আমার বাড়ি

অথৈ আবেগ মানেই তো প্রেম।

আর সেই অদম্য-অসহ্য আবেগ যদি পরিণয়ে পরিণতি পায়, তখন শুরুতে আতশবাজির ফুলঝুরি হয়ে আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করবে, তা-ই স্বাভাবিক!

কোনো অঙ্ক কষা নয়, কোনো দরদাম নয়। যত পারো হাওয়ায় উড়ে বেড়াও। হাওয়ার তোড়ে কেবলি নেচে বেড়ায় মন, ঠোঁটে প্রেমের শাস্ত্রীয় বোল, তা-থৈ তা-থৈ, তা-তা থৈ-থৈ।

নীলা বসাক তখন ঢাকার মেয়ে। জন্মকর্ম সব পুরনো ঢাকার তাঁতিবাজারে। লেখাপড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়-

পরিজনের বেশিরভাগ বাস করেন পুরনো ঢাকার আশেপাশে। সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, ঢালকা নগর, ফরিদাবাদ, বাংলাবাজার এলাকা জুড়ে। লেখাপড়ার পর ব্যাংকের যে-চাকরিটা সে করছে এখন, পদোন্নতি পেয়ে চার বছরে যে কি না এখন সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, সেটার ঠিকানাও রাস্তার ওপারে, বংশাল ব্রাঞ্চে।

তবু সহকর্মী জয়ন্তর জন্য সব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত সে। পুরাতন গানের কলির মতো এক কথা – গাছতলাও চলবে, তবু প্রেমের মর্মর পাথরের তাজমহল গড়তেই হবে। কালের কপোলতলের এক ফোঁটা স্ফটিক-স্বচ্ছ শিশিরবিন্দুর মতো এ-প্রেম। গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন দিয়ে একে বাঁচাতে হবে। নইলে কিসের কী?

জয়ন্ত গ্রামের ছেলে। প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে সে এ-পর্যন্ত উঠে এসেছে। ওর কাকা-জেঠার পরিবারের ভেতর সে-ই ব্যাংকের চাকুরে। অন্যরা এলাকার বাজারে মুদিদোকান আর ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিয়ে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে জয়ন্ত এখনো গ্রামেই স্বস্তি খুঁজে পায়। টাটকা শাকসবজি, মাছ আর মায়ের হাতের রান্নার ভেতর সে জীবনের একমাত্র পরমানন্দের আস্বাদ পায়।

জয়ন্তর মুখে নীলা যত গ্রামের বাড়ির প্রশংসা শোনে, তত সে আপ্লুত হয়ে পড়ে। চোখে ভাসে ছায়াসুনিবিড় গ্রামের মানুষের সারল্য আর শিশুর মুখের মতো তাজা ও প্রাণময় প্রকৃতি। এর ছোঁয়া পেতে নীলা মরিয়া। শহুরে পিঁপড়ের জীবন নিয়ে সে অতিষ্ঠ; দমবন্ধ বৈচিত্র্যহীনতায় প্রাণ ওর ওষ্ঠাগত!

উইপোকার মতো এসব মানুষের জীবন ও পরিবেশ আজকাল বড় অসহ্য লাগে নীলার। বস্তাপচা জীবন ছেড়ে গ্যালন-গ্যালন অমলিন অক্সিজেন গিলতে চায় মন; বাঁচতে হলে নদীর পাড়ে বাবুই হয়ে থাকতে হবে। হাওয়ায় দুলবে শরীর, সেইসঙ্গে মন।  

নীলা ফিসফিস করে জয়ন্তকে বলে, ‘বিয়ের পর আমি গ্রামে গিয়েই থাকবো জান।’

‘চাকরি?’

‘ট্রান্সফার নিয়ে মুন্সীগঞ্জ চলে যাবো প্রাণনাথ। কোনো অসুবিধা হবে না।’

ব্যস, কদিনের ভেতর বিয়েটা ধুমধামের সঙ্গে সম্পন্ন হয়ে গেল। একমাত্র কন্যার স্বপ্ন সাজাতে গিয়ে লাখ দশেক খসে গেল ওর স্বর্ণকার বাবা মাধব বসাকের। অবিবেচক বরপক্ষের বরযাত্রীর সংখ্যা আড়াইশো হওয়ায় কিঞ্চিৎ হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। তবু ঢাকায় ওদের যত পরিচিত মানুষজন, সবাইকে মাধব বসাক ঢোল বাজিয়ে বলে দিয়েছেন, চলে এসো। এমন মাগনা সুস্বাদু খাওয়ার সুযোগ জীবনে আর পাবে না। চলে এসো।

মেয়ের ইচ্ছানুযায়ী কমিউনিটি সেন্টারের ডেকোরেশনেই চলে গেছে দেড় লাখ টাকা। হাসতে হাসতে ব্যাংক থেকে কষ্টের টাকা তিনি তুলেছেন আর যজ্ঞের ঘি’র মতো ঢেলে দিয়েছেন বিয়েতে। স্ত্রী সুতপা মিনমিন করে প্রতিবাদ করলেও কে শোনে কার কথা। মেয়ের আনন্দে মাতোয়ারা তখন বাবা মাধব। আত্মীয়-পরিজনে মুখর তাঁতিবাজারের তিনতলা বাড়িটি। সবাইকে পনেরো দিন ধরে নিজের কাছে রেখে বিদায়বেলায় জনে জনে দামি উপহার দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, মধ্যবিত্ত বাঙালির জন্য বিয়েটা আসলেই আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর অপচয়ে ভরা এক জমকালো উৎসব।

শেষ পর্যন্ত বিয়ের পর নীলা বসাক চলে গেল মুন্সীগঞ্জের এক পাড়াগাঁয়ে। যাওয়ার সময় অশ্রুসজল মা সুতপা বসাক মেয়েকে কাতর গলায় বললেন, ‘তুই কি ওখানে পারবি থাকতে, মা?’

‘সবাইকে যা পারতে হয়, আমিও তাই করছি।’ বলে তীব্রভাবে তাকাল মায়ের দিকে। বিরক্ত ক্ষুব্ধ সেই চাউনি। মা হয়েও কুঁচকে গেলেন সুতপা। কোনো কথা আর বলতে পারলেন না!

দুই

নীলা আর জয়ন্ত ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেল মুন্সীগঞ্জের শ^শুরবাড়িতে। শহর থেকে সামান্য দূরে নীলার শ্বশুরবাড়ি। টেম্পো-বাসে করে শহরে আসতে হয়। সময় লাগে

ঘণ্টাখানেক।

বাড়ির চারপাশে সকাল-সন্ধ্যা গাঙের সোঁ-সোঁ বাতাসের স্পর্শ। ইলেকট্রিক ফ্যানের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁতিবাজারের গুমোট পরিবেশ আর দুর্গন্ধ এখানে নেই। ভ্যাপসা গরম তো নয়ই। যেদিকে চোখ যায় শুধু গাঙের তীরঘেঁষা ধু-ধু ক্ষেত আর সবুজ গাছগাছালির সারি। পাখিরা উড়ে এসে গান ধরে উঠোনে। নেচে বেড়ায় মনের আনন্দে আর ঠোঁট দিয়ে খুঁটে বের করে নেয় খাবার। তাঁতিবাজারের ঘুপচি-গলির ভেতর এরকম দৃশ্য কোথায় পাবে নীলা?

শ^শুরবাড়ির পুকুরে জাল ফেললে মাছ ধরা পড়ে যখন-তখন। বাড়িতে আত্মীয়-পরিজনের পা পড়লে বাপ-ছেলের কেউ না কেউ নেমে পড়ে জলে। মলা-বাতাসি যে লাফায় খলুইর ভেতর। পুঁইমাচায় সাপের ফণার মতো পুষ্ট লতা, বাতাসে হলহল করা ডাঁটার মাথা, মরিচের বিন্দু-বিন্দু সাদা ফুল, ধনেপাতার ঘন-সবুজ ক্ষেত, মাচায় মানবশিশুর মাথার মতো ঝুলে থাকা লাউ-কুমড়ো – সব এই বাড়ির আঙিনায় হাত বাড়ালেই মেলে! সবকিছু জীবনে প্রথম ওর!

সবার ওপর গাঙের বাতাস। প্রচণ্ড দাবদাহে যদি তা সহসা থমকে পড়ে তখন হাঁসফাঁস গরমে কেউ এসি কিংবা ফ্যানের জন্য কাঁদে না। কাঁঠালগাছের নিচে দিব্যি শীতলপাটি ছড়িয়ে হাত দিয়ে তালপাখা ঘুরাতে ঘুরাতে নাক ডেকে সুখের ঘুম ঘুমিয়ে নেয়। খুব ঘেমে গেলে কাঁধের গামছা দিয়ে মুখ-গলা খানিকটা মুছে নিয়ে ফের নেতিয়ে পড়ে গভীর ঘুমে। ঘুমানো যে অত সহজ তা নীলা ওর শ্বশুরবাড়ি এসে টের পেল। প্রচণ্ড পরিশ্রম, অনাড়ম্বর খাওয়া-দাওয়া আর ঘুম যেন একজন আরেকজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু! কাউকে ছাড়া কেউ বাঁচে না।

বাতাস যে এমন দিলদরিয়া আর মায়াবি হয় তা এখানে না এলে কোনোদিন সে বুঝতে পারত না।

কোনোদিন নয়।

তিন

জীবন কি শুধুই রোমান্টিক আবেশে ভরা প্রকৃতির ছোঁয়া?

তা যে নয়, নীলা হাড়ে হাড়ে তা বুঝতে পারছে। চারপাশের সময় বড় নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে দিন দিন।

জয়ন্ত আর নীলা অফিস ধরতে প্রতিদিন টেম্পো করে মুন্সিগঞ্জ শহরে যায়। ঘণ্টাখানেক লাগে। চাকরির ধকল সহ্য করে ঘরে ফেরার পর ক্লান্ত নীলার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে বড়। কিন্তু অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়ি চোখের সামনে অবিরাম-অবিরল কোঁকাতে থাকেন তখন। এটা-ওটা খাওয়ার আব্দার জানান। কখনো ‘অ বউমা , হালুয়া-লুচি করবানি একটু? অনেকদিন যে খাই না। স্বাদটাই ভুইলা গেছি বউমা।’ কিংবা ‘মালপোয়া করো না কয়টা? তুমার শ^শুরের বড় প্রিয় জিনিস। করো না দুইডা?’ অগত্যা কিচেনে গিয়ে ওদের জন্য নাশতা তৈরি করতে হয় নীলার। নুডলস, পাকোড়া এসব বানিয়ে মুখে হাসি ফোটাতে হয় সবার। নইলে জয়ন্তের মুখটাও আমসি হয়ে যায়।

শুধু কি তাই? পরিবারটির নানারকম বাতিক আর গোঁড়ামির কথা কাকে শোনাবে নীলা? শীত-গ্রীষ্ম যে কোনো সময়ে টয়লেটে গেলে স্নান সেরে ঘরে পা রাখতে হয়। কথায় কথায় মাথায় কাপড় দেওয়া লাগে। তাছাড়া স্বামীর অযাচিত সংগোপন ইচ্ছার পাগলামো তো আছেই। সব সামলে একসময় নীলা অনুভব করে, সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, ওর নিজের বলে কিছু অবশিষ্ট নই। চেকবইটার দায়িত্বভারও জয়ন্তর হাতে। নিজের আন্ডারগার্মেন্টসের রং কী হবে তাও জয়ন্ত পছন্দ করে দেয়। পুতুলের মতো নীলার কেবল হ্যাঁ বলাই কাজ। মুখের ওপর কখনো যে ‘না’ বলা সম্ভব তা সে ভুলেই গেছে। প্রথমদিকে গাঙের শীতল বাতাস যতই ভালো লাগুক, যত দিন যাচ্ছে তত নিঃস্বার্থ পরোপকারী নির্মল বাতাসও পর মনে হয় নিজের কাছে। মাঝে মাঝে পাশের বাসার হাসিমুখের কুচুটে বউটির মতো লাগে।

এরকম একঘেয়ে বিপর্যস্ত মানসিকতা থেকে মুক্তি পেতে কদিনের জন্য নীলা বাপের বাড়ি আসে বেড়াতে। প্রথমবার নীলা আবিষ্কার করে, এখানকার সবকিছু ওর বড় আপন। চিরচেনা কোলাহল, প্রতিবেশীর পরিচিত মুখ, ঘুপচি অন্ধকার আর রাস্তায় স্তূপীকৃত দুর্গন্ধকেও নিজের বলে মনে হয়। আপন অস্তিত্বের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে সব। জন্ম থেকে ওর যত আনন্দ, ভালোবাসা আর অহমিকা সব এগুলো ঘিরে। কিছুতেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

 মায়ের সঙ্গে মেয়ের হাজার কথা। চুলের জট ছাড়াতে মেয়ের মাথায় তেল মেখে মা-মেয়ের এসব অন্তরঙ্গ কথার শুরু। কোনো সেন্সরশিপ নেই। যা মুখে আসছে তাই বলছে। হাসছে তো পরক্ষণে চোপার ঝড় বইছে দুজনার ভেতর। সব মিলিয়ে এ যেন শ^শুরবাড়ির গাঙের বাতাসের অন্য এক রূপ। প্রাণবন্ত আর আনন্দদায়ক এক অভিজ্ঞতা। এদ্দিন বুঝতে পারেনি, এখন খুব বুঝছে।

একদিন সুতপা আচমকা মেয়েকে বলে উঠলেন, ‘এতদিন ধরে চাকরি করছিস, একটা বাড়ি কর মা। নিজের নামে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফ্যাল। চাকরির মতন বাড়িটাও বড় জরুরি মেয়েদের জন্য। পরে বুঝবি।’

নীলা ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলার সময় ওর মাকে বড় বিষণ্ন মনে হলো। নীলার সব উচ্ছলতা লোডশেডিংয়ের মতো ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়ে। নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে সে।

ইদানীং জয়ন্তর আচরণও বেশ পাল্টাতে শুরু করেছে। আগের মতো কথায় কথায় আদর ঝরে না। তীব্র পুরুষালি মেজাজ, মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে, ওর মায়ের কথায় ‘কথা তো নয়, য্যান বিষমাখানো তীর।’

দুজন একই সঙ্গে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এলেও ঘরে ঢোকার আগেই কর্কশ গলায় জয়ন্ত বলে উঠবে, ‘চা বসাও তো। মাথা ধরেছে।’

অগত্যা তড়িঘড়ি অফিসের শাড়ি শরীরে জড়িয়ে নীলাকে কিচেনে ঢুকে একটার পর একটা কাজ সম্পন্ন করতে হয়। ওদের আবার কাজের লোক রাখার রীতি নেই। কাজের মেয়েরা নোংরা হয়, নিচু জাতের হয়, তা-ই। চেষ্টা করেও নীলা তা ভাঙতে পারেনি।

জীবনটাও বিনোদনহীন, কোথাও বেড়ানোর কোনো প্ল্যান নেই জয়ন্তর। বললেই সতীনের মতো মা-বাবার রুগ্ণ স্বাস্থ্য এসে পড়ে মাঝখানে। অপরাধবোধ মুখ চেপে ধরে সঙ্গে সঙ্গে নীলার। কথা আর এগোয় না।

ইদানীং প্রায়ই নীলার অফিস কামাই লেগে থাকে। কোনো ছুতো পেলেই জয়ন্তর বাঁধা বাণী, ‘থেকে যাও। মায়ের শরীরটা তো ভালো নেই আজ। আমি তোমার স্যারকে বলে দেব।’

এভাবে একের পর এক নীলার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চাইছে জয়ন্ত। মাধ্যমিক পাশ স্ত্রীর সঙ্গে যেরকম আচরণ হওয়া উচিত, নীলার মনে হচ্ছে সে তাই পাচ্ছে স্বামীর কাছে। ওর মতো পেশাজীবী স্বাবলম্বী স্ত্রীর কোনো সম্মান নেই সংসারে। বরং যখন-তখন ওকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারলে যেন জয়ন্ত ও তার পরিবার খুশি। ওদের ছেলেই গুণে ও কর্মে উৎকৃষ্ট; আর কেউ তুলনীয় নয়। এমনকি, একই কাজ ও রোজগার করেও যে নীলা নামের মেয়েটি ক্লান্ত হতে পারে, সামান্য বিনোদন ওর জীবনেও বিশ্রাম হিসেবে প্রয়োজন, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবে না। হয়তো ভাবতেই চায় না। ঘরের বউর আবার বিশ্রাম কি?

এ সময় বড় মনে পড়ে যায় মাকে। সুযোগ পেলেই মা ওকে বলতেন, ‘একটা বাড়ি কর নিজের নামে। এইডা বেচবি না। বাড়িডার নাম হইব নীলা কুটির।’ বলতে বলতে এসএসসি পাশ মা বুঁদ হয়ে ডুব দেন নিজের ভেতর। যেন নিজের স্বপ্নগুলো বাড়ির সঙ্গে চোখের সামনে সাকার হতে দেখছেন। হয়তো ভাবছেন, লেখাপড়া শিখে চাকরি করতে পারলে তো নিজের নামে একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখতে পারতেন সুতপা!

নীলা রোজগেরে মেয়ে। সুতপার মতো আয়-রোজগারহীন বেকার নয়। তাহলে কেন নিজের নামে নিজের জন্য একটি ঠিকানা তৈরি করছে না মেয়েটা?

পুরুষের মতো নিজের নামে একটা বাড়ি থাকলে কী এমন ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে?

চার

নীলার ঘুম ভাঙতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা ও অধিকারটুকু নিজের ভেতর গেড়ে বসে।

মাঝরাতে নাকডাকা জয়ন্তর ঘুম ভাঙিয়ে ঘুমহীন উতলা নীলা জানাল, ‘আমি একটা বাড়ি করতে চাই জয়। অনেকদিনের ইচ্ছে আমার। কি বলো?’

গভীর ঘুম জয়ন্তর। এজন্য ওর কখনো কসরত করতে হয় না। বালিশে মাথা রাখতেই মরফিন ইনজেকশন নেওয়ার মতো ওর আর জ্ঞান থাকে না। যত ঘুম তত তকতকে ঝরঝরে শরীর আর মন। নিবিড় এ-ঘুম সামান্য বাধাগ্রস্ত হলেও জয়ন্ত বিরক্ত হয়। মাঝে মাঝে মেজাজ হারিয়ে অস্থির হয়ে ওঠে।

এরকমই নিñিদ্র-নিবিড় এক ঘুম, কাচের গ্লাসের মতো স্ত্রীর ডাকে আচমকা ভেঙে পড়ায় সে প্রথমে কিছুটা হতভম্ব ও বিস্মিত হয়ে পড়ে। ফ্যালফ্যাল করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর মুখের দিকে। ক্ষুব্ধ নাকি বিরক্ত হবে, তা সে বুঝতে পারছে না। শুধু নীলার অর্থহীন কথাগুলো কানে ঢুকে তালগোল পাকাতে শুরু করে মাথার ভেতর।

জয়ন্ত স্পষ্ট বুঝতে পারছে, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে স্ত্রীর মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। একটু বাদে নীলার দিকে তাক করা ওর ভাবলেশহীন দৃষ্টি ভাষা পায়; সহসা মুখ ভেংচে বলে উঠল, ‘কী শুরু করছো অত রাইতে? বাড়ি তো আছেই। এইডা বাড়ি না?’ কথার মাঝখানে আঙুল দিয়ে মাথার চারদিকে চরকি কাটে, কণ্ঠে উত্তেজনা, ‘আবার বাড়ি কিসের? বাড়ি দিয়া কি পানি খাইবা?’

‘না, পানি খাবো না। ওটা হবে আমার বাড়ি। বাড়ির নাম রাখব নীলা লজ। তুমি খালি জমি খুঁজতে শুরু করো মুন্সীগঞ্জ শহরে। নিজের নামে আমি কিনব সেই জমি।’

‘বাথরুমে গিয়া মাথায় জল দিয়া আসো। মাথার নাটবোল্ট সব পড়ে গেছে। মিস্ত্রি দরকার।’

নীলা আর কথা বাড়াল না। পরদিন অফিসে গিয়ে সবার আগে লোন সেকশনের ইনচার্জের সামনে গিয়ে বসে পড়ল। নানা কথার ভেতর সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, সামান্য সরল সুদে বাড়ির লোন পাওয়ার যোগ্য সে। সেই টাকায় ফ্ল্যাটও কেনা যায়।

স্বামীকে বিষয়টি জানাল। কথা শুনে জয়ন্ত হাসতে হাসতে সোফা থেকে পড়ে যাবে, এমন এক অবস্থা। হাসি থামার পর সে উত্তর দিলো, ‘আমার বাবা তো সব দিয়ে দেবে তোমায়। আমাদের যা সম্পত্তি সব তো তোমারই। বিশ কাঠা ধানের জমি আর মাছ ধরা পুকুর – সব তো তোমারই। আমাকে নয়, তোমাকেই দিয়ে দিবে। আমি বাপের একমাত্র ছেলে না? অথচ তুমি ফালতু ঠাঁট দেখাতে গিয়ে বাড়ি কিনতে চাইছো?

হো-হো-হো।’

‘তোমার মাকে তোমার বাবা কি কোনো সম্পত্তি লিখে দিয়েছে? তোমার মাকে উদয়াস্ত কাজে একটুখানি হেল্প করার জন্য একটা ছুটা বুয়ার ব্যবস্থাও তো করে দেয় নাই?

তাহলে?’

নিমেষে জয়ন্তর হাসি থেমে গেল। হাঁ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। নীলা যে তলে তলে এতখানি স্বার্থান্ধ হয়ে পড়ছে তা সে ভাবতেই পারেনি। এখন বাচ্চাকাচ্চার বিষয়ে নিজেদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। আর এসময়ে নিজের নামে বাড়ি করতে চাইছে ওর স্ত্রী?

এসব কুমন্ত্রণা ওর কানে দিচ্ছে কে? ওর মা? ওর মা’টাকেই জয়ন্তর বড় জটিল লাগে। মহিলার চাউনিটা যেন কেমন সন্দেহের বিষে ভরা। তাকানো যায় না বেশিক্ষণ। এ-মহিলাটাই কি নাটের গোড়া? ভাবতে ভাবতে সময় কাটে জয়ন্তর। একদিন তর্কাতর্কির মুহূর্তে জয়ন্ত চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, ‘জানি, জানি। এসব কুবুদ্ধি কে জোগায় তোমায়, সব জানি।’

‘কী বলতে চাও তুমি? আমি একটা ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার। আমার মাথায় কে বুদ্ধি দেবে? কী বলতে চাও?’

‘সব নষ্টের গোড়া তোমার মা। নোয়াখালীর মাইয়া না? নিজের জীবনে সুখ নাই। অহন মাইয়ার সংসারটা বিনাশ করতে চাইছে। ভালা অইয়া যাও। মাইয়া মাইনষের আবার কিয়ের বাড়ি? স্বামীর বাড়ি তার বাড়ি। তুমি কি আরেকটা বিয়া বইবা?’

নীলা থ হয়ে রইল স্বামীর কথা শুনে। জয়ন্তর মা-বাবা সামনেই দাঁড়ানো। একটা শব্দও ওঁদের কেউ বউমার পক্ষে উচ্চারণ করেননি। বরং মুচকি হাসতে লাগলেন।

পরদিন অফিসে গিয়ে প্রথমেই একটি লোন অ্যাপ্লিকেশন পূরণ করে নীলা জমা দিয়ে দিলো ইনচার্জের কাছে। কাতর কণ্ঠে জানাল, ‘লোনটা আমার খুব দরকার স্যার। তাড়াতাড়ি করবেন।’

‘আপনার হাজবেন্ড জানেন?’

‘না।’ কথা শুনে বসও অবাক হয়ে গেলেন। কোনো প্রশ্ন না করলেও পুরুষ হিসেবে তিনিও যে আহত হয়েছেন তা ভেসে উঠল তার চেহারায়। নীলা ঠিকই বুঝতে পারল।

যেদিন ওর দরখাস্তটি অনুমোদন পেল সেদিন সে ওর মাকে টেলিফোন করে জানাল, ‘আমি একটি বাড়ি করব নিজের নামে। লোনটা আমার স্যাংশন হয়ে গেছে, মা।’

ওপাশে কোনো কথা নেই। শুধু কান্নার শব্দ কানে এলো নীলার। অনেক্ষণ পর ওর মা অর্থাৎ মাধব বসাকের স্ত্রী সুতপা উত্তর দিলেন, ‘আমার কোনো বাড়ি নেই রে মা। তোর বাড়িতে থাকতে দিবি?’

এবার নীলা আর ঠিক থাকতে পারে না। নিজের অজান্তে জল গড়ায় চিবুক বেয়ে।