সাজ্জাদ জহীর : জীবন ও কর্ম

লেখক:

জাফর আলম

প্রগতিশীল লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কমরেড সাজ্জাদ জহীরের নাম উপমহাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনে এবং উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। এখনো প্রগতিশীল লেখক সংঘ ভারত ও পাকিস্তানে চালু আছে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানে প্রগতিশীল লেখক সংঘ (PWA) নিষিদ্ধ করা হয়। তখন সংঘের মহাসচিব ছিলেন প্রয়াত প্রখ্যাত উর্দু লেখক আহমদ নাদিম কাসমী। দেশের প্রবীণ-নবীন খ্যাতিমান উর্দু লেখকরা এই সংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এমনকি বাবায়ে উর্দু মৌলভি আবদুল হক পাকিস্তানে প্রগতিশীল লেখক সংঘের বার্ষিক সম্মেলনে (১৯৫৩) গিয়ে সভাপতিত্ব করেন।

সাজ্জাদ জহীরের জন্ম ৫ নভেম্বর ১৯০৫ সালে লখনউর গোলাগঞ্জে। এমন সময়ে সাজ্জাদ জহীরের জন্ম যখন নতজানু আবেদন-নিবেদনের রাজনীতির ক্রমশ অবনতি ঘটছিল আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছিল। সে-সময়কার বৈশিষ্ট্য ছিল ক্রমান্বয়ে ছোট ছোট জাতীয় রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকারের দ্বৈতনীতি একদিকে শাসন-সংস্কার, অন্যদিকে ভারতীয়দের ওপর নির্যাতন চরমে পৌঁছেছিল।

ব্রিটিশ সরকার ভারতের ডোমিনিয়ন মর্যাদা দানের প্রতি অঙ্গীকার থেকে সরে আসছিল। উত্তেজিত ভারতবাসীকে খুশি করার জন্য ব্রিটিশ সরকার মন্টেগু-চেমস্ফোর্ড সংস্কারের মুলো ঝুলিয়ে দেয়। পরবর্তীকালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। কাকরী মামলা লখনউ শহরেই অনুষ্ঠিত হয়। এতে রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লাহ, হাসরত ওয়ার্সি, রওশন সিং, ডা. রাজেন্দ্র লাহিড়ীকে ফাঁসি এবং অনেককে দীর্ঘমেয়াদি জেল দেওয়া হয়।

এমনি রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে সাজ্জাদ জহীর লখনউর সরকারি জুবিলী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। তারপর অক্সফোর্ডে উচ্চতর শিক্ষার জন্য চলে যান। উল্লেখ্য, লখনউ শহরের সর্বজনসম্মানিত উর্দু কবি পন্ডিত ব্রজনারায়ণ চকবন্ত (একজন পেশাদার আইনজীবী) ১৯১৬ সালে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কংগ্রেস ঐক্য সম্মেলনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। লখনউ শহরের এই রাজনৈতিক স্রোতধারায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক তরুণকে লেখক সংঘে অংশগ্রহণে আকৃষ্ট করে। এঁদের মধ্যে আশরারুল হক মমতাজ, আলী সরদার জাফরী এবং কাইফি আজমীর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

সাজ্জাদ জহীর মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯১৯ সালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আট বছর তাঁর লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা নেন। সেখানে তাঁর জীবনের গতি-পরিবর্তনে দিকনির্দেশনা লাভ করেন।

সাজ্জাদ জহীর যখন ইংল্যান্ড পৌঁছেন, তখন ভারতীয় ও অন্যান্য উপনিবেশ দেশ থেকে আগত ছাত্ররা ব্রিটিশ রাজধানী লন্ডনে বসে উপনিবেশ শাসনের অবসানের জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। এমনকি শ্যামজী কৃষ্ণ ভার্মা, ভি ডি সাভারকার এবং মাডাম ভিকাজি চামা প্রকাশ্যে উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার জন্য প্রচারকাজ চালাচ্ছিলেন। সান ফ্রান্সিসকোতে গঠিত গাহদার পার্টির আদর্শে অনুপ্রাণিত লন্ডনে শিক্ষারত অনেক ভারতীয় ছাত্র পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে ও এর উন্নয়নে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

