অস্ট্রেলিয়া  থেকে  চাচার  জন্য  একটা  মোবাইল  সেট পাঠিয়েছে। চাচা সেই সেটটা বুকপকেটে রাখেন। সেটটা লম্বা। বুকপকেটে রাখলে সেটার আগা বের হয়ে থাকে। অফিসের কলিগরা দাম জানতে চান, মডেল জানতে চান, অপশন নতুন কী কী আছে জানতে চান। চাচা উদাস মুখে বলেন, ‘কী জানি!’ কলিগরা তখন বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘কিনেছেন – জানেন না! তাহলে কী কিনলেন?’ উনিও বিরক্ত হয়ে জবাব দেন, ‘কিনলে তো জানতাম!’

‘ও গিফট!’ কলিগরা একবার চোখ গোল করে মুহূর্তেই আবার স্বাভাবিক করে ফেলেন। ‘হ্যাঁ, গিফট। আমার ভাতিজি বীথি পাঠিয়েছে। ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। পিআর। ওর হ্যাজবেন্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ম্যাকোয়ারি পার্কে বাড়ি কিনেছে। টিনের চালওয়ালা বাড়ি। সবুজ টিনের চাল। চালের ওপরে মাধবীলতা, নিচে কবুতরের ঘর। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এক হালি করে। না-না, এক ডজন করে …।’ শেষের

কথাগুলো তাকে খুব জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলতে হয়, ওনার শ্রোতারা ‘ওহ্, গিফট’ বলে সেই কখন মুখ ঘুরিয়ে চলে গেছে। চোখের আড়ালে চলে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি কথা বলতে থাকেন। তাঁর গল্প এ-অফিসের কেউ শোনে না, আর বাসায় শোনার কেউ নেই। অথচ ল্যান্সার ভিজিলেন্স সিকিউরিটি কোম্পানির এই চাকরিটি তিনি নিয়েছিলেন কথা বলে সময়টা কাটানোর জন্য। ৩০ বছরের চাকরিশেষে তেজগাঁও টিঅ্যান্ডটি অফিস থেকে যেদিন অবসরে গিয়েছিলেন – আজ থেকে নয় বছর আগে – সেদিনই বুঝেছিলেন, বই পড়ে সময় কাটে, তবে পুরোটা কাটে না; গান শুনে সময় কাটে, তবে পুরোটা কাটে না; মুভি দেখে সময় কাটে, তবে পুরোটা কাটে না; সময়ের বাকিটা কাটে মানুষের সঙ্গে কথা বলে, মানুষের কথা শুনে, মানুষকে দেখে। তিনি লক্ষ করেছেন, কোনোদিন মানুষের সঙ্গে ঠিকমতো সময় কাটাতে পারলে, সেদিন আর অন্য কিছু না হলেও চলে। তাই অবসরে গিয়ে আবার চাকরি নিলেন। রোজ সকাল-সকাল পত্রিকা হাতে করে অফিসে ঢোকেন – যদিও পত্রিকা পড়ার অভ্যাস তাঁর নেই – চলতি ঘটনা তাঁকে কোনোকালেই টানেনি, শুধু আলাপের প্রসঙ্গগুলো জানার জন্য চলতি ঘটনাগুলো একবার দেখে রাখেন, আর শুনে মন্তব্য করার জন্য কলামগুলো পড়ে রাখেন। গত নয় বছর তাঁর এভাবেই কেটেছে। জীবনটাকে একটা রুটিনে বেঁধে নিয়েছেন। বড় কাজের জন্য জীবনটাকে রুটিনে বাঁধতে হয়, না হলে বড় কাজ আর বড় করে হয় না – ছোট করে হয়ে যায় – ছোটলোকের মতো করে – যাচ্ছে-না-তাইভাবে। 

সোহরাব সাহেব রাতে শুয়ে শুয়ে ওই সেটের  স্ক্রিনে  টাচ  করেন;  টাচ  করে এক-একবার এক-একটা জিনিস বের করে আনেন; রোজই নতুন নতুন চমক বেরিয়ে আসে, তাঁর ভালো লাগে। বীথি যখন ছোট, একটু একটু করে কেবল বড় হচ্ছে, প্রতিদিন যেন ওর শরীরে নতুন নতুন কিছু খুঁজে পেতেন – ছোঁয়ার জন্য – আর ছুঁয়ে দিলে নতুন নতুন ঘটনা ঘটত – একদিন পায়ের তলা ছুঁয়ে আবিষ্কার করলেন, ওর দাঁত গজাচ্ছে। আরেক দিন হাতের আঙুল ছুঁয়ে আবিষ্কার করলেন, আঙুল ছেড়ে দিলেও ও আঙুল ছাড়ে না, ছাড়াতে গেলে কাঁদে, তখন কোলে তুলে নিলেই কেবল থামে, নয়তো কেঁদেই চলে। তা যদি হয় অফিস দিনে, সকালবেলা, তো সেদিন অফিসে যাওয়ার প্ল্যান বাতিল। অফিসে দেরি করা, না-বলে না-যাওয়া, গিয়ে বকা খেয়ে আসা – এসব তাঁর ক্ষেত্রে নিত্যনৈমিত্তিক। আজ ভাতিজির সর্দি লেগেছে, কোলে করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন; কাল ওর স্কুলের প্রথম দিন, ঘটনার সাক্ষী থাকতে হবে; পরশু ওর কান-ফোঁড়ানি, ডাক্তারকে গাইড না করলে ইনফেকশন বাধিয়ে দেবে; আরেকদিন ওর বিয়ে – বাজারঘাট করা – কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি, রক্তজবা রঙের ব্লাউজ, খয়েরি রঙের পেটিকোট; অনেক খুঁজে খুঁজে সাদা শাঁখা আর জারবেরা ফুলের মালা কেনা – চাকরিজীবন তাঁর এভাবেই কেটেছে। টিঅ্যান্ডটি অফিস থেকে যেদিন অবসরে গেলেন, সেদিন খুব করে মাফ চেয়ে নিয়েছিলেন, ‘… আমার একটু দেরি হতো মাঝেসাঝে, আর মাঝেসাঝে অনুপস্থিত থাকতাম, আর কাজটাজ একটু কম বুঝতাম …।’ তেজগাঁও টিঅ্যান্ডটি অফিসের রাশভারী ডিএমডি সাহেব সেই ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানেও হেসে ফেলেছিলেন। সেদিন সেমিনার কক্ষের অনেকেই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে মাথা নিচু করে হেসেছিল। তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই অনুপস্থিত থাকতেন – তাঁর সংসার নেই। তাই বলে তিনি সংসারী মানুষ নন – সে-কথা যেন কেউ মনে না করে সেজন্য তিনি নিয়ম করে অনিয়ম করতেন।

দুই

ল্যান্সার ভিজিলেন্সের ছোকরাগুলো খুব বেয়াদবগোছের। ওরা চাকরি করতে আসেনি, চাকরি খুঁজতে এসেছে। আসলে এতো অল্প বেতনের চাকরি কেউ করে না। এগুলোর ভেতরে আলিম ছোকরাটা সবচেয়ে বেয়াদব। অফিসের সবার ধারণা, আলিমই অন্য ছোকরাগুলোকে বেয়াদব বানিয়েছে। সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে টেপাটেপি করে, কোনো কাজ করে না, বাংলার ভেতরে ইংরেজি ঢুকিয়ে কথা বলে; সামনে জ্যেষ্ঠদের ‘স্যার’ বলে, আর পেছনে ‘আকমল সাহেব’, ‘রাব্বানি সাহেব’, ‘এমডি সাহেব’, ‘সুপারভাইজার সাহেব’ – এসব বলে। কাছাকাছি বয়েসিদের ‘ভাই’ বলার চেষ্টা করে – ‘মামুনভাই’, ‘শামিমভাই’, ‘সাইদভাই’ – এভাবে। সোহরাব সাহেবকে পেছনে কী বলে সেটা সোহরাব সাহেব জানেন – ‘গ্র্যান্ডড্যাড’, ‘ওল্ডম্যান’, ‘বুড়া মেঞা’ – এইসব; মাঝে মাঝে শুধু ‘বুইড়া’ও বলে; আবার মাঝে মাঝে ‘মাকুন্দ বুইড়া’। তবে ‘মাকুন্দ বুইড়া’ বলতে শুরু করেছে অনেকদিন পর থেকে, অনেক কাছ থেকে দেখে নিশ্চিত হয়ে তবেই বলতে শুরু করেছে। যা হোক, ছেলেটার জ্ঞান ভালো। সেদিন চা দিতে এসে সোহরাব সাহেবের বুকপকেটে মোবাইল সেটটার আগা দেখেই পুরো সেটটা চিনে ফেলল – ‘ইস্মাট ফোন – আমনের পকেডে ওইডা ইস্মাট ফোন।’ সোহরাব সাহেব কিছু বললেন না। আলিম বলে গেল, ‘ইস্মাট ফোন মানে হইতে আছে তাতে অ্যাপস চালানো যায়, আর অ্যাপস মানে হইতে আছে ভিডিও দেখা, মেসেঞ্জারে কল করা, ফেসবুক চালানো – এইসব।’ শুনে সোহরাব সাহেব বুঝলেন সেটটা অনেক দামি। তবে কত দাম সেটা আলিম বলতে পারেনি; নাড়াচাড়া করে শুধু বলেছিল, ‘অর্জিনাল।’ সোহরাব সাহেব বলেছিলেন, ‘তোরা জানবি কোত্থেকে? তোরা তো কিনিস সব দেশি সেট।’

