সুজানের সঙ্গে প্রথম ডেট

প্রথম ডেটে সুজানকে চুমু দেবো কি না সেই ভাবনা আমাকে পেয়ে বসে অনেকটা সময়। এমন নয় যে, আমরা ইতোমধ্যে একসঙ্গে কোথাও বসিনি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ক্যাফেতে কিংবা অক্সফোর্ড স্ট্রিটে ওর প্রিয় কফিশপে আমরা চা-কফি খেয়েছি একত্রে। প্রথমবারের অভিজ্ঞতাটা সত্যি মজারই বলতে হবে। ফ্রেঞ্চ ক্যাফে নাম দেখে আমরা এগিয়ে গিয়ে দারোয়ানের কাছে জানতে চাই ভালো বিনের কফি পাওয়া যাবে কি না। আমাদের অবাক করে দিয়ে সম্ভবত আলজেরীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি লোকটা বলতে থাকে : পাজংলে সিলভু প্লে! অবাক হওয়ারই কথা। ইংল্যান্ডের সীমানায় একটা ছোট্ট ফরাসি ক্যাফেতে ঢুকবার এমন শর্ত দেখে কে না অবাক হবে। লোকটার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে একই সঙ্গে সুজানকে অবাক করে দিয়ে আমি বলি : নু ভুলোঁ প্রঁদঘ আঁ কাফে! মেঘ সরিয়ে দুম করে রোদ এসে পড়ার মতো লোকটার স্মিত মুখ প্রসন্নতায় ঝকঝকে। কফিশপে আমরা তো কফিই খাবো; কিন্তু সেটা আমার মতো বাদামি চামড়ার কারো মুখে শুনতে পারাটা জাতীয়তাবাদী লোকটাকে খানিক উদ্বেল করে হয়তোবা। অবাক সুজানও। আমার ফরাসি জ্ঞানের কথা তার অজানা। ফরাসিতে সেও চোস্ত। ও-লেভেলে ইংরেজি ছাড়াও তার বিষয় ছিল ফরাসি ও জার্মান ভাষা। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী সুজানের জন্য এসবই ছিল সম্পদবিশেষ। মজা করে লোকটার সামনেই সে হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে বলে : ভু পুভে পাঘলে ফ্রঁসে! বস্তুত বিনয় নয়, আমার ফরাসি জ্ঞানটা কেবল দৈনন্দিন কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়ার মতো, সেটা স্বীকার করতে অন্তত সুজানের সঙ্গে আমার অভিনয় করতে হয় না। যদিও বোদলেয়ারের লে ফ্ল্যুর দ্যু মাল মূল ভাষায় পড়ার জন্যই আমার ফরাসি শেখা।

তবে এটাই ওর সঙ্গে প্রথম ডেট কি না সেটাও একটা প্রশ্নকর ব্যাপার। হ্যাঁ, একসঙ্গে বেশ কয়েকবার আমরা চা-কফি-আইসক্রিম খেয়েছিলাম। গ্রীষ্মের বিকেলে কখনো ওয়াটারলু ইস্টে কখনো এমব্যাংকমেন্টে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় আড্ডায়ও বসা হয়। প্রথম পরিচয়পর্বটাও পাশাপাশি বসা দুই পাঠকের পারস্পরিকতার সূত্রে। আমি পড়ার জন্য নিয়ে বসেছিলাম লরেন্স লার্নারের দ্য ফ্রন্টিয়ার্স অফ লিটারেচার এবং মিলোভান জিলাসের অফ প্রিজন্স অ্যান্ড আইডিয়াস। অনুচ্চ স্বরে পাশের চেয়ারে বসা সুজান বললো : যে-দুটো বই তুমি পড়ছো দুটোই আমার প্রিয়। ওর সামনে ছড়ানো ছিল দুজন নাট্যকার-সম্পর্কিত পাঁচ-ছখানা বই। এঁদের একজন জঁ পল সার্ত্র এবং অন্যজন হ্যারল্ড পিন্টার। ওর পিএইচ.ডির বিষয় ফরাসি সার্ত্র এবং ইংরেজ পিন্টারের নাটকের তুলনামূলক বিশ্লেষণ। সার্ত্রের লা নজে এবং নো এক্সিট আমার পড়া, পিন্টারের নো ম্যান্স ল্যান্ড। দুই পাঠকের পাঠাভিজ্ঞতার সিঁড়ি বেয়ে আমি এবং সুজান একসময় পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসি। মিউজিয়ামে পড়তে এলেই আমরা বেছে নিই পাশাপাশি আসন। সাড়ে দশটার টি-ব্রেকে চা-কফি কিংবা দুপুরের লাঞ্চে লাজানিয়া কিংবা ফিশ অ্যান্ড চিপস। মাঝখানে একদিন খানিকটা বিলাসের বশে আমি ওকে খাওয়ালাম চিকেন টিক্কা আর হায়দরাবাদি বিরিয়ানি। দেখলাম সুজানও অবশ্য ঋণী থাকতে নারাজ। সপ্তাহান্ত না আসতেই এক দুপুরে ওর মারফত পাওয়া গেল শেফার্ডস পাই এবং ইয়র্কশায়ার পুডিং।

সবটাই বাইরে-বাইরে যদিও আমরা থাকি নৈকট্যের মধ্যেই। এক বিকেলে ক্লোকরুম থেকে দুজনের রুকসাক নিতে গিয়ে সরু প্যাসেজটার মধ্যে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং পরিস্থিতির সাপেক্ষে আমি আর সুজান মুখোমুখি। মুখোমুখি মানে আমাদের দুজনের মাঝখানে মাত্র বিঘতখানেক দূরত্ব। এমনকি ওর নিশ্বাসের উষ্ণতা আমার মুখে এসে পড়ে। গায়ের বারবেরি কি শ্যানেল ফাইভ যেটাই হোক ঢুকে পড়ে আমার করোটিতে অদৃশ্য হাওয়ার প্রকৃতিতে। সুজানের গোলাপি আভায় ছিল আপেল আর কাঁচা হলুদের সংমিশ্রণ-মাদকতা। নিজেকে বিনীত-সংযত করে নিয়ে মৃদু স্বরে বলি, চলো যাই। ডরমিটরিতে ফিরে মনে হয়েছিল, সুজানের প্রসন্নতায় কিছু একটা ছিল। হয়তো সেটা ছিল সেই মুহূর্তেরও দাবি। কিন্তু আমার মনে হতে থাকে, সেটা হতো পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া এক ধরনের লাম্পট্য। অল্প আগেই লার্নারের আলোচনার সূত্রে আমরা শার্লট ব্রন্টির জেন আয়ারের আত্মজৈবনিকতার প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করছিলাম। সত্যি কথা বলতে কী, শৈশবের একটা দারুণ সংশ্লিষ্টতা উপন্যাসে আসেই। এটা সুজানের মত। জেন আয়ার ছাড়াও ডিলান থমাসের ‘পিচফল’ গল্প কিংবা ডিকেন্সের উপন্যাসে শৈশবের উপস্থিতি অনিবার্যভাবে প্রাসঙ্গিক এবং আকর্ষণীয়। আমরা কোনো একটা মুহূর্তের নির্জন নৈকট্যে এসেছি বলেই যে আমি তার প্রতি উদ্যত হবো, তার দিকটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, সেটা নিশ্চয়ই কোনো কাজের কথা নয়। ওর মনে তখন কি বিস্ময়ের দোলা খেলা করে তা-ও আমার জানার কথা নয়; কিন্তু পরদিন দেখি, পড়তে বসার কিছুক্ষণ পরপরই সে নানা বিষয়ে আমার মতামত জানতে চায়। গবেষণার জন্য পরিশ্রমের কথা উঠতেই আমি ফ্রিডরিশ অ্যাঙ্গেলসের দৃষ্টান্ত দিই। ১৮৪৩ সালে তিনি জার্মানি থেকে ম্যানচেস্টারে এসেছিলেন একখানা প্রবন্ধ লেখার জন্য বাস্তব উপাদান ও পরিস্থিতির নিবিড় পর্যবেক্ষণে। ম্যানচেস্টারে তখন হোসিয়ারি আর বস্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটে চলছিল। সেই শিল্পায়নের সঙ্গে যে স্বাস্থ্য আয়ুষ্কাল এবং জীবনযাপনেরও সান্দ্র সম্পর্ক থাকা সম্ভব, সেটা প্রমাণ করে গবেষণা-প্রবন্ধ লেখেন তিনি। এরকম নানা উপলক্ষে সাহিত্যের দুই নিবিষ্ট শিক্ষার্থী ও পাঠক কখন যে একই বৃত্তের অধিবাসী হয়ে পড়ে, তা আমাদের মনে থাকে না।

সুজান আমার কী পরীক্ষা নেয় সেটা আমার জানার কথা না হলেও আমি ঠিকই তার মনোজগতে কুশলী অনুসন্ধান চালাই। ইংরেজ মনস্তত্ত্বের গড় পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ওর চরিত্র ও স্বভাবের একটা মানচিত্র আমি আঁকি। তাতে ওর সঙ্গে আমার কালযাপনের পর্বগুলোকেও জুড়ে দিই। না, কারো ব্যক্তিগত সীমানার মধ্যে নাক গলানো কিংবা আগ বাড়িয়ে কারো ব্যক্তিগত পারিবারিক ইত্যাদি বিষয়ে কৌতূহল-ঔৎসুক্য এইসবে নেই সুজান। মাঝে-মাঝে শুনতে পাই জাতিগত বৈষম্য কিংবা অশে^তাঙ্গদের প্রতি তাদের বিরক্তি রাগ এসবের নানা কাহিনি। কিন্তু একদিন সন্ধ্যার দিকে একটা ক্যাফেতে কফি খেতে গিয়ে আমার চোখ পড়ে পাশের টেবিলে বসা এক অদ্ভুতদর্শন যুবকের প্রতি। তার পোশাক বসার ধরন সবকিছুতেই কেমন যেন একটা অনান্তরিকতা এবং বিতৃষ্ণার ভাব। যেন কোনো অজ্ঞাত কারণে দুনিয়াদারির প্রতি লোকটা দারুণ ক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। মজার বিষয়, লোকটার মাথা সম্পূর্ণরূপে মুড়ানো। কয়েক সেকেন্ড যুবকটাকে নিরীক্ষণ করে সুজান আলতো স্বরে আমাকে বলে : লোকটা হলো স্কিনহেড, ওরা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট, শে^তাঙ্গ ছাড়া কাউকে সহ্য করতে পারে না। ওদের ধারণা, দেশটা একমাত্র শে^তাঙ্গদেরই, অন্য সবাই বহিরাগত এবং এদেশে থাকার কোনো অধিকার নেই তাদের। রাস্তার এখানে-ওখানে কত পূর্ব ইউরোপীয়, রুমানিয়া, পোল্যান্ড এইসব দেশের লোক অনিকেত এবং নানা ধরনের ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত; কিন্তু ওদের নিয়ে মাথাব্যথা নেই স্কিনহেডদের। কিন্তু

যে-ভারতবর্ষীয় লোকটা নিজের যোগ্যতায় ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনো শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত, তাকে ওদের অসহ্য। একটু পরে লোকটা উঠে পড়ে। তখনই দেখতে পাই তার পায়ে হাঁটু পর্যন্ত তোলা স্যাক্সনের চামড়ার জুতো। পিছলে মোজাইকের সমতলে পা ফেলে গেলে তার পদপাতের শব্দে মনে হলো, একটা রেসের ঘোড়া অলস ভঙ্গিতে হালকা চালে বেরিয়ে গেল।

সেদিনই সন্ধ্যায় টিভিতে স্থানীয় সংবাদ শুনতে গিয়ে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা সর্পিল স্রোত নেমে যায় পায়ের দিকে। ক্লোকরুমের সুজানকে মনে পড়ে। নির্জন নৈকট্যের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় একটা অজ্ঞাত অস্বস্তির প্রতিমূর্তি। নরউইচের এক তরুণী তার ছেলেবন্ধুকে আসামি করে মামলা ঠুকে দিয়েছে। সচিত্র সংবাদ-প্রতিবেদনে ভেসে ওঠে সেই কাহিনির পূর্বাপর। মেয়েটির কাছে জানতে চান বিচারক –

: সে তো তোমার বয়ফ্রেন্ড তাই না?

: ঠিক তাই, মাননীয় বিচারক।

ছেলেপক্ষের নিয়োগ করা আইনজীবীর তীক্ষè জিজ্ঞাসা –

: সেদিনটা তোমরা ছেলেটার নির্জন কক্ষে পরস্পর অনেক ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়েছিলে?

: হ্যাঁ, কাটিয়েছি।

: তোমরা পরস্পর চুমু খেয়েছো।

: হ্যাঁ, সত্যি।

: তাহলে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতেই তোমার বয়ফ্রেন্ড তোমার সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিল। সেটা কী অস্বীকার করতে পারো তুমি? সেটাকে অ্যাটেম্পট টু রেপ কেন বলছো তাহলে?

মেয়েটির চোখেমুখে উৎক্ষিপ্ততার আভা। সেই আভা তীব্র আলোকময় হয়ে ওঠে তার কণ্ঠনিঃসৃত দৃঢ়োচ্চারণে।

: মাননীয় বিচারক, প্রেমের মিলন একটা যৌথ উদযাপন। হ্যাঁ, চুম্বনের অনুমোদন আমার ছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি তাকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলাম। সেটার জন্য যে-মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন সেটা আমার ছিল না। আমি বলেছি, আমার সময়ের প্রয়োজন, তাকে অপেক্ষা করতে হবে। আসলে মাননীয় বিচারক, সে তো প্রেমিক না হয়ে একটা স্কার্টচেইসাহ্ হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি আর তার প্রেমিকা ছিলাম না। তখন তার চোখে আমি একটা মেয়েমানুষ যাকে যেভাবে খুশি ভোগ করা যায়। আমি ভোগ্যা হতে চাইনি।

ছেলেটার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিচারক তাকে হাজতবাসে পাঠিয়ে দিলেন ছয় মাসের জন্য। প্রকৃত প্রস্তাবে প্রস্তুতি এবং সময়, এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়। নরউইচের অচেনা মেয়েটির সূত্রে আমি যেন দিব্যদৃষ্টি পেলাম। সুজান, হ্যাঁ সুজান বুকবাইন্ডারের প্রতি চুম্বনে উদ্যত না হয়ে আমি সঠিক কাজটাই করেছিলাম। নিজেকে প্রবোধ দিয়ে ফের সুজানের বাসায় দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ নিয়ে আমি আরো একবার ভাবতে বসি। প্রাথমিক পরিচয়পর্বে ওর সারনেমটাতে বেশ মজা পেয়েছিলাম। সুজান নিজেই জানায়, ওদের পিতৃপুরুষদের পদবিটা এসেছে হয়তো হল্যান্ড, জার্মানি বা স্পেন থেকে। একটুখানি আভাস পাই তার কথায়। তাদের পরিবারে একটা বহুসাংস্কৃতিক ব্যাপার রয়েছে। কিন্তু সমস্ত কৌতূহল একদিনেই মেটানোটা ভব্যতার পর্যায়ে পড়ে না বলে আমি অপেক্ষা করি। তাছাড়া ইংল্যান্ডে এসে একটা দারুণ জিনিস শিখেছি। অনাবশ্যক ও অতিরিক্ত কৌতূহল বর্জনীয়, কারণ তা মার্জিত রুচিগর্হিত কাজ। একটা বিষয় স্পষ্ট। ওরা যখন কারো সঙ্গে মিশবে, কাউকে ক্রমশ আপন করে নিতে শুরু করবে, তারও রয়েছে একটা ব্যাকরণ। পাবে, কফিশপে, ম্যাকডোনাল্ডসে বা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানে পারস্পরিক নৈকট্যের ঘটনা ঘটতে থাকবে এবং তারপর কোনো একদিন অকস্মাৎ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরাই বলবে, তাহলে সামনের উইকএন্ডের দুপুরটায় আমরা ডিনারে মিলিত হবো! আমার ক্ষেত্রেও তেমন ঘটনাই ঘটে।

স্কিনহেডের ঘটনাতে প্রথম আমি ওর মনের সূক্ষ্মতা ও রুচির স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচিত হই। এটা আমার মনে হয় যে, তার মনে হয়তো ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির প্রতি কোনো প্রেজুডিস বা বিতৃষ্ণা নেই। থাকলে শে^তাঙ্গ সুপ্রিমিস্টদের প্রসঙ্গে সরব হতো না। প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে পারতো। পরে মনে হলো, সুজানের সেই প্রসঙ্গবর্ণনের নেপথ্যেও ছিল কোনো গূঢ়তর হেতু। মাঝে-মাঝে শোনা যায়, স্কিনহেডদের হাতে হেনস্তা কিংবা নাজেহালের শিকার হয়েছে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী কিংবা শিক্ষার্থীরা। কয়েকদিন আগেই একটা খবর কানে আসে। ব্রিকলেনমুখী পাতালরেলের একটা কম্পার্টমেন্টে এক বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি ফিরছিলেন। পুরো বগিতে একাই ছিলেন তিনি। পথে কারা তাকে প্রচণ্ড আক্রমণ করে, আহত করে। বলা যায় মরতে মরতে বেঁচে যায় লোকটা। এখন সুজানের কথায় স্পষ্ট বুঝতে পারি, সেটা ছিল আসলে স্কিনহেডদের কাজ। অর্থাৎ আমাকেও পথেঘাটে থাকতে হবে সদাসতর্ক। সূক্ষ্মতার বিভিন্ন পরীক্ষায় সুজানকে আমার উত্তীর্ণই মনে হয়। তারপরেও একদিন টি-ব্রেকে সাহিত্য কবিতা ইত্যাদি আলাপের সূত্রে তাকে বললাম ওলে সোয়িংকার ‘টেলিফোন কনভারসেশন’ কবিতাটা আমার খুব প্রিয়। একটা সময়ের বাস্তবতার ছবি কী দারুণভাবেই না মাত্র কয়েকটা লাইনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে। শুনেই উদ্ভাসিত সুজান বলে, আরে এটা তো আমারও অনেক প্রিয় একটা কবিতা। ওই যে ফোনে শে^তাঙ্গ বাড়িঅলিটা বাড়িভাড়া দেবে আর ভাড়া নেবে আফ্রিকীয় এক যুবক। মহিলা বর্ণবাদী। এদিকে ফোনের আলাপে যুবকটাকে ঠিক বোঝা যায় না সে কোন দেশের কোন জাতের। মহিলার সেটা জানা দরকার। কেননা, কৃষ্ণাঙ্গকে সে কোনোভাবেই ভাড়া দেবে না। দারুণ নাটকীয় ভঙ্গির একটা কবিতা। ইংরেজ শ্বেতাঙ্গিণী হয়েও যে-মেয়ে সোয়িংকার এ-কবিতা পছন্দ করে তাকে আসলেই ভালো না বেসে পারা যায় না। ওইদিনের পর থেকে আমি সুজানের মনোজগতের ভেতরটা আরো স্বচ্ছভাবে আবিষ্কার করি।

সুজানের পরিবার সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পেলেও সেটিকে বিস্তারিত করার দিকে ঝুঁকে পড়ি না আমি। তবু সে নিজে থেকেই উৎসাহ ছড়ায় আমাকে লক্ষ করে –

: আমার ভাই সাইমনকে তুমি খুব পছন্দ করবে। একটা নাম্বার ওয়ান গপ্পোবাজ। ওর বিষয় অ্যানথ্রোপলজি, পড়ে শেফিল্ডে। দেখবে গ্রিমাল্ডি আলতামিরা এজিল এসব গুহার গল্প শোনাবে তোমাকে। আরো কত কত কাহিনি।

সুজানের কাছেই জানা গেল, সাইমনের একটা বিশেষ লক্ষ্য হলো, কিউনিফর্ম বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করা। সেই যে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার মহাকাব্য গিলগামেশ, সেটা ছিল কিউনিফর্মে অর্থাৎ পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপিতে লেখা মহাকাব্য। সত্যি বলতে কি সুজানের ভাই সাইমনকে দেখার একটা প্রবল আগ্রহ আমার মধ্যে জেগে ওঠে। কিন্তু মনের সেই অস্থিরতার বীজ উপযুক্ত জল-হাওয়ার সংযোগ খুঁজতেই থাকে। এক ধরনের সংশয়, যদিও সংশয় যে-কোনো পরীক্ষার

প্রাথমিক ধাপ বটে, দুলতেই থাকে ভেতরে। যতটা আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি অগ্রসর হয়েছি, সেখানে একটা অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী আবেশের বাস্তবতা দুজনের কারো পক্ষেই অস্বীকার করা সম্ভব হয় না। ধরা যাক, বিকেলের কফি-ব্রেকের পরে একটা পর্ব পাঠের মগ্নতায় কাটিয়ে আমাদের যার-যার ডেরায় ফিরে যাওয়ার কথা; কিন্তু তখন যদি সুজান বলে, চলো ব্ল্যাক ফায়ার্সের ওখানটায় বসে বা টেমসের ওপরকার ব্রিজের রেলিং থেকে নদী দেখবো। সুন্দর সুন্দর ক্রুজশিপ ট্যুরিস্ট নিয়ে ছুটে যাচ্ছে। সেসব দেখবো। আর সুজানের সে কী সাহস, আমি একে সাঁতার জানি না, তার ওপর রয়েছে উচ্চতাভীতি। সে তার পরনের ঢোলা ডেনিম ট্রাউজার হাঁটুর দিকে একটু গুটিয়ে নিয়ে যখন রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে তখন অফিসফেরত লোকে ব্রিজের দুই দিকে গতিব্যস্ত। সবার কী আর নদী দেখার মতো আলস্যাবকাশ বা সময় থাকে! সুজান অবশ্য সাঁতারজানা মানুষ। তবু সে যখন মৃদু আবদারি সুরে বলে,

: তুমি রেলিংয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকো, আমি ঠেস দেবো তোমার গায়ে। এটা তোমার দায়িত্ব। কারণ আমি নদীতে পড়ে গেলে লোকে কিন্তু তোমাকে জেলখানায় নিয়ে যাবে। বলবে ষড়যন্ত্র করে প্রেমিকাকে ফেলে দিয়েছে টেমসের স্রোতে।

সাঁই করে এলিয়টের কবিতার পঙ্ক্তি সরু তীব্র ঢেউয়ের মতো ঢুকে পড়ে করোটিতে। নিচে সামনে টেমসের অবারিত স্রোত। ভেসে যায় যত জলতরি আর পর্যটকপূর্ণ ক্রুজ। দূরে-অদূরে বিভিন্ন উৎসের আলো একটা বিশাল স্বপ্নময়তা রচনা করে আমাকে আর সুজানকে ঘিরে। জলভ্রমির মতো একটা রহস্যময়তার মধ্যে পড়ি। নদীর ঢেউ মুহূর্তে হয়ে পড়ে এলিয়টীয় : সুইট টেমস, রান সফ্টলি টিল্ আই অ্যান্ড মাই সং,/ সুইট টেমস রান সফ্টলি, ফর আই স্পিক নট লাউড অর লং। চারপাশের ব্যস্ততার গানের যদিও শেষ নেই, শেষ নেই টেমসের স্রোতেরও। হতে পারে মজা করেই সুজান নিজেকে লোককল্পিত প্রেমিকা সাজিয়েছে আামাকে খানিকটা কৌতুকের আস্বাদ দেওয়ার জন্য। তবু সেই ইঙ্গিতে আমি ভেতরে ভেতরে কিছু ইতিবাচকতা অনুভব করি। সেই অনুভূতির প্রণোদনাই যেন আমাকে আশ্বাস দেয়, একটা চুমুই তো। নিঃসন্দেহে তুমি সুজানকে একটা অনুরাগী চুম্বন এঁকে দিতেই পারো যখন সে নিজে থেকেই তোমাকে বিবিধ ইঙ্গিতে আহ্বান করছে। সুজানের পায়ে কেডস, ট্রাউজার হাঁটু পর্যন্ত গোটানো থাকায় তার গোলাপি পায়ের অনেকটাই থাকে আমার দৃষ্টির সীমানায়। হ্যাঁ, ওর শারীরিক কাঠামো সৌন্দর্য অবয়ব সবটা মিলিয়ে দেখলে প্রথমেই মনে পড়বে ব্রাজিলীয় মডেল জিসেল বুন্ডচেনের কথা। কিংবা হয়তো জিসেলের চাইতেও সে সুন্দরী। সৌন্দর্য মেধা ও সৃষ্টিশীলতার একত্র অবস্থান আসলেই দুর্লভ ঘটনা। সুজান সেই দুর্লভতার দৃষ্টান্ত এবং আমি সেই ব্যতিক্রমের দর্শক।

পরিকল্পনামাফিক আমি এবং সুজান দুজন শহরের দুই বিপরীত দিক থেকে লিভারপুল রেলস্টেশনে এসে পৌঁছাই। উইকএন্ড বলে স্টেশনে ব্যস্ততা সাপ্তাহিক কর্মমুখর দিনগুলোর তুলনায় কম। কিন্তু তবুও লোক ছুটছে তো ছুটছেই। কেউ যাবে স্ট্রার্টফোর্ড অন-আভনে শেকসপিয়রের জন্মস্থানে। ছুটির দিনগুলোতে ট্যুরিস্ট জায়গাগুলোর দিকে লোকের গমনাগমন বেশি। একটা স্কুলের ছেলেমেয়ে শিক্ষাসফরের ব্যানার নিয়ে একটা বগিতে উঠে পড়লো ওয়ারউইক ক্যাসলে যাবে বলে। আমাদের গন্তব্য কেন্টের ডার্টফোর্ড। ডার্টফোর্ডের পিলগ্রিমস ওয়েতে সুজানদের বাড়ি। সেই পিলগ্রিমস ওয়ে যে-পথ ধরে অনেক কাল আগে জিওফ্রে চসারের তীর্থযাত্রীরা পথ হেঁটে পৌঁছাতো ক্যান্টারবারি চার্চে। সুজানদের দোতলা বাড়ির প্রায় উল্টোদিকেই কেন্ট-ক্লাবের ক্রিকেট-মাঠ যেখানে কাউন্টি ক্রিকেটের অনেক খেলা হয়। মজা করে বললাম, দারুণ তো, তোমরা তো দোতলা থেকে বিনে টিকেটে কাউন্টি ক্রিকেটের ম্যাচগুলো দেখতে পারো চাইলে। না, সুজান ক্রিকেটভক্ত নয়। ফুটবলও না। সে আসলে কোনো বিশেষ খেলারই ফ্যান না। তার পছন্দ সংগীত, মুভি ও মঞ্চনাটক। মূলত ভালো বই পেলে সুজানের আর কিছুর প্রয়োজন নেই।

দুপুরের অল্প আগে আমাকে নিয়ে সুজান ওদের বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালে দেখলাম কেন্টের মাঠে নেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত একদল খেলোয়াড়। পাশেই একটুখানি টিলার মতোও আছে। লন্ডনে টিলা কমই চোখে পড়ে। যা-ও একটুখানি আছে, দেখতে পাই এদিকটাতেই যেখানে নদী দুর্গ আর ছোট ছোট টিলার মতো পাহাড়। আবার সেইসব টিলার কোনো-কোনোটার ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ ভেদ করে চলে যায় ব্রিটিশ রেল। কু-ঝিঁকঝিঁক শব্দে তাকিয়ে দেখি অদূরের মেডওয়ে নদীর দিকে ছুটছে একটা ট্রেন। কি জানি সেটা চার্লস ডিকেন্সের বাড়ির কাছ ঘেঁষেই যায় নাকি। গেলে হয়তো একটা দিন আমরা কাটিয়ে আসতে পারি ডিকেন্সের জন্মস্থানে। এসবই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভাবতে পারি আমি। অকস্মাৎ সংবিৎ ফেরে পাঁজরে সুজানের কনুইয়ের হালকা খোঁচায়।

: মা আসবে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। সাইমনও আসতে পারে।

এবং খুলে যায় দরজা। সুজানের মা নয়, যে আসে সে যদি সুজানেরই ভাই সাইমন হয়, তাহলে আকস্মিক বজ্রপাতেও আমি ততটা অবাক হতাম না যতটা হই সেই উন্মোচনে। নিগ্রো শব্দটা ব্যবহার করলে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযোগী হয়; কিন্তু বর্তমানে শব্দটা বৈধ নয় বলে আমাকে অ্যাফ্রোক্যারিবিয়ান শব্দের ওপর নির্ভর করতে হয়। যতটা জেনেছি সুজানদের বাড়িতে কোনো দারোয়ান থাকার কথা নয়, তাহলে দরজা খুলে দেওয়া আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ যুবকই সাইমন। আমাকে দখল করে বিস্ময়। সুজানের বাবা-মা কাউকে দেখিনি। শুধু জানি ওর বাবা মাইকেল এবং মা জেসিকা। এখন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক সাইমন হলে অবশ্যই সুজানের বাবা কিংবা মা দুজনের একজনকে কৃষ্ণাঙ্গ হতেই হবে। এসবই আমার চকিত ভাবনা কিন্তু দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে করমর্দনের জন্য হাত বাড়াই।

: মাই ব্রাদার সাইমন, টোল্ড ইউ অ্যাবাউট হিম।

সুজানের সুরেলা কণ্ঠ সংযোগ ঘটায় আমার এবং সাইমনের মধ্যে। সম্ভাষণ বিনিময়ের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেতর থেকে স্মিতমুখ মাঝবয়েসি এক মহিলা এগিয়ে এলে আমার সংশয় পরিণত হয় সত্যে। সুজানের মা শ্বেতাঙ্গিণী জেসিকা। জুতো রেখে সোফায় বসে পড়ি আমি। জুলাইয়ের উষ্ণ বিকেল

ডাবল-গ্লেজ জানলা দিয়ে ঢুকলেও ভেতরটায় তত গরম বোধ হয় না। পেছন দিককার প্রশস্ত প্রাঙ্গণ থেকে পেছনের খোলা দরজা দিয়ে হাওয়া আসে অবারিত। সাইমন যথেষ্ট প্রাণবন্ত। দেখে মনে হলো, ওর বয়স পঁচিশ হলে সে ওই বয়সেই আটকে থাকতে পারবে আরো অনেক বছর। একটা ছোকরা ধরনের আভা তার অবয়বজুড়ে। ছিপছিপে নির্মেদ তার শরীরে আফ্রিকান অ্যাথলেটদের প্রতিচ্ছবি। হয়তো বিখ্যাত জেসি ওয়েন্স কি মিরুৎস ইফতারও একদিন এমন সাইমনীয়ই ছিলেন। জেসিকা সম্পূর্ণ সোনালি চুলের এবং সুজানের বাদামি চুলে তার আংশিক প্রতিফলন ঘটেছে। তাহলে সুজানের বাবা মাইকেল নিঃসন্দেহে কালো বা বাদামি চুলের একজন হবেন। তবে নৃবিজ্ঞান বলে, চৌদ্দ পুরুষের ঠিক কোন জায়গা থেকে কোন জিন লাফ দিয়ে এসে ধারায় ঢুকে পড়বে তা আগাম বলা দুরূহ। মানবজীবনটাই একটা বিশাল দুর্ঘটনা। তবে কথা হলো সেই দুর্ঘটনা ঘটনারই সমষ্টি। মাইকেল আমাদের মধ্যে থাকেন না এবং আসেনও না। উৎসাহ দেখিয়ে তার কথা জানতে চাওয়াটা রুচিসম্মত নয় বলে আমি হেসে জেসিকার সঙ্গে পরিচয়পর্বের গুরুত্ব রচনায় তৎপর হয়ে উঠি।

পেছনের খোলা দরজা দিয়ে যে হাওয়া আসে তা আসার সময় বয়ে আনে খাবারেরও ঘ্রাণ। সে-ঘ্রাণে থাকে সদ্য-সতেজতা আর উষ্ণ দুপুরের আর্দ্রতাশূন্য চনমনে ভাব। ঘ্রাণ থেকে খাদ্য-উপাদান সনাক্তকরণের একটা বিশেষ ক্ষমতা বা যোগ্যতা থাকার ফলে আমি নিশ্চিত হই, দুপুরের খাবারে একটা উপাদান অবশ্যই ম্যারো কিংবা বেগুন। টেবিল থেকে কমলার রস গেলাসে ভরে আমাকে হস্তান্তর করে সাইমন। ততক্ষণে ডুপ্লেক্সের ওপরতলা থেকে টাওয়েলে মুখ মুছতে মুছতে নেমে আসে সুজান। তাই তো, কখন সে ওপরে গেল। আমাদের বসতে দিয়ে সে দ্রুতই ওপরে গিয়ে ফের নেমে পড়ে নিচে। অর্থাৎ ওর কক্ষটা ওপরেই। ইংল্যান্ডে অধিকাংশ ঘরেরই থাকার কক্ষগুলো ওপরে হয়। নিচে থাকে বৈঠকখানা এবং অন্যান্য অনুষঙ্গের কক্ষাদি। বাড়ির অবস্থান দেখে এলাকার আভিজাত্য, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কিছুটা সাংস্কৃতিক মানও আঁচ করা চলে। টির‌্যাস ঘরগুলো যেমন পাশাপাশি একটানা ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন। আবার সেমিটির‌্যাস ঘরের একটা দিক পার্শ্ববর্তী ঘরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং একটা দিক বিচ্ছিন্ন। বাংলো ঘরগুলো একদম স্বতন্ত্র। নিজস্ব পরিচিতি ও অবস্থান নিয়ে বিশিষ্ট। তবে ঘর যেমনই হোক তার ছাদগুলো মোটামুটি সমধর্মী। দুই বা চারদিকে ঢালু। শীতে বরফের দিনে বরফ না জমে ছাদ থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ার জন্যই তেমন ছাদের ব্যবস্থা। সুজানদের বাংলো বাড়িটাও তেমনই। জেসিকা রান্নাপর্বের সুসমাপনীর জন্য কোণের দিকটায় চলে যান আমাদের গল্প করার সুযোগ দিয়ে। সেই অবসরে সুজান আর সাইমন আমাকে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখাতে থাকে তাদের বাড়ির নিচতলাটা। পেছনের প্রাঙ্গণটা পরিসরই। হঠাৎ তাকালে বাগানের প্রান্তিক দিকগুলোতে ফুটে থাকা সুগন্ধি ল্যাভেন্ডার ডালিয়া কি গোলাপ চোখে পড়ে। এমনিতেই জুলাই মাস ইংল্যান্ডে বিচিত্র সব ফুল ফোটার মাস। আশেপাশে হয়তোবা ঝোপেঝাড়ে পেকে টসটসে হয়ে আসে নানা রকমের বেরিফল। দূর থেকে স্বচ্ছ শূন্যতার মধ্য দিয়ে নির্মেঘ আকাশের দিকে তাকালে হঠাৎ-হঠাৎ কালো বিন্দুর বিক্ষিপ্ততা চোখে পড়লে বুঝতে পারা যায়, মৌমাছিরাও আর ঘরে বসে নেই। রানিকে অবসরযাপনে রেখে এসে তারা ছোটাছুটি করছে মধুর অন্বেষণে।

সুজানের আমন্ত্রণে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়ি দোতলায়। ওঠার সময় প্রাঙ্গণে পড়ে থাকা ক্রোকে খেলার সরঞ্জাম দেখতে পাওয়া যায়। বড় ভারি কাঠের হাতুড়ির মতো ব্যাট আর লাল নীল হলুদ কালো কাঠের বল। বক্সগুলো মাটিতে লাগানো নেই, হয়তো এই গ্রীষ্মেই ওদের কেউ খেলেছে বা খেলবে ক্রোকে এবং খেলার সময় মাটিতে গাড়বে বক্স বা চৌকো বারগুলো। সুজান আজ কী সুগন্ধি মেখেছে কে জানে। হতে পারে এলিজাবেথ আর্ডেনের ফিফথ অ্যাভিনিউ। এই ঘ্রাণ আগেও পেয়েছি। সাইমনকে দেখতে পাই ওর মা জেসিকাকে সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সুজানের কক্ষে ঢুকে আমার সুজানসম্পর্কিত বিষয়-আশয়ের কথাই মনে পড়া উচিত’ কিন্তু আমার মনোজগতে তখন চকিতে ঢেউ তুলে যায় ওর বাবা মাইকেল। তিনি শে^তাঙ্গ না কৃষ্ণাঙ্গ, জীবিত না মৃত – কিছুই জানা হয় না। এদিকে মাইকেলের কথা জিজ্ঞেস করাটাও ইংরেজ ভব্যতার মধ্যে পড়ে না। ব্যাপারটা আমার মধ্যে যাতে ভাবনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, দুশ্চিন্তামুখী না হয়, সেজন্য আমি বরং সুজানের সংগ্রহে থাকা মিউজিক সিডিগুলোর দিকেই মনোযাগী হই। আমার সংগীতরুচির সঙ্গে বেশ খানিকটা মিল দেখে মনে মনে বেশ প্রসন্ন বোধ করি আমি। হয়তো অল্প আগেই সে শুনেছিল, কাল বা পরশু বা আজ ভোরেই – এলা ফিটজেরাল্ডের সামারটাইম। আমি এই সামারটাইম এরই মধ্যে অন্তত ছয়-সাতজনের কণ্ঠে শুনেছি। গানটার কথা ভাবা যায়! ১৯৩৪-এ যখন শে^তাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গে ভেদের রাজনীতি মার্কিন দেশে সর্বব্যাপী তখন শে^তাঙ্গ জর্জ গার্শউইন এই গানটাতে তুলে আনেন আফ্রিকীয় জীবনের ছবি। লাইনগুলো গেঁথে থাকে মনে – সামারটাইম, অ্যান্ড দ্য লিভিং ইজ ইজি/ ফিশ আর জাম্পিং অ্যান্ড দ্য কটন ইজ হাই/ ইয়োর ড্যাডি ইজ রিচ অ্যান্ড ইয়োর মামি ইজ গুডি লুকিং/ সো, হাশ লিটল বেবি, ডোন্ট ইউ ক্রাই। গানটা যখন প্রথম আমার কানে আসে, আহা, আমি যাচ্ছি একদিকে অল্ডগেট ইস্টের চ্যাপেল, অন্যদিকে একটা মার্কেটের একদিক, যেখানে অলংকারপ্রধান দোকানের মধ্যে আলটপকা ভেনিসন মানে হরিণের মাংসের দোকান। কেউ শুনছিল গানটা আর ঠিক সেখানটাতে এসে বুকের ভেতরটাতে এমন একটা মোচড় দেয় যে, এলা আমাকে অশ্রুপাত করিয়ে ছাড়েন। আসলে আমার শৈশবের মাতৃহীনতাই বুকের গহিন থেকে ‘ইয়োর মামি ইজ গুড লুকিং’-এর সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে আমার বুকের কুঠুরিতে। শেষের দুটো লাইন : নাথিং ক্যান হার্ম ইউ, উইথ ড্যাডি অ্যান্ড মামি স্ট্যান্ডিং বাই, অস্ফুটে বলতেই সুজান পরিপূর্ণ হেসে বলে, আরে, তোমার ভালো লাগে এই গান? বলি, কার না ভালো লাগে! কিন্তু ঠিক এই লাইনটাই কেন আসে উচ্চারণে! সে কী ‘ড্যাডি’ শব্দের মধ্য দিয়ে আজকের ড্যাডি চরিত্র মাইকেলের অনুপস্থিতির সূত্র ধরেই! হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। যদিও সুজানের বাবা সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রবল নয় আমার মধ্যে এবং কেন শে^তাঙ্গ মায়ের ঘরে শে^তাঙ্গ কন্যার সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ পুত্র থাকে সে-বিষয়েও আমি বোধ করি না উত্তেজনা। বরং এই যে সুজানের ঘরে তার টেবিলে এলার সামারটাইম, এটাই আমাকে অদ্ভুত এক আকর্ষণে নিয়ে যায় তার দিকে।

আমরা মুখোমুখি। আমি সুজানের পড়ার টেবিলসংলগ্ন চেয়ারে, ও টি-টেবিলের মতো দেখতে একটা কুশনের ওপর। আমার বাদামি পা এবং সুজানের গোলাপি পায়ের মাঝখানে আরেকটা পা রাখার জায়গা হতে পারে। কথা বলতে বলতে আমি সচেতন থাকি, জায়গাটা যাতে যথাযথই থাকে, সংকুচিত না হয়। সুজানকে খুব স্বতঃস্ফূর্ত দেখায়। আমাকে লাঞ্চে আমন্ত্রণ করতে পেরে ও যে আনন্দিত সেটা তার কথা, হাসি আর ইশারায় বুঝতে অসুবিধে হয় না। ওর ঘরটা বেশ সাজানো-গোছানো ছিমছাম ধরনের। হতে পারে লেখাপড়া গবেষণা এসবের গুরুত্বের আধিক্য হেতু অন্যান্য অনুষঙ্গের ব্যাপারে তাকে আপস করতে হয় আপাতত। চুলগুলো ঘাড়ের পেছন দিকে সরিয়ে দিতে দিতে সুজান ব্যস্ত হয়ে ওঠে আমার প্রসঙ্গে –

: তোমাদের দেশটা তো অনেক সুন্দর। কান্ট্রি লাইফই বেশি, আর খুব সবুজ আর ভেজা-ভেজা। প্রায়ই আমি ব্রিকলেনের দিকে যাই। মা খুব পছন্দ করে তোমাদের সবজি। বিটার গুর্ড দেখে ভালো লাগে। দোকানদারকে বলে, খাবো কীভাবে? বললো : সবজি যেভাবে রান্না করো। তবে একটু তেতো। মা হাসে, তেতো কী করে খাই! লোকটাও সরস, বলে : কেন তেতো কফি তো খাও! সত্যি মা এখন বিটার গুর্ডের ভক্ত।

সুজানের মুখে করোলার প্রশস্তি শুনে ভালো লাগে। এ যেন সুজান নয়, আমারই কোনো বোন টেবিলে করোলা ভাজি কি তরকারি সাজাতে সাজাতে বলছে : আজকের করোলা একটু তিতা হবে। এর মানে হলো, করোলার তেতোর স্বাদেরও তারতম্য হতে পারে। সুজানের আর তার প্রিয় সংগীতশিল্পী ক্যারেন কার্পেন্টারের কথা বলা হয় না। নিচ থেকে ডাক পড়ে, ডিনার প্রস্তুত। সিঁড়িতে নামার সময় সুজানের বাহু আমার বাহুতে এমনভাবে লাগে যেন সেটা নির্ভরতার ক্ষণেক আশ্রয়প্রার্থী। সেদিকে মনোযোগী না হয়েই আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা ঘ্রাণের প্রশংসা করি খাদ্য গ্রহণেরই পূর্বে – নাইস স্মেল! খেলেই বোঝা যাবে, মা কেমন রাঁধুনি – উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা ছিটকে পড়ে সুজানের কণ্ঠে। যদিও তা দৃশ্যমান কিছু নয়, তবু মনে হলো, আমার গা স্পর্শ করতে করতে সেটা ছুটে যায় খাবারের টেবিলের দিকে। ওভাল আকৃতির ডাইনিং টেবিলের চারপাশে চারজন, সহজ হিসাব। অতিথির প্রতি সৌজন্যের দায় নিতে হয় আমাকেই, ফলে টেবিলের লম্বাটে দুই দিককার একদিকে আমি। একদিক থেকে বলা যাবে, চারদিকে চারজন বসলে চারজনের প্রত্যেকেই দিকপ্রধান। সে-হিসেবে আমার বিপরীতে বসা সুজানও প্রাধান্য পাবে। তবুও জ্যামিতিক বিচারে আজকের ডিনারে আমিই গেস্ট অফ অনার এবং ডইংরুমের দরজা থেকে আমার বসার চেয়ারের দূরত্বই সবচেয়ে কম। সাধারণ ইংরেজদের মতোই পরিমিতিসম্পন্নভাবে সাজানো হয়েছে টেবিল। স্পাইসি বলতে খুব ঝাল নয়, গোলমরিচের খানিকটা ঝাঁঝ থাকবে। সেরকমই স্টাফড ম্যারো। দেখতে অনেকটা শসার মতো সেই ম্যারোর ভেতরে মসলামাখানো মাটনের কিমা ভরে সেগুলোকে ওভেনে তাতিয়ে নিলেই সুস্বাদ প্রস্তুত। একটা ক্রিস্টালের চ্যাপ্টা বাটিতে বেগুনের মুসাকা। সেটিও ওভেনে প্রস্তুত। একটা স্তরে বেগুন এবং আরেকটা স্তরে পনির এবং বিভিন্ন হার্ব, এইভাবে কয়েক স্তরে তৈরি মুসাকা ছুরিতে কেটে নিতে হয় খণ্ড-খণ্ড করে। চিকেন কারি মোটামুটি বাহুল্যবর্জিত নির্দোষ আন্তর্জাতিক খাদ্যোপকরণ। ইংরেজদের যেটা ভালো লাগে, জোরাজুরি নেই, চাপাচাপি নেই। যার যেটা ভালো লাগবে স্বেচ্ছায় প্লেটে নিয়ে খাও। ‘আরেকটু দিই’ ‘আরো খানিকটা নিতেই হবে’ – এমনতর প্রভাব এখানকার ডিনার-টেবিলে অরুচিকর আচরণ হিসেবেই ধরে নিতে হয়।  

জেসিকার রান্না করা প্রতিটি খাবারই চমৎকার ও সুস্বাদু। সহানুভূতিভরে আমাকে বলতেই হয় –

: আপনি আজ যথেষ্ট সময় খরচ করলেন আমাকে ডিনার করানোর জন্য। এতটা কষ্ট করেছেন ভাবতেই আমার কেমন জানি লাগছে, কাছে হলে আমি এসে সাহায্য করতে পারতাম আপনাকে।

প্রতিবাদী স্বর জেসিকার, যদিও ওর হাসিতে বুঝতে পারি আমার কথায় সে খুশি হয়েছে। কিন্তু ডিনারের জন্য কষ্টের দায় নিতে বরং তার মনে আনন্দের ভাগই বেশি। তাছাড়া খেতে বসলে প্রশংসা সেখানেই করতে হয় প্রথম। পরে পুনরায়। তাতে নিমন্ত্রণকারীর প্রতি সম্মান দেখানো হয়। জেসিকার মুখে উল্টো আমারই প্রশংসা –

: সুজান বলেছে, তুমি নাকি ভালো রাঁধতে পারো। একবার পাকোড়া বানিয়ে এনে খাইয়েছিলে ওকে।

নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। সত্যিই একদিন টিফিনে পাকোড়া বানিয়ে এনেছিলাম; কিন্তু স্বাদু হলেও কাঁচামরিচের ঝাল দৌর্দণ্ডপ্রতাপ চালিয়েছিল সুজানের ওপর। ওরা অভ্যস্ত গোলমরিচের মৃদু ধরনের ঝালে। শেষে লাইব্রেরির ক্যাফেটেরিয়া থেকে আইসক্রিম খেয়ে সেই ঝালের উপশম ঘটাতে হয় তাকে। তবে ঝাল হলেও যে তা স্বাদে ও মানে উত্তীর্ণ ছিল তা জেসিকার কথায় স্পষ্ট। চিকেনের একটা টুকরো মুখে দিতে দিতে সাইমন সমর্থন জোগায় জেসিকাকে –

: তাহলে একদিন আমি এবং মা তোমার বানানো পাকোড়া খাবো। কী বলো?

সানন্দে সম্মতি দিতে হয় আমাকে। যদিও ডরমিটরির জীবনে রোজ কেউ রাঁধে না। সকলেই যার যার শিক্ষা গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু উইকএন্ডে কিছুটা বৈচিত্র্য আনার জন্যই প্রত্যেকে স্ব-স্ব দেশীয় খাবার রান্না করে। সেটা যে কেবল খাওয়ার জন্যই, তা নয়, স্বদেশি খাবারের প্রস্তুত প্রক্রিয়ার গোটা ব্যাপারটার মধ্যে থাকে এক ধরনের স্বাদেশিকতার বোধ। যেমন নাইজেরীয় সিদি ওকোঙ্কোকে রাঁধতে দেখেছি শুকনো মাছের গুঁড়ো দিয়ে কুচকুচ, আলবেনীয় এনভারকে মাংসের বুরেক, জার্মান হোল্টগেনকে মার্জিপান কুকিজ, ইতালীয় গ্রাৎসিয়াকে লাজানিয়া, চৈনিক শিপিংকে বেইজিং ডাক এবং আমি রান্না করেছি আলু দিয়ে ঝোল-ঝোল খাসির মাংস। নানা দেশের শিক্ষার্থীদের সম্মিলনে ডরমিটরির রান্নাঘর তখন সেইসব রান্নার সূত্রে যেন এক আন্তর্জাতিক সংঘে রূপান্তরিত, যে-সংঘে নেই কোনো রাজনীতি বা কালাকানুন, থাকে কেবলই জীবনের আনন্দপূর্ণ উদযাপন। ডেজার্ট হিসেবে খেলাম জেসিকার বানানো রাইস পুডিং। মূল উপাদান চালের জন্য তাকে বাসমতির ওপরেই নির্ভর করতে হয়। ইংল্যান্ডে চাল প্রধান খাদ্য না হলেও যেটুকু চাহিদা তাতে প্রায় সকলেরই প্রথম পছন্দ বাসমতি। আমার প্রধান খাদ্য ভাত হলেও জেসিকার আয়োজন ছিল ফ্রেঞ্চ ব্রেড আর আইরিশ জ্যাকেট পটেটো।

ডিনার শেষে আমরা ফের সিঁড়ি বেয়ে সুজানের কামরায় এসে পড়ি। সাইমন আর জেসিকা থাকে নিচতলায়। টিভিতে মশগুল দুজনেই। আজ সম্ভবত চেতেনহ্যাম রেসকোর্সের ঘোড়দৌড় সরাসরি দেখাবে। জানি না ওরা বাজি ধরে কি না। ঘোড়দৌড়ের বাজি এখানে সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। কাজেই জেসিকা আর সাইমন যদি রেসকোর্সের উত্তেজনায় ফুটতে শুরু করে ডার্টফোর্ডে তাদের ড্রইংরুমে বসে তাতে দোষের কিছু থাকে না। এসব ব্যাপারে আমি নিরুত্তেজ, হয়তো সুজানও। কেননা বইপাঠে তার নিমগ্নতা দেখে মনে হয় না একই সুজান এইসব ঘোড়দৌড়ের তৎপরতায় অস্থির হয়ে উঠবে। সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে নিজ থেকেই সুজান আমার বাহুতে হালকা চাপ দিয়ে বলে, মায়ের রান্না কেমন লাগলো? ওর চাহনিতে কেমন যেন একটা মাদকতার আভাস। গ্রীষ্মের সুযোগে হাতকাটা টপস আর স্কার্ট পরা তাকে মনে হয় ঠিক ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানির অড্রে হেপবার্ন। উন্মুক্ত তার দুটো হাত দুই গোলাপি ডানার মতো দেখায়। উড়াল হয়তো দেবে না সেই ডানা; কিন্তু মনের মধ্যে বয়ে আনবে উড়ালেরই স্মৃতি। এসব মুহূর্ত সত্যিকার অর্থেই আবেগী। প্রায়ই হলিউডের সিনেমায় দেখেছি এসব মুহূর্তে নায়ক-নায়িকা তাদের প্রাণের আবেগকে নির্মলভাবে প্রকাশ করার জন্য পরস্পর চুম্বন করে। সুজান আমার এতোটা কাছে অবস্থান করে বা আমি তার, সেটিকে নিঃসন্দেহে আবেগী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু চকিতে, যখন সুজান আমার মাঝখানে ন্যূনতম শূন্যতা, আমার ভেতরের মন প্রশ্নসূচক, যে-মুহূর্তকে আবেগের মুহূর্ত ভাবছি সেটা কি ‘আমার’ না ‘আমাদের’! একই আবেগের মুহূর্ত বা মুহূর্তের আবেগ কি আবিষ্ট করে সুজানকেও। যদি তা না করে তাহলে আমার উদ্যত অগ্রসরমানতা তার কাছে কি আগ্রাসন বলে মনে হবে না। নিশ্চিত হতে পারি না আমি। হেলেপড়া দুপুরের হাওয়া আর সূর্যালোকে ঘরের ভেতর আর বাইরের পারস্পরিকতায় নির্জনতার যে-পর্ব রচিত হয় অকস্মাৎ সেটিকে স্বপ্নময় যদি না-ও বলি অন্তত বর্ণনাতীত তো বলাই যায়। জানি না, আমার ভেতরের ভাবনা সুজানের মধ্যে কোন বাস্তবতায় অনূদিত হয় বা আদৌ সেই ভাবনা তার মধ্যে পৌঁছায় কি না, সুজান অনেকটা আবদারি ভঙ্গিতে বলে ওঠে –

: তোমার ডর্মে গিয়ে একদিন গোটাদিন কাটাবো আমি। তুমি রান্না করবে তোমার পছন্দের খাবার। খেয়েদেয়ে আড্ডা মেরে ফিরবো। মজা হবে না, কী বলো!

সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে সুজানের কামরায় ঢুকি। চাইলে ওর কামরায় বিশ্রাম নেওয়া যেত খানিক। কিন্তু ভেতর থেকে কারো কণ্ঠ শুনতে পাই, তোমাকে আরো সময় নিতে হবে। সংশয় থেকে সত্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো সময়। আমি তাই পরদিনকার লাইব্রেরি শিডিউল চূড়ান্ত করে বিদায় সম্ভাষণ জানাই সুজানকে। তিনজনই আমাকে উষ্ণ বিদায় সম্ভাষণ জানায়। উলওয়ার্থের কোয়ালিটি স্ট্রিট চকোলেট বক্স আনার জন্য আরো একবার ধন্যবাদ জানালো জেসিকা। সাইমনও বললো একই কথা – কোয়ালিটি স্ট্রিট তার সবচেয়ে প্রিয় চকোলেট। সুজানের সঙ্গে নিচে সদর দরজায় বিদায়ী করমর্দন করতে গিয়ে মনে হলো তার হাতটায় কোনো হাড় নেই, সম্পূর্ণ নরম কোনো উপাদানে তৈরি তার হাত। নাকি সেটা আমার ভাবনাভ্রম! গ্রীষ্মের প্রলম্বিত বিকেল সন্ধ্যার দিকে গড়াতে তখনো কিছু বাকি। ডরমিটরির কাছাকাছি এসে ছোট্ট পার্কটাতে বসে নিজস্ব নির্জনতা উপভোগ করার জন্য এসে বসি একটা লোহার সিটে। পার্ক কোলাহলশূন্য। একটু দূরে দূরে একজন/ দুজনকে দেখা যায় গল্প করছে। এদিকটায় আবার টেমসের একটা সরু শাখা বয়ে এসেছে। এটাকে হয়তো স্বতন্ত্র ব্রুক বলা যাবে না, তবে অনেকটা ক্যানালের মতো। একটা লোক বড়শি ফেলে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ফাৎনার দিকে। নিশ্চয়ই শখের মৎস্যশিকারি। 

সুজানের সঙ্গে চমৎকার দুপুরটা কাটিয়ে আসার পর মনের কোণে ক্ষণে-ক্ষণে জেগে ওঠা সমস্ত প্রশ্ন অবকাশ পেয়ে আমার দিকে ধেয়ে আসে বেগে। সুজানের বাবা কোথায়, বেঁচে না প্রয়াত। নাকি জেসিকার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে তার স্বামীর। এমন শে^তাঙ্গ বৃত্তের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ সাইমন কেন? নাকি সাইমন জেসিকাদের ফস্টার সন্তান? পুরোটা সময় নিজের মধ্যে কোনো ধরনের কৌতূহলকে প্রশ্রয় না দিয়ে স্বাভাবিক থাকার আমার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সফল কিন্তু তাতে করে সুজান এবং ওর পরিবার সবকিছু এক নতুন বিস্ময় ও প্রশ্নবোধকতা জাগিয়ে তোলে আমার মধ্যে। জাহাজের ধোঁয়া কি হুইসেলও সেই ভাবনায় বুদ্বুদ জাগাতে পারে না। এটাও আমার মনে হতে থাকে, সুজান এবং আমি হয়তোবা আমাদের প্রাণাবেগের শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছে গেছি যেখানে একটি চুম্বনের প্রাসঙ্গিকতা প্রত্যাশিতই। তবু কেন মনে হলো, আমার আর সুজানের মুহূর্ত কি একই আবেগে শীলিত ছিল? পার্কের নির্জন কোণে সবটা প্রসঙ্গ প্রথম থেকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখার জন্য যেই না ডুব দিতে শুরু করেছি ঠিক তখন একটা লোক একটা দ্রুতগতি মানব দৌড়ে এসে আমাকে সম্ভাষণ জানায় – হ্যালো জেন্টলম্যান! প্রত্যুত্তর দিতেই খেয়াল করলাম, এই লোকটাই তো বড়শি বাইছিল ছোট্ট ক্যানালের মতো নদীটার তীরে। হ্যাঁ, তার ছিপটা একটা ভি-আকৃতির লোহার আংটার মধ্যে বসানো রয়েছে। সেটা স্পষ্ট বোঝাও যায়।

: তুমি কি এখানে আরো আধাঘণ্টা বসবে?

যে-লোককে কখনো দেখিনি, যাকে জীবনে দেখলাম

প্রথমবার সে কি না বলছে আরো আধা ঘণ্টা বসার জন্য। দুশ্চিন্তা আর সন্দেহ আঁকড়ে ধরে আমাকে। আরো আধা ঘণ্টা পার্কের আসনটাতে বসে থাকলে তার কী লাভ। নাকি এই আধা ঘণ্টা মাছধরার ব্যস্ততা শেষে সে আমাকে তার নিজস্ব কোনো কাজে লাগাবে। সাঁই করে ভেসে আসে সুজানের কণ্ঠ – দেখবে এইসব স্কিনহেডরা সুযোগ পেলেই, নির্জন জায়গায়, ট্রেনে-আন্ডারগ্রাউন্ডে, পার্কে আক্রমণ করে বসে বিদেশিদের। লোকটা অবশ্য স্কিনহেড না, তার মাথাভর্তি চুল। হ্যাঁ,

আধা ঘণ্টা পরে জায়গাটা হয়তো আরো খানিকটা ফাঁকা হয়ে যাবে এবং সময়টাও গোধূলির কাছাকাছি পৌঁছাবে। তবে কি লোকটা আমাকে সেই ফাঁকা অবস্থানে আক্রমণ করে বসবে! এইসব প্রশ্ন উদ্বেগ দুশ্চিন্তা একনাগাড়ে আমার ভেতরে ঘুরপাক খায় তথাপি আমি গম্ভীর কিন্তু প্রসন্ন ভাব নিয়ে লোকটাকে পাল্টা প্রশ্ন করি –

: কেন বলো তো? আরো আধা ঘণ্টা থাকলে কী হবে?

এবার লোকটার মুখমণ্ডল জুড়ে নির্মল হাসি ছড়িয়ে পড়ে। হ্যাঁ, আধাঘণ্টার স্বার্থচিন্তা মূলত তারই। হাসতে হাসতে সে বলতে থাকে –

: জেন্টলম্যান, এক ঘণ্টা ধরে ছিপ ফেলে বসেছিলাম এখানটায়। একটাও ধরা পড়লো না মাছ। যেইমাত্র তুমি এসে চেয়ারটাতে বসলে আর আমার বড়শিতে টুপ করে ধরা পড়লো একটা হেরিং। তুমি হলে আমার লাকি ম্যান। তাই বলছি তুমি যদি আরো আধা ঘণ্টা এখানে বসো তাহলে নির্ঘাৎ আমার বড়শিতে আরো ক’টা মাছ ধরা পড়বে। এখানে স্যামন ম্যাকারেল অ্যানচোবি কড কার্প পাইক সব ধরনের মাছই আসে। প্লিজ তুমি আর আধাটা ঘণ্টা বসো এখানে।

মাথা নেড়ে সায় দিই, বসবো আধা ঘণ্টা। তা-ও একটা ঝাপসা সংশয় খোঁচা দেয়, এটা কোনো ফাঁদ নয় তো, যেটা পাতা হলো মাছ দিয়ে। অল্ডগেট ইস্টের চার্চে বিকেল পাঁচটার ঘণ্টা বাজে এক এক করে পরপর পাঁচবার। লোকটা ততক্ষণে তীরে গিয়ে তার ছিপের সংস্পর্শে বসে। এখন সবচেয়ে ভালো হতো সুজান পাশে থাকলে। হয়তো এই আধা ঘণ্টার আড্ডা-আলাপে আমরা আরো কাছাকাছি পৌঁছে যেতাম পরস্পরের। আর সুজান পাশে থাকলে কোনো স্কিনহেডও সাহস করতো না আমাকে নির্জনে পেয়ে আক্রমণ শানানোর। সত্যি আমার সুজানকেই দরকার, তাকে চুমু দেবো কি দেবো না, দেওয়া উচিত কি অনুচিত – সেটা বড় কথা নয়, ওর পাশে থাকাটাই আসল। এটাও আমার মনে হলো, আজকের দুপুরের লাঞ্চকে কি ডেট হিসেবে বিবেচনা করা যাবে! রঁদেভু বলতে যা বোঝায়, সেখানে থাকে নির্জনতা, কোলাহলমুক্ততা। নাকি আজকের লাঞ্চটা সুজানেরই পরিকল্পিত কোনো ডেটের প্রেলুড! সুজানের পিতৃসূত্র, কৃষ্ণাঙ্গ সাইমন, সুজান এবং আমার সম্পর্কের বাস্তবতা ইত্যাকার নানা প্রশ্ন ভেতরে চক্কর দিতে শুরু করলে আমি চোখ বুঁজে মগ্নতার সন্ধান করি। আর তখনই লোকটার বড়শিতে আরেকটা মাছ ধরা পড়লে ভাবি, জগতে কত কুসংস্কারই না থাকে। কব্জির ঘড়িতে তাকাই, আধা ঘণ্টা যেতে আরো মিনিট পনেরো বাকি।