সেন্ট জোনাথনের ছেলে

লেখক: বিশ্বজিৎ চৌধুরী

‘তুমি বলবে সোনাইমুড়ীতে বিরাট চারতলা বাড়ি আছে আমাদের।’

‘চারতলা?’

‘ইয়েস। চারতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে বিরাট উঠান, বড় একটি লোহার গেট পেরিয়ে উঠানে ঢুকতে হয়। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে দুটি, শান-বাঁধানো ঘাট। চারপাশে সুপুরি বাগান, আম-জাম-কাঁঠাল গাছ তো আছেই। পুরো এলাকায় কয়েক বিঘা জমি আছে, গরিব কৃষকরা চাষ-বাস করে সেখানে। বলবে তোমার বাবা জমিদার।’

‘জমিদার?’

‘না, জমিদার বলা ঠিক হবে না। এখন জমিদারি আমল নেই। তুমি বরং বলবে ইয়োর ফাদার ইজ আ বিজনেসম্যান; বড় কন্ট্রাক্টর। ঢাকা-চট্টগ্রামের ফোর লেন হাইওয়ের অর্ধেক কাজের কন্ট্রাক্ট পেয়েছিল তোমার বাবা। আমাদের দুটো গাড়ি আছে, তার মধ্যে একটা মার্সিডিজ বেঞ্জ।’

‘হোয়াই শুড আই? এসব আমি কেন বলব বাবা?’

‘বলবে, ইউ হ্যাভ টু সে। না হলে তোমাকে ওরা খেলায় নেবে না, তোমার সঙ্গে মিশবে না। আড়চোখে তাকিয়ে দেখবে তোমার টিফিন বাক্সটার মধ্যে কী আছে। পনির-মাখন মাখানো পাউরুটি, বিফ বার্গার বা চিকেন স্যান্ডউইচের বদলে দুখানা বিস্কুট দেখলে ওরা মুচকি হাসবে।’

‘কেন হাসবে? আমি তো ওদেরটা চাইতে যাচ্ছি না।’

‘হাসবে, তবু ওরা হাসবে। ওদেরকে তো চিনি আমি বাপ, সেন্ট জোনাথন স্কুলে আমিও পড়েছি। শহরের সবচেয়ে ধনী লোকের ছেলেরা পড়ে ওখানে। ওদের মান্থলি টুইশন ফি কত জানো? একজনের টুইশন ফির টাকায় আমাদের পুরো পরিবারের মাসের খরচ চলে যাবে।’

ছেলেটা অসহায় বিস্মিত দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।

সোনাইমুড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা ছেলেটিকে চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে সেন্ট জোনাথনে ভর্তি করানোর আগে এসব সবক দিয়েছিল এরল গঞ্জালবেস। তার ছেলে এলু, মানে এলেন গঞ্জালবেস লেখাপড়ায় ভালো। প্রাইমারি স্কুলে সব ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট হয়েছে। কিন্তু এরলের ধারণা, ছেলেটা ঠিক তত চালাক-চতুর হয়ে ওঠেনি। মানে সবকিছু তো আর বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না, কিছুটা চারপাশের জীবন থেকে শিখতে হয়, সারভাইভ করার জন্য এটুকু তো শিখতেই হবে। কিন্তু এলুটা হয়েছে ওর মায়ের মতো, একটু যেন ভোলাভালা ধরনের।

সেন্ট জোনাথনে দরিদ্র খ্রিষ্টান পরিবারের সন্তানদের জন্য একটা কোটা আছে। মেধাবী কিছু খ্রিষ্টান ছাত্র বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পায়। অবশ্য অনেকদিন ধরেই ব্যাপারটা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

শহরের বিত্তবান ব্যক্তিরা, তা সে যে-ধর্মেরই হোক, ইংলিশ মিডিয়ামের এই স্কুলে ভিড় করছেন। সন্তানকে বড় অংকের ডোনেশন দিয়ে হলেও এই স্কুলে ঢোকাতে পারলে তাদের সম্মান রক্ষা হয়। ফলে ‘দরিদ্র খ্রিষ্টান কোটা’ কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এরকম কঠিন সময়ে এরল গঞ্জালবেসের মতো বুদ্ধিমান (যা সে নিজেকে ভাবে) লোক ছাড়া ছেলেকে এই স্কুলে ভর্তি তো বটেই, ওয়াইএমসির হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা পাকা করতে পারত কে! এরল পেরেছে। ছেলেকে তাই এই অভিজাত বিদ্যালয়ে অ্যাডজাস্ট করার মতো বুদ্ধির জোগানও দিয়েছিল।

