হাতুড়ি-হাপর

সাত সকালে আনোয়ার হাজি শম্ভুর বাড়ির সামনে এসে ডাকাডাকি করছেন, ‘কী রে শম্ভু, তুই কই, তোরে আজকাল পাওয়া যায় না ক্যান?’

শম্ভু অবাক না হয়ে পারে না, সে উঠেছে আরো ভোরে, উঠে গাড়িটা ধুয়েমুছে নিচ্ছে। গতকাল বৃষ্টিতে চাকাগুলি একেবারে ময়লা হয়ে গেছে, গাড়ির পেছনের দিকটাও কাদায় ভরে গেছে। ভোরে উঠে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে বাড়ির সামনে এনে বালতি দিয়ে পুকুর থেকে জল তুলে হাতাওয়ালা ব্রাস দিয়ে ঘসে ধোয়ার কাজটাই করছিল। হঠাৎ সে পেছনে আনোয়ার হাজির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।

পেছনে ফিরে শম্ভু দেখে আনোয়ার হাজির সঙ্গে তাদের বাড়ির কাজের লোক ফটিক, দুজনের হাতে অনেকগুলি ধারালো অস্ত্র। হাজি সাহেবের হাতে ছোট ছোট পাঁচটা ছুরি আর তার সহচরের হাতে আড়াই ফুট লম্বা একটা ছোরা আর তিনটা চাপাতি। কোনো একটা ব্যাগে না ভরে হাতে করে নিয়ে আসার মধ্যে কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না সময়টা জেনেও তা শম্ভু বুঝতে পারছে না। কী জানি বড়লোকদের ব্যাপার-স্যাপার!

স্বভাবগত বিনয়ের সঙ্গে শম্ভু বলে, ‘কি যে কন কাকা! আমার মতন গরিবের বাড়িতে আইছেন! আমি তো এখন আর লোহার কাজ করি না।’

আনোয়ার হাজি বিস্মিত হয়, ‘করস না মানে! তোর চৌদ্দপুরুষ কামার, আর তুই এই বয়সে গাড়ি ধুইতাছোস, এর মানে কী? নিজেই গাড়ি চালাস নাকি?’

দেড় লাখ টাকা দিয়ে কেনা পুরনো ইজিবাইকটা ধোয়ার কাজ শেষ করে পরম মমতায় গামছা দিয়ে সিটগুলি মুছে গামছাটা কাঁধে ফেলে সামনে এসে শম্ভু বলে, ‘কাকা, আমার দোকানটা উঠায়া দিছে। অন্য কোনোখানে দোকানের ব্যবস্থা হইল না, কী করুম? সংসার তো আছে। কিছু একটা তো করন লাগে, সে-কারণে গাড়ি কিনছি।’

দোকান যেদিন উঠিয়ে দেওয়া হয় সেদিন বাড়ি এসে শম্ভু হতাশায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটা কলেজে পড়ে, এমন মেয়ের সামনে হতাশার কথা বলতে নেই। তাহলে মেয়ে হয়তো নিজের পছন্দমতো কারো হাত ধরে পালিয়ে গিয়ে বাপকে ঝামেলা থেকে মুক্তি দেবে। তবু রাতে শম্ভুর চোখে জল এসে পড়েছিল, কয়েক ফোঁটা হয়তো বালিশের তুলায় মিশে গেছে।

দয়ালবাজারে তার দোকান ছিল, বাজারের শেষের মোড়টায়; এখন সেখানে বিশাল মার্কেট। অনেকদিন ধরেই সে শুনে আসছিল সেখানে মার্কেট হবে, একটা দোকানের জন্য সে নাসির মেম্বারের কাছে আবদার করেছিল; মেম্বার বলেছে, ‘তুই দোকান নিয়া কী করবি? এহানে তো আর কামারের দোকান দিতে পারবি না। এহানে সব হাইফাই দোকান হইব বুঝলি? হাইফাই দোকান!’