অবসর সময়ে সোহরাব সাহেব সেটটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। বীথির ছেলেবেলার কথা মনে করেন। তাঁর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করেন। তারপর বুকের ওপরে সেটটা রেখে চিৎ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। একদিন রাতে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ স্ক্রিনের নিচের দিকে বাঁ কোনায় একটা সংখ্যার ওপরে চোখ পড়ল – ৬৩১। পরিবাগে যখন থাকতেন, বছর ত্রিশেক আগে, বীথির তখন তিন বছর বয়স, একটা মাই-চাইল্ডের কান ধরে ঘর ভরে হেঁটে বেড়াত, সেই বাসাটার নম্বর ছিল ১৩৬ – কী অদ্ভুত মিল – ঠিক তার উল্টো সংখ্যাটা হচ্ছে ৬৩১। ওই বাসার সামনে একটা কড়ইগাছ ছিল। চাঁদ উঠলে চাঁদের আলো চিরে চিরে বেলকনিতে এসে পড়ত – কখনো মোটা মোটা ডালে আটকাত, কখনো ঝিরিঝিরি পাতায়; আর বারান্দার মেঝেতে আলোছায়ার রহস্যময় প্যাটার্ন তৈরি হতো – ফেলে-আসা কবেকার সেই গ্রামের বাড়িতে সোহরাব সাহেবের মা দুই দাঁতে সুতো কেটে কাঁথার ওপরে ফুলপাখি-লতাপাতা আঁকতেন – সেরকম নকশা। হাফপ্যান্ট পরা সোহরাব যদি হাঁটু গেড়ে বসে জানতে চাইতেন, ‘এইডে কোন গাছের পাতা, মা?’ তাঁর মা বিরক্ত হতেন – ‘ধুত্তুরি! তোর অত পণ্ডিতি করতি হবি নে!’ হাফপ্যান্ট পরা সোহরাব পরের প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে দৌড়ে পালাতেন – ‘এইডে কী পাখি, মা – কানাকুয়ো?’ চাঁদের রাতগুলোতে পরিবাগের সেই বাসার বারান্দায় বসলে মায়ের কথা খুব মনে পড়ত। বীথির মায়ের কাছ থেকে ওকে চেয়ে নিয়ে আসতেন। লুঙ্গির কোচের ওপরে রেখে বারান্দায় মোড়া পেতে বসতেন। বীথি ছোট একটা আঙুল তুলে দেখাত – ‘চান।’ সোহরাব সাহেব বলতেন, ‘হ্যাঁ, চাঁদ মামা।’ বীথি বলত, ‘চাম্মা।’ বীথির বাবা গদি থেকে ফিরে এসে পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে কঠিন গলায় ডাক দিত, ‘বীথি! খাতি হবি, আয়!’ ওর মা টুংটাং আওয়াজ করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেলত। বাথরুমে ছরছর করে পানি পড়ার আওয়াজ পেলে সোহরাব সাহেব বুঝতেন, বীথিকে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে বসাতে হবে, আজ আর চাঁদ দেখা যাবে না। বীথির বাবা সোহরাব সাহেবের ছোট – বারো বছরের ছোট। বড় হলে না হয় বলা যেত, ‘বীথি চাঁদ দ্যাখে। গাছের পাতার ফাঁকে আস্ত একটা চাঁদ বসেছে। তুমরাও আসো, দ্যাখ্ফা।’ ছোটরা বড় হলে তাদের কাছে আহ্ল­াদের কথা বলা যায় না, কেবল কাজের কথা বলতে হয়। আর বীথির মা চাঁদ-সূর্য দেখে না। আসলে সে কী দেখে, সে কী দেখে না, কী তার ভালো লাগে, কী তার লাগে না – সে নিজেই জানে না। সারাদিন শুধু হাঁড়িভরে রান্না করে, দুই কনুই নেড়ে নেড়ে বাসনকোসন ধোয়, মাজা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের মেঝে মোছে – টিভি দেখে না, গান শোনে না, গল্প করে না, শপিং করে না। এতে সুবিধা ছিল – বীথির বাবা অনেক রাতে ফিরলেও অসুবিধা হতো না – কারোর ভালো লাগা না-লাগা নিয়ে ভেবে ভেবে ঘুম কামাই করতে হতো না; কিংবা কোনো রাতে না ফিরলেও পরের দিন দিনভর নাক ডেকে ঘুমুতে পারত।

তিন

সোহরাব সাহেব অফিসে গিয়ে আলিমকে ডেকে পাঠালেন। আলিমকে ডাকার উদ্দেশ্য সেটের নতুন কিছু ফাংশন শেখা। আলিম খুব আগ্রহ নিয়ে শেখায়। স্ক্রিন সরিয়ে সরিয়ে কোথা থেকে কখন যে কী বের করে আনে, সোহরাব সাহেবের বুকের ভেতরটা চমকে ওঠে – কী সেটটাই না দিয়েছে তার ভাতিজি! আলিম এসে বলল, ‘স্যার, ফোনডা মোর দারে দ্যান, ভাইরাস ক্যামনে কিল করতে হয় আমনেরে দেহাইয়া দেই।’ সোহরার সাহেব মুখে বললেন, ‘দে’, আর মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন, ‘ভাইরাস এমন কী জিনিস, যেটাকে কিল করতে হবে?’ আলিম সেটটা সোহরাব সাহেবের চোখের সামনে ধরল, ‘এই বোতামডায় একটা টিপ দেবেন, একখান চাকতি আইয়া কতক্খোন ঘোরবে, ঘোরা বন্ধ অইলেই মনে হরবেন ভাইরাস কিল – গড মি?’

‘গড মি না, পাগল, গট মি!’

‘আমনে বোজদেয়ারছেন কি না?’

‘মনে হয় পারব।’

‘অলরাইট!’

সোহরাব সাহেব একবার ভাবলেন, আলিমকে জিজ্ঞাসা করবেন, মোবাইলে ভাইরাস কেন ঢোকে। আরেকবার ভাবলেন, না থাক – ছেলেটার বানিয়ে বানিয়ে কথা বলার বদভ্যাস আছে – না জানা থাকলে উত্তর একটা বানিয়ে ফেলবে – এসব ছেলেপুলের কাছ থেকে জটিল কোনো জ্ঞান নিতে নেই। আলিম চলে গেলে তাঁর মনে পড়ল, সংখ্যাটার বিষয়ে তো ওকে জিজ্ঞাসা করা হলো না।

সেদিন ঘরে ফিরে সোহরাব সাহেব প্রতিদিনের মতো সেটটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। স্ক্রিনের ওই জায়গায় চোখ পড়তেই অবাক হলেন – সেই সংখ্যাটা আর নেই, সেখানে অন্য সংখ্যা – ৭১২। অল্পের জন্য জিগাতলার রোড নম্বরটা হয়নি – শুরুতে ৭ না থাকলে হতো – ১২ নম্বর রোড। ওই রোডে তাঁদের বাসা ছিল – অল্প কিছুদিন ছিল। বীথি তখন স্কুলে যায়। ওর বাবা একটা রিকশা নিয়ে সোজা ইসলামপুরে গদিতে চলে যেত। ফিরত অনেক রাতে। ওর মা ঘুমিয়ে পড়ত। বীথি কোনো কোনো দিন টিভি দেখতে দেখতে সোফার ওপর ঘুমিয়ে পড়ত; কোনো কোনো দিন রান্নাঘর থেকে হাঁড়ির ঢাকনা তুলে প্লেটে করে ভাত নিয়ে আর ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা তরকারি নিয়ে, ডাইনিং টেবিলে বসে একা একা ভাত মাখিয়ে খেত। এই বাসাটা থেকে চাঁদ দেখা যেত না, সূর্যও দেখা যেত না। ঘোলা ঘোলা অন্ধকার। গুমোট লাগত। বন্ধের দিন বীথির সঙ্গে ক্যারম খেলার সময় সোহরাব সাহেব আলো জ্বালিয়ে নিতেন। সন্ধ্যায় গুমোট গরমে বীথির মা চিকন সুরে নাক ডেকে ঘুমোত। গভীর রাতে বীথির বাবা এসে ঘটাং ঘটাং করে বেল টিপত। সোহরাব সাহেব তাঁর রুম থেকে প্রথম কলই শুনতে পেতেন। বীথির মা শুনতে পেত তৃতীয় কল, তখন বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ হতো। আর ফ্রন্ট ডোর খুলতে খুলতে সাত-আটবার বেল বেজে যেত। ছোটরা বড় হলে তাকে অনেক কথা বলা যায় না; কিন্তু বড়কে যখন যা খুশি বলে ফেলা যায়।

