সন্দ্বীপের আজিমপুর গ্রামের সৈকতে দাঁড়িয়ে আছি।
সাঁঝের কোমল রোদ সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে মিলেমিশে ভাটির টানে চলে যাচ্ছে দক্ষিণে। মনে হচ্ছে কেবল রোদ নয়, রোদের ঢেউ বিষাদময় কাব্য-পঙ্ক্তি ছড়িয়ে সরে যাচ্ছে দূরে।
কিছু কি বলতে চায় ওরা?
মনে প্রশ্ন আসার সঙ্গে সঙ্গে মৃদু একটা শোরগোল শোনা গেল, স্পষ্ট নয়।
কান পেতে মগ্ন হয়ে শুনতে চেষ্টা করলাম ঢেউয়ের ভাষা। সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে মøান হয়ে আসছে। দূরে, দিগন্তের কাছে, আকাশ আর লালচে জল একাকার। মনে হলো, পৃথিবীর সব গল্প যন্ত্রণার চাদর গায়ে জড়িয়ে ওই সীমারেখার ওপারে জমে আছে।
প্রশ্ন করলাম, ‘কথা বলবে? আগেও এসেছিলাম অনেক কথা বলেছিলে।’
একটা ঢেউ এগিয়ে এসে পায়ের কাছে ভেঙে পড়ল আর ফিসফিস করে বলল, ‘গল্প কি কখনো শেষ হয়?’
আমি চুপ করে রইলাম।
ঢেউ আবার বলল, ‘তুমি যে গল্পের খোঁজে এসেছ, তা শুধু জাহাজডুবির গল্প নয়। তা মানুষের, রক্তের, বংশের আর অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প।’
আমি বসে পড়লাম বালুর ওপর। মনে মনে বললাম, ‘কীভাবে জানলে যে বঙ্গোপসাগরে জাহাজডুবির গল্প শুনতে চাই আমি?’
আমার মনের কথা বুঝে ফেলল ভেঙে যাওয়া ঢেউ। স্রোতের টানে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে আবার এগিয়ে এসে লুটিয়ে পড়ল পায়ে।
মুখ ফুটে এবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘সন্দ্বীপ উপকূলে মেঘনা আর সাগরের মোহনায় বাদুরা জাহাজডুবির কথা জানো তুমি?’
ঢেউ কিছুটা থেমে থেকে বড় রকম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
উত্তর না পেয়ে এবার আমি বলতে লাগলাম, ‘১৯৭১ সালে জীবন বাঁচাতে আমাদের পরিবারের সকলে সীতাকুণ্ডের কুমিরা ফেরিঘাট থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাম্পানে চড়ে আশ্রয় গ্রহণ করি নানার বাড়ি সন্দ্বীপের চৌকাতলি গ্রামে।
চাঁদনী রাতে বাড়ির উঠোনে মাদুর বিছিয়ে বড় মামি আমাদের রূপকথার গল্প শোনাতেন। চাঁদের দেশের সুতা কাটা বুড়ি, সুয়োরানি দুয়োরানি, চাঁদ সওদাগর, নানা গল্প বলতেন। সেই সঙ্গে বলেছিলেন ঐতিহাসিক বাদুরা জাহাজডুবির ঘটনাও। কিন্তু বড় হয়ে আমি কোথাও ইতিহাসে সে-কাহিনি খুঁজে পাইনি। সেটা কি লোকমুখে প্রচলিত কোনো গল্প না সত্যি ঘটনা?’
