অন্ধ কিছু দেখে না, তার কণ্ঠ পারে
ফুল ফোটাতে অন্ধকারে।
অন্ধকারে যে গান বাজাই একলা হাতে
সুদূর সরল এক তারাতে,
সে গান কোথায় ভাষা পেল, স্বচ্ছ ভাষা?
(‘পৌত্তলিক’, অরবিন্দ গুহ)
বিশ্বাস করা যায় না এমন একটা গল্প বলি। মানে, এই জটিল
জগৎ-সংসারের ঘূর্ণাবর্তে নাকানিচুবানির নানা অভিজ্ঞতার পর যে
সহজ-সরল ঘটনাকেও আপনাদের অবিশ্বাস্য মনে হবে, সেরকমই একটা গল্প।
এ-গল্প অপূর্ব এক সুন্দরী কন্যার। বয়স পঁচিশ থেকে সাতাশের মধ্যে। ধরুন, তার নাম হাস্নাহেনা। অতি ব্যবহারে জীর্ণ নাম। তবে শুনলেই সুন্দর একটা গন্ধ যেন এসে লাগে নাকে। ‘অপূর্ব সুন্দরী’ বিশেষণটির মধ্যে ততটা দৃষ্টি ও কল্পনাগ্রাহ্য আদল নেই। চোখ-নাক-ঠোঁট বা শরীরের অন্যান্য অংশের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটা প্রতিকৃতি তৈরি করা যেত, সেদিকে গেলাম না। বরং বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয়ের নায়িকার রূপবর্ণনা থেকে কিছুটা ধার নেওয়া যেতে পারে – ‘যুবতীর বয়ঃক্রম সপ্তবিংশতি বৎসর – ভাদ্র মাসের ভরা নদী। ভাদ্র মাসের নদীজলের মতো ইহার জলরাশি টলটল করিতেছিল – উছলিয়া পড়িতেছিল। পূর্ণ যৌবনভারে সতত ঈষচ্চঞ্চল; বিনা বায়ুতে নব শরতের নদী যেমন ঈষচ্চঞ্চল, তেমনি চঞ্চল …।’
গ্রামের এক সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে হাস্নাহেনা। রাঙামাটির কোনো এক ঝরনা থেকে বয়ে আসা ক্ষীণতোয়া একটি খাল বা ছড়াকে লোকে আরশিছড়ি নামে ডেকেছে, কেননা এর স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখেছে তারা। ছড়ার দুপাশের আপাত শান্ত জনবসতির নামও আরশিছড়ি।
হাস্নাহেনার সৌন্দর্যের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছিল আরশিছড়ি ছাড়িয়ে আরো
দু-দশ গ্রামে। গ্রামজুড়ে তার প্রেম কিংবা কৃপা প্রার্থীর বহর এতই দীর্ঘ হয়ে পড়েছিল, এবং তাদের অনেকেই একনজর দেখার আশায় এমনভাবে পথেঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত যে, হাস্নাহেনার স্কুলে যাওয়া-আসার পালা চুকে গেল মাত্র নবম শ্রেণিতেই। অনেকে যদিও বলে, শুধু বখাটেদের কারণে তার বিদ্যাশিক্ষা বন্ধ হয়েছিল এ-কথা সত্য নয়। মেয়েটির মাথায়ও সার জাতীয় কিছু ছিল না। ক্লাস এইটে অংক পরীক্ষায় নাকি পেয়েছিল মাত্র কুড়ি! অবশ্য অংক পরীক্ষায় নব্বই পেলেও যে এমন কিছু দেশ জয় করা যায় না, সেটা আমাকে দেখলেই তো বোঝা যায়! তাছাড়া ‘সুন্দরী গাধা’ বলে একটি কথা বহুল প্রচলিত, সুন্দরীদের গাধা হওয়ার অধিকার আছে। আমার মতো বিএ পাশের সার্টিফিকেট গলায় ঝোলানোর দিব্যি কেউ দেয়নি তাকে। তার বুকে ঝুলবে সোনার চেইনের মধ্যিখানে মুক্তোর লকেট, আর শত তরুণের হাজার দীর্ঘশ্বাস।
কন্যা পনেরো বছরে পা রাখার আগে থেকেই আইনুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে নানা অঞ্চল থেকে বিত্তবান পরিবারের পয়গাম আসতে শুরু করেছিল। কিন্তু হাস্নাহেনা মুখ বাঁকিয়ে, ঠোঁট উল্টে সব প্রস্তাবই নাকচ করে দেয়। একমাত্র কন্যার স্নেহান্ধ পিতাটিও তার অমতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কঠোর হতে পারেন না। মেয়ে আইবুড়ো থাকলে যা হয়, গ্রামে নানা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