সোহরাব সাহেব সেটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, মনে করতে পারছেন না। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন বুকের ওপরে সেটটা। মনে পড়ল, আগের রাতে ৭১২ নিয়ে ভাবতে ভাবতে জিগাতলার ১২ নম্বর রোডের বাসাটাতে ঢুকেছিলেন। সকালে সেটটা তুলে দেখেন সেই নম্বরটাও নেই। সেখানে এখন শূন্য মানে জিরো। আর শূন্যের ওপরে ছোট করে একটা কেডসের ছবি। কেডসের ছবিটা আগে ছিল কি না তাঁর মনে পড়ছে না। হয়তো ছিল, হয়তো না। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন, নম্বরটা থেমে নেই – ছুটছে  – কীসের সঙ্গে ছুটছে উনি বুঝতে পারছেন না। স্ক্রিনের একেবারে ওপরের দিকে যে তিনটি সংখ্যা কোলন দিয়ে আলাদা করা, সেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে – পাল্টে যাচ্ছে – একেবারে বাঁয়েরটা ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টাচ্ছে, একেবারে ডানেরটা – যেটা বেশি ছুটছে – সেকেন্ডে সেকেন্ডে, আর মাঝেরটা মিনিটে মিনিটে – আলিম বলে দিয়েছে। কিন্তু জুতোর নিচের এই সংখ্যাটা পাল্টাচ্ছে কীসের সঙ্গে? আর রাত পোহালেই কেন শূন্য হয়ে গেল? সোহরাব সাহেব ভাবলেন, আলিমকে জিজ্ঞাসা করতে হবে; আবার ভাবলেন, আলিম যদি না জানে তো ভুল উত্তর দেবে – ও একটা বাচাল টাইপের ছেলে – কিছু না জানলে বানিয়ে বানিয়ে উত্তর দেয়; কিন্তু কাকে আর জিজ্ঞাসা করবেন? ল্যান্সার ভিজিলেন্স কোম্পানিতে তিনি আর কারো সঙ্গেই অতটা ফ্রি নন। আলিম বাচাল বলেই হয়তো তার সঙ্গে সহজে খাতির হয়ে গেছে। তাছাড়া কলিগদের কারো কাছে জিজ্ঞাসা করেও লাভ নেই। তাঁদের অবস্থা তাঁরই মতো – রিটায়ার্ড মাল। রিটায়ারমেন্টের পরে ঘরে বসে আর থাকবে কি, সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে লোকজনের সঙ্গে গল্পগুজব করে সময়টা পার করে যায় – না হলে ঘরে গিয়ে বুড়ি গিন্নির ঘ্যানঘ্যানানি আর জোয়ান ছেলে ও ছেলেবউদের ফোঁড়ন শুনতে হবে। আবার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কী সুন্দর করে বলে যাবে, ‘আব্বু, চা দেই – চা খান।’

সোহরাব সাহেব অফিসে গিয়ে সেটটা হাতে নিয়ে দেখলেন, শূন্য আর নেই, এবার ৩১৮ দেখাচ্ছে। শেষমেশ আলিমকে ডেকে খুব বোকার মতো একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘দ্যাখ্ তো, আলিম, এই নম্বরটা কেন রোজ বাড়ে-কমে?’ আলিম চোখের কাছে সেটটা ধরে মুচকি হাসি দিলো, ‘ও, এইডা! খাড়ান, স্যার, দ্যাহাইতেয়াছি’ – বলেই মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে থপথপ করে পা ফেলে ডেস্কের চারপাশে ঘুরতে লাগল। সেই সঙ্গে সোহরাব সাহেব তাঁর রিভলভিং চেয়ারটায় বসে মুখ হাঁ করে ঘুরতে লাগলেন। তার বিস্ময় কাটার আগেই আলিম দুবার ঘুরে ফেলল; তারপর পকেট থেকে সেটটা বের করে দেখাল, ‘দ্যাহেন!’ তিনি দেখলেন সংখ্যাটা আবারো পাল্টে গেছে – ৩১৮ থেকে বেড়ে ৩৩৮ হয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। আলিম অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘আরে, বোজলেন না! ফুড কাউন্ট করতেয়াছে।’ সোহরাব সাহেবের চোখ আরো সরু হয়ে গেল। আলিম জ্ঞান দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘আরে, বুড়া মেঞা! কয়ডা পাও হালাইলাম হেইডা ক্যালকুলেট করতেয়াছে।’ সোহরাব সাহেবের মাথায় এবার ঢুকল। তিনি নিজে সেটটা হাতের ওপর রেখে কয়েক স্টেপ হেঁটে বললেন, ‘ওহ্, স্টেপ কাউন্টিং।’ আলিম সামনের চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে পড়ল। সোহরাব সাহেব আড়চোখে একবার তাকালেন। সেদিন বাসায় এসে ভাবলেন, এটাকে কোনো কাজে লাগানো যায় কি না – বীথি খুব খুশি হবে।

চার

সকালে আলিম চা দিতে এলে সোহরাব সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আলিম, তুই থাকিস কোথায়?’ আলিম বলল, ‘কাঁডালবাগান।’

‘ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে?’

‘আমনে কি কাঁডালবাগান গ্যাছেন?’

সোহরাব সাহেব কোনো জবাব দিলেন না, সুরুৎ করে চায়ে একটা চুমুক দিলেন। আলিম বলল, ‘কাঁডালবাগান ঢাল পারাইয়া।’ সোহরাব সাহেব উদাস হয়ে বললেন, ‘ওইখানে আমরাও ছিলাম রে। আমার ভাতিজি, সে-ও ছিল ওইখানে। ওর বাবা, আর ওর …।’ তিনি খেয়াল করেননি, আলিম কখন যেন উঠে চলে গেছে।

দুপুরে আলিম আবার চা দিতে এলে চায়ে চুমুক দিতে দিতে সোহরাব সাহেব আবার শুরু করলেন, ‘আমি থাকি তেজকুনিপাড়া। তোর জন্য একটু দূর হয়ে যাবে …।’ আলিম থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তেজকুনিপাড়া বেশি ডিসট্যান্ট না, স্যার – বোগোলেই আছে।’

‘তা বলতে পারিস। তবে সকালবেলা আসার জন্য দূরই বলা যায়।’

‘বেইন্নাকালে আইতে অইবে ক্যা?’

‘না, ভাবছিলাম, ভাতিজি একটা দারুণ সেট দিয়েছে তো, একটু কাজে লাগাই।’

‘কী কাম?’