এই স্থানে – মানুষের কনুইয়ের মতো মোড়সহ এখানে এখন বিশটা দোকান উঠেছে। সত্যিই হাইফাই দোকান উঠেছে সেখানে। আগের মতো অমুক ‘মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ নয়, ‘সুইটমিট’ হয়েছে; ‘বস্ত্রবিতান’ হয়নি, হয়েছে ‘নিউ কালেকশন’ টাইপের সব দোকান। মার্কেটের পেছনে ছয়-বাই-ছয় ফুটের একটা চালা তোলার জায়গা দিলেও শম্ভুর চলে যেত; কিন্তু শম্ভুর অনুরোধ রাখার সময় নেই নাসির মেম্বারের।

আনোয়ার হাজির হাতের দিকে মাত্র একবার তাকিয়েই শম্ভু চিনতে পেরেছে এই অস্ত্রগুলি তার হাতেই তৈরি, নিজের সন্তানের মতো জিনিসগুলি সে আবার তাকিয়ে দেখতে থাকে। আনোয়ার হাজি বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট, একসময় তুই-তোকারি করেই বলত, কিন্তু যারা টাকা-পয়সায় বড় হয়ে যায়, তাদের জন্য সর্বনাম পদ পাল্টিয়ে দিতে হয়, শম্ভু অত কিছু বোঝে না; বোঝে আনোয়ার হাজি এখন অনেক বড়লোক। দুই দিন আছে কোরবানির ঈদের, যাঁরা গরু-খাসি কোরবানি দেবেন, তাঁরা এখন শম্ভুকে খোঁজ করবেন, অস্ত্রগুলি শান দিতে হবে; এগুলি বছরে শুধু একদিন কাজে লাগে, আর সারা বছর বাড়ির কোন চিপায় পড়ে থাকে কে জানে!

এদেশের কামারদের জন্য এই কোরবানির ঈদটাই সিজন। এসময় তারা টাকা-পয়সার মুখ দেখে। মাঝে মাঝে পেপারেও নাকি কামারদের দোকানের ব্যস্ততা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়, ইদানীং টিভিতেও কামারদের দেখানো হয়; কোরবানির ঈদ এলেই সাংবাদিকদের ক্যামেরা দৌড়ে আসে। সারা বছর যখন বঁটি বানানো ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না, না খেয়েও থাকতে হয়, তখন কোনো সাংবাদিক এসে একবারও উঁকি দিয়ে দেখেন না।

শম্ভুর দোকান যেখানে ছিল, সেখানে সত্যি বঁটি বানানো আর শান দেওয়া ছাড়া আর তেমন কাজ ছিল না। আগে ওখানে কৃষিজমি ছিল বলে নাঙলের ফলা, ফসল কাটার কাঁচি, নিড়ানি, দাঁড়া কোদাল, পাতা কোদাল, নাঙলা কোদাল, দাও, কুড়াল, শাবল, খুন্তি, বঁটি, চটি কত কিছু বানানোর কাজ ছিল, শান দেওয়ার ছিল। আর কোরবানির ঈদের সময় তো বড় ছোরা, ছোট ছুরি, কোপা-চাপাতি, হাতকুড়ালসহ কত কাজ হতো। এখন এক ইঞ্চি কৃষিজমিও নেই, সেইসব যন্ত্র বানানোর কাজও নেই; মাঝখানে কৃষিব্যবস্থা উন্নত হওয়ার সময় ট্রাক্টর মেশিনের ফলা বানানোর কাজও সে করেছে, এখন সেসবও নেই।

সব জমি শিল্পকারখানা আর বাড়িঘরে ভরে গেছে। শম্ভুর বাবা তখন বিদায়ের পথে, লিভারে সমস্যা ছিল; ঢাকা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি চলছিল। তখন মনে হয়েছিল শিল্পকারখানা হলে কত কাজ বাড়বে, কিন্তু তেমন বাড়েনি।

প্রথমদিকে বিল্ডিংয়ের দরজার ক্লাম বানানো হতো কামারের দোকান থেকে। আগে রাইস মিলের কিছু কাজ আসত, এরপরে রেডিমেড ক্লাম হার্ডওয়্যারের দোকানে চলে আসে। ওয়েল্ডিং-ওয়ার্কশপ থেকেই বিল্ডিংয়ের প্রয়োজনীয় লোহালক্কড় বানানো হয়। তবে যত বস্তি   বাড়ছে, ঘর বাড়ছে, সংসার বাড়ছে – ততই বঁটির চাহিদা বাড়ছে। বড় বড় পরিবারে ভাঙন ধরলেই নতুন করে