কেউ বলে মেয়ের কঠিন রোগ আছে, তাই বিয়ে বসতে চায় না। কেউবা বলে, জেলা শহরে এক বিয়েবাড়িতে গিয়ে মেয়ের সঙ্গে ভাব হয়েছিল এক সিনেমার ভিলেন মার্কা ছেলের, তার প্রেমে দিওয়ানা কন্যা, তাই অন্য বিয়ের প্রস্তাব এলে সায় দেয় না। শহরে দেওয়ানহাটের ব্রিজে ওই ভিলেনের কোমর জড়িয়ে মোটরসাইকেলে চেপে ঘোরার সময় তাকে স্বচক্ষে দেখেছে বলেও গ্রামের এক যুবক সাক্ষ্য দেয়। ঘটনার সত্যাসত্য প্রমাণিত হয় না, কেননা ওই যুবক নিজেও সুন্দরীর প্রণয়প্রার্থী।
এসব সত্যমিথ্যা প্রচার নিয়ে এতটুকু বিচলিত দেখায় না হাস্নাহেনাকে। বরং দু-পাঁচজন সখী পরিবেষ্টিত হয়ে রাজহংসীর মতো গ্রীবা উঁচু করে মাঝে মাঝেই এ-পাড়া ও-পাড়া চড়ে বেড়ায় সে। আপনারা নিশ্চয় জানেন, যে মেয়েরা নিজের রূপ ও রূপের খ্যাতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন, তুলনায় নিষ্প্রভ সাথিদের সঙ্গে চলাফেরা করা তাদের সহজাত প্রবণতা। মধ্যমণি হয়ে থাকে হাস্নাহেনা, আর পার্শ্বচরিত্ররা তার সামান্য রসিকতায়ও হাসি-আনন্দে কলকলিয়ে ওঠে।
আমি এসব নিয়ে কখনো কথা বলি না। জনান্তিকে স্বীকার করি, একজন অবিবাহিত যুবক, তদুপরি একজন কাব্যসাধক বলেই কি না ‘ভাদ্রমাসের ভরা নদী’ আমারও কিঞ্চিৎ চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়েছিল। কিন্তু আরশিছড়ি বয়েজ হাইস্কুলের শিক্ষক হিসেবে যেটুকু সমীহ এবং অখ্যাত কবি হিসেবে যা কিছু করুণা (অনেক সময় তাতে বিদ্রূপ মেশানো) সমাজে আমার প্রতি আছে, সেটুকু নিয়েই আমি থাকি। আঁচ বাঁচিয়ে চলি।
কিন্তু কিছুদিন পরই কাঙালের (প্রণয়প্রার্থী যুবক) কথা বাসি হলে যে সত্য হয় তা বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো গ্রামবাসী। হঠাৎ আপাতশান্ত আরশিছড়িতে শুরু হলো ব্যাপক কোলাহল। আইনুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে কান্নার রোল উঠলে গ্রামবাসী জেনে যায়, ভিলেনের সঙ্গে পালিয়ে গেছে হাস্নাহেনা।
প্রথমে কানাঘুষা, তারপর ঢিঢি পড়ে গেল গ্রামজুড়ে। হাট-বাজারে আইনুদ্দীন সাহেবের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করল লোকজন। তার প্রশ্রয়েই তো এত বড় একটা কেলেংকারি ঘটাতে পারল মেয়েটা। মেয়ের চরিত্র নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিল গ্রামবাসী, কিন্তু ভিলেনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছাড়া এ-বিষয়ে আর বিশেষ কোনো তথ্য তাদের কাছে ছিল না। নাগালে না পাওয়া আঙুর ফলের নামে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল তার ব্যর্থ প্রণয়প্রার্থীরা।
ঘটনার দুদিন পর স্কুলে যাওয়ার পথে দেখা হয়ে গেল আইনুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে। হাসিখুশি পরিতৃপ্ত চেহারার লোকটিকে বিমর্ষ ও বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কী আশ্চর্য, তিনিই দাঁড় করালেন আমাকে।
‘কেমন আছেন মাস্টারসাব?’
‘আছি, ভালোই আছি আপনাদের দোয়ায়। আপনি ভালো আছেন তো চাচা?’
‘আর ভালো! শুনছেন তো মনে অয় আমার মাইয়াডা …।’
যে ঘটনা নিয়ে সারা গ্রামে সরস আলোচনা চলছে, সে-কথা আমার না শোনার কথা নয়, এটা আইনুদ্দীন সাহেবও জানেন। তবু আমাকে নিজের মুখে তাঁর দুর্দশার কথা জানানোর মানে কী হতে পারে বুঝি না। তবে এলাকার যে বিরল দু-একজন মানুষ এ নিয়ে কোনো রসাল গল্পগুজবের আসর জমাবে না, আমাকে তাদের একজন ভেবে হয়তো মনের ভার হালকা করতে চাইছেন।
‘মেয়ে তার পছন্দের কথা কিছু জানাইছিল আপনারে?’
