সেবার যখন মৌসুমি বায়ু এসেছিল

লেখক:

দেবেশ রায়

তিন

১৭ জুন মঙ্গলবার থেকে তো কলকাতার জল বেরোতে শুরু করেছে, সে-ই ১১ আর ১২ তারিখের  শেষ ও অষ্টম কালবৈশাখীর জল ও ১৪ থেকে মৌসুমি বায়ুর জল। জল বেরোনোর নানা জটিলতা আছে। সে-সব কথা না হয় থাক। কেষ্টপুর খাল দিয়ে যে-জল বেরোনোর সে-জল কেষ্টপুর খালে ঢুকে আর বেরোতে পারে না। কোনো দিনই পারে না। এক স্মৃতিকথায় পারে – যখন বিদ্যাধরী খোলা ছিল। নিচে পাঁক, ওপরে কচুরিপানা, স্রোত নেই, কেষ্টপুরের মোড়ে ক্যান্টনমেন্ট খাল এসে পড়েছে বাগজোলায়, এত জল বেরোবে কোথা

দিয়ে? না-হয় দু-তিনদিন এক-আধবেলা খটখটে রোদই দিলো। বৃষ্টি ঝরলে তাও জলের একটা টান থাকে, শুকনো হলে তো খালের জল দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বাড়ে। বাড়ছিলও তাই, কেষ্টপুর খালের জল।

গোলাঘাটায় কেষ্টপুর খালের ধারে চন্দ্র সাঁতরা দাঁড়িয়েছিল, ওই শনিবার, ২১ তারিখ। নিমাই ঢালি কোথাও থেকে তাকে দেখে থাকবে। চন্দ্র সাঁতরা এতক্ষণই দাঁড়িয়ে ছিল যে বোঝা যাচ্ছিল – সে কিছু প্যাঁচে পড়েছে। নিমাই ঢালি যে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সেটা কোনো ধান্দায় নয়। এমন একটা চেনাজানা মানুষ ভিআইপির ওপরে, ভিআইপির দিকে পেছন ফিরে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে খালের দিকে মুখ করে – তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো তো পায়ের  অভ্যেস। চন্দ্র সাঁতরা একটু পরে নিমাইকে বলল, ‘হাওয়াটা আবার আজ থেকে বদলে গেল, না?’

‘হ্যাঁ। মনে হচ্ছে তাই। সকালে ভেজা, বিকেলে খাজা।’

‘এ-রকমই থাকবে, না? আরো দু-চারদিন?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে। এবার তো পালা করে আসছে। চারদিন ভেজাল, চারদিন তাতাল, চারদিন দিনে রোদ নেই – রাতে তারা। আর এক সপ্তা তো রথের?’

‘এখনো যদি পাইপটা জলের তলা থেকে তোলা না যায়, তাহলে তো ভেসে যাবে রে?’

‘খালের জলে আপনার পাইপ আছে নাকি?’

‘হ্যাঁ। তাই তো দেখছি।’

ব্যস, ওই পর্যন্তই। চন্দ্র  সাঁতরা যেমন কখনো জিজ্ঞেস করে না ���ব পেলি কোথায়, নিমাইও তেমনি জানতে চায় না কেষ্টপুরের খালের জলে সাঁতরার পাইপ এলো কোত্থেকে। যে-কাজের              যে-দস্ত্তর।

কত কাজকর্মেই তো পাইপ জলে রাখতে হতে পারে – ডাঙায় রাখলে চুরি হতে পারে এই ভয়েও।

চন্দ্র সাঁতরা বলে, ‘এখন তুলে ফেলাই ভালো, না?’

‘হ্যাঁ। জলে গোলমাল তো রোজই বাড়বে,  তুলে ফেলেন।’

‘তুলবি? তাহলে তোল?’

‘মনে পড়ল কখন জলের তলার পাইপের কথা?’

‘দুপুরে ভাতের পরের ঘুমের পর উঠে দেখি আকাশ নীলে চকচক করছে। তখনই সন্দেহ হলো – এই রে, হাওয়ার ঢক তো আবার বদলাল। এখন তো শুরু হলো দিনভর বৃষ্টি, রাতভর গরম। তাহলে পাইপের কী হবে? তাই তো এসে দাঁড়ালাম -’

‘খালের ধারে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখলে কি আর জলে ডোবা পাইপ পোষা কাউটার মতো উঠে আসবে? পাইপ তুলতে গেলে খালের জলে তো ডুবতে হবে।’

‘ডুববি নাকি? এক ডুব দিলেই পেয়ে যাবি। আমার জায়গা মার্কা দেওয়া আছে। যদি জলের টানে সরে গিয়ে না থাকে। বড়জোর দুই ডুব কি তিন ডুব।’

‘জলে না নেমে কি আর ডুবের হিসেব করা যায়? আর, নামলে তো এই বেলা ছাড়া টাইম নেই। কালও তো দিনে বৃষ্টি।’

‘তাহলে দেখ। নামবি তো নাম।’

‘হ্যাঁ। যখনকার কাজ তখনই তো করতে হবে। ভিআইপিতে যদি সাত-সকালের ট্রাকের নিচে চাপা পড়ো, তাহলে তখনই তো আরজি করে নিতে হবে। সে বেঁচেই থাকো আর মরেই থাকো।’

‘তাহলে কর। নাম। তোল।’