বঁটি-চটির চাহিদা বাড়ে। মাংসের দোকান বাড়ছে, কাটারি-ছুরির চাহিদা বাড়ছে, এগুলির ওপরেই তার দোকান টিকে ছিল।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কাজ করার সময় দেখেছে তখন কত কাজ ছিল; তখন দাওয়ের কত রকম ছিল। বাড়িতে গাছ বা গাছের ডালাপালা কাটার জন্য ভারী দাও লাগত, আরেকটু ছোট কাজের জন্য কাটাইল নামের পাতলা দাও বানানো হতো, খেজুরগাছ কাটার জন্য ছোট, চিকন দাও বানানো হতো। মাঝে মাঝে ছেলেরা দোকান থেকে লাটিম কিনে কামারের দোকানে এসে লাটিমের আগের হুল ফেলে দিয়ে নতুন ধার হুল লাগিয়ে নিত। লাটিম দিয়ে কোপাকুপি খেলার জন্য ধারালো হুল লাগে। একটা হুল লাগিয়ে দিতে পারলে পাঁচ মিনিটেই এক টাকা কামাই হতো। আর একটা দাওয়ে ‘পানি-দিলে’ বা শামি লাগালে পাঁচ টাকা পাওয়া যেত, সময় লাগত আধঘণ্টা। ধান কাটার, পাট কাটার কাঁচিতে রোয়া কাটাতে সময় লাগে এক ঘণ্টারও বেশি, দশ টাকার বেশি কেউ দিত না, লাটিমের হুল লাগনোর মতো ছোট কাজেই আয় ছিল বেশি। এখন আর ছেলেরা লাটিম ঘোরায় না, সেই গাবের কাঠের শক্ত লাটিম পাওয়াও যায় না। মাঝে মাঝে রঙিন লাটিম দেখা যায়, সেগুলো বড়লোকদের আহ্লাদী পোলাপানের মতো। লাটিম দিয়ে এক কোপ দিলেই শেষ, আর আগের দিনের গাবের লাটিমের ওপরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেত, কিন্তু লাটিম ভাঙত না।

আগের দিনে অনেক সময় আঙুলমাপা গজাল বানানোর অর্ডার আসত। চার আঙুল ঝিনারি গজালের মজুরি কম ছিল; কিন্তু ছয় আঙুল, আট আঙুল, দশ আঙুলের গজালও শম্ভু তার বাবাকে বানাতে দেখেছে, সেগুলিতে লাভ বেশি হতো। তখনো দুয়ারের কপাটে লাগানোর কব্জা এত ছিল না, কাঠের কপাটে আস্কর-ডিঙ্গা লাগানো হতো, আস্কর আর ডিঙ্গা বানানোর ছোট অর্ডার আসত, বড় অর্ডারও আসত। ছোট অর্ডার করত গেরস্তরা আর অনেক মালের অর্ডার করত বেপারিরা, তারা সে-মাল নিয়ে হাট করত। গেরস্ত বাড়িতে ঢেঁকি এবং কাঁকাল-সিয়াতে লোহার বেড়ি লাগানো হতো। তাছাড়া তখন কাঠের নৌকা ছিল, নৌকায় ছিল অনেক রকম লোহার কাজ। পাতাম বানানো, নৌকার মাথি এবং গলুইয়ের জন্য লোহার অ্যাঙ্গেল বাঁকা করা, ছিদ্র করা, শিকল বানানো, শিকলের আংটা বানানো, জোড়া দেওয়া, গেড়াপি বানানো, ছোট নৌকার শিকলের মাথার জন্য চোখা খুঁটি বানানো, বৈঠার মধ্যে লোহার বেড়ি লাগানোসহ কত কাজ। ঘরের জন্য দুয়ারে আংটা, শিকল, হুড়কো বানানো, কাঠমিস্ত্রিদের ব্যবহারের ছেনি, বাটাল, মাত্রিশ, সাঁড়াশি, কাউয়াল, মাতুল,  বোর ও বর্মার বিট, রান্দার বাটাল বানানো হতো। রাজমিস্ত্রিদের উলন, কুনি বানানো হতো, রিকশামিস্ত্রিদেরও কত কাজ ছিল তখন কামারের দোকানে।

