শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের বাইরে নানা বিষয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যমূলক বইয়ের প্রকাশকরা নিজেদের দাবি করেন সৃজনশীল প্রকাশক হিসেবে। তাঁদের একটা সমিতিও আছে। নিছক মুনাফালোভী পাঠ্য কি নোট-গাইড বইয়ের ব্যবসায়ের চেয়ে তাঁদের পেশাটা মহত্তর সন্দেহ নেই। কারণ এসব বইয়ের রচয়িতারা দেশের জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবী হিসেবে সম্মানিত, আর কবি-সাহিত্যিকরা নিজেদের সৃজনশীল মানুষ ভাবতে ভালোবাসেন। সাহিত্যমূলক এসব বইয়ের পাঠকরাও নিজেদের সৃজনশীল, মননশীল ও সংস্কৃতিবান ভেবে আত্মতৃপ্তি পেতে পারেন। কারণ শিক্ষার্থীদের মতো নিছক পাশ কি অধিক নাম্বার প্রাপ্তির লক্ষ্যে তাঁরা এসব বই পড়েন না। আর শিক্ষিত মানুষ মাত্রই জানেন, শিক্ষা, মানব-সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। একটি জাতির মেধা, মনন ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য জানার ও বোঝার অন্যতম মাধ্যম হলো বই। এখন প্রশ্ন হলো, সৃজনশীল লেখক, প্রকাশক ও পাঠক – এই তিনটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে যে আমাদের সৃজনশীল বইজগৎ, তার সীমা-পরিসীমা আসলে কতটুকু?

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষে দেশের নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের দাবি সরকারি তথ্য-পরিসংখ্যানে পাওয়া যাচ্ছে। সত্য যে, দেশে অনাহারী গরিব মানুষের সংখ্যা কমছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের জন্য কোটি কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ করছে সরকার। কিন্তু সোনার বাংলা হয়ে উঠতে থাকা সতেরো কোটি মানুষের উন্নয়নশীল এ-দেশেটায় দেশের সংস্কৃতি তথা গ্রন্থজগৎ কতটা উন্নত হয়েছে? কীভাবে কতটা বিকশিত হয়েছে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা? এমন আত্মজিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে ঘুরেফিরে একুশে বইমেলাটি সামনে চলে আসে। তার কারণ সম্ভবত, উন্নয়নের চেহারা দর্শন ছাড়াও প্রয়োজনীয় তথ্য-পরিসংখ্যান একমাত্র একুশের বইমেলাতেই সহজে মেলে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা একাডেমি চত্বরের বইমেলার সঙ্গে বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রসারিত বইমেলার তুলনা করলেও সৃজনশীল প্রকাশনা তথা গ্রন্থজগতের উন্নয়ন সহজেই আন্দাজ করা যায়। মেলায় প্রতিবছর তিন-চার হাজার টাইটেলের নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। সৃজনশীল প্রকাশক ও লেখকের সংখ্যাও বেড়েছে। পাঠকের ভিড় বাড়ছে। এক মেলাতেই কোটি টাকার ঊর্ধ্বে বই বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বইমেলার তথ্য-পরিসংখ্যান, ভিড় ও প্রচারণা দিয়ে আপাতদৃষ্টিতে বইজগতের উন্নয়ন আন্দাজ হলেও, দেশের বইজগতের পোক্ত ও টেকসই উন্নয়ন শুধু বইমেলার নিরিখে করা সম্ভব নয়। কারণ বই তো কোনো মৌসুমি ফল নয় যে, তা শুধু একুশে বইমেলাতেই উৎপাদিত এবং ব্যবহৃত হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের যেমন গোটা শিক্ষাজীবনের সম্পর্ক, সৃজনশীল বইয়ের সঙ্গেও শিক্ষিত পাঠকের তেমনি জীবনব্যেপে চাহিদার সম্পর্ক থাকাটা স্বাভাবিক। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী হতে পারে সৃজনশীল গ্রন্থজগতের সম্ভাব্য পাঠক। কাজেই বইজগতের আয়তন ও অস্তিত্ব শুধু একুশে বইমেলার মতো স্থানিক-কালিক গণ্ডিতে সীমিত হতে পারে না, তা গোটা দেশজুড়ে সারাবছরেই বিস্তৃত ও বিকশিত হওয়াটা কাম্য।

