হয়তো সেটা ছিল ১৩১৪ বঙ্গ সন, বা হয়তো তার আগের অথবা পরের অন্য কোনো সনও হতে পারে। সনের সঠিক হিসাব স্মরণে পরখে চলাচলতি করা বেটাপোলা বা মাতারিসকল, তখন সেই তল্লাটে, মোটের ওপর ছিলই না। হিজরি-চান্দের হিসাব রাখলে রাখে মসজিদের হুজুরে। সেই মসজিদও এই শনখোলা গ্রাম থেকে অনেক দূরের, আরেক কোনো এক দেওভোগ গ্রামে আছে। সেই দিকে এই গ্রামের লোকের পারতপক্ষে আসা-যাওয়া নাই।
তো, বচ্ছর যেইটাই হোক, আমাদের এই পরস্তাবের পত্তনি ঘটেছিল এক আশ্বিন মাসে। আশি^ন মাসের শেষ দিনে। শনখোলা গ্রামের সর্বলোকের কাছে, আশ্বিনের শেষদিন তো কেবল একটা মাসের শেষদিন না, ওইটা এক কড়ড়া ব্রতপালনের দিন। কে না জানে, এই আশিশন্না-কাত্তিক্কা ব্রত হইল এক এমন মহাব্রত, তুমি যদি জান-পরান দিয়ে ব্রতখানা পালন করতে পারো, তাইলে পুরা এক বচ্ছরের মনস্কামনা তোমার সিদ্ধ হবেই হবে। ডাক আর খনার মায়ে তো জানান্তি দিছেই যে, আশ্বিনে রাইন্ধা কাত্তিকে খায়/ যেই বর মাঙ্গে সেই বর পায়।
যুগ-জীবন ধরে মা-নানি-পরনানির আমলের সকলেই, গ্রামের ঘরে ঘরে, এই
আশ্বিনা-কারতিক্কা ব্রত আচার-আচরি করে গেছে। কোনোপ্রকার গাফিলতি করে নাই কেউ, কোনোকালে। মুরুব্বিগণরে দেখেই না পোলাপানে সহবত-তমিজ-ভালা-বুরাইয়ের ভেদ-অভেদ শিক্ষা পায়! গ্রামের সকল পোলাপানে মুরুব্বি মাতারিগণের কাছেপিঠে লড়েচড়ে লড়েচড়ে, ক্রমে সর্বমাসের সর্বব্রতের আদব-কায়দা-রীতি-নিয়ম শিক্ষা করে ফেলে। শিক্ষা করতে করতেই তারা দিনে দিনে ডাঙর হয়ে ওঠে।
পোলাসন্তানেরা ডাঙর হতে হতে ক্রমে এইসকল ব্রত সংঘটনের হুড়াতাড়া থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এইসবের সমস্তই তো মা-দাদির ক্রিয়াকারবার, সিয়ান বেটাপোলার সেইখানে করার তো কিছু নাই। শিশুকালে বুঝে না-বুঝে তাদের কোলে কোলে থেকে যা করার, করেছে। কিন্তু বড়োকালে এখন ওইখানে বেটাপোলার কী করার আছে!
এমনে এমনেই শনখোলার দিন যায় রাইত পোহায়।
শেষে একদিন আবার শনখোলায় আশ্শিন মাসের শেষদিনটা আসে। আসে আমাদের এই পরস্তাবের আশ্শিনা-ব্রতের কালখানা। এই ব্রতখানা এই গ্রামের মাতারিগণের বহুতই আল্লাদের এক ব্রত। সম্বচ্ছরের আশা-বাস্নাগুলারে এইদিন তারা, একে একে অন্তরের ভিতরে লাড়েচাড়ে, আর খোদার কাছে নিজ নিজ বাঞ্ছাসকল পুরা হওনের ফরিয়াদ দেয়।
‘সামনের আশ্শিন তক য্যান ভালাইয়ের মধ্যে থাকে আমাগো জিন্দিগি।’
‘বড়ো ঘরের চালের শন য্যান, অঘোর বাদলায়, তেনাতেনা ঝুরঝুরা হওনের গরদিশের তলে না পড়ে মাবুদ।’
‘রুপার একজোড়া পাও-ঝাঁপ য্যান এই বচ্ছর বানান্তির উপায়টা হয়, পরোয়ারদিগার। সেই রুপার পাও-ঝাঁপ য্যান ঝিয়ের হউর-বাইত তগনগদ দিয়া আওনের কিসমতটা দেয় মাবুদে। পাও-ঝাঁপ দেওয়া হয় নাই দেইখ্যাই, নয়া বিয়াইস্তা ঝিটারে নাইওর আইতে দেয় না।’ এমন-তেমন কত কত বর থাকে তাদের মাঙ্গনের। সমস্ত রাত জাগনা দিয়া অন্তরের ভিতরে অইসব বাঞ্ছারে আনা-নেওয়া করতে করতেই সকলে দেখে, আত্কার উপরে য্যান আসমান ফস্সা হইয়া যায় যায়।
এই দিনে, বাড়ির মাতারিসকলের কেবল ফলাহারের বিধি। রাঁধা-অন্ন পাতে নেওয়া মানা। তবে সংসারে তো কেবল তারাই নাই। ঘরে ঘরে তো সংসারের আসল মাথা, পুরুষপোলারাও আছে। তাদের জন্য চুলা তাদের ধরানো লাগে না? লাগে। তবে সেই কর্ম করার জন্য তাদের সকলেরই হাত-রথ য্যান লড়তে চায় না। তাও যেট্টুক করে, করে অতি অনিচ্ছার সঙ্গে।
এইদিনে ব্রতের বিধান হলো : আশ্বিনে রান্ধবা তুমি, কিন্তু সেই খাওন খাইবা কাত্তিকের পইল্লা দণ্ডে।
আর এই শেষদিনে, বেইল দুপুরের মধ্যে যা রান্ধনের, রান্ধো তুমি ত্বরা কইরা। তারপর থেকে সকল বাড়িতে কেবল অরন্ধন। সকল চুলা ঠান্ডা, শীতল, মরা মরা হয়ে পইড়া থাকা। একদম কিনা সেই কাত্তিকের পয়লা দিনের দুপুরের কাল পর্যন্ত, চুলা অমন নিভন্ত রাখোনেরই বিধি। আর ব্রতঅলীগণের কেবল কিঞ্চিৎ ফলাহার। কিন্তু আদতে উপাসই সেইটা।
তো, এখন আশ্শিন্না শেষ দিনে ঘরের বেটাপোলাদের পাতে দেওয়ার জন্য মুগ নাইলে কলাইয়ের ডাল রান্ধো। শাক লতাপাতা-রসুন ছ্যাচড়া করো। কিন্তু তেল দিবা না। শাপলাডাঁটাও ভাজাভাজা করো, সেই তেল ছাড়াই। আর থাকলো গাইয়ের নাইলে বকরির দুধ। ঘন-ঘুলটি-কড়া জ¦াল দেও তারে। শেষপাতে আউক্ষা মিঠাইয়ের লগে সেই ঘন-ঘনোটা দুধেরে বেটাপোলাগুলার পাতে দেও। দেখবা সেইটার সোয়াদ কত! ভাতেরেই মুখে লাগবো য্যান মেওয়া-মিছরি-দেওয়া ফিরনি! নিরামিষ-দিনেরে তখন আর মন্দ লাগবো না বেসাইরা-অতুষ্ট বেটাগুলানের চিত্তে।
অইটুকুই নিরামিষ রান্ধন! সেইটুকু রান্ধন-বাড়নেরও হুজ্জোত কিছু কম না। অমন অমন নানা জাতের হুজ্জোত-কুজ্জত করতে করতেই না মাতারিরা একশেষ হতে থাকে আশ্শিনা শেষদিনটার সমস্তটা দুপুর। এর মধ্যে, তখন কেমনে কোন হাতে তারা যায় ব্রতের অন্য নানা ক্রিয়াবিধিগুলারে সিজিলমিছিল করতে! উপাস-দেওয়া হাতরথ নিয়া রান্ধনঘরই একেকজনে সামলায়, না যায় ব্রতের শুদ্ধ স্থানেরে গুছান্তি দিতে। ওদিকে বেইল না তখন পড়ি পড়ি করে! তারা কোন হাতে কী
সামলায়!
কাত্তিক্কা পইল্লা দিনের পইল্লা দণ্ডে রে মাতারি, তোমারে যে খাওন মুখে দিতে হবে, সেইগুলারে তো ঘরের ভিতরে রেখে দেওয়ার নিয়ম নাই।
ব্রতের নিরামিষ পদগুলারে নিয়ে রাখা লাগে উঠান-আঙিনার এক কিনারে বান্ধা চালাখানের নিচে। এক টুকরা মাত্র এক চালা। তারে হেনতেন রকমে বান্ধাই হয় এই ব্রত পালন্তির কর্ম সারার জন্য। দুই দিবসের ঠেকা-কর্মই সারুন্তিই তো। কাজেই কোনোরকমে বান্ধা গেলেই হয়। চালাখানের নিচে যেই আঙিনাটুক আছে, তারে অতি সাফসাফা রাখাই হইলো আসল কাজ।
বেলা চড়ার আগে থেকেই সেইটুকুরে সাতবার লেপাপোছ দেও, সাতবার সেইখানে ধূপধুনা জ¦ালো। তার বাদে বিকাল পড়তে থাকবে একদিকে, অন্যদিকে তুমি লেপাপোছা আঙিনাটুকের একেবারে মধ্যিখানে রাখতে থাকো কলমি শাক, হলুদ গাছ, তুলসী গাছ, একটুকরা মানকচু আর তার পাতা। রাখো সেইগুলা গোল কইরা, তবে মাঝখানে যেন অনেকখানি ফাঁক থাকে। সেই ফাঁক না থাকলে কেমনে সেইখানে রাখবা চারখানা কড়ি, চারখানা আস্তা সুপারি আর চারখানা ডোগর-মোগর কাঁচা হলুদ!
এই যে লেপাপোছা আঙিনাটুক, এর চারমুড়ায় পোঁতা আছে চারখান মুলি বাঁশের টুকরা। সেইসবের ওপরেই বেন্ধে রাখা আছে এক ফালি চাটাই। ওইটাই চালা। এর নিচেই লেপাপোছা পাকসাফ মাটির ওপরে কাৎ হয়ে হয়ে, বাড়ির ব্রতঅলি মাতারিগণ রাত পার করে। এই রাত্রি তারা এমনেই পার করে। এমন করারই যে বিধি।
আশ্বিন মাসের ওই শেষদিনে; সকলে আশা করতে থাকে যে, গাফুরুর রহিমের দয়ায়, কোনোপ্রকার বাদলা-মেঘ আজকার দিনটাতে নামবে না। তারা সকলে সুভালাভালিই আঙিনায় কাৎ হয়ে পড়ে থাকতে পারবে। চিরচিরা মিরমিরা বাদলায় এইবার তাদের ভিজতে হবে না। ছোটো এট্টুই তো রাইত। তার আর যাইতে কতক্ষণ! ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই, ওই ঘুরঘুট্টি আন্ধারের কালেই তো, ছুট পাওয়ে গিয়া, নিজের নিজের পুষ্কুনিতে নেমে হুলুত-ছালুত ডুব দেও। ভেজা চুল আর ভেজা কাপড়ে এসে বসো এই লেপাপোছা আঙিনায়। আল্লা রাসুলেরে স্মরণ করতে করতে যা কিছু খাদ্যখানা আছে, সেগুলারে মিলঝুল করে করে মুখে দেও। তবে অন্তরে চুপেচুপে তোমরা নিজ নিজ বরগুলারে কিন্তু মাঙ্গতে ভুলবা না।
সেদিন শনখোলা গ্রামের পুব মাথার একদম শেষ কিনারের যেই দুই-চাইরটা বাড়ি আছে, তাদের রান্ধন ঘরে ঘরে, মাতারিরা নিরামিষ পদ রান্ধন নিয়া হেজাভেজা হেজাভেজা হতে থাকে ঠিকই, কিন্তু পরানে তাদের কোনো ডিবিডিবি তরাস থাকে না। চালাখানার নিচের জায়গাটারে পাকসাফ কখন করবে, কেমন কখন শুকাবে কখন কেমনে ধূপধুনা জ¦ালবে, এই চিন্তা তাদের বেচাইন করেই না। কেন করবে? তাগো সর্বকর্ম নিপাটে সাধন করে দেওয়ার জন্য আল্লায় তো একজনেরে দিয়া থুইছে।
এই তো এই মাত্র তিনখানা সংসার এই ভিটিতে। মাতারি কয়জনই বা? কুল্লে তিনজন। আর আছে একজন ডেমার ডেমা ছোট এক ছেড়ি। বয়স তার দশ বচ্ছর ঠিকই, কিন্তু কাজেকর্মে দেখো গা সে ডাঙ্গর ছেড়িগোও তফাৎ কইরা দেয়। তবে, সে কিনা এই গুষ্টির কেউ না।
সে হইল এই ভিটির শেষ কিনারের বসতদার জাওয়ার মাওয়ের পুষ্যি।
এই জাওয়ার মায়ে এক জনম দুক্ষিণী রাঁড়ি-বেওয়া বেটি। কোনো-না-কোনো আগেকার আমলে সে বিয়াইস্তা বউ হইয়া এই ভিটির এক বংশধরের সংসারে আসছিল। কোনকালে যে আসছিল, কেউ সেইটা সঠিক স্মরণে আনতে পারে না। তবে চিরকাল ধরে, এই জাওয়ার মায়েরে গ্রামের সর্বজনে দেখে চলছে যে, সে এক রাঁড়ি-বেওয়া মাতারি। সংসারে বসত নেওয়ার পরপরই তার কোলে আল্লায় একখান পুতও দিছিল। তারই নাম ছিল জাওয়া। সেই জাওয়ায় পুরা জুয়ান হওয়ার আগেই ওলা বিবির দয়া তারে ঝাপটা দেয়। সে এক রাইতের ভিতরে গত হয়।
দিনদুনিয়ায় তখন এই আবাগী মায়ের থাকার মধ্যে থাকে এক-ঝোলকা ওই ঘরটুক। সেইটারও তো এখন পড়ি পড়ি দশা। কে ছৈয়াল এনে দেয়, কে চালে শন বসান্তির খরচ দেয়। দুনিয়ায় তো জাওয়ার মায়ের থাকার মধ্যে আছে দুই গণ্ডা বকরি। আর আছে এক পুষ্যি ছেড়ি – জিয়নী। এই ছেড়িও জাওয়ার মায়ের মতনই পোড়াকপালি জনমদুক্ষী এতিম আবাগী।
এই জিয়নী কন্যায়, এই ভিটিতে আছে কিনা! সেই কারণে কোনো ব্রতঅলিরই পরানে কোনো তরাস নাই। ব্রতস্থলীরে সাত লেপা দিয়ে শুকান্তি দেওয়া, ধূপধুনা দিয়ে শুদ্ধি করার কর্ম, ওই জিয়নীই করে। ভালারকমে করে। ডাঙ্গর ছেড়িরা যেইখানে শত জাতের ভুল না-করে পারে না, সেইখানে জিয়নীর দেখো কোনো ভুল হয় না।
আজকা তিন বচ্ছর হয়, সে এই ব্রতস্থলী সাফসুতরা করণের কর্মে হাত দিছে। আহা! সেই কন্যায় এই ভিটির তিন তিনটা বুইড়া মাতারিরে জানে বাঁচাইয়া দিছে। বোঝা কমছে তাদের। আত্মাটার ডর-ধুঁকানি কমছে। আহা! বহুত পয়অলা এই এতিম ছেড়িটায়।
আর জাওয়ার মা বুড়ির কেমুন গুণ! কেমনে এমন সুশীল হওনের সহবত শিক্ষা দিছে সেয় তার পুষ্যি ছেড়িটারে!
দুই
এই যে কন্যা। নাম তার জিয়ন বালা। দাস্ত-ভেদবমির কামড়ে তার বাপ ও মা একদিনের মধ্যে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে, পাড়াপড়শিরা দেখে যে, বিষম তো বিপদ! তিনকুলে এই কন্যার একটা কোনো আপনারজন তো নাই। কোনোদিকে কোনো কুটুম্ব নাই। মামা নাই, চাচা নাই। খালা ফুপু – কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নাই। থাকার মধ্যে আছে শুধু শনখোলার পুব-ঘেঁষা এক ছায়ছোট্ট ভিটির একচালা ঘরখানা।
কন্যার বাপে ছিল ছৈয়াল। জোয়ান মর্দা এক বেটা। লোকের বাড়িতে বাড়িতে তখন কেবলই মুলি বাঁশের বেড়াঅলা ঘর, মাথার উপরে শনের চাল। সেইসকল কিছু বান্ধন-গড়নের কর্মরে ওই ছৈয়াল বেটা দিল-শরীর ঢেলে দিয়েই করত। কোনো রকম ফাঁকিজুকির কারবারি ছিল না সে। দশ গ্রামের সর্বজনেরই হাতের বল, আপদের কালের ভরসা ছিল সে। তারই অই এক কন্যা, আর বউ।
ছৈয়ালের মউত হয় বৈশাখ মাসে। সেই বছরের বৈশাখ মাইস্যা দিনে, শনখোলা গ্রামে ওলা বিবির দয়া য্যান ঢলকায়ে ঢলকায়ে নামে, তেমন আর কোনোকালে দেখা যায় নাই। গ্রামের কোনো একটা পুষ্কুনিতে এক আঁজলা পানি নাই তখন। সেইখানে কেবল চৌচির কটখটা বালু বালু মাটি। আসমানে আসমানে খালি খক্করা খক্করা রইদ। বিষ্টি নাই মেঘ নাই ছাওয়া নাই। খালি গুমগুমানো, দম-ফাঁপড় দম-ফাঁপড় তাপ।
তেমন কালে ওলা বিবির দয়া শনখোলা গ্রামে হাজির হয়। আর ভেদ-দাস্ত-গোঙানি-কঁকানি-খিচুন্তির কামড় করে কী, অতি ধেতলে ধেতলে লোকেরে জানে শেষ করতে থাকে। সাত্তুর-সুত্তুর সাত্তুর-সুত্তুর কামড়ে কামড়ে দেহ-শীতল। সেই জাতের মউতেরে মনে হতে থাকে যেন নিদুলি-মউত। সমস্ত দিন বা গোটা রাত্রি, লোকে, ভেদ-দাস্তর কামড় পেতে পেতে গক গক গোঙ গোঙ করতে করতে আস্তে অল্পে ফুস্সুত করে মউতেরে পেয়ে যেতে থাকে।
কন্যা জিয়ন বালা সেই বৈশাখ মাসের ভোর সকাল থেকে দেখে তার বাজানে, মাটিতে পাতা চাটিখানারে পায়খানা দিয়া ভাসাইয়া দিতাছে, আর মায়ে যেমনে পারতাছে সেই পায়খানারে মুছামুছির একটা চেষ্টা নিতাছে।
মায়ের আর তখন নিজের কন্যাখানের কথাও স্মরণ নাই। কিন্তু কন্যার তো ডর হইতে থাকে। বাজানে খালি পায়খানাই তো করতাছে না, তার গলা দিয়া বলকে বলকে ওয়াক ওয়াক আওয়াজও যে বাইর হইতাছে।
মায়ে একবার বাপেরে সাফসাফা করার জন্য মুছুনি দিতাছে, একবার বাপের মুখে ঝিনাই দিয়া অল্প-মল্প এট্টুস এট্টুস পানি দেওয়ার চেষ্টা দিতাছে। কিন্তু বাপের শরীর কোনোমতেই যেন আরাম পাইতাছে না।
তার মধ্যেই কেমনে জানি কন্যার কথাখানাও একবার স্মরণে আসে তার। মায়ে তখন কন্যারে কোনোমতে বলে, যা যা! যা গো মা, বকরির দুধ দোয়াইয়া যেট্টুক পারস খাইয়া ল গা। তর বাপেরে থুইয়া তো মায় অহন লড়তে পারমু না। যাও ধন, যাও!
মায়ে অট্টুক যা-ই বলুক, কন্যা কিন্তু ঘরের বাইরে পাও দেয় না। তার ডর লাগতে থাকে! বাজানে কেমুন করতাছে দেহো! বাজান গো! বাজান গো। কন্যা ডরের কান্দন দিতে দিতে ঘরের দরোজা বান্ধনের ঝাঁপখানার পেছনে নিজেরে গুঁজে নিতে থাকে, কেবল গুঁজে নিতে থাকে। কিন্তু ঘরের বাইরে সে পাও দেয় না। অমা, বাজানের শইল নিছন্তি-পুছন্তি দিতে দিতে আতকা দেখো, মায়েও উটকানি দেওয়া ধরছে। গোয়াক গোয়াক গো গো!
হায় হায় হায়! মা মা রে! জিয়ন বালা। অক্ষণ তুই এই ভিটি ছাড়। যেইদিগে চউখ যায়, পলা তুই। নাইলে কইলাম তুইও ওলা বিবির কোরোধের তলে পড়বি। যা যা, সইরা যা! এই দেখ, আমাগো দোনোজোনোর কইলাম ওলা বিবির দয়া হইছে। ধনরে, তুই জলদি পলা। বাইর হ বাইর হ এইন তেনে। মায়ে এইমতে কন্যারে হুঁশিয়ারি দিতে দিতে, নিজে দাস্ত-ভেদকর্ম করার তুফানের তলে পড়ে যায়।
অইটুকই তো কন্যাখান, তার বয়স তখন সাত বচ্ছর। সে ডরেভয়ে নিজ বাপমায়েরে একলা ফেলে, কোথায় গিয়ে নিজেরে গুঁজে দেয়? কী করে সে?
সে করে কী, ঠেলতে ঠেলতে নিজেরে নিয়ে ফেলে দেয়, নিজেগো বকরি রাখোনের চালাখানের তলে। সেই চালার নিচে বকরি আছে তিনখান। একটা গাভীন বকরি, আর তার দুই ড্যাকরা পাঁঠাপুত। গাভীন যে বকরি, কন্যার মায়ে তার নাম দিছিলো মুংলি।
এতদিন এই মুংলির যতন-তরিজুত করা, সমস্তটা দিন ঘাস ফেনপানি খাওয়ানো – জিয়নী বালারেই করতে দিছে মায়ে। মায়ে বলছে, ‘মাইয়া সন্তানেরে, আগে বাড়ির বোবা পরানির যয়-যতন হিগোন লাগে। লগে লগে আরো হিগোন লাগে গাছগরানের যতন। তার বাদে আস্তেমুস্থে এট্টু ডাঙর হইছো তুমি, তহন তুমি পারবা ঘর-গিরস্তির যতনকর্ম করতে। আপনা তেনেই পারবা। এইগিলি পারছো তো তুমি হইছো পয়অলা মাইয়া-মাতারি।’
সেইদিন মায়ের ডাকচিৎকারের ধাক্কাখানে তো কন্যাটারে নিজেগো বকরির চালার নিচে নিয়ে ফালায়, তারপর আর সে জানে না কী করবে। শয়নঘরের ভিতর থেকে মা-বাপের গোঙানি-চিক্কুর ওই যে আসতাছে। আসতাছে। তার যে ডর করতাছে! সে তাইলে কী করে এখন! কই যাবে! কারে ডাকবে! কাগো ঘরে যাবে! সে বুঝে উঠতে পারে না। মাটিতে লেট দিয়ে বসে সে মুংলিরে জাবড়ে ধরে। মুংলিও কী যে বোঝে কে জানে। কোনো একটুও ভ্যাবানি না-দিয়ে মুংলি কিনা মাটিতে শুয়ে আসে। একদম জিয়ন বালার শরীর ঘেঁষে নিজেরে শোওয়ায়ে দেয় মুংলি।
ওদিকে, কাছে-কিনারে দূরে-অদূরে সকল বাড়ি থেকে কান্দনের ঝুল্লার উঠতে থাকে! আল্লা আল্লা রে! নিলা গা নিলা গা এমনে তুমি! অরে নিদয়ী কাঠুইরা ওলা বিবি, এই নি তর মনে আছিলো! এমন কত কত চিক্কুর আর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আওয়াজ! সেইসব আওয়াজ এসে জিয়নী বালার মা আর বাপের কোঁকন-গোঙান-কাতরানি দেওয়া গলারে একদম নাই করে দেয়।
‘মায় কী করে! বাজানের নি নিদ পাইছে! হেগো কান্দন হোনোন যায় না ক্যান!’ জিয়ন বালার মনে আসে কথাটা। তারপর মনে আসে যে, একবার সে ঘরের ভিতরে যায়! মায়ের নি পানি খাওন লাগবো? এই কথাখানও তার মনে আসে। ‘কিন্তুক মায়ে যে তারে আর ঘরে যাইতে নিষেধ দিছে! কইছে না, পলাইয়া যাইতে! তাইলে সেয় এই বকরিগো লগে পলান্তি দিয়াই থাকুক! ওলা বিবি তাইলে তারে বিছরাইয়া পাইবো না।’ জিয়ন বালা মুংলি আর অন্য বকরি দুইটারে জাবড়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে কুঁকড়ে পড়ে থাকে। ‘এমতে থাকলে ওলা বিবি তারে আর বিছরাইয়া পাইবো না।’
বৈকালের কালে এই জাওয়ার মায়েই তার ভিটির আরো দুই বউ-মানুষরে নিয়া ছৈয়াল বাড়িতে পাও দেয়। ‘অগো বাইত তেনে একটা কোনো লড়ালড়ির আওয়াজ আহে না! ক্যান! পুরাটা দিন ধইরা এমুন নিশুথি হোনায় ক্যান হেই বাড়ি!’ তিন মাতারির পরানে কুচিন্তা লড়াচড়া দিতে থাকে। তারা এই ভিটির তিনঘরের সকলেই ভালা আছে অখনতরি! মাবুদের মেহেরবানি। নাইলে অন্যদিকে তো দেহো গা শোকের কারবালা যাইতাছে!
জাওয়ার মায়ে সন্ধ্যার মুখে আইসা দেখে, ভেদ-দাস্তে মাখামাখি হয়ে অই যে পইড়া আছে, ছৈয়াল আর তার বউয়ের লাশ। ‘হায় আল্লা হায় খোদা! জিয়ন বালায় কই! সেয় কি বাইচ্চা আছে? না উয়েও মউতা!’ তারা দেখে, বকরি তিনটার পাশে বেহুঁশ পড়ে আছে অইট্টুক মাইয়াটায়।
বাপ-মা খোয়ানো জিয়ন বালারে এখন কে পালে? তিন কুলে যে অর কেউই নাই দেখা যায়! ছৈয়ালের ভিটির নিকট-পড়শী কয়জনে সাব্যস্ত করে, এই এতিমেরে অখন জাওয়ার মায়েই পুষ্যি নিক। এই নিরাছাড়া রাঁড়ি-বেওয়া মাতারি, তারও তো তিনকুলে কেউ নাই। এই এতিম ছেড়িও নিরাছাড়া। থাকুক সে জাওয়ার মায়েরই লগে। নাইলে এই মাইয়ায় যাইবো কই।
‘কিন্তুক আমি খাওয়ামু কী? আমার নিজেরই তো পাতে কোনোসোম পেটভরোনে ভাত পড়ে না। আমি অরে কেমনে পালমু!’ জাওয়ার মায়ে মিনমিনায়। সে বকরি পালে। চার গণ্ডা বকরি আছে তার। দুধ বেচে সে, বকরিও সময়ে সময়ে বেচে। কিন্তুক সেইটা দিয়া তার একপেট সেয় সংবচ্ছর সামলান্তি দেয় কোনোমতে। কিন্তু দুই মোখ সেয় ভরবো কেমতে! লোকে বলে, জাওয়ার মায়ের কথা কোনো ফেলনা কথা না। কথা সত্য। আর, খালি হাত নি কোনোসোম মোখে যায়! যায় না।
তখন তারা করে কী, ছৈয়ালের ড্যাকরা পাঁঠা দুইটারে জাওয়ার মায়েরে সোপর্দ করে। কয়, ‘এই যে নেন গো দাদি! ছৈয়ালের মাইয়ার খোরপোষ বাবদ এই দুই বকরি আপনেরে দিতাছি। আপনে আর আপিত্তি কইরেন না। দিন ভালা হইলে, আপনের লগে ছৈয়ালের মাইয়ারে ভিক্ষা করতে নিয়েন। তহন অর খোরাকি উয়েই জুটাইবো নে। তয়, গাভীন বকরিটা ছৈয়ালের ঝিয়েরই থাকুক। উয়েই না এতদিন পালছে-পুষছে এইটারে? এইটারে পালা-লালা কইরা কইরা উয়ে বাপ-মাওয়েরে যদি বিস্মরণ পায়, তো ভালা তো সেইটা।’
তার বাদে সাব্যস্ত হয়, ‘ছৈয়ালের ভিটি যেমুন আছে হেমুন পইড়া থাক। জিয়ন বালায় যদি হায়াত পায়, যদি অর পুত-ক্ষেত-সোয়ামি-ভাগ্য হয়, তহন উয়ে আবার বসত করবো নে, বাপের ভিটিতে।’ সেই সালিশীর পরে জিয়ন বালার ঠাঁই হয় এই জাওয়ার মায়ের ঘরে। আর তার নিজ বাপের ভিটি পড়ে থাকে সুমসাম আন্ধার। ঘরের দরোজার ঝাঁপখানারে বাইরে থেকে শক্ত দড়ি দিয়ে বান্ধা দেওয়া আছে। এখন জিয়ন বালায় ডাঙর হোক। নিজ ভিটিরে সে নিজে বুঝে নেওয়ার হায়াত যেন পায়।
এই মতে এই মতে জাওয়ার মা দাদির লগে জিয়ন বালায় আছে আজকা তিন বচ্ছর। না, তারে নিজের লগে লগে ভিক্ষা করতে নিতে পারে নাই জাওয়ার মায়ে। তার অন্তরে সায় দেয় নাই। ‘এইটা যুদি তার নিজের নাতিন হইতো! নিতো সেয় তহন ভিখ মাঙ্গনের কর্মে? নিত? নিত না। আর, কন্যাসন্তান না এইটা? আজকা বাদে কাউলকা এয় ডাঙর হইবোই! তহন লোকে না কইবো এই মাইয়ায় ভিক্ষা-করুনি! ফকিন্নি ছেড়ি! এরে নি তহন ভালা কোনো ঘরে বিয়া দেওন যাইবো! গিরস্ত বাইত বউ কইরা নিবো নি তহন!’
সেই বুঝমাফিক জাওয়ার মায়ে জিয়ন বালারে ঘরসংসার দেখদোখ করোনের কর্মে রাখে। নিকটের পাতরে বকরি চরাইতে পাঠায়। আরো সব ঘরগিরস্তির কর্ম, পইটে পইটে শিক্ষা দেয়। আর জিয়ন বালাও কেমন ভালা স্বভাবের কন্যাগো। বোবা মুখে সর্বকর্ম শিক্ষা করে সে। এই ভিটির সবকয়জন মাতারির হাতের কর্মও সে কাইড়া নিয়া নিষ্পন্ন্ন করে ছাড়ে। তারে একটা হুকুমসুদ্ধা দেওয়া লাগে কারো। এমন সু-খাসলতের এই এতিম মাইয়াটায়।
তবে বাবাসগল! যা কও না কও, এই ভিটির মা-মাতারিরা কিন্তুক এই মাইয়ারে অমুন বড়ো নাম ধইরা ডাকাডাকি করতে পারবো না। মা গো মা। নাম কী! এতিম ছেড়ির আবার এমুন নামের বাহার কিয়ের! জিয়ন বালা! কেমুন পরপর লাগে এই নামখানারে। সকলের অন্তরে এমত কথাসকল নড়েচড়ে নড়েচড়ে; আর মুখে তারা ডাকতে থাকে, জিয়নী! অ জিয়নী! অই চ্ছেড়ি জিয়নী।
ব্রতের জিনিসপানি গোছান্তি-রাখোন্তির কর্মে সেই দিন সেই কন্যা ধুন্ধুমার তবড়খানি-হুড়া-তাড়াতে থাকে বলে, নিজেদের বকরিগুলার তত্ত্বতালাশ করে ওঠার ফাঁক পায় না। ভোরবিহানের কালে সব কয়টা বকরিরেই এই ভিটির পুষ্কুনির পাড়ে সে চরতে দিয়ে আসে। কিন্তু কোনো বকরিরেই সে আজকা খুঁটা দেয় নাই। বৈকালের কালে কোনোসময় তার হাত আজাইর হবে, কোনোসময় সে ফাঁক পাবে, কে জানে। আজকা বরং বকরিরা ছাড়াই থাকুক। পেট ভরলে পরে, ওরা নিজেরা নিজেরাই ভিটিতে উঠে যাবে। জিয়নী তখন তুরুত হাতে সবগুলারে খোয়ারে ঢুকায়ে নেবে নে। তখন তার কষ্টটা কম হবে।
তবে চরতে দিয়ে আসার কালে সে বকরিদের কিন্তু ঠিকই বলে দিয়ে আসছে যে, পেট ভরা মাত্রই যেন তারা ভিটিতে উঠে যায়। একটুও য্যান ঢিলামালা না করে। আজকা ভিটিতে কাজের উপরে কাজ। জিয়নীরে যেন অরাও আর বেহুদা তাড়া-মাড়া না দেয়। জিয়নী খুব জানে, বকরিরা প্রতিজনেই ওর কথা বোঝে। অরা সব কয়জনেই লক্ষ্মীর লক্ষ্মী! কোনো কথার অবাধ্যসুদ্ধা হয় না কোনোদিন।
তয়, বেশি বাধ্যুক হইলো জিয়নীর কইলজার টুকরা – মুংলিয়ে। সেয় আবারো গাভীন হইছে। আজকা-পরশুর মিদেই বিয়ানি দিবো। বিহানের কালে মুলিংরে জিয়নী কইয়া তো আইছে, ‘মুংলি ত্বরা কইরা ভিটিত যাইয়ো গা গো তুমি। আমার লেইগা বাইর চাইয়া থাইক্কো না। বুজলা?’ মুংলি তো জবাবে ম্যাহ ম্যাহ করে উঠতেও ভোলে নাই। কাজেই বকরিগুলার খোয়ারে আসা নিয়া আজকা জিয়নীর কোনো ডরডরানি নাই।
জিয়নী একমনে ব্রতপালনের আঙিনাখানের ঠিক মধ্যিতে চার খণ্ড হলুদেরে রাখতে থাকে, চারখানা আস্তা সুপারি রাখে। এই সুপারির ছোবলা ফালানো হয় নাই। কত বাহারের এই ছোবলার সবজা-হইলদা বরণটা! সুবাস উঠতাছে কত, এই সুপারির ছোবলার! ভিজা ভিজা আমের বউলের গন্ধের লাহান গন্ধ এই কাঁচা সুপারি-ছোবলার! জিয়নীর অনেক ভালা লাগে।
এমতে এমতে য্যান সুরুজ একেবারে ডুবুডুবু হয়ে যায়। সব সিজিলমিছিল করা শেষ। বাকি আছে শুধু কয়টা কাঁসার লোটা ভরে পানি এনে রাখা। উপাস শেষে, তিয়াসের মুখে, এই পানিরে লাগবো নে য্যান আউক্ষা মিঠাইয়ের শরবত। জিয়নী জানে, লোটা কয়টারে ভরে আনা লাগবে সুরুজ ডোবার আগেই। ব্রতঅলিরা এসে আঙিনায় বসে য্যান দেখে, ব্রতের জিনিসপাতি সব সুহালেই রাখা আছে। নাইলে না তারা জিয়নীরে নিন্দা দিবে।
লোটা ভরার জন্য জিয়নী পুষ্কুনির দিকে খালি মেলা দিতে গেছে, দেখে যে জাওয়ার মা দাদিয়ে তার লাঠি ঠুকটায়ে ঠুকটায়ে ছুটুন্তি দিছে এই আঙিনার দিকেই।
‘কী হইছে গো দাদি?’
‘আলো নাতিন! আমাগো য্যান বিপদ হইছে! সবটি বকরি খোয়ারে আইছে, অগো লগে মুংলিয়ে নাই। দেখ দেখ। খোয়ারে মুংলিয়ে নাই।’
জিয়নীর হাতেধরা লোটা ঝুপ্পুর ঠুক্কুর করে উঠানে পড়ে। সে পুষ্কুনির দিকে লৌড় দেয়।
‘আমি দেখছি, দেখছি। হেইনে মুংলি নাই। সবদিক বিছরাইয়াই আমার দিলে কম্প দিতাছে। মুংলি নি পানিত পইড়া গেছে! ভরা গাভীন না উয়ে!’ দাদি কাতরায়; ‘এমুন লয়লক্ষ্মী বকরিটা গো! বিয়াইতে আর কয়দিন! ধরাধাজ্জি কিসমতে আমাগো কেটায় ছোঁ দিলো। আহারে আহারে!’
মুংলি পানিতে পড়লে কী! সে জিয়নীর তেনে বেশি সাঁতোর জানে। কাজেই ডুববো কেমনে উয়ে। সর্পে দংশন দিলে, তড়পানি দিতে দিতে এতক্ষণে মরে পড়ে থাকতো পুষ্কুনির কিনারে! জিয়নী বোঝে তেমন কিছু হয় নাই। তাইলে কী হইতে পারে!
‘চোরে নি নিলো গা! আহারে আহারে!’ দাদিয়ে চিক্কুর দিতে গিয়েও, পলকে, নিজেরে বোবা বানায়ে নেয়। ‘আজকার এমুন ব্রতকাইল্লা দিনে নি এমনসব বিলাপ-চিক্কুর দেওনের কোনো উপায় আছে!’ সে বোবা মুখে, জিয়নীর পিছে পিছে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে আ¹ানি দিতে থাকে, আর তার আগে আগে জিয়নী লৌড় দিতে থাকে ভিটির চতুর্সীমানা ঘিরে। আছে নি কোনোদিগে মুংলিয়ে? আছে?
কোনোদিকে নাই। পুষ্কুনরি পানিতে নি ডুবছে! উয়ে নি অখন ফুইল্লা উইট্টা ভাসতাছে? নাহ! পানি সুমসাম ফকফক্কা নিজ্ঝুম! তাইলে! অখন! অখন কী?
‘জলদি যা তুই, তিনসন্ধ্যা হওনের আগে আগে’, দাদি জিয়নীরে ফরমাশ করে; ‘জলদি তুই পুরা শনখোলা গেরামখানরে একটা ঘুরুন্তি দে! দেখ, কোনোদিগে গিয়া খাড়াইয়া রইছে নি! চোরে নিলেও কইলাম চিন্ন পাবি! যা।’
জিয়ন বালার হাতের লোটা ব্রতের আঙিনার এককিনারে কাৎ হয়ে পড়ে থাকে। সেই লোটা এখন কে ভরে আনে পুষ্কুনির তেনে, কে রাখে মধ্যখানে কে জানে! মুংলিরে, তুই কই গেছস!
তিন
অন্যদিকে ছুট দেওয়ার আগে জিয়ন বালার মনে হতে থাকে যে, ‘সকলের আগে নিজেগো ভিটিতেই তারে একটা ঘুরুন্তি দেওয়া লাগবো। এর আগে না একদিন মুংলিয়ে আপনা তেনেই এই ভিটির উঠানে আইয়া লেট দিয়া পইড়া আছিলো! তখন তারে না এমনে-তেমনে কত বুঝ দিয়া, তবেই জাওয়ার মা দাদির খোয়ারে নিতে হইছিলো? এই ভিটিরে মুংলি ভুলতে পারে নাই। অর তাইলে এই ভিটির লেইগা কইলজা টনটনায়! নাইলে একলা উয়ে এই ভিটিতে সেইদিন আইয়া পড়ছিলো ক্যান! আহ্হারে বোবা অবোধ পরানি! কত মায়া জমাইয়া রাখো তোমাগো ভিতরে!’ ছুটতে ছুটতে জিয়নীর পাওয়েরা দেখে, অর চক্ষে য্যান ঢল জাগনা দিছে। ধুন্ধুস ঢল! কান্দে নিকি জিয়নী! ক্যান কান্দে! এই কথার কোনো উত্তর আসে না।
জিয়নী উল্টা তার পাও দুইটারে, আরো জোর লৌড় দেওনের জন্য খাবড়া দিতে থাকে। পুরুটা শনখোলা বিছরান্তি দিয়া বাইত যাওন লাগবো; ঘরে ঘরে সন্ধ্যাবাত্তি জ¦লোনের আগেই। ব্রতের আঙিনায় কুপি ধরান্তি আছে না? জিয়নী না থাকলে ধরাইবো কেটায়!
নিজেদের উঠানে পড়ে আছে খালি মরা ঝরাপাতা। আর কিচ্ছু নাই কোনোদিকে। বড়ো ঘরখানের ঝাঁপ যেমন বান্ধা আছিলো, তেমন বান্ধাই আছে, অই ত্তো! মুংলিরে কোনোদিগে দেহা যায় না। জোর তুরুত পাওয়ে নিজেগো বাড়িরে পেছনে ফেলে দেয় জিয়নী। ছোটোমোটো এই গাওখানরে এক ঘুরুন্তি দিতে জিয়নীর বেশিক্ষণ লাগে না! কিন্তু কোনোদিগে মুংলির কোনো নামনিশানা নাই। মুংলি! অই! তুই কই!
শনখোলারে এক পাঁক দিয়ে, আবার সে আগায় ছৈয়াল বাড়ির ঘাটার দিকে। যুদি এর মধ্যে মুংলি সেইখানে এসে থাকে। সন্ধ্যা এদিকে শনখোলার আকাশে আকাশে আর মাটির নিকটে নিকটে গাঢ় হয়ে উঠছে। এরপরে আরেকটু ঘন হয়ে গেলে, সেই আন্ধারে নি আর কিচ্ছু দেখা যাবে! জিয়নী তুরুত লৌড় দেওয়া ধরে। লৌড় দিতে দিতে সে হঠাৎই বোধ করে, এই না সন্ধ্যাকালের আন্ধাররে একটু আগেই সে দেখলো ঘনঘনাট-জমাট হয়ে উঠতে। এখন কেন লাগে যে, সন্ধ্যা আর নাই কোনোদিকে? যেন বিহান হইতে যাইতাছে! এই য্যান সুরুজ উঠি উঠি ক্ষণ এইটা!
এমুন কেমুন বিষয়! জিয়নী পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারে না। সন্ধ্যারে আবার বিহান লাগে কেমনে। আসমান দুনিয়া ফিক্কিফিক্কি ফস্সা লাগে যে! সে ছুট থামায়। এবং দেখে, সে না-জানি কোন একখানের কোন এক ভিটিতে আইসা খাড়াইয়া গেছে! এইটা তাগো নিজ ছৈয়াল বাড়ির ভিটিটা য্যান না! এইটা অন্য কোনো একটা ভিটি। সেই ভিটির চতুর্মুড়া পানিকে পানি। পানিকে পানি! বুঝাই তো যায়, এইটা বাইরা মাইস্যা দিন! এইটা কোন মুল্লুক? সেই ভেদের মীমাংসা দিবো কে? কোনোদিকে একটা য্যান কাকপক্ষীসুদ্ধা নাই।
তবে একটা য্যান কেমন এক ছেড়িরে, অই যে সামনের পানিতে সাঁতোর দিতে দেখা যাইতাছে! এক হাত তার মাথার উপরে রাখা। সেই হাতখানা অতি শক্তপ্রকারে নিজের মাথায় ধরে রাখছে একখান তেনাতেনা হয়ে যেতে থাকা ডুরে-কাপড়, আর য্যান কয়খান কিতাব।
ছেড়ির মাথায় কিতাব ধরা ক্যান! কিতাব দিয়া অট্টুক ছেড়ি কী করবো! মুংলির কথা বিস্মরণ হয়ে জিয়নী ওই অচিন ছেড়ির দিকে চোখ দিয়ে রাখে। দেখো দেখো ছেড়ির কারবার! সাঁতোর দিয়া সেয়, এই বাইন্না পানি পার হইয়া অই ত্তো এট্টু দূরের ডাঙায় পাও তুলছে। আল্লা! ছেড়ি নি লেংটা হইয়া নিজের তেনা-তেনা শাড়িকাপড়খানারে মাথায় থুইছিলো? ক্যান?
ডাঙায় খাড়া হয়ে, অই যে ছেড়িটায়ে নিজের শইলটারে এট্টু ঝাড়া দিলো। তাতে কী উবকার হইলো রে! শইল্লের পানি শইল্লেই তো থাকলো! দেখো। ভিজা চুল তেনে টিপটিপায়ে পানি পড়তাছেই। সেই ভিজা শইল্লেরেই সেই তেনাখানা পিন্ধন্তি দিলো ছেড়িটায়! তার বাদে কিতাবগিলিরে জাবড়ানি দিয়া ধইরা সেয় হাঁটা দিলো সামনের দিকে।
কিতাবের লগে সেয় কিন্তুক কেমুন একটা কালা বরণের পাত্থরের টুকরাও য্যান জাবড়ানি দিয়া রাখছে! কে জানি অইটা কী। এইটা কিমুন পাত্থর-টুকরা! ছেড়ি কই যায়? কিতাব ধরোনের কিসমত পাইছে উয়ে! কেটায় এইটা? জিয়নীর দিলে এমত কত জিজ্ঞাসা। কিন্তু কে তারে মীমাংসা দিবে! কিন্তু কেমনে জানি সেই দূরস্থানের ছেড়িয়ে জিয়নীর অন্তরের জিজ্ঞাসগুলিরে ঠিকই শুনে ফেলে!
ছেড়ি দেখো জিয়নীর মুখ বরাবরি চাউন্তি দিয়া কেমুন হাসি দেয়! হাসে ক্যান ছেড়িয়ে! সেই হাসি বলতে থাকে : এই ছেড়ি যাইতাছে বিদ্যাশিক্ষা করতে! তাগো ঘরে আউজকা খুদের জাউসুদ্ধা রান্ধোনের উপায় হয় নাই। এক মুষ্টি খুদও যে আছিলো না কোনো মটকিতে। ভুক্ষা পেটেই আউজকা ছেড়িয়ে যাইতাছে বিদ্যাশিক্ষা করতে!
ছেড়িটার মুখটারে দেখতে লাগে য্যান একদম জিয়ন বালার মুখখান। সেয় কি জিয়ন বালার কিছু লাগে? ইষ্টি লাগে নি? কিন্তুক জিয়ন বালাগো দিনদুনিয়ার কোনোদিগে তো কিতাব-কুতাবের নামনিশানাও নাই। দেওভোগের মসজিদের হুজুরের কাছে খালি একখান আছে। এই ছেড়ি কিতাব কই পাইলো! উয়ে কেটায়! এই ভিটি-ভুটিগিলিই বা কোন দেশের! পুরা অচিনা এইটা কই আইয়া পড়ছে জিয়নী! এইটা কই!
অই তো কিতাবঅলা ছেড়িয়ে, হাঁটোন দিতে দিতে আ¹াইয়া যাইতাছে। অর লেইগা জিয়নীর কেমুন দরদ লাগতাছে! ক্যান লাগে! আইচ্ছা যাউক উয়ে। যাও গো যাও! জিয়নীও যাউক গা জাওয়ার মা দাদির কাছে। মুংলিরে বিছরাইয়া লইয়া তবেই তো তার ফিরুন্তি! কিন্তু আগায়ে যাইতে থাকা ছেড়িটার দিগে খালি চাইয়া থাকতে মন চায় জিয়নীর। ধুরো! এইটা কী!
আর দেখো, অই ত্তো দেহি মুংলি যাইতাছে! অই যে অই দিকে! সে ডান দিকে ঘাড় ফেরায়। মুংলিরে যেন হেঁটে হেঁটে কোনো-না-কোনো একদিকে চলে যেতে দেখা যায়! মুংলি মুংলি! কই যাস! খাড়ো খাড়ো তুই। খাড়াও গো মুংলি!
চার
তারা দু-ভাইবোন দাঁড়িয়ে ছিল তখন, বাসার মেইন গেটের মুখে। গেটের বাইরেই এই পাড়ার মেইন রোডটা। ওটার অন্য সাইডেই খাড়া হয়ে আছে এই মহল্লার দশতলা বিল্ডিংটা। ওটার বেসমেন্টের পার্কিং প্লেসেই রাখা থাকে তাদের গাড়ি। ড্রাইভার গাড়ি আনতে গেছে সেই কখন, অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো হবেই। বাট সি, নো সাইন অফ হিম! এতক্ষণ লাগে গাড়ি বের করতে! ভাই বিরক্ত হয়ে পা ঝটকাতে থাকে! লুক বুবু! দিস ম্যান! হি ইজ লেইজি অ্যান্ড ইনকমপিটেন্ট। উই শুড গেট রিড অফ হিম! আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াই ডোন্ট ইউ ফায়ার হিম অ্যান্ড গেট সামওয়ান এলস! হোয়াই ডু ইউ কিপ ডিফেনডিং দিজ গাই! বুবু! তুমি একটা হোরিবল ইমপসিবল গার্ডিয়ান! হা হা।
বুবু, ভাইয়ের অকারণ বকাবকি পেতে পেতে, হাসতে থাকে। এমন অবুঝ! সবকিছু বুঝি স্মুথ থাকে সবসময়! এটা বোঝে না পাগলাটা।
নিরুত্তর থেকে মিটি মিটি হাসতে হাসতেই বোনটি দেখে, কী একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তার চোখের সামনে! এই যে তারা দুজন দাঁড়ানো মেইন গেটের সামনে। ওটার ছোট পাল্লাটা এই তো ভেড়ানো। ড্রাইভার এসে হর্ন দিলে তারা বেরুবে, এমনই তো কথা। বেশ ভোর ভোর টাইম বলে, পথে লোক চলাচল একদমই কম। ফলে গাড়ির হর্ন শুনতে তাদের কোনো প্রবলেম হওয়ারই কথা না। আর, গেটে ঠেলে যে কোনো ভিখিরি ভিক্ষা চেয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে উঠবে, তেমনটা হওয়ারও চান্স অন্তত, এতটা ভোরে, খুবই কম!
তার মধ্যে দেখো, ভেড়ানো পাল্লাটা ঠেলে কি না একটা ছাগল ঢুকে পড়েছে, তাদের এই এক চিলতে ফ্রন্ট-ইয়ার্ডটাতে! কী কালো আর হেলদি ছাগলটা। ভাই সেই ছাগল দেখে রাগবে কী, চিল্লাহল্লা করেই বাঁচে না। গস গস! রিয়েল ব্ল্যাক বেঙ্গল! কীভাবে কোত্থেকে এলো! তোমার সব বেলির ঝাড় আজকে এটার মুখে ঢুকবে। দেখো দেখো। হা হা হা!
এই বেরো বেরো! বোন ভেড়ানো পাল্লাটা খুলে দিয়ে ছাগল তাড়ানো শুরু করে। কিন্তু ছাগলটা কোনো খেদানির আওয়াজই যেন শুনতে পায় না। আরো কী এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখো! কোন ফাঁকে যেন একটা পিচ্চি মেয়েও ভেতরে ঢুকে পড়েছে। স্ট্রেঞ্জ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, এটা এই মেয়েটার পোষা জিনিস।
জলদি জলদি তোমার ছাগল নিয়ে চলে যাও তো পিচ্চি! জলদি যাও।
কিন্তু সেই পিচ্চিটাও যেন কিচ্ছু শুনতে পায় না। সে কোনোদিকে তাকায় না। শুধু আগাতে থাকে তার ছাগলটার দিকে। দূরের রাস্তায় হালকা স্বরে হর্ন ডেকে ওঠে। এবার তো তাদের দুজনকে বেরোতে হয়। এই! এই! তুমি যাও , যাও তো। যাও! বোনটা এবার গলা কঠিন করে। এতক্ষণে যেন পিচ্চি মেয়েটা, কঠিন গলাটাকে শুনতে পেয়ে যায়। সে তাকায় ভাই এবং বোনের দিকে।
কী কাণ্ড! হাউ অ্যাবসার্ড! আনবিলিভেবল! অই টোকাই পিচ্চি মেয়ের মুখটা দেখো বুবু! দেখো! দ্যাট গার্ল লুকস একজাক্টলি লাইক ইউ! সেই মুখ এই বুবুর ছোট্টবেলার মুখ। অবিকল সেই। স্ট্রেঞ্জ! এসব কী! কে এটা!


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.