সেন্ট জোনাথন স্কুলে এলেনের এক বছর পেরিয়ে গেছে। বাপের বুদ্ধিসুদ্ধি কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে কে জানে, কথা এত কম বলে যে, বোঝারও উপায় নেই। সিক্স থেকে সেভেনে ওঠার সময় ফার্স্ট না হলেও চতুর্থ বা পঞ্চম স্থানে ছিল। সেটাই যথেষ্ট। এটা তো আর সোনাইমুড়ী প্রাইমারি নয়; সেন্ট জোনাথনে প্রাইভেট টিউটরের কাছে না পড়ে কেউ এক থেকে দশের মধ্যে থাকতে পেরেছে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। এই ছেলে একদিন কিছু একটা হবে।

সেন্ট জোনাথনের ছাত্ররা আজ দেশে-বিদেশে কত বড় বড় কোম্পানিতে, কত বড় বড় পদে আছে। এরলের মতো হাতেগোনা দু-একজনেরই শুধু কিছু হলো না। অবশ্য সেন্ট জোনাথনের কোনো ছাত্র শেষ পর্যন্ত মোটরযানের মেকানিক হয়েছে এমন উদাহরণ সম্ভবত এরল ছাড়া আর একটিও নেই। এরকম একটি স্কুলে ভর্তি করানোর সময় এরলের বাবাও নিশ্চয় ভাবেননি প্রতিদিন বিকল গাড়ির তলায় ঢুকে তেল-কালি-ধুলো-ধোঁয়া মেখে বেরিয়ে আসার একটা জীবিকা বেছে নিতে হবে তার ছেলেটাকে। এরল গঞ্জালবেস নিজেও কি ভেবেছিল? এলেনের ক্ষেত্রে নিশ্চয় এরকম হবে না। ছেলেটা যে ব্রিলিয়ান্ট এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এরলের। আফসোস শুধু একটাই, একটু চালাক-চতুর না হয়ে ছেলেটা তার হয়েছে মায়ের মতো ভোলাভালা ধরনের।

এলেনের সঙ্গে মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। হুঁ-হাঁ দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া কথা বাড়ায় না ছেলেটা। বরং মা-র সঙ্গে বেশি বলে। উজবুক মহিলাটির সঙ্গে কী এত কথা বলার আছে বুঝে উঠতে পারে না এরল। আবার ভাবে, মা-ই তো, আফটারঅল মা।

এলেনের মা, এরলের স্ত্রী মার্গারেটের চেহারার দিকে তাকিয়ে এখন হয়তো বোঝা যাবে না কম বয়সে কী মারাত্মক সুন্দরী ছিল এই মহিলা। কনভেন্টে পড়ার সময় নিয়ম-কানুনের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেতেই কিনা কে জানে প্রেমে পড়েছিল এরলের। তখন তো গাঁটের অবস্থা যা-ই হোক, চেহারা দেখে এরলকে চেনার উপায় ছিল না। বাবরি দোলানো ঝাঁকড়া চুল, জিনসের ট্রাউজার, টি-শার্ট, গলায় ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রিষ্টের লকেটসমেত চেইন আর হাতে নানা রঙের রিস্টব্যান্ড। রীতিমতো হিন্দি-বাংলা সিনেমার অ্যান্টি হিরো ইমেজের কার্বন-কপি। সেই কার্বন-কপিটার সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করে কী ভুলটাই না করেছিল মার্গারেট! ভুল কিনা কে বলবে, অভিভাবকহীন কনভেন্টের মেয়েটার এর চেয়ে ভালোইবা কী হতে পারত। তবে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল তো বটেই। সেই ভাঙা স্বপ্নের ছাপ এখন সমস্ত চেহারা-শরীরে। মোটর মেকানিকের এখনকার চোয়াড়ে চেহারার সঙ্গে যেন যথার্থ মানানসই তার লাবণ্যহীন গৃহসঙ্গীটি। এত ছাইচাপা পড়েছে আগুন যে, কোথাও ছিল বোঝার উপায় নেই। নীরবে সংসার টেনে যাচ্ছেন মহিলা। অভাব-দারিদ্র্যের সঙ্গে চিরপরিচিত মার্গারেটের সাত চড়ে রা নেই। শুধু বেশি রাতে মদ খেয়ে এসে এরল হই-চিৎকার করে খ্রিষ্টানপাড়ার কুকুরগুলোকেও সচকিত করে তুললে মাঝেসাঝে সীমিত সাধ্যে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে; কিন্তু ফল হয়েছে উলটো। তখন মার্গারেটের ওপরই চড়াও হয় এরল। গায়ে হাত-টাতও তোলে। নিজের এসব আচরণের জন্য মন যে খারাপ হয় না তা তো নয়, মন খারাপ হয়।