‘হ্যাঁ। যখনকার কাজ তখনই করতে হয়। ধরেন, মাল নিয়ে ট্রাক যাচ্ছে আসাম – এই ভিআইপি দিয়ে গিয়ে চৌত্রিশ নম্বর ধরবে। এমন সময় ধরেন কৈখালি পার হয় কী হলো না সামনের টায়ার ফেটে গেল। সে তো তখনই সারাতে হবে। স্টেপনি লাগতে হবে। এক নম্বর গেটের টায়ারের দোকান ছাড়া উপায় নেই। মিস্তিরি, যন্ত্রপাতি সব ধরে আনতে হবে। বেশি রাত্রি লোডেড ট্রাক সেখানে তো টায়ার-বদলানোর রেট আলাদা। যখনকার কাজ তখনই তো করতে হয় – সে যে রেটই হোক।’

‘বা-বা নিমাই। তুই আবার রেট ঠিক করে কাজে নামতে কবে থেকে শুরু করলি? তোর তো এ-স্বভাব ছিল না।’

‘ছিল। থাকবে না কেন? তবে সব সময় কি আর সব স্বভাব দেখানো চলে? যখনকার যে-স্বভাব। দুটো তক্তা কি এক হাত পাইপ – সে বললেন, আমিও পারলাম তো পারলাম। তারপর যেদিন দেখা হলো পয়সা দিলেন। তখন কি রেটের কথা বলি?’

‘তাই তো জিজ্ঞেস করছি তোকে – রেট বাতলানো কবে থেকে ধরলি? নামবি তো নাম। এতক্ষণে তো তোলা হয়ে যেত।’

‘তোলা হলে তো তোলা হয়ে যাবেই। কিন্তু এই ধরুন, বৃষ্টিবাদলা, খালের জল, আপনারই পাইপ – এই সব তো আর এক-বর্ষার মধ্যে আমি পাবো না। এক, বর্ষাতেই তো যা একটু-আধটু রেটের কাজ। তাও তো খালগুলো মজে আছে বলে, প্রতি বছরই ফ্লাড হয় বলে। আমি কোনো দরদাম করব না। কিন্তু রেটটা চাই।’

হ্যাঁ, রেট একটা ঠিক হওয়ার পরই নিমাই খালের জলে নেমেছিল আর ডুবতে-ডুবতে, পাইপ খুঁজতে-খুজতে একেবারেই ডুবে গিয়েছিল, ওই শনিবার ২১ জুন, বিকেলে। নিমাই যে ডুবে মরে গিয়েছে – এটা বুঝতেও তো চন্দ্র সাঁতরার কিছু সময় লেগেছিল। হঠাৎ করে নিমাই ডুবতেই-বা যাবে কেন, মরতেই-বা যাবে কেন। নিমাই? এই কেষ্টপুরের খালে? যতক্ষণ পর চন্দ্র সাঁতরার ধন্দ লেগেছে, তারপর তো সে নজর করে দেখতে চেয়েছে কচুরিপানা আর জলো জঙ্গলের মধ্যে কোথাও নিমাইয়ের কালো মাথা ভেসে ওঠে কী না। ওই নজর করতে করতে সে তো ডেকেওছে, ‘এই নিমাই, নিমাই, আরে এই নিমাই।’ তার ডাকাডাকি শুনে               এক-আধজন যখন ভিড় করতে শুরু করেছে, গোলাঘাটারই লোকজন, ততক্ষণে সাঁতরা বলতে শুরু করেছে, ‘আরে নিমাই নামল একটা পাইপ তুলে আনবে বলে, আর উঠছে না। আরে, নিমাই আর উঠছে না কেন? এই নিমাই -।’

তারপর তো ভিড়ও বাড়ল, কথাও বাড়ল, নিমাইকেও চেনে না, সাঁতরাকেও চেনে না, এমন মানুষজনও এসে গেল আর সকলেই যে যার মতো জেনে ফেলল, নিমাইকে কুড়ি টাকার লোভ দেখিয়ে চন্দ্র সাঁতরা খালে নামিয়েছিল তার চোরাই পাইপ তোলাতে ও একবার নিমাই নাকি উঠে পড়েছিল, ‘নিচের জলে খুব টান, থাক আজ’। তখন নাকি সাঁতরা বলেছিল, ‘কাল সকাল থেকে তো আবার জল ঝরবে, না-হয় আরো পাঁচ টাকা বেশি দেব, তুই দেখ আরেকবার।’ আর সেই দ্বিতীয়বার নেমেই নিমাই আর ওঠেনি।

এই গল্পগুলি যদি তৈরি হয়ে না উঠত, তাহলে কিন্তু ঘটনাটাই ঘটত না। নিমাই যদি একবার উঠে না আসে, তাহলে চন্দ্র সাঁতরা কিন্তু পুরোপুরি ফাঁসে না। সবাই-ই জানে, নিমাই ঢালির এসব কাজ করেই চলে। খাল থেকে পাইপ তুলে আনা তার সেই রোজগারের কাজ বৈ তো কিছু নয়। সব রোজগারের কাজেই বিপদ থাকে – নিমাইয়ের তেমন একটা বিপদ ঘটে গেছে। কী আর করা যাবে? কিন্তু নিমাই যদি একবার উঠে আসে – খালের জলের বিপদ বুঝে, তাহলে চন্দ্র সাঁতরা ঠেলে দ্বিতীয়বার না-নামালে সে এমন মরে কী করে, যাকে হত্যাই বলা যায় খবরে। সেসব দিক থেকে গল্পগুলো আঁটসাঁট বাঁধা।

