এক। ভূমিকা
১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হতে দেখে স্পেন-পর্তুগাল সীমান্তে এক হোটেলে আত্মহত্যা করার সময় জার্মান বুদ্ধিজীবী ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের বয়স হয়েছিল আটচল্লিশ বছর। সেই পর্যন্ত তাঁর যা পরিচিতি এবং খ্যাতি, তার সবই ছিল জার্মানির ‘ফ্রাংকফুর্ট স্কুল’ নামে খ্যাত বামপন্থী গোষ্ঠীর কতিপয় মার্কসবাদী চিন্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জার্মান দার্শনিক-চিন্তক থিওডোর এডর্নো ১৯৫৫ সালে বেঞ্জামিনের নির্বাচিত লেখা গ্রন্থিত করে প্রকাশের পর তাঁর পরিচিতি এবং খ্যাতির সূচনা হয় এবং তিনি জার্মানির বাইরে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সারস্বত সমাজে পরিচিত হন। তাঁর ব্যক্তি ও কর্মজীবন এবং চিন্তার ফসল সবই ছিল সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় ব্যতিক্রমী। শুধু যে তাঁর ধারণাগুলি জটিল ছিল, তা নয়, তিনি কোনো একটি বিষয়ের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হওয়ার আগেই অন্য বিষয়ের চর্চা শুরু করেছেন। তাঁর প্রকাশভঙ্গিও ছিল এমন অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট যে তাঁকে সীমিত সংখ্যক মানুষই বুঝতে পেরেছে। তাঁর চিন্তা ও লেখায় জার্মান আদর্শবাদ, রোমান্টিসিজম, ইহুদিদের মরমিয়াবাদ, মার্কসবাদ এবং নব্য-কান্টীয় দর্শন চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়ার জন্য তাঁকে কেউ কেউ ‘সমন্বয়কারী চিন্তক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তাঁর বহুরূপী পরিচয় টিকে থেকেছে, যার জন্য তিনি মৃত্যুর পরে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর কাছে গুরুত্ব পেয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে এবং বিবেচনায়। ১৯৬৮ সালে বেঞ্জামিনের কিছু লেখার সংকলন গ্রন্থনার পর Illuminations শিরোনামে বের করে জার্মান বুদ্ধিজীবী হান্না আরেন্ড মুখবন্ধে তাঁর সাহিত্য-সমালোচক পরিচিতি বড় করে তুলে ধরেন সবার ওপরে। কিন্তু থিওডোর এডর্নোর কাছে তিনি মূলত একজন দার্শনিক। আবার সমকালীন জার্মান বুদ্ধিজীবী গার্সন শোলেমের কাছে তিনি আগামীদিনের দ্রষ্টা-অধিবিদ্যক হিসেবেই গুরুত্ব পেয়েছেন বেশি। অন্যদিকে মার্কসবাদী লেখক টেরি ঈগলটনের কাছে তাঁর ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে যে পরিচয়, সেটাই বড় মনে হয়েছে। তাঁর চিন্তা-ভাবনার যে বিচিত্র উৎস, ইহুদি মরমিয়াবাদ, কান্টের দর্শন থেকে অতিবাস্তববাদ, সেই বিষয়টিও তাঁকে বোঝা দুরূহ করে তুলেছে। বেঞ্জামিন কোনো একটি ক্ষেত্রে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দীর্ঘ বা বিশদ না করলেও তাঁকে শিল্প, সাহিত্য এবং অধিবিদ্যক ও রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে মৌলিক অবদানের জন্য পড়তে হয়। ইউরোপে
সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক দর্শনের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ভূমিকা রেখেছেন বিবেচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ।
দুই। জীবন
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ১৮৯২ সালে বার্লিন শহরে এক বনেদি ধনী ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যাংকার, যাঁর অ্যান্টিক ব্যবসায়ে আগ্রহ ছিল। ১৯০২ সালে দশ বছর বয়সে তিনি শার্লোটেনবুর্গে কাইজার ফ্রেডারিক স্কুলে ভর্তি হন। দশ বছর পর সেই স্কুল থেকে তিনি পাশ করে বের হওয়ার আগে ১৯০৫ সালে তাঁকে দুই বছরের জন্য স্বাস্থ্যোদ্ধারের উদ্দেশ্যে থুরিঞ্জিয়ানের গ্রামীণ পরিবেশে এক বোর্ডিং স্কুলে থাকতে হয়। বিশ বছর বয়সে, ১৯১২ সালে, তিনি ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে এক সেমিস্টার পড়ার পর তিনি বার্লিনে ফিরে দর্শন পড়ার প্রস্তুতি হিসেবে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেট করেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ইহুদিদের মৌলবাদ, জায়োনিজমের সঙ্গে পরিচিত হলেও রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী জায়োনবাদের স্থানে নিজের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যময় এক সাংস্কৃতিক জায়োনবাদ গড়ে তোলেন। ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে অবদান রেখে তার উন্নতিসাধনই ইহুদিদের কর্তব্য বলে তিনি মনে করেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান যুব-আন্দোলনের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করার সময় বেঞ্জামিন সহপাঠী মার্টিন বুবার এবং গার্শম শোলেমের সঙ্গে পরিচিত হন। ফ্রি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য দি বিগিনিং শিরোনামের বিতর্কিত পত্রিকায় প্রবন্ধ ছাপেন। বিপ্লবী সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য যুব সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে – এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে লেখা হয় তাঁর অধিকাংশ প্রবন্ধ। ১৯১৪ সালের আগস্টে প্রথম মহাযুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদানের আবেদন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর তিনি বোদলেয়ারের কবিতা অনুবাদে মনোনিবেশ করেন। এরপর তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য বলা হলে তিনি অসুস্থতার ভান করে তা এড়িয়ে যান। পরের বছর, ১৯১৫ সালে, তিনি মিউনিখে গিয়ে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে কবি রাইনার মারিয়া রিল্কের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী গার্শম শোলেমের সঙ্গে মিউনিখে দেখা হওয়ার পর তাঁদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। দুজনের মধ্যে জুডাইজম এবং ইহুদি মরমিয়াবাদ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। এই আলোচনার ভিত্তিতে তিনি ভাষার ওপর দুটি প্রবন্ধ লেখেন যার সঙ্গে ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘জেনেসিস’ অধ্যায়ের সম্পর্ক আছে বলে তিনি শোলেমকে জানান। এই সময়েই তিনি অষ্টাদশ শতকের রোমান্টিক কবি হোল্ডারলিন সম্পর্কে লেখেন। ধর্ম বিষয়ে আলোচনা, ভাষা নিয়ে লেখা এবং হোল্ডারলিনের কবিতা চর্চা, তাঁর বহুমুখী আগ্রহের সূচনা করে।
