প্রতিটি গল্পে লুকিয়ে থাকেন লেখক স্বয়ং। শুধু গল্পের পেছনে বা আড়ালে নয়, কখনো-বা মিলেমিশে একাকার হয়েও থাকেন। সাহিত্যবোদ্ধা সমালোচকের মতে, সফল গল্প আসলে লেখকের জীবনের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, পর্যবেক্ষণ, সত্যান্বেষণ, কামনা-বাসনা, আনন্দ-বেদনা,
স্বপ্ন-কল্পনা ইত্যাদি সহজ-কঠিন ও জটিল মানবিক বিষয়ের প্রতিফলন, ভাষায় যার শৈল্পিক নির্মাণ স্থান-কালের সীমা ছাপিয়ে পাঠকচিত্তে সাড়া জাগায়। লেখক মরে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট শিল্প টিকে থাকে।
এরকম ধারণা বিশ্বাস করে এবং নিজেও অচেনা জীবিত ও মৃত বিস্তর লেখকের কালজয়ী সাহিত্য পাঠে মুগ্ধ হয়েই তো লেখালেখি শুরু করেছিলাম। আমার জন্মের আগে, লেখক হওয়ার বাসনায় নিজেও কলম ধরার আগে কত লেখক মরে গেছেন। বিশ্বসাহিত্যের চেকভ, টলস্টয়, ও’ হেনরি এবং বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে কত যে লেখক তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠছেন পাঠকমনে। সেইসব
প্রাপ্তি-স্মৃতি টিকে আছে এখনো। লেখক হওয়ার পেছনে মরেও অমর হওয়ার বাসনাটি শুধু অবচেতনে নয়, সচেতনভাবেও বেশ জোরালো ছিল একসময়। আজ যখন কবরে ঢোকার সময় ঘনিয়ে আসছে, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখি করে, নিজেকে তাই প্রশ্ন করি, টিকে থাকার মতো কয়টা সফল গল্প লিখতে পেরেছি? হায়, কে দেবে এ-প্রশ্নের সদুত্তর?
নিজের পক্ষে এমন প্রশ্নের দেওয়াটা অসম্ভব। বিনয় বা ভদ্রতা দেখাতে
এ-কথা বলছি না। বুকসেলফে নিষ্প্রাণ নিজের সৃষ্টিসমগ্রের দিকে তাকিয়ে থাকি, ছুঁয়েও দেখি, হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টেও দেখেছি, কিন্তু এগুলোর বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক কিছু ভাবতে পারি না। বই প্রকাশের পর নিজের বই পড়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা সময় হয় না। অবশ্য পরিমার্জিত সংস্করণ করার তাগিদে নতুন করে পড়া ও ঘষামাজা করতে হয়েছে অনেক লেখা। কিন্তু কোনটা শিল্পসফল সৃষ্টি হিসেবে কালজয়ী
হয়েছে, আগামীদিনের পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি হবে না নিশ্চিত করে বলতে পারব না। এর একটি বড় কারণ লেখক হিসেবে বড়ই খুঁতখুঁতে স্বভাবের আমি। একটি গল্প লিখতে গিয়ে কাটাছেঁড়া অনেক করি, পুরোটা ডিলিট করে নতুন করেও লিখি, তারপরও কখনোই মনে হয়নি – দারুণ লিখে ফেললাম! গর্ববোধ জাগেনি কখনো। তবে লেখা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর ভারমুক্তির আরামবোধ করি। গর্ভবতী মায়েরা খালাস হওয়ার পর যেমনটা আরাম বোধ করেন আর কী। কিন্তু মায়েরা নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে যেরকম তৃপ্ত এবং সারাজীবন আপন সৃষ্টির লালনপালনে যত্নশীল থাকেন, লেখা বই হওয়ার পর লেখকের সৃষ্টির প্রতি সেরকম দায় থাকে না। এ-কারণেই বোধহয় একটার জন্ম হতে না হতেই আরেকটার জন্ম দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠি। পেশাদার লেখক দাবি করেন যে, ইচ্ছা না করলেও লেখার টেবিলে তাঁকে রোজ বসতে হয়, আমিও বসি।
শতাধিক ছোটগল্প লেখার পরও কেন নতুন করে গল্প লেখার চেষ্টা করি? পেশাদারিত্ব বা লেখক পরিচয় বজায়ে লেখার জন্য লেখা হয় নাকি? আপাতদৃষ্টিতে এরকম মনে হতে পারে। তবে গল্প লেখার বিষয়ে নিজের বদ্ধমূল ধারণা, প্রতিটি গল্পের পেছনে থাকে গল্পকারের জীবনের সত্যি গল্পের চাপ। সত্যকে প্রকট রূপে প্রকাশের জন্য কল্পনার দ্বৈরথে, কখনো-বা
রূপক-প্রতীকের আড়ালে, প্রতিবেদনসুলভ সহজ বয়ানেও মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে গল্পকারের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। নিজের রচিত গল্পগুলির ক্ষেত্রে এ-কথা শতভাগ সত্য। কেন এবং কীভাবে গল্পের ভেতরে গল্পকারের ব্যক্তি-অস্তিত্ব বিদ্যমান – নিজের রচিত শতাধিক গল্প ধরে উদাহরণ দিতে গেলে ব্যর্থ লেখকের আত্মকথার বিশাল ভার নিজেও বইতে পারব না। কাজেই কিছু গল্প ধরে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। শুরু করা যাক সর্বশেষ রচিত ‘শখের বাগানে সাপ’ গল্প দিয়ে। এটি আসলে লেখকের সাম্প্রতিক গল্পগ্রন্থেরও নাম, বইয়ের নামকরণও এ-গল্পটির নামেই হয়েছে।