লেখক, প্রকাশক ও পাঠক – এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে যে সৃজনশীল গ্রন্থজগৎ, তার উন্নয়ন ও বিকাশ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, গ্রন্থাগার অধিদফতর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গ্রন্থজগতের উন্নয়নকাজে নিয়োজিত। এসব সরকারি প্রতিষ্ঠান ও একুশে বইমেলা ছাড়াও গ্রন্থজগতের কাঠামো ও উপাদানের মধ্যে রয়েছে মুদ্রণ প্রেস, কাগজ-কালি, বইয়ের দোকান, দেশব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি গণপাঠাগার। আর বইসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে লেখক, প্রকাশক ছাড়াও রয়েছে বইবিক্রেতা, প্রুফরিডার, বই বাঁধাইকার এবং সম্পাদক নামে গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী। কাজেই গ্রন্থজগতের উন্নয়ন মানে এর অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদেরও উন্নয়ন। এখন দেখা যাক পঞ্চাশ বছরে গ্রন্থজগতের উন্নয়ন কোথায়, কীভাবে এবং কী পরিমাণে ঘটেছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য-পরিসংখ্যানের অভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এ-নিবন্ধে গ্রন্থজগতের একজন পাঠক, লেখক ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রাক্তন কর্মী হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রকাশনা জগতের হালচাল, উন্নতি ও অবক্ষয় যা দেখছি, তার প্রাসঙ্গিক কিছু স্মৃতিচারণ ও ব্যক্তিগত মতামত উল্লেখ করব। তাতে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের গতি-প্রকৃতি ও বইজগতের বর্তমানের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি আন্দাজ করা সহজ হবে বলে আশা করছি।

পেশাদার লেখক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ঢাকায় এসে ১৯৭৩-এ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের চাকরিটা পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। কারণ সরকারি অর্থে পরিচালিত সংস্থাটির মূল লক্ষ্যই হলো, দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা তথা গ্রন্থজগতের প্রসার ঘটানো। লক্ষ্য অর্জনে সৃজনশীল প্রকাশকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতাদানের জন্য নানারকম বইকেন্দ্রিক কর্মসূচি পালন করে সংস্থাটি। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত স্বায়ত্তশাসিত এ-গ্রন্থকেন্দ্রের শাখা অফিসটি স্বাধীনতা-উত্তর জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। কোটি টাকার গ্রন্থোন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। গুলিস্তানে গ্রন্থকেন্দ্রের নিজস্ব ভবন হয়েছে। ভবনে মহানগর পাঠাগার ও আদর্শ বই বিক্রয় বিভাগ রয়েছে। বেসরকারি পাঠাগারের জন্য সরকারি অনুদানের বই সরবরাহ করা হচ্ছে প্রতিবছর। জাতীয়, আঞ্চলিক ও ভ্রাম্যমাণ বইমেলার আয়োজন ছাড়াও কর্মকর্তাদের ডলারে টিএ/ ডিএ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারিভাবে প্রতিবছর বিদেশি বইমেলায় অংশগ্রহণ করছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ছাড়াও গ্রন্থের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য বাংলা একাডেমি ও সরকারি গ্রন্থাগারগুলোতে সরকারের ব্যয়-বরাদ্দ আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের ফলে গ্রন্থোন্নয়নের বেসরকারি উদ্যোগ, বিশেষ করে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প হিসেবে, কতটা উন্নত হয়েছে?

বর্তমান পুঁঁজিবাদী বিশে^ উন্নয়নের একটা বড় মাপকাঠি হলো বিভিন্ন শিল্পজাত পণ্যের উৎপাদন, চাহিদা ও বিক্রয়-বিতরণ ব্যবস্থা। প্রকাশনা শিল্পেও সৃজিত কিংবা উৎপাদিত প্রতিটি গ্রন্থই একটি পৃথক পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই পণ্যের উৎপাদন, চাহিদা পূরণে বিক্রয়-বিতরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে এই শিল্পের উন্নয়ন। এ-কারণে বড় পেশাদারি প্রকাশনা সংস্থায় উৎপাদনের প্রাথমিক স্তরে সম্পাদক নামে পেশাজীবী থাকেন, লেখকের পাণ্ডুলিপির মান ও বাজার-সম্ভাবনা বিষয়ে যাঁর মতামতকে প্রকাশক ও লেখক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এরপর লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের চুক্তি হয়, চুক্তি অনুসারে লেখক তাঁর প্রাপ্য রয়্যালটি নিশ্চিতভাবে পেয়ে থাকেন। এছাড়া অন্যান্য শিল্পের মতো প্রকাশনা শিল্পেও গ্রন্থপণ্যের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও প্রচারণা ব্যবস্থাপনাও পৃথকভাবে গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