নিউইয়র্ক, ভ্যানকুভার, লন্ডনে অবস্থানরত ভারতীয়রা যেহেতু উপনিবেশ থেকে আগত তাই পদে পদে অপদস্থ হচ্ছিল। ফলে ভারতের অভিজাত পরিবার থেকে আগত ছাত্রেরাও কমিউনিস্ট এবং সমাজবাদী আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যদিও তাঁদের পরিবার থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানে কঠোর বিরোধিতা করা হয়। সাজ্জাদ জহীর সেই তরুণ ছাত্রদেরই একজন।

সাজ্জাদ জহীর ১৯২৭ সালে ইংল্যান্ডে যান, ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।  সেখানে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস লন্ডন শাখার সক্রিয় সদস্য হিসেবে ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন।

অক্সফোর্ড থেকে ভারত শিরোনামে একটি মুখপত্র ভারতীয় ছাত্ররা প্রকাশ করেন। সাজ্জাদ জহীরকে ভারত সাময়িকীর সম্পাদক মনোনীত করা হয়। কিন্তু সাজ্জাদ জহীরের নেতৃত্বে প্রগতিবাদী আন্দোলনের জের হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষ ভারতের প্রকাশনা বন্ধ করে দেন (১৯২৯)। সাজ্জাদ জহীর সে-সময়ে কমিউনিস্ট-সমর্থক ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করতেন।

সাজ্জাদ জহীরের বাবা সৈয়দ ওয়াজির হাসান ছিলেন লখনউ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তাঁর ইচ্ছা ছিল ছেলে লন্ডন থেকে ফিরে ভারতে আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে সুনাম অর্জন করবে। কিন্তু সাজ্জাদ জহীর ভারতে ফিরে এসে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই আদর্শ অনুসরণ করেন।

১৯৩৫ সালে বিশেষ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লন্ডনে একদল ভারতীয় ছাত্র প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন সংগঠিত করতে মনস্থ করেন। এর জন্য একটি খসড়া ম্যানিফেস্টো লেখা হয়। এই ম্যানিফেস্টো ভারতের খ্যাতনামা লেখকদের কাছে প্রেরণ করা হয় এবং তাঁদের মতামত যাচাই করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যাঁরা এই আন্দোলন পরিচালনার জন্য ম্যানিফেস্টো রচনা করেন, তাঁরা হলেন – ড. মুলক রাজ আনন্দ, প্রমোদ সেনগুপ্ত, ড. মোহাম্মদ দীন তাসির, ড. জয়তী ঘোষ এবং সৈয়দ সাজ্জাদ জহীর।

এঁরা ভারতে ফিরে, বিশেষত সাজ্জাদ জহীর, প্রবীণ লেখকদের সঙ্গে খসড়া ম্যানিফেস্টো নিয়ে অনেকবার বৈঠক করেন। প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন পরিচালনার ব্যাপারে হ্যাঁ-সূচক সম্মতি দেন অমর হিন্দি কথাশিল্পী মুনশি প্রেমচন্দ, মৌলভি আবদুল হক, জোশ মলিহাবাদী, ফিরক গোরকপুরী, ড. তারাচান্দ, প্রফেসর অমরনাথ ঝা, প্রফেসর হীরেন মুখার্জি এবং কাজী আবদুল গাফ্ফার। সাজ্জাদ জহীর তাঁর বন্ধুদের নিয়ে পাঞ্জাব সফর করেন, সেখানে ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সহায়তায় অনেক খ্যাতিমান সাহিত্যিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাঁরা হলেন – মিয়া বশির আহামদ, আবদুল মজিদ মালিক, গোলাম রসুল মেহের, সুফি তাবাসসুম এবং তরুণ লেখক আহমদ নাদিম কাসমী। বিভিন্ন অঞ্চলের উর্দু লেখকদের সাড়া পেয়ে ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিল লখনউ শহরে প্রগতিশীল লেখক সংঘের নিখিল ভারত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মুনশি প্রেমচন্দ। এখানেই প্রকৃতপক্ষে প্রগতিশীল লেখক সংঘ ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এরপর সাজ্জাদ জহীর মোহাম্মদ তাসির এবং প্রফেসর আহমেদ আলীসহ কলকাতা সফর করেন এবং সেখানে লেখক সংঘের শাখা উদ্বোধন করেন। ড. মুলক রাজ আনন্দ সংঘের কর্মকান্ডের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন কিন্তু তেমন কার্যকর সহায়তা দেননি। অন্যদিকে প্রেমচন্দ বিহারে সংঘের শাখা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বেচ্ছায় সম্মতি দিলেও তিনি ইতোমধ্যে মারা যান। সংগঠনের জন্য কাজ করার তেমন কেউ ছিল না। সাজ্জাদ জহীর হয়ে যান একা। অবশ্য এ-সময়ে সাজ্জাদ জহীরকে সহায়তার হাত বাড়ান ড. বশীর জাহান, তাঁর সুযোগ্য স্বামী মাহমুদুজ্জাফর এবং তরুণদের মধ্যে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সরদার জাফরী, সিব্তে হাসান এবং মখদুম মহীউদ্দিন। ১৯৪৭ সালের পর এগিয়ে আসেন খ্যাতিমান পাকিস্তানি উর্দু লেখক আহমদ নাদিম কাসমী (তখন তিনি তরুণ)। প্রগতিশীল লেখক সংঘের ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত যে-অগ্রগতি সাধিত হয়, তাতে সাজ্জাদ জহীরের সংগঠন-প্রতিষ্ঠায় দক্ষতা, একাগ্রতা এবং তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ বিশেষভাবে কাজ করেছে।