‘কস কী শম্ভু! দুইদিন আছে ঈদের! এখন এগুলা পানি-দিতে কই নিমু?’ কিছুটা বিরক্ত হয়েই যেন কথাগুলি বলেন আনোয়ার হাজি। শম্ভু বোঝে আনোয়ার হাজি আরো দু-এক দোকানে বোধহয় গিয়েছিল, সব কামারের দোকানেই এখন ভিড়, কোনোখানে সময় নিয়ে বসে থেকে কাজ করিয়ে আনার মতো ধৈর্য আনোয়ার হাজির নেই। ‘তুই দোকান ছাড়ছত কতদিন হইল?’

শম্ভু উত্তরে বলে, ‘মাত্র এক সপ্তাহ কাকা।’

দুদিকে মাথা দুলিয়ে আনোয়ার হাজি বলেন, ‘নারে, না। তুই গাড়ি চালাইতে পারবি না। পদ্মাসেতু চালু হইলে এই লাইনে যেইভাবে গাড়ির সংখ্যা বাড়ব আর স্পিড বাড়ব, তুই গাড়ি চালাইতে পারবি না, বড় গাড়ির ডলা খাইলে তর গাড়ি শেষ, তুইও শেষ! তুই আমাগ বাজারে জায়গা দেখ, আমি তরে বহাইয়া দেই। যতদিন খুশি দোকান চালাইস।’

আনোয়ার হাজির প্রস্তাবে আশাবাদী হয় শম্ভু। সত্যি সে বড় রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারে না, নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। কিন্তু কী আর করা! সংসারের টানেই সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে গাড়ি কিনেছিল। কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া সবাই ইজিবাইক চালায়, সেও সেভাবে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু নামার পরে বুঝেছে, কাজটা এত সহজ নয়। বড় বড় ট্রাক, লরি আর কাভার্ডভ্যান দেখলেই তার হাত অবশ হয়ে আসে। এসব গাড়ি সামনে দিয়ে এলে যেমন ভয় লাগে, পেছনে দিয়ে এলেও তেমন ভয় হয়।

শম্ভুর বউ তার গাড়ি চলানোর পক্ষে, কিন্তু তার কলেজপড়ুয়া মেয়ে আশালতা বলে, ‘বাবা, তুমি গাড়ি চালাইতে পারবা না। এই বয়স গাড়ি চালানোর বয়স না। তুমি অন্য কোনো জায়গায় দোকান দেওয়ার চিন্তা করো। গাড়ি কিননের চিন্তাও কইরো না।’

মেয়ের কথা অমান্য করেই শম্ভু গাড়ি কিনেছে।     

এখন দিন অনেক বদলে গেছে। সব কাজ এখন অটোমেশিনে করা হয়, কারেন্ট খরচ হলেও সময় বাঁচে মানুষের, সবাই শর্টকার্ট চায়।

হাজি সাহেবের আশ^াসে শম্ভু সেদিন গাড়ি নিয়ে বের না হয়ে নতুন বাজারে মসজিদের গলিতে হাজি সাহেবের দেখিয়ে দেওয়া জমিতে দোকান তোলার কাজে ব্যস্ত রইল। আষাঢ় মাস, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বৃষ্টি নামে, তাই বড় একটা পলিথিন চারটা খুঁটিতে টানিয়ে ভেতরে হাপর বসানো, নেহাই বসানো। হাপরের কাঠ দিয়ে বানানো গরুর মুখের ডিজাইন করা, এটা তার বাবার আমলের; কাঁঠাল-কাঠের গোমুখটা সাবান গোলানো পানিতে ন্যাকড়া ভিজিয়ে সুন্দর করে ধুয়ে-মুছে উজ্জ্বল করে তুলল। এর সামনের লোহার পাইপটা মাটিচাপা দিয়ে লেপে দিলো। বাড়িতে ছিল আগের দোকানের গাবগাছের গোড়া, সেটিতে আগে থেকেই হুক লাগানো, সেখানে রেললাইনের এক হাত লম্বা লোহার টুকরাটা বসাল, উঁচু নেহাইটা শক্ত করে মাটিতে গাঁথল। পানির জন্য একটা মাটির পুরনো মটকা অর্ধেক মাটিতে গেঁথে চারপাশটা লেপে দিলো। এসব কাজ করতে করতে রাত হয়ে গেল।