সমবয়সী লেখক-পাঠক বন্ধুরা জানেন, আমার প্রথম গল্পসংকলনটির নাম অবিনাশী আয়োজন। বইয়ের নামকরণ এবং আয়োজনের মধ্যেও নবীন লেখকের মরেও অমর হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি পাঠক-সমালোচক টের পেয়েছিলেন কি না জানি না, তবে নবীন লেখক হাড়ে-মজ্জায় অনুভব করেছিল। শখের বাগানে সাপ বইয়ের নামকরণেও তেমনি লেখকের তামাম শেষ হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা বিদ্যমান। এ-গল্পের নায়ক গ্রামে সত্যই শেষ বয়সে একটি শখের প্রাকৃতিক বাগান করে। এবং গল্পে শখের বাগান নিয়ে, প্রতীকী অর্থে বলা যায় স্বপ্নের সোনার বাংলায় – লেখকের স্বাধীনভাবে বাঁচার শখ-আহ্লাদ যেমন বিদ্যমান, তেমনি বিষধর সাপের হিংস্র ছোবলে সহসা শেষ হয়ে যাওয়ার আতঙ্কটা মোটেও অমূলক নয়। শখ ও সাপের প্রভাব অন্য গল্পগুলোতেও আছে। সীমিত পাঠকবন্ধুরা বইটি দেখে কিংবা না দেখেও জেনেছেন হয়তো কেউ-বা, এটা আসলে দুঃশাসন ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লেখা আটটি ছোট ও বড় গল্পের সংকলন। বিজ্ঞাপন ও বই পরিচিতিতে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এই গল্পগুলির সঙ্গে, গল্প লেখার পেছনে লেখকের জীবনের যেসব পুরনো গল্প কাজ করেছে, রক্ত না ঝরলেও বিস্তর শ্রমপীড়িত ঘামও ঝরেছে, বিশদ না বললে পাঠক তা অনুমান করতেও পারবেন না।
অনেক লেখকই লেখার পেছনের গল্পটা বলতে গিয়ে বলেন, বসলাম আর হয়ে গেল। বসা আর হওয়া, মাঝখানে কায়েক ঘণ্টা বা দিনকয়েক সময়ে কলমই তরতর করে টেনে নিয়ে গেছে উপসংহারে। কেউবা বলেন – শুরু করে দিলে কলমই শেষ গন্তব্যে নিয়ে যায়। লেখক হিসেবে আমি সেরকম প্রতিভাবান নই অবশ্যই। আর কলমই তো নেই, টেনে নেবে সে কোথায়? খুঁজে পেতে সস্তার বলপেনটি ব্যবহার করি শুধু চেকবুকে স্বাক্ষরটি দেওয়ার জন্য। দুই যুগ ধরে লেখালেখি করছি আসলে কম্পিউটারে। চোখ বন্ধ করে কী-বোর্ডে আঙুলকে বৃষ্টির মতো নাচিয়ে দ্রুতগতিতে লিখতে পারি। তারপরও একটি গল্প শেষ করতে কমপক্ষে আট-দশদিনের সেশনে কি-বোর্ড টিপতে হয়। এ-বইয়ের গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক শেষ চারটি গল্প লিখতেই টানা সময় লেগেছে গড়ে পাঁচ মাস।
গল্পের পেছনে লেখকের জীবনের যে অভিজ্ঞতা-উপলব্ধির চাপের কথা বলেছি, সেই অভিজ্ঞতার গল্পটি সরাসরি বললেই হয়তো লেখার কারণ এবং কীভাবে লিখলাম, এ-প্রশ্নেরও জবাব অনেকটা স্পষ্ট হবে। যেমন বইয়ের প্রথম গল্প ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’। গল্পটার প্রতি লেখকের বিশেষ দুর্বলতা গরুর কারণেই। গ্রামের গেরস্ত-চাষির ছেলে। ছোটবেলায় শখ করে গরু চড়াতাম। গোয়ালভরা গরুর মধ্যে একটা লাল-সাদা রঙের বাছুর ছিল খেলার সাথির মতো প্রিয়। বাছুরটার জননী, লালরঙা তরুণী গো-মাতাকে দড়ি ধরে ক্ষেতের আলের ডগমগে কচি ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যেতাম। এত লক্ষ্মী ছিল গাইটি, ওটা কখনো আমাকে ঢুসা মারেনি, লেজের বাড়িও দেয়নি। শৈশব-কৈশোরের এই স্মৃতির প্রভাবেই কি না জানি না, স্কুলে গরুর রচনা লেখার পরও পরিণত বয়সেও রচিত গল্পের মধ্যে গরু ফিরে এসেছে অনেকবার। অবশ্য নিছক গরু নিয়ে গল্প লেখার গরজে নয়। গরুর সঙ্গে সম্পর্কিত গরিব গেরস্ত-চাষির দুঃখ-কষ্ট-সংগ্রামের গল্প বলতে গিয়ে অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবেই এসেছে গরুগুলি।