১৯১৭ সালে বেঞ্জামিন সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যেখানে জার্মান মার্কসবাদী দার্শনিক আর্নস্ট ব্লশের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এখানেই তাঁর দেখা হয় ডোরা সোফি পোলাকের সঙ্গে, যাঁকে তিনি পরে বিয়ে করেন। জার্মান রোমান্টিসিজমে শিল্পসমালোচনার ধারণা, এই বিষয়ে অভিসন্দর্ভ লিখে তিনি ১৯১৯ সালে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯২০ সালে পোস্ট-ডক্টরাল করার জন্য তিনি থিসিসের বিষয় হিসেবে বেছে নেন ‘থিওরি অফ ক্যাটাগরিজ অ্যান্ড মিনিং’। মধ্যযুগের থিওলজি শাস্ত্রে ভাষার সঙ্গে আধুনিক ভাষা-দর্শনের যে পার্থক্য এবং অমিল তা দূর করার জন্য তিনি বেছে নেন এই বিষয়। শোলেম যখন তাঁকে জানালেন যে, একই বিষয় নিয়ে মার্টিন হেইডেগার ইতোমধ্যে লিখে বই বের করেছেন, তখন তিনি শুধু হতাশ নয়, হেইডেগারের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠেন। এই বৈরিতা পরে দীর্ঘস্থায়ী হয়, কেননা বেঞ্জামিনের অনেক ধারণা এবং চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে হেইডেগারের লেখা মিলে যায়। ১৯১৩ সালে ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন বেঞ্জামিন যেখানে হেইডেগারও ছিলেন। দুজনের একই বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনার পেছনে ছিল সেই সেমিনারের প্রভাব, এ-কথা মনে করেন অনেকে। বুদ্ধিবৃত্তির জগতে নির্দিষ্ট সময়কালে কয়েকটি অভিন্ন বিষয়ই লেখক-চিন্তকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্রে থাকে, এই ঐতিহ্য সভ্যতার ইতিহাসে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানের বাইরে, দর্শনই জ্ঞানের জগতে গুরুত্বের স্থানে আসীন ছিল অতীত এবং নিকট অতীতে – এ-কথা মনে রাখলে কেন গত শতাব্দীতে এবং এখনো ইউরোপে দর্শন চর্চা সমুন্নত ছিল, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
পোস্ট-ডক্টরাল করতে না পারার হতাশা নিয়ে বেঞ্জামিন ১৯২১ সালে সপরিবারে বার্লিন ফিরে আসেন। তখন তাঁদের এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। কিছুদিন পর ছাপা হয় তাঁর প্রবন্ধ ‘সংঘাতের ব্যাখ্যা’। সেই সময় দার্শনিক লিও স্ট্রসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং তিনি স্ট্রসের লেখার গুণগ্রাহী হন, যে-মুগ্ধতা থাকে আজীবন।
তারুণ্য থেকে শুরু করে বেঞ্জামিন এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্বে বুদ্ধি-উদ্দীপ্ত এবং অনুসন্ধিৎসু এক গোষ্ঠী ও তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই পর্বের স্থানিক পরিমণ্ডল ছিল বামপন্থীদের প্রিয় বিচরণক্ষেত্র, দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী বার্লিন ও প্যারিস। অধিবিদ্যা, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব (থেওলজি) থিয়েটার, দৃশ্যশিল্প, সাহিত্য, রেডিও এবং রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ তাঁকে সমমনা অনেকের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিল। কিন্তু প্রথমদিকে তিনি ইউরোপে এইসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিমণ্ডলের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা হয়েই থেকেছেন, ভেতরের একজন হননি। তিনি সমকালীন চিন্তার জগতে এবং জীবনে যেসব ঘটনা ও বিবর্তন তাঁকে আকৃষ্ট করেছে তার বিশ্লেষণ করে লিখেছেন। এই শিক্ষানবিসীর পর্বে তিনি ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে যোগ দেন (১৯১৩), যেখানে হেইডেগার ছিলেন। ১৯১৫ সালে মিউনিখে থাকার সময় তিনি রাইনে মারিয়া রিল্কের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁর একটি ক্লাসে যোগদান করেন। কুর্ট গোডেল যে অধিবেশনে Incompleteness Theorem বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা দেন, তিনি সেখানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বার্লিনে ক্যাবারে থিয়েটার পরিচালক ও নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেশটের বাড়িতে প্রায়ই অতিথি হয়ে থেকে নাট্যজগতের অন্দরমহলের বিষয়ে অবহিত হয়েছিলেন। দার্শনিক মার্টিন বুবার তাঁর চিন্তা-ভাবনায় আকৃষ্ট হলেও বেঞ্জামিন তাঁর পত্রিকা খুব বেশি উন্মার্গগামী (esoteric) হওয়ার জন্য সেখানে লেখা থেকে বিরত থেকেছেন। এ সত্ত্বেও বুবার তাঁর প্রতি বিরূপ হননি এবং তাঁকে মস্কো গিয়ে তাঁর পত্রিকায় একটা লেখার জন্য যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন। এই লেখা দেওয়ার সময়সীমা পার করে বেঞ্জামিন কয়েক বছর পর লেখাটি দেন। মস্কো গিয়ে তিনি কমিউনিস্ট রাশিয়ার শিল্প-সাহিত্য এবং রাজনীতি সম্পর্কে অবহিত হন। সুইজারল্যান্ডে দার্শনিক আর্নস্ট ব্লশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর থেকে পুরো বিশের দশক তিনি তাঁর নিকটসান্নিধ্যে থাকেন। তিনি ব্লশের লেখা Spirit of Utopia-এর ওপর একটি রিভিউ লেখেন, যা তাঁর মৃত্যুর পর ছাপা হয়।
১৯২৩ সালে যখন ফ্রাংকফুর্টে ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল রিসার্চ (যা পরবর্তীকালে ফ্রাংকফুর্ট স্কুল নামে খ্যাত হয়েছিল) প্রতিষ্ঠিত হয়, বেঞ্জামিন তার সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন। এদের একজন ছিলেন থিওডোর এডর্নো, যিনি পরবর্তীতে তাঁর ভাবশিষ্য হয়ে যান। একই সময়ে তাঁর গিওর্গি লুকাচের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং তাঁর লেখা Theory of Novel দ্বারা তিনি প্রভান্বিত হন। এই সময় বোদলেয়ারের Tableaux Parisiens-এর প্রথম অংশের যে অনুবাদ তিনি করেছিলেন তা ১৯২৪ সালে ছাপা হয়। ১৮০৯ সালে লেখা গেইটের তৃতীয় উপন্যাসের ওপর তাঁর লেখাটিকে তাঁর আগের দার্শনিক-নন্দনতাত্ত্বিক চিন্তা-ভাবনার ধারাবাহিকতায় গণ্য করেছেন অনেকে। অর্থাৎ বেঞ্জামিন যখন সাহিত্য নিয়ে লিখেছেন, তার পেছনে দর্শনচিন্তা কাজ করেছে। কিন্তু লেখা নিয়ে তিনি যে বিতর্কের অবতারণা করেন তা গেইটে ভক্ত ফ্রেড্রিশ গান্ডলফের
রোমান্টিক-ন্যাশনালিস্ট কবি-গোষ্ঠীকে বিরূপ করেছিল। বেঞ্জামিন তাঁর বেশকিছু চিঠিপত্রে এই গোষ্ঠীর শৈলী-আদর্শে ফ্যাসিবাদের নন্দনতত্ত্ব দেখতে পেয়েছিলেন।
১৯২৪ সালের শেষে তিনি আর্নস্ট ব্লশের সঙ্গে ইতালির ক্যাপ্রি দ্বীপে যান। বেঞ্জামিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ব্লশ বলেন, too close। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি লাভের উদ্দেশ্যে লেখেন ‘The Origin of German Tragic Drama’ নামে দীর্ঘ এক প্রবন্ধ। এক বছর পর এই প্রবন্ধ সম্পর্কে ফ্রাংকফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটির নেতিবাচক মনোভাব দেখে তিনি তাঁদের বিবেচনার জন্য দেওয়া প্রবন্ধটি প্রত্যাহার করেন। নিয়োগ কমিটির অন্যতম সদস্য ম্যাক্স হর্খহয়মার পরবর্তীকালে ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের সদস্য হিসেবে বেঞ্জামিনের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও জার্মান ট্রাজিক ড্রামার ওপর লেখা প্রবন্ধটিকে নিয়োগ কমিটির অন্য সদস্যদের মতোই অত্যাধুনিক এবং অস্পষ্ট মনে করেছিলেন। পরিহাসের বিষয়, ১৯৩১ এবং ১৯৩২ সালে থিওডোর এডর্নো ফ্রাংকফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে জার্মান ট্রাজিক ড্রামার ওপর লেখা বেঞ্জামিনের প্রবন্ধটি বিশদ আলোচনায় এনেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পেয়ে বেঞ্জামিনকে জীবিকা নির্বাহের জন্য অনুবাদ এবং বই সমালোচনার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই সময় (১৯২৫) তিনি মার্সেল প্রুস্তের In Search of Lost Time-এর প্রথম খণ্ড অনুবাদ করেন। পরের বছর তিনি দুটি জার্মান পত্রিকার জন্য নিয়মিত লেখেন। ১৯২৬ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য মস্কো যান যখন তাঁকে সোভিয়েত এনসাইক্লোপেডিয়ার জন্য গেইটের ওপর লিখতে বলা হয়। লেখার পর এর একটি অংশমাত্র এনসাইক্লোপেডিয়ায় স্থান পায়।