কতদিন আগে, মনে হয় এ-জীবনে নয়, অন্য কোনো জীবনে প্রথম দেখাতেই মার্গারেটের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল এরল। সার বেঁধে হেঁটে কী একটা উপলক্ষে যেন ক্যাথলিক ক্লাবে যাচ্ছিল পাথরঘাটা কনভেন্টের মেয়েরা। সেই কিশোরীদের ভিড়ে একদম অন্যরকম পর্তুগিজ উত্তরাধিকারের সাক্ষাৎ নমুনা বার্থা মার্গারেট রায়। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। আহা, আজ এলেনের মাকে দেখে কে বলবে, এই সেই মার্গারেট। সোনার অঙ্গ কালি আর কাকে বলে!

কিছুই দিতে পারল না তাকে, কিন্তু অত্যাচার-নির্যাতন কম কিছু করেনি। কেন করেছে? করেছে কারণ এরল নিজেও নির্যাতিত। প্রতিদিন দু-মাইল সাইকেল ঠেঙিয়ে বড় রাস্তায় গ্যারেজে যেতে হয়। এ চাকরির দশটা-পাঁচটা নেই, শুক্র-রবিও নেই। প্রতিদিন খোলা, দিবা-রাত্রি খোলা। কাজ শেষে ঝুল-কালি মেখে বাড়ি ফেরার সময়ও টাকা-পয়সা দেওয়ার বেলায় ধানাই-পানাইয়ের শেষ নেই গ্যারেজ মালিকের। চাকরি দিয়ে মাথাটাই কিনে নিয়েছে লোকটা। অথচ এই গ্যারেজে বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট গাড়ি মেরামতের জন্য আসে শুধু এরল গঞ্জালবেসের ভরসায়। কিন্তু বুড়ো হাবড়া মালিক বাডি সোয়াইন তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, টাকা-পয়সাটা ঠিকমতো দেয় না।  কোথায় যাবে এরল, কাজ তো জানে এই একটাই। দু-দশ মাইলের মধ্যে আর কোনো গ্যারেজ নেই। ঢাকা বা চট্টগ্রামে চলে যাবে সে-পথও পায় না। এখানে তবু পৈতৃক ভিটাটা আছে। বড় শহরে চাকরির টাকায় বাড়ি ভাড়া দিয়ে সংসার চলবে ভরসা কী?

জ্বালা জুড়ানোর জন্য রাতে মদ গেলে। কিন্তু দ্রব্যগুণে জ্বালা তো জুড়ায়ই না, বরং জ্বালানি পেয়ে আগুনটা আরো উসকে ওঠে। তখন সব রাগ-দুঃখ-ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য মার্গারেটের মতো হাতের কাছে আর কাকে পাবে। যা যাওয়ার তার ওপর দিয়েই যায়।

মায়া হয়, মুখ বুজে এই সংসার মেনে নেওয়া মার্গারেটের জন্য মাঝে মাঝে সত্যিই খুব মায়া হয় এরলের। কিন্তু সান্ত্বনা দেবে কী, নিজের জীবনের ওপরই তো মায়া উঠে গেছে। শুধু ছেলেটার মুখের দিকে চেয়েই তো বেঁচে থাকা এখন। অপেক্ষাটা দীর্ঘ, তবু পথের শেষে কোথায় যেন একটুকরো আলোর ইশারা জেগে আছে।

তো সেই এলেনই ফোন করে সেদিন জানাল, স্কুল ভলিবল টিমে সিলেক্টেড হয়েছে সে। সমস্যা হলো জার্সি কিনতে হবে, গ্রে-কালারের কলার, কালো পোলো গেঞ্জি। বাপের ওপর বাড়তি চাপ দিতে চায় না ছেলে, বলেছে, ‘আমি কি নাম তুলে নেব বাবা?’