ছোটবেলার মতো শেষবেলায়ও যেহেতু গ্রামেই বসবাস করছি, সাম্প্রতিক গল্পের সংকরজাত দামি গরু ও গরুর মালিক মামুদকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। কল্পনার রং মেশাতে হয়নি তেমন। অর্থের লোভে জান-কোরবান দিতে ট্রাকযাত্রী গরুটার সঙ্গী মামুদ ও তার বেকার ছেলের বিদেশযাত্রার স্বপ্নের পেছনে দেখেছি পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের আগ্রাসন। আর এই আগ্রাসনের মুখে মামুদ তার পোষা গরুটার মতোই অসহায়। মুনাফা লোটার অপ্রতিরোধ্য যান্ত্রিক গতির শিকার গরুটার শরীরে ঢলে পড়ে মামুদের শেষ আশ্রয় খোঁজার মধ্য দিয়ে গল্পটা শেষ হয়েছে। গল্পটি লেখার পেছনে শুধু অতীত ও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার চাপ যেমন, তেমনি বুনন-কৌশলেও লেখকের রাজনৈতিক সচেতনতা কাজ করেছে নিশ্চয়। কিন্তু গল্পটি বোধ-উপলব্ধির জগতে কীভাবে কতটা সংক্রমিত হয়েছে কি হয় নাই, মামুদের প্রতি সহমর্মিতার বোধ জেগেছে কি জাগে নেই, নিজে বলতে পারব না।
দ্বিতীয় গল্পের নাম ‘কুড়ানি বুড়ি ভাদুর মা’। এই কুড়ানি বুড়িও আমার খুব পরিচিত চরিত্র। গ্রামে প্রকৃতিনির্ভর তার জীবনসংগ্রাম খুব কাছে থেকে দেখেছি। কিন্তু ভাদুর মায়ের গল্পে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিংবদন্তি দুই মহাপুরুষ মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান স্বনামে এসেছেন।
মওলানা ভাসানীর জীবনাদর্শ ও একজন পির হিসেবে তাঁর স্মৃতি
মুরিদ-পরিবারের উত্তরাধিকারী ভাদুর মায়ের মধ্যে সক্রিয় থেকে তার বাঁচার লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা জোগায়। অন্যদিকে শেখ মুজিবের নাম ভাঙিয়ে কিছু নেতা ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে তৃণমূল পর্যায়েও এক মোড়ল কুড়ানি বুড়ির শেষ সম্পত্তিটুকু কেড়ে নিতে তৎপর। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভাদুর মায়ের জীবন-বাস্তবতা দেখাতে এটার কী দরকার ছিল? লেখকের
রাজনীতি-বাতিকের কারণে দুই নেতার স্মৃতি-মূল্যায়ন আরোপনের ফলে গল্পটির বুনোট বা শৈল্পিক নির্মাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি কি? এমন সন্দেহ নিজের মনেও জেগেছিল। শুধু তো এ-গল্পে নয়, বইয়ের পরবর্তী পাঁচটি গল্পে শাসকদলীয় রাজনৈতিক নেতা, দল, সরকারপ্রধান এবং রাজনৈতিক দলের নাম ও তাদের কর্মকাণ্ডের ভূমিকা স্ব-স্ব নামে ও সরাসরি এসেছে। বলা যায়, রাজনীতির বিষয় ও প্রভাব নিয়ে রচিত এ-গ্রন্থের বেশির ভাগ গল্প।
লেখকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত পিএইচ.ডি কোর্সের এক গবেষক জানতে চেয়েছিলেন, আমার গল্প-উপন্যাসে রাজনীতি ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলো ঘুরেফিরে আসে কেন? এ-বইটির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। আত্মকথার বই পথে নেমে পথে খোঁজা পড়ে গবেষককে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কথা বলে এড়িয়ে গেছি। কিন্তু এ-লেখায় শেখ হাসিনার শাসনামল ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গল্প লেখার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে পুনরাবৃত্তি হলেও সংক্ষেপে নিজের রাজনীতি-বাতিকের কারণটা বলা প্রয়োজন। রাজনীতির বীজটি কোমল চিত্তে রোপিত হয়েছিল আসলে কৈশোরেই। শৈশবে গাঁয়ের সবুজ ক্ষেত-প্রান্তর পশুপাখিদের যেমন, কৈশোরে তেমনি শহরে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষেণের সুযোগ ঘটেছিল। বাঙালি জাতির আত্মঅধিকার প্রতিষ্ঠার উত্তাল সময় সেটা। আমি জেলা শহরের হাইস্কুলে নাইন-টেনের ছাত্র। পাকিস্তান আমলের শেষদিকে স্বৈরচারী শাসক আইয়ুব খানকে হটানোর জন্য ঊনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানে নিজেও মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। কলেজছাত্রদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আইয়ুব খানের গদিতে একসঙ্গে আগুন জ্বালানোর উত্তেজনায় স্লোগান হেঁকেছিলাম। অনেকের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার লড়াকু তেজটা ভালো লেগেছিল। কলেজে ভর্তির পর সেই তেজ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দেশজুড়ে গড়ে ওঠা বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে জড়িয়ে ক্রমে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল সত্তর-একাত্তরে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার
স্বপ্ন-সংগ্রামে জড়িত হয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী সাহসে মুক্তিযুদ্ধেও শরিক হয়েছি। দেশ, আত্মপরিচয় ও আত্মমুক্তির পথ নিয়ে কত যে প্রশ্ন জেগেছিল সেই সময়ে। এক কথায় বলা যায়, কৈশোর-তারুণ্যে মুক্তিকামী মানুষের
আন্দোলন-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে গড়ে উঠেছে নিজের লেখক সত্তা। রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন-উত্তেজনার প্রতি টানটাও তাই মজ্জাগত। স্বাধীন বাংলাদেশে ডান-বাম কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী-সদস্য হইনি। তবে স্বাধীনতার স্বাদবঞ্চিত মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম থেকে কলমযোদ্ধা হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করতে চেয়েছি। এ-কারণে স্বাধীনতার পর দেশে যতগুলো বড় ধরনের রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে, আন্দোলন হয়েছে, কমবেশি জড়িত হয়েছিলাম সবগুলিতে। যেহেতু রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের ও জনসমাজের মূল চালিকাশক্তি, আমার গল্প-উপন্যাসের ঘটনায় চরিত্রগুলির জীবনবাস্তবতায় তার প্রভাব পড়াটাই মনে হয় স্বাভাবিক। ইতিহাসের দিকে তাকালেও বুঝতে পারি, রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিশ্বের বহু দেশেই যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে এবং নিরন্তর ঘটে চলেছে। কাজেই বাস্তবতা বুঝতে সত্যসন্ধ লেখকের পক্ষে রাজনীতি এড়ানোর উপায় আছে? বিশেষ করে বাস্তব ও সত্য উদ্ঘাটনের সঙ্গে মানব কল্যাণের দায়ও কাজ করে যেসব লেখকের ভেতরে, তাদের?
প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনীতি ছাড়া কি সাহিত্যে জীবনসত্য বা বাস্তবতা নেই? অবশ্যই আছে। মানবজীবন অনেক ব্যাপক-বিস্তৃত, গভীর ও জটিল একটা বিষয়। কতভাবেই না এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে। টিকে থাকার লড়াই ছাড়াও মানব প্রকৃতিতে চিরন্তন ইতিবাচক যেসব প্রবৃত্তি, যেমন ভালোবাসা, আনন্দ-বেদনা, দয়া-মায়া, সহমর্মিতা ইত্যাদি বোধের সঙ্গে রাজনীতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। বরং রাজনীতির সংস্পর্শে এলেই এগুলো দূষিত হয়ে পড়ে যেন। রাজনীতিতে লোভ, হিংসা, ক্ষমতা, ঘৃণা, ক্রোধ ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক আবেগের ব্যবহার আকছার ঘটে। তাছাড়া রাজা বা রাজনীতি কর্তৃক শাসিত হলেও দার্শনিক বিজ্ঞানীরা মানবজীবনে ধর্ম, মিথ, কাম, যৌথ অবচেতন, কল্পনা ইত্যাদি নানারকম শক্তির প্রভাব আবিষ্কার করেছেন। সাহিত্যে এসবের বিস্তর নিদর্শন আছে। বহু কালজয়ী সাহিত্য রচিত হয়েছে মানবজীবনের চিরন্তন প্রবৃত্তিকে অবলম্বন করে, যা প্রাসঙ্গিক মনে হয় আজকের যুগেও।
সামান্য লেখক হিসেবে রাজনীতির বাইরেও ব্যক্তির জীবনসত্যকে বোঝার ও লেখায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ ও রোমাঞ্চ এই পড়ন্ত বয়সেও কম নয়। কিন্তু প্রেম ও রাজনীতি একসঙ্গে যায় না বোধহয়। এই গ্রন্থে ‘দাঁতভাঙা হাসি’ নামে যে প্রেমের গল্পটি, তাতে প্রত্যক্ষ রাজনীতি নেই। নায়িকার নকল দাঁতের হাসি দেখে মুগ্ধ হয়েছিল লেখকও। মেয়েটির জীবনের সত্যি দুর্ঘটনাটি ও তার আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সহমর্মিতার বোধ জাগিয়েছিল। পত্রিকার চাপে অল্পসময়ে লিখে দিয়েছি গল্পটা। জানি না এ-গল্পের নায়িকা এখন নতুন কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে কোথায় কীভাবে পথ চলছে। রাজনীতি ও গণঅভ্যুত্থানের এই গল্পসংকলনে পাঠককে কিছুটা ভিন্ন স্বাদ দিতে এবং নিজের আর কোনো গল্পগ্রন্থ বেরুবে না ভেবে ‘দাঁতভাঙা হাসি’ও শখের বাগানে সাপের মাঝে ঠাঁই পেয়েছে। না পেলেই ভালো হতো কী?