উন্নত দেশ বা প্রকাশনা ব্যবসায়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও। এমনকি কুটিরশিল্পসুলভ পেশাদারিত্বও নেই অনেক প্রকাশকের। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ প্রকাশকের পাণ্ডুলিপি নির্বাচনে সম্পাদক নেই। লেখকের সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, লেখকের নগদ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে প্রায় সকলেই একুশে মেলায় বই প্রকাশ করেন। প্রতিবছর দেশে যত সৃজনশীল বই প্রকাশিত হয়, তার প্রায় শতভাগই প্রকাশিত হয় একুশের বইমেলায়। নতুন টাইটেলের সংখ্যা ও স্টলের আকার দেখে আন্দাজ হয় কে কত বড় সৃজনশীল। স্টল বরাদ্দ পাওয়ার জন্য মেলা কর্তৃপক্ষের চাপানো শর্তে লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকের চুক্তি দেখতে চাওয়ায় কিছু লেখকের সঙ্গে চুক্তিপত্র দেখানো হয় বটে, কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী বই বিক্রির হিসাব ও  লেখকের পাওনা পরিশোধে বাধ্য থাকেন না কোনো প্রকাশক। কমন কারণ একটাই, পাঠক তেমন কিনছেন না। আর একটি বই প্রকাশে বিনিয়োগকৃত পুঁজি উঠে না এলে লেখকের পাওনা পরিশোধ করেনই বা কোন যুক্তিতে? বইমেলার বাইরেও একজন গ্রন্থকর্মী ও লেখক হিসেবে দেশের প্রকাশকদের সম্পর্কে নিজের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সে-বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করলে সৃজনশীল প্রকাশনার বিকাশ ও বর্তমান অবস্থাটা উপলব্ধি করা সহজ হবে আশা করছি। 

ঢাকায় বাংলাবাজার যে প্রকাশকদের ঘাঁটি, পাঠক হিসেবে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই জানতাম তথ্যটি। স্কুল-কলেজের পাঠ্য ও নোটবই-গাইডবইয়ের উৎপাদনকারীরাই মূলত বড় প্রকাশক ও বড় বই ব্যবসায়ী ছিলেন সেখানে। তাঁদের প্রকাশিত বই দেশের সর্বত্র শহরের বইদোকানে কমবেশি পাওয়া যেত। মফস্বল শহরের বইয়ের দোকানকেও লাইব্রেরি হিসেবে দেখত আমজনতা। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ের বাইরে এসব লাইব্রেরির দু-একটি তাকে থাকত সৃজনশীল প্রকাশনার বই। পাঠ্যবহির্ভূত বই বলতে কিছু গোয়েন্দা কাহিনী – উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মাসুদ রানা, দস্যু মোহন ইত্যাদি সিরিজের কিছু বই; ভারতের জনপ্রিয় লেখকের কিছু পাইরেটেড পাবলিকেশন্স, যেমন – নীহারঞ্জন গুপ্ত, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ কিছু লেখকের সস্তা উপন্যাস এবং ধর্মীয় কেচ্ছাকাহিনিমূলক বই। বটতলার বইয়ের ধারাবাহিকতায় এসব বই দেশব্যাপী শহরের বইদোকান ছাড়াও রেলস্টশনের বুকস্টলে, এমনকি স্টিমার-ট্রেনে-ফুটপাতেও ফেরিওয়ালাদের হাতে বিক্রি হতে দেখেছি। এসব বইয়ের প্রকাশক বা পরিবেশকের ঠিকানাও লেখা থাকত বাংলাবাজার। কৈশোরে ক্রেতা হিসেবে বাংলাবাজারি বই কিনে পড়েছিও অনেক।

নোটবইয়ের ব্যবসায়ী পুঁথিঘরের স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সৃজনশীল গ্রন্থের প্রকাশক হিসেবে ‘মুক্তধারা’ নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরে মুক্তধারাই হয়ে ওঠে দেশের প্রধান প্রকাশক। সৃজনশীল গ্রন্থের প্রকাশনায় পেশাদারিত্ব এনে একে মহৎ ব্যবসায় হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য চিত্তরঞ্জন সাহার সার্বিক উদ্যোগ স্বাধীনতা-উত্তর প্রকাশনা জগতে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। গ্রন্থজগতের উন্নয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের যেসব উদ্যোগ কর্মসূচি পালনের কথা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও মুক্তধারা একক উদ্যোগে সেসবের অনেক কিছু করেছে।