১৯২৭ সালে বেঞ্জামিন শুরু করেন তাঁর The Arcades Project-এর লেখা। উনিশ শতকের প্যারিসের জীবন নিয়ে এই লেখার প্রকল্প তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। ১৯২৮ সালে ডোরার সঙ্গে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এর দু-বছর পর তিনি লেখেন One-Way Street এবং তাঁর জার্মান ট্রাজিক ড্রামা প্রবন্ধটি সংশোধন করেন।
হিটলার ক্ষমতায় আসার আগে জার্মানিতে যে অরাজকতা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয় তা দেখে বেঞ্জামিন ১৯৩২ সালে দেশ ত্যাগ করে স্পেনে যান। সেখানে কয়েক মাস থাকার পর তিনি ফ্রান্সের নিস শহরে গিয়ে থাকেন। প্যারিসে তিনি জার্মানি থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে আসা শিল্পী-সাহিত্যিকদের দেখা পান। হান্নাহ আরেন্ড, ঔপন্যাসিক হার্মান হেস এবং সুরকার কুর্ট ওয়েলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। ১৯৩৬ সালে ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়ে বের হয় ১৯৩৫ সালে জার্মান ভাষায় লেখা তাঁর প্রবন্ধ ‘The Work of Art in the Age of Mechanical
Reproduction,’-এর প্রথম সংস্করণ। প্রবন্ধটি ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের মুখপত্রে ম্যাক্স হর্খহেইমারের সম্পাদনায় ছাপা হয়েছিল।
প্যারিসে নির্বাসনে থাকার সময় বেঞ্জামিন লেখেন The Paris of the Second Empire in Baudelaire। এই সময় জর্জ বাঁতাইয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি তাঁর হাতে Arcade Project-এর সব পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য তুলে দেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ডেনমার্কে নির্বাসনে থাকা বার্টোল্ট ব্রেশটের সঙ্গে শেষবারের জন্য দেখা করতে যান। ইতিমধ্যে নাৎসি জার্মানি সকল ইহুদির জার্মান নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বেঞ্জামিন আমেরিকায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু তার আগেই রাষ্ট্রবিহীন ব্যক্তি হিসেবে ফরাসি পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তিন মাস জেলে থাকার পর ছাড়া পেয়ে তিনি ১৯৪০-এর জানুয়ারি মাসে প্যারিসে ফিরে ‘On the Concept of History’ শিরোনামে এক প্রবন্ধের খসড়া লেখেন, যা পরে ‘On the Theses of History’ নামে ছাপা হয়। নাৎসি বাহিনী প্যারিসের দিকে অগ্রসর হলে বেঞ্জামিন আগস্ট মাসে লুদুঁ শহরে গিয়ে আশ্রয় নেন। হর্খহেইমারের পাঠানো আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে তিনি পর্তুগালের উদ্দেশে ২৫শে সেপ্টেম্বর স্পেনে যান। স্পেন-পর্তুগাল সীমান্ত চৌকি পোর্টবুতে পৌঁছানোর পর তাঁকে এবং অন্য ইহুদি যাত্রীদের বলা হয় ফরাসি সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁদের পরদিন ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হবে। গেস্টাপো তাঁর খোঁজে প্যারিস পৌঁছেছে; ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁকে নাৎসিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, এ বিষয়ে বেঞ্জামিনের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। তিনি সীমান্তের হোটেলে ফিরে ২৬শে সেপ্টেম্বরের রাতে অতিরিক্ত মর্ফিন নিয়ে আত্মহত্যা করেন।
তিন। চিন্তা, ধারণা ও লেখা
ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহ ছিল বহুমুখী। ফলে বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে তিনি লিখেছেন। অনেক বিষয়ে তাঁর লেখা ছিল খণ্ডিত, আংশিক। কোনো বিষয় নিয়ে বেশি কালক্ষেপণ করেননি তিনি, যার জন্য কোনো একটি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁকে শনাক্ত করা যায় না। অন্যদিকে, চিন্তা-ভাবনাকে প্রাঞ্জল করার চেষ্টা ছিল না তাঁর। লেখার ভাষায় ছিল অস্পষ্টতা, যা তাঁর লেখাকে করেছিল আরো জটিল। এসব সত্ত্বেও একটু মনোযোগ আর ধৈর্য নিয়ে পড়লে বোঝা যায় তাঁর ছিল বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভা; তিনি যা কিছু বলেছেন, সবই মৌলিক।
তাঁর শেষ লেখা ছিল যখন তিনি নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্যারিসে এসে রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে গ্রেফতার হয়ে প্যারিসের বাইরে বারগান্ডিতে জেলে যান এবং তিন মাস জেলে থেকে প্যারিসে ফিরে এসে লেখেন Philosophy of History (১৯৪০)। এটি ছিল একই সঙ্গে ইতিহাস লেখার পদ্ধতি (historiography) এবং ইতিহাসের দর্শন।
যে-পরিস্থিতিতে তিনি এই প্রবন্ধ লেখেন, স্বভাবতই তার প্রভাব রয়েছে এই লেখায়। বলা যায়, ব্যক্তিগত এবং জাতীয় (ইহুদিদের) জীবনের উদ্ভূত পরিস্থিতিই তাঁকে উদ্বুদ্ধ (বাধ্য?) করেছিল প্রবন্ধটি লিখতে। লেখাটি ইতিহাস, বিশেষ করে যা চলমান, তার ওপর বেঞ্জামিনের বিশ্বাস-উপলব্ধ এবং অভিজ্ঞতাসঞ্জাত এক বিশ্লেষণী বিবরণ। আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে তিনি ইতিহাসকে বুঝতে এবং বোঝাতে চেয়েছেন। এই ব্যাখ্যায় স্ব-বিরোধিতা ছিল, কেননা তিনি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক মরমিয়াবাদের সংমিশ্রণ করে ‘ঐতিহাসিক সময়ের এক নতুন দর্শন’-এর অবতারণা করেন। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং আধ্যাত্মিক মরমিয়াবাদকে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক সময়ের নতুন দর্শনের আলোকে বুঝতে চেয়েছেন।
ইতিহাস বিষয়ে লিখতে গিয়ে বেঞ্জামিন অজ্ঞানতা ও নৈরাজ্যের সময়ে (নাৎসি শাসন?) মুক্তির উপায় হিসেবে ইহুদি মরমিয়াবাদের দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। ওল্ড টেস্টামেন্টের মরমিয়াবাদী ব্যাখ্যায় সন্ত পুরুষদের ‘টিক্কুন’ নামে পদ্ধতিতে শাশ^ত সত্যের অন্বেষণকে তিনি মনে করেছেন অনুসরণীয়। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী ঈশ্বরের সব গুণ কয়েকটি পাত্রে রক্ষিত ছিল। অশুভের সংস্পর্শে পবিত্রতা হারিয়ে পাত্রগুলি ভেঙে গুণাবলি বিক্ষিপ্তভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। টিক্কুন পদ্ধতিতে এই ছড়িয়ে পড়া পার গুণাবলি আবার সংগ্রহ করে একত্রিত করা হয়। বেঞ্জামিন টিক্কুনকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সিন্থেসিস প্রক্রিয়ার সমার্থক জ্ঞান করে সামগ্রিক শক্তির মুক্তির উপায় বলে মনে করেছেন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে ভুলে যাওয়া অতীতের স্মৃতি থেকে বিপ্লবী সমকালের বিপদ বা সংকটকে পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে মনে করেছেন তিনি। এই প্রবন্ধে তিনি অতীতের নৈরাজ্যের সঙ্গে বর্তমানের প্রগতির সামঞ্জস্য বিধানে প্রয়াসী হয়েছেন।