‘অনেক বছর আগে, তোমাদের পূর্বপুরুষেরা স্বপ্ন দেখতে জানত, তখনই সেই জাহাজে যাত্রা শুরু করেছিল সন্দ্বীপের কিছু আশাবাদী মানুষের দল। বাদুরা নামটা তাদের জন্য ছিল প্রবল এক আশ্বাসের বাহন। বড়, দৃঢ় আর আত্মবিশ্বাসী তাঁরা যদিও জানত, উর্বর ভূমি সন্দ্বীপকে একসময় বলা হতো স্বর্ণদ্বীপ। কালের পরিক্রমায় এসে দাঁড়িয়েছে সন্দ্বীপ। তবু তাঁদের একদল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবাসন গড়ার চিন্তা করেছিল। সেই জাহাজে উঠেছিল সন্দ্বীপের কীর্তিমান কিছু মানুষ। কেউ ছিল ব্যবসায়ী, কেউ নবীন স্বপ্নবাজ। কারো চোখে ছিল শহরের আলো, কারো মনে ছিল নিজের দ্বীপকে বদলে দেওয়ার ইচ্ছে। তোমার বংশের মানুষও ছিল সেখানে।’ জোরালোভাবে বলল ঢেউয়ের ভাঙনে ছলকে ওঠা ফেনিল উচ্ছ্বাস।
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ মোচড় দেওয়া একটা শব্দ হলো।
‘কে?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘নামগুলো হারিয়ে গেছে, কিন্তু রক্ত হারায় না। রক্তধারা প্রবহমান, বয়ে চলে দেহ থেকে দেহে।’ বলল ঢেউ।
বিষাদের একটা সুর ভেসে এলো। দূর সাগরের অনুচ্চারিত শব্দমালাই ভেসে আসতে লাগল সেই সুরে ভর করে।
‘… বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে।
তুমি আসিলে না, আশার সূর্য ডুবিল সাগর নীরে ॥
চলে যাই যদি চিরদিন মনে, তোমার সে-কথা রহিবে স্মরণে, শুধু সেই কথা শোনার লাগিয়া হয়তো আসিব ফিরে। …’
নজরুলের চক্রবাক কাব্যের কয়েকটি পঙ্ক্তি প্রতিধ্বনিত হলো কেন এই মুহূর্তে? ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেল পুরনো ইতিহাস। ১৯২৯ সালে নজরুল মোজাফ্ফরের সঙ্গে এসেছিলেন সন্দ্বীপে বেড়াতে। তখন তিনি চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অসংখ্য কবিতা রচনা করেছিলেন এই অঞ্চলের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে বসে। সেই কাব্যগ্রন্থ ছিল বিরহ-বেদনায় ভরা। মিলনের চেয়েও সেখানে প্রধান অনুভবের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিরহ।
তো, দুই বিরহের ধরন আলাদা হলেও কোথায় যেন অন্তর্গত এক মিল রয়েছে আর এখন তা অনুভবে একাকার হয়ে গেছে পূর্বপ্রজন্মের স্বজন-হারানো বেদনার সঙ্গে।
হঠাৎ ডানে তাকিয়ে থমকে গেলাম। বিশাল এক গাছের শেকড়ের গুঁড়ি উপড়ে আছে, শাখা-প্রশাখা ঝাঁকড়া চুলের বাউলের মতো দেখতে। এর প্রায় অর্ধেক বালিতে ডুবে আছে। বাকি অর্ধেক ভিজে যাচ্ছে ঢেউয়ের কোমল পরশে। চারপাশে জমেছে নানা ধরনের বাঁশের টুকরো, খড়কুটো, সমুদ্রের স্রোতে ভেসে আসা লতাপাতা, সাগরে চলমান জাহাজ থেকে ফেলে দেওয়া ব্যবহার্য টিনের কৌটা, আরো নানা ধরনের এটা-সেটা।
দেখলাম, গাছের গুঁড়ির একপাশ থেকে ছোট ছোট বাগদা চিংড়ির ঝাঁক শিকড় বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠছে, শিকড়ে জমে থাকা ছোট ছোট সামুদ্রিক পরজীবী উদ্ভিদ খাওয়ার চেষ্টা করছে। বড়গুলোকে মনে হচ্ছে গলদা, ছোটগুলোকে বাগদা। ওদের খাওয়ার জন্য আরেক পাশ দিয়ে দেখলাম কাঁকড়া লাইন ধরে উঠে আসছে। টপ করে ধরে ফেলছে ছোট বাগদা চিংড়ি। একেক জন একেকজনের খাবার। বেঁচে থাকার যুদ্ধে তারা লেগে আছে। জীবন মানেই যুদ্ধ। কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার তাকালাম ঢেউয়ের পানে। তটের দিকে নরম গতিতে এগিয়ে যাওয়া ঢেউ ভিজিয়ে দিচ্ছে একটু পেছনের বালুতটও। সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্তের চারপাশে কণা কণা বালির গুটি জমা হয়ে আছে। সেই গর্ত ভিজে যাচ্ছে। সেখান থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে অতি ক্ষুদ্র আকৃতির মাছ। সন্দ্বীপের আঞ্চলিক ভাষায় এর নাম লটকামাছ।
