঁটি ডায়মন্ড। পাঁচ-ছয়টা। সঙ্গে সঙ্গে আলুগুলো চুলায় বসিয়ে দিলাম। শান্তি শান্তি। বুক আবার ফুলে উঠল। ভয়ানক একটা চাপ বোধ করলাম বুকে। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
আগামীকাল একটা বায়িং হাউসে চাকরি হওয়ার কথা আছে। চাকরির স্থায়িত্বকাল রোজার মাস। মূলত ঈদটাকে ঠেক দেওয়া আর কী। আমার এত ভেবে কাজ কী! চাই কাজ। সেটা ট্যাঙ্ক সাফের কাজ হোক আর এক মাসের জন্য কোনো বায়িং হাউসই হোক – কোনো তফাৎ নেই। বরং আমি আমার সুভাগ্যে গদগদ। জীবনে এমন সৌভাগ্য বুঝি মানুষের কদাচিত মেলে। সামনে থেকে যখন সকল শুভানুধ্যায়ী অদৃশ্য হয়ে গেছে একে একে। চাকরি মিলছে না কোনো। দুর্বিষহ জীবন। মুখচেনা এক সাধারণ পরিচিতের মাধ্যমে হয়ে গেল এ-কাজটা। সে যে আমাকে পছন্দ করে, সেটা জানতে পারি এই কাজে নিয়ে যাওয়ার সময় তার স্বীকারোক্তিতে। কী বিচিত্র পৃথিবী! এতদিন ধরে একই মার্কেটে কাজ করি! সত্যি হলো, কে কার জন্য কী ভেবে রেখেছে মনে আর কী করবে সেটা কে জানতে পারে।
চাকরিতে লেগে গেলাম। আশপাশে খোঁজ করতে লাগলাম কারো লোক লাগে কি না। কারণ এখানের স্থায়িত্ব তো সীমিত। কিন্তু কারো তো লোকও লাগে না। তবু কি আশার শেষ আছে মানুষের। না অনুসন্ধানেরই ইতি আছে। আমিও অনুসন্ধান ছাড়িনি। ছাড়ব কেন? ছাড়লে কী হবে? কাজ তো আমাকে পেতেই হবে।
কাপড়ের দোকানে ঈদের সময় প্রচণ্ড চাপ থাকে। আনকোরা সেলসম্যান। মালিকও সেই আনকোরা। পোশাকের ব্যবসার ব্যাপারে আমিও যা, সেও তাই। মালিক আগের মালিকের কাছ থেকে দোকান এবং দোকানের সব রদ্দি মাল কিনে নিয়েছে। কাস্টমার এসে শুধু ঘুরে যায়। ওল্ড মডেল হওয়ার জন্য পছন্দ হয় না। কাপড় বের করে স্তূপ করে রেখে কাস্টমার চলে যায়। সারাদিন গোছগাছ আর কাস্টমারকে কনভিন্স করতেই চলে যায়। অবশ্য ইদানীং কিন্তু প্রচুর কথা বলি। সেটা পূর্বপরিচিত যে কেউ দেখে বিশ্বাস করবে না। সেই যে তুমি চাবিটা মেরে দিলে। দুটো হাত যন্ত্রচালিতের মতো কেবল নড়তে থাকে, আর মুখ কথা বলতে থাকে। রাত হলে হাতদুটো মৃতের মতো দুদিকে ঝুলে পড়ে। মাঝে এক দুঃসহ ক্লান্তি নিয়ে বাসার পথ ধরি। চোখের পাতায় ঘুমের পাহাড় এসে ভর করে। ঘুমিয়ে পড়ি।
এটা ঠিক কাজে প্রচুর ভুল হয়। কাস্টমার আকৃষ্ট করতে পারি না সেভাবে। ছড়ানো মাল গোছাতে জানি না সেভাবে। হায়, জীবনে কি কোনোদিন কোনো গোছগাছের মধ্যে থেকেছি! এক সপ্তাহের মধ্যে দুবার মালিকের বকুনি খেয়ে ফেলেছি। এদিকে মালিকও ঠিকমতো বোঝে না, ভুলটা আসলে কোথায় হচ্ছে আর বকাটা ঠিক কখন দিতে হবে। এসবের পরও দুশ্চিন্তা কিন্তু আমার নিত্যসঙ্গী। মাসটা গেলেই তো আবার সেই বেকারত্বের গ্লানি। তার চেয়ে বড় কথা, এই শহরে টাকা ছাড়া কীভাবে আর চলব। থাকা-খাওয়া কী করে চালাব? বকুক। হ্যাঁ, বকুক যত খুশি। তাতে আমার কী। আমার দরকার কাজ।