ইতিহাস বিশ্লেষণ জটিল বুঝতে পেরে তিনি পল ক্লে’র আঁকা এক ছবির উদাহরণ দিয়েছেন। ‘অ্যাঞ্জেলাস নভাস’ নামের এই ছবিতে এক দেবদূতকে দেখা যায় নিবিষ্ট হয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন এমন বস্তু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে উদ্যত। তাঁর দুই হাত প্রসারিত, চোখ দর্শনরত এবং মুখ উন্মুক্ত। ইতিহাসকে বেঞ্জামিন এই দেবদূতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দেবদূত পেছনের (অতীতের) দিকে পিঠ রেখে তাকিয়ে দেখছেন। যেখানে মানুষ শৃঙ্খলে বাঁধা একের পর এক ঘটনা দেখতে পায়, দেবদূত দেখেন একটি বিপদকেই ক্রমাগত পুঞ্জীভূত হতে এবং পায়ের সামনে দিয়ে ধাবিত হতে। দেবদূত মৃতদের জাগিয়ে তুলতে চান এবং যা কিছু ভেঙে পড়েছে সেসব পুনর্নির্মিত দেখতে চান; কিন্তু স্বর্গ থেকে প্রচণ্ড ঝড় এসে তাঁর ডানায় যেভাবে আটকেছে তাতে তাঁর পক্ষে সেই ডানা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঝড় তাঁকে যেন উড়িয়ে সামনের দিকে নিয়ে যাবেই। বেঞ্জামিন বলেছেন, এই ‘সামনে’ হলো ভবিষ্যৎ, যার দিকে বর্তমানে দেবদূতের পিঠ প্রদর্শিত, আর ঝড় হলো প্রগতি। ইতিহাসকে তিনি এইভাবে সরলরৈখিক নয়, উত্থান-পতনের ভঙ্গিতে, আঁকাবাঁকা রেখায় দেখেছেন। ইতিহাসের গতিতে ক্রমাগত উন্নতি নয়, ছেদ এবং বিরতি আছে। বেঞ্জামিনের এই ইতিহাসতত্ত্ব নতুন নয়, তাঁর আগে আরো অনেক ঐতিহাসিক একই কথা বলে গিয়েছেন। তিনি যেখানে নতুন কথা বলেছেন বা তাঁর ব্যাখ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, তা হলো ইহুদিদের আধ্যাত্মিক মরমিয়াবাদের উল্লেখ। একটা সরল বর্ণনাকে জটিল করে তোলার জন্য বেঞ্জামিনের যে ‘খ্যাতি’, ইতিহাস নিয়ে এই লেখাটি তার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। জীবনের শেষ লেখাতেও যে তিনি জটিলতা পরিহার করতে পারেননি, এই বিষয় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ভাষা নিয়ে লিখেছেন লেখক জীবনের শুরু থেকে। যে-বিষয়েই লিখেছেন – শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, থিয়েটার – ভাষার প্রসঙ্গ এনেছেন। তাঁর ভাষাতত্ত্ব একটা দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে, যার উৎসে রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, বিশেষ করে ইহুদি মরমিয়াবাদ। ১৯১৬ সালে তিনি লেখেন On Language as Such and the Language of Man যার পেছনে ছিল সহপাঠী গার্শম শোলমের সঙ্গে ইহুদি মরমিয়াবাদ নিয়ে তাঁর আলোচনা। তিনি তাঁকে বলেছেন, ওল্ড টেস্টামেন্টেই রয়েছে ভাষার জন্মের ব্যাখ্যা। ভাষা নিয়ে প্রথম লেখাটি তিনি শুরু করেন শোলমের কাছে চিঠির আকারে। ভাষা, অনুবাদ এবং দর্শনের মধ্যে সম্পর্ক এসেছে এই সব চিঠিতে। ১৮ পৃষ্ঠা লেখার পর তিনি বিষয়টির ওপর লেখা অসমাপ্ত রেখে বলেন, এই জটিল বিষয়ে আমার চিন্তা এখনো চলমান। চিঠির আকারে ভাষার ওপর যে-প্রবন্ধ সেটি অসমাপ্ত থেকে যায়, যা তাঁর আরো অনেক লেখার ক্ষেত্রে হয়েছে। এরপর তিনি ভাষা নিয়ে যা লিখেছেন (The Mimetic Faculty, 1933; Problems in the Sociology of Language, 1934) সেখানে তাঁর চিন্তা বেশ অগ্রসর হয়েছে এবং যে দার্শনিক তত্ত্ব দাঁড় করানো হয়েছে তা বেশ সুসংহত, যদিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
বেঞ্জামিন মনে করেন, ভাষার বুর্জোয়া তত্ত্ব ভাষাকে উপায় (means) হিসেবে দেখে যার উদ্দেশ্য ‘অর্থ’ বের করা। অপরদিকে ভাষার মরমিয়াতত্ত্ব শব্দ এবং বস্তুর মধ্যে যে-সম্পর্ক সে-সম্বন্ধে বলে। ভাষা এই দ্বিতীয় তত্ত্বে হলো গন্তব্য (end), বুর্জোয়া ব্যাখ্যার উপায় (means) নয়। বেঞ্জামিন এই দুই তত্ত্বের মধ্যবর্তী এক তত্ত্ব তৈরি করেন, যা দুই-এর দ্বান্দ্বিক প্রকাশ। তাঁর মতে, ভাষা নিজেকে ছাড়া অন্য কিছু প্রকাশ করে না। এর অর্থ হলো, ভাষাগুলি নিজেদের মধ্যেই কথোপকথন করে। মানুষ (subject) নয়, ভাষাই কথা বলে বিষয়কে (object) ব্যক্ত করে। অর্থাৎ ভাষাই বক্তা। বক্তা মানুষ এবং বক্তব্যের মধ্যে বিভেদ ঘুচিয়ে তিনি বুর্জোয়া এবং মরমিয়া ভাষাতত্ত্ব, উভয়কেই নাকচ করে দেন। কিন্তু তিনি যে ভাষাতত্ত্ব তৈরি করেন সেখানে এই দুই ভাষাতত্ত্ব সম্পূর্ণ তিরোহিত হয় না। বিষয়ী (subject) এবং বিষয় (object)-এর মধ্যে যে বিভেদ এনে ইমানুয়েল কান্ট তাঁর ‘পিওর রিজন’-এর দর্শন তৈরি করেছেন, বেঞ্জামিন সেই বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে বলেন, ভাষা নিজেই বিষয়ী এবং বিষয়। ভাষা নিজে নিজেকেই প্রকাশ করে।
ভাষা কিভাবে নিজেকেই প্রকাশ করে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বেঞ্জামিন বাইবেলের ‘জেনেসিস’ অধ্যায়ের উল্লেখ করে লিখেছেন, অন্য প্রাণীর ভাষার সঙ্গে মানুষের ভাষার তফাত হলো, মানুষের ভাষা বিভিন্ন বিষয়ের নাম দেয়। নামকরণই মানুষের ভাষার বৈশিষ্ট্য। নামকরণ দিয়েই মানুষের ভাষার সঙ্গে ঈশ^রের বিশুদ্ধ ভাষার যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ঈশ্বর বিশুদ্ধ ভাষার শব্দ ব্যবহার করে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। এই জন্য বেঞ্জামিন মনে করেন, বিশুদ্ধ ভাষা (divine language) যেমন সৃষ্টিশীল, মানুষের ভাষার সেই সৃজনশীলতা ক্ষমতা নেই। বড়জোর মানুষের ভাষা অনুকরণ করতে পারে। এভাবে মানুষের ভাষা প্রকৃতি বা অন্য কিছুর ভাষাকে নামকরণের মাধ্যমে অনুবাদ করে মাত্র। যেহেতু প্রকৃতি বা অন্য কিছুর ভাষা সম্বন্ধে অবহিত নয়, সেই কারণে মানুষের ভাষা দিয়ে প্রকৃতি বা অন্য কিছুর নামকরণে বাহুল্য থাকে। নামকরণে মানুষের ভাষার অনুকরণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ঐশ্বরিক বিশুদ্ধ ভাষার অসীম সৃজনশীলতার মুখোমুখি হয়। তাঁর মতে, সীমাবদ্ধতার এই উপলব্ধি এক ধরনের শোক বা বিলাপের সৃষ্টি করে। বেঞ্জামিন মনে করেন, মানুষের নোংরা (profane) ভাষাকে বিশুদ্ধ ভাষার কাছাকাছি আনার কয়েকটি উপায় আছে। একটি হলো বইপত্র অনুবাদ করা। অনুবাদ করার সময় বিশুদ্ধ এবং ‘নোংরা’ ভাষা থেকে একটি ভাষা কিভাবে অন্য ভাষাকে অনুবাদের ক্ষেত্রে কাজ করে, তার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ হয়। বেঞ্জামিন বিভিন্ন ভাষার মধ্যে আদান-প্রদান এবং যাতায়াত সম্ভব করে তোলার পর কোনো ভাষার টেক্সট অনুবাদযোগ্য (translatabilc) কি না, এই বিবেচনা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।
বেঞ্জামিনের মতে, মৌলিক সব শিল্পকর্মই অনুবাদযোগ্য, কেননা কোনো সৃষ্টিই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এই অসম্পূর্ণতার জন্যই কোনো ভাষায় লেখা টেক্সটকে অন্য ভাষায় অনূদিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বেঞ্জামিনের এই ভাষাতত্ত্ব শেষ পর্যন্ত একটি অনুবাদতত্ত্ব হয়ে গিয়েছে। আরো একটা সমস্যা দেখা যায় ভাষার এই অভিনব ব্যাখ্যায়, যা তাঁর নিজের বিশ্লেষণকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানুষের ভাষা যদি প্রকৃতির ভাষার অনুবাদ হয়ে থাকে এবং তা বিশুদ্ধ ভাষা থেকে ভিন্ন, তাহলে কীভাবে অন্য ভাষার টেক্সটের অনুবাদ করা হলেই মানুষের ‘নোংরা’ ভাষা সেই বিশুদ্ধ ভাষার কাছাকাছি যেতে পারে? বেঞ্জামিন কি বলতে চেয়েছেন অনুবাদের মাধ্যমেই মানুষের ভাষার শুদ্ধিকরণ হতে পারে? যদি একথা সত্য বলে মেনে নেওয়াও হয় তাহলে ভাষার ভূমিকাকে খুব সংকীর্ণ পরিসরে (অনুবাদে) সীমাবদ্ধ করা হবে।
অনুবাদকে বেঞ্জামিন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। বোদেলেয়ারের Tableaux Parisiens অনুবাদের ভূমিকায় তিনি The Task of the Translator লিখে বলেছেন, অনুবাদের কাজ শুধু তথ্য দেওয়া নয়। তাঁর মতে, টেক্সটে যা দুর্জ্ঞেয়, রহস্যময় এবং কাব্যিক, অনুবাদক সেই বৈশিষ্ট পুনর্সৃষ্টি করতে পারেন কেবল, যদি তাঁর কাব্যপ্রতিভা থাকে। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, অনুবাদককে কল্পনাপ্রবণ এবং সৃজনশীল হতে হবে।