পরদিন সকালে শম্ভু আবার

বাপ-দাদার পেশায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ঈদের আর মাত্র মাঝখানে একদিন বাকি আছে। তার নতুন এই দোকানটা সদর রাস্তার পাশে, সহজেই লোকজনের চোখে পড়ে। ঈদের দিন পর্যন্ত তার দোকানে বেশ কাস্টমার এলো। জোগালি না থাকায় একাই তাকে সব কাজ সামলাতে হলো। হাপর টানা, হাতুড়ি দিয়ে পেটানো, পানিতে চুবিয়ে ঠান্ডা করা, রেত ঘষে ধার করা, সবশেষে লুঙ্গির কোচড়ে টাকা রাখা।   

শত কাজের মধ্যেও গাড়িটার কথা বারবার তার মনে পড়ছিল। ঈদের পরদিন তার এক আত্মীয় বন্ধু রাজীবচন্দ্র এসে তার নতুন দোকান দেখে গাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব করল। শম্ভু ভেবে দেখল গাড়িটা গ্যারেজে ফেলে রেখে লাভ নেই, বিক্রি করে দেওয়াই ভালো, সে গাড়িটা রাজীবের কাছে বাকিতে বিক্রি করে দিলো। বায়না হিসেবে দশ হাজার টাকা পেল, বাকি টাকা পরে দেওয়া হবে – এই কথা রইল।

কিন্তু এক সপ্তাহও গেল না, ঈদের পরদিন হাজি সাহেব ঢাকা চলে গেলেন; এর পাঁচদিন পরেই তার ভাতিজা এসে জানাল যে, এই জায়গা তাদের ভাগে পড়েছে, হাজি সাহেব মালিকানার মিথ্যা দাবি করেছে। এখানে তারা মার্কেট তুলবে, শম্ভুকে উঠে যেতে হবে। ট্রাকে করে ইট, বালু, রড চলে এসেছে, সেসব নির্মাণসামগ্রী রাস্তার পাশে এমনভাবে রাখা হলো, শম্ভুর দোকান আর রাস্তা থেকে দেখা যায় না, বন্ধ হয়ে গেল দোকানে যাওয়ার পথ। হাতে-পায়ে ধরে শম্ভু তিনদিন সময় চাইল। হাজি সাহেবের ভাতিজা যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে বলল, ‘বর্ষাকাল, তাড়াতাড়ি কাজ না ধরলে রডে জং ধরে যাবে, বালু ঢলে যাবে। এই কয়েকদিনের খরার মধ্যেই কাজ শুরু করে দেওয়া উচিত।’

শম্ভুকে দুদিন সময় দেওয়া হলো, এর মধ্যে সে নতুন কোনো জায়গায় দোকান বসানোর জায়গা মেলাতে পারল না। অনেকের কাছে অনুনয়-বিনয় করল, কেউ তার কথা কানে তুলল না। ওখানে ওস্তাগাররা কাজ শুরু করে দিয়েছে। শম্ভুর দোকানের খুঁটি তুলে মার্কেটের কলাম খাড়া করার জন্য মাটি কাটা শুরু করে দিলো। শম্ভু আবার তার হাপর-নেহাই তুলে বাড়িতে ফিরে গেল।

এর মধ্যে আরেক অঘটন ঘটেছে, তার ইজিবাইকসহ তার সেই বন্ধু রাজীব নিখোঁজ। তিনদিন পরে তার লাশ পাওয়া গেল দূরের এক গ্রামে, কিন্তু গাড়ি পাওয়া গেল না। রাজীবের বউ এসে কান্নাকাটি করে গেছে স্বামীর জন্য। শম্ভু বোঝে, স্বামীর জন্য কান্না বাড়িতে বসেই কাঁদা যায়, শম্ভুদের বাড়িতে এসে কান্নার মানে হলো, গাড়ির মূল্য বাবদ বাকি টাকা মওকুফ করার চেষ্টা করা। স্বামীহারা বিধবা মহিলা আর করবেই বা কী! 

শম্ভু বুঝল আবার আগামী বছর কোরবানির ঈদের সময় তার মূল্য বাড়বে, তার আগে আর কিছুতেই নয়।