তাছাড়া কর্মচারী মানে তো দাসত্ব। স্রেফ মাসখানেকের জন্য পাঁচ হাজার টাকায় তোমার সময়টাকে কিনে নেওয়া। এরপর যা-তা করার ক্ষমতা মালিকের থাকবে। চাবকানো থেকে নিয়ে অপমান – সব। সেটা তো আমি মেনে নিয়েছি। এই শহরে যে ছয়-সাত মাস ধরে অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেকার জীবন কাটাচ্ছে সে তো স্রেফ একটা ভিক্ষুক। চাকরির যে কী মূল্য সেটা তো আর আমাকে বোঝাতে হবে না। চাকরি আমার কাছে সোনার হরিণের মতো। আগে তো বাঁচতে হবে! আগে তো বাঁচো। ভেতরের যে-আগুন, সে-আগুনে পুড়ে পুড়ে নিজেই শুদ্ধ হও। বিপ্লবের কথা ভুলে যাও। গলায় পরে নাও দাসত্বের শিকল। যদিও এটা স্রেফ দাসত্বেরই একটা নয়া ফর্ম। তাতে কি এসে-যায়। তবু যদি কেউ কিনে নেয়, তাহলে কেন বিকোবো না? যখন ন্যূনতম আলো আসার ফুটোরও কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ এক সিঁড়ি ওপর থেকে ঈশ্বর পর্যন্ত – সবার কাছে আমার একটা কাজ চাওয়ার কর্ম সমাপ্ত হয়েছে; কিন্তু কাজটা কেউ দিতে পারেনি। দিয়েছিল সেই স্বল্পপরিচিত এক লোক। অবশ্য আমার মতো মাদ্রাসাপড়–য়া অসামাজিক পরিবারচ্যুত বিভ্রান্ত নিঃসঙ্গ বাউন্ডুলেকে কেই-বা কাজ দেবে। যার নেই কোনো অ্যাকাডেমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা। যদিও কাজের জন্য আমি জীবনও দিতে প্রস্তুত। কিন্তু সেই কাজ মেলার আমি কে?
আস্ত সমাজটা দেখো, মানুষ সুখী করতে চায় এমন একজনকেই যার সুখ উপচে পড়ছে। যার অঢেল আছে, তাকেই মানুষ দু-হাতে দেয়। যার নেই, তার কথা যেন শকুনও ভুলে যায়। অবশ্য আমার এই ভাগাড়ে-জীবনের জন্য দায়ী কি আমি? হয়তো না। সম্ভবত আমার পরিবার। আমাকে তারা তাদের স্বর্গপ্রাপ্তির তুরুপ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। করেছেও তাই। তার জন্য কি না করা হয়েছে আমার সঙ্গে। আমি মাদ্রাসা থেকে পালিয়েছি। পায়ে শেকল পরিয়েছে তারা। স্বর্গপ্রাপ্তির এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো কসুর করেনি। স্কুলে পড়ব। সে-আশায় গুড়ে বালি। নাসারাদের শিক্ষা! ‘তওবা’ – বাবা জিব কেটে বলেছে, ‘ত্যাজ্য করে দেবো। অমন সন্তান আমার চাই না।’ বাবার সামাজিক পুরুষতান্ত্রিক মর্যাদাবোধ তার বাবাত্বকে ছাড়িয়ে তার ধর্মীয় মূর্তিকে এমন পাষাণে পরিণত করেছিল, যা আমাদের এদিকে বড় একটা দেখা যায় না। যে কারণ মারতে মারতে আমাকে ব্যথার ইনজেকশন দিতে হয়েছে তার। একজন বাবার পক্ষে তা যে কতটা অসহনীয় তাও প্রথম দেখেছি। মেরে সে নিজেই যেন পাগল হয়ে গেল। কেঁদে কেঁদে দৌড়াল ডাক্তার ডাকতে। আহ্, অসহায় বাবাত্ব। যার দেখা মিলত ক্বচিত। কারণ সবসময় সে তার ধর্মীয় মূর্তির খোলসে বন্দি হয়ে থাকত। আমি শুধু প্রতীক্ষায় ছিলাম কবে আসবে সেদিন, যেদিন এদের ছেড়ে এমন কোথাও চলে যাব – এদের কেউ যখন আমার টিকিটিরও দেখা পাবে না।
শুধু যে আমাকে পিছে থেকে একটু হলেও টানবে, তিনি আমার মা। তুমি কেমন আছো মা? ছোট্ট ওই ভিটার মধ্যে তোমার জীবনের গণ্ডি। আটাশটা বছর এখানে তুমি কাটিয়ে দিয়েছ। কত ঝড়-অত্যাচারই না তুমি সয়েছ। কেন তুমি এই দণ্ড বরণ করে নিয়েছ। তোমারই ছেলে আমি। স্রেফ তিনটা ঘর আর উঠোন। কী করে তুমি থাকো এভাবে! তুমি আমার প্রথম এবং সর্বোচ্চ বিস্ময়। তোমার জন্য আমার বুকটা ছিঁড়ে যায় মা। যখন দেখি আরো সকলের মা কীভাবে জীবনটা উপভোগ করছে। পৃথিবী, যদি কারো জন্য তুমি কাঁদার প্রয়োজন বোধ করো আমার মার জন্য কেঁদো। কারণ এই বন্দি রাজকন্যাকে বাঁচানোর জন্য কোনো রাজকুমার তৈরি হয়নি পৃথিবীতে।
রোজার মাসও কেটে গেল। যেন পলকের মধ্যে। পাশের দোকানের আদিবাসী মেয়েটাকে দেখে বুকে মাঝে মাঝে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করি। অনেক দিন পর কেন যেন তোমাকে ফোন দিতে মন চাইল। দিলাম। ধরলে। নাম বললাম। তুমি কেটে দিলে। আবার দিলাম। কিন্তু ব্যস্ত দেখাল। এর মানে তুমি আমার নম্বর ব্লক করে দিলে। বেশ করেছ। আমার সঙ্গে কে কথা বলে। না-মানুষদের কি কোনো প্রেম থাকতে পারে! এরা তো পাথর। জঞ্জাল। ইদানীং নিজেকে ব্যবহৃত কনডম, গ্রামের ময়লার স্তূপে পড়ে থাকা মাসিকের ত্যানার চেয়ে ঘৃণ্য, অযোগ্য মনে হয়।
ঈদ চলে এলো। পাশের দোকানের পাহাড়ি আদিবাসী মেয়েটা আমাকে দেখে মৃদু মৃদু হাসি উপহার দেয়। শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের এই হাসির সম্পর্ক বজায় থাকল। ঈদের দিন রাত। চলে আসব। সেদিন সে এগিয়ে এলো। ছোট্ট আর মিষ্টি একটা হাসি বিনিময় হলো। এই। সম্পর্ক, কী আশ্চর্য একটি কারুকাজ। চলে এলাম অনিশ্চয়তার পাহাড় মাথায় নিয়ে। এর মধ্যে একটা পত্রিকায় চাকরির কথা হচ্ছে। ঈদের ছুটির পর ডেকেছে। দেখা যাক, সময় কী ব্যবহার করে আমার সঙ্গে।

Leave a Reply