এক জোড়া বিহ্বল দস্তানা

মেজদার কাঁধে ভর দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন রবি। পা টলছে। নাকি জাহাজই দুলছে? বোম্বে ছাড়িয়ে কত দূর চলে এসেছে তাদের ‘পুনা’ স্টিমার? স্টিমার কি আরব সাগর পেরিয়ে লোহিত সাগরের মাঝবরাবর চলছে? সমুদ্রের ঢেউয়ের দোলায় তিনি দুলছেন? নাকি তাঁর পা টলছে!

জাহাজের স্টুয়ার্ড ভায়া ডেভিড সুপের বাটি মুখের সামনে ধরে রোজই বলতেন, ‘খাও, কষ্ট করে হলেও খাও। নইলে তো ইঁদুরের মতো দুর্বল হয়ে পড়বে!’ আজো ঘণ্টাখানেক আগে এসে পীড়াপীড়ি করে গেছেন, ‘ইয়াং ম্যান, গেট আউট অফ দ্য কেবিন, সিট অন দ্য ডেক অ্যান্ড গেট সাম ফ্রেশ এয়ার, আদারওয়াইজ ইউ’ল বিকাম উইক অ্যাজ আ র‌্যাট!’ স্টুয়ার্ড ব্যাটা ইঁদুর ছাড়া আর কোনো তুলনা খুঁজে পায় না! মেজাজ খারাপ হয়ে যায় রবির। তাই, কোনো এক অদ্ভুত কারণে যুবকটি তাকে আলাদা খাতিরযত্ন করলেও, রবি গোঁ ধরে বিছানায় পড়ে থাকেন। কিন্তু মেজদার আদেশ তো অমান্য করতে পারেন না! মেজদা যখন বললেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে সিক বেডের নার্সিং ভোগ করা, এবার ওঠ।’ কয়েক কদম চলতেই মনে হলো, সত্যিই তিনি ইঁদুরের মতো দুর্বল হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ দু-বাহু ছড়িয়ে প্যাসেজের দুদিকের দেয়াল ধরে টাল সামলে নিয়ে রবি হাসেন।

– বড্ড কাহিল হয়ে গেছি, তাই না মেজদা?

– হুম! তুই তো আমাকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলি রবি! ছয়-ছয়টা দিন! চাঁদ সুয্যির মুখ দেখাদেখি নেই। বিছানায় পড়ে পড়ে ওয়াক ওয়াক করলি আর পেটে বালিশ চেপে কোঁ কোঁ করে কাতরালি। ছোটবেলা থেকে এত কুস্তি লড়লি, জুডো শিখলি, কোনো জুজুৎসু প্যাঁচ দিয়েই সমুদ্রদেবের

আদর-সোহাগের বাড়াবাড়িটাকে ঘায়েল করতে পারলিনে! অবশ্য এবার কয়েকটা দিন দ্য সি ওয়াজ রিয়েলি ভেরি রাফ, জাহাজও খুব দুলছিল। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’

এ-কটা দিন যেন একটা ঘোরের মধ্যে কাটিয়েছেন রবি। সি সিকনেস এমন ভয়াবহ ব্যাপার বুঝতে পারেননি। সারাদেহ যেন ঘোলের মতো পাক খেয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। অবশ্য নলিনী, মানে আন্না তাকে বারবার বলেছিলেন, ‘জাহাজে উঠেই দুটো কাজ করতে যেও না। রিডিং আ বুক অ্যান্ড লুকিং অ্যাট দ্য ওশান ওয়েভস! ডোন্ট ডু দিস টু থিংস অ্যাটওয়ান্স। তুমি দিনের বেলা জাহাজের যাত্রীদের মাথা গুনতে পারো, রাতে আকাশের তারা গুনতে পারো; কিন্তু সাগরের ঢেউ গুনতে যেও না। সিক হয়ে পড়বে।’ আহ নলিনী! কী বেগড়বাই ছাত্র তুমি পেলে, যে কি না তোমার মতো মাস্টারের কথাকে থোড়াই কেয়ার করে! জীবনে প্রথমবার জাহাজে চেপে কে-ই বা এসব নিষেধাজ্ঞা মনে রাখে! তাছাড়া রবি তো আর যেমন-তেমন কোনো যাত্রী নয়, সে যে কবি! জোড়াসাঁকোর শতাব্দীকালের পুরনো বাড়ির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সাগরের বুকে গিয়ে পড়লে কবি সেই অনন্ত অসীমের অমৃতরসকে প্রাণ ভরে পান করবে না! তা কি হয়?

নলিনীর কথা মনে হতেই দেহে যেন একটু বল পান রবি। সদ্যই নলিনীকে ছেড়ে এসেছেন। যদিও মাস দেড়েকের বেশি ছিল না বোম্বেতে ওদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণের সময়সীমা, তবুও মন জুড়ে কত স্মৃতি শরতের নীল আকাশে হালকা মেঘের মতো ভেসে আসে, ভেসে যায়! মৃদু হাসি ফোটে তার ঠোঁটে। এখন আর হাসি নিয়ন্ত্রণে রাখার দরকার নেই। ওখানে থাকাকালীন নলিনী যখন ইংরেজি ভাষা নিয়ে রবির ওপর পাণ্ডিত্য ফলাতে আসতেন, মনে করতেন সে বুঝি একেবারে ক-অক্ষর-গোমাংস, তখন খুব হাসি পেত। কিন্তু ঠোঁট চেপে ভালো ছেলের মতো মুখটি করে বসে নলিনীর মাস্টারি গ্রহণ করতেন রবি। বড় মুখরা মেয়েটি! প্রথমদিনই বলেছিলেন, ‘দেখো, আমাকে ওই টিপিক্যাল অ্যাড্রেস মানে দিদিটিদি, আপনি আজ্ঞে বলা চলবে না। নাম ধরে ডাকবে। সেটাই মডার্ন অ্যাটিকেট। মানে আধুনিক কেতা! তাছাড়া তুমি ইউরোপ যাচ্ছো। সেদেশে বাপ-মাকেও মি. অমুক বলে নাম ধরে ডাকার রেওয়াজ আছে, জানো তো! আর আপনি-তুমির শ্রেণিভেদ তো নেই-ই! আমার নাম অন্নপূর্ণা। অন্নপূর্ণা তড়খড়। পরিবারে আমাকে সবাই আন্না বলে ডাকে। তুমিও তাই ডেকো। অর ইউ ক্যান কল মি মিস তড়খড়!’