সেন্ট জোনাথন স্কুলের ছেলেরা ভলিবলে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন। সেই টিমে চান্স পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, এরল জানে। এখন একটা জার্সির জন্য নাম তুলে নিতে হবে তার ছেলেকে! সে জানতে চেয়েছিল, ‘জার্সি তো স্কুল থেকেই দেওয়ার কথা…।’

‘না স্কুল থেকে দেবে না। বলেছে, স্টেডিয়াম মার্কেটে পাওয়া যায়, নিজেদেরই কিনতে হবে। শুড আই উইথড্র মাই নেম বাবা?’

‘না। জার্সি কিনে দেবো আমি, ডোন্ট ওয়ারি। কবে লাগবে?’

‘ডে আফটার টুমরো, আগামী পরশু দিন।’

‘ওকে, আইল বাই ইয়োর জার্সি, ডোন্ট ওয়ারি।’

ছেলেকে আশ্বস্ত করল বটে, নিজে বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল এরল।

ভেবেছিল এবার হেস্তনেস্ত একটা হয়ে যাবে গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে। কিছু টাকা অ্যাডভান্স চাইবে, না দিলে শালা চাকরিটাই ঢুকিয়ে দিয়ে আসবে তার পাছার ভেতরে। বড় বাজারে গিয়ে চালের বস্তা টানবে সেও ভালো। কিন্তু ঘটনাটা ঘটল ঠিক উলটো। হাজি সাহেবের মুড ছিল সেদিন অন্যরকম। হাইওয়েতে অ্যাকসিডেন্টে থুবড়ে-মুচড়ে যাওয়া একটা পাজেরো জিপ শেষরাতে টেনেহিঁচড়ে আনা হয়েছিল গ্যারেজে। সেটার দুরবস্থা দেখেই বোধহয় দিনের শুরুতেই প্রসন্ন চেহারা তার। ইঞ্জিন সারাই, ডেন্টিং-পেন্টিং মিলিয়ে অন্তত পাঁচ-সাত দিনের কাজ। চোখের সামনে হয়তো কাজের বিলের টাকার অংকটা ভাসছিল। টাইমিংটা মিলে গিয়েছিল, ফলে এরল ছেলের স্কুলের কথা বলে কিছু টাকা লাগবে জানাতেই দাতা হাতেম তাঈ নগদ সাতশো তো দিলোই, উপরন্তু শহরে গিয়ে ছেলেকে দেখে আসার জন্য একদিনের ছুটিও মঞ্জুর করে ফেলল।

এত সহজে ব্যাপারটার মীমাংসা হয়ে যাবে ভাবতেও পারেনি। রাতে ঘরে ফিরে পুরনো ট্রাংকের ভেতর থেকে কালো স্যুটটা বের করল। দীর্ঘদিনের অব্যবহারে বিবর্ণ কোট আর ট্রাউজার। তা হোক স্যুটই তো, জীবনে সেই একবারই তো কিনতে পেরেছিল। সাদা ছোপ পড়া জায়গাগুলোতে ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখল। চওড়া টাইও আছে একটা। সেন্ট জোনাথনের ছাত্রের অভিভাবক তো আর যে-কোনো পোশাকে সেই ক্যাম্পাসে যেতে পারে না! ছেলেটাকে ভর্তি করিয়ে আসার পর আর কখনো স্কুলটাতে যাওয়া হয়নি। সকালে পাড়ার সেলুনে গিয়ে শেভ করিয়ে এলো। স্নানের সময় সারাশরীরে সাবান ঘষে ঘষে তেল-মোবিলের জীবনটাকে মুছে ফেলার চেষ্টাও করল যথাসাধ্য।

স্যুট-টাই পরে তৈরি হওয়ার পর একজোড়া জুতো-মোজার অভাবটা টের পেল। বাট নো ওয়ে, আপাতত ফিতে দেওয়া স্যান্ডেলেই কাজ সারতে হবে। মার্গারেটের সামনে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘কেমন লাগছে?’ আজকাল এ-মহিলা যেন বোবা-কানা হয়ে গেছে। একনজর তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসল বোধহয়, সেই হাসি প্রশংসার না বিদ্রূপের বোঝার উপায় নেই।