‘কবর’ গল্পটার প্রথমে নাম ছিল কবরশাসিত উন্নয়ন। অপরিকল্পিত নগরায়ণের মাঝে সরকারি রাস্তা দখলকারী
একটি পারিবারিক কবর ঘিরে বস্তি ঘরের বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে ওঠার
এ-গল্পে নায়ক বাড়ির অন্যান্য হকদারকে বঞ্চিত করেছে। দুর্নীতিনির্ভর এই উন্নয়নকে বৈধ প্রমাণ করতে প্রতি বছর সে মহা আড়ম্বরে পিতার মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করে। লেখক তাঁর পিতার ও জাতির পিতার নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার দিনটি অভিন্ন রেখেছে বৃহত্তর সত্যের প্রতি ইঙ্গিত দিতে। গল্পটা যখন লিখেছি তখন শেখ হাসিনার শাসনকালে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছিল! সেই উন্নয়নের ভাগীদার হতে ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা-মন্ত্রীদের জাতির পিতার কবরে ও স্মৃতিবেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রতিযোগিতা দেখেছি। বিষয়টাকে পারিবারিক কবরের সঙ্গে আনতে একজন সাংবাদিককে গল্পের কথক করা হয়েছে। কিংবা সাংবাদিকের ছদ্মবেশে গল্পকার নিজেও গল্পে হাজির হয়েছে। কবরশাসিত উন্নয়ন নামের কারণেও গল্পটা একাধিক পত্রিকা ছাপতে চায়নি। শেষে এক সম্পাদক শুধু কবর নাম দিয়ে গল্পটা ছাপতে চাইলে রাজি হয়ে যাই। তার আগে গল্পটির প্রাথমিক খসড়া মৃতের আশ্রয় নামে কোনো একটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল সম্ভবত।
বইয়ের শেষ চারটি গল্প কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের পতন ও দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থির সময়ে রচিত। ‘জনৈক পেশাদার প্রতিবাদী’ গল্পটার পটভূমি হাসিনা-শাসনামল হলেও লিখেছি চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক লেখা ‘লুণ্ঠিত সিংহাসন’ ও ‘মৃতুঞ্জয়ী নিনাদ’ লেখার পরে। চারটি গল্প লেখার পেছনেই লেখকের ব্যক্তিজীবনের গল্প ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন তুঙ্গে উঠলে, স্বৈরাচারী শাসকরা যেমন সেই গণআন্দোলনে নিজেদের মৃত্যুঘণ্টার ধ্বনি শুনেছিল, আমিও নিজের মৃত্যুকে আসন্ন বুঝে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। এই সরল স্বীকারোক্তি শুনে অনেকে ভাবতে পারেন, পলাতক স্বৈরাচারী সরকারের দোসর বা সুবিধাভোগী ছিলাম নিশ্চয়। বিষয়টা মোটেও সে-রকম নয়।
আসলে ২রা জুলাই আকস্মিকভাবে হার্টঅ্যাটাক হয়। শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলে মৃত্যুভীতি ভালোভাবে অনুভব করি। জরুরি তলব পেয়ে ছেলে এসে আমাকে নিয়ে ছুটে যায় নিকটস্থ হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। সেখানকার ইমার্জেন্সি ইউনিট পরীক্ষা করে জরুরিভিত্তিতে হাসপাতালের আইসিসিইউতে ভর্তি করাতে বলে। ওই হাসপাতালের আইসিসিইউতে সিট ছিল না তখন। রাতেই ছুটতে হয় ল্যাবএইড হাসপাতালে। ল্যাবএইডের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞে অধ্যাপক সোহরাবুজ্জামানের চিকিৎসাধীন ছিলাম আগে থেকেই। তাঁর সুপারিশে রাতে ল্যাবএইডে সিট পেয়ে ভর্তি হই। অতঃপর প্রাণপাখিটি যেন চট করে দেহের খাঁচাছাড়া না হয়, তার জন্য শরীরে নানারকম তার বেঁধে ইলেকট্রনিক যন্ত্রে সংযুক্ত করা হয়। আইসিসিইউ’র বেডে সটান শুয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। চারদিন পর এনজিওগ্রামে চিকিৎক হৃদযন্ত্রে এমন ক্রিটিক্যাল ব্লকের সন্ধান পান, যা সারাতে প্রচলিত পদ্ধতিতে রিং পরানোর ঝুঁকি নেন না তিনি। ইব্রাহিম কর্ডিয়াক, স্কয়ার ও আরেকটি বিশেষায়িত হাসপাতালের তিন বিশেষজ্ঞ-অধ্যাপককে রেফার করেন।
ল্যাবএইব থেকে রিলিজ নিয়ে বাসায় ফিরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ও শাহবাগ এলাকায় চাকরিতে কোটাপদ্ধতি তুলে দেওয়ার দাবিতে ছাত্রদের