সোহরাব সাহেব প্রস্তাব রাখার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ভাবছি, রোজ সকালবেলা নিয়ম করে হাঁটব।’ আলিম বলল, ‘কোম্মে হাঁডবেন?’ সোহরাব সাহেব কণ্ঠে উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, ‘লেক রোডে।’ ‘হাঁডেন’ – বলে আলিম চায়ের কাপ নিয়ে চলে গেল। সোহরাব সাহেব কী যেন ভাবলেন, একবার হাত বাড়িয়ে আবার গুটিয়ে নিলেন – আলিমকে বোধহয় ডাকতে চেয়েছিলেন। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে সেটটা হাতের তালুর ওপরে রেখে ডেস্কের চারপাশে থপথপ করে হাঁটলেন। স্টেপ কাউন্টারে রিডিং দেখলেন। আবার হাঁটলেন, আবার রিডিং দেখলেন।

সোহরাব সাহেবের স্টেপ কাউন্টারের রিডিং কখনো হাজার ছোঁয় না – এমনকি, যেদিন কিছুদূর হেঁটে গিয়ে রিকশায় ওঠেন, সেদিনও আটশো সাড়ে-আটশো ওঠে – খুব বেশি হলে নয়শো। তিনি হেঁটে হাজার পার করবেন, তারপর বীথিকে ফোন করে বলবেন, ‘দেখেছিস্, আমি আজ তোর মোবাইল সেট দিয়ে এক হাজার স্টেপ হেঁটেছি।’ কিন্তু বিদেশে কীভাবে কল করতে হয়, সেটা তো তিনি জানেন না। সেটা অবশ্য সমস্যাও নয়, আলিমের কাছ থেকে শিখে নেওয়া যাবে। কিন্তু ও যদি তাঁর ভাতিজির নম্বর জেনে ফেলে তাহলে তো যখন-তখন কল করবে। বীথির হ্যাজবেন্ড ইঞ্জিনিয়ার, খুব সফিস্টিকেটেড পারসন, কী ভেবে বসবে! আলিমের আক্কেল বলতে কিছু নেই। সোহরাব সাহেব ভাবলেন, ‘আগে তো হাঁটি, তারপর না হয় একটা ব্যবস্থা হবে। এর ভেতরে বীথিও তো একদিন ফোন করে বসতে পারে।’

সেদিন চা দিতে এসে আলিম জানতে চাইল, ‘আইজগো কয় স্টেপ হাঁডলেন, স্যার?’ সোহরাব সাহেব উত্তর দিলেন, ‘না রে, হাঁটাটা হচ্ছে না, একা একা হাঁটতে ভালো লাগে না।’ আলিম সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তাইলে লোনলি লোনলি থাহেন ক্যামনে?’ সোহরাব সাহেব চমকে উঠলেন বোধহয় – আলিমের পুরো মুখে একবার চোখ বুলালেন, আলিম তাহলে খবর নিয়ে ফেলেছে তিনি একা থাকেন। আলিম চলে গেলে সোহরাব সাহেব ভাবতে লাগলেন, ছেলেটা হ্যাংলা টাইপের। হাঁটার ব্যাপারটা ওকে বলা ঠিক হয়নি। ভাগ্য ভালো যে ওর বাসা দূরে, না হলে ঠিকই হাঁটতে চলে আসত, আর দুনিয়ার সব খবর বের করে ফেলত – হ্যাংলা কোথাকার!

সোহরাব সাহেব স্বস্তি পেলেন – আলিমের বাসা দূরেই আছে। কিন্তু চেয়ারে হেলান দিতেই আবার অস্বস্তি এসে ভর করল, আলিমটা তাঁর বিষয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে। হ্যাংলা ছেলেপুলে তিনি ছেলেবেলা থেকেই পছন্দ করেন না। এমনিতে তিনি মিশুক মানুষ, মানুষের সঙ্গ তিনি উপভোগ করেন; কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয়ে উৎসুকদের এড়িয়ে চলেন; পরিচিতদের ভেতরে কাউকে হঠাৎ অতি-উৎসাহী হতে দেখলে নীরবে সরে যান।

পাঁচ

কে জানত যে আলিম একদিন সত্যি সত্যিই চলে আসবে। সেদিন সকাল ৬টার সময় ও লেক রোডে এসে হাজির। কোত্থেকে একটা পুরনো ট্র্যাকস্যুট জোগাড় করে এনেছে, কাছ দিয়ে হাঁটলে গন্ধ করে। সোহরাব সাহেব একটু দূরত্ব রেখে হাঁটছিলেন। আলিম বারবারই তাঁর কাছে চলে আসছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কয়েকবার কাছে আসার পর, আলিম যখন দেখল কাছে আসা অত সহজ হচ্ছে না, সে বোধহয় বুঝতে পারল তার স্যার তার সঙ্গে হাঁটতে চাইছেন না। ও তাই দূরত্ব রেখেই হাঁটতে লাগল, আর কিছুক্ষণ পরপর চেঁচিয়ে জানতে চাইছিল, ‘স্যার, কয় স্টেপ হইলে?’ সোহরাব সাহেব কোনো জবাব দিচ্ছিলেন না। তারপরও কিছুক্ষণ পরপরই আলিম চেঁচাচ্ছিল, ‘কয় স্টেপ হইলে, দাদাজান, কিছু কইতেয়াছেন না ক্যা!’ আলিমের কণ্ঠে স্পষ্ট রসিকতা। সোহরাব সাহেবের বিরক্তি বাড়ল। তিনি আলিমকে দূর থেকেই হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বাসার দিকে রওনা হলেন। সেদিন অফিসে আসামাত্রই আলিম জিজ্ঞাসা করল, ‘কয় স্টেপ হাঁডলেন, স্যার, কইলেন না?’ সোহরাব সাহেবের বিরক্তি আরো বাড়ল – কে বলেছিল, এই ল্যাঠা জোটাতে! তিনি মনে মনে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করলেন, ‘আজ যেমন অ্যাভয়েড করেছি, কাল থেকে ও বোধহয় আর হাঁটতে আসবে না – একটা কোনো অজুহাত দিয়ে ভাগবে।’ তাঁর ধারণা ঠিক বলে মনে হলো, যখন অফিস ছুটির সময় আলিম বলল, ‘কাইল বেইন্নাকালে পরিবাগ যামু – সিস্টার’স হোম-নেফিউ ইল।’ সোহরাব সাহেব স্বস্তি পেলেন। কিন্তু পরদিন সকালে হাঁটতে গিয়ে আবার অস্বস্তিতে পড়লেন – আলিম কোথা থেকে ছুটতে ছুটতে এসে হাজির। আজ গন্ধটা আরো বেড়েছে – পুরনো ছাতলা গন্ধের সঙ্গে শুকনো ঘামের গন্ধ যোগ হয়েছে। সোহরাব সাহেব নাক বন্ধ করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার, তুই না বোনের বাসায় যাবি?’ আলিম একগাল হেসে জবাব দিলো, ‘গেল্লাম, মিসেসরে রাইক্খা তড়াতড়ি আইয়া পড়ছি।’ সোহরাব সাহেবের রাগও হলো, মায়াও হলো। তাঁর প্রতি এতটা আগ্রহ কখনো কেউ দেখিয়েছে, তাঁর মনে পড়ে না। আজ অনেকক্ষণ হাঁটলেন। আলিমকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটলেন। লেক রোডের ফুরফুরে বাতাসে আলিমের ট্র্যাকস্যুটের গন্ধের কথা ভুলে গেলেন। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে দুজনে পা ছড়িয়ে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছে। আলিম সোয়েট শার্টের জিপার খানিকটা খুলে একপাশ ধরে নাড়াতে

লাগল – ওর বুকের লোম ভিজে ঘাম গড়াচ্ছে। যতই ঘাম গড়াক, সোহরাব সাহেব ঘরের বাইরে জামাকাপড় খোলেন না।

তিনি পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করলেন, ‘বিদেশে কীভাবে কল করতে হয় জানিস?’ আলিম চটজলদি বলল, ‘নাম্বার দ্যান।’ সোহরাব সাহেব পকেট থেকে ছোট্ট একটা নোটবুক বের করে নম্বর পড়ে শোনালেন। আলিম সেদিকে কান দিলো না, সেটের দিকে হাত বাড়াল। সোহরাব

সাহেব সেটটা এগিয়ে দিলেন। আলিম সেটটা হাতে নিয়ে বলল, ‘এহন কন।’

 তিনি আবার বললেন, ‘শূন্য চার আট

আট …।’ আলিম নম্বরটা সেটে তুলে একবার নিজের কানে ধরে সোহরাব সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরল, ‘রিং বাজদেয়াছে।’ সোহরাব সাহেব লোভী বালকের মতো সেটটা লুফে নিয়ে কানের কাছে ধরলেন। কিছুক্ষণ পর জোরে জোরে বলতে লাগলেন, ‘… হ্যাঁ, বীথি! ভালো আছিস, মা? ডায়না ভালো আছে? আর ছোটটা? – ছোটটার যেন কী নাম রেখেছিস … শাহেদের অফিস কেমন চলছে? … শোন্, আজ এক কাণ্ড করেছি, তোর মোবাইল দিয়ে না দশ হাজার স্টেপ হেঁটেছি – দশ হাজার আঠারো স্টেপ। … তুই বলতিস্ না, শরীরের যত্ন নিও। আমি এখন নিয়মিত হাঁটি। তুই খুশি, মা? … কবে আসবি? … যোগাযোগ করিস না ক্যান? … ব্যস্ত? … ভালো থাক …।’ আলিম শুনছিল আর নাক খুঁটছিল। ফোন শেষ করে সোহরাব সাহেব খানিকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। তার ঠোঁট নড়ছিল – মনে মনে হাসছিলেন। চোখদুটো নড়ছিল – বীথির ৩৩ বছরের জীবন – একবার দেখে নিচ্ছিলেন। তারপর স্নেহবিগলিত কণ্ঠে বললেন, ‘কোন দেশে কথা বললাম, জানিস?’ আলিম ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে জবাব দিলো, ‘অস্ট্রেলিয়া – হেইয়ানে ছাড়া আর কোম্মে কতা কইবেন?’ সোহরাব সাহেব চোখ বড় বড় করে জানতে চাইলেন, ‘তুই কী করে বুঝলি?’ ‘না বোজলে, নাম্বারে রিং দেলাম ক্যামনে? কান্ট্রি কোড দেলাম ক্যামনে?’ সোহরাব সাহেব কিছু বললেন না। আলিমের দিকে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আলিমও উঠে দাঁড়াল। তারপর দুজন দুদিকে হাঁটতে শুরু করল।

আসার সময় বীথির স্মৃতিগুলো একে একে মনে পড়তে থাকল। ওর বিয়ে। বেনারসি পল্লিতে গিয়ে একটা লাল রঙের শাড়ি কিনে এনেছিলেন। নিজে ওর মাপ নিয়ে দর্জির কাছে গিয়ে সাদা আর ঘিয়ে রঙের পেটিকোট বানিয়ে এনেছিলেন; হলুদ, মেরুন আর কালো রঙের ব্লাউজ বানিয়ে এনেছিলেন। রেন্ট-এ-কার থেকে একটা গাড়ি নিয়ে বীথিকে বিউটি পার্লারে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর কবে কী দেওয়া হবে, তাই পেনশনের টাকা দিয়ে বীথিকে সাজিয়ে দিলেন। পার্লার থেকে ওকে রানি করে এনেছিলেন। বিয়ের সব বাজার তিনি নিজে বেছে বেছে করেছিলেন। শুধু গহনাগাটি কেনার দিন বীথির মা দুই কানের ফাঁকে মাথার কাপড় গুঁজে দিয়ে বড় বড় বোতাম লাগানো চামড়ার একটা মোটা ভ্যানিটি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সোহরাব সাহেবের সঙ্গে তাঁতিবাজারে গিয়েছিল এক স্বর্ণকারের কাছে – বীথির বাবা আগেই কথা বলে রেখেছিল – ওরা মেপে শুধু সোনার দামটাই রেখেছিল। বিয়েতে সোহরাব সাহেব বীথির জন্য যা খরচ করেছিলেন, এর ঠিক দশগুণ খরচ করেছিলেন শাহেদের জন্য – এক কলিগের সঙ্গে আলাপ করে বিদেশ থেকে ক্যালভিন ক্লেইনের এক ডজন বাটন-ডাউন আনিয়েছিলেন, স্যুটের পিস আনিয়েছিলেন কর্নেলিয়ানির – ইতালি থেকে। শাহেদ ইঞ্জিনিয়ার, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য যা দেওয়ার, তার চেয়ে বেশি দিতে হয় তার ভালোবাসার মানুষকে – ভালোবাসার এটাই নিয়ম।

বীথিই শাহেদকে পছন্দ করে এনেছিল। পছন্দের তিন মাসের মাথায় বড়চাচাকে সেকথা বলেছিল। চাচার ভেতরটা স্নেহে বিগলিত হয়ে গিয়েছিল, ওকে সত্যিই সেদিন বড় মনে হচ্ছিল। কদিন আগেও যে-মেয়ে বেছে বেছে পুতুল কিনত, পকেটওয়ালা ফ্রক-পরা পুতুল – ম্যাটেলের মাই চাইল্ড, অথবা মুখে বাঁশি লাগানো পুতুল – আইডিয়াল টয় কোম্পানির টাইনি টিয়ার্স – সে আজ এক অচেনা পুরুষমানুষকে তার স্বামী হিসেবে পছন্দ করে ফেলেছে – পুরুষমানুষের প্রতি ওর যে বিশেষ রুচি তৈরি হয়েছে, এটা ভেবেই তাঁর ভালো লাগছিল। মেয়ে বিয়ের জন্য সোমত্তা হলে যে-কোনো বাবারই বোধহয় এরকম লাগে – সবটাই সোহরাব সাহেবের অনুমান – বীথিকে নিয়ে তাঁর মনের ভেতরে যা কিছু ঘটে, তা সবই পিতার অনুভূতি বলেই তিনি অনুভব করেন। তিনি শাহেদকে দেখতে চাননি, শাহেদের প্রতি ওর ভালোবাসা দেখতে চেয়েছিলেন, তাই বলেছিলেন, ‘আমাদের পছন্দেই তোকে বিয়ে করতে হবে।’ বীথি বলেছিল, ‘যাও, পছন্দ করে আসো। কে তোমাদের বারণ করেছে?’

‘তুই।’

‘মানে?’

‘মানে, তুই আগে পছন্দ করে ফেলেছিস।’

‘তো?’

‘তো, আমরা এখন অন্য কোথাও পছন্দ করতে যাব।’

‘আচ্ছা, করে বেড়াও!’

সোহরাব সাহেব বীথির বাবাকে কিছু বললেন না, কারণ সে ভালোবাসা পছন্দ করে না, আর মাকেও বলেননি, কারণ ভালোবাসার বিশেষ কোনো রুচি তার নেই। ছোটভাই বড় হওয়ার পর তিনি বহুদিন কোনোকিছু ওর ওপরে চাপিয়ে দেননি; শেষবারের মতো চাপিয়ে দিলেন – কাউকে কিছু না বলেই তিনি বিয়ের আয়োজন শুরু করে দিলেন – ছেলেবেলায় এমন করতেন। যা ছোটভাইয়ের কর্তব্য মনে করতেন, তা ঘোঁতঘোঁত করে তাকে দিয়ে করিয়ে নিতেন। স্নেহ যত কোমল, তত আন্তরিক; শাসনের ক্ষেত্রেও সেরকম – তা যত কঠোর, তত আন্তরিক। সোজা পথে গেলে বীথির বাবা-মা অমত করত, তা নয়, শাহেদ পাত্র হিসেবে ফেলনা নয়। কিন্তু সে-পথে কেন যাবেন? সেটা প্রতারণা। যা করবেন বলে মনস্থ করেছেন, তা তিনি করবেনই, কারো অমত যখন মানবেন না, তখন মত নেওয়া প্রতারণা। সবার সঙ্গে প্রতারণা করা যায়, যাকে শাসন করে বড় করে তুলেছেন, তার সঙ্গে প্রতারণা করা যায় না; তাই বিয়ের বিষয়ে বীথির বাবার মত নেওয়ার ভড়ং তিনি করেননি।

বীথির বিয়ের রাত। মাঝে মাঝে বাসরঘর থেকে ওদের খুনসুটির চাপা আওয়াজ ভেসে আসছিল। সোহরাব সাহেব এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভেসে যাচ্ছিলেন – এতোকাল ওর প্রতি তাঁর সব অনুভূতিকেই বাবার অনুভূতি হিসেবে মনে করে তৃপ্ত ছিলেন, আজ তার চেয়ে বেশি পেয়ে অতৃপ্ত হলেন। পৃথিবীর কোনো মানুষ এমন অনুভূতি পেয়েছে বলে তাঁর মনে হলো না, তাই এক অসহনীয় হাহাকার অনুভব করলেন। সে-রাতে কাঁঠালবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের পাঁচতলা দালানের চতুর্থতলার বেলকনিতে দখিনা হাওয়ায় যে-গান তাঁর শুনতে ইচ্ছে করেছিল, আজ বহুদিন পরে বীথির সঙ্গে তাঁর কথা বলে লেক রোডের এই ফুরফুরে বাতাসে কেন যেন সেই গানটিই শুনতে ইচ্ছে করছে।

এরপর প্রতিদিনই আলিম আসত। সোহরাব সাহেব লেক রোডের কৃষ্ণচূড়া গাছের রোদ্রছায়ায় প্রতিদিন দশ হাজার স্টেপ হাঁটতেন। আলিম ক্লান্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু পাছ ছাড়ত না। সোহরাব সাহেব ক্লান্ত হতেন না। মাঝে মাঝে আলিমের হাত ধরে হাঁটতেন। একদিন আলিমের হাত ধরে গল্প করতে করতে বলে ফেললেন বীথির বিয়ের পর তিনি কীভাবে একা হয়ে গেলেন। বীথিকে যখন ওরা তুলে নিয়েছে, তার কদিন পরেই বীথির মা বলল, ‘ভাইজান, বীথির বাবা কইছে, ঢাকায় একা একা থাকফেন ক্যান, গ্রামে চইলে যান, সুমায় ভালো কাটবি’ – পড়া বলার মতো হড়বড় করে বলে গেল। টিঅ্যান্ডটি অফিসে চাকরি নেওয়ার পরে ছোটভাইটাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে তিনি আর কখনো গ্রামে যাননি। গ্রামের ভিটেটাতে কারা যেন বসবাস করছে, খবর রাখেন না। মাঠের জায়গাজমি বেচে দিয়ে ওকে ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসায় বসিয়েছেন, পাত্রী খুঁজে বিয়ে দিয়েছেন, ঢাকায় এ-মেস থেকে সে-মেস, এ-বাসা থেকে সে-বাসায় দীর্ঘ ৩০ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন।

সাত লাখ সতেরো হাজার টাকায় ইসলামপুরে কাপড়ের দোকানের পজেশন কিনে দিয়ে ছোটভাইকে যেদিন গদিতে বসালেন, সেদিন সোহরাব সাহেব চোয়াল শক্ত করে ঘোঁতঘোঁত করে বলেছিলেন, ‘মোনে রাখিস, আব্বা বাঁইচে থাকলি তোর হাতে নগদ টাকা দিত না – মানসির ঘরে চুরি কইরে খাতি, সেইডে করতি দিত, নিজির ঘরে চুরি করতি দিত না।’ ছোটভাই গদি থেকে উঠে হাত দিয়ে সোহরাব সাহেবের পা ছুঁলো, তারপর সে-হাত একবার মাথায় ডলে নিল, চোখে চোখ পড়বে বলে গদিতে বসে কাপড়ের গাঁটগুলোর দিকে চোখ ঘুরাতে লাগল।

গ্রামে গেলে কেউ তাঁকে আর চিনবে, এমন মনে হয়নি বলে সোহরাব সাহেব গ্রামে গেলেন না, তেজকুনিপাড়ায় এক রুমের একটা বাসা নিয়ে উঠে পড়লেন। ল্যান্সার ভিজিলেন্সে চাকরি নিলেন – নয় বছর হতে চলল। এখানে কেউ তাকে চেনে না, তিনিও কাউকে চেনেন না। চেনা মানুষগুলোই যখন তাঁকে চিনল না, অচেনা মানুষরা আর কী চিনবে? তিনি নিজেই কি চেনা মানুষদের ঠিকভাবে চিনতে পেরেছেন? বিয়ের সাত মাসের মাথায় বীথিরা অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেল। বীথির বড়মামা তেজকুনিপাড়ায় এসে একদিন খবর দিয়ে গেল, ‘ভাইজান, বীথির মারে নিয়ে যাচ্ছি। গ্রামে রাইখে আসফ – মায়ের ভিটেয়।’ বীথির বাবা তাঁতিবাজারের কোন স্বর্ণকারের বউকে বিয়ে করেছে। সে-ঘরে বড় বড় ছেলেমেয়ে আছে।

সোহরাব সাহেব কোনোকালেও মানুষ চেনেননি। ঘোঁতঘোঁত করে ছোটভাইটাকে শুধু সুপথে রেখেছিলেন। মানুষ চেনার সময় আর কোথায়? বয়স ঊনসত্তর। একদিন ঘরের ভেতরে মরে পড়ে থাকবেন – গন্ধ পেয়ে মানুষ আসবে – সেই প্রতীক্ষায় আছেন। এতোকাল নিজেকে সংসারহীন মানুষ ভাবেননি; কিন্তু ইদানীং ভাবছেন – যার জীবন যা দিয়ে শেষ হয়, সে মূলত তা-ই। যারটা সংসার দিয়ে শেষ হয়, সে সংসারী, যারটা বৃদ্ধনিবাসে শেষ হয়, সে সংসার-পরিত্যক্ত, যারটা পতিতালয়ে শেষ হয়, সে সংসার-পতিত; জীবন যা দিয়ে শুরু হয়, মানুষ তা নয় – সবার জীবনই সংসারে শুরু হয়; কিন্তু সবাই সংসারী নয়। তিনি সে-কথা ভালোভাবে জানেন বলেই বহুবার ইঙ্গিত পাওয়ার পরও না বোঝার ভান ধরে ছিলেন – ছোটদের সব কথার মানে খুঁজতে যেতে হয় না – ওদের যে-কথার অর্থে সামান্য সংশয়ের অবকাশ আছে, অপরিস্ফুটতা আছে, দ্বিধা আছে, দ্বন্দ্ব আছে, সে-কথার সাফ সাফ মানে বের করার কোনো মানে হয় না; তাছাড়া মানে কখন খুঁজবেন? বীথি তাঁর রুমে এসে যখন ওর ভার্সিটির দুষ্টু বন্ধুদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে গল্প জুড়ে দিত, অথবা কোথায় মেক্সিকান-লেবানিজ ফুডের নতুন রেস্টুরেন্ট খুলেছে সেই গল্প, অথবা টিভিতে নতুন কোনো রিয়েলিটি শোর গল্প; অথবা লুকিয়ে কোথায় আজ কী করে এসেছে, খোলা দরজার দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে যখন চোখ গোল গোল করে ফিসফিস করে সে-গল্প করত, তখন কবেকার কোন ছেঁদো কথা মনে থাকে? লোভের গ্রাসের কাছে কিছুই উচ্ছিষ্ট থাকে না – সবটুকুই পরম উপাদেয় ঠেকে। ভালোবাসার লোভ সর্বগ্রাসী লোভ, সেখানে সবকিছু নিমিষে হারিয়ে যায়। তাই তাঁর প্রতিদিনই নতুন দিন ছিল, পুরনো সবকিছুই পেছনে পড়ে থাকত।

বুড়ো হয়ে গেলে মানুষ কেবল পেছনের দিকে তাকায়; কারণ সামনে অন্ধকার। সেদিকে দেখার কিছু নেই। আর, যে কেবল পেছনে তাকিয়ে আছে, সে তো কেবল পেছনের কথাই বলবে। তবে সোহরাব সাহেব বুঝতে পারেন না, আলিম তাঁর কথা বোঝে কি না; আবার মনে হয়, ও বেশ বোঝে। তবে তাঁর পেছনের কথা নিয়ে ও মাঝে মাঝে এমন বেধড়ক রসিকতা করে, মনে হয়, তাঁর জীবনটা ছেলেমানুষি করেই কেটেছে – কেউ দেখার ছিল না বলে কেউ ধরিয়ে দেয়নি, আজ ওর কাছে সব ধরা পড়ছে।

সোহরাব সাহেবের মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় – আলিমের মতো এরকম একটা ফটকা ছেলের কাছে কেন তিনি এতো কথা বলছেন? মাঝে মাঝে তীব্র অস্বস্তি হয়; কিন্তু কারো কাছে কিছু না বলে হঠাৎ মরে যাবেন, সেটা ভাবলে অস্বস্তি আরো বেশি হয়। বীথির কাছে এসব তিনি কখনো বলেননি, হয়তো সুন্দর মুহূর্তগুলো নষ্ট হওয়ার ভয়েই বলেননি, অথবা বীথি সেরকম সঙ্গী নয় – তিনি বুঝে উঠতে পারেন না।

বীথিকে সোহরাব সাহেব ঠিকই বুঝেছিলেন – ও সত্যিই শাহেদকে ভালোবাসে, ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ও ম্যাকোয়ারি পার্কে নিবিড় সংসার পেতেছে, গত নয় বছরে একদিনও দেশে আসেনি; নয় বছরে কোনোদিন দেশের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তেমনও শোনা যায়নি। শুধু কদিন আগে ওর বড়মামাকে দিয়ে চাচার খোঁজখবর নিয়েছে। ওর মামা খোঁজখবর নিতে এসে ওই সেটটা দিয়ে গেছে, ‘ভাইজান, বীথি আপনার জন্যি পাঠাইছে।’ যাওয়ার সময় একটা চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বলে গেছে, ‘এহেনে ওর অস্ট্রেলিয়ার নম্বর।’ সোহরাব সাহেব একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ফজিলা কেমন আছে?’ বীথির মামা চোখ নামিয়ে ফেলেছিল, সে-কথার কোনো উত্তর দেয়নি, ‘বীথির মেয়ে বড়ডা স্কুলি যায় … ছোটডা ওর মতো হইছে … উরা বাড়ি কেনেছে …।’ তারপর যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ কেবল মেয়েদের গল্প, শাহেদের গল্প, মাধবীলতার গল্প, আর কবুতরের গল্প করল; শুধু যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘ফজিলা মায়ের ভিটেয় আছে।’

ছয়

সোহরাব সাহেব একদিন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেলেন। আলিমের হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, ‘আলিম, তোদের অফিসে আর যাব না রে।’

‘যাইয়েন না। হুদা কামে অফিসে যাওনের দরকার কি? বুড়াকালে বাসায় বইয়া রেস্ট নেবেন।’

‘না রে, বাসায়ও আর যাব না।’

‘কী কন, বোজলাম না।’

‘ফিরে যাব।’

এ-কথায় আলিম একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। কোনো কোনো মানুষকে গ্রামের মানুষ হিসেবে মানায় না, এমনকি তারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করে এলেও নয়। সোহরাব সাহেবকে আলিম বোধহয় সেরকম একজন মানুষই ভাবত। তাই একটু থেমে বলল, ‘গেরামে গিয়া কী হরবেন?’

‘এখানেই বা কী করব?’

‘হেইডাও ঠিক।’

‘আমার আসলে কিছু করার আর সময় নাই। এখন শুধু বড় কাজটাই বাকি আছে।’

আলিম মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘হেইলে, আইজগো আর ওয়াকিং হরবেন না?’ সোহরাব সাহেব বোধহয় সম্বিৎ ফিরে পেলেন – একবার উঁ-করে উঠলেন, তারপর ধীরপায়ে হাঁটতে শুরু করলেন।

সেদিন সত্যিই সোহরাব সাহেব অফিসে গেলেন না। আলিম অফিসে গিয়ে সোহরাব সাহেবের নম্বরে কল দিলো, রিসিভ হলো না। পরদিনও সোহরাব সাহেব অফিসে গেলেন না। সকালে হাঁটতেও এলেন না। আলিম গিয়ে ফিরে এলো। কল করেছিল, রিসিভ হয়নি। সোহরাব সাহেব ফোন রিসিভ করতে পারেন। আলিমের নম্বরটাও তাঁর সেটে সেভ করা আছে। আলিম যেদিন তাঁকে সিম কিনে দিয়েছিল সেদিনই সেটে তার নিজের নম্বরটা সেভ করে দেখিয়ে দিয়েছিল – আলিম.মৃধা.বাউফল। পরদিন আলিম আর হাঁটতে গেল না – বুইড়াডা মনে অয় সিরিয়াস – আর আইবে না! আলিম সোজা অফিসে চলে গেল। সকালে

 চা দিতে এসে দেখল, সোহরাব সাহেব আজো অফিসে আসেননি। আলিম এমডি সাহেবকে গিয়ে বলল, ‘ছোরাব ভাই কইছে আর চাকরি হরবে না।’ এমডি সাহেব বিরক্ত মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে চাকরি করবে না?’

‘ছোরাব স্যার!’

‘তুই যা, ভাগ!’

যাওয়ার সময় আলিম বলতে বলতে বেরুল, ‘হে দুইদিন দর্ইরা অফিসে আইতেয়াছে না, হে দুইদিন দর্ইরা অফিসে আইতেয়াছে না …।’ এমডি সাহেব গলা চড়িয়ে বললেন, ‘রাব্বানি সাহেবকে বল আসতে।’

রাব্বানি সাহেব হচ্ছেন এইচআর হেড। একটাই হাফহাতা শার্ট রোজ ইন করে পরে আসেন, পায়ে থাকে তেঁতুলবিচি রঙের বেল্ট-লাগানো চামড়ার স্যান্ডেল। রাব্বানি সাহেব এলে এমডি সাহেব বললেন, ‘একটা দুঃসংবাদ আছে।’ রাব্বানি সাহেব বললেন, ‘জি, স্যার।’

‘কী জি স্যার! আপনি শুনেছেন?’

‘জি, না স্যার।’ তারপর ফাইল ওল্টাতে ওল্টাতে এমডি সাহেব বললেন, ‘এ-মাসের বেতনটা আপনারা মাসের শেষে নেবেন। বিল আবারো আটকে গেছে।’

‘জি, স্যার।’

‘ব্যাপারটা সবাইকে আগেভাগেই বুঝিয়ে বলবেন।’

‘জি, স্যার।’

‘আপনি এখন যান।’

রাব্বানি সাহেব দরজা পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেলেন। পেছনে তাকালেন। এমডি সাহেব ফাইল থেকে মাথা তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিছু বলবেন?’ একবার ঢোক গিলে রাব্বানি সাহেব বললেন, ‘জি, না, স্যার।’ এমডি সাহেব ফাইলে মনোযোগ দিলেন। রাব্বানি সাহেব বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে এমডি সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা, কোনো রেজিগনেশন লেটার কি পেয়েছেন?’ রাব্বানি সাহেব বোধহয় শুনতে পেলেন না; তবুও কী মনে করে পেছনে ঘুরলেন – এমডি সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে রাব্বানি সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জি, স্যার! কিছু বলছিলেন?’

‘না, মানে, আপনি যান … আচ্ছা কেউ কি রিজাইন করেছে?’

রাব্বানি সাহেব একটু মনে করার চেষ্টা করে বললেন, ‘জি, স্যার! … না, স্যার! একটু ফাইল দেখে বলি, স্যার?’

এমডি সাহেব কাজে মনোযোগ দিলেন।

পরদিন আলিম ট্র্যাকস্যুট পরে হাঁটতে বেরুল। দুদিন না হেঁটে সে বুঝেছে, এ কয়দিনে হাঁটাটা তার অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু অনেকক্ষণ হাঁটার পরও যখন দেখল সে-অভ্যাস পালন হচ্ছে না, তখন বুঝল – আসলে দুজনে একসঙ্গে হাঁটার অভ্যাস হয়েছে – কেবল নিজেরটা হেঁটে গেলে কাজ হবে না। সোহরাব সাহেবের নম্বরে অনর্থক কল দিলো – ফোন বন্ধ। আবার হাঁটতে শুরু করল। পকেটে ফোন বাজল।

ওপাশ থেকে ভারি কণ্ঠে কে যেন বলল, ‘হ্যালো!’

আলিম বলল, ‘হ্যালো, কেডা?’

‘আমি তেজগাঁও থানা থেকে বলছি, এসআই ইরতাজুদ্দিন?’

‘কন।’

‘আপনি কে বলছেন?’

‘আমারে চেনেন না, তয় ফোন দেলেন ক্যা?’

‘আচ্ছা, আপনি আলিম মৃধা?’

‘তাইলে আবার জিগান ক্যা?’

‘সোহরাব সাহেব আপনার কী হন?’

‘কী হয় হে দিয়া আমনের কাম কী? হে কই?’

‘তিনি আছেন। তিনি আপনার কী হন, সেটা বলেন।’

‘ব্রাদার হয়।’

‘ঠিক আছে। আপনি আসেন।’

‘কোম্মে আমু?’

‘থানায় আসেন।’

‘থানায় আমু ক্যা?’

‘কেন, আপনি না তাকে খুঁজছেন।’

‘হ, বিচরাইতেছি তো। কয়দিন দর্ইরাই তো বিচরাইতেছি।’

‘তাহলে থানায় আসুন।’

‘কোন থানায়?’

‘তেজগাঁও থানায়।’

‘তেজগাঁও থানা কোম্মে?’

‘ফার্মগেট চেনেন?’

‘হ, চিনি।’

‘ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণির দিকে যেতে হাতের ডান দিকে। আবার বলব?’

‘হঁ, আবার কন।’

আলিম ঘরে ফিরে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে অফিসে চলে গেল। তারপর সবাইকে চা দিয়ে, কাউকে কিছু না বলে, অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল – সোজা তেজগাঁও থানা। ডিউটি অফিসারকে গিয়ে বলল, ‘থানাত্থন ফোন দিয়া মোরে আইতে কইছে।’ ডিউটি অফিসার বললেন, ‘কে আসতে বলেছেন?’

‘হেইডা ক্যামনে কমু? আমনে গিয়া জিগান কেডা আইতে কইছে।’

‘আপনার নাম কি?’

‘মোর নাম আলিম মৃধা।’

‘আচ্ছা, আপনি কি সোহরাব সাহেবের আত্মীয়?’

‘ব্যাপার কী কন দেহি? হে কোম্মে আছে?’