মিস তড়খড়? অমন রূপলাবণ্যে ভরপুর বাইশ বছরের তরুণীকে ওই খটোমটো শব্দে ডাকা মানায়? হোক না সে তুমুল চৌকস আর শিক্ষাদীক্ষায় ঝকঝকে ধারালো! অমন প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো কোমল শ্রীমণ্ডিত মুখ, প্রশস্ত কপালের নিচে বড় বড় স্বপ্নময় দুটি চোখ, গাঙচিলের ডানার মতো চিকন দীঘল দুটো ভ্রুরেখা, যেন মুখর পঙ্ক্তির একটি দ্বিপদী কবিতা, তাকে কি না বলবে মিস তড়খড়! শুনলেই মনে হয় জানালার কাঠের পাল্লায় রংচটা খড়খড়ি! এসব কথা মনে মনে ভেবেছেন রবি।

ওইসব তড়খড়ি খড়খড়ি না ডেকে আপনাকে, মানে তোমাকে একটা নতুন নাম দিলে কেমন হয়? মনে মনেই ভেবেছেন এ-কথা। তবে কী করে যেন আন্নার মন সে-কথা জেনে গিয়েছিল। যাক সেসব কথা। এখন নিজের কথা ভাবো রবি! গায়ের জামাটা ঢলঢল করছে। মনে হচ্ছে অন্য কারো জামা চুরি করে এনে গায়ে চাপিয়েছেন। বুকের বোতামটা লাগিয়ে নিয়ে হাতাগুলো একটু টেনে দেন।

– কি রে শীত করছে? একটা আলোয়ান জড়িয়ে নিবি? ডেকে কিন্তু খোলা হাওয়া। দুর্বল শরীর। জ¦র আসতে পারে।

কপালে হাতে রেখে তাপ পরখ করেন সত্যেন্দ্র। বড্ড ভালোবাসেন এই উদাসী ভাবুক-কবি ছোটভাইটিকে। রবি লজ্জা পেয়ে যান। উনিশ বছরের বড়, সাংঘাতিক মেধাবী আর প্রতিভাবান, ভারতের প্রথম বাঙালি আইসিএস অফিসার এই মেজোভাইকে রবি যেমন গুরুর মতো ভক্তি করেন, তেমনি ভয়ও পান। তিনি সত্যেন্দ্রনাথের কাঁধ ছেড়ে দেন।

– তুমি চলে যাও মেজদা। আমি ঠিক আছি। একাই ডেকে গিয়ে বসতে পারবো।

কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে কোনোমতে একটা আরামকেদারায় শরীরটাকে ধপাস করে ছেড়ে দিয়ে রবি যেন ঘাড় থেকে ভারী বোঝা নামিয়ে দেওয়ার মতো হালকা অনুভব করেন। লম্বা করে দম নিয়ে তাজা হাওয়ায় ফুসফুস ভরে নেন। কয়েকবার অনুলোম বিলোম প্রাণায়াম করেন। তারপর দৃষ্টি পাঠিয়ে দেন দূর দিগন্তে। মাথার ওপর বিশাল আকাশ সুনীল ঢাকনা খুলে একটা নিঃসীম অনন্তকে যেন উপুড় করে ঢেলে দিচ্ছে। সাগরও শান্ত। সুশৃঙ্খল তরঙ্গমালায় যেন ঢাকাই জামদানির নকশা বোনা হচ্ছে।

পড়ন্ত দুপুরের আলো তার দেহটিকে পাতলা শালের মতো জড়িয়ে নেয়। আরাম লাগতে থাকে। সমুদ্রের সুবিশাল পরিধির মধ্যে আপন অস্তিত্বের অর্থহীনতা অথবা নতুন অর্থ মনের মধ্যে কী একটা অনুভূতির দোলা লাগায়। রবির মনে পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি ভেসে আসে। ওরা এখন যেথা খুশি ভেসে যাক। খসড়া খাতাটি সঙ্গে নেই। এখন অন্য ভাবনা। ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে রবি নিজের মধ্যে ডুব দেন।

দুই

ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেত যাচ্ছেন রবি। মাত্র সতেরো বছর বয়স তাঁর! আন্না বলেছিলেন, ‘ইউ আর স্টিল আ টিনএজার! এই বয়সেই তুমি ইংল্যান্ড যাচ্ছো? আমি তো হেরে গেলুম। আমি ভাবতাম আমিই বুঝি অল্প বয়সে বিলেত গিয়েছি! কিন্তু আমি তো টিন পেরিয়ে ‘টি’তে গিয়েছি! টোয়েন্টি ওয়ান! যাক, তা নইলে সত্য কাকু তোমাকে কি আমার পাঠশালায় ভর্তি করাতো!’

আন্নাকে হারানো মুশকিল। মাত্র একুশ বছরে এক ভারতীয় মেয়ে বিলেত ঘুরে এসেছেন। কী সাংঘাতিক! যেখানে কি না এখনো গৌরী দান না হলে কন্যার পিতামাতার চিন্তার অন্ত থাকে না! পাশ্চাত্যের চলনবলনে তিনি দুরন্ত আধুনিক। শুধু কি ইংরেজি? ফরাসি, জার্মানসহ তিন-চারটা ভাষায় তিনি গড়গড় করে কথা বলতে পারেন। পাশ্চাত্য ঢঙের পোশাক, চুলের কাট, হিল তোলা লেডিস শু পরে টকটক করে ব্যালে নৃত্যপটিয়সী ললনার মতো সাবলীল ছন্দোময় হাঁটা, পিয়ানোর রিডে চম্পক অঙ্গুলি আলতো বুলিয়ে

দু-বাহুতে অদ্ভুত মায়াবী ঢেউ খেলিয়ে পাশ্চাত্য সংগীতের সুর বাজানো – সবই তার চেয়ে দেখার মতো। আন্নার ভক্ত স্তাবকের সংখ্যাও কম নয়। ড. হ্যারল্ড নামে বরোদা কলেজের একজন অধ্যাপক তো প্রায়ই আসতেন, আন্নাও টিপটপ পোশাক-আশাক পরে ভ্যানিটি ব্যাগ দুলিয়ে তার সঙ্গে বেড়াতে বের হয়ে যেতেন। এসব নিয়ে পরিবারের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, নেই কোনো হীনম্মন্যতা।

শিক্ষা-সংস্কৃতির অবাধ হাওয়া চলাচল করে ওদের পরিবারে। অবশ্য আন্নার গোটা পরিবারই উচ্চশিক্ষিত। আধুনিক। বিশেষ করে আন্নার বাবা ডা. পান্ডুরঙ্গ তড়খড় ভারতের স্বনামধন্য ডাক্তারই শুধু নন, নানারকম সমাজ সংস্কারমূলক কাজে তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মেয়েদের শিক্ষাদীক্ষা প্রসারের জন্যও কাজ করে চলেছেন। রবির মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গেও পাণ্ডুরঙ্গের ভালো জানাশোনা ছিল। সত্যেন্দ্রনাথ উচ্চশিক্ষিত। সে-সময়ে আমেদাবাদে সেশন জজ। মেজদার কথাতেই বাবামশাই রবিকে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেত পাঠাতে রাজি হলেন। আর মেজদাও ঘাড়টা ধরে রবিকে নিয়ে গেলেন আমেদাবাদে। সেখান থেকে ইংরেজি বোলচাল, বিলেতের আদবকায়দা আর আধুনিক কেতায় সড়গড় করে তোলার জন্য পাঠিয়ে দিলেন বোম্বেতে পাণ্ডুরঙ্গের বাড়ি।

ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য তো রবির মোটেও ইচ্ছে ছিল না। তার জন্য আবার ভারতীয় ধ্রুপদী বনেদিয়ানা ছেড়ে পশ্চিমা কেতা আয়ত্ত করতে এক তরুণীর সকাশে যাওয়া! কেমন যেন না ব্যাপারটা! ভেতরে ভেতরে একটা গোঁ ধরে বসে ছিলেন রবি। কিচ্ছুটি শিখবেন না। তিনি কি কম জানেন নাকি? বয়স সতেরো হলে কী হবে? ইংরেজি বাংলা সংস্কৃত গণিত সাহিত্য ইতিহাস দর্শন ধর্ম মিলিয়ে কম পড়াশোনা আছে তাঁর? অন্নপূর্ণা না হলেও তিনিই পারেন তাঁর ছোট বোন মানেককে দিব্যি মাস্টারি করে বিদ্যা শেখাতে!

স্কুল-কলেজের গণ্ডিবদ্ধ নিয়মকানুনের মধ্যেকার লেখাপড়ায় তো তিনি কোনোদিনই আমোদ পাননি! কাঠখোট্টা নীরস ওই লেখাপড়া বইয়ের পাতা ছেড়ে মনের পাতায় আঁক কাটতে পারতো না। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে সারাদিন একের পর এক বিদ্যা শিক্ষার মধ্যে বরং তিনি মনের স্ফূর্তি পেতেন। কিন্তু না বাবামশাই, না মেজদা, কারো কথার ওপর কথা বলা বা দ্বিমত করার মতো সাহস তো তাঁর নেই! অবশ্য কলকাতার বাড়ির গণ্ডি ছেড়ে নতুন পরিবেশে, নতুন আকাশ, নতুন বাতাসের মধ্যে গিয়ে নতুন জীবন, নতুন মানুষকে জানার মধ্যে যে রোমাঞ্চ আছে তার প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল বইকি! কিন্তু মধ্যখানে নলিনী এসে যেন বুকের মধ্যে কেমন সুখ সুখ ব্যথা জাগিয়ে তুললো। নলিনীকে বিদায় জানিয়ে চলে আসার সময়কার অনুভূতিটাকে কিছুতেই মন থেকে মুছে দিতে পারছেন না।

আর্চবিশপ ট্রেঞ্চ সাহেবের লেখা প্রোভার্বস অ্যান্ড দেয়ার লেসনস বইটা মেলে ধরেন সামনে। পড়া যাক!

একজন ইউরেশীয় ভদ্রলোক এসে দাঁড়ান রবির পাশে। বাদামিঘেঁষা চামড়া। রোদের তাপে একটু লাল হয়ে উঠেছে। চুলের মধ্যেও লালচে রং। খপ করে রবির হাত থেকে বইটা তুলে নেন। এ ক’দিন বলতে গেলে রুমেই আবদ্ধ থাকায় লোকজনের সঙ্গে তেমন আলাপ-পরিচয় হয়ে ওঠেনি। বইটার কয়েক পাতা উল্টে নেড়েচেড়ে বললেন, ‘ও, অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করতে যাচ্ছো? দ্যাটস গুড! ওটা ভালো ইশকুল! ভালো, খুব ভালো।’ রবি ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে উপদেশ বাক্যের প্রত্যুত্তরে কী বলবেন ভেবে না উঠতেই লোকটি তার হাত বাড়িয়ে আর একবার খপ করে রবির দক্ষিণ কর আকর্ষণ করে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন, ‘আয়্যাম ব্রুনো! ইউ ক্যান কল মি মিস্টার বি, ইফ ইউ ওয়ান্ট টু মেক মাই লং নেইম ইন টু শর্ট!’ বলেই হা হা করে হেসে ওঠেন। আমুদে ব্রুনোকে রবির বেশ ভালো লেগে যায়। ভ্রমণে এই ব্যাপারটাই মজার। নতুন দেশ নতুন মানুষ নতুন আচার-আচরণ – কত কী দেখা যায়!

কেবিনটা রবির একেবারেই অপছন্দের। মনে হয় একেবারে জাহাজের তলপেটের খোড়লে খাঁজ কেটে একটা বাকসো বানিয়ে তার ভেতর দেহটাকে মেলে দেওয়ার জন্য বেড নামের দুটো তাক পাতা হয়েছে। ছোট্ট একটা জানালা। সেটা দিয়ে তাকালে সবুজ রঙের পানসে ঢেউ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। একটু দুলে উঠলেই মনে হয় গলগল করে জানালার ফোকর দিয়ে সমুদ্দুরের নোনা জল ঢুকে পড়বে। আলো নেই হাওয়া নেই। সি সিকনেস কেটে যাওয়ার পর রবি তাই ডেকেই থাকেন বেশি।

এখন কেবিনে বসেই ডায়েরিটা খুলেছেন। কতদিন কিচ্ছু লেখা হয়নি। ভেবেছিলেন প্রথম ইউরোপযাত্রা, প্রতি মুহূর্তের ঘটনার নোট রাখবেন। আর দেড়দিন বাদেই এডেন বন্দরে জাহাজ থামবে। লোকজন চিঠি লেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রবিও কি লিখবেন? কাকে? আন্নাকে? কলম দিয়ে আলতো টানে ডায়েরির পাতায় আনমনে লেখেন ‘প্রিয় নলিনী’। শব্দদুটোকে মনে হচ্ছে দুটো চোখ। জুলজুল করে তাকিয়ে বলছে, ‘হ্যাঁ, কবি, বলো। তারপরে কী?’ রবি একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে নামটা কেটে দেন। মেজদার চোখে পড়ে গেলে লজ্জার একশেষ হবে। মেজদা তো তাঁর সব লেখাই এখন মাসিক ভারতীতে ছেপে দিচ্ছেন! তিনিই সম্পাদক কি না! কবিকাহিনির কবিতাগুলো সব ধারাবাহিক ছেপে দিয়েছেন। কবিকাহিনির বনবালা তো নলিনী! ওই কাব্যে নলিনীর সঙ্গেই তো কবি একধরনের নিষ্কাম সুন্দর প্রণয় রচনা করেছেন। কিন্তু একেবারেই কি নিষ্কাম? ‘ওই হৃদয়ের সাথে মিশাতে চাই এ হৃদি/ দেহের আড়াল তবে রহিল গো কেন?’ এসব লাইন তো আছে! এসব কী অ্যাঁ? এই বয়সেই এমন ডেঁপো কবিতা? নিজেকে নিজেই চোখ ঠারেন রবি। আবার কলমের নিবটি ঠোঁটের সামনে তুলে ধরে বলেন, কবির আবার ‘এই বয়স’ কী, হ্যাঁ? কবি তো কবি! কিন্তু কবিকাহিনির সেই ‘নলিনী’ নামটি যে তিনি আন্না তড়খড়কে দান করে বসেছেন, এ-কথা এখন প্রকাশ করা যাবে না! ডায়েরির কাটাকুটিকে একটা নকশি পতঙ্গের রূপ দেন রবি।