সেন্ট জোনাথন স্কুলের ছাত্রের বাবাকে কতটা সুবেশী অভিজাত চেহারার হতে হয় নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই জানে এরল। সেই দিনটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। ছেলের, মানে এরলের একটি গুরুতর অপরাধের দায়ে তার বাবাকে নোটিস দিয়ে ডাকিয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। তখন এরলের ক্লাস নাইন। ঘটনা হচ্ছে, হাতে টাকা-পয়সা ছিল না একেবারে। দুর্বুদ্ধি এসেছিল মাথায়। স্কুল ছুটির পর টেবিলের ওপর টুল, তার ওপর দাঁড়িয়ে স্ক্রু-ডাইভার দিয়ে খুলে নিয়েছিল ক্লাসরুমের ফ্যানটা। এ-ধরনের কাজে তখন থেকেই পাকা ছিল, কে জানে হয়তো মিস্ত্রি হওয়াটা তার নিয়তি-নির্ধারিতই ছিল। আরেক ডানপিটে সহপাঠী সেলিমকেও নিয়েছিল সঙ্গে। একশ টাকায় সেই ফ্যান বিক্রি করে দিয়েছিল পাথরঘাটারই এক ইলেকট্রিক সরঞ্জামের দোকানে। এ-পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু কদিন পর সেই দোকানদারই এসে স্কুলের হেডস্যারকে জানিয়ে গিয়েছিল তার স্কুলের ছাত্রের দুষ্কর্মের কথা!

নোটিস পেয়ে এরলের বাবা ছুটে এসেছিল স্কুলে। তখন সম্ভবত এপ্রিল মাসের শেষদিক। অ্যাসেমব্লিতে দাঁড়িয়ে সবাই গরমে হাঁসফাঁস করছিল মনে আছে। এ-সময় বিসদৃশ পোশাক, চোপসা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মলিন চেহারার ফাদার রড্রিক্সের সামনে যে-লোকটা এসে দাঁড়াল তাকে ভিখিরি বলে ভ্রম হওয়া অসম্ভব নয়। স্কুলের অধিকাংশ ছাত্র-শিক্ষক হয়তো তা-ই ভেবেছিল।

ফাদার রড্রিক্স ক্লাস নাইনের এরল আর সেলিমকে অপেক্ষা করতে বলে, অ্যাসেমব্লি শেষে বাকি সবাইকে ক্লাসে ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিচারপর্বটা হয়তো স্কুল-প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু সেলিমের বাবা এসে একবার নিজের ছেলের দিকে, আরেকবার ফাদার রড্রিক্সের দিকে তাকিয়ে জুতো মচমচিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। পরে সেই কক্ষেই বিচার সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেলিমের বাবা হেডস্যারের কক্ষে চেয়ারে বসেছিলেন পায়ের ওপর পা তুলে, আর এরলের বাবা তখনো হাত-জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে বসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বসেনি, সেই হাত-জোড়, করুণ ভঙ্গি। চাষাভুষো আর কাকে বলে! রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল এরলের।

সেদিনই এরলকে বহিষ্কার করা হয়েছিল স্কুল থেকে। অপরাধের তারতম্য বিবেচনায় জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়েছিল সেলিম। অথচ ফ্যান বিক্রির টাকার বখরা দুজনই পেয়েছিল সমান, পঞ্চাশ পঞ্চাশ। স্কুল থেকে বের হওয়ার দুঃখটা তবু সহ্য করেছিল সেই বয়সে, কিন্তু এত এত ছাত্র-শিক্ষকের বিস্ময় ও অবজ্ঞার দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে যাওয়া বাপের চেহারাটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না এরল। নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ যতটা না, তার চেয়েও অনেক বেশি রাগ-ঘৃণা গিয়ে পড়েছিল যেন চাষাটার ওপর। কতদিন ধরে একশটা বানানো গল্পের সুতো জোড়া দিয়ে নিজের অবস্থাপন্ন পরিবারের একটা ছবি তুলে ধরেছিল সহপাঠীদের কাছে। এই লোকটা একটানে ছিঁড়ে ফেলল ছবিটা। মনে পড়ে, সহপাঠীদের কেউ কেউ জানতে চেয়েছিল, কে লোকটা, তার কী হয়? … ইত্যাদি।

এরল বলেছিল, ‘ড্রাইভার, আমাদের গাড়ির ড্রাইভার।’