ডিউটি পুলিশ শান্ত গলায় বললেন, ‘আছেন।’ তারপর রিসিভার তুলে

ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলে রিসিভার রাখলেন, ‘আপনি ভেতরে চলে যান। হাতের ডানদিকে ১০৫ নাম্বার রুম। ইন্সপেক্টর কামরুল।’

আলিম ১০৫ নম্বর রুমে গিয়ে দেখল সেখানে অন্তত কুড়ি-পঁচিশজন পুলিশ – ডেস্কে ডেস্কে বসা – গমগম করছে রুমের ভেতরটা। দরজার কাছের জনকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইনেসপেক্টর কামরুল কেডা?’ তিনি ঘাড় ফিরিয়ে হাত তুলে পেছনে দুই ডেস্ক পরের ডেস্ক দেখালেন। ওই ডেস্কটা অন্য ডেস্কগুলোর চেয়ে মনে হলো বেশি ব্যস্ত। ডেস্কের তিনদিকে পুলিশ বসা। একজন মহিলা পুলিশও আছেন। তাদের সামনে লম্বা লম্বা বাঁধাই খাতা। আলিম ডেস্কের সামনে গিয়ে সালাম দিলো – ‘আসসালামু আলাইকুম।’ যিনি সালামের উত্তর দিলেন আলিম তার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সোহরাব সাহেব আপনার কী হন?’ আলিম ঢোক গিলে বলল, ‘ব্রাদার।’

পুলিশ চোখ সরু করলেন, ‘ব্রাদার!’

‘স্টেপ ব্রাদার।’

‘শিওর?’

‘শিওর।’

‘কিন্তু তিনি তো আপনার ভাই হতে পারেন না।’

‘ভাই না, আবার ভাইও। হে-ই মোরে হাঁডদে নিয়া কইল আমি হ্যার ভাই লাগি।’

‘তাহলে স্টেপ ব্রাদার কেন বলছেন?’

‘কইলাম না, হের লগে মুই ওয়াকিং করি – দশ হাজার স্টেপ ওয়াকিং। হেইল্লেইগ্গা হে মোর স্টেপ ব্রাদার।’

‘ও আচ্ছা!’

‘হে এহন কই আছে?’

‘আছেন।’

আলিম ওদের কথাবার্তার কিছুই বুঝতে পারছে না। এতো মোটা মোটা খাতাপত্র যাদের আছে, যাদের এতো লেখাজোখা করা লাগে, তাদের কথা বলার অভ্যাস নষ্ট হয়ে যায়, তাই তাদের কথা সাধারণের কাছে আর সহজবোধ্য থাকে না, না হলে এতোক্ষণে আলিম সব বুঝে ফেলত, আলিম একজন সাধারণ মানুষ। আলিম ঘাড় ঘুরিয়ে সবার চোখের দিকে তাকাল, ‘হোনেন, একখান কতা কই, মেইল মেইল ব্রাদার। ফিমেইল হইলেই সিস্টার।’ মহিলা পুলিশ তর্জনী আর বুড়ি আঙুলের মাঝে কলম ধরে নাকের সামনে ঘোরাচ্ছিলেন। তিনি শুকনো গলায় বললেন, ‘উনি তো ফিমেলও

ছিলেন না।’ ৎ যার সঙ্গে দেখা হয়, মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে। কেউ কিছু বলতে পারে না। আবার রাস্তায় এমন কাউকে দেখতে পায় না যাদের হাতে বিড়ির ডালা আছে। বিড়ির মহাজন যে বাড়িতে বসে, সেই বাড়ির বৈঠক বারান্দায় গিয়ে দেখে সেখানেও কেউ নেই। আকালির খুব ভয় করতে শুরু করে। বাতাসে বিপদের গন্ধ পায় সে। তার হঠাৎ মনে হয় মা তাকে খুঁজতে কালীপালের পুকুরপাড়ে যায়নি তো!

এমন ভাবনা থেকেই সে একসময় গিয়ে হাজির হয় আবার সেই কালী পালের পুকুরপাড়ে। কী আশ্চর্য! দেখতে পায় আবোল সেখকে। কালী পালের পুকুর থেকে লোকটা উঠে আসছে। তাকে দেখতে পেয়ে আবোল সেখ আঁতকে ওঠে, ‘বাপ তুই এখানে কী করছিস, এই সাঁঝের সুমায়? চল চল, বাড়ি চল! তোর মা তোকে ধুড়ে বেড়াইছে। তাছাড়া এই সুমায় এই জায়গা ভালো লয়।’ বলে তাকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে আসে। বাড়ি বলতে তাদের ভাঙাচোরা বাড়ি নয়, আবোল সেখের নিজের বাড়ি।

সেই  থেকে  ওই  আবোল  সেখের ঘর-গেরস্থালি হয়েছিল তার নিজের বাড়ি। যেখানে সে মাসুমা চাচিকে পেয়েছিল। যে তার মায়ের অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিল। তারপর হারানো মায়ের আর খোঁজ করেনি আকালি। কিন্তু আজ করবে। আবোল সেখ তাকে কুকুরের মতো ছ্যাঃ ছ্যাঃ করে তাড়িয়ে দিয়েছে। এই অপমানের বদলা নিতে সে তার মাকে খুঁজে বের করবে।

কালী পালের পুকুরটা আর সেদিনের কালীপালের পুকুর হয়ে নেই। এই করোনাকালে একটাজড় জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। কী জানি কেন, যা দেখে আকালির বুক থরথর করে কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে, ওই জড়জঙ্গল ঘিরে চারপাশে শূন্য মাঠ পড়ে আছে সন্তানহারা মায়ের মতো। দূরে নিরন্তর বয়ে চলা নহরে স্রোতে কলকল আওয়াজ নেই। খালি নহরের বুকে বয়ে যাওয়া শুকনো বাতাসের সাঁই সাঁই আওয়াজ আছে, যা আপন খেয়ালে পাগলের মতো বয়ে চলেছে ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে। যদিও সেই বাতাসে মিশে আছে আশ্চর্য এক মাদকতা। যে-মাদকতায় সাধারণ মানুষেরও মনপ্রাণ অস্থির হয়ে ওঠে। আকালি নিজেও অতি সাধারণ মানুষ। তাই এই মুহূর্তে নিজের মনপ্রাণকেও স্থির রাখাটা খুব জরুরি মনে হলো তার। কেননা, এখনই তাকে ওই জড়জঙ্গলে প্রবেশ করতে হবে। 

চার

একটা জড়জঙ্গল। ভেতরে ঢোকার কোনো পথ নেই। তবু মাটির মানুষ আকালি অদ্ভুত কৌশলে পথ তৈরি করতে করতে তার ভেতর থেকে ভেতরে প্রবেশ করছে। এতো কাঁটাঝোপ যে, ওসবের খামচানিতে তার শরীর থেকে পোশাক-আশাক খসে পড়ছে। কাঁটার আঁচড়ে তার শরীর থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্তও ঝরছে।

না, বুকে আর থরথর ভয় নেই এখন। তবে মায়ের জন্য সেই সেদিনের মতো আজো উদ্বেগ আছে। যে-উদ্বেগ থেকে গহিন জড়জঙ্গল ভেদ করে কালী পালের পুকুরপাড়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে সে। তার স্থির বিশ্বাস, মা নিশ্চয় সেখানেই আছে। হাতে একটা লাঠি নিয়ে কালী পালের পুকুর থেকে তার উঠে আসার অপেক্ষা করছে। লাঠি চোখিয়ে মুখে বলছে, ‘উঠে এলি তু! না হামি নামব?’   

এমন বিশ্বাস পাগলের হয়। গহিন জড়জঙ্গল পাগল আকালিকে পাত্তা দেয় না। সে আরো ঘন হয়। আরো জমাট বাঁধে, যাতে তার ভেতরে কেউ প্রবেশ করতে না পারে।

শেষ পর্যন্ত আকালির সঙ্গে জঙ্গলটা পেরে ওঠে না। একসময় আকালি সব বাধা অতিক্রম করে গিয়ে হাজির হয় কালী পালের সেই পুকুরপাড়ে। আর দেখতে পায় তার ক্ষতবিক্ষত বিবস্ত্র মাকে কালী পালের পুকুরের  সবুজ পানিতে চিৎ হয়ে ভেসে থাকতে। আশপাশে তখন কেউ নেই। শুধু কয়েকটি শেয়াল পরম তৃপ্তিতে কালী পালের পুকুরপাড়ে এই করোনাকালে গজিয়ে ওঠা ঘন সবুজ ঘাসে তাদের রক্তমাখা মুখ মুছে নিচ্ছে। তাদের মধ্যে একটা দাড়িওয়ালা শেয়ালও আছে। যার দাড়ি থেকে রক্তের দাগ কিছুতেই মুছছে না।

Leave a Reply