‘না। কিচ্ছু জানায় নাই। তার পছন্দ অইলে আর ছেলেডা ভালো অইলে আমি তো নিজে ডাইকা বিয়া দিতাম। আমারে কিছুই জানাইল না … ব্যাপারডা কেমুন অইল কন দেহি?’
আমি আর কী বলব, চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম তাঁর দিকে। বিষণ্ন পিতা নিজেই বিড়বিড় করছেন, ‘এত আদরে-যত্নে বড় করলাম মাইয়াডারে … এই তার প্রতিদান? বাপের মাথাডা হেঁট কইরা দিলি সবার সামনে?’
প্রশ্নগুলো যেন আমাকেই করেছেন এভাবে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। কিন্তু হাস্নাহেনা কেন কী করল তার উত্তর তো আমার কাছে নেই। আমি শুধু সমব্যথীর মতো তাকিয়েছিলাম আইনুদ্দীন সাহেবের দিকে। ওইটুকু সান্ত্বনাই হয়তো তিনি চেয়েছিলেন। অতঃপর কীসব বিড়বিড় করতে করতে উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন তিনি।
ভিলেনের হাত ধরে নায়িকার পলায়ন বিষয়টা নিয়ে দু-তিন দিন সরস আলোচনা জমে উঠেছিল চায়ের দোকান, সমিতি, বাজার-হাট থেকে পুকুরঘাট পর্যন্ত। কিন্তু চতুর্থ দিন থেকে তা ধীরে ধীরে মিইয়ে যেতে থাকে। কেননা, আরশিছড়ির জীবন যত মন্থরই হোক, দু-বেলার অন্নচিন্তায় জীবিকার পেছনেও তো ছুটতে হয়।
কিন্তু মাত্র সাতদিনের মাথায় বিষয়টা আবার চাঙা হয়ে উঠল হাস্নাহেনার ফিরে আসার সংবাদে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল হাস্নাহেনা ফিরে এসেছে বাপের বাড়িতে। নিয়মিত রূপচর্চায় উচ্চকিত মেয়েটি ফিরে এসেছে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও নিঃস্ব চেহারায়। ঘটনা কী? ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, ঈর্ষাবশত গ্রামের মানুষ যাকে ভিলেন বলে অভিহিত করেছিল, প্রকৃতই সিনেমার ভিলেনের মতো আচরণ করেছে সে। এত দ্রুত কী করে আরশিছড়ির মানুষ এত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে কে জানে!
প্রেমিক প্রবরের হাত ধরে প্রথমে কক্সবাজার চলে গিয়েছিল হাস্নাহেনা। সেখানে একটি হোটেলে ছিল তিনদিন। ধারণা করি, সম্পূর্ণ মধুচন্দ্রিমার মেজাজে সমুদ্রে দাপাদাপি করে, সৈকতের বালুতে শুয়ে-বসে, হোটেলের আরামদায়ক কামরায় স্বামী-স্ত্রীর মতো রাত্রিযাপন করেছে তারা। তিনদিন পর চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির পার এলাকায় একটি হোটেলে গিয়ে উঠেছিল। কথা ছিল, শহরেই একটি নিকাহ রেজিস্ট্রার অফিসে বিধিসম্মত বিবাহের কাগজপত্র করা হবে।
ভালোবাসা জিনিসটা বোধহয় নদীর একমুখী স্রোতে ভেসে যাওয়ার মতো। একটু থেমে দম নেওয়ার সময় তখন কোথায় হাস্নাহেনা ভেসে যাচ্ছিল। বাকি জীবনটা ভেসে যাওয়ার আনন্দে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু তার সঙ্গীর ফন্দি ছিল অন্যরকম। ব্যাগ থেকে তার সঙ্গে নিয়ে আসা সোনাদানা হাতিয়ে নিয়ে ঘুমন্ত মেয়েটিকে হোটেলে ফেলে রেখে উধাও হয়েছিল ভিলেন। তার নাম জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। এত বড় একজন মোঘল সম্রাটের নামের সঙ্গে মিল রেখে যে-ছেলের আকিকা হয়েছিল, তার এমন তস্করের আচরণ নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। তবে নামে আর কী আসে-যায়। যুগে যুগে কত কানা ছেলেকে পদ্মলোচন নামে ডাকা হয়েছে। এই বাবর যে জাতে চোর ও চূড়ান্ত দুশ্চরিত্র এ-বিষয়ে সন্দেহের আর অবকাশ রইল না।