তিন

সমুদ্রে জোছনার চেহারা এমন রহস্যময়ী? ঢেউ উঠছে, পড়ছে আর তার মধ্যে ভেঙে ভেঙে পড়ছে চাঁদের আলো। এক টুকরো চাঁদ হাজার টুকরো হয়ে ঢেউয়ের আবর্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবনও কি এমন? মহাকালের আবর্তে জীবন তার সমস্ত আলো-আঁধার নিয়ে এমনি বিলীন হয়ে যাবে! ডেকে বসে রবি জ্যোৎস্নালোকিত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। রবি তো কল্পনায় জোছনা রাতে সলমাজরির কারুকাজ করা উড়নিতে মুখ ঢাকা ইরানি রমণীর মতো উদ্ভিন্ন যৌবনা সমুদ্রকন্যার চঞ্চল ভঙ্গিমা নিয়ে কত পঙ্ক্তির কথা ভেবেছেন, লিখেছেন, কিন্তু বাস্তবে সে-রূপ এমন রোমাঞ্চকর! এমন মোহময়ী!

তখন ভারতী পত্রিকায় কবিকাহিনী সর্গের পর সর্গ প্রকাশিত হচ্ছিল। মনের মধ্যে অনবরত ঘুরে বেড়ায় পঙ্ক্তি। আন্না এরই মধ্যে ভূমিকা বদলে নিয়েছিলেন। তিনি বসেছেন শিষ্যার আসনে আর রবি হলেন গুরু। রবি তাঁর কবিতা পড়ে শোনান আন্নাকে। মারাঠি ভাষা জানেন না রবি, ইংরেজি তরজমা করে বুঝিয়ে দেন কবিতার মর্মকথা। এত সুন্দর এ-ভাষার কবিতা! বাংলা শিখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন আন্না। সেদিনের জোছনায় চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল আর মদির হয়ে উঠেছিলেন আন্না। জোছনাভেজা সন্ধ্যায় পশ্চিমের বারান্দায় আত্মমগ্ন রবির কাছে একটি জোছনাপরীর মতোই ফিনফিনে নীলাভ পোশাকে এসে হাজির হয়েছিলেন আন্না। রবির হাতে ভারতী। তা থেকে আন্নাকে আবৃত্তি করে শোনান।

‘হা নিষ্ঠুর কাল, তোর এ কিরূপ খেলা/ সত্যের মতন গড়িলি প্রতিমা/ স্বপ্নের মতন তাহা ফেলিলি ভাঙিয়া?/ কালের সমুদ্রে এক বিম্বের মতন/ উঠিল, আবার গেল মিলায়ে তাহাতে?/ না, না , তাহা নয় কভু, নলিনী, সেকি গো/ কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মতো,/ যাহার মোহিনী মূর্তি হৃদয়ে হৃদয়ে/ শিরায় শিরায় আঁকা শোনিতের সাথে,/ যতকাল রব বেঁচে, যার ভালোবাসা/ চিরকাল এ হৃদয়ে রহিবে অক্ষয়,/ সে বালিকা, সে নলিনী, সে স্বর্গপ্রতিমা …।’

মেদুর হয়ে হয়ে উঠেছিল আন্নার স্বপ্নময় চোখদুটি। ভা-লো-বা-সা। লাভ! লাভ! ডিভাইন আইডল! হোয়াট আ ম্যাগনিফিসেন্ট ইমেইজারি? ইফ আই ওয়্যার দ্যাট গার্ল – নলিনী! বাট আয়্যাম আন্না, আন্নাপূর্ণা।’ আন্না হঠাৎ রবির কবিতার খাতাটা টেনে নেন। আলতো হাতে রবির আঙুলগুলো মুঠি করে ধরে বলেন, ‘আমাকে একটা ডাকনাম দেবে, কবি? ওই তোমার নলিনীর মতো সুন্দর একটি নাম? আমি তাকে পরম যত্নে বাঁচিয়ে রাখবো!’

রবি আন্নার কণ্ঠ শুনে অবাক হন। ছলছল আর্তিভরা কণ্ঠ। চোখদুটোতেও অচেনা আলো। আন্নার এ-রূপ আর দেখেননি রবি। আন্না কর্তৃত্বপরায়ণ। রবির তুলনায় অনেক চঞ্চল, নানারকম দুষ্টুবুদ্ধি তাঁর মাথায় খেলা করে। রবির কাছে নানা ছলে ঘুরে বেড়ান, নানাভাবে তাঁকে আকৃষ্ট করার ছলচাতুরী করেন। একদিন পেছন থেকে এসে রবির চোখদুটো চেপে ধরেন, আর একদিন দুম করে এসে তাঁর নেয়ারের খাটের এক প্রান্তে বসে পড়ে গাউনের হাতার ফ্রিল গুটিয়ে বলেন, ‘আমার হাতটা ধরো তো! টাগ অফ ওয়ার খেলি! দেখি কে হারে কে জেতে।’ আবার পাঞ্জা লড়ার ছলে নিজেই হেরে গিয়ে আলতোভাবে নিজের হাতটাকে রবির সামনে এমন করে বিছিয়ে দেন, যাতে হাত থেকে একটা মধুর আবেশের রূপরসগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