স্বাধীনতা-উত্তর সাহিত্যিক সরদার জয়েন উদ্দীন যখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, সেই সময়ে মুক্তধারা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে সপ্তাহব্যাপী নিজেদের প্রকাশিত কিছু বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করেছিল। দেশের বিখ্যাত ও বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবীগণ অতিথি আলোচক হয়ে প্রতিদিনের বই-উৎসবে আলোচনা করেছেন। ক্যাসেট-রেকর্ডে ধারণকৃত এসব বক্তৃতা সংকলিত করে বইয়ের খবর নামে একটি সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল মুক্তধারা। বাংলা শর্টহ্যান্ড জানতাম বলে ক্যাসেটের বক্তৃতাগুলোকে লিখিত রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। বাড়তি রোজগারের আশায় কাজটি করার জন্য রোজ বিকেলে যেতাম ৭৪ ফরাশগঞ্জ মুক্তধারা অফিসে। পুরনো আমলের কাঠের পাটাতনের দোতলায় মুক্তধারা অফিস। একটা কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে যেতে হতো চিত্তবাবুর বাসগৃহে। কাজটি করতে গিয়ে নিঃসন্তান চিত্তরঞ্জন সাহার পরিবার মুক্তধারার কর্মী ও কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে জানার সুযোগ ঘটে। দেশের বিশিষ্ট কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, লেখক ও শিল্পী মুক্তধারার উপদেষ্টা ও সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শিল্পী হাশেম খান, আব্দুল হাফিজ ছাড়াও চিত্তবাবু প্রয়োজনমতো অভিজ্ঞ লেখক-শিল্পী-শিক্ষাবিদদের পরামর্শ নিতেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সম্পাদনায় একটি সাহিত্য পত্রিকাও মুক্তধারা থেকে নিয়মিত বেরিয়েছে কিছুকাল। এছাড়া বইয়ের প্রচারণার জন্য বইয়ের খবর। নিজের প্রকাশিত প্রতিটি বইকে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য জ্ঞান করে তার প্রচারণার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিত মুক্তধারা। বই প্রকাশের পর প্রকাশনা উৎসব, প্রতিটি বইকে আলোচনার জন্য পত্র-পত্রিকায় পাঠানো, বিজ্ঞাপন ও লিফলেট প্রকাশ এবং নানা উপলক্ষে স্থানীয়ভাবে বইমেলার আয়োজন করত নিয়মিত। একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপনের ভিড়ে বাংলা একাডেমির মাটিতে বই বিছিয়ে বই প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থার মাধ্যমে একুশে বইমেলার গোড়াপত্তন হওয়ার তথ্যটি এখন সবাই জানে।

মুক্তধারা ছাড়াও বই প্রকাশনায় আন্তর্জাতিক মানের পেশাদরিত্ব আনার ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান আমলে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের দেশীয় শাখা ছিল এটি। ওই সংস্থার কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ ইউপিএলের মালিক হওয়ার পরও ইংরেজি ভাষায় অ্যাকাডেমিক ও গবেষণামূলক বইয়ের প্রকাশকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্রমে বাংলা বই প্রকাশও শুরু করে তারা। প্রতিটি বইকে পৃথক পণ্য ভেবে সম্পাদক কর্তৃক পড়িয়ে তার প্রকাশযোগ্যতা বা বাজার যাচাই, লেখকের সঙ্গে চুক্তিপত্র সম্পাদন ও চুক্তি অনুযায়ী রয়্যালটি প্রদান, নানাভাবে বইয়ের প্রচারকে গুরুত্ব দেওয়া ইত্যাদি কাজকে মুক্তধারা ও ইউপিএল পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরুত্ব দিয়েছে ও দায়িত্বের সঙ্গে পালন করেছে। বইকে শুধু তারা মৌসুমি ফলের মতো হরেদরে একাকার ও শুধু একুশে মেলার পণ্য ভাবেনি। সারাবছর ধরে প্রকাশ ও বিপণন প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিয়েছে।

বাংলাবাজারে অবশ্য পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পাকিস্তান আমল থেকেই বেশ কিছু সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশক ছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁদের ব্যবসায় ও পেশাদারিত্বে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। মুক্তধারার উত্থান ও প্রচারের পাশে অনেকটাই মøান ছিলেন তাঁরা। নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মাওলা ব্রাদার্স, আহমদ পাবলিশিং হউস, খোশরোজ কিতাবমহল, খান ব্রাদার্স, আদিল ব্রাদার্স, বইঘর, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স, চলন্তিকা বইঘর, বর্ণমিছিল, বর্ণবীথি ইত্যাদি নামের বহু খ্যাত ও অখ্যাত প্রকাশক ব্যবসায় গুটিয়ে এনেছেন কিংবা কোনোমতে টিকে আছেন এখনো। পুরনোদের মধ্যে ব্যবসায়িক সাফল্যে কিংবা মানসম্পন্ন পেশাদারিত্ব নিয়ে উন্নত হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল।