ইতিমধ্যে ২১ জুনের সন্ধ্যা নেমে এসেছে – শুকনো খটখটে নীলাকাশময় তারাভরাসন্ধ্যা। দেখে মনেই হয় না, মৌসুমি বায়ু সপ্তাহখানেক হলো এসে গেছে। ভিআইপি দিয়ে গাড়িগুলো  যে-বাতাস কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাতে জল লেগে না থাকায় সাঁ-সাঁ আওয়াজ উঠছিল। টানা সাঁ-সাঁ নয়। কালভার্টের ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটে যাওয়ার আওয়াজের মতো উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছে। ধীরে-ধীরে ধীরে-ধীরে এটা বোঝা হয়ে যাচ্ছিল – যে-খালে নেমে একজন মরেছে, তার বডি খুঁজতে আর-কেউ নামবে না সেই খালে। তখন খালের জল নিয়েও নানারকম কথা হচ্ছিল আর এত নানারকম কথার প্রত্যেকটিই সম্ভাব্য সত্য। কচুরিপানাগুলি কোথাও-কোথাও এত জমাট বেঁধে আছে যে তার ওপর দিয়ে হেঁটে ভিআইপি থেকে সল্টলেকে ওঠা যায়। এখন চোররা নাকি এই রুটই নিচ্ছে – সল্টলেকে চুরি করতে। খেয়াঘাটগুলিতে তো এখন পাটি-বানানো বাঁশের ব্রিজ-ফেয়ারওয়েদার ব্রিজ, যদিও খেয়ার ভাড়া দিতে হয়। সেই সব ব্রিজের মাথায় রাতে পুলিশ গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হলুদ-কালো ডোরাকাটা গাড়ি – ‘হাইওয়ে প্যাট্রল’। সুতরাং সল্টলেকে যারা চুরি করতে যায়, তারা কচুরিপানার ওপর দিয়েই হেঁটে চলে যায়। অথচ তার নিচে জল তো আছেই, এত বৃষ্টিতে সে-জলে স্রোতও আছে – আন্ডারকারেন্ট – কেষ্টপুর খালের সেই আন্ডারকারেন্টে পড়লে আর রক্ষা নেই, বেরোতে হবে সেই বাগজোলায়। এতই যদি চোরাস্রোতের টান তাহলে বৃষ্টির জল বেরোয় না কেন – এসব প্রশ্নে বরং কেষ্টপুর খালটা আরো জটিল হয়ে যায়। আন্ডারকারেন্টের তলায় নাকি দু-তিন মানুষ সমান পাঁক। সে-পাঁকে একটা পাও যদি ঢুকে যায়, তাহলেও টেনে বের করা যায় না, বরং পুরো শরীরটাই পাঁক টেনে নেয়। ওপরে শক্ত জমাট কচুরিপানা, তার নিচে খালের জল যেমন হয় তেমন জল, তারই নিচে সম্ভবত আন্ডারকারেন্ট, তার নিচে পাঁক। অষ্টপ্রহরের চেনা একটা মজে-যাওয়া জলদেশ এমন চকিত মৃত্যুতেই এমন দুর্ভেদ্য জটিল ও অজ্ঞেয় হতে পারে।

ভিড়টা বদলাতে শুরু করেছিল। কয়েকজন সেই প্রথম থেকেই সেঁটে ছিল। তাদের দু-চারজন নিমাইয়ের পাড়ার, দু-চারজন নিমাইয়ের বেশি চেনা, দু-চারজন সাঁতরার বেশি চেনা। এরাও আর খালের দিকে তাকিয়েছিল না।

চন্দ্র সাঁতরার সমস্যা হলো – সে এখন খালপাড়া ছেড়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় কী করে। অথচ এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তো কোনো লাভ নেই। কিন্তু চন্দ্র চলে গেলেই তো ঠিক হয়ে যাবে নিমাই ঢালি আর উঠল না। সে খালের জলে ডুবে মারা গেছে। সেটার দায়িত্ব চন্দ্র কী করে নেবে। তার চাইতে বরং সে সারারাত এই খালপাড়েই বসে থাকবে। সে বসে থাকলে যদি নিমাইয়ের মরাটা অসম্পূর্ণ থাকে, তবে থাকবে সে বসে। চন্দ্র সাঁতরা নিজের থেকে বাড়ির দিকে পা বাড়াবে না।

সেই গোড়ার দিকে ফায়ার ব্রিগেড, থানা, এসব কথা যে ওঠেনি তা নয়। ফায়ার ব্রিগেড না থানা – এসব নিয়েও একটু-আধটু কথা হয়েছিল। একটা  অটোকে বলে দেওয়া হয়েছে কাঁকুড়গাছির ফায়ার ব্রিগেডে খবর দিতে – এমন একটা খবরও শোনা গিয়েছে। চন্দ্র সাঁতরার যারা বেশি চেনা সম্ভবত তাদেরই কেউ একবার বলেও উঠল – ‘তাহলে ফায়ার ব্রিগেড আর এলো না’, যেন ফায়ার ব্রিগেডের জন্যই তারা অপেক্ষা করছিল।

আরো কিছুক্ষণ পর একজন কেউ বলে, ‘একটা কোথাও তো জানিয়ে রাখা দরকার। পরে তো এই নিয়ে কথা উঠবে, একটা লোক তোমাদের চোখের সামনে খালে ডুবে গেল আর তোমরা খবর দিতে এলে রাত পুইয়ে?’