ব্যথা ও বিস্ময়ে হয়তো ছেলের দিকে তাকিয়েছিল এরলের বাবা, কিন্তু নিজের জীবনের সব অপ্রাপ্তির জন্য, দারিদ্র্যের জন্য, সবরকম অপমানের জন্য এই লোকটাকে দায়ী মনে হয়েছিল এরলের। বহিষ্কৃত ছাত্রটা স্কুলের আঙিনা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে কী ক্রোধে, কী ঘৃণায় তার পাশে পাশে হাঁটতে থাকা পিতাকে দেখিয়ে কৌতূহলী সহপাঠীদের বারবার বলেছিল, ‘এই লোকটা আমাদের ড্রাইভার। এই লোকটা আমাদের ড্রাইভার।’

এ-নিয়ে যে পরে কখনো খুব একটা অনুশোচনায় ভুগেছে তাও নয়। এই লোকটার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের জীবনটাকে পালটে নেবে, অর্থ-বিত্ত গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে দেখিয়ে দেবে – এরকম প্রচণ্ড একটা জেদ ছিল। কিন্তু হলো তো না, শেষ পর্যন্ত হলো না কিছুই। নানাদিকে ঘুরেফিরে এখন যেন সেই একই বৃত্তে এসে পৌঁছেছে, সারাজীবন যাকে অবজ্ঞা-উপেক্ষা করেছিল সেই মানুষটার পায়ের ছাপেই নিজের পা রেখে চলছে এখন। কিছুই পালটানো গেল না, বাপের জীবনেরই পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়াল তারও জীবনটা।

বাস থেকে চট্টগ্রাম শহরে নেমে যেন ধাঁধা লেগে গেল চোখে। কী রকম বদলে গেছে সবকিছু। চারদিকে সব হাইরাইজ বিল্ডিং। স্টেডিয়ামের পাশে দু-একটা খেলাধুলার সামগ্রীর দোকান আর ‘দারুল কাবাব’ নামে একটা পরোটা-কাবাবের দোকান ছাড়া আর কিছুই ছিল না এখানে। এখন স্টেডিয়ামের গ্যালারির বাইরের চারপাশটা ঘিরে বৃত্তাকারে অন্তত বিশ-তিরিশটা ঝাঁ-চকচকে রেস্টুরেন্ট। কারা আসে এখানে? এত টাকা কোথায় পায় লোকগুলো?

ভেবেছিল, একটা জার্সি বড়জোর দু-আড়াইশো টাকা হবে। কিন্তু পাঁচশো-সাতশো টাকার কমে পাওয়াই গেল না। শেষে জহুর হকার মার্কেটে ঘুরে ঘুরে ঘেমে-নেয়ে দুশো টাকায় কিনে ফেলল জিনিসটা। কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করতে হলো, তা হোক, গ্রে-কালারের কলারের কালো পোলো গেঞ্জি তো পাওয়া গেল।

দুপুরে সস্তার হোটেলে খেয়েও বেরিয়ে গেল একশ টাকার বেশি। তবু মনটা ভালো লাগছে এই ভেবে, স্কুল টিমে খেলার সুযোগটা হাতছাড়া হচ্ছে না ছেলেটার। বিকেল চারটার মধ্যে স্কুলমাঠে পৌঁছতে বলে দিয়েছিল এলেন। যথাসময়ে পৌঁছে দেখল খেলার পোশাক পরে মাঠের এদিক থেকে ওদিকে দৌড়াদৌড়ি করে গা-গরম করছে
ছেলেরা। তাদের ভিড়ে সাধারণ স্কুল-পোশাকে দেখতে পেল এলেনকে। ভলিবল কোর্টের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে দূর থেকে জার্সিটা দেখাল তাকে। এতদূর থেকেও লক্ষ করল খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে ছেলের মুখ।

এই উচ্ছ্বসিত মুখটা দেখবে বলেই তো ছুটে এসেছিল এরল। দৌড় থামিয়ে প্রথমেই বাঁশি-হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়েসি এক ভদ্রলোকের কাছে গেল এলেন। তিনিই বোধহয় স্কুল টিমের কোচ। দূর থেকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তাকে দেখিয়ে কী বলল কে জানে, এলেনকে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন তিনি।

‘দেখি?’ – বলে তার দিকে হাত বাড়ালেন কোচ।

পলিথিনের ভেতর থেকে জার্সিটা বের করে তার হাতে দিলো এরল।

জার্সিটা হাতে নিয়ে ভ্রু কোঁচকালেন তিনি। দুবার নাড়াচাড়া করে বললেন, ‘এটা কী এনেছেন? এটা জার্সি? সিন্থেটিক কাপড়ের এই জামা পরে খেলতে পারবে? সুতো-টুতো বেরিয়ে আছে, সেলাইটা পর্যন্ত ঠিক নেই, কোত্থেকে এনেছেন এই জিনিস?’