উধাও তো উধাও, বাবরের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায়ও আর ছিল না। ফোন বন্ধ। হোটেলের বিল পরিশোধ করার মতো টাকাও হাতে ছিল না হাস্নাহেনার। এই হোটেলগুলো বোধহয় এ-ধরনের প্রতারণার ব্যাপারগুলোর সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত, এমনকি এতে গোপনে হোটেল কর্তৃপক্ষ জড়িত কি না তা-ও সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। তারা হাস্নাহেনাকে হোটেলে রাত্রিযাপন ও খাওয়া-দাওয়ার বিল পরিশোধের জন্য বিকল্প একটা পথ দেখিয়েছিল, কুপথ। কিন্তু শেষ সম্বল সোনার দুটি কানের দুল আর একটি সরু আংটি অন্যায্য মূল্যে বিক্রি করে হোটেলের পাওনা মিটিয়েও বাড়ি ফেরার মতো কিছু টাকা ছিল হাস্নাহেনার।
বিপর্যস্ত চেহারায় বাড়ি ফিরে এলো সে। হতে পারত, মেয়েকে দেখেই রাগে-ক্ষোভে অন্ধ হয়ে চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে দিলো তার বাবা। গ্রামে-গঞ্জে এরকম হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আইনুদ্দীন সাহেবকে সব সময় অন্যরকম একজন মানুষ মনে হয়েছে আমার। সন্তানের বিপদে পাশে আছেন সবসময়, তা পাড়া-প্রতিবেশী যতই ছি-ছিক্কার করুক। ঘরের মেয়েকে তিনি ঘরে ফিরিয়ে তো নিয়েছেনই, আবার তাকে নিজে শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছেন; জহিরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবরের নামে নারী নির্যাতনের একটি মামলাও ঠুকে দিয়ে এসেছেন থানায়।
এসব কথা উড়ে আসে, পাঁচ কান ঘুরে আসে আমার কাছে। এ নিয়ে কৌতূহলের কোনো ঘাটতি নেই আমার, তবু যারা শোনাতে আসে তাদের সামনে খুব একটা আগ্রহ দেখাই না। জানি, আমার আগ্রহ-অনাগ্রহ কোনো বিষয়ই নয় তাদের কাছে, তথ্য পরিবেশন করার মধ্যেই বিশেষ আনন্দ আছে, ঘটনাকে নানা বর্ণে রাঙিয়ে তোলে তারা।
আরশিছড়িতে শীতকাল নেমে এসেছে। ভোর থেকে কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে থাকে চারপাশ। সূর্যের মুখ দেখতে দেখতেই যেন দিনের প্রথম ভাগের অর্ধেকটা কেটে যায়। আবার ওদিকে বিকেলের আলো ফুরিয়ে যায় অনেক আগে। ফলে চায়ের দোকানে একটু জটলা করবে কী, গরম কাপড়-চোপড়ে জবুথবু হয়ে, গামছা বা মাফলারে চোখ-মুখ ঢেকে দু-বেলার অন্নসংস্থানের ধান্ধায় সময়ের সঙ্গে ছুটে দিশ-কূল পায় না মানুষ। রাত আটটা-ন’টা বাজার আগেই গ্রামজুড়ে ঘোর নিশুতি। তখন কোনো বাড়িতে হঠাৎ বুড়োবুড়ির খকখক কাশির শব্দ বা নিজের মুতে কাঁথা ভেজানো শিশুর কান ফাটানো তীক্ষè কান্না ছাড়া আর কোনো শব্দ পাওয়া যাবে না। তবে হ্যাঁ, ব্যতিক্রম তো কিছু থাকেই, যেমন ভগ্নপ্রায় পরিত্যক্ত একটি জমিদারবাড়ির ভেতর বসে যারা ছোলাভাজা দিয়ে দেশি মদ গেলে, তাদের মতো সুখী মানুষ এ-জগতে বিরল। তারা খিস্তি করে, গান গায়, এমনকি নাচেও। তাদের বাড়া ভাতে কেউ ছাই দিতে আসে না। আর আছি আমি। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, রেজাল্টও হয়ে গেছে। খাতা দেখার কঠিন পরীক্ষা থেকে অবসর পেয়ে আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে রাত জেগে কবিতা লিখি। প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা। আমার কবিতা আমার গ্রামের মতোই শান্ত। সে-কবিতার কদর নেই, তাতে আক্ষেপও নেই। ইহকালে খ্যাতি না পেয়ে কত কবি মৃত্যুর পরও অমর হয়ে আছেন, তাঁরা আমার মন থেকে কুয়াশা সরিয়ে দেন।
কিন্তু কী আশ্চর্য, আরশিছড়ির নিস্তরঙ্গ জীবনকে তরঙ্গমুখর করে তোলাই যেন হাস্নাহেনার নিয়তি। লোকসমক্ষে মুখ দেখানোর উপায় নেই বলে হয়তো দুর্বহ জীবন কাটাচ্ছিল ঘরের কোণে। কিন্তু এক সকালে সেই উপায়ও আর রইল না। হঠাৎ এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে শুনি, গ্রামের মানুষ কাজকর্ম ফেলে দলে দলে ছুটছে আইনুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে। কার আগে কে ছুটবে এ অবস্থায় কেউই পুরো ঘটনা খুলে বলতে পারল না, শুধু কোলাহল থেকে এটুকু বোঝা গেল, ভিলেন এসে হাজির হয়েছে আইনুদ্দীন সাহেবের বাড়ির সামনে। ভিলেন মানে হাস্নাহেনার প্রতারক-প্রেমিক জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।
আমি সাতে-পাঁচে না থাকা মানুষ। কিন্তু কবি হলেও সাধু-সন্ন্যাসী তো আর নই। এরকম একটি নাটকীয় ব্যাপার অগ্রাহ্য করার মতো সংযম কোথায় পাব! আমি বরং একটু সময় নিয়ে ধীরপায়ে গিয়ে হাজির হলাম আইনুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে।
বাড়ির সামনে বলতে গেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এর মধ্যে সেখানে গ্রামের চেয়ারম্যান, স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এসে পৌঁছেছেন। সাত-আটটি চেয়ার বরাদ্দ হয়েছে তাঁদের জন্য। চেয়ারে অপরিচিত একজন ভদ্রলোককেও দেখতে পেলাম। জানা গেল, তিনি বাবরের পিতা।
অনাহূতদের ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাকে ভিড়ের লোকজন সামনের দিকে এগোনোর জায়গা করে দিলো আর খোদ আইনুদ্দীন সাহেব আমাকে ডেকে নিয়ে একটা চেয়ারে বসতে দিলেন। গ্রামে এখনো এটুকু সমীহ আমার প্রতি আছে দেখতে পেয়ে বড় ভালো লাগল।
জহিরউদ্দিন দাঁড়িয়ে ছিল নতমুখে। এতগুলো মানুষের চোখ তাকে আগাগোড়া মাপজোখ করছে, তার পক্ষে চোখ তোলা কঠিন বইকি। নানাজনের কথার সূত্রে যেটুকু বোঝা গেল, পুলিশের তাড়া খেয়ে একটা সমঝোতার পথ বের করতে পিতাকে নিয়ে সে এখানে এসেছে। তার মানে, আইনুদ্দীন সাহেব মামলা টুকে দিয়ে একটা বুদ্ধিমানের কাজ করে এসেছিলেন।
লোকজনের গুঞ্জন মাঝে মাঝে কোলাহলে পরিণত হলে চেয়ারম্যান সাহেব ধমক দিয়ে শান্ত করছেন। এবার তিনি পুরো ব্যাপারটার সারাংশ টানতে চাইলেন, বাবরের উদ্দেশে বললেন, ‘তার মানে তুমি যে একটা বড় অন্যায় করছো এইটা তুমি স্বীকার করো?’
নতমুখ সামান্য তুলে বাবর বলল, ‘জি।’
‘এখন তুমি মাইয়াডারে শাদি কইরা স্ত্রীর মর্যাদা দিতে রাজি?’