যে-আন্দোলনের খবর পাচ্ছিলাম, তা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে আন্দোলন শাহবাগের চৌহদ্দি থেকে রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে দেশজুড়ে বিস্তার পেতে শুরু করেছে। সুস্থ মানুষই যানবাহনবিরল বিশৃঙ্খল রাজপথে চলতে ভয় পায়। আর আমি তো সংকটাপন্ন হৃদরোগী। তারপরও অসুস্থ পিতাকে সঙ্গে নিয়ে, কখনো-বা একাই পুত্র বিভিন্ন হাসপাতাল-ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করতে থাকে। সেইসঙ্গে অপারেশনের জন্য কয়েক লাখ টাকা জোগাড়ের ধাক্কা সামলানো। অবশেষে প্রবাসী কন্যার জানাশোনা সূত্রে হার্ট ফাউন্ডেশনের পরিচিত এক পরিচালক-অধ্যাপককে পেয়ে তাঁর পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে সেখানকার দুই কার্ডিওলজিস্ট পরীক্ষা করেন। জুলাইয়ের ১৬ তারিখে আমার ক্রিটিক্যাল ব্লক সারাতে রিং পরানো হয়। অপারেশনের তিনদিন পর হার্ট ফাউন্ডেশনের আইসিসিইউর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরার পথেই আন্দোলনের উত্তাপ টের পাই। এর মধ্যে মিছিলে গোলাগুলির ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। আন্দোলন দমাতে সরকার রাস্তায় সেনাবাহিনী নামিয়ে কারফিউ জারি করে।
বাসায় ফেরার পরও এক মাস সতর্ক ও রেস্টে থাকতে হবে। একদিকে নিজের শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে রাজপথের মিছিল-আন্দোলনের প্রতি রক্তের টানে উত্তেজিত-উদ্বিগ্ন হওয়ার আশঙ্কা। শুয়েবসে টিভি দেখি, ইন্টারনেট ঘেঁটে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও পরিণতি বোঝার চেষ্টা করি। বড় আন্দোলন-অভ্যুত্থানে শরিক হওয়ার স্মৃতিগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে। একাত্তরে শেখ মুজিবের বজ্রকণ্ঠে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ – ডাক শুনেই তো ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী সাহস নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের স্বৈরাচারী এরশাদকে গদি ছাড়ার আন্দোলনেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত থেকে প্রত্যক্ষ করেছি অভ্যুত্থান। আমার কর্মস্থল প্রথমদিকে পল্টনে ও পরে গুলিস্তানের কেন্দ্রস্থল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ছিল। ফলে ওই এলাকায় রাজনৈতিক আন্দোলন-সমাবেশ দেখাটা নেশায় পরিণত হয়েছিল যেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনরত সকল
দল-সংগঠনের সঙ্গে দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্নটাও জোরালো ছিল। এরপরও সরকারবিরোধী ডান-বাম বহু রাজনৈতিক জোট ও দলের আন্দোলন-সমাবেশ-মিছিল দেখেছি।
কল্পিত মুক্তিযোদ্ধা নয়, সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা আকবরের গল্প আমার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্প সংকলন অপারেশন জয়বাংলায় আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শুধু আকবর নয়, বহু মুক্তিযোদ্ধাই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছেন। হাসিনা সরকারের কট্টর সমালোচক, পরিচিত কিছু বাম বুদ্ধিজীবীকে স্বৈরাচারী সরকার পতনে বেশ উৎফুল্ল হতে দেখেছি। হাসিনার শাসনামলেও তাঁদের কলম ও বচন বেশ প্রতিবাদী ছিল। কিন্তু চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরও যে এসব প্রতিবাদীকে নতুন ক্ষমতাসীনদের সেবক হয়ে তাদের কোলে বসতে হবে, অথবা জনগণের পক্ষে পেশাদার প্রতিবাদীর ভূমিকা বজায় রাখাই হবে নিয়তি। এমত ধারণা থেকে জনবিচ্ছিন্ন কিছু বুদ্ধিজীবীর ছায়া নিয়ে লিখেছি ‘প্রফেসর কলিমুল্লার’ গল্পটা। এ-গল্পে কেউ যদি লেখকের ছায়াও খুঁজে পান, আপত্তি করার কিছু নেই। বইয়ের শেষ গল্প ‘শখের বাগানে সাপ’ সম্পর্কে শুরুতেই বলেছি।
এই গল্পের নায়কের সঙ্গেই বরং লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল বেশি। শেখ হাসিনা যেমন পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন, তেমনি পালিয়ে আত্মরক্ষার অভিজ্ঞতা নিজের জীবনেও একাধিকবার হয়েছে।
বইয়ের আটটি গল্প লেখার পেছনে লেখকের যে-উদ্দেশ্য, দেশকালের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিজীবনের সত্যি গল্প বলা হলো, তাতে অন্য সব গল্পেই লেখকের মিলেমিশে থাকার ধরনটা পাঠক ধরতে পারবেন আশা করি। এখন গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক শেষ চারটি গল্পের প্রকাশ নিয়ে শেষ বয়সেও যে ব্যর্থ লেখকের অভিজ্ঞতা, তা অনেকটা নবীন হবু লেখকের অভিজ্ঞতার মতোই। নবীন গল্পকার হিসেবে বিভিন্ন পত্রিকায় একের পর এক অমনোনীত হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আজ পরিণত বয়সে লেখক হিসেবে কিছুটা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। যেহেতু দায়বোধ থেকে তাড়িত হয়ে লিখেছি অস্থির সময়ের গল্প কয়েকটি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই প্রকাশের জন্য প্রিন্ট ও অনলাইন কয়েকটি পত্রিকার চেনা সম্পাদকের কাছে পাঠিয়েছি। কেউ ছাপেননি। কেন ছাপেননি, সঠিক কারণ তাঁরাই ভালো জানেন। এরপর গল্পগুলির ই-কপি পিডিএফ ফরম্যাটে হোয়াটসঅ্যাপে কয়েক পাঠক-বন্ধুকে পড়িয়ে তাদের মতামত চেয়েছি। কেউ দু-একটা পড়ে ভালো, সাহসী কাজ বলেছেন। কেউবা পড়ার সময় পাননি। এক বোদ্ধা পাঠক তাঁর ভালো না লাগার কারণ বোঝাতেই সম্ভবত, রাজনীতি নিয়ে সরাসরি লেখার বিপদ ও শৈল্পিক ত্রুটির দিক সম্পর্কে সতর্ক করে রূপকের আশ্রয়ে লেখার পরামর্শ দিয়েছেন।
লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছার পর তা গ্রহণ-বর্জনের স্বাধীনতা পাঠকের। এখানে লেখকের বলার কিছু থাকে না। জোর করে কাউকে ভালো লাগানো সম্ভব নয়। তবে পতিত স্বৈরাচারের প্রতি পক্ষপাত ও সরাসরি লেখার বিপদ সম্পর্কে দুই পাঠকের প্রতিক্রিয়া শুনে যে জবাব মনে এসেছিল, তা
এ-লেখার পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। যারা মার খায়, তাদের প্রতি এ-লেখকের সহানুভূতি বোধহয় সহজাত। একাত্তরে উর্দুভাষী বিহারি ও রাজাকারকে মারতে দেখেও মানবিক দরদ-সহানুভূতি উথলে উঠেছিল। ক্ষমতা থাকলে নিশ্চয় ক্ষমা করে দিতাম। স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্টকে নিয়ে বরপুত্র উপন্যাস, বিপ্লবী রাজনীতি নিয়ে দাঁড়াবার জায়গা উপন্যাস অনেক আগেই লিখেছি। যুদ্ধে বা ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতিতে একপক্ষ জেতে, আরেকপক্ষ হারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের লাভ হয় কতটুকু? জুলাই অভ্যুত্থানের ফসল খেটে খাওয়া মানুষ ভ্যানচালক হেম্মতের ঘরে পৌঁছানোর জন্য তার
মাথায় লুণ্ঠিত সিংহাসনটি তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু হেম্মতকে যে এভাবে জীবন দিতে হলো, এটাকে যদি পাঠক গল্পের দুর্বলতা ভাবেন, এই সময়ে মব-ভায়োলেন্সে অনেকের মৃত্যুর ঘটনা মিথ্যা বলা যাবে না।
মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি দুর্বলতার কারণ নিজের রাজনীতিবাতিক ব্যাখ্যায় আগেই বলেছি। তাছাড়া বত্রিশ নম্বরে শেখ মুজিবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িভাঙার বিষয়টি গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক গল্পগুলিতে ঘুরেফিরে আসার পেছনে ব্যক্তিগত একটা তুচ্ছ কারণও আছে সম্ভবত। একসময় বত্রিশের উল্টোদিকে কলাবাগানের ডলফিন গলিতে টানা পনেরো বছর ভাড়া-বাসায় থেকেছি। রোজ বিকেলে বত্রিশ নম্বরে শেখ মুজিবের স্মৃতিবেদির কাছেই লেকের ধারের ফুটপাত ছিল আমার ড্রয়িংরুম। এখানে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে কত বন্ধু-শুভার্থীর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। অনেককেই দেখা করার জন্য ঠিকানা দিতাম বত্রিশ নম্বর। কাজেই নিজের এমন দামি বৈঠকখানা নষ্ট হলে কষ্ট ও প্রতিবাদী চেতনা তো জাগতেই পারে।
পত্রিকাগুলি প্রকাশ না করায় পিডিএফ ই-কপি আমার প্রকাশক সুহৃদ আবু এম. ইউসুফকেও পড়াতে চাইলাম। তিনি মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের লোক। বাংলাবাজারের অন্য পেশাদার ব্যবসায়ী-প্রকাশকদের মতো নন। শখের বশে অনুপ্রাণন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে তরুণ লেখকদের বই প্রকাশ করে তাঁদের অনুপ্রাণিত করে থাকেন। আমার মতো বয়স্ক তরুণের চারটি গল্পগ্রন্থ করে অগ্রিম রয়্যালটি দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁকে অভ্যুত্থানবিষয়ক গল্পগুলি পড়াতে চাইলে তিনি পাণ্ডুলিপি আকারে পড়তে চাইলেন। আগের প্রকাশিত ও অগ্রন্থিত চারটি গল্পসহ
পত্র-পত্রিকা অমনোনীত অভ্যুত্থানের গল্পগুলি দিয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে পাঠালাম। পড়ে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সিদ্ধান্ত জানালেন, বইটি প্রকাশ করবেন, আগের মতো অগ্রিম কিছু রয়্যালটিও দেবেন। উৎসাহিত হলাম। মরার আগে হয়তো শেষ বইটি দেখে যেতে পারব। বইটি
প্রকাশনা-প্রক্রিয়ার মাঝে ছাব্বিশের জানুয়ারিতে ‘লুণ্ঠিত সিংহাসন’ প্রকাশ করেন ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্তের সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। মাস ছয়েক আগে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলাম গল্পটি। পরে পরিমার্জনার কাজ করে বইয়ে দিয়েছি। বইটি প্রকাশ পাওয়ার আগে পত্র-পত্রিকাগুলিতে যথারীতি এ-বছরের ঈদসংখ্যা প্রকাশের আয়োজন শুরু হয়। ঈদসংখ্যা আমার পেশাদার লেখক হওয়ার লক্ষ্যকে কীভাবে প্রভাবিত এবং প্রতারিতও করেছে। ঈদসংখ্যায় তড়িঘড়ি করে ছোট উপন্যাস লিখে বিষয়বাসনা বিসর্জন দিয়েছি। এবারে ঈদসংখ্যাগুলি লেখা চাইলে অভ্যুত্থানবিষয়ক বড় ও ছোট গল্প চারটির কথা বললাম। ‘লুণ্ঠিত সিংহাসন’ যুগান্তরের প্রীতিভাজন সম্পদক ও সাহিত্যসম্পাদক উপন্যাস আকারে ছেপেছেন। ‘পেশাদার প্রতিবাদী’কে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রীতিভাজন সম্পাদক ও সাহিত্য সম্পাদক বড় গল্প হিসেবে ছেপেছেন। কিন্তু নাম গল্পটিসহ ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নিনাদ’ দুটি ঈদসংখ্যা শেষ মুহূর্তে ছাপেনি। এতে লেখক কিছু অর্থপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলেও বইটির মর্যাদা বেড়েছে। কারণ আগ্রহী পাঠক সরাসরি এ-বই থেকেই পড়বেন গল্প দুটি।
ব্যর্থ লেখকের আত্মপ্রচার কিংবা খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হলো কি না জানি না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য এরই মধ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধানমন্ত্রীর গণভবনকে সরকার জাদুঘর করেছে। পত্র-পত্রিকায় ও ফেসবুকেরও লেখক-বুদ্ধিজীবীরা বিস্তর মূল্যায়ন-প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেমন হয়েছে, এই গণঅভ্যুত্থান নিয়েও নিশ্চয় বিস্তর বই প্রকাশিত হবে। আমিও ঘটনার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে, সময় ও সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে লিখেছি শখের বাগানে সাপের গল্পগুলি। জুলাই অভ্যুত্থানের শৈল্পিক দলিল হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি ব্যর্থ জঞ্জাল হিসেবে পরিগণিত হবে – এ-রায় দেওয়ার দায়িত্ব এখন সমকালের এবং আগামী দিনে বোদ্ধা পাঠক-সমালোচকের। হৃদযন্ত্রে অন্তিম অ্যাটাকটি ঘটার আগে, অতৃপ্তির বোধ থেকে বরং ব্যর্থ লেখকের অপবাদ ঘোচাতে মাস্টারপিস উপন্যাসটি নিয়ে আত্মমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করাটাই উত্তম।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.