স্বাধীনতার পর দেশে নানারকম ব্যবসায়-বাণিজ্যে বেসরকারি উদ্যোগে বিস্তর পুঁজি বিনিয়োগ ঘটেছে। গ্রন্থজগতেও ক্ষুদ্র-মাঝারি পুঁজি বিনিয়োগে এসেছে বহু নতুন নতুন প্রকাশক। প্রধানত বাংলাবাজার, শাহবাগ কিংবা অন্যত্র একটি দোকান কি অফিস নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন অনেকেই। বইমেলায় তাঁদের প্যাভিলিয়ন বা বড় স্টল দেখা যায়। আগামী, সাহিত্য প্রকাশ, বিদ্যাপ্রকাশ, অবসর, অনন্যা, অনুপম, অন্যপ্রকাশ, সময়, কাকলি, পাঠক সমাবেশ, জার্নিম্যান, ঐতিহ্য, অনুপ্রাণন ইত্যাদি শতেক নামের প্রকাশকের সাইনবোর্ড বইমেলায় দেখা যায়। সবমিলিয়ে সৃজনশীল প্রকাশকের সংখ্যা এখন দেশে কত, তার সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। হয়তো সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি কিংবা একুশে বইমেলার আয়োজক সংস্থা বলতে পারবে। তবে অনুমান করি, সুপ্রতিষ্ঠিত সৃজনশীল প্রকশকদের অনেকেরই প্রকাশিত গ্রন্থের টাইটেল শত পেরিয়েছে। আবার বছর কয়েক সাড়ম্বরে সক্রিয় থাকার পর নিষ্প্রভ হতে হতে নিভে গেছে অনেকেই। নামসর্বস্ব হয়ে টিমটিমে দশায় টিকে আছে কেউবা। নিঃসন্তান চিত্ত সাহার মৃত্যুর পর মুক্তধারাও যেমন টিকে আছে একুশে বইমেলার নামমাত্র প্রতিষ্ঠান হয়ে। অন্যদিকে নোটবই-গাইড বইয়ের প্রকাশনা, নিজস্ব প্রেস-পত্রিকা কিংবা সহায়ক ব্যবসায়ের জোরে সৃজনশীল প্রকাশক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে অল্প সময়ে বড় প্রকাশক হয়েছে পাঞ্জেরী, কথাপ্রকাশ, প্রথমা, বাংলা প্রকাশ, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স এবং এরকম বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। বড় কি ক্ষুদ্র, পুরাতন কি নবাগত – সবমিলিয়ে প্রকাশক ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে লেখকের সংখ্যাও। একুশে বইমেলায় প্রতিবছরই নবীন কবি-লেখকদের বই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সৃজনশীল প্রকাশনায় প্রত্যাশিত পেশাদরিত্ব ও নির্ভরযোগ্য নীতি-পদ্ধতিও গড়ে ওঠেনি এখন পর্যন্ত। সত্যি বলতে কী, একনিষ্ঠভাবে লেখার কাজে ব্যস্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন, দেশে এমন পেশাদার লেখক নেই বললেই চলে। অন্যদিকে পেশাদার লেখক কিংবা লেখকের সৃষ্ট বিশেষ কোনো গ্রন্থপণ্যের বাজার সৃষ্টির ব্যাপারে বড় বড় প্রকাশকও পেশাদারি ভূমিকায় নেই। বইমেলা উপলক্ষে নতুন বই প্রকাশে ব্যস্ত, কিন্তু কোনো বই সাধারণত তিনশো কপির বেশি ছাপেন না। কাজেই উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ নানা খাতে এগিয়ে গেলেও শিক্ষা-সংস্কৃতির বড় মাধ্যম সৃজনশীল গ্রন্থজগৎ প্রসারিত, নাকি সংকুচিত হয়ে আসছে, এ নিয়েও ধন্ধ জাগে।

তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবে বিশ^ময় প্রতিটি খাতে উৎপাদন ও উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। দেশের মুদ্রণশিল্প লেটারপ্রেসের যুগ থেকে ক্রমে কম্পিউটারনির্ভর আজকের ডিজিটাল দশায় উন্নীত হওয়ায় সার্বিকভাবে মুদ্রিত বইপত্রের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। প্রসারিত হয়েছে সংবাদপত্রের জগৎও। একইভাবে অপাঠ্য তথা সৃজনশীল বইয়ের লেখক, প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন বই এবং সৃজনশীল প্রকাশকের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রন্থজগতের এই উন্নয়নের মূলে একুশের বইমেলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। একুশের বইমেলাকে বলা চলে আমাদের গ্রন্থজগতের গর্ব করার মতো তীর্থস্থান। এ-মেলা সৃজনশীল লেখক-প্রকাশক তৈরির উর্বর ভূমি কিংবা ডিজিটাল কারখানাও বটে। দেশের যে কেউই সামান্য পুঁজি নিয়ে খুব সহজেই এখন গ্রন্থকার ও প্রকাশক হতে পারেন।

লেখক হতে হলে আজকাল পত্রপত্রিকায় অভিজ্ঞ সম্পাদক কর্তৃক লেখাটি মনোনীত এবং প্রকাশিত হয়ে হাত পাকানোর দরকার নেই। দৈনিক কি লিটলম্যাগের তরুণ সাহিত্য সম্পাদকরা লেখকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুণে ছাপে তো ভালো, নইলে ফেসবুক তো আছে। সেখানে লেখা দিলে সম্পাদকের প্রত্যাখ্যান কি ক্ষুর-কাঁচির ছোঁয়া লাগার ভয় নেই। পোস্ট দিলে লাইক দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বন্ধুসংখ্যা ও গ্রুপও তৈরি আছে। আর কম্পিউটারে করা ই-পাণ্ডুলিপি একুশের বইমেলায় একটা বই হয়ে জন্মালে, মানস-সন্তানটির আকিকা-উৎসবের মতো প্রচার-প্রোপাগান্ডাও করা সহজ। টিভি-পত্রিকায় প্রচ্ছদটি ছাপার ব্যবস্থা করা না গেলে, নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রতিদিনই ফ্রি বিজ্ঞাপন পোস্ট দিলে আপত্তি করার কেউ নেই। কাজেই মেলায় অংশগ্রহণকারী কোনো প্রকাশকের সঙ্গে সামান্য লেনদেনের সহজ শর্তে পাণ্ডুলিপি গছালেই হলো। বানান-বাক্য ভুল থাকলে প্রুফরিডারই সব ঠিক করে দেবেন। মেলায় আসার পর হাজারো বইয়ের ভিড়ে নিজেরটি হটকেকের মতো না চলুক, প্রিয়জনকে দেওয়ার জন্য নিজে এবং স্বজন-শুভার্থীকে দিয়ে কিছু বই তো কেনানো সম্ভব। হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় লেখকরা মিডিয়ায় নানারকম প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং সশরীরে মেলায় উপস্থিত থেকে পাঠক-ক্রেতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কাজেই নবীন লেখকরা মেলায় রোজ উপস্থিত থেকে চেনা-অচেনা দর্শকদের মাঝে নিজ সৃজনকর্ম গছানোর চেষ্টা করলে দোষ কী? প্রকাশকরা যেহেতু বইটি প্রকাশের পর সেই বইয়ের প্রচারে কোনো ভূমিকা রাখেন না, লেখককেই তাঁর গ্রন্থের প্রচারণায় তৎপর হতে হয়। লেখার কাজে যেটুকু সময় ও নিষ্ঠা প্রয়োজন, তারচেয়ে প্রচারণা ও নগদ খ্যাতি-স্বীকৃতির সন্ধানেই ব্যস্ত থাকেন লেখকরা। এভাবে একুশে বইমেলার প্রভাবে স্বল্প পুঁজি ও শ্রমে লেখক-প্রকাশক হওয়া যায় বলে প্রতিবছরই নতুন বই, নতুন লেখক ও প্রকাশকের সংখ্যা বাড়ছে। ভাষাশহিদদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একুশে বইমেলা হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রাণের মেলা। দেশের প্রধান এক সংস্কৃতিক ঘটনা। দেশের সবরকম মিডিয়া নিয়মিত প্রচারণা দেয় একুশে বইমেলার। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমির ভাষা-সাহিত্যের গবেষণা ও উন্নয়নমূলক সব কাজ ছাপিয়ে যেন একুশের বইমেলার আয়োজনই হয়ে উঠেছে প্রধান কাজ। প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী মেলা উদ্বোধন করে গ্রন্থোন্নয়নের নানা দিকনির্দেশনা দেন। এতে বাংলা একাডেমির মূল কাজ কতটা গতিশীল হচ্ছে জানি না, তবে মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে বিদগ্ধ পাঠক-সমালোচক মহলের বিরূপ সমালোচনা বাড়ছে। জাতির মনন ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশের সহায়ক দূরের কথা, প্রকাশিত বেশিরভাগ বই আবর্জনার মতো পরিত্যাজ্য মনে করছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে মেলানির্ভরতা সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্পে প্রত্যাশিত পেশাদারিত্ব আনার ক্ষেত্রে সহায়ক, নাকি প্রতিবন্ধক? এ-প্রশ্নও অবান্তর নয়। বিশে^র অন্যান্য দেশের প্রকাশনাশিল্প কোথাও এরকম মৌসুমি বা মেলানির্ভর নয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে পরপর দুই বছর একুশের বইমেলা বাধাগ্রস্ত ও ব্যর্থ হওয়ায় প্রকাশনা ক্ষেত্রে অনেকটা অচলাবস্থা বিরাজ করেছে। প্রস্তুতি সত্ত্বেও অনেক বই প্রকাশিত হয়নি। বইয়ের কেনাবেচা প্রায় বন্ধ ছিল। এই গৎবাঁধা অজুহাতে লেখকসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করেননি বহু প্রকাশক।