এসব চাতুরী রবি সবই বোঝেন। মনে মনে একটা রোমাঞ্চও অনুভব করেন। কিন্তু স্বভাবসুলভ লাজুকতায় চুপ করে থাকেন অথবা এড়িয়ে যান। অথবা খুব সহজভঙ্গিতে টাগ অফ ওয়ার খেলায় জিতিয়ে দেওয়াটাকে সত্যিকারের ‘জিত’ বলে মেনে নেওয়ার ছলে তাচ্ছিল্য করে বলে ওঠেন, ‘মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে কোনোদিন জিততে পেরেছে, হুঁ?’ কখনো অপ্রাসঙ্গিক নানা গল্প শুরু করেন। কবিতার কথা বলেন। আন্নাকে সহজ করে তোলেন। মাঝেমাঝে রবির মনে হতো, আন্নার দুষ্টুমিগুলো যেন সরল দুষ্টুমি নয়, দুষ্টুমির ছলে অন্য কিছু। গভীর কিছু। কিছু একটা হতে চলেছে। এই ‘হতে চলা’টাকে থামাতে হবে। এটা আসলে হয় না। রবি নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে নিতেন। কিন্তু এসবের মধ্যে আন্নার এমন কাতর আবেদনভরা গলা আর শোনেননি। সেদিনের জোছনা রবিকেও বুঝি পাল্টে দেয়। ইচ্ছে করছিল আজ আন্নার হাতটা নিয়ে টাগ অফ ওয়ার নয়, গালের ওপর চেপে ধরে রাখেন। এই গাল নিয়েও মজা করতে ছাড়েননি আন্না। একদিন বললেন, ‘আচ্ছা পুরুষরা তো কমবেশি সবাই দাড়ি রাখেন। কিন্তু এই স্টাইল যে সবাইকে মানায় না সেটা কিন্তু বোঝে না। রবি, তুমি কিন্তু তোমার এই সুন্দর মুখটা কোনোদিনও দাড়িগোঁফ দিয়ে ঢেকে ফেলো না!’ বলে রবির মুখের দিকে রহস্যময় হাসিছাপা চোখে চেয়ে থাকেন আন্না। ওই দৃষ্টি দুষ্টুমির ছলে হলেও সেদিন রবির সতেরো বছরের কৈশোরের রক্তোচ্ছ্বাস তাঁর দাড়িগোঁফবিহীন কোমল গাল দুটিকে অরুণাভ করে তুলেছিল।

পূর্ণ চাঁদের মাতাল জোছনা যেন রবিকে এক সোরাহি স্বর্ণমদ্য পান করায়। রবি আবেগে উচ্ছল হয়ে বলে ওঠেন, ‘বেশ তো এই নামটিই তোমাকে দিলুম। আজ থেকে তুমি নলিনী!’

– নলিনী? সত্যি? আমাকে এই নাম তুমি দিলে?

– হ্যাঁ দিলুম তো!

– মন থেকে দিয়েছো, না চেয়ে নিলাম বলে, অপারগ হয়ে?

রবি মনে মনে বলেন, কবিকাহিনির বনবালা নলিনী যদি ‘মনবালা’ হয়ে ওঠে, আর কবিতার পাতা ছেড়ে মারাঠি ডাক্তার আত্মারাম পাণ্ডুরেঙ্গের বাড়ির জোছনাভেজা বারান্দায় আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে ‘তোমার দেওয়া একটি নামে আমায় ডাকো’, তখন তো মন শতমুখ খুলে উন্মুখ হয়েই বলে ওঠে, নলিনী! মুখে বলেন, ‘ও নামটা তোমাকেই মানায়।’

আন্না গাঢ় কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘তাহলে আর একটা কথা রাখবে? এ-নামটিকে সুরে জড়িয়ে দিও। একটি গীত রচনা করো নলিনীর জন্য!’

রবি বলেন, ‘কে গাইবে? তুমি?’

– শিখিয়ে দিও। তুমি তো আমার গুরু!

কী এক অদম্য প্রেরণায় সেদিন রাতেই গানটি লিখে ফেলেছিলেন রবি। ‘শুন নলিনী, খোলো গো আঁখি -/ ঘুম এখনো ভাঙিল না কি!/ দেখো, তোমারি দুয়ার ’পরে/ সখী, এসেছে তোমার রবি ॥’ মনে মনে সুরের একটা খসড়াও করে ফেলেন। পরে ঠিকঠাক করে নলিনীকে গেয়ে শোনাবেন।১

‘নলিনী’ নামাঙ্কিত হওয়ার পরে আন্না যেন অনেকটাই বদলে যান। সুযোগ পেলেই রবিকে আর খোঁচাতে আসেন না। ইউরোপে এই করে, সেই করে, এভাবে বসে, এভাবে খায়, এভাবে হাত মেলায়, এভাবে পা চালায় – এমন পদে পদে নিয়মের ব্যাকরণ শেখাতে আসেন না। বরঞ্চ একদিন খাবার টেবিলে রবির বসার জায়গাটিতে ন্যাপকিনের ভাঁজের ভেতরে একটা রোমান্টিক চিরকুট লুকিয়ে রেখেছিলেন, যার শেষে নাম স্বাক্ষর করা ছিল ‘নলিনী’।

রবি তো বড় হয়েছেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে চাকর ব্রজেশ্বরের তত্ত্বাবধানে। ব্রজেশ্বর খাবার ঘরে মাদুর পেতে দিতেন। বারোয়ারি পাত পাতা হতো। একগাদা ছেলের সঙ্গে লাইন করে বসে হাত দিয়ে গ্রাস তুলেই ভাত লুচি পায়েস মন্ডা খেতে অভ্যস্ত ছিলেন। খাওয়া শেষে আচমন। আত্মারামের বাড়িতে ভিন্ন ব্যবস্থা। খাবার টেবিলে আধুনিক নিয়মে ছুরি কাঁটাচামচ ন্যাপকিন ইত্যাদি প্লেটের দুপাশে সাজানো থাকতো। সবাই একসঙ্গে খেতে বসতেন। আন্না পাঠ দিতেন রবিকে। ধোপদুরস্ত পোশাকে ফিটফাট হয়ে খাবার টেবিলে বসতে হবে। ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছেন প্লেটের কোন পাশে ছুরি, কোন পাশে কাঁটা, খাওয়া শুরুর আগে ছুরি-কাঁটার অবস্থান কী, পরবর্তী পদের জন্য অপেক্ষায় তা কেমন, শেষ করার পর কেমন, স্বাদু বা বিস্বাদ বোঝাতে চামচ-কাঁটার নকশা কেমন, খাবার মুখে দেওয়ার সময় কয় ইঞ্চি মাথা নামাবে, কনুই কখনো টেবিলের ওপরে ঠোকর খাবে না। খাবার মুখের কাছে আনবে, মুখ খাবারের কাছে নিয়ে যাবে না, মুখ খুলে বা শব্দ করে চিবোবে না – এইসব অংক আর সূত্র মনে রাখতে গিয়ে খাওয়ার টেবিলে বসে কখন কী ভুল হয়ে যায়, এই ভয়ে রবি কাঁটা হয়ে থাকতেন। তারপরেও ভুল হতো। ছুরি-কাঁটা, চামচ সবই ডান হাতে চলে আসতো। আন্নার চোখে মাঝে মাঝেই ভর্ৎসনার ইঙ্গিত ফুটতো। কাঁটাচামচ বাম হাতে, ডানে না!

আরেহ! মারাঠি আন্না কি জানে যে, বাঙালির কাছে খাওয়া মানে ‘ডান হাতের ব্যাপার?’ সেটাকে কোন দুঃখে বাঁ হাতে চালান করতে যাবে?

আন্না রবির টেবিল ম্যানারসের ভুলগুলো খুব উপভোগ করতেন। এই নিয়ে পরে ফুট কাটতে ছাড়তেন না। একদিন তো রবিকে সহানুভূতির ছলে রাগিয়েই দিলেন। সেদিন টেবিলে ছিল জনপ্রিয় মারাঠি খাবার পুরান পোলি। বড় পেতলের থালায় পুরভরা দু-ভাঁজ করা মোটা মোটা রুটি, একপাশে তিন-চারটা ছোট বাটিতে লাল হলুদ সাদা সবুজ রঙের ঘন রাইতা আর টক ঝাল-মিষ্টি চাটনি। মুখ বন্ধ করে চিবোতে গিয়ে একবার খাদ্যের মণ্ড গলায় আটকে গেল। রবি কোনোমতে এক ঢোক জল খেলেন। কিন্তু হা করে একটু বাতাস ফুসফুসে নেওয়া আর গলার কাছে জমে থাকা একটা বাতাসের দলা বিশাল ঢেকুর আকারে বের করে দেওয়ার জন্য প্রাণটা আইঢাই করছিল। রবি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন ঢেকুর আটকাতে। সবার সঙ্গে খাবার টেবিলে বসে তো ওই কম্মটি কিছুতেই করা যাবে না! আন্না অপাঙ্গে দেখছিলেন রবির অবস্থা। আন্নার মা রাধাবাঈ একবার বলে উঠলেন, ‘বেটা, তোমার খারাপ লাগছে?’ রবি অপ্রস্তুত হয়ে ঘড়ঘড় গলায় বলেন, ‘না না। কিছু না।’ কিন্তু আন্না তখন মুচকি হাসি দিয়ে বলে ওঠেন, ‘রবি, ইটস ওকে টু বার্প ইফ ইউ আর কম্ফোর্টেবল, উই ডোন্ট মাইন্ড!’ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিলেন রবি। মনে মনে আন্নার মুণ্ডুপাত করে নিজেকে সামলেছিলেন।

এরপরে খাবারের টেবিলটাকে মনে হতো অত্যাচারের জায়গা। সেই অত্যাচারের জায়গাটিতে সেদিন একটু দখিনা হাওয়া লাগল। চেয়ারে বসে ন্যাপকিনটা খুলে কোলে বিছিয়ে দিতেই তার ভেতরে একফালি দু-ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পেলেন। কোলের ওপরেই মেলে ধরলেন। ‘বিকেলে ছাদে এসো। কথা আছে। নলিনী!’ এক ঝলক শিহরণ খেলে গেল রবির মনে।

পরে বলেছিলেন, ‘এই সাদামাটা নিরীহ কথাটা চিরকুট দিয়ে বলতে হলো কেন? হুকুম করলেই তো হতো।’

আন্না উত্তর করেছিলেন, ‘দুটো কারণে।’

– কী সেই দুটো কারণ?

– প্রথম কারণ, হুকুমের মধ্যে কড়া তামাকের গন্ধ থাকে, আড়ালে ফোটা অজানা ফুলের সৌরভ থাকে না। দ্বিতীয় কথা, চিরকুট না হলে যে সদ্য পাওয়া নামখানা স্বাক্ষর করা যায় না।

ছাদে শতরঞ্চি পেতে বসে আন্না সেদিন রবিকে বলেছিলেন, ‘আমার সামনে বসে তুমি নলিনীকে নিয়ে গানটি রচনা করো আর আমাকে সেই গান শোনাও। আজ শুধু নলিনীর জন্য গাইবে রবি।’

রবি রঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘এটাও তো হুকুমই! এখনই লেখো, এখনই সুর দাও, এখনই শোনাও! বাপরে! এর চেয়ে তো এখনই ধরে আনো, বিচার করো আর এক্ষুনি শূলে চড়াওয়ের হুকুম মান্য করা বেশি সহজ!’

– হুকুম হলে হুকুম। এখন তোমার কাজ ‘জো হুকুম মহাশয়া’ বলা।

রবির সঙ্গেই ছিল গানটি। দুটো কপিও করে রেখেছিলেন। তার একটি আন্নার হাতে তুলে দেন। গানের বাণী পড়ে আন্নার চোখ ছলছল করে উঠলো। বুকে চেপে ধরে বললেন, ‘কেন তুমি এমন করে আমার কাছে এলে, বলো তো! আমি তো তোমাকে ধরে রাখতে পারবো না! তোমায় যেমন ইউরোপ টানছে, তার চেয়ে ঢের বেশি পিছুটান আমার। এই টানাটানির মধ্যে পড়ে আমার আত্মাটা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।’

রবি সহাস্যে বলেন, ‘ধরে রাখতে না পারো, মনে তো রাখতে পারবে? সেজন্যই তো এ-গান।’

রবি উদাত্ত গলায় মায়াবী সুরে জড়িয়ে নিলেন গানটিকে।

ড্রয়িংরুমের পিয়ানোয় বসে রবির গাওয়া গান কয়েকবারই আন্না শুনেছেন। কিন্তু সে-গান আন্না ছাড়াও ঘরে যাঁরা থাকেন সবাই-ই শুনতে পান। রবির গান বড় ভালো লাগে আন্নার। সে-কথাটা বিশেষ করে বলা হয়নি। সেদিন ছাদের কোনায় ফোটা চাঁপাগাছ থেকে এক অপার্থিব সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছিল। দেহমন আবিষ্ট হয়ে পড়ছিল এক অচেনা অনুভূতিতে। তার মধ্যে রবি গান গাইলেন। সে-গানের সুর ছাদের নিঃশব্দ রেলিং পেরিয়ে, আনমনা কার্নিশ বেয়ে সন্ধ্যার আকুল বাতাসে ঢেউ তুলে ভেসে বেড়াতে লাগল।

গান শুনে নলিনী যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘কবি, তোমার গান শুনে আমি যেন মরণ দিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।’

চার

আর আট-দশ ঘণ্টা পরে জাহাজ এডেন বন্দরে থামবে। মেজদা এসে বলে গেছেন, ‘বন্দরে নামতে হবে। একটু গোছগাছ করে নে।’ কিন্তু রবির যেন এক পা চলে তো আর এক পা চলে না। কেমন একটা নিরেট শ্রান্তি। কেবিনের ছোট টেবিলটার ওপরে টেবিল ল্যাম্পের হলদেটে আলোয় বসে কতক্ষণ ডায়েরি লিখে রবির কেমন গা গুলোচ্ছে। আবার বমি হবে নাকি? সি সিকনেস তো শেষ! আর কয়েক ঘণ্টা পরে তো ডাঙা পাওয়া যাবে! এটা তাহলে কী? ল্যান্ড সিকনেস? অলস হাতে কাগজপত্র গুটিয়ে বাকসে ভরেন।

দরজায় বেল বাজে, যা ভেবেছিলেন তাই। সুপের বাটি হাতে স্টুয়ার্ড ডেভিড দাঁড়িয়ে। ঝকঝকে দাঁতে ঝিলিমিলি হাসি।

– তোমার জন্য হেলদি স্যুপ এনেছি। চিকেন ব্রেস্ট উইদ মাশরুম অ্যান্ড ব্রোকলি। জিঞ্জার ব্ল্যাকপেপার আর সøাইট ক্যাফির লাইম জুস আছে। ক্রিস্টাল ক্লিয়ার।

বাটির ওপরে হালকা ধোঁয়া উড়ছে। ডেভিড নিজেই ধোঁয়াটা এক দমে টেনে বলেন, ‘ওয়ান্ডারফুল! টেস্ট ইট। ইট’ল বি ভেরি গুড ফর ইয়োর হেলথ।’

রবি ধন্যবাদ জানিয়ে সুপের বাটিটা নেন। বলেন, ‘আর কত সুপ খাওয়াবে আমাকে? আমার মা থাকলেও এতবার আমার জন্য সুপ রান্না করতো না।’

– ও, ডোন্ট সে দিস। ইট ওয়াজ মাই ডিউটি। নাথিং মোর …।’ ছলছল করে ওঠে ডেভিডের চোখ। এডেন পৌঁছলে ডেভিডের ডিউটি বদল হবে। তখন আর রবির জন্য সুপ বানাতে পারবে না। এটাই শেষ। আজ সন্ধ্যায় ডান্স পার্টি আছে। বলরুমে। ‘উইল ইউ অ্যাটেন্ড? ইউ মে এনজয়।’

ডান্স পার্টি? হ্যাঁ, রুমে ফেরার সময় একবার ব্রুনোর সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। ডান্স পার্টির কথা বলে কতক্ষণ রঙ্গ করেছেন। বলেছেন, ‘ধ্যাৎ ও-পার্টিতে অ্যাটেন্ড করে কী কচুটা হবে! এ-জাহাজে তুমি কোনো সুন্দরী তরুণী দেখতে পেয়েছো! অল আর ওল্ড উইমেন, ফাঁপানো চুল, চোখে কাদার মতো মাশকারার পলেস্তারা আর চামড়া কুঁচকানো গালে-ঠোঁটে রুজ লিপস্টিকের পরত, এসব লাগালেই সে ইয়াং লেডি হয় নাকি? তুমি নিশ্চয়ই বোম্বেতে তোমার প্রণয়িণীকে ছেড়ে এসেছো! তোমার চোখ দেখে কিন্তু ঠিক আমি পড়ে ফেলতে পেরেছি। ওকে ইয়াং ম্যান, ডান্স পার্টিতে গেলে কোনো বুড়ির হাত ধরে তোমার ফিয়ান্সের মুখ মনে করে নাচতে পারো, হা হা হা!’

ব্রুনোর বকবকানি শুরু হলে থামতে চায় না। রবি কৌশলে পালিয়ে এসেছিল কেবিনে।

নলিনী কি তার ফিয়ান্সে? প্রণয়িণী? তিনি তো নলিনীর প্রেমের আমন্ত্রণকে উপেক্ষা করেছেন। ফিরিয়ে দিয়েছেন একটি নিবিড় প্রেমকাতর চুম্বনের আহ্বান। নলিনীর প্রেমকে অবজ্ঞার চাবুকে রক্তাক্ত করেছেন। 

রবি হঠাৎ বাকসো-প্যাঁটরা ঘাঁটতে থাকেন। জামাকাপড় আচকান গেঞ্জি মোজা রুমাল সব উল্টেপাল্টে জিনিসটি খোঁজেন। বড় বাকসো খোঁজা হলো। এবার ছোট বাকসো। নেই। ওটা কি বোম্বেতে পাণ্ডুরঙ্গের বাড়িতেই ফেলে এসেছেন? কিন্তু তিনি তো প্যাকেটসহই জিনিসটি তাঁর অ্যাটাচিতে ঢোকালেন, এ পর্যন্ত মনে আছে। তারপর ইংল্যান্ডযাত্রার গোছগাছের তোড়জোড়ে সেটা কী করেছেন, আর মনে নেই। রবির হঠাৎ মনে হয়, তিনি যেন মহামূল্যবান কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু সেটা না হলে যে তাঁর চলবেই না। সাগর সেঁচে মুক্তো খোঁজার মতো করে হলেও তা খুঁজে বের করা চাই। বিছানার ওপর জামাকাপড় বইপুস্তক আলোয়ান কম্ফোর্টার জিনিসপত্তরের পাহাড় জমে ওঠে। অবশেষে পাওয়া গেল। তার গানের খাতা রাখার ছোট পার্সটার ভেতরে। কী করে ওখানে ঢুকল কে জানে। রবি বুভুক্ষুর মতো প্যাকেটটা খুলে সামনে মেলে ধরেন। পাতলা উলেন সুতোয় বোনা এক জোড়া সাদা দস্তানা। ম্যারাথন দৌড়ের পর থামলে যেমন গা দিয়ে ঘামের স্রোত বয়ে যায়, রবির দেহেও তেমনি একটা স্বস্তির ঘাম সূক্ষ্মভাবে রোমকূপগুলোকে স্যাঁতসেঁতে করে তুলল।

দুটি দস্তানা যেন দুটি আন্না। একজন চঞ্চল দুষ্টুমিভরা, ছলপটিয়সী। আর একজন শান্ত, বিষণ্ন সুন্দর, বেদনা লুকোনো ছলছলে চোখ।

সেদিন ছিল একটা চাপা আলোর বিকেল। সমুদ্রে একটা নিম্নচাপ ভর করছিল। ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। রবি কবিকাহিনির পরের সর্গটি লিখছিলেন – ‘যতকাল বেঁচে রব, রবে যা হৃদয়ে/ মুহূর্তে না পালটিতে আঁখির পলক/ ক্ষণস্থায়ী কুসুমের সুরভির মতো/ শূন্য এই বায়ুস্রোতে যাইবে মিশায়ে …।’

দমকা হাওয়ার মতো ঘরে ঢুকলেন নলিনী। পরনে ধবধবে সাদা গাউন। গলা থেকে বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে সাদা লেস আর গোলাপি ঝিনুক বোতামের সঙ্গে রেশমি সুতোয় গুজরাটি কাজ করা একটা চওড়া কলকা। একটা সাদা নাইলনের স্কার্ফ দিয়ে চুলগুলো আলতোভাবে বাঁধা। দু-হাতে দুটো সাদা দস্তানা। এসেই হাতির দাঁতের কাজ করা দোলচেয়ারটা

দখল করে এলিয়ে পড়লেন। বললেন, ‘ঠিক সময়ে এসেছি। নতুন কবিতা লেখা হচ্ছে। আমাকে শোনাও। পড়াও। আমার বাংলা পড়া কদ্দূর এগোল তার একটা পরীক্ষাও তো হতে হবে। আর দুদিন বাদেই তো পাখি উড়ে যাবে! তোমাকে পাবো কোথায়?’

ভাবনার সুতাটি আচমকা ছিঁড়ে যাওয়ায় রবি মনে মনে আন্নার ওপর বিরক্ত। এত নিয়মের ব্যাকরণ শেখান রবিকে অথচ রবির কাজের সময় অনুমতির তোয়াক্কা না করে ঘরে ঢুকে যান। বলতে গেলে জ্বালাতনই করেন।

কবিতার কলমের মুখ বন্ধ করে রবি নিজের মুখ খুললেন। কবিতা শোনাতে লাগলেন : ‘একদিন বালিকারে কবি সে কহিল গিয়া -/ নলিনী! চলিনু আমি ভ্রমিতে পৃথিবী। আর একবার বালা কাশ্মীরের বনে বনে/ যাই গো শুনিতে আমি পাখির কবিতা।’

হি হি করে হেসে ওঠেন নলিনী। ‘তুমি কাশ্মীর যাচ্ছো, পাখির কবিতা শুনতে? লায়ার। তুমি তো যাচ্ছো ইউরোপ! ফুল পাখি সবকিছু ভুলে গিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে নিতে!’

রবি হাসেন, ‘কবিতার কবির চরিত্রকে বাস্তবের রবির ওপর এনে বসালে আমি তো নাচার!’

একটা দমকা হাওয়া এসে ঘরের পর্দা উড়িয়ে দিয়ে যায়। নলিনী হঠাৎ দোলচেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ভালো কথা মনে পড়ল, তুমি কি জানো, ঘুমন্ত কুমারী মেয়েদের হাতের দস্তানা যদি কোনো পুরুষ চুরি করে নিতে পারে তবে সে ওই মেয়েকে চুম্বন করার অধিকার পায়?’

– তাই নাকি? কোথায় আছে এ-নিয়ম?

– তুমি যেখানে যাচ্ছো সেখানে। পাশ্চাত্যে!

– কিন্তু আমরা তো এখন প্রাচ্যে আছি! এ-নিয়ম শুনে কী করবো!

– তুমি শিখবে। রপ্ত করবে। কারণ তুমি ওখানে যাচ্ছো! আমি ঘুমোলাম। আই ওয়ান্ট টু সি হাউ গুড ইউ আর অ্যাট স্টিলিং গার্লস গ্লাভস!

রবি সকৌতুকে চেয়ে থাকেন নলিনীর দিকে। নলিনী তার পদ্ম ডাঁটির মতো ডান হাতটি কপালের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। ছন্দে ছন্দে তাঁর সুগঠিত তরুণী বুক ওঠানামা করতে থাকে। ওখানে যেন এক জোড়া ঘুমন্ত ঘুঘু আছে, এখন পালক ফুলিয়ে জেগে উঠতে চাইছে। আন্নার কনুই পর্যন্ত খোলা হাতটিকে মনে হচ্ছে মোমের তৈরি। দু-হাতের পাতায় সাদা পদ্মের মতো ফুটে আছে দুটি বিহ্বল দস্তানা। রবি অপলক চেয়ে থাকেন সেদিকে। মনের ভেতর পঙ্ক্তি ভেসে চলে, ‘আমি স্বপনে রয়েছি ভোর, সখী আমারে জাগায়ো না …।’ চলে যাক পঙ্ক্তিরা। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন রবি। কৃত্রিম নিদ্রাভিভূত অভিনয়কুশলা কামিনীকে ঘুমোতে দিয়ে রবি নিঃশব্দে উঠে এসেছিলেন।

এর পরে কয়েকদিন দুজনের একজনও সেই দস্তানাকাণ্ড নিয়ে একটি কথাও বলেননি। যেন দস্তানা নিয়ে কোনোদিনই কিছু ঘটেনি। আত্মারামের বাড়ি ছেড়ে আসার দিন নলিনীর কাছে বিদায় চাইলে নলিনী তাঁকে একটি প্যাকেট উপহার দিলেন। বললেন, ‘ইউরোপ যাচ্ছো। সেখানে গিয়ে কোনো নাচের আসরে গেলে দস্তানা পরে যেও। খালি হাতে কোনো মেয়ের হাত ধরে নাচতে যেও না। ওটা দস্তুর না। তুমি মেয়েদের দস্তানা চুরিতে দক্ষ নও; কিন্তু মেয়েদের হাতের সৌজন্য রক্ষার জন্য নিজে দস্তানা পরতে ভুলো না।’

এই দস্তানা যে সেদিনের চুম্বনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করার মধুর শাস্তি তা বুঝতে বাকি ছিল না রবির। তিনি নলিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে গানের খাতার পার্সের ভেতর প্যাকেটটি গুঁজে দিয়েছিলেন। 

এখন দস্তানাজোড়া হাতে নিয়ে রবি থ হয়ে বসে থাকেন। কেন? এই জিনিস খুঁজে না পেয়ে তার এমন অস্থির লাগছিল কেন? এই পিছুটান, এই মেয়েলি আবেগ নিয়ে তিনি কতদূর যেতে পারবেন? আন্না ঠিকই বলেছিলেন, তিনি নিজেকে নতুন মানুষ রূপে গড়তে যাচ্ছেন। নলিনী থাকবে তাঁর লেখায়, কবিতায়, গল্পের চরিত্রে। কিন্তু বাস্তবে তাকে বিসর্জন দিতে হবে।

রবি দস্তানাজোড়া হাতে নিয়ে স্টিমারের সামনের ডেকে চলে আসেন। দূরে ডাঙার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গাঙচিলের ডাক শোনা যাচ্ছে। সাগরের নোনা হাওয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে গাছপালার বন্য সুবাস আর জাহাজের তেলের রাসায়নিক গন্ধবিক্রিয়া। গলিত তুষারের মতো সফেন ঢেউ কেটে এগিয়ে যাচ্ছে জাহাজ। রবি দস্তানা দুটো সেই ফেনার স্তূপে ছেড়ে দেন। দুটো দিশাহীন সাদা সাগর বিহঙ্গের মতো খাবি খেতে খেতে ওর পেছনে চলে যায়। রবি অস্ফুটে উচ্চারণ করেন – ‘শুনি প্রভাতের গাথা মোর/ দেখো ভেঙেছে ঘুমের ঘোর/ জগৎ উঠেছে নয়ন মেলিয়া নূতন জীবন লভি …।’