‘তাহলে চন্দ্রবাবু যান, লেকটাউন থানায় একটা খবর দেন।’ এই থেকেই থানার সীমানা নিয়ে কথা উঠল। খালের যে-জায়গায় চন্দ্র সাঁতরার পাইপ ছিল ও তা তুলতে নিমাই ঢালি নেমেছিল – সেটা লেকটাউন থানার অধীনে নাকি রাজারহাট থানার অধীনে। পুরো ভিআইপিটাই নাকি লেকটাউন থানার চার্জে – শুধু রাস্তাটুকু। কেষ্টপুর খাল কি ভিআইপি রাস্তার ভেতরে, নাকি বাইরে। শেষে কেন ও কখন যে ঠিক হলো – রাজারহাট থানার যে-একটা ফাঁড়ি আছে অর্জুনপুরে, গোরক্ষবাসী মন্দিরের মেইন গেটের উলটোদিকে – সেখানেই চন্দ্র সাঁতরা খবর দিয়ে যাবে। সম্ভবত, সাঁতরার বাড়ি যাওয়ার পথে ওই ফাঁড়ি পড়ে।

এটা যখন একবার ঠিক হয়ে গেল যে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার বদলে থানায় খবর দেওয়াটা বেশি জরুরি তখন চন্দ্র সাঁতরাকে তো যেতেই হয়। ভিড়টা সেরকম একটু নড়েও উঠল।

‘আপনারা কি পুলিশ নিয়ে আবার আসছেন?’ এমন একটা কথা কেউ জিজ্ঞেস করায় প্রথম বোঝা গেল কেউ কেউ সেটাই চায় ও নিমাই ঢালির হলোটা কী সেটা জানতে চায় কেউ  কেউ।

‘সে থানায় গিয়ে বলার পর তো জানা যাবে। তোমরা দু-একজন চলো না। সবই মিলে যাই। থানাবাবু কী বলেন। রাত বেশি হয়ে গেলে তো কোনো দারোগাবাবুকেই পাওয়া যাবে না। চলো!’ এটা চন্দ্র সাঁতরাই বলেছিল। সে আসলে চাইছিলও নিমাই ঢালির নিজের লোকজন পাওয়া যাক। নইলে তো ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চন্দ্র সাঁতরা একাই নিমাই ঢালির লোক। একটা লোক যখন বেঁচেবর্তে আছে, কথাবার্তা বলছে, কাজকর্ম করছে, তখন যদি কেউ সেই লোকটিকে কারো লোক বলে – তা তো বলতেই পারে। কিন্তু চোখের সামনে খালের জলে নেমে গিয়ে যে-লোকটি এতক্ষণের মধ্যে আর উঠল না, একা-একা তার লোক কতক্ষণ আর থাকা যায়। চন্দ্র সাঁতরার কথায় কোনো তঞ্চকতা ছিল না।

অর্জুনপুর ফাঁড়িতে বড়বাবু নিজেই ছিলেন – নিশীথ দলুই। তিনি কিছু জিজ্ঞেসও করলেন না – প্রথমে শুনলেন, সবাই মিলে এ ওকে থামিয়ে যেরকম করে ঘটনাটা বলছিল সেভাবেই শুনলেন। কাউকেই থামালেন না। তিনি সকলের ওপর চোখ বুলিয়ে-বুলিয়ে যেমন করে শুনছিলেন, তাতে মনে হতে পারে, সেইভাবেই তিনি শুনতে চাইছিলেন। আর তাঁর ওই তাকানোর ফলে এক-একজন বুঝে যাচ্ছিল, সে ঘটনাটা সবটুকু জানে না। তখন, সে থেমে যাচ্ছিল। এমন করে সবার থামা হয়ে গেলে বড়বাবু একটা খাতা টেনে নিয়ে বললেন, ‘কার  নামে ডায়েরি হবে? একজনের নাম বলুন। একজনের বললেই হবে।’

‘সে তো চন্দ্রবাবুই আছেন, উনিই তো নিমাইকে…’

‘আমরা তো সবাই মিলেই খবর দিতে এসেছি স্যার, শুধু আমার নামে ডায়েরি করাটা কি ঠিক হবে?’

‘ঠিক-বেঠিক আমার ওপর ছেড়ে দিন। আপনার নাম-ঠিকানা, বাবার নাম, ফোন নাম্বার বলুন।’

সেটা বলার আগেই যেন লেখা হয়ে গেল। বড়বাবু বললেন, ‘আর-একজন কেউ নাম-ঠিকানা, বাবার নাম, ফোন নাম্বার বলুন। কী, ওই লোকটির নাম, কী বললেন?’

‘কার নাম স্যার?’

‘ওই, যে-লোকটা ডুবে গেছে -’

‘নিমাই ঢালি।’

‘হ্যাঁ। ওর বাবার নাম আর বাড়ির ঠিকানা কেউ জানেন?’

সবাই একটু থতমত খেয়ে যায়। নিমাই ঢালির বাবার নাম যে কখনো তাদের জানতে হবে এই লোকজনের কেউই তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। বড়বাবু সেটা বুঝে ফেলেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘পুরনো লোক, না নতুন লোক?’