সৃজনশীল প্রকাশক ও লেখকের সংখ্যা বাড়লেও দেশে পাঠকের হ্রাস-বৃদ্ধি কিংবা পাঠরুচি জানতে গবেষণা-জরিপের প্রয়োজন নিয়ে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তবে দেখেশুনে আমার ব্যক্তিগত ধারণা গভীর হচ্ছে, বইয়ের পাঠক ও পাঠাভ্যাস বাড়েনি খুব একটা। বরং কমে আসার লক্ষণগুলো চারদিকে স্পষ্ট। প্রকাশিত সব বইয়েরই মুদ্রণসংখ্যা কমেছে। পাকিস্তান আমলেও অধিকাংশ সাহিত্যমূলক বইয়ের প্রথম সংস্করণের মুদ্রণসংখ্যা ছিল কমপক্ষে সাড়ে বারোশো থেকে এক হাজার কপি। এখন ছাপা হয় পাঁচশো থেকে তিনশো কিংবা তারও কম। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ হয় কদাচিত। বিদেশে বেস্টসেলার বইয়ে সাধারণত বিক্রীত কপিসংখ্যা উল্লেখ থাকে। কিন্তু দেশে একাধিক সংস্করণ হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় যেসব বইয়ে, সেসব বেস্টসেলার মানে কত কপি বিক্রি হলো, তার হিসাব সংশ্লিষ্ট প্রকাশক-লেখক ছাড়া অন্যদের জানার উপায় নেই।

প্রতিবছর একুশে বইমেলায় যে কয়েক হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়, তার অধিকাংশই দেশব্যাপী বইয়ের দোকানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এর কারণ যেমন এসব বইয়ের চাহিদার অভাব, তেমনি দেশে গ্রন্থপণ্যের বিক্রয় নেটওয়ার্কের দুর্বলতাও। পাঠকচাহিদা ও সম্পাদনার তোয়াক্কা ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে নিম্নমানের বইয়ের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন লেখক-প্রকাশকরা।

বই বিক্রয়ব্যবস্থা ও বইদোকান ছাড়াও গ্রন্থজগতের আর একটি অপরিহার্য কাঠামো গণপাঠাগার। পাকিস্তান আমলে ও স্বাধীনতার পরেও সরকারি-বেসরকারি পাঠাগারগুলোতে পাঠকের উপস্থিতি এবং বাসায় বই নিয়ে পড়ার সদস্যসংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না। বইজগতের উন্নয়ন হলে তো দেশে পাঠাগার ও পাঠক বৃদ্ধি হবার কথা; কিন্তু আগের অবস্থার সঙ্গে বর্তমানের চিত্র মেলালে পাঠকের হ্রাস ও পাঠকশূন্যতার চিত্র স্পষ্ট হবে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের চাকরিতে থাকার সময় অনেক বেসরকারি পাঠাগার পরিদর্শন করে দেখেছি, সরকারি অনুদান লাভই ছিল নামকাওয়াস্তে পাঠাগারগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য। অনেক পাঠাগারে পাঠকের বদলে ইঁদুর-তেলাপোকা পড়ে বই। আবার অনুদানপ্রাপ্ত বই কোথায় কীভাবে আছে, স্বয়ং লাইব্রেরিয়ানও তা জানেন না। এভাবে অচলাবস্থার কবলে পড়ে বহু পুরনো পাঠাগারের মৃত্যু ঘটেছে। অন্যদিকে নিয়মিত বইমেলায় যাওয়ার কারণে বাড়িতে ব্যক্তিগত পাঠাগার বা বইসংগ্রহ গড়ে উঠেছে অনেকেরই। জরিপ করলে দেখা যাবে, বাড়ির সদস্যদের হাতে স্মার্টফোন আছে প্রায় সারাক্ষণই। কিন্তু হাতে বই থাকার বিরল মুহূর্ত সারামাসেও চোখে পড়বে কি না সন্দেহ। আর বইয়ের চাহিদা ও পাঠাভ্যাস না বাড়লে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনার বিকাশ বা গ্রন্থজগতের উন্নয়ন হবে কী করে?

ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিবিধ আন্দোলন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির মধ্যে যেটুকু সাহিত্যানুরাগ ও গ্রন্থচাহিদা সৃষ্টি করেছিল, তার ক্রমবিকাশ গোটা জাতীয় জীবনকে প্রভাবিত ও বইমুখী করতে পারেনি। এর কারণ যেমন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি নীতির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে, তেমনি পাঠক হ্রাস ও সংকটের দায় পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারা ও বিশ^ায়নে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের ওপরও চাপানো যেতে পারে অনেকখানি। বর্তমানের ডিজিটাল বিশ^ একদার রেডিও, ল্যান্ডফোন, টেলিগ্রাম ও ডাকব্যবস্থার চিঠির আদান-প্রদানের ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোঠায় এনেছে। একইভাবে হাতের স্মার্টফোনে ও ইন্টারনেটের তথ্যসমুদ্রে অবগাহনের নেশা মুদ্রিত সংবাদপত্র ও বই পাঠের অভ্যাস ক্রমে শূন্যের কোঠায় নামাবে বলে অনেকের আশঙ্কা। এ-প্রজন্মের মানুষ হাতের স্মার্টফোনে বা কম্পিউটারে ফেসবুক ছাড়া নানারকম টেক্সট পড়ে, ইউটিউব দেখে, অপাঠ্য কাগুজে বইপত্র পড়ার সময় কোথায়?

যা হোক, শিক্ষিত মানুষ বা একটি একটি জাতির গ্রন্থবিমুখ হয়ে ওঠার কারণগুলো বিশেষজ্ঞগণ ভালোভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে পারবেন। সাধারণ অভিজ্ঞতায় তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে গ্রন্থজগতে উন্নয়নের দিকটাও আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্ট। বই উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। অনলাইন-ব্যবস্থায় বইয়ের প্রচার ও সরবরাহ ব্যবস্থাও সহজ হয়েছে। একুশে বইমেলারও প্রসার-প্রচারে মানুষের গ্রন্থমনস্কতা ও সামগ্রিকভাবে বই বিক্রি বাড়ছে। সরকারিভাবেও নানা খাতে কোটি কোটি টাকার বই কেনা হচ্ছে। এই উন্নয়ন সামগ্রিক জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশের পরিপূরক হয়ে না উঠলেও গ্রন্থজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সুবিধাভোগীর স্বার্থে যাচ্ছে অবশ্যই। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল যেভাবে একটা সুবিধাভোগী শ্রেণি লুটেপুটে খেতে তৎপর থাকে, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। এ-সত্য সরকারি বই কেনা, একুশের বইমেলা ও অন্যান্য গ্রন্থোন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখলেই পরিষ্কার হবে বলে মনে করি।

সার্বিকভাবে গ্রন্থজগতের অবক্ষয় ও হতাশার মাঝেও ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ^াস, মানবসভ্যতায় যত রূপান্তর আসুক, মুদ্রিত বইপত্রের সঙ্গে শিক্ষিত মানুষের সম্পর্কের সময় ও ক্ষেত্র যতই সংকুচিত হোক, বইয়ের সঙ্গে মানবসভ্যতা ও ব্যক্তি মানুষের বিকাশের গভীর সম্পর্কটি কখনোই বিলুপ্ত হওয়ার নয়। প্রকৃত লেখক যেমন ভবিষ্যতেও নিভৃতে বসে সৃজনের তাড়না কিংবা ভেতরের অদম্য দায়বোধ থেকেই তাঁর লেখার কাজটি সম্পন্ন করবেন, তেমনি ওয়ান-টাইম সাধারণ পণ্যেরও অধিক মর্যাদা দিয়ে লেখকের সাধনার ফসল মুদ্রিত বই হিসেবে প্রকাশে এগিয়ে আসবেন সৃজনশীল প্রকাশকরা, মেলার মানহীন আবর্জনাতুল্য গ্রন্থপণ্যের ভিড়ে ক্লান্ত-বিরক্ত পাঠকও অমূল্য পণ্যজ্ঞানে খুঁজে পাবেন তাঁর প্রয়োজনীয় বইটি। সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বইজগতের প্রসার ও টেকসই উন্নয়নেও সংশ্লিষ্টরা আরো সচেতন ও দায়িত্ববান হবেন, এমন আশাবাদে আস্থা রাখা ছাড়া বিপন্ন পণ্যের স্রষ্টা লেখকের আর কী-বা করার আছে এই সংকটকালে?

Leave a Reply