চোখের পলকে কাঁকড়া ছুটে গেল তাদের দিকে। টপ করে ধরে ফেলে দু-একটা। বাকি লটকার ঝাঁক চোখের পলকে গর্তের ভেতর উধাও হয়ে গেল। বাগদা বা গলদার দল এত দ্রুতগতিতে লটকামাছ ধরতে পারছে বলে মনে হলো না। ওরা ক্ষুদ্র মাছগুলো খায় কি না তা-ও বোঝা গেল না। তবে দেখতে লাগলাম, জীবনযুদ্ধে পাশাপাশি সবাই লড়াই করে যাচ্ছে খাবারের আশায়। একমাত্র মানুষই খাবার মজুদ করে রাখে জীবনধারণের জন্য আর প্রকৃতির এই নান্দনিক ক্ষুদ্র প্রজাতির মাছগুলোকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়, বেঁচে থাকতে খাবার ধরতে হয়। অন্যদেরও খাবার হয়ে যায় তারা।
বাদুরা জাহাজের যাত্রীরা কি জীবনযুদ্ধে উন্নতির আশায় পাড়ি জমাতে চেয়েছিল সুদূর পশ্চিমা বিশ্বে? সেখানে কি তারা পারে নিজেকে গড়ে তুলতে, নাকি অন্যদের জীবন গড়তে গিয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে? মনে জেগে ওঠা প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইলাম বিশাল সাগরের দিকে।
দুই
‘ওই বাদুরা জাহাজে যাত্রী ছিল সন্দ্বীপের এক ধনাঢ্য তরুণ, তোমাদের কয়েক প্রজন্ম পূর্বের বংশধরের উজ্জ্বলতম বাতি। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে বসতি করেছিল। বিয়ে করে নববধূকে নিয়ে যাচ্ছিল। তার নাম জামশেদ আর বধূটির নাম লিমা।’
চোখ সরু হয়ে গেল, কানও খাড়া হয়ে গেল। সেলুলয়েডের ফিতা থেকে চলমান ছবির মতো করে ঢেউ বলতেই লাগল জাহাজের ভেতরের জীবনকথা – ‘ডেকে দাঁড়িয়ে হাসছিল নবদম্পতি। অনেক তরুণ যাত্রীও সঙ্গে ছিল। অনেক শ্রমজীবী মানুষও। কেউ গান ধরেছিল। সমুদ্রের ওপর ভাসতে ভাসতে গান ও সুরের তালে অসাধারণ ছিল সেই যাত্রা।’
এটুকু বলেই ঢেউ ভেঙে গেল, কিছুক্ষণ থেমে আবার পিছিয়ে গেল। আবার ফিরে এসে পা ভিজিয়ে দিলো।
‘তারপর কী হলো?’ প্রশ্ন করলাম আমি।
‘একজন বৃদ্ধও ছিলেন যাত্রী হিসেবে। আপনি কোথায় যাবেন?’ তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল জামশেদ।
‘আমারও ভবিষ্যৎ আছে। নতুন করে সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমিও যাত্রী, জীবনযুদ্ধের যাত্রী।’
‘এই পড়ন্ত জীবনে আবার ভবিষ্যৎ কী?’
‘এই যাত্রা শুধু পড়ন্তবেলার পথ হারানোর জন্য নয়, নির্মাণেরও। আমার উত্তর-প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যৎ মজবুত করার দায়িত্ব আমার। যতক্ষণ শক্তি আছে, সাহস আছে, ততক্ষণ আমি কর্মক্ষম। আমি হচ্ছি আমার পূর্ব-প্রজন্মের ক্রোমোজোমের এক্সটেনশন। আর উত্তর-প্রজন্ম আমার ক্রোমোজোমের এক্সট্রেনশন। জীবের তো বিনাশ নেই। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম চলতে থাকে। এক প্রজন্ম শ্রম আর বুদ্ধি দিয়ে অর্জন করে, আরেক প্রজন্ম ভোগ করে অথবা নিঃশেষ করে দেয়। ব্যান্ড সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর একটা গান আছে। জানো না তার কথা?’