‘জি।’
চেয়ারম্যান সাহেব মীমাংসার একটা উপায় পেয়ে একবার আইনুদ্দীন সাহেবের দিকে, আরেকবার জহিরউদ্দিনের পিতার দিকে তাকালেন। বাবরের পিতার চেহারায় একটা গদগদ ভাব, আইনুদ্দীন সাহেব ততটা বিনয় না দেখালেও তাঁকে অসম্মত মনে হলো না। ভিড়ের ভেতর থেকে গুঞ্জন আবার প্রায় কোলাহলে পরিণত হচ্ছিল, চেয়ারম্যান সাহেব ধমক দিয়ে তাদের শান্ত করলেন।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে সালিশ-বিচারের পর্বটা শেষ করে যখন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ঘরের ভেতর চা-নাশতা খেতে যাওয়ার কথা, ঠিক তখনই ঘটল উল্টো ঘটনা। উঠোনভর্তি মানুষ দেখল প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বাইরে এলো হাস্নাহেনা, তার পেছনে দু-একজন বয়স্ক মহিলা তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ। হাতে একটা স্যান্ডেল উঁচিয়ে হাস্নাহেনা ছুটে যাচ্ছে বাবরের দিকে। আইনুদ্দীন সাহেব এবং হেনার দূরসম্পর্কের এক চাচা ছুটে গিয়ে তাকে আটকালেন। আর কী আশ্চর্য, তখনই হঠাৎ আমার মনে হলো, দর্শকের ভূমিকায় বসে না থেকে আমার এখানে কিছু করার আছে। নিরীহ মানুষদের আচরণ মাঝেমধ্যে আপনার বোধগম্য হবে না। এখানে আমার আচরণটাও হলো সে-রকম। আমি বাপ-চাচার হাত থেকে হাস্নাহেনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে পথ করে দিলাম। সে ছুটে গিয়ে বাবরের দুই গালে সজোরে স্যান্ডেলের আঘাত করে চেঁচিয়ে বলল, ‘অ্যাই শুয়োরের বাচ্চারে আমি বিয়া করুম না। মইরা গেলেও না …।’
ভিড়ের গুঞ্জন কোলাহলে পরিণত হলো। এবার ধমক-ধামকে বিশেষ কাজ হলো না। আরশিছড়ির মানুষ উত্তেজিত। বাবরকে গণপিটুনি দেওয়ার মতো একটা পরিস্থিতিও তৈরি হয়ে গেল। মুরুব্বিরা বহু কষ্টে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে, যে অটোরিকশাটি নিয়ে বাপ-বেটা এসেছিল, কোনোমতে তাতে তুলে দিতে পারলেন তাদের। বলা যায়, পালিয়ে বাঁচল জহিরউদ্দিন বাবর ও তার পিতা।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় সালিশকারীরা নির্বাক। গ্রামের মানুষ তখনো ভিড় করে আছে উঠোনে। হঠাৎ করে আমার দিকে আঙুল তুললেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। কর্মস্থলে তিনি আমার ঊর্ধ্বতন, সেই অধিকারেই কি না বলে উঠলেন, ‘ঝামেলাটা তো পাকাইলেন আপনি, আপনি সাহস না দিলে …।’
আমি নিরুত্তর। প্রধান শিক্ষকের কথাটা আংশিক সত্য। আমি সুযোগ করে না দিলে বাবরের গালে পায়ের চটির আঘাত পড়ত না।
‘মাইয়াডা পলায়া গেছিল, ওই পোলার লগে রাত কাটাইছে হোটেলে, এই কথা তো দুনিয়ার সবাই জানে। অহন মাইয়াডার গতি কী হবে? আপনি বিয়া করবেন তারে?’
হয়তো নেহায়েত ভর্ৎসনার সুরেই প্রশ্নটা করেছিলেন তিনি, কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমি দ্বিধাহীন কণ্ঠে বললাম, ‘করব। মেয়ে ও তার পরিবার রাজি থাকলে আমি করব।’
প্রধান শিক্ষকের মুখের হা আর বন্ধ হয় না। উঠোনের ভিড় এবং বাড়ির ভেতরমহলেও গুঞ্জন শুরু হলো। ছুটকা-ছাটকা এত রকমের মিঠা-তিতা মত ও মন্তব্য ছুটে আসছে চারদিক থেকে, এর মধ্যে হাস্নাহেনার নিজের কী মত তা জানার কোনো উপায় নেই।
সালিশ-বিচারে এসে গ্রামের মুরুব্বিরা বিশেষ সম্মান লাভ করেন। তাঁরা যখন দুটি পক্ষের সম্মতিতে কোনো বিষয়ের ফয়সালা করতে সমর্থ হন, তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। অথচ এই গোলমেলে ও অমীমাংসিত বৈঠকে সেই পরিচয়ের প্রকাশ ঘটল না। তাঁরা ক্ষুণ্ন হয়ে বৈঠক ছেড়ে চলে গেলেন।
সেদিন চারপাশের লোকজনের দৃষ্টির অনুসরণের মধ্যে ধীরপায়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম আমিও। কয়েকটা দিন স্কুল আর ঘর ছাড়া আর কোথাও
যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল আমার। কারণ হাটে-বাজারে, পথে-ঘাটে আমাকে নিয়েই তো আলোচনা। এরকম ‘হাত-ফেরতা’ একটা মেয়েকে কী বুঝে বিয়ে করতে রাজি হলাম – এ-প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন এমনকি আমার সহকর্মীরাও। ক্লাসে ছাত্রদেরও দেখি কৌতূহলী দৃষ্টি, বড়দের আলোচনায় তাদের আগ্রহও নেহায়েত কম নয়, এতদিনের চেনা শিক্ষকটিকে কেমন অচেনা লাগে তাদের।
সব ধরনের ধিক্কার বা সমালোচনা উপেক্ষা করে বিয়ের প্রস্তুতি চলতে থাকল। প্রস্তুতি মানে, আমার তো মা-বাবা-পরিবার বলতে কিছু নেই, যা তোড়জোড় সব ও-বাড়িতেই।
আমি শুধু একবার জানতে চেয়েছিলাম হাস্নাহেনা বিয়েতে রাজি কি না। আইনুদ্দীন সাহেব বলেছিলেন, ‘আপনার মতো একটা পাত্র পাওয়া কি সহজ কথা! মাইয়া একবার কাচের টুকরা দেইখা হীরা ভাবছিল, অহন সবকিছু কিলিয়ার, আসল হীরা চিনতে পারছে।’
কে জানে মেয়ে নিজে চিনেছে, নাকি তার বাবা তাকে আসল হীরা চেনাচ্ছে। তবে সে যে সম্মত তাতে সন্দেহ করার বিশেষ কিছু নেই, কারণ হাস্নাহেনার মতো মেয়েকে যে অনিচ্ছায় বিয়েতে রাজি করানো যাবে না – এ-বিষয়ে আমি প্রায় নিশ্চিত। সুতরাং দিন-তারিখ ঠিক করে বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল।
কিন্তু নাটক তখনো শেষ হয়নি। ওই যে বললাম, হাস্নাহেনার নিয়তি! সহজে কিছু হওয়া তার কপালে যেন লেখাই নেই। বিয়ের মাত্র পাঁচদিন আগে জানা গেল হাস্নাহেনা চোখে দেখছে না। দেখছে না মানে দেখছেই না। সম্পূর্ণ অন্ধ যাকে বলে। প্রেমিকের কাছে প্রতারিত হয়ে ফিরে আসার পর থেকে চোখে ঘোলা দেখছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল, এমনকি সে নিজেও, এটা সাময়িক। কিন্তু যত দিন যায় দৃষ্টিশক্তি কমতে লাগল এবং একপর্যায়ে সম্পূর্ণ নির্বাপিত হয়ে গেল দৃষ্টিশক্তি। চোখের পাতা দুটো খুলে রাখা আর বন্ধ রাখার মধ্যে কোনো তফাত নেই!
কিছুদিন এই বিস্ময়কর বিষয়টা গোপন রাখার চেষ্টা করেছিল হাস্নাহেনার পরিবারের লোকজন। কিন্তু আইনুদ্দীন সাহেব মেয়েকে শহরে নিয়ে গিয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে যখন নিশ্চিত হলেন সত্যিই মেয়েটার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং সাধারণ চিকিৎসায় এর কোনো নিরাময় নেই, তখন সেটা আর গোপন রাখা গেল না। চিকিৎসক কোনো তাৎক্ষণিক কার্যকারণ খুঁজে না পেয়ে মানসিক আঘাতের কারণে হতে পারে বলে ধারণা করলেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্ধত্বের বিষয়টা গ্রামজুড়ে দ্রুত রটে গেল এবং ব্যভিচারের কারণে একে প্রকৃতিদত্ত শাস্তি বলে নিশ্চিত হলো প্রায় সবাই। এক মধ্যরাতে আইনুদ্দীন সাহেব ছুটে এলেন আমার কাছে। প্রায় ভিখিরির মতো হাত পেতে বললেন, একটাই মেয়ে, এই অন্ধ মেয়েকে বিয়ে করতে বলার কোনো মুখ তার নেই। তবু যদি আমি দয়াপরবশ হয়ে তাকে গ্রহণ করি তাহলে নিজের যা কিছু সহায়-সম্পদ সবকিছুই আমাকে লিখে দেবেন।
আমি একজন এতিম। ছোটবেলায় কিছুদিন মামাবাড়িতে, কিছুদিন এতিমখানায় আর কলেজের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছি। এখনো দুটি কামরার একটি টিনের ছাউনি বেড়ার ঘরে একা দিন গুজরান করি। প্রচুর অর্থ-সম্পদ মানুষের কী কী কাজে লাগে, সত্যি বলতে, তা আমার জানাও নেই। সুতরাং আমি আইনুদ্দীন সাহেবের সম্পদ দিয়ে কী করব! বরং আমার চোখে হাস্নাহেনার অপূর্ব সৌন্দর্য ভেসে ওঠে, জনসমক্ষে পায়ের স্যান্ডেল হাতে নিয়ে ছুটে যাওয়া সেই রুদ্রমূর্তি, সেই সৌন্দর্যকে যেন খানিকটা বাড়িয়েও দেয়। ভাদ্র মাসের ভরা নদীর চ্ছলচ্ছল শব্দ নিঃসঙ্গ রাত্রিতে আমার নিদ্রাহরণ করে।
সহায়-সম্পত্তির প্রয়োজন নেই, আমি তাঁর অন্ধ মেয়েকে খুশিমনে বিয়ে করতে রাজি আছি জানানোর পর আইনুদ্দীন সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বুক ভাসালেন। কী ভরসায় যেন আমি এ-কথাও বললাম, ‘আমি আপনার মেয়েটারে দৃষ্টি ফিরায়ে দেব।’ শুনে দুনিয়ায় এখনো ফেরেশতার মতো মানুষ আছে বলে তিনি বেশ কিছুটা সময় বিলাপ করলেন।
আরশিছড়ির মানুষ এক এতিম ছেলের সঙ্গে একটি অন্ধ মেয়ের বিয়ের সাক্ষী হলো। মেয়ের খুঁত আছে বলেই হয়তো নিখুঁত বিবাহ-অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন আইনুদ্দীন সাহেব। পুরো ব্যাপারটা আদৌ বিধিসম্মত হলো কি না এ নিয়ে নানা মত থাকলেও একবেলা নোলা ডুবিয়ে খাওয়ার ব্যাপারে কারোরই দ্বিমত ছিল না। ফলে বিবাহ সুসম্পন্ন হলো বলতে হবে।
বিয়ের পর প্রথম সাক্ষাতে হাস্নাহেনা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনে কী কারণে আমারে বিয়া করতে রাজি হইলেন?’