১৯৩৫ সালের নভেম্বর মাসে কমরেড সাজ্জাদ জহীর লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে এসে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যান। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের এলাহাবাদ শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পান। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্য মনোনীত হওয়ার পর তাঁকে বৈদেশিক বিষয়ে এবং মুসলমানদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগের বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এ-সময়ে তিনি সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুযোগ পান। তাঁর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সংগঠনের আত্মগোপনকারী নেতা পি সি যোশী এবং আর. ডি. ভরদ্বাজের দেখা হয়। কমরেড সাজ্জাদ জহীরকে কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সংগঠনের যুক্ত প্রদেশ শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। এ-সময়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মাসিক উর্দু মুখপত্র চিংগারী (অগ্নিস্ফুলিঙ্গ) সম্পাদনা করেন।

একই সময়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারবিরোধী কড়া বক্তৃতা দেওয়ার জন্য দুবছর জেল খাটেন। তাঁকে লখনউ কেন্দ্রীয় কারাগারে কারারুদ্ধ করা হয়। তাঁর স্ত্রী উর্দু লেখিকা রাজিয়া সাজ্জাদ জহীরের কাছে সে-সময়ে তিনি আবেগময় কয়েকটি পত্র লেখেন। এই পত্রাবলি পরবর্তীকালে নাকুশে জিন্দা (জেলের ছাপচিত্র) নামে ছাপা হয়। এই পত্রাবলি উর্দু সাহিত্যের পত্রসাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই পত্রগুলো ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট-প্রকাশিত সাজ্জাদ জহীরের উর্দু রচনাসমগ্র (আবরার রহমানি-সম্পাদিত) সাজ্জাদ জহীর কি মুনতখবতাহরিরি (‘সাজ্জাদ জহীরের নির্বাচিত রচনাবলি’) গ্রন্থে সংকলিত করা হয়েছে।

১৯৪২ সালে নিষিদ্ধ গোপন কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে সরকারি বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হলে কমরেড সাজ্জাদ জহীর কমিউনিস্ট পার্টির উর্দু মুখপত্র কওমি জং (জাতীয় সংগ্রাম) এবং নয়া জামানা (নতুন যুগ) সাময়িকীর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রকৃতপক্ষে কমরেড সাজ্জাদ জহীর ১৯৩০ সাল থেকে লন্ডনে অবস্থানকালে প্রগতিশীল লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি লন্ডন থেকে বেশ কয়েক দফা লখনউ সফর করেন। ১৯৩৫ সালে মূলত লন্ডনে সাজ্জাদ জহীরের নেতৃত্বে প্রগতিশীল লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা আগেই উল্লেখ করেছি।