‘স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে …।’ অবলীলায় বলে ফেলল এরল।

‘স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে? সেন্ট জোনাথন স্কুলের জার্সির কথা বলেননি ওদের?’ প্রচণ্ড বিরক্তি কোচের চেহারায়।

‘বলেছিলাম, মানে …।’

‘মানে আবার কী, এই রদ্দি মাল দিয়ে চলবে না …।’ বলে জার্সিটা এরলের দিকে ছুড়ে দিলেন কোচ।

এলেনের চেহারার দিকে তাকাতে পারছিল না এরল। ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ততক্ষণে মাঠের প্র্যাকটিস ফেলে দু-একজন করে ছাত্র আসতে শুরু করেছে এদিকে। কোচ ভদ্রলোক জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্যদের কাছেও তাঁর বক্তব্যের সমর্থন আদায় করে নিতে চাইলেন, ‘এটা সেন্ট জোনাথনের জার্সি? এটা পরে মাঠে নামবে আমাদের প্লেয়ার?’

ছেলেরা কেউ উত্তর দিলো না বটে, কিন্তু তাদের চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোচের বক্তব্যই ঠিক, এ-পোশাক পরে সেন্ট জোনাথনের প্লেয়ার মাঠে নামতে পারবে না। ভ্রু-কুঞ্চন আরো বাড়ল কোচের, এবার হঠাৎ সরাসরি তাকেই প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আপনি কে? আপনি এলেনের কী হন?’

থতমত খেল এরল। তার মনে হলো, ছেলেরা সবাই যেন একই প্রশ্নের উত্তরের জন্য তাকিয়ে আছে তার দিকে।

মুহূর্তে কতকাল আগের সেই দিনটি যেন মনে পড়ে গেল এরলের। এই স্কুল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তার বাবাকে দেখিয়ে সহপাঠীদের বলেছিল, ‘এই লোকটা আমাদের ড্রাইভার।’

‘আপনি এলেনের কী হন?’ – আবার জিজ্ঞেস করলেন কোচ।

নিজের দিকে আর একবার তাকাল এরল। গায়ে বিবর্ণ কোট-প্যান্ট, পায়ে বেমানান একজোড়া স্যান্ডেল …। এসব দিয়ে আর যাই হোক পরিচয়টা ঢাকা যায় না। তাছাড়া নিজের চোয়াড়ে চেহারাটা কী করে আড়াল করবে এতগুলো দৃষ্টির সামনে থেকে।

কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘আমি স্যার এলেন সাহেবদের ড্রাইভার।’

চমকে উঠল এলেন। নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার বুঝতে পারল যে ছেলেটা কেঁপে উঠল, কেমন বেঁকেচুরে গেল যেন মুখটা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘মিথ্যা কথা স্যার, আমার বাবা … এটা আমার বাবা।’

সবাই অবাক। এরল তারপরও বুদ্ধি করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ছেলেটা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে, ফুঁপিয়ে উঠল, ‘হোয়াই আর ইউ লায়িং? তুমি আমার বাবা, তুমি আমার বাবা।’

এরল অশ্রু সংবরণ করত পারে না। ছেলেটা এতদিনেও একটু চালাক-চতুর হয়ে উঠল না, ওর মায়ের মতো কেমন যেন ভোলাভালা ধরনের রয়ে গেল।

‘আমি খেলব না স্যার।’ – বাবাকে আঁকড়ে ধরে রেখেই এলেন বলল।

কোচ ভদ্রলোক বিমূঢ় তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেয়েই যেন হঠাৎ জোরে একবার বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে বাকি ছেলেদের বললেন, ‘ওকে বয়েজ, নো মোর ওয়াস্ট অব টাইম, লেটস গো প্র্যাকটিস।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: