এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষ ছাড়াও অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কিনা – এই বিষয়টি থেকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে নিউট্রিনোর ভর আছে কিনা এবং যদি থেকে থকে সেটি কত। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি, নিউট্রিনোর ভর-বিষয়ক আলোচনা হলে সাধারণ মানুষ হাই তুলে অন্য একটি বিষয়ে চলে যাবেন, কিন্তু এই সৃষ্টিজগতে মানুষ ছাড়া অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কিনা, সেটি নিয়ে আলোচনা হলে নিশ্চিতভাবে কৌতূহলী হয়ে আলোচনাটি শুনবেন।

পৃথিবীর মানুষের এই বিষয় নিয়ে কৌতূহল অনেক দিনের। একসময়ে ধারণা করা হতো সূর্যের প্রখর উত্তাপ বাইরে, ভেতরে পৃথিবীর মতো শান্তিময় পরিবেশ। সেখানে বুদ্ধিমান প্রাণীরা বসবাস করে। সূর্যের গঠনটা বুঝে নেবার পর এখন আর সেটি কেউ বিশ্বাস করে না। পৃথিবীর কাছাকাছি ছোট গ্রহগুলো হচ্ছে বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গল। পৃথিবীতে আমরা সবাই আছি এবং সবসময়েই কল্পনা করছি, অন্য গ্রহগুলোতে হয়তো আমাদের মতো কেউ আছে। এখন আমরা জেনেছি, ভয়ংকর উত্তপ্ত বুধ গ্রহে প্রাণের বিকাশ ঘটা সম্ভব না। শুক্র গ্রহও মেঘে ঢাকা উত্তপ্ত প্রাণ সৃষ্টির অনুপযোগী একটি গ্রহ। মঙ্গল গ্রহ প্রতিযোগিতায় খুব দুর্বলভাবে টিকে আছে। বড় বড় চোখ, কিলবিলে হাত পা, ধারালো দাঁত – এই ধরনের পূর্ণ বিকশিত প্রাণীর আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু জীবাণু-আকারের কিছু একটা আছে কিনা কিংবা এখন না থাকলেও অতীতে কখনো ছিল কিনা – সেটি নিয়ে আলোচনা এবং গবেষণা মাঝে মাঝেই চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

মানুষ ছাড়া এই সৃষ্টিজগতে অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কিনা, সেটি নিয়ে মানুষের কৌতূহল যুক্তিসঙ্গত এবং সেটি বের করার জন্যে একটি প্রতিষ্ঠানও আছে, তার নাম Search for Extraterrestrial Intelligence সংক্ষেপে SETI এবং তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করে মহাজগতে ক্রমাগত প্রাণের সন্ধান করে যাচ্ছে। মূলত মহাজগৎ থেকে যে বিভিন্ন ধরনের সংকেত আসে তার মাঝে কোনো প্যাটার্ন বা বুদ্ধিমত্তা আছে কিনা, সেটিই খোঁজা হয়। ধারণা করা হয়, যদি সে-রকম কিছু পাওয়া যায় বুঝে নিতে হবে সেটি পাঠাচ্ছে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী। এটি নিয়ে অনেক বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী লেখা হয়েছে, কিন্তু এখনো কিছু পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক প্রাণী বলে যে কিছু নেই, সেটি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন তা নয়। ভয়েজার মহাকাশযানগুলো আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করে সৌরজগতের বাইরে চলে গেছে, সেখানে মানব-মানবীর ছবিসহ আরো অনেক কিছু পাঠানো হয়েছে, কোনো একটি বুদ্ধিমান প্রাণী কোনো একদিন সেটি খুঁজে পাবে সেই আশায়!

পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা – সেটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা করা হয়নি, তা নয়। এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ড্রেকের সমীকরণ। এই সমীকরণে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে যে-কটি বুদ্ধিমান প্রাণীর জগৎ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে তার সংখ্যা ঘ হচ্ছে :

N = R x P x E x L x I x T

এখানে জ হচ্ছে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা, চ হচ্ছে একটি নক্ষত্রকে ঘিরে গ্রহ পাওয়ার সম্ভাবনা, ঊ হচ্ছে এরকম গ্রহ থেকে থাকলে প্রাণবিকাশের উপযোগী গ্রহের সংখ্যা, খ হচ্ছে প্রাণবিকাশের উপযোগী গ্রহ থেকে থাকলে তার ভেতরে সত্যি সত্যি প্রাণের বিকাশ হবার সম্ভাবনা, ও হচ্ছে সত্যি সত্যি প্রাণের বিকাশ হয়ে থাকলে সেগুলো বিবর্তণে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত হয়ে অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো বুদ্ধিমত্তা-অর্জনের সম্ভাবনা এবং ঞ হচ্ছে যে-সময় পর্যন্ত সেই বুদ্ধিমান প্রাণী টিকে থাকতে পারে। এর কিছু কিছু সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বেশ ভালো ধারণা আছে, কিছু কিছু অনুমান করতে হয়। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সাগান ড্রেক-সমীকরণ ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, এই গ্যালাক্সিতেই লাখ লাখ বুদ্ধিমান প্রাণীর সভ্যতার জন্ম হওয়ার কথা। আবার অনেক বিজ্ঞানী সেটি মোটেই বিশ্বাস করতে রাজি নন – তাদের ধারণা ড্রেকের সমীকরণ ব্যবহার করে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব প্রমাণ করা এত সহজ নয়। আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী হচ্ছেন এনরিকো ফারমি, তিনি ড্রেকের সমীকরণ দেখে বিখ্যাত ফারমির বিভ্রান্তি জন্ম দিয়েছিলেন, সেটি এরকম :

(ক) সত্যিই যদি মহাজগতে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব থেকে থাকত, তাহলে এতদিনে তাদের পৃথিবীতে দেখা পাওয়ার কথা।

(খ) তাদের যদি পৃথিবীতে দেখা না পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে, মহাকাশযান তৈরি করে পৃথিবীতে আসার তাদের কোনো গজর নেই।

(গ) সেটি যদি সত্যি না হয়ে থাকে তাহলে বুঝবে হবে, এই বুদ্ধিমান প্রাণীর সভ্যতা খুবই ক্ষণস্থায়ী। তাদের জন্ম হয় এবং কিছু বোঝার আগেই তারা নিজেরা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে!

এনরিকো ফারমি যে খুব চিন্তাভাবনা করে তাঁর এই বিভ্রান্তিটির জন্ম দিয়েছিলেন তা নয়, বলা হয়ে থাকে, দুপুরের খাবার খেতে খেতে ঠাট্টার   ছলে কথাগুলো বন্ধুদের বলেছিলেন এবং এখন যারাই মহাজাগতিক প্রাণী নিয়ে চিন্তাভাবনা করে তারা কোনো-না-কোনোভাবে এনরিকো ফারমির বিভ্রান্তির কথা জানেন। প্রথম দুটোর কথা ছেড়ে দিয়ে আমরা তৃতীয়টি নিয়ে একটু ভাবতে পারি।

আমরা মানুষেরা নিজেদের খুব উন্নত এবং বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করি, কিন্তু ইতিহাস পড়লে সেটিকে খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। যুদ্ধবিগ্রহ করে মানুষ একে অন্যকে কতোভাবে খুন করেছে, সেটি কেউ চিন্তা করে দেখেছে? পুরো একটি সভ্যতাকে অন্য একটি সভ্যতা এসে ধ্বংস করে দিয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, আমাদের মনে হয়, এই মুহূর্তে আমরা ঠিক এরকম একটি সময়ের মাঝে আছি। চেঙ্গিস খান বা হালাকু খানের আমলে মানুষ খুন করা পরিশ্রমের ব্যাপার ছিল, কারণ তরবারি দিয়ে আরেকজনকে কাটতে হতো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাৎসী বাহিনী সেটিকে আধুনিক করেছিল, গ্যাস-চেম্বারে মারা থেকে মৃতদেহকে ভস্মীভূত করার অনেক বিজ্ঞানসম্মত উপায় তারা আবিষ্কার করেছিল। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিধ্বংসী নিউক্লিয়ার বোমা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে একমুহূর্তে কয়েক লাখ মানুষকে মেরে ফেলে হত্যাকাণ্ডের একটি নতুন দিগন্ত-উন্মোচন করেছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে এই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকবে কিনা, সেটি নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রথমবার তৈরি হয়েছে। অস্ত্র-প্রতিযোগিতা করে পৃথিবীর নানা দেশের কাছে এখন যে-পরিমাণ মানববিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে সেই অস্ত্র দিয়ে এই পৃথিবীর সকল প্রাণীকে একবার নয় অসংখ্যবার ধ্বংস করে ফেলা যায় – তারপরেও আমরা কী মানুষকে সভ্যমানুষ বলতে পারি?

আমাদের পছন্দ হোক আর না হোক, এটি আমাদের স্বীকার করতেই হবে, এরকম একটি পরিস্থিতি হওয়া সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্যে। চেঙ্গিস খান বা হালাকু খান ধারালো তরবারি দিয়ে কুপিয়ে পৃথিবীর সব মানুষকে মেরে শেষ করতে পারত না, কিন্তু জর্জ বুশ কিংবা টনি ব্লেয়ার ইচ্ছে করলে পৃথিবীর সব মানুষকে মেরে শেষ করে ফেলতে পারেন – একবার নয়, বহুবার। তার কারণ চেঙ্গিস খান বা হালাকু খানের কাছে নিউক্লিয়ার বোমা ছিল না, জর্জ বুশ কিংবা টনি ব্লেয়ারের কাছে আছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিক সূত্র থেকে যখন বের করেছিলেন ঊ = সপ২, তখন কী তিনি সন্দেহ করেছিলেন, এটি দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মারণাস্ত্র তৈরি হবে। পরমাণুর বড় একটি নিউক্লিয়াস ভেঙে দুটুকরো করা হলে তার বাড়তি ভরটুকু শক্তি হিসেবে বের হয়ে আসে। ভর বা স কে ঊ বা শক্তি তৈরি করা হলে সেটিকে প বা আলোর বেগ দিয়ে দুইবার গুণ করতে হয়, তাই একটুখানি ভর দিয়ে অনেকখানি শক্তি পাওয়া যায়। সাধারণ বোমার ধ্বংস-ক্ষমতার চেয়ে নিউক্লিয়ার বোমার ধ্বংস করার ক্ষমতা তাই এত বেশি। যে-পরমাণুর নিউক্লিয়াস দিয়ে এটি প্রথমে করা হয়েছিল সেটি ছিল ইউরেনিয়ামের। ইউরেনিয়ামের পরমাণু-সংখ্যা হচ্ছে ৯২, তাই এই সংখ্যাটির একটি অন্যরকম গুরুত্ব রয়েছে। মানুষ যখন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত হয়ে প্রথমবার ৯২ নম্বর পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতর থেকে ভয়ংকর শক্তিটি বের করতে পেরেছে, ঠিক তখনই তারা সারাজীবনের জন্যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে – কারণ ঠিক তখনই প্রথমবার তারা পৃথিবীকে ধ্বংস করার ক্ষমতাটি অর্জন করেছে। মানুষ তাদের নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে কিনা সেটি কেউ এখনো জানে না, কিন্তু সেই ক্ষমতাটি যে তাদের আছে সেটি সবাই জানে। একটি বুদ্ধিমান প্রাণীর সভ্যতা যখন বিকশিত হয় তাদের অস্তিত্বের প্রথম বিপদটি আসে এই ৯২ নম্বর পরমাণু থেকে। এর থেকে উত্তরণ হবার পরেই বলা যায় তারা ৯২-এর বাধা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

পৃথিবীতে মানুষ যেভাবে বিবর্তনের ভেতর দিয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে বিকশিত হয়ে একসময়ে ৯২-এর ভয়ংকর বিপদের মুখোমুখি হয়, ঠিক সে-রকম অন্য কোনো গ্যালাক্সির অন্য কোনো নক্ষত্রের অন্য কোনো গ্রহে যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্ভব হয় তাহলে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত হয়ে তারাও একসময়ে ৯২ নম্বর পরমাণু থেকে শক্তি বের করার রহস্যটি জেনে যাবে। মানুষ যেভাবে তাদের নিজেদের    অস্তিত্বকেই ধ্বংস করার মুখোমুখি হয়েছে – সে-রকম তারাও সেই নিজেকে ধ্বংস করার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াবে!তারপর কী হয় আমরা জানি না। এনরিকো ফারমি ভয় পেয়েছেন বুদ্ধিমান প্রাণী হয়তো নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে! মানুষও বুদ্ধিমান প্রাণী, তাই হয়তো আমরাও নিজেদের ধ্বংস করে ফেলব! হয়তো সৃষ্টিজগতে অনেক প্রাণের উদ্ভব হয়েছে, কিন্তু বুদ্ধিমত্তার জন্যে তাদের খুব বড় মূল্য দিতে হয়েছে। সে-কারণে হয়তো বুদ্ধিমান প্রাণীরা সবসময়েই একা। সবসময়েই নিঃসঙ্গ।