এই প্রশ্নটার জন্যেও এই লোকজনের কোনো প্রস্ত্ততি ছিল না। ফলে, ‘পুরনো’, ‘পুরনোই তো’, ‘অত পুরনো নয়’, ‘আমরা তা দেখে আসছি’, ‘এই সব জায়গাতেই তো কাজকম্ম করে’ – এসব গুঞ্জন ওঠে।

‘বাংলাদেশি না তো?’

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না, এমনকি গুঞ্জনও না।

‘ওর সঙ্গে কেউ কোনো ভোট দিয়েছেন – যে-কোনো ভোট হলেই হবে?’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। এই শেষ ভোট দিয়েছে।’

‘আপনার সঙ্গে?’

‘ঠিক সঙ্গে না। তো তা বলতে পারেন।’

‘তাহলে তো ভিআইসি আছে, ভোটের ফটো। ওতেই সব পাওয়া যাবে। কাল সকাল এগারোটায় আমি স্পটে যাবো। আপনারা কেউ ওই কার্ডটা নিয়ে আসবেন। ঠিকানাটা কী?’

‘ঠিকানা তো হয় না, ওই খালপাড়ে থাকে -’

‘সবই তো খালপাড়? কোন খালপাড়?’

‘অরিজিন্যালি সঞ্জয়নগর ছিল -’

‘আরে, রাখো তো তোমার সঞ্জয়নগর। তখনকার কেউ কি আর আছে? বদলে নতুন নাম হলো না? জয়নগর, স্যার।’

‘ক-নম্বর জয়নগর?

‘তিন।’

‘তিন? মানে খালের ঢালে? তাহলে খালপাড় বলছেন কেন? খালপাড় বললে তো রাস্তার পশ্চিম বোঝায়।’

‘ওই। আর কী?’

‘তাহলে কাল সকাল এগারোটায় আপনারা স্পটে থাকবেন। আমি যাবো। এই খালেজলে ডুবে মরা, বিশেষ করে বর্ষাকালে, গবমেন্ট খুব স্ট্রিক্ট হয়ে গেছে। আপনারা কেউ আবার উদ্ধার করতে জলে নামবেন না – তাহলে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। আর ওই পুরনো বডিটাও পাঁকে আরো ঢুকে যেতে পারে। এসব প্রফেশনাল কাজ। পোর্ট কমিশনার থেকে ডুবুরি রিকিউজিশন করতে হবে। সে হয়ে যাবে। কাল সকাল এগারোটায়।’

কথা তো শেষই হয়ে গিয়েছিল, এরা দরজা পেরোতে শুরু করেছে। হঠাৎ বড়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এই লোকটার বাড়িতে, কী  নাম লোকটার? ডুবে গেছে -’

‘নিমাই ঢালি।’

‘হ্যাঁ। ওর ফ্যামিলিকে রিপোর্ট করা হয়েছে তো ডাউনিং কেস? করা না হলে এখুনি জানিয়ে দিন। ওদের অ্যাডাল্ট কাউকে কাল স্পটে থাকতে বলবেন ভোটার কার্ড নিয়ে। নইলে ডেডবডি আইডেন্টিফিকেশনও হবে না, হ্যান্ড-ওভারও হবে না।’

একটু বেশি রাত, এত আইনকানুন, ভোটার কার্ড, গবমেন্ট স্ট্রিক্ট, পোর্ট কমিশনার, বিশেষ করে ডুবুরি – এতসবের পর মনে হলো নিমাই ঢালি সত্যিই মরেছে ও তার মরা নিয়ে সবাই মিলে যথেষ্ট করা হয়েছে ও আরো করা হবে।

ফাঁড়ি থেকে বেরিয়েই ভিড়টা ভাগ হয়ে যায়। নিমাই ঢালির বাড়িতে খবর দেওয়ার লোক ভিড়ের মধ্যেই ছিল। সেও ওই জয়নগর তিন-নম্বরে, মানে একটি খালের ঢালে, থাকে। সে থানায় কিছু বলেনি সাহস করে। বেরিয়েও কিছু বলত না। কিন্তু নিমাই ঢালি যেমন চন্দ্র সাঁতরার লোক ছিল, তেমনি এই লোকটিও কারো লোক। সেও ওই ভিড়ে ছিল। সে-ই বলল, ‘তুমিই তাহলে খবরটা দিও, কাল ওই সময়ে ওদের কাউকে নিয়ে ওই জায়গাটায় এসো। ভোটার কার্ডটা ভুলো না।’

২১ জুন, শনিবার, রাত সাড়ে দশটা নাগাদ আকাশ আরো বেশি তারায় জ্বলজ্বল করছিল। মানে, এখন কয়েকদিন সকালে ঝরা, বিকেলে খরা। সেই কারণেই তো চন্দ্র সাঁতরা নিমাই ঢালিকে খাল থেকে পাইপটা তুলে আনতে বলেছিল। তারপর এই পাঁচ ঘণ্টা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর সবারই, চন্দ্র সাঁতরারও, মনে হলো, নিমাইয়ের জন্য ভালো ব্যবস্থাই হলো। একেবারে ডুবুরি।

দেড়-দু ঘণ্টার মধ্যেই চন্দ্র সাঁতরা তার স্ত্রী ও বছর নয়েকের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে থানায়, মানে অর্জুনপুর ফাঁড়িতে, এসে বলল, ‘স্যার, আমাকে বাঁচান, আমাকে আশ্রয় দিন।’ থানায় তখন দলুই ছিলেন না, বন্দুক-কাঁধে একজন পুরনো কনস্টেবল ছিল। চন্দ্র সাঁতরা তার কাছেই আশ্রয় চাইল।

সে বলল – ‘আপনি তো এখনই সেই জলে-ডোবা কেস রিপোর্ট করে গেলেন। এর মধ্যে কী হলো?’

‘কী করে বলব? খেয়েদেয়ে সবে শুয়েছি, বাড়িতে যেন ডাকাত পড়ল, ঢিল, পড়ছে তো পড়ছেই, শেষে ভাবলাম বোমাও তো মারতে পারে?’

‘কারা? কেন? আপনাকে বলল না কিছু?’

‘বলল তো, চিৎকার করে, আমি নাকি নিমাই ঢালিকে ডুবিয়ে মেরে বাড়িতে এসে ঘুমুচ্ছি। কমপেনসেশন দিতে হবে। নিমাই তো থাকে ওদিকে খালের ঢালে। ওই ভাঙাপচা প��ইটলাইয়ে মাথাটা গুঁজে দেওয়ার মতো একটু জায়গা করেছে। এত লোক নিমাইকে চিনত যে রাত বারোটায় আমার বাড়িতে চড়াও হবে? আর আমার দোষ কী স্যার? অন্তত আজ রাতের জন্য শেল্টার দিন।’

‘আপনি যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফাঁড়িতে এলেন, ওরা আপনাকে আসতে দিলো? ঠিক আছে। ভিতরে গিয়ে শুয়ে থাকুন। বড়বাবু এলে বলবেন।’

‘আমি তো পাঁচিল টপকে পালিয়ে এসেছি। ওরা টের পায়নি।’

‘ও তো পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা। ওরা কি ওই লোকটাকে চেনে নাকি। এত রাত্তিরে থানায় এত লোক দেখে ধান্দা করার জন্য জেনে নিয়েছে। কিছু ডোনেশন দিয়ে দেবেন ক্লাবে।’

ডায়েরি করে চন্দ্র সাঁতরা ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে আবার যে ফাঁড়িতে ফিরে এলো, তার মধ্যেই সংবাদপত্র থেকে থানা-বিটের ফোন এসেছিল। তখন এই পুরনো কনস্টেবলটিই বলেছিল, ‘একটা           জলে-ডোবা কেস ডায়েরি হয়েছে। কাল এনকোয়ারি হবে।’

‘মানে, নর্মাল জলে-ডোবা? মেয়েছেলে, না বেটাছেলে?’

‘ওই, হয় তো, এই বর্ষার টাইমে। কাল ফোন করবেন। বেটাছেলে।’

২২ জুন, রবিবার সকালে হাওয়া-বৃষ্টি দুই-ই ছিল। হাওয়া থাকলে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেমন কাত হয়ে যায়, তেমনই হচ্ছিল – ছাতাতে ভেজা ঠেকানো যায় না, ছাতা ওই হাওয়ায় সামলানোও যায় না। ছাতার ডাঁট ফাঁপা-অ্যালুমিনিয়ামের হওয়ায় আর ছাতার শিক কমে যাওয়ায় ছাতা আর হাওয়া সামলাতে পারে না। এসব বৃষ্টি খুব  লোক-ঠকানো। দেখলে মনে হয়, তেমন কিছু না। আর, নামলে বোঝা যায় এগোনো যায় না। চন্দ্র সাঁতরা আর নিমাই ঢালির আন্দাজ ঠিকই ছিল – ওই শনিবার থেকে হাওয়া আর-এক পাক বদলেছে, সকালে ঝরা বিকেলে খরা। সেই ঠিক আন্দাজের ফলেই নিমাই ঢালি জলের তলায় আর চন্দ্র সাঁতরা বৃষ্টির তলায় ওই ২২ জুন রোববার বেলা এগোরোটা-সাড়ে এগারোটায়। থানার বড়বাবু বেলা এগারোটায় আসবেন বললেই যে আসেন, তিনি ডুবুরির কথা বললেও যে সত্যি-সত্যি ডুবুরি আসে, এ কেউ বিশ্বাস করে? নিমাই ঢালির ফ্যামিলি তো আসবেই – ভোটের ফটোসহ।

অনেকেই এর আগে কখনো ডুবুরি দেখেনি। ফলে দেখতে না-দেখতে ভিড় হয়ে গেল। ল্যাঙট-পরা লোকদুটো মাথায় হেলমেট পরেছে বলেই ডুবুরি? হেলমেট আর ল্যাঙট দুই-ই আজকাল এত চেনা হয়ে গেছে, অবাক হতে চাইলেও খুব একটা অবাক হওয়া গেল না। খুব ছোট একটা জেনারেটর চালিয়ে দিয়ে তারা একজন পায়ে-পায়ে জলে নামল, ডুবল, ভাসল, ডুবল, উঠে এলো। সে  উঠে-আসতেই ভটভটি থামিয়ে দেওয়া হলো। ‘কোনো বডি নেই, এত খারাপ জল, পানার কত নিচে জল – মাপাই যায় না।’ বড়বাবু নিশীথ দলুই বলে দিলেন, কাকে তা বোঝা গেল না, কিন্তু গলা চড়িয়েই বললেন, তাঁর গাঁয়ে ওয়াটার প্রুফ, মাথায় ছাতা ধরে ছিল এক বন্দুকওয়ালা সেপাই – ‘বডি পাওয়া না গেলে কিন্তু ডোবা-কেস করা যাবে না।’ এ ভিড়ের বেশিরভাগ লোকই ঘটনাটা জানে না, আন্দাজেই ধরে নিয়েছে – জলে ডুবেছে কেউ। নিমাইয়ের প্রতিবেশী লোকটি নিমাইয়ের বৌকে হাত তুলে আশ্বস্ত করে কারণ বড়বাবুর গলায় তার মনে হয়েছে নিমাইকে নিয়েই কিছু একটা বলা হচ্ছে। নিমাইয়ের বৌ ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে ঠিকে কাজ করে, তার আয় নিমাইয়ের চাইতে নিশ্চিতও বটে, নিয়মিতও বটে। মানুষের গলার স্বরের মানে সে বোঝে, অনেকটা আন্দাজ করতে পারে – না-বুঝলে না-পারলে তার চলবে কী করে।