প্রগতিশীল লেখক সংঘ এমন সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যখন ফ্যাসিবাদ সমগ্র মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ দেখা দিয়েছিল। বিশ্বের সাংস্কৃতিক সংগঠক, লেখক এবং শিল্পীদের কাছে ম্যাক্সিম গোর্কি প্রশ্ন রাখেন, ফ্যাসিবাদের ওই ভয়াবহ বিপদ থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য তাঁরা কী করছেন এবং কোথায় অবস্থান করছেন? তিনি বলেন, এখানে নীরব ভূমিকার কোনো অবকাশ নেই, বরং ফ্যাসিবাদকে রুখে দাঁড়াতে হবে, নতুবা স্বেচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক একে রুখে দাঁড়ানোর জন্য যাঁরা এগিয়ে আসছেন তাঁদের দিকে পরোক্ষভাবে হলেও সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভারতীয় লেখকরা প্রগতিশীল লেখক সংঘ গঠনের মাধ্যমে এগিয়ে আসেন। ১৯৩৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় প্রগতিশীল লেখক সংঘ। প্রগতিশীল লেখক সংঘের সঙ্গে আরো দুটি প্রতিষ্ঠার গঠিত হয় সেগুলো হলো – নিখিল ভারত কিষান সভা এবং ছাত্র কংগ্রেস। ছাত্র কংগ্রেসের পরে ছাত্র ফেডারেশন নামকরণ হয়।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রগতিশীল লেখক সংঘ ছিল একটি যুক্তফ্রন্ট। অথচ স্বার্থান্বেষী মহল একে কমিউনিস্ট পার্টির শাখা বলে উল্লেখ করতে দ্বিধা করেনি। প্রকৃতপক্ষে কমিউনিস্ট ছাড়া কংগ্রেসপন্থী, কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট, এমনকি নির্দলীয় উর্দু লেখক ও অন্যেরা যোগদান করেন এ সংঘে। সাজ্জাদ জহীরের নেতৃত্বে উর্দু লেখকদের এক বিরাট দল লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত হয়। এঁদের মধ্যে লেখালেখির জন্য অনেকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে মমতাজ, সরদার জাফরী, সাহির লুধিয়ানভী, মজরুহ সুলতানপুরী, জান নেসার আখতার (কবি জাভেদ আখতারের বাবা), কায়েফ ভূপালী, কাইফি আজমী, মখদুম মহীউদ্দীন কৃষণ চন্দর, রাজেন্দ্র সিং বেদী, শংকর শৈলেন্দ্র, গুরবখশ সিং, মখমুর জলন্ধরী এবং আরো অনেকে। প্রগতিশীল লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি করার জন্য কমরেড সাজ্জাদ জহীর প্রেমচন্দের নাম প্রস্তাব করলে এই প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয় (অনেকে তাঁকে ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ ‘বান্নেভাই’ নামে ডাকতেন)। লখনউতে অনুষ্ঠিত লেখক সংঘের নিখিল ভারত সম্মেলনে মুনশি প্রেমচন্দ সভাপতিত্ব করেন। প্রেমচন্দের সেই সভাপতির ভাষণ সারল্য ও বৈশিষ্ট্যে এখনো উর্দু সাহিত্যে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। উল্লেখ্য, এই সম্মেলনে সংঘের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন সাজ্জাদ জহীর।

সাজ্জাদ জহীরের উর্দু সাহিত্যজীবনের উন্মেষ হয় অঙ্গারে (অঙ্গার) উর্দু সাহিত্য সংকলন সম্পাদনার মাধ্যমে। এতে পাঁচটি ছোটগল্প স্থান পায়। উর্দু ছোটগল্প দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু। তাছাড়া রশীদ জাহানের একটি গল্প ও একটি নাটক ছাপা হয়। গল্পের শিরোনাম ছিল ‘দিল্লি কি সায়ের’ (দিল্লি-ভ্রমণ)। আর মাহমুদুজ্জাফরের ‘জওয়ামর্দি’ (পৌরুষ) মূলে ইংরেজিতে লেখা। সাজ্জাদ জহীর এর উর্দু তর্জমা করে অঙ্গারে সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেন।

অঙ্গারে সংকলন প্রকাশের পর উত্তর ভারতের মুসলিম সমাজে হইচই পড়ে যায়। উর্দু পত্রপত্রিকায় এর রচনার তীব্র সমালোচনা করা হয়। রক্ষণশীল সমাজের লোকজন অঙ্গারের লেখকদের ‘রক্ত চাই’ দাবি করে। ফলে ব্রিটিশ সরকার অঙ্গারের সংকলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে প্রেমচন্দ ও অনেক লেখক অঙ্গারের লেখকদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। প্রেমচন্দ বলেন, ‘প্রবীণ লোকেরা (তিনিও একজন) তাদের (অঙ্গারের লেখকদের মতামত) সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন, তবে তরুণ লেখকদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত আর তাঁদের বক্তব্য শোনা অবশ্যকর্তব্য।’

অন্যদিকে ইসমত চুগতাই, সাদত হাসান মান্টো, কাইফি আজমী এবং আরো অনেকে দাবি করেন, অঙ্গারে সমগ্র উর্দুভাষী যুবসমাজের চেতনাকে নাড়া দিয়েছে। আসলে অঙ্গারের লেখকেরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজের ধোঁকাবাজি, দখলবাজি, লোক-দেখানো সেবাকর্ম, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী আওয়াজ তোলেন। অবশ্য অতিরিক্ত আবেগ-উত্তেজনা তাঁদের নিয়ন্ত্রণহীন করেছিল – এ-কথা সাজ্জাদ জহীর নিজেই স্বীকার করেছেন। অঙ্গারে সংকলনের বিরুদ্ধে মিছিল-প্রতিবাদ সভা হয়েছে, কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। তবে সাজ্জাদ জহীর ও তাঁর বন্ধুদের যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল তাতে তাঁরা সফলকাম হয়েছিলেন।

ওইসব রচনার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়। বর্তমান যুগে সে-সময় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল তা অর্থহীন মনে হবে। কিন্তু ১৯৩৩ সালে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ভারতীয় রক্ষণশীল সমাজে এভাবে নির্ভয়ে অঙ্গারে অন্তর্ভুক্ত রচনা প্রকাশ করায় অনেক সাহসের প্রয়োজন ছিল। সাজ্জাদ জহীরের রচনা ‘জান্নাত কী বশারত’ (বেহেশতের সুসংবাদ) একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা, যা সাধারণ মুসলিম জনতাকে উত্তেজিত করা স্বাভাবিক ছিল, অন্যদিকে রশীদ জাহানের ‘দিল্লি কি সায়ের’ (দিল্লি-ভ্রমণ) গল্পে বলা হয়েছে, ফরিদাবাদ থেকে একজন মহিলা দিল্লি সফরে এসে কীভাবে বিপদে পড়েছিলেন, তার বর্ণনা দিয়েছেন প্রতিবেশী মহিলার কাছে। গল্পের বর্ণনামতে, ভদ্রমহিলার স্বামী তাকে ট্রেনে দিল্লি পৌঁছার পর রেলস্টেশনে রেখে কয়েক ঘণ্টা যাবত উধাও। দুশ্চিন্তায় মহিলার অবস্থা কাহিল। কয়েক ঘণ্টা পর ভদ্রমহিলার স্বামী ফিরে এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়।

অঙ্গারে সংকলনের গল্প মুসলিম সমাজের স্বার্থান্বেষী মহলকে ক্ষুব্ধ করেছিল তাদের অনেক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় বলে। তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অঙ্গারে সংকলনের বিরুদ্ধে গা-ঝাড়া দিয়ে রুখে দাঁড়ান। একথা অস্বীকার করার জো নেই, তৎকালীন অভিজাত সমাজপতি এবং মোল্লাদের সাধারণ মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রভাব ছিল। তাদের চেতনায় আঘাত করায় তারা অঙ্গারের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। অঙ্গারের মাধ্যমে সমাজে, বিশেষত যুবসমাজে, যে-আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, এই সাফল্যের জন্য কৃতিত্বের দাবিদার হলেন কমরেড সাজ্জাদ জহীর। তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অঙ্গারের রচনাগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

ভারত বিভাগের পর সাজ্জাদ জহীরকে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টিকে সংগঠিত করার জন্য প্রেরণ করা হয়। সাজ্জাদ জহীর পাকিস্তানে নবগঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

পাকিস্তানে আসার পর থেকে তৎকালীন লিয়াকত আলী সরকার সাজ্জাদ জহীরকে গলার কাঁটা মনে করছিল। ১৯৫১ সালে পিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় বিপ্লবী উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে সাজ্জাদ জহীরকেও গ্রেফতার করা হয়। আসলে এটা ছিল সাজানো মামলা।

পাকিস্তানে সাজ্জাদ জহীর সাড়ে চার বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। তাঁকে হায়দরাবাদ, সিন্ধু, লাহোর এবং কোয়েটা জেলে রাখা হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়ার পর সাজ্জাদ জহীর ভারতে চলে যান। পাকিস্তানে জেলে থাকাকালে তিনি লেখনী ত্যাগ করেননি। তিনি জেলে বসে লিখেছেন প্রগতিশীল লেখক সংঘের ইতিহাস রোশনাই (উর্দু) এবং জিকরে হাফিজ পারস্যের কবি হাফিজ সিরাজীর লেখার মূল্যায়নসূচক রচনা।

কমরেড সাজ্জাদ জহীর ভারতে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। তাঁকে ভারত থেকে ব্রিটিশ সরকার বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ এবং পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ভারতে অবস্থানের জন্য কমরেড সাজ্জাদ জহীরকে অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি প্রগতিশীল লেখক সংঘকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তাঁকে আফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের ভারতীয় শাখার সম্পাদক মনোনীত করা হয়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক আওয়ামী দউর (জনতার যুগ) সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে এই মুখপত্রের নাম পরিবর্তন করে হায়াত (জীবন) রাখা হয়। তাঁর জনপ্রিয়তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশ থেকে কমরেড সাজ্জাদ জহীরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অমানবিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে লেখকদের সংগঠিত করার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁকে জামেয়া মিল্লিয়া কবরস্থানে (দিল্লি) দাফন করা হয়।

কমরেড সাজ্জাদ জহীর অঙ্গারে ছাড়া উর্দুতে লিখেছেন বীমার (অসুখ) নাটক, পিগলা নীলম (উর্দু গদ্য কবিতা সংকলন) এবং নাকুশো জিন্দান (স্ত্রীকে লেখা জেলের দীর্ঘ চিঠি)। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ লন্ডন কি একরাত (লন্ডনে এক রাত্রি)। এই উপন্যাসে তিনি লন্ডনে অবস্থানরত ভারতীয়দের দুর্দশা ও অপদস্থ হওয়ার সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন।

ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া সাজ্জাদ জহীরের উর্দু রচনাসমগ্র প্রকাশ করেছে। বইটির নাম সাজ্জাদ জহীর কি মুনতখব তাহারিরি (সাজ্জাদ জহীরের নির্বাচিত রচনাবলী)। সম্পাদনা করেছেন বিশিষ্ট উর্দু লেখক ও সমালোচক আবরার রহমানী। ওই গ্রন্থে সাজ্জাদ জহীরের কাব্যগ্রন্থ পিগলা নীলমের (মূল্যবান পাথর) কবিতাগুলো প্রকাশিত হয়েছে। সব কবিতাই উর্দু ভাষায় রচিত গদ্য-কবিতা। পাঠকদের অবগতির জন্য কয়েকটি উর্দু কবিতার বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো।

 

প্রেমের মৃত্যু

 

তুমি কি প্রেমের মৃত্যু দেখেছ?

হাসিতে ঝলমল চোখ পাথর হয়ে যায়

হৃদয়ের দালানে ক্লান্ত লু হাওয়ার

ঝড় বয়ে যায়।

গোলাপি আবেগের বহমান সুপ্ত শুষ্ক

আর মনে হয়

যেমন সবুজ ক্ষেতের ওপর

তুষারপাত হয়েছে।

কিন্তু হে ঈশ্বর

বাসনীর সেই শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলো

জনতার মাঝে নিখোঁজ

যেমন চন্দন কাঠের

মনোগ্রাহী

সুগন্ধী ভেসে আসে।

 

পুরনো বাগান

 

কেমন নীরব নিঃশব্দ হে ঈশ্বর

আর কেমন অস্থির মনের ব্যথায়

উৎপীড়িত নিঃসঙ্গতা

আওয়াজ আসছে কিন্তু

মিলেমিশে

উঁচু-নিচু

অনর্থ ও তাৎপর্যটি শুধু

সামান্য ছুঁয়ে

এদিক সেদিক বয়ে যায়।

একটি স্মৃতির সুগন্ধি ভেসে আসে

রঙিন কারুখচিত

তিতলি পাখির থরথর কাঁপুনির মতো

কিন্তু সেটাও

এক ঝটকায়

উড়ে যায়।

 

 

ঠোঁট

 

কী সুন্দর ঠোঁট

গরম সুবাসিত নিঃশ্বাস থেকে

তুমি সিক্ত নয়নে

আমাকে জিজ্ঞাসা করলে

‘তুমি কি আমাকে ভালোবাস?’

একটি বাক্য মুখ থেকে বের হলো

‘হ্যাঁ।’

অত্যন্ত মামুলি

ছোট্ট

এই অসমাপ্ত শব্দ

তোমাকে কীভাবে দেখাবো

ওই ঘুমন্ত ও গোপন

উপত্যকাকে

যেখানে

আলোর বরিষণ হয়

গানের ঝর্নাধারা বয়ে যায়।

আর নিচু গাছের সারি

ঝলমল সবুজ শীতল ছায়াকে

ছড়িয়ে দেয়

যেমন নিজে বেঁচে থাকার পথ

এই হৃদয়কে এই সব সম্পদ

তুমিই তো দিয়েছ।