বৃদ্ধের উত্তর শুনে থমকে যায় জামশেদ। বাকরুদ্ধ হয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। প্রচণ্ড একটা ঢেউ এসে জাহাজটাকে কাঁপিয়ে দেয়। আকাশে মেঘের ঘনঘটাও সে দেখতে পেল। তবে দেখল, পাশে দাঁড়ানো লিমা নির্বিকার। বরং কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করে, ‘আপনার প্রজন্মের কিংবা
উত্তর-প্রজন্মের কে কে বেঁচে আছেন? কী করতে চান তাদের জন্য?’
বৃদ্ধ কোনো জবাব দিলেন না। তার চোখ খোলা। তিনিও দেখলেন ঈশান কোণে ভয়াল মেঘের উথালপাতাল ঢেউ। পূর্বাভিজ্ঞতার কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে গেলেন, কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখ কুঁচকে গেল।
একজন তরুণ উত্তর দিলো, ‘আমরা ফিরব। সবকিছু বদলে দিতে কিংবা বদলে গিয়ে ফিরব। মানুষের দুর্দশা দূর করব, দ্বীপের উন্নয়নের জন্য জীবন উৎসর্গ করব।’
ঢেউ হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসিতে বিষাদ-মেশানো। তবু বলল, ‘মানুষ আশায় বাঁচে। সবসময় ভাবে, সে ফিরে আসবে। কতকিছু করবে। সবার ভাগ্যে কি তা জোটে? সবাই কি সফল হয়? কে কোথায় যাবে, কী করবে, বর্তমানে বসে তার ভাবনা ভাবনাই থেকে যায়। তবু ভাবে। ভাবনায় বেঁচে থাকে মানুষ।’
বৃদ্ধের কথার কোনো অর্থ ধরতে পারল না লিমা। বরং হঠাৎ জাপটে ধরল জামশেদের ডান বাহু। একই সঙ্গে নির্ভরতা আর ভালোবাসার আশ্রয়স্থল স্বামীর বুকের সঙ্গে সেঁটে গেল মুহূর্তের কম্পনে। বড় একটা ঢেউ এসে কাঁপিয়ে দিলো পুরো জাহাজ।
তিন
‘সন্ধ্যার পর আকাশের রং বদলে গেল। দূরের কালো মেঘ আরো কাছে এসে চারপাশে বেপরোয়া ঘূর্ণি তুলতে লাগল। তার দাপটে বঙ্গোপসাগরেও অনিয়ন্ত্রিত বেসামাল ঢেউ অশনিসংকেত ছড়িয়ে দিলো।’ এই মুহূর্তে সেই সময়ের সাক্ষ্য দিলো নতুন করে আসা ঢেউ।
একজন নাবিক, জামশেদের কাকা, হুলু মিয়া, ওই জাহাজেরই সুকানি। জাহাজের ডেকে ছুটে এসে বললেন, ‘বাবা, বউমারে লইয়া ভিতরে যাওগা, কেবিনে চলি যাও। আকাশের অবস্থা ভালা ঠেইকছে না। ইয়ান ভালা লক্ষণ না। তয় ভয় পাইও না। দরিয়ায় এমনডা হরহামশা ঘইটা থাকে।’
‘আঁয় ডরাই ন। আমনেরগো বউমা এক্কানা ডরাইছে মনে অয়।’
‘না। না। ডরের কিচ্ছু নাই। ভিতরে যাগোই, বউমা।’
‘এতসব কথা শুনেও নিয়মিত চলাচল করে এমন অধিকাংশ যাত্রীরা ছিল নির্ভার। কেউ সেটাকে ভয়ের কিংবা অশনিসংকেত হিসেবে দেখল না।’
কিছুটা থেমে থেকে বিষাদ কণ্ঠে ঢেউ আবার বলতে লাগল, ‘সমুদ্র আগে থেকেই জানত। কী করতে যাচ্ছে, বুঝে ফেলেছিল।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি তাদের সতর্ক করোনি?’
‘আমরা, ঢেউয়েরা সবসময় সতর্ক করি। আমরাও তো নিম্নচাপের শিকারে পরিণত হই, ঝড়ঝঞ্ঝার তাণ্ডবের শিকারে পরিণত হই। কিন্তু মানুষ সবসময় শোনে না আমাদের সতর্কবার্তা। আমরা ভূখণ্ডের চারপাশ ভাসিয়ে দিলেও, জলোচ্ছ্বাসের ভয়ালগ্রাসে জনবসতি উজাড় করে দিলেও, মানুষ, জীবজন্তু, গবাদিপশু, ক্ষেত-খামার সব নাশ করে দিলেও এই দায় আমাদের নয়। সমুদ্রে সৃষ্ট নিম্নচাপই এর জন্য দায়ী।’
চার
‘হঠাৎ ঝড় নেমে এলো। বাতাস তীব্র হয়ে উঠল। জাহাজ দুলতে লাগল, ভয়ংকর সেই দোলা। একবার জাহাজ বাঁ-দিকে কাত হয়, আবার ডানদিকে। ঝপ করে ডেকের ওপর পানির স্রোত চলে আসে। সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় ডেকের ওপর থেকে। কখনো জাহাজের অগ্রভাগ পানিতে ডুবে যায় আবার ভেসে ওঠে। সকল যাত্রী জাহাজের ভেতরে ঢুকে গেছে। কিন্তু ভেতর থেকে সমস্বরে চিৎকার ভেসে আসছে। কেউ আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার করছে, হিন্দুরা ভগবান বলে। সুকানি দিশেহারা হলেও আপ্রাণ চেষ্টা করছে জাহাজের গতি ঠিক রাখতে। মেঘের গর্জন আর বাতাসের তাণ্ডব আমাদের ঢেউয়ের জীবনকে দানবীয় রূপে জাগিয়ে তুলতে লাগল, আমরা তাণ্ডব চালাতে লাগলাম বা চালাতে বাধ্য হলাম, সেইসঙ্গে শুনতে লাগলাম জীবন বাঁচানোর চিৎকার। ডেকের ওপরেও যাত্রীরা একবার ডানে আরেকবার বামে আছড়ে পড়ছে। কেউ মাথায় আঘাত পাচ্ছে। কেউ রক্তাক্ত হয়ে গেছে। কেউ অজ্ঞান হয়ে গেছে। কেউ বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে। চারপাশের আতঙ্ক, দৌড়ঝাঁপ – সব একসঙ্গেই চলতে লাগল। আমরা তার সাক্ষী হয়ে রইলাম। একজন মা তার শিশুকে বুকে চেপে ধরল। আল্লা বাঁচাও, আল্লা বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। একজন যুবক অন্যদের বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে। কেউ প্রার্থনা করছে, কেউ কাঁদছে। জামশেদ তার কেবিনে লিমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। বারবার বলছিল ভয় নেই, ভয় নেই, লিমা। আমার বুকের ভেতর থেকে তোমার অবস্থান কেউ ছোটাতে পারবে না।’
কিছুক্ষণ দম নিয়ে ঢেউ বলতে লাগল, ‘সেই রাতে আকাশও কেঁদেছিল।’
আমি চোখ বন্ধ করলাম। মনে হলো সবকিছু দেখতে পাচ্ছি এই মুহূর্তে।
পাঁচ
আকাশের কান্নার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মানুষের দুঃখে আকাশও কাঁদে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো।
হঠাৎ নতুন ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল বালুতটে।
‘চট করে কোনো কিছু অবিশ্বাস করতে নেই। বিশেষ করে কেউ যখন আন্তরিকভাবে কথা বলে তার কথা বিশ্বাস করতে হয়।’
কিছুটা অভিমান মেশানো ঢেউয়ের কথা শুনে সংকোচ জেগে উঠল মনে। তবু বললাম, ‘বেদনাদায়ক ঘটনা প্রথমে মানুষ অবিশ্বাস করে, ডিনাই করে। এটা মানুষের অন্তর্গত একটা বিষয়। মনোবিদ ফ্রয়েড কথাটা বলে গেছেন। যদিও আনহেলদি, তবু নিজেকে সুরক্ষা করার এটি এক অন্তর্গত স্বয়ংক্রিয় বিষয়।’
‘আচ্ছা, বুঝলাম।’ বলেই থেমে গেল ঢেউয়ের কথা।
‘কথা বলছো না কেন? রাগ করেছো আমার ওপর? সরি বললাম। তারপর বলো কী ঘটেছে?’
‘একটা প্রচণ্ড শব্দে জাহাজ কেঁপে ওঠে। তারপর অনিবার্যভাবে সেটা ডুবতে শুরু করে।’
আমি চেয়ে রইলাম শূন্য দৃষ্টি মেলে। এখনকার ঢেউ কত শান্ত! সুবোধ বালকের মতো কিংবা লজ্জাবতী বালিকার মতো মাথা নিচু করে বয়ে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণে, সাগরের মোহনার দিকে। দূরে দেখলাম অসংখ্য জাহাজ নোঙর করে আছে। কয়েকটা সাম্পান ছুটছে পাল তুলে, মাছ ধরার ট্রলারগুলো যে যার মতো কাজে নেমে পড়েছে। তবু স্মৃতি আমাদের কাতর করে; সমুদ্রের দিকে তাকালে বাদুরা জাহাজডুবির মর্মান্তিক কথা ভেসে ওঠে মনে। আরো কিছু জানার আগ্রহে প্রশ্ন করলাম, ‘তারপর কী হলো?’
‘মানুষ পানিতে পড়ে যাচ্ছে। কেউ ভাসতে চেষ্টা করছে, কেউ আর পারছে না। খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু একসময় সবকিছু থেমে যায়। ওই সময়ের প্রবল ঢেউও। অথচ ডুবিয়ে দেয় জাহাজটিকে।’
‘তুমি বা তোমরা কি কাউকে বাঁচাতে পেরেছিলে?’
ঢেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলো, ‘আমরা বাঁচাই আবার জীবন হরণও করি। নিজের ইচ্ছায় নয়। অনিচ্ছায়। এটাই আমাদের নিয়তি।’
ছয়
সাগরের কোনো গর্জন নেই। বিষাদঘন বাতাস ভেসে আসছে। সূর্য ডুবে গেছে। তবে চারপাশ ঘন আঁধারে ডুবে যায়নি। এক নিঃশব্দ ইতিহাসের বুনিয়াদের মূল ভিতের ওপর আমি বসে আছি। অথচ ইতিহাস জানি না। জানার অদম্য বাসনায় তবু জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর?’
‘তার আর পর নেই। তারপর কেবল নীরবতা।’ ঢেউ বলল।
কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই। কোনো বড় ইতিহাসের বইয়ে লেখা নেই এই করুণ কাহিনি। শুধু শত শত পরিবারে রয়ে গেছে গল্প, ‘তাদের একজন ছিলেন, ফিরে আসেনি আর।’
ঢেউ বলল, ‘তোমরা মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর আর হিংস্র। তোমরা ইতিহাস লেখো, কিন্তু সব বা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখো না!’
নিজেদের হিংস্রতা আর নিষ্ঠুরতা আবিষ্কার করে মনটা বড় কাতর হয়ে পড়ল। মাথা নিচু করে বসে গেলাম বালুতটে।
সাত
বালুর ওপর হাত রাখলাম। চেষ্টা করলাম সাগরে হারিয়ে যাওয়া সন্দ্বীপবাসী এবং পূর্বপ্রজন্মের স্বজনদের স্পর্শ পেতে।
ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘আমার মধ্যে কি তাদের অস্তিত্বের কিছুই বহমান নেই?’
‘তোমার রক্তে তাদের অসমাপ্ত যাত্রা বয়ে চলেছে।’
‘তাদের স্বপ্ন?’
‘সেগুলোও।’
‘তাদের ভয়, কষ্ট, যন্ত্রণা?’
‘তাও। আর সে-কারণেই তুমি রাজধানীর চাকচিক্যের ভেতর থেকেও ছুটে এসেছো শিকড়ের টানে, পূর্বপ্রজন্মের কিংবা বংশের স্মৃতির খোঁজে।’
ঢেউয়ের স্বীকারোক্তি শুনে মন নরম হয়ে এলো।
‘আমরা কাউকে শত্রু মনে করি না।’ বলল ঢেউ।
‘কিন্তু আমরা কাউকে ছাড়ি না, শত্রুকে তো নয়ই। ক্ষমা করতে পারি না, আমরা প্রতিহিংসাপরায়ণ।’ আমি বললাম।
‘তাহলে এসব গল্প শুনতে চাচ্ছো কেন? কেন ছুটে এলে এতো দূর?’
‘জানি না।’
‘কারণ তুমি চাও, কেউ না কেউ মনে রাখুক, অতীত মনে রাখুক, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ুক।’
আট
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বর্তমানে সৈকতের ভেজা মাটির ভেতর থেকে আকস্মিক একটা গড় গড় শোরগোল ছড়িয়ে যেতে লাগল। পুরো দ্বীপ আজ শান্ত। স্বাভাবিক নিয়মে গড়িয়ে যাচ্ছে সময়। হঠাৎ করে এই অস্বাভাবিক শব্দ কোত্থেকে আসছে?
এই সৈকতের নিচেও কি তবে লুকিয়ে আছে অনেক গল্প?
আমার মনে জেগে ওঠা কষ্টটা টের পেয়ে ঢেউ আবার এসে পা ভিজিয়ে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি লিখবে সেই করুণ গাথা?’
‘লিখব। অবশ্যই লিখব। তবে আমাকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে হবে অনেক কিছু।’ জোরালোভাবে জবাব দিলাম আমি।
‘তাহলে যা জেনেছ, তাকে শেষ ভেবো না।’
‘কেন?’
‘সামনে তাকাও। শোরগোলের অর্থ বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমাকে সহায়তা করছি। আমার প্রবল ঢেউয়ের একটা জলধারা ওই নরম বালির ভেতরে ঢুকে যাবে। সেখান থেকে কারা বেরিয়ে আসে, দেখো। তারা কী সাক্ষ্য দেয়, শোনো।’
আমি একবার দূরে তাকালাম। অসীম সাগরের শব্দরাজি শোনার চেষ্টা করলাম। না। সেই শব্দের চেয়ে বালির ভেতর থেকে জেগে ওঠা শোরগোলের শক্তি আরো বেশি জোরালো। আরো বেদনাবিধুর, আরো প্রাণকাড়া। তবু তাকালাম দিগন্তের পানে। সেখানে আকাশ আর জল এক হয়ে গেছে।
জীবন-যৌবন, অর্থ-বিত্ত-সম্পত্তি মাটির সঙ্গে যেভাবে মিশে যায়, ঠিক তেমনিভাবে আকাশ মিশে গেছে জলে।
চমকে গিয়ে আবার তাকালাম সামনে। দেখলাম বালির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে বিশাল আকৃতির সারবাঁধা কচ্ছপের দল। তাদের সামনে রয়েছে আরো বিশাল সাইজের বয়স্ক এক কচ্ছপ। সে তার মাথাটা বের করে আমার পায়ের কাছে এসে গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করল। তারপর চিৎকার করে কী যেন বলতে লাগল।
ওদের কথা বুঝতে পারছি না।
দিশেহারা হয়ে ঢেউকে প্রশ্ন করলাম, ‘ওরা কী বলছে?’
‘তুমি ভয় পেয়ো না। ভয় পেয়ে গেছ। এজন্য ওদের কথা বুঝতে পারছ না। ওদের বন্ধু ভাবো। তোমার চোখের মণির সঙ্গে ওই বয়স্ক কচ্ছপের চোখের মণির সংযোগ ঘটাও। তাহলে ওদের বলা কথার দৃশ্যপট ভেসে উঠবে তোমার চোখে। ওদের কথাও বুঝতে পারবে তখন।’
‘তোমার রক্তের গন্ধ পেয়ে গেছি আমি। এই গন্ধের সঙ্গে মিশে গেছে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা এক নববিবাহিত দম্পতির ঘ্রাণ। বিশেষ করে তরুণ বয়সী জামশেদের দেহের গন্ধ। তুমি জামশেদের বংশধর। তোমার দেহকোষের ক্রোমোজোমের ভেতর লুকিয়ে থাকা আরএনএ, ডিএনএ’র মধ্যে সেই বংশের বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে।’
‘তুমি নিশ্চিত বলছো?’
‘অবশ্যই। আমাদের আয়ুষ্কাল মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি। আমাদের ঘ্রাণের শক্তিও অনেক বেশি স্থায়ী এবং নির্ভুল। সেই ক্ষমতা দিয়ে বলছি, তোমার পূর্বপুরুষ জামশেদ বাদুরা জাহাজডুবির পর তার বিবাহিত স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে ভাসতে ভাসতে চলে এসেছিল এই বালুতটে।’
‘তারা মৃত ছিল?’
‘না। জীবিত ছিল। তবে মনে হচ্ছিল তাদের স্মরণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ছিল।’
‘তারপর কী হলো? তোমরা কী করলে?’
‘আশেপাশে আমরা নৌকা খুঁজতে লাগলাম, জীবিত মানুষ খুঁজতে লাগলাম। চারপাশে কোনো মানুষ জীবিত ছিল না। শুধু ওরাই ছিল জীবিত। আমরা ধরে নিলাম কোনো মানুষের কাছে না পৌঁছালে তারা বাঁচবে না। হঠাৎ দেখলাম দূর সাগরে একটা বড় জাহাজ ভেসে আছে। তখন আমাদের কচ্ছপ-যোদ্ধা বাহিনী তাদের দুজনকে পিঠে করে নিয়ে চলে গেল সেই জাহাজের কাছে। জাহাজের নাবিকেরা দেখতে পেয়ে স্পিডবোট নিয়ে ছুটে আসে। তারপর তাদের যখন ধরতে পারল আমরা চলে আসি।’
‘তোমরা কি বলতে চাও তারা বেঁচে আছে? ওই জাহাজে চড়ে কোথাও চলে গেছে বা তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে?’
‘অবশ্যই তারা বেঁচে ছিল। অবশ্যই তারা বেঁচে আছে। অবশ্যই পৃথিবীর কোনো না কোনো দেশে তারা সুস্থ হয়ে জীবনযাপন করছে। এটা আমাদের বিশ্বাস। এ-ও জানি এই ইতিহাস তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। লোকমুখে নানা কথা, নানা মিথ প্রচলিত আছে। কিন্তু এটাই সত্য।’
আমি কচ্ছপ অধিপতিকে স্যালুট জানালাম। ভালোবাসা জানালাম। মানুষের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ দেখে মুগ্ধ হলাম। কেবল মনে হলো মানুষের প্রতিই মানুষের ভালোবাসা নেই। আমরা এক দেশের মানুষ আরেক দেশের মানুষকে হত্যা করছি, ধ্বংস করছি অন্য দেশের অবকাঠামো, নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য অন্যকে তুচ্ছ করছি, মেরে ফেলছি। অথচ এই সামুদ্রিক প্রাণী মানুষের পাশেও দাঁড়াতে পারে বন্ধু হয়ে। কৃতজ্ঞতায় নতজানু হয়ে তাকে আবারও স্যালুট জানিয়ে তাকালাম সাগরের দিকে। কিছুই চোখে পড়ছে না। অথচ হঠাৎ মনে হলো, সেখানে এখনো একটি জাহাজ ভাসছে। অদৃশ্য দৃশ্যের বাইরেও দৃশ্য থাকে। সেই ধোঁয়াশাময় প্রকৃতির দৃশ্যপটও জীবনের কথা বলে।
‘সত্য দেখার ক্ষমতা আছে তোমাদের। এটাই কি জীবনের কঠিন পরিণতি নয়? এজন্যই কি তোমাদের বিশ্বকবি ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে বলে যাননি, ‘পৃথিবীতে কে কাহার’?’
‘ঠিক বলেছ। বলে গেছেন তিনি। কঠিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারেননি। মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আমি মিথ ভেঙে ফেলব। দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করব জামশেদ আমারই পূর্বপুরুষ আর লিমা আমার প্রিয় সন্দ্বীপের মাটির সন্তান। তাঁদের অস্তিত্ব আমাদের মধ্যে বহমান। আমি একদিন তাদের খুঁজে বের করবই।’
হঠাৎ মনে হলো ঘন ধোঁয়াশা ভেদ করে দক্ষিণ সাগরের বহুদূর থেকে ভেসে আসছে একটা জাহাজ। বিলাপ করছে। এটাই কি তবে সেই ডুবে যাওয়া বাদুরা জাহাজের আর্তনাদ? নাকি সমুদ্রের বিলাপ?


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.