লেখক হিসেবে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের শক্তির জায়গা সাহিত্য এবং শিল্প। তিনি, বোদলেয়ার, কাফকা, প্রুস্ত, ম্যাক্স ব্রড, নিকোলাই লেস্কোভ এবং বার্টোল্ট ব্রেশটকে নিয়ে লিখেছেন। এসব লেখায় তিনি অন্য কোনো সাহিত্যতত্ত্ব ব্যবহার না করে প্রয়োগ করেছেন নিজের সাহিত্য-সমালোচনাতত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী টেক্সটের মধ্যেই থাকে সমালোচনার বীজ বা উপকরণ, বাইরের কোনো তত্ত্ব দিয়ে টেক্সটের বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা, ছোটগল্প, নাটক সম্বন্ধে যে-কয়েকটি বিশ্লেষণী লেখা তিনি লিখেছেন তার ভিত্তিতে বলা যায়, আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে এবং সুস্থির সময় পেলে বেঞ্জামিন আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হতে পারতেন।
সাহিত্য-সমালোচনায় তাঁর অবদান অন্যসব ক্ষেত্রে চর্চাকে অতিক্রম করে গিয়েছে।
চার্লস বোদলেয়ারের কবিতা সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে বেঞ্জামিন প্রথমেই বলেছেন, যেসব পাঠকের কাছে লিরিক কবিতা পাঠ সমস্যার মনে হবে বোদলেয়ার তাঁদের কথা মনে রেখে ‘ক্লেদজ কুসুম’ (Le fleur du mal) কাব্য সংকলনের প্রথম কবিতাটি লেখেন। মনোযোগ দেওয়া বা জেদ নিয়ে পড়া এই সব পাঠকের স্বভাব নয়, তারা চায় আবেগী আনন্দ (sensual pleasure), লিখেছেন বেঞ্জামিন। এরপর তিনি বোদলেয়ার যে এই ভাবে পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য আপস করেছেন তা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারপর বলেছেন, বোদলেয়ার জানতেন তিনি যে ধরনের কবিতা লিখেছেন তাদের জনপ্রিয় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই পরিস্থিতির জন্য বেঞ্জামিন তিনটি কারণ শনাক্ত করেছিলেন। প্রথমত, লিরিক কবিরা এখন আর কবিদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। দ্বিতীয়ত, লিরিক কবিতার সাফল্য সমাপ্ত হয়েছে। তৃতীয় কারণ, লিরিক কবিতার প্রতি পাঠকের ক্রমিক ঔদাসীন্য। কিন্তু বোদলেয়ারের কবিতা এইসব কারণ সত্ত্বেও জনপ্রিয় হয়েছে এবং ক্লাসিকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই লিরিক কবিতা পাঠকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যময় হতে পারে। আর এই ব্যতিক্রম ঘটে যখন অভিজ্ঞতার কাঠামোগত পরিবর্তন হয়। এরপর বেঞ্জামিন অভিজ্ঞতার কাঠামোগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দর্শন এবং অতীত স্মৃতির উল্লেখ করেছেন। স্মৃতির কাঠামো অভিজ্ঞতার দার্শনিক প্যাটার্ন নির্ধারণ করে, এই প্রতিপাদ্যে এসেছেন তিনি। বোদলেয়ারের লিরিক কবিতার ব্যাখ্যায় তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেছেন বার্গসঁ-এর দর্শন এবং তার ফলশ্রুতি হিসেবে মার্সেল প্রুস্তের স্মৃতিচারণা। স্মৃতিচারণের প্রসঙ্গে এরপর ফ্রয়েড এসেছে এবং স্মৃতিকে চিন্তার চালিকাশক্তি মনে করেছেন বলে পল ভ্যালেরির উল্লেখও করেছেন। এইভাবে দর্শন, মনস্তত্ত্ব এবং সাহিত্য, বিশেষ করে সমকালীন এবং নিকট অতীতের কবিতা ব্যবহার করে বেঞ্জামিন ব্যাখ্যা করেছেন কেন বোদলেয়ারের লিরিক কবিতা জনপ্রিয় এবং কালজয়ী হয়েছে।
‘ক্লেদজ কুসুম’ কাব্যগ্রন্থে যে মোটিফ একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে মানুষের ভিড় বেশ প্রধান। এই ভিড়ের উল্লেখ করতে গিয়ে বোদলেয়ার প্যারিস শহরের নাম ব্যবহার করেননি, যেমন করেছেন ভিক্টর হুগো। বেঞ্জামিন লিখেছেন : mass was the agitated veil; through it Baudelaire saw, Paris. The presence of the mass determines one of the most famous components of Les Fleurs du mal. (On Some Motifs of Baudelaire, Benjamin, W. 1923)
প্যারিসের রাস্তায় ভিড়ের মানুষ যে উদ্দেশ্য – উদাসীন পথচারী (flaneur) নয়, এর ওপর জোর দিয়েছেন বেঞ্জামিন। তাঁর সমর্থনে তিনি এডগার অ্যালান পো’র বর্ণনায় লন্ডনের পথের দৃশ্য এবং ভিড়ের কথা বলেছেন। বেঞ্জামিনের এই লেখায় উত্তর-আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য inter-texuality-এর অনেক ব্যবহার করেছেন বেঞ্জামিন তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে। বোদলেয়ারের এবং তাঁর কবিতার পরিচিতি এর চেয়ে ভালো হয়তো আছে; কিন্তু এমন চমৎকার, আকর্ষণীয়ভাবে কমই বলা হয়েছে।
ফ্রাঞ্জ কাফকার লেখা বেঞ্জামিনকে আকর্ষণ করেছিল তাঁর লেখার বিষণ্ন, দুশ্চিন্তা-উদ্বেগময় এবং ভীতিকর আবহের জন্য। ক্ষমতার শক্তির কাছে সাধারণ মানুষ যে পরাস্ত এবং পরাজয়ের আগে নিত্যই নির্যাতিত, কাফকার লেখায় এই বিষয় ঘুরেফিরে আসতে দেখে বেঞ্জামিন এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসেবে জ্ঞানার্জনের কথা ভাবেন। ন্যায়বিচার পেতে হলে আইন সম্বন্ধে জানতে হবে, মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে ভরসা পেতে হবে ধর্মীয় ঐতিহ্যকে স্মরণ করে, যার সঙ্গে যুক্ত আছে পরিত্রাণের প্রতিশ্রুতি। এই আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানে কাফকাকে না দেখে তিনি অন্যদের মতো বেশ অবাক হন।
কাফকার ওপর লেখাটি (Franz Kafka : On the Tenth Anniversary of his Death, 1934) শুরু হয়েছে রাশিয়ার রানি ক্যাথারিনের অর্থমন্ত্রী পটেমকিনের প্যারোডি-সুলভ কাহিনি দিয়ে যেখানে তাঁকে দেখা যায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে অধস্তনের আনা একের পর এক ফাইলে সই করে বিদায় করতে। পরে দেখা গেল তিনি নিজের নাম নয়, সেই অধস্তনের নাম লিখেছেন নিজের নামের পরিবর্তে। পটেমকিনকে ক্ষমতাধরদের প্রতীক করে দেখিয়ে বেঞ্জামিন প্রশ্ন করেছেন : Why do they vegetate? প্রকৃতপক্ষে তিনি বলতে চেয়েছেন ক্ষমতাসীন যারা, রাজা-রানি, মন্ত্রী, আমলা – সবাই একটা সময়ের পর স্থবিরতায় ভোগে। চলৎশক্তিহীন হয়ে তাঁরা অধস্তন আর সাধারণ মানুষকে ঘোরায়, বিপন্ন করে, হয়রানি করে পাশবিক আনন্দ পায়। তিনি একথা বলতে গিয়ে দি ট্রায়াল আর দি ক্যাসল উপন্যাসের মূল চরিত্র এবং ভিকটিম মি. কে-এর উল্লেখ করে বলেন, পাপবোধে আক্রান্ত পিতা যেমন পুত্রকে শাস্তি দিয়ে নিজে উদ্ধার পেতে চান, এও তেমনি। The father punishes; guilt attracts him as it does the court officials. পিতা নিজের আদি পাপ (original sin) মোচনের জন্য তা পুত্রের ওপর চাপান। কি এই ‘অরিজিনাল সিন’ – তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন : Original sin, the old injustice committed by man, consists in the complaint that unceasingly made by man that he has been the victim of an injustice. কিন্তু এই অভিযোগ ভিত্তিহীন কেননা কে যে পাপের জন্য দায়ী তা অনির্দিষ্ট। কাফকা তাঁর চরিত্রের মুখ দিয়ে বলান : It is the characteristic of this legal system, conjectures K, that one is sententenced not only in innocence but also in ignorance.