‘আমি তোমারে ভালোবাসি হাস্নাহেনা।’ আমি অকপটে স্বীকার করেছিলাম।
‘কিন্তু আপনেরে তো আমি দেখব না।’
‘আমি ভালোবাসা দিয়া তোমারে ভালো করে তুলব।’
বিশ্বাস করেছিল কি না জানি না, বিশ্বাস করার কথা তো নয়, কিন্তু প্রতি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আমি তার দু-চোখে চুম্বন দিয়ে বলেছি, ‘তোমার দৃষ্টি ফিরে আসুক … তোমার এই ক্ষতি যে করছে সে অন্ধ হোক।’
প্রতিটি রাতে গভীর আবেগে আমি এ-কথা বলেছি। যতবার বলেছি ততবারই কেঁপে উঠেছে হাস্নাহেনা। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি এইভাবে কেঁপে ওঠো ক্যান হাস্নাহেনা?’
‘আপনে এমনভাবে কথা বলেন, মিছাডারেও সত্য কথার মতো লাগে।’
‘আমি মিছা কথা বলি না হেনা।’ আমি বলেছিলাম আইনুদ্দীন সাহেব মেয়ের চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজছিল। অভিজ্ঞ লোকজনের সঙ্গে বুদ্ধি-পরামর্শ করছিল। কিন্তু চল্লিশ দিনের মাথায় এক সুবেহ সাদেকে নিদ্রাভঙ্গের পর হাস্নাহেনা অবাক চোখে তাকাল আমার দিকে। তার স্থির দুটি চোখে কথা ফুটে উঠল; আর আমি অশ্রুসজল হয়ে পড়লাম। কেন যেন আমার মনে হলো, এটাই ছিল অনিবার্য।
সারা গ্রামে এ-কথা ছড়িয়ে পড়ল যে, আইনুদ্দীনের মেয়ে দৃষ্টি ফিরে পেয়েছে। অংকের মাস্টার কী এক অলৌকিক চিকিৎসায় তার অন্ধ চোখে আলো জ্বেলে দিয়েছে। কেউ কেউ বোকা বনে গেল, আর কেউবা অবিশ্বাস করল। অবিশ্বাস যারা করেছে তাদের অনেকে এ-কথাও রটাল যে, হাস্নাহেনা আসলে কখনো অন্ধই হয়নি, সবই তার ‘অ্যাক্টিং’। কিন্তু কিছুদিন পর শহরফেরত একজন যখন স্বচক্ষে দেখে এসে জানাল, শহরের অন্ধকল্যাণ সমিতির সামনে সে জহিরউদ্দিন বাবরকে কালো চশমা আর সাদা ছড়ি হাতে পথ হাতড়ে চলতে দেখেছে, তখন সবার চোখই কপালে ওঠার জোগাড়। পুরো ব্যাপারটা একটা ধাঁধাঁ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। কিছুই আর অবিশ্বাস করতে পারে না!
আরশিছড়ির মানুষ দলে দলে ছুটে আসে আমার কাছে, দৃষ্টিহীনের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চায়, দুষ্টু লোককে কীভাবে অন্ধ করে দেওয়া যায় – সেটাও। আমি অবশ্য কিছুই বলি না।
জানি, গল্পটা আপনারা বিশ্বাস করলেন না। তা না করুন, হাস্নাহেনার সুগন্ধে আমার তো ঘর ভরে আছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.