কাল রাতে খবরটা শোনার পর, বোঝার পর, কান্নাকাটির পর, পাশাপাশি লোকজনের কথাবার্তা শোনার পরও সে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার একটু সময় পেয়েছে। নিমাই এমন হঠাৎ মরে যাওয়ায় তার দুই মেয়ে নিয়ে খাওয়া-থাকার খুব একটা অদলবদল কিছু হবে না – নিমাই মাঝেমধ্যে যা আয় করত, সে-টাকাটা সে কয়েকটি ফ্ল্যাটে মাইনে বাড়িয়ে পুষিয়ে নিতে পারবে। মানুষজন তো ভালোই হয়। কাজের লোক কাজ ছাড়বে না আর কামাই করবে না বুঝলে ভদ্রলোকরা আজকাল দু-দশ টাকা দিতে হাত কচলায় না। বাড়ির পুরুষমানুষের এমন দুর্ঘটনায় মরণ ঘটলে বৌদি-মাসিমারা ভয় পেয়ে যান, নিমাইয়ের বৌয়ের কপালের সঙ্গে অন্তত দু-চারদিনের জন্য নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন – তাঁরও এমন কিছু ঘটে যেতে পারে। যেন আগেও তার স্বামী মারা গেছে বলেই নিমাইয়ের বউ এসব ভেবে নিতে পারে – তা নয়। রাস্তা বা মাঠ থেকে পচা প��ই আর পলিথিন কুড়িয়ে, এমন পচা-মজা খালের ঢালে ঠিকানা বানিয়ে সারাদিন ও সন্ধ্যা নানা আয়ের নানা ফ্ল্যাটে-বাড়িতে ওঠানামা করতে-করতে নিমাইয়ের বৌয়ের আন্দাজ এতই শেয়ানা ও লাগসই।

নিজেকে এটুকু গুছিয়ে নেওয়ার পরই কেবল সে নিমাইয়ের মৃত্যুতে তার ক্ষতির ও শূন্যতার ভিতরের চাইতেও ভিতরের জায়গাটা ছুঁতে পারে। সে কেমন একা হয়ে গেল। দুজন মিলে খেটেখুটে দুই মেয়েকে বড় করে তোলা – এই ব্যবস্থাটায় সে এমন হঠাৎ একা হয়ে গেল? কথা বলারও কেউ থাকল না? নিমাইয়ের বউ যেন বুঝে ফেলে, তাদের তেমন খুব দুঃখ-কষ্ট অভাবও যেন ছিল না। তেমন অনভাবে এখন অভাবে পড়ে গেল? সে-অভাব তার ঘুচবেই না? কিন্তু এমন হতেও পারে – ওই যে সাপ��য়ার চন্দ্র সাঁতরার জলে-ডোবা পাইপ তুলতে গিয়ে মানুষটি চলে গেল, তার কাছ থেকে, মানে তার জোগাড়-যন্ত্ররে, সে খাল ঢালের চাইতে উঁচু কোনো জায়গায় একটা ছাউনি তুলতে পারবে। এমন জায়গার জন্য ক্লাবের দাদাদের টাকা দিতে হয় – সেটা তো এই সাপ��য়ারবাবু দিতে পারে? থানার বড়বাবু জোর দিলে হয়ে যাবে। তাই বড়বাবুর ওই গলা শুনে তার কেমন সন্দেহ হলো – বড়বাবু যেন আলগোছ হতে চান। লোকটা ডুবলই যদি, ডুবুরিরা পায় না কেন?

কিন্তু ডুবুরিরা সত্যিই পেল না নিমাইয়ের বডি। তারা দুজন মিলে পালা করে-করে অনেকবারই ডুবল ও ভাসল, কিছুক্ষণ জিরিয়েও নিল, আবার ডুবল-ভাসল কিন্তু নিমাইকে পেল না। তারা একবার জিজ্ঞেসও করল – ‘স্পট ঠিক আছে তো?’ বড়বাবু ডাকলেন, ‘কই, ওই ভদ্রলোক কোথায়? স্পট ঠিক আছে তো?’ চন্দ্র সাঁতরা পেছন থেকেই বলে দেয়, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, স্পট গোলমাল হবে কী করে? পাইপ তো এখনো আছে।’ সারা-রাত সারা-সকাল গেল, বডি নেমে যায়নি তো –  এমন একটা কথা যে উঠছে তা বোঝা যাচ্ছিল। বড়বাবু বললেন, ‘তা যেতে পারে। আপনারা তো কাল এই স্পটটাতেই ডুবে গেছে বললেন, তাই আমরা এই জায়গাটাই দেখছি। বডি না পেলে তো আর কেস খোলা যাবে না।’

এবার নিমাইয়ের বউ স্পষ্ট করে বলে উঠতে পারল, ‘জলজ্যান্ত মানুষটা ঘর থেকে বেরিয়ে খালের জলে নেমে আর উঠল না, তার কেস হবে না?’ চন্দ্র সাঁতরা ক্লাবের দুইজনকে বলল, ‘আপনারা ওকে একটু বোঝান, চেষ্টা তো হচ্ছে, বডি পাওয়া না-গেলে কী করা যাবে?’ ক্লাবের ওরা জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে বোঝাব? ‘নিমাইয়ের স্ত্রীকে – ’। ‘আমরা তো ওকে চিনিই না – ।’

ডুবুরিদের প্রস্থান ঘটল, সবাই সব বুঝে উঠতে পারার আগেই। তারা মাথা থেকে পা মুছে, একটা পুরনো গামছার আড়ালে ভেজা ল্যাঙট ছেড়ে নতুন জাঙ্গিয়ার ওপর প্যান্ট পরে নিল। তারপর একজন একটা টি-শার্ট, আর-একজন একটা জংলাছাপের হাওয়াই শার্ট পরে একজন ভটভটিয়াটা কাঁধে ঝুলিয়ে, আর একজন দুটো হেলমেট এক করে বগলে চেপে, একটা প্রাইভেট বাসে উঠে পড়ল, যার পেছনে লেখা ‘বসন পর্ মা, বসন পর্’। ওই ভিড়ের অনেকেই, হয়তো প্রত্যেকেই, টিভিতে ডুবুরি দেখেছে। ডুবুরিরা যে জামাকাপড় বদলে প্রাইভেট বাসের প্যাসেঞ্জার হয়ে চলে যেতে পারে – এটা তারা ভাবেনি। সেসব নীল জলের সঙ্গে ম্যাচ করা থাকে ডুবুরির গেঞ্জির আর জাঙিয়ার রং। বড়বাবু বললেন, ‘ওরা তো পেল না।’

‘সারা-রাত সারা-সকালে তো বডি নেমে গেছে।’

‘হ্যাঁ। নেমে যেতে পারে। তাহলে নিচে কোন স্পটে আপনারা সন্দেহ করছেন, বলে দিন, কাল আবার রিকিউজিশন করব। কাল যে-স্পট বলেছেন, আজ তো সেটা দেখা হলো।’

‘ও-রকম একটা জায়গা কি আন্দাজ করা যায়?’

‘তা করা যায় না ঠিকই। তবে আর কী করা যাবে?’

‘ওঁরা যদি এখান থেকে খুঁজতে-খুঁজতে নিচে নামতেন -’

‘মানে, বডি না-পাওয়া পর্যন্ত?’

‘হ্যাঁ। সবাই তো বলছেন, ও খালে নেমেছে। তা নিয়ে তো আর সন্দেহ নেই?’

‘সবাই মানে তো একজন। চন্দ্র সাঁতরা। আর-কেউ তো আর ওকে জলে নামতে দেখেনি। সবাই শুনেছে। আর, দেখেছে – খালের জল থেকে কেউ উঠছেও না, জলে কেউ ভাসছেও না।’

‘কিন্তু খালে তো নেমেছে – এটা ঠিক?’

‘তাহলে বরং খালের মুখে, বাগজোলায়, ওয়াচ করতে হবে, বডিটা বেরোয় কি না -’

‘মানে, ডুবুরিরা খুঁজতে পারেন না?’

‘এই পুরো খালের লেংথ আর ব্রেডথ্? কী বলছেন? তাছাড়া আমাদের তো আগে যা করা হয়েছে, তাই মেনে চলতে হবে। তিন বছর আগে তার মায়ের হাত থেকে ছিটকে একটি আট বছরের ছেলে ম্যানহোল দিয়ে গলে গিয়েছিল না, উলটোডাঙায়? তখনো তো খালের মুখে ওয়াচ রেখে পাওয়া গিয়েছিল, তিনদিন পর। ডুবুরি নামিয়ে পাওয়া যায়নি। তখন থেকে এটাই প্রসিডিয়োর। একবার স্পটে ডুবুরি, তারপর খালের মুখে ওয়াচ।’

‘জলজ্যান্ত মানুষটা ডুবে গেল আর তার বডি পাওয়া গেল না?’ নিমাইয়ের বৌয়ের এই প্রশ্নে বড়বাবু বললেন, ‘বডি না পেলে তো আর ডুবে-মরা প্রমাণ হবে না। তুমি বরং থানায় এসে একটা মিসিং ডায়েরি করে যাও, মেয়ে।’

রবিবারে কাগজের অফিসে স্কেলিটন স্টাফ। রাত সাড়ে দশটার পর তাদের কেউ থানাবিট করতে গিয়ে ডুবুরি-নামা ও বডি                না-পাওয়ার কথা জানল, আসলে পুরো ঘটনাটাই প্রথম শুনল।

‘স্যার, ডুবুরি পর্যন্ত নামল, বডি পাওয়া গেল না, আমাদের একটু জানালেন না স্যার? বেটাছেলে, না মেয়েছেলে?’ ২৩ জুন, সোমবার পরদিন, একটি কাগজই তাদের ফাইল থেকে ডুবুরিদের ছবি ছেপেছিল – হেলমেট থেকে জাঙিয়া সাইড শট। জল তো চেনা যায় না।  (চলবে)