বেঞ্জামিন এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় ধর্ম, উপকথা, ইউলিসিসের মিথ, থিয়েটার, সার্ভেন্তেসের ডন কিহোতে নিয়ে আসেন। শেষ পর্যন্ত বেশ জটিল হয়ে যায় নির্দোষ এবং জ্ঞানহীনদের অকারণে শাস্তি পাওয়ার বয়ান। তিনি যে প্রচলিত অর্থে যাঁদের বুদ্ধিজীবী বলা হয় তাঁদের একজন নন, বেশ ব্যতিক্রমী চিন্তা-ভাবনায় এবং বিশ্লেষণে, তার আরো একটা দৃষ্টান্ত এই লেখা। খুবই উচ্চমার্গের, কিন্তু সবার জন্য নয়, এই উপসংহারে না এসে উপায় থাকে না।
মার্শেল প্রুস্তের ওপর লেখাটি (The Image of Proust, 1929) তুলনামূলকভাবে প্রাঞ্জল। বেঞ্জামিন কৌতুক আর কৌতূহল নিয়ে তাকিয়েছেন প্রুস্তের চার দেয়ালের মধ্যে কাটানো স্বেচ্ছাবন্দি জীবনের প্রতি। প্রুস্তের সমস্যা যে শুধু ইনোসেন্স নয়, ইগ্নোরেন্স – অজ্ঞতাও সমানভাবে দায়ী, একথা বলেছেন তিনি কোনো ভনিতা না করে। অজ্ঞ যদি না হবেন ঘরের জানালা খুললেই তো তাজা বাতাসে প্রাণ তাঁর নেচে উঠতে পারতো প্রজাপতির মতো, লিখেছেন বেঞ্জামিন।
প্রুস্তের আত্মজীবনীকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন একজন মিস্টিক, গদ্যলেখক, ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপকারী, পণ্ডিত এবং নিজের সম্বন্ধে উঁচু ধারণার অধিকারীর সাহিত্যসৃষ্টি। বেঞ্জামিনের ব্যবহৃত বিশেষণে প্রশংসা যেমন আছে, সেইসঙ্গে আছে ঠাট্টা এবং বিদ্রূপ। এই সবই প্রুস্তের পাওনা বলে মনে করেন বেঞ্জামিন। তবে সবচেয়ে বড় কম্পলিমেন্ট দিয়েছেন তিনি একথা বলে : All great works of literature found a genre or dissolve one – that they are, in other words, special cases. কিন্তু এই লেখা যে উপলব্ধির জন্য সহজপাঠ্য না (unfathomable), সে-কথাও বলেছেন তিনি। গল্প, আত্মজীবনী, ধারাবিবরণীর আঙ্গিকে লেখা হলেও এই বিশাল লেখার (তেরো খণ্ড) কাঠামো কোনো প্রথাগত শৈলীতে পড়ে না বলে পাঠক পড়তে গিয়ে প্রতারিত হয় এবং হকচকিয়ে যায়। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বইটি লেখার বিশেষ যে পটভূমি তার উল্লেখ করেছেন : An unusual malady, extraordinary wealth, and an abnormal disposition. This is not a model life in every respect, but everything about it is exemplary.
বেঞ্জামিন বলেছেন, এই বইতে প্রুস্ত যে জীবন যাপিত, তার কথা লেখেননি, সেই জীবনের স্মৃতিকথা লিখেছেন। এটা সত্য মেনে নিয়েও বেঞ্জামিন মনে করেন, প্রুস্তের এই কথায় স্মৃতিচারণের প্রক্রিয়ার উল্লেখ নেই, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়াকে বেঞ্জামিন বর্ণনা করেছেন weaving of his memory, the Penelope work of recollection. এ-কথা বলার পর তিনি ইউলিসিসের স্ত্রী পেনেলোপে যেভাবে দিনে ট্যাপেস্ট্রি বুনে রাতে খুলে দিতেন সুতোর বাঁধন তার উল্লেখ করে প্রুস্তের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলে মিল দেখিয়েছেন। এরপর তিনি প্রশ্ন রেখেছেন : Is not this work of spontaneous recollection, in which remembrance is the woof and forgetting the warf, a conterpart to Penelope’s work rather than its likeness? For here the day unravels what the night has woven. স্মৃতিচারণার এই প্রতারণা এড়ানোর জন্যই প্রুস্ত অন্ধকার ঘরে আলো জ্বেলে দিনকে রাত করেছেন এবং লিখে গিয়েছেন।
এই যে এত কষ্ট করে যাপিত জীবনকে স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, এই কাজ প্রুস্ত করতে গিয়েছেন কেন? তাঁর কি উদ্দেশ্য ছিল? এর উত্তরে বেঞ্জামিন বলেছেন, প্রুস্ত যখন কোনো মুহূর্তকে নিজের জীবনের বলেছেন, তিনি এমনভাবে এর বর্ণনা দিয়েছেন যে সব পাঠক তাদের জীবনে সেই মুহূর্তটি দেখতে পেয়েছে। We might almost call it an everyday hour.
প্রুস্তের এই ক্লাসিক সৃষ্টির আলোচনায় বেঞ্জামিন অন্য লেখকদের প্রসঙ্গ এনেছেন, কিন্তু দর্শন বা ধর্মতত্ত্ব দিয়ে জটিল করে তোলেননি, যেমন করেছেন তাঁর অধিকাংশ লেখায়। বেশ স্বচ্ছ, প্রাঞ্জল আর সরলরৈখিক প্রুস্তের ওপর এই লেখা। এবং অবশ্যই মৌলিক।
ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রভাবিত হয়েছে তিনজনের সান্নিধ্যে এসে। গার্শম শোলম তাঁকে বলেছেন ইহুদি ধর্মের মরমিয়াবাদ সম্পর্কে যার প্রভাবে তিনি লেখেন ভাষার ওপর দুটি প্রবন্ধ এবং প্রায় সব লেখায় থাকে ইহুদি ধর্মের ঐতিহ্যের উল্লেখ। ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের থিওডোর এডর্নোর ক্রিটিকাল থিওরির অনুসরণে সর্বদা দ্বন্দ্ববাদী বস্তুবাদের আলোকে না লিখলেও সেই স্কুলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না দিলেও ব্রেশটের মার্কসবাদী
চিন্তা-ভাবনা তাঁকে প্রভাবান্বিত করেছে। বার্টোল্ট ব্রেশট তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য ডেনমার্ক গিয়েছিলেন। ব্রেশটের এপিক থিয়েটার তাঁকে মুগ্ধ করেছিল এবং এর মধ্যে তিনি শ্রেণিসংগ্রাম উজ্জীবিত রাখার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন।
Illuminations শিরোনামে ১৯৫৫ সালে তাঁর যে প্রবন্ধ সংকলন বের হয় সেখানে What is Epic Theatre? শীর্ষক লেখায় তিনি ব্রেশটের উদ্ভাবিত নতুন নাটক মঞ্চায়নের বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা দিয়েছেন। খুব সহজ, সরল ভাষায় লেখা এই প্রবন্ধ এমন প্রাঞ্জল যে, তাঁর অন্য জটিল লেখার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এই লেখায় তিনি তত্ত্বের চেয়ে তথ্য পরিবেশনাতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন, কেননা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পরিচিতি দেওয়া। তিনি প্রথমেই বলেছেন, এপিক থিয়েটারের উদ্দেশ্য দর্শকদের কাছে দৈনন্দিনের আটপৌরে অভিজ্ঞতার মতো কাহিনি উপস্থাপিত করা যেন তাদের এর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিতে না হয়। মঞ্চে নয়, তাদের সাধারণ জীবনের পরিচিত পরিবেশে ঘটছে কিছু, তাদের মতোই কিছু মানুষের চলাফেরায় এবং কথাবার্তায়, এমন হতে হবে কাহিনির উপস্থাপনা। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এপিক থিয়েটারের কাজ হলো প্রচলিত মঞ্চ থেকে চাঞ্চল্য বা অভিনবত্ব সৃষ্টির ক্ষমতা তুলে নিয়ে তা অপ্রয়োজনীয় করে তোলা। নাটকীয় বিষয় নয়, পরিচিত বিষয়কে উপস্থাপনার গুণে আকর্ষণীয় করে তোলে এপিক থিয়েটার, এর ওপর জোর দিয়েছেন বেঞ্জামিন। অভিনয়হীন স্বাভাবিক আচরণ ও সংলাপ, প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানের ব্যবহার নাটকীয়তা বর্জন করে এপিক থিয়েটারকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে, বলেছেন তিনি। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হিসেবে আয়োজিত হলেও, এপিক থিয়েটার শ্রেণিসংগ্রামে তার রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের প্রতিই বেশি গুরুত্বারোপ করে। কিন্তু রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের জন্য অভিনেতার অভিনয়কে কেন বেশি গুরুত্ব দিলেন বেঞ্জামিন, পরিচালককে নয়, তা বোঝা যায় না।
একই জায়গায় এনে, দর্শকদের সঙ্গে অভিনেতার পার্থক্য দূর করে এপিক থিয়েটার নাটককে যে শক্তি দিয়েছে তার সাহায্যে সমাজ পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগ বেগবান হতে পারে, মনে করেছেন বেঞ্জামিন। এরিস্টটলের catharsis-এর ব্যবহার করে দর্শকের সহানুভূতি লাভের পরিবর্তে এপিক থিয়েটার উদ্রেক করে সমমনাদের অংশগ্রহণের তৃপ্তি। এখানে বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করে।
ফরাসি ক্লাসিকাল এবং মধ্যযুগের নাটক থেকে শুরু করে স্ট্রিন্ডবার্গ ও শেক্সপিয়ারের নাটকের দৃষ্টান্ত দিয়ে তুলনা করা হয়েছে এপিক থিয়েটারের সঙ্গে। কিন্তু অন্য লেখার মতো এই প্রবন্ধ রেফারেন্সের জটিলতায় আকীর্ণ হয়নি। স্বল্প আয়াসেই বোধগম্য হয়, জানা যায় এপিক থিয়েটারের গোড়ার কথা। বেঞ্জামিন ব্রেশটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। শুধু তাঁর থিয়েটার দেখেননি, নিশ্চয় আলোচনা করেছেন। কিন্তু লেখার সময় লিখেছেন নির্মোহ হয়ে।
চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফি এবং চিত্রকলা – সব দৃশ্যশিল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের। স্কুলে থাকতে এসব বিষয়ে কিছু লিখলেও পরবর্তী সময়ে মনোযোগী হন ভাষা, দর্শন এবং জার্মান রোমান্টিক সাহিত্য নিয়ে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি বার্লিনে জড়ো হলেন ফরাসি আর রাশিয়ান আভাঁ গার্দ কয়েকজন শিল্পী, স্থপতি আর সিনেমা নির্মাতা।
এঁদের মধ্যে ছিলেন দার্শনিক আর্নস্ট ব্লশ, স্থপতি মিস ভ্যান ডার রোয়ে, ফটোগ্রাফার লাসজলো মোহেলা নাগি, চলচ্চিত্র নির্মাতা সিগফ্রিড ক্রাকাউর, ল্যাটভিয়ান নাট্যজন আসজা লাসিস, দাদাবাদী রাউল হউসম্যান, রাউল রিখতার প্রমুখ। এঁরা তাঁদের আগ্রহের বিষয় নিয়ে লেখা ছাপার জন্য বের করলেন জি নামে এক পত্রিকা এবং পরিচিত হলেন ‘জি’ গ্রুপের সদস্য হিসেবে। এঁদের আলোচনায় পুঁজিবাদের বাজারে বিভিন্ন দৃশ্যশিল্পের বিবর্তন দাদাবাদের মতো আভাঁ-গার্দের অভিঘাতে যেভাবে কম্পিত হয়ে আগের আবেদন হারিয়েছে এবং নতুন প্রযুক্তি যেভাবে মিডিয়ার (রেডিও, সংবাদপত্র) মাধ্যমে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়মিতভাবে এসেছে। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বেঞ্জামিনের মনে দৃশ্যশিল্প এবং মিডিয়া সম্পর্কে নতুন চিন্তার সূত্রপাত হয়। তিনি এই বিষয় নিয়ে যে তত্ত্ব তৈরির পথে অগ্রসর হন সেখানে জার্মান রোমান্টিসিজম নয়, মার্কসবাদী চিন্তার প্রভাব ছিল বেশি। মার্কসবাদী ব্রেশট, আসজা ল্যাজিস (যিনি পরে তাঁর প্রণয়ী হন) এবং ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের হর্খহেইমার ও থিওডোর এডর্নোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও দৃশ্যশিল্পের প্রসঙ্গে মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল বলা যায়। ‘জি’ গ্রুপের প্রভাবেই বিশের দশকের শেষার্ধ তাঁর অতিবাহিত হয়েছে মিডিয়া ও দৃশ্যশিল্পের সার্বিক তত্ত্বের অনুসন্ধানে। রোমান্টিসিজিমের ওপর কাজ করার সময় তিনি যেমন মানুষ, সাহিত্য এবং সমাজের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে ভেবেছেন, জি গ্রুপের সদস্য হয়ে মিডিয়া আর দৃশ্যশিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে হলো তাঁকে। এই কাজ করতে গিয়ে অনেকটা পথিকৃতের মতো পথ বের করে অগ্রসর হতে হলো বেঞ্জামিনকে, বিশেষ করে মিডিয়ার ক্ষেত্রে, কেননা মিডিয়া তখনো সাংস্কৃতিক সমালোচকদের আলোচনার বিষয় হয়নি এবং সেই কারণে অনুসরণের কিছু ছিল না।
দৃশ্যশিল্প ও মিডিয়া নিয়ে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তাঁর সাড়া জাগানো দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন ১৯৩৬ সালে, নাম দিলেন : The Work of Art in the Age of Mechanical Reproduction. এটি তিনি লিখলেন বার্লিন নয়, প্যারিসে স্বেচ্ছানির্বাসনে এসে। সেই সময় জি গ্রুপের প্রায় সব সদস্য বার্লিন ত্যাগ করে বিভিন্ন দেশে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে গিয়েছেন। ১৯৩৩ সালে জার্মান পার্লামেন্ট রাইখটাগ হিটলারের কর্মীদের হাতে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর তাঁদের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, নাৎসিরা জি গ্রুপের চিন্তা-ভাবনা আর প্রচারণার কর্মকাণ্ড বরদাশত করবে না। যেসব চিন্তা এতদিন বেঞ্জামিনের মনের মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে ঘুরছিল, ফ্যাসিজমের উত্থানের পর তিনি সে-সম্বন্ধে বিশদভাবে লিখলেন। প্রবন্ধের শেষের বাক্য দিয়েই বুঝিয়ে দিলেন কী তার উদ্দেশ্য : This is the situation of politics which fascism is rendering aesthetic. Communism responds by politicizing art. এর আগে আর কোনো প্রবন্ধে বেঞ্জামিন এমন বলিষ্ঠ স্বরে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে বলেননি, কমিউনিজমের স্বপক্ষেও ঘোষণা দেননি। এই আপোসহীন লেখা ছিল তাঁর লেখক জীবনে ইংরেজিতে যাকে বলে watershed event।
১৯২০ দশকের মাঝামাঝি দৃশ্যকলা আর মিডিয়া নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে কেন তিনি এত সময় নিলেন ফ্যাসিবিরোধী মার্কসবাদী এই ‘ইশতেহার’ লিখতে? এর উত্তরে তিনি প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছেন উৎপাদন সম্পর্ক সমাজের ভিত্তিতে (অর্থনীতিতে) যত তাড়াতাড়ি আসে উপরিতলে (superstructure) তেমন নয়। The transformation of the superstructure, which takes place far more slowly than that of the substructure, has taken more than half a century to manifest in all areas of culture the change in the conditions of production. এরপর তিনি যোগ করেছেন এই শর্ত (proviso) যে, তার শিল্পতত্ত্ব শ্রেণিহীন সমাজ যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই দেশের শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় যেখানে শিল্প নিছক একটি কমোডিটি, বেচা-কেনার পণ্য, তার কথা মনে রেখেই এই শিল্পতত্ত্ব তৈরি।
প্রবন্ধের শুরুতে তিনি বলেছেন শিল্পের পুনরুৎপাদন অতীতেও হয়েছে। শিক্ষানবিসেরা গুরুর শিল্পকর্ম নকল করেছে। প্রাচীন গ্রিসে ব্রোঞ্জ মূর্তি, টেরাকোটা শিল্প এবং মুদ্রা তৈরি পৌনঃপুনিকভাবে হয়েছে। কিন্তু অন্য সব শিল্প – বিশেষ করে পেইন্টিং থেকে গিয়েছে পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে, একক (unique) মহিমায়, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, সার্বভৌম (autonomous)। উডকাট এসে গ্রাফিক আর্ট পুনরুৎপাদিত হওয়া সম্ভব করে তুললো। তারপর যুক্ত হলো এনিগ্রেভিং, এচিং এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এলো লিথোগ্রাফি যা পুনরুৎপাদনকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। লিথোগ্রাফি গ্রাফিক আর্টের সাহায্যে দৈনন্দিন জীবনের ছবি সরবরাহ করলো সবার কাছে, বই-নিউজপেপার প্রিন্টিংয়ের সঙ্গে একাকার হয়ে। কয়েক দশক পর ফটোগ্রাফি লিথোগ্রাফির স্থান অধিকার করে নিল। ফটোগ্রাফির মাধ্যম পুনরুৎপাদন অন্য সব মাধ্যমকে ছাড়িয়ে গেল। লিথোগ্রাফি যেমন সচিত্র সংবাদপত্র সম্ভব করেছিল, ফটোগ্রাফির হাত ধরে একসময় চলচ্চিত্রের আবির্ভাব হলো। বেঞ্জামিন প্রযুক্তির অগ্রগতির এই বিবরণ দেওয়ার পর বলেছেন, দৃশ্যশিল্পের ওপর শিল্পকর্মের পুনরুৎপাদন এবং চলচ্চিত্র যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, যার পরিণাম হয়েছে সুদূরপ্রসারী।
পুনরুৎপাদনের ফলে যে পরিবর্তন এসেছে দৃশ্যশিল্পের জগতে তার ব্যাখ্যায় বেঞ্জামিন বলেছেন – প্রথমত, পুনরুৎপাদিত শিল্প তাদের স্থান-কালের প্রেক্ষিত হারিয়েছে। যেহেতু একটি শিল্পকর্ম যে-কোনো স্থানে যে-কোনো সময়ে পুনরুৎপাদিত হতে পারে, সেই জন্য তার কোনো স্থান-কালের নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। দ্বিতীয়ত, যেহেতু স্থান-কাল অনির্দিষ্ট সেই জন্য পুনরুৎপাদিত শিল্প খাঁটি (authentic), না নকল বোঝার উপায় নেই। হাতে করে যখন নকল করা হতো, সেটা মূলের সঙ্গে তুলনা করে বোঝা যেত নকল কি না। কিন্তু যান্ত্রিক যে পুনরুৎপাদন তার ফলে মূল শিল্পকর্মের সঙ্গে তার স্থানগত দূরত্ব এমন বিশাল হতে পারে যে তুলনার প্রশ্নই ওঠে না। অন্যদিকে শিল্পকর্ম বা চলচ্চিত্র যেখানে তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে দূরে, দর্শকের কাছে এসে যাওয়ার ফলে শিল্পকর্ম উপভোগের যে সামাজিক প্রেক্ষিত ছিল সেটি তিরোহিত হয়ে গিয়েছে। এর নেতিবাচক দিকের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে বেঞ্জামিন লিখেছেন : Its social significance, particularly in its mist positive form, is inconceivable without its destructive, cathartic aspect, that is, the liquidation of the traditional value of the cultural heritage.
যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের ফলে দৃশ্যশিল্পে, বিশেষ করে চিত্রকলায়, আরেকটি ব্যাপার ঘটেছে। একটি মহৎ এবং সুন্দর ছবিকে ঘিরে যে মুগ্ধতা, রহস্যের হাতছানি, তীব্র আকর্ষণ এবং দেখার সময় যে রোমাঞ্চ ও শিহরণ, এসব বৈশিষ্ট্যকে বলা যায় ‘আভা’ বা ‘জ্যোতি’ (aura)। যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনে এই আভার বা জ্যোতির বোধ হারিয়ে যায়, কেননা শিল্পকর্মটি তখন সব রহস্য হারিয়ে হাতের কাছে অলস অবলোকনের জন্য অপেক্ষা করে।
এরপর বেঞ্জামিন তাঁর শিল্পতত্ত্বে এসে বলেন, স্থান-কাল, মূলানুগতা (authenticity) এবং ‘আভা’ (aura) হারানোর ফলে দৃশ্যশিল্প নিয়ে যে আচরণ (ritual) প্রক্রিয়া (দর্শক হিসেবে সবার সঙ্গে দেখার এবং উপভোগের; ক্রেতা হিসেবে দুর্লভ সম্পদের অধিকারী হিসেবে গৌরব) তা হারিয়ে যায়। পুনরুৎপাদনে শিল্পকর্ম একক, অদ্বিতীয় (unique) থাকে না, তার সর্বময় কর্তৃত্ব বা স্বায়ত্তশাসিত হওয়ার ক্ষমতাও দূর হয়ে যায়।
দৃশ্যশিল্পের এই আচার (ritual) হারানোকে বেঞ্জামিন পরিতাপের বিষয় মনে করেন না। বরং মনে করেন পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শিল্পকে যেভাবে পণ্য করে রাখা হয়েছিল তার থেকে মুক্তি। আর যেহেতু পুঁজিবাদের বাজারে ব্রাত্যজন ক্রেতা হিসেবে সীমান্তের (periphery) অধিবাসী এবিং শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে কেনা দূরের কথা দেখারও সুযোগ নেই, সেই কারণে যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনে সাধারণ বিত্তহীন মানুষদেরই লাভ। এডর্নো যেমন পুঁজিবাদী কালচার ইন্ডাস্ট্রির mass production-কে বাজারের স্বার্থে রুচির অবনতি বলে মনে করেছেন, তার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে বেঞ্জামিন শিল্পের যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনে পুঁজিবাদে শিল্পকে পণ্যে রূপান্তরিত করার সমাপ্তি দেখতে পেয়েছেন। ফ্যাসিবাদে রাজনীতিকে এস্থেটিক দিয়ে গৌরবান্বিত করার যে আয়োজন তার উত্তরে কমিউনিজমে শিল্পের রাজনীতিকরণের অন্যতম উপায় হিসেবে তিনি দেখতে পেয়েছেন শিল্পের যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন। শিল্পের বিশাল উৎপাদন তাঁর কাছে গণমুখী মনে হয়েছে।
বেঞ্জামিন দৃশ্যশিল্পে যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যে-তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন তা আংশিক সত্য। দৃশ্যশিল্প, বিশেষ করে চিত্রকলা এখনো বাজারে পণ্য হয়েই কেনা-বেচা হচ্ছে। যান্ত্রিকভাবে যেসব ছবির প্রিন্ট তৈরি হয়, সেখানে শিল্পীর স্বাক্ষর মূল কাজের ‘আভা’কে এককভাবে না হলেও সীমাবদ্ধের (limited edition) মধ্যে ধরে রাখা হয়। একমাত্র সংবাদপত্রের ফটোগ্রাফ আর চলচ্চিত্র পুঁজিবাদের বাজারে পণ্য হলেও সহজলভ্য হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের উপভোগের আয়ত্তে আছে। তবে কমিউনিজম শিল্পকে রাজনীতিতে এনেছে সোশ্যাল রিয়েলিজমের আদর্শ আরোপ করে এবং শিল্পীদের জীবিকানির্বাহের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দিয়ে। এই পটভূমিতেই শিল্পের যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন কমিউনিজমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে শিল্পের পরিচিতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে প্রচারের ক্ষেত্রে। বেঞ্জামিন এসব ভেবেছিলেন কি না বলার উপায় নেই। এখন অবশ্য এই সব প্রসঙ্গই অ্যাকাডেমিক।
চার। উপসংহার
সংক্ষিপ্ত জীবনে নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। তাঁকে বলা যায় ইউরোপের শেষ রেনেসাঁস ম্যান। তাঁর বেশির ভাগ লেখাই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ। বেশ কিছু লেখা অসমাপ্ত এবং শেষের লেখাটি (The Arcade Project) অপ্রকাশিত রয়ে গিয়েছে। ওপরে কয়েকটি বিষয়ের ওপর তাঁর লেখার আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর সম্বন্ধে যে-কথা সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য তা হলো, মৃত্যুর ৮৪ বছর পরও তাঁর সব না হলেও বেশ কিছু লেখা এখনো প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে এবং পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। Illuminations (১৯৫৫) প্রবন্ধ সংকলনের ভূমিকায় বেঞ্জামিনের প্রায় সমকালীন দার্শনিক Hannah Arendt লিখেছেন : To describe adequately his work and him as an author within our usual framework of reference one would have to make a great many negative statements, such as: his erudition was great, but he was no scholar; his subject matter comprised texts and their interpretation, but he was no philologist; he was greatly attracted not by religion but by theology but he was no theologian; he was a born writer, but his greatest ambition was
was to produce a work consisting entirely of quotations; he was the first German to translate Proust and St. John Perse and Baudelaire, but he was no translator.
মজা করে (তিনি বিশ্বাস করেননি যা বলেছেন) এইসব ‘নেতিবাচক’ উক্তির পর তিনি লিখেছেন : Still, in the rare moments when he cared to define what he was doing, Benjamin thought himself as a literary critic…
হালকাভাবে হলেও ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের এমন চমৎকার মূল্যায়ন আর